আলম্গীরের পত্রাবলী/৭০
[ ৭০ ]
[ সম্রাটের মরণাপন্ন অবস্থায় এই পত্রখানি তাঁহার তৃতীয় পুত্র মুহম্মদ আজম্ শাহ্কে লিখিত হইয়াছিল ]
পুত্র, আশীর্ব্বাদ করি তুমি শান্তিলাভ কর—তোমার পরিজনবর্গও শান্তিলাভ করুক। বার্দ্ধক্যের একেবারে শেষ সীমায় উপনীত হইয়াছি, দুর্ব্বলতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতেছে; অঙ্গপ্রত্যঙ্গ একেবারে শিথিল, শক্তিহীন। একা আসিয়াছিলাম, একাই চলিয়া যাইতেছি। আমি বুঝিতে পারিলাম না, কে আমি, কেন আসিয়াছিলাম, কি কাজ করিলাম! জীবন বৃথায় অতিবাহিত হইয়াছে—ভগবানের আরাধনা ত করা হয় নাই! একটি বিপুল সাম্রাজ্যের ভার আমার স্কন্ধে পড়িয়াছিল, কিন্তু দক্ষতার সহিত উহা পরিচালনা করিতে পারিয়াছি কি? আকাঙ্ক্ষিত অমূল্য জীবন হেলায় নষ্ট করিয়াছি। জগদীশ্বর এই পৃথিবীতেই বিরাজমান, কিন্তু তাহার দর্শনলাভের সৌভাগ্য আমার ঘটিল না। জীবন অনিত্য—অতীতের কোন চিহ্নই দৃষ্টিগোচর হইতেছে না, ভবিষ্যৎ-জীবন সম্বন্ধেও কোন আশা নাই। আমার শরীর এখন জ্বর-ব্যাধিশূন্য, যেন শরীরের দুরবস্থা দেখিয়া তাহারা লজ্জা পাইয়াই পলায়ন করিয়াছে। চর্ম্মসার এই দেহে আর এতটুকুও বল নাই। পুত্র কামবক্শ্ বিজাপুরে গিয়াছে বটে, কিন্তু সে স্থান ত বেশী দূর নয়? তুমি আরও নিকটে (মালবদেশে) রহিয়াছ। প্রিয় পুত্র শাহ্আলম্ কিন্তু সর্ব্বাপেক্ষা দূরে (কাবুলে) পড়িয়াছে। পৌত্র মহম্মদ আজিমও সেইখানে।—ভগবানের যা’ অভিরুচি। আমার সৈন্যদল অসহায়, হতবুদ্ধি হইয়া পড়িয়াছে। তাহারা আমারই মত অস্থির এবং বিচলিত হইয়া উঠিয়াছে। হায়, তাহারা বুঝিতেছে না যে, উপরে ভগবান আছেন—যিনি তাহাদের প্রভুরও প্রভু। সংসারে যখন আসিয়াছিলাম, কিছুই সঙ্গে আনি নাই; কিন্তু এখন ফিরিয়া যাইতেছি পাপের বোঝা লইয়া। জানি না আমাকে কি শাস্তিই ভোগ করিতে হইবে। জগদীশ্বর পরম কৃপাময়, সে বিশ্বাস আমার আছে, তথাপি ভয় দূর হইতেছে না; কারণ আমি যে মহাপাপী। যাহা হইবার তাহা ত হইয়া গিয়াছে। এখন আমি কাল সমুদ্রে জীবন-তরী ভাসাইয়া দিয়াছি। জগদীশ্বর প্রজাগণের রক্ষাকর্ত্তা হইলেও আমার উপযুক্ত পুত্রগণের কর্ত্তব্য, প্রতিকূল ঘটনাবলীর উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা, যাহাতে প্রজাগণের বিশেষতঃ মুসলমানগণের জীবন অকারণে নষ্ট না হয়। আমার প্রিয় পৌত্র বাহাদুরকে আমার শুভ ইচ্ছা এবং শেষ আশীর্ব্বাদ জানাইও। আর একটি কথা তোমাকে বলি—কন্যা জিনত্-উন্-ন্নিসা যারপর নাই শোকার্ত্তা। তাহার রক্ষাকর্তা একমাত্র ভগবান। বিদায় পুত্র বিদায়, বিদায়।