বিষয়বস্তুতে চলুন

আলম্‌গীরের পত্রাবলী/৫১

উইকিসংকলন থেকে

[ ৫১ ]

[ উম্‌দত্ উল্‌মুল্‌ক্ উজির আসদ্ খাঁর প্রতি ]

 সাম্রাজ্যের বিশ্বস্ত অনুগত সেবক, তোমার অনুরোধক্রমে সদর উজির মুহম্মদ খাঁ সফীকে দ্বিতীয় খাস মুন্সীর পদে বাহাল করা গেল। এই অনুগ্রহের কথা জানাইয়া সত্বর তাহাকে কাজে ডাকিয়া পাঠাও। তাহার কাজে যোগ না দেওয়া পর্য্যন্ত তুমি নিজেই হিসাব-কিতাব ভাল করিয়া পর্য্যবেক্ষণ করিতে থাক, যাহাতে নিম্নপদস্থ কর্ম্মচারিগণ অযথা প্রভুত্ব লাভ করিয়া কাজের ক্ষতি করিবার সুযোগ না পায়। নিজকে পবিত্র রাখ, মনটাকে দর্পণের ন্যায় পরিষ্কার কর; অভাবগ্রস্তকে সাধ্যমত সাহায্য কর; সৎকার্য্যের পুরস্কার ইহজীবনেই লাভ করিবে।

 খাঁজাহান্ বাহাদুরকে অবিলম্বে এর মধ্যে এক পত্র লিখিয়া দাও—“অশ্বব্যবসায়িগণ এবং অন্য সকলে পুনঃ পুনঃ অভিযোগ করিতেছে। প্রপীড়ক হওয়া কোন মতেই ভাল কাজ নহে। অত্যাচারী ব্যক্তি ভগবানের নিকট কঠিন দণ্ডভোগ করিবে, একথা কেন তুমি সর্ব্বদা মনে করিয়া রাখিতেছ না? ভুলিয়া যাইলে যে, তুমি ধীরে ধীরে মৃত্যুর সমীপবর্ত্তী হইতেছ! ভগবানের কঠোর দণ্ড এবং ইহজীবনে বাদশার প্রবল কোপ, এই দুই বিষয় সর্ব্বদা যেন তোমার স্মরণ থাকে।”

 তোমার পুত্র নস্‌রত জঙ্গকে জানাইও যে, একটি বহুমূল্য অঙ্গুরীয় তাহাকে উপহার পাঠাইব। কিন্তু ইহাতে তাহার পুরা খেতাব অঙ্কিত থাকিবে না, বড় জোর তাহার নামটি মাত্র দেওয়া থাকিবে। অত বড় যে সোলেমান, তাঁহার অঙ্গুরীতে কি লেখা ছিল জান? স্বর্ণাক্ষরে কেবল এই কয়টি কথা খোদিত ছিল—“এই জগৎ নশ্বর।”

 রুহ্‌আল্লা খাঁ সেদিন যে ফকীরকে সঙ্গে আনিয়াছিল আমি তাহাকে দেখিয়াছি। ইহারা সেরূপ ফকীর নয়—শুধু আড়ম্বরই আছে দেখিলাম। ইহাকে দেখিয়া ফকীর মিঞা আব্‌দুল লতিফের একটি উপদেশ মনে পড়িয়া গেল—খোদা তাঁহার পবিত্র সমাধিকে অধিকতর পবিত্র করুন। তিনি বলিয়াছিলেন, “ফকীরগণের সহিত যখন-তখন সাক্ষাৎ করা তোমার উচিত নয়।” তাঁহার এই কথায় আমি কিছু চিন্তিত হইলাম, বলিলাম, “আমরা সাংসারিক কাজে অহরহ লিপ্ত থাকিয়া পাপের মধ্যে ডুবিয়া রহিয়াছি। অতএব খোদার প্রিয়পাত্র ফকীরগণের সঙ্গলাভ না করিলে আমাদের কি গতি হইবে?” তদুত্তরে মিঞা বলিলেন, “আমি নিষেধ করিতেছি কেবল এই জন্য যে, এ-কালের ফকীরগণের মধ্যে ফকীরের ভাব অতি অল্পই আছে। সে-কালের ফকীরগণ যে পথে চলিতেন, ইহাদের পন্থা তাহা হইতে সম্পূর্ণ বিভিন্ন, ইহাদের সংশ্রবে থাকিলে তুমি আরও বেশি অন্ধকারে গিয়া পড়িবে। অতএব সাবধান হওয়া উচিত। খোদা তোমাকে রক্ষা করুন।” এই ফকীরকে এইরূপ লিখিয়া দাও, “বাদশার হুকুম যে তুমি ভগবানের আদেশ মানিয়া চলিবে এবং একমাত্র তাঁহাকেই প্রসন্ন করিবার চেষ্টা করিবে। তুমি যেখানে ইচ্ছা অবাধে যাইতে পার, কিন্তু পুনঃ পুনঃ যাতায়াত করিয়া বাদশাহ্‌কে বা লোকজনকে যেন বিরক্ত করিও না। তোমাকে কিছু মাসহারা দেওয়া যাইবে।”