আলম্গীরের পত্রাবলী/৭১
[ ৭১ ]
[ সম্রাটের মৃত্যুশয্যায় কনিষ্ঠ পুত্র সুলতান মুহম্মদ কামবক্শের প্রতি
এই পত্রখানি লিখিত হইয়াছিল ]
প্রিয়দর্শন পুত্র, এই সংসারে সকলেই নিজ নিজ ইচ্ছার বশীভূত হইয়া কার্য্য করিতেছে। কিন্তু পুত্র, আমি অন্তিমকালে তোমাকে ঐশ্বরিক ইচ্ছার কথাও স্মরণ করাইয়া দিতেছি। আমার উপদেশ তোমার কর্ণে প্রবেশ করিবে না জানি, তথাপি কয়েকটি কথা তোমাকে বলিব। আমি ত এই সংসার হইতে বিদায় হইলাম, কিন্তু আমার বড়ই দুঃখ হয় তোমাদের অক্ষমতার কথা ভাবিয়া। না জানি তোমাদের কি দুর্দ্দশাই হইবে। যাহা হউক এখন ত আর কোন হাত নাই! আমি পাপের বোঝা বহন করিয়া লইয়া চলিলাম—সংসারে থাকিয়া কেবল পাপ কার্য্যই যে সঞ্চয় করিয়াছি! প্রকৃতির কি আশ্চর্য্য বিধান! আসিয়াছিলাম রিক্তহস্তে, কিন্তু ফিরিয়া যাইতেছি পাপের ভারে ভারাক্রান্ত হইয়া। বার দিন প্রবল জ্বরে আক্রান্ত ছিলাম, এখন জ্বর ছাড়িয়া গিয়াছে। এখন যে দিকে দৃষ্টিপাত করিতেছি পুত্র, সেই দিকেই যেন ভগবানের অস্তিত্ব অনুভব করিতেছি। একটি কারণে আমি প্রাণে বড়ই বেদনা অনুভব করিতেছি। আমার অবর্ত্তমানে আমার বিপুল বাহিনী এবং বিশ্বস্ত অনুচরগণ যোগ্য উত্তরাধিকারীর অভাবে সুপরিচালিত হইবে না। আমি নিজের সম্বন্ধে কিন্তু কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। মহাপাতকী আমি, আমার ভাগ্যে না-জানি কি শাস্তিই লেখা আছে! ভগবান্ প্রজার রক্ষা-কর্ত্তা বটেন, কিন্তু আমার পুত্রগণের উচিত প্রজা-সকলকে বিপদে রক্ষা করা। আজম্ আমার নিকটেই আছে। তোমার সম্বন্ধে সকল কথা তাহাকে বলিয়াছি। তুমিও আমার শেষ অভিপ্রায় প্রতিপালন করিও, পুত্র। যাহাতে অনর্থক রক্তপাত হয় এবং মুসলমানগণের যাহাতে জীবন নষ্ট হয় সেরূপ ঘটনা রহিত করাই তোমাদের কর্ত্তব্য। এই বৃদ্ধকে আর নিমিত্তের ভাগী করিও না। তোমাকে এবং তোমার পুত্রগণকে ভগবানের হস্তে সমর্পণ করিলাম। তোমরা সুখী হও, পুত্র! আমি তোমাদের সকলের নিকট হইতে বিদায় লইতেছি। আমার হৃদয় এখন বড়ই চঞ্চল। প্রিয় পৌত্র বাহাদুর এখন গুজরাটে, আজম্ সীমান্ত প্রদেশে (কাবুলে)। বেগম জিনত্-উন্-ন্নিসা বড়ই শোকাকুলা। জীবনে কোন সুখই ত সে পায় নাই। তাহার যে কি কষ্ট, সে তাহা নিজেই জানে, অপরে তা’ কি বুঝিবে? উদিপুরী বেগম, তোমার মাতা—আমার পীড়ারও অংশভাগিনী হইয়াছেন। তাহার অভিপ্রায়, হিন্দু সতীনারীর ন্যায় আমার সহিত তিনি সহমৃতা হইবেন। পুত্র, আত্মীয়স্বজন এবং ভৃত্যগণ ভণ্ড এবং কপটাচারী হইলেও তাহাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করিও। তাহাদিগকে পদচ্যুত বা কোনরূপে নিগৃহীত করিও না। পুত্র, মিতব্যয়ী হইতে চেষ্টা কর। আশীর্ব্বাদ করি সুখী হও। বিদায় পুত্র, বিদায়।