বিষয়বস্তুতে চলুন

আলম্‌গীরের পত্রাবলী/১৭

উইকিসংকলন থেকে

[ ১৭ ]

 প্রিয় পুত্র আজম্, সাহান্‌শাহ্ (শাহ্‌জহান্) বলিতেন, ‘অলস লোকই শিকার-প্রিয় হয়।’ শিকারে সময়ক্ষেপণ করা নিষ্কর্ম্মা লোকের কাজ। সংসারের ভোগবিলাসে আসক্ত হওয়া এবং রাজধর্ম্মের প্রতি অমনোযোগী হওয়া বড়ই গর্হিত কার্য্য। কারণ ইহজগতে যে যেরূপ কাজ করিবে, পরজগতে সে তদনুযায়ী ফলভোগ করিবে। পুত্র, শাহানশাহ্ (শাহ্‌জহান) কিরূপ সুনিয়মে তাঁহার প্রাত্যহিক কার্য্য করিতেন, বলিতেছি শুন।—তিনি প্রত্যহ রাত্রি এক প্রহর থাকিতে প্রফুল্লচিত্তে শয্যাত্যাগ করিতেন এবং ঘুসলখানায় গিয়া যথারীতি প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া প্রাত্যহিক কোরাণপাঠে মনোনিবেশ করিতেন। তৎপরে সূর্য্যোদয়ের পূর্ব্বে মোল্লাদিগের নামাজের চীৎকার শেষ হইলে পর তিনি প্রাতঃকালীন উপাসনা করিতেন। উপাসনা শেষ হইলে ‘দর্শনী-ঝরকা’য়[] গিয়া উপবেশন করিতেন; তথায় সমবেত প্রজাবৃন্দ তাঁহার দর্শনলাভ করিয়া তৃপ্ত হইত। বেলা এক প্রহরের সময় তিনি দেওয়ানী-আমে উপস্থিত হইতেন। তথায় আমীর-ওমরাহ্ ও পদস্থ কর্ম্মচারিগণ নতজানু হইয়া তাঁহাকে অভিবাদন করিত। তৎপরে রাজকার্য্য আরম্ভ হইত। উজিরগণ এবং ধনাধ্যক্ষগণ যে যাহার কাগজ পেশ করিত। রাজভৃত্যগণ, সহর-কোতোয়ালগণ, এবং জেলার শাসনভারপ্রাপ্ত কর্ম্মচারিগণ বিশ্বস্ততা এবং কার্য্যকুশলতা দেখাইয়া থাকিলে তাহা সম্রাটকে জানান হইত। তিনি ইহাদের যার যা’ অভিলাষ পূর্ণ করিতেন। দেওয়ানী-আমের কার্য্য শেষ হইলে সম্রাট রাজকীয় অশ্ব এবং হস্তী যথারীতি পরিদর্শন করিতেন। তৎপরে বেলা দেড়প্রহরের সময় তিনি দেওয়ানী-আমে গিয়া দর্শন দিতেন। তখন খাস মুন্সীগণ নব-নিযুক্ত কর্ম্মচারিগণের কার্য্যবিবরণ তাঁহার সমীপে উপস্থাপিত করিত; সম্রাট তাহাদের সম্বন্ধে শেষ হুকুম প্রচার করিতেন। অতঃপর মুন্সীগণ প্রত্যেক প্রদেশে যে যে আবশ্যক ঘটনা ঘটিতেছে তাহার বিবরণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সংবাদ সম্রাটের গোচর করিত। তিনি সে সকলের মীমাংসা করিয়া শেষ হুকুম প্রদান করিতেন। এই সকল কার্য্যে বেলা দ্বিপ্রহর অতিবাহিত হইত। তৎপরে তিনি মধ্যাহ্নভোজন করিতেন। তাঁহার ভোজ্য সামগ্রী খাস লোক দ্বারা বিশেষ সাবধানে প্রস্তুত হইত। তিনি শরীর ধারণের উপযোগী, রাজকার্য্য সুনিয়ন্ত্রিত করিবার জন্য বলাধানের উপযোগী এবং স্বাস্থ্যকর আহার্য্য গ্রহণ করিতেন। তৎপরে আশ্রিত ব্যক্তিগণের এবং যাহাদিগকে তিনি প্রত্যহ খোরাক যোগাইতেন, তাহাদের আহারের বিষয় তদন্ত করিতেন। এই সকল লোকের অধিকাংশই ধার্ম্মিক, ভগবদ্ভক্ত এবং শাস্ত্রজ্ঞ ছিল। নিঃস্ব, দরিদ্র, অনাথ, আতুর এবং দুর্দ্দশাগ্রস্ত লোকও বিস্তর ছিল। তিনি ইহাদের অনেককেই চিনিতেন। আহারের ব্যাপার শেষ হইলে তিনি বিশ্রাম লাভার্থ খাস কামরায় প্রবেশ করিতেন। বেলা তিন প্রহরের সময় বিশ্রামকক্ষ হইতে বাহির হইয়া হস্তমুখাদি প্রক্ষালন করিয়া তিনি কোরাণপাঠে রত হইতেন। কোরাণপাঠের পর দ্বিপ্রহরের নমাজ শেষ করিয়া তিনি আসাদ বুরুজে আসিয়া উপবেশন করিতেন। এখানে প্রধান প্রধান উজীরগণ উপস্থিত থাকিত। তাহারা রাজস্ব এবং রাজনীতিসংক্রান্ত কার্য্য সম্রাট-সমীপে উপস্থাপিত করিত এবং সম্রাটের দস্তখতের জন্য আর্জি সকল পেশ করিত। এখানকার কার্য্য শেষ করিয়া তিনি পুনরায় দেওয়ানীআমে হাজির হইতেন। এই সময় মুন্সীগণ, যে সকল লোক উচ্চপদে নূতন বাহাল হইয়াছে এবং যাহারা রাজকীয় জায়গীর প্রার্থনা করে, তাহাদের কাগজপত্র দাখিল করিত। সম্রাট খুব সতর্কতার সহিত এই সকল কাগজ দেখিতেন এবং উমেদারগণের বংশমর্য্যাদা ও ব্যক্তিগত গুণপনা ভালরূপ তদন্ত করিয়া ইহাদের যোগ্যতা-অনুযায়ী পদ বা জায়গীর দিতেন। সূর্য্যাস্তের পূর্ব্বে দেওয়ানী-আম হইতে বাহির হইয়া তিনি সান্ধ্যউপাসনা শেষ করিতেন; তারপর নিজের খাস কামরায় গিয়া বসিতেন। এই সময় এখানে বিদ্বজ্জনের সম্মিলনী হইত। সুনিপুণ ঐতিহাসিকগণ, সুললিতভাষী কথকগণ, অভিজ্ঞ ভ্রমণকারিগণ, এবং সুকণ্ঠ গায়কগণ এখানে সমবেত হইত। স্ত্রীলোকেরা পর্দ্দার আড়ালে বসিতেন এবং পুরুষেরা সম্মুখে বসিতেন। সম্রাটের ইচ্ছা এবং আদেশ-অনুযায়ী ইহারা তখন প্রাচীন রাজগণের ইতিহাস, মহানুভব ব্যক্তিগণের চরিতকথা এবং দেশ-বিদেশের পুরাতত্ত্ব ও ভ্রমণকাহিনী বিবৃত করিত। এইরূপে মধ্যরাত্রি পর্য্যন্ত তিনি সময় যাপন করিতেন। সংক্ষেপে বলিতে গেলে, শাহান্‌শাহ্ দিবাভাগ এবং রাত্রিকাল বেশ সুনিয়ন্ত্রিতভাবে অতিবাহিত করিতেন। এইরূপে সময়ের সদ্ব্যবহার দ্বারা তিনি রাজ্যের প্রতি, প্রজাবর্গের প্রতি এবং নিজের প্রতি সুবিচার করিতেন। আমার পুত্রের প্রতি আমার যে স্নেহ তাহা আন্তরিক, এতটুকুও বাহ্যিক নহে। সেই হেতু আমি আমার প্রিয় পুত্রকে যাহা ভাল এবং মূল্যবান, তাহা লিখিয়া জানাইলাম। লিখিতে বসিয়া এখন আমি যতদূর স্মরণ করিতে পারিলাম—লিখিলাম। আমাকে ক্ষমা করিও, পুত্র।

  1. মোগল বাদশাহগণ যেখানে বসিয়া প্রজাদিগকে দর্শন দিতেন সেস্থান অদ্যাপি বিদ্যমান আছে। দিল্লী-দুর্গের অভ্যন্তরে যমুনার উপকূলবর্ত্তী প্রস্তরখচিত এই বারান্দা এখনও দর্শকের নয়নগোচর হয়।