আলালের ঘরের দুলাল/২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

মতিলালের ইংরাজী শিখিবার উদ্‌যোগ ও বাবুরাম বাবুর বালীতে গমন।

মুন্শী সাহেবের দুর্গতির কথা শুনিয়া বাবুরামবাবু বলিলেন-মতিলাল তো আমার তেমন ছেলে নয়- সে বেটা জেতে নেড়ে-কত ভালো হবে ? পরে ভাবিলেন যে ফার্সী চলন উঠিয়া যাইতেছে, এখন ইংরেজী পড়ানো ভালো। যেমন ক্ষিপ্তের কখন কখন জ্ঞানোদয় হয় তেমনি অবিজ্ঞ লোকেরও কখন কখন বিজ্ঞতা উপস্থিত হয়। বাবুরামবাবু ঐ বিষয় স্থির করিয়া বিবেচনা করিতে লাগিলেন আমি বারাণসীবাবুর ন্যায় ইংরেজী জানি-‘‘সরকার কম স্পিক ন্যাট’’ -আমার নিকটস্থ লোকেরাও তদ্রূপ বিদ্বান্, অতএব একজন বিজ্ঞ ব্যক্তির নিকট পরামর্শ লওয়া কর্তব্য। আপন কুটুম্ব ও আত্মীয়দিগের নাম স্মরণ করাতে মনে হইল বালীর বেণীবাবু বড়ো যোগ্য লোক। বিষয় কর্ম করিলে তৎপরতা জন্মে। এজন্য অবিলম্বে একজন চাকর ও পাইক সঙ্গে লইয়া বৈদ্যবাটীর ঘাটে আসিলেন।

আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে মাঝিরা বৈঁতির জাল ফেলিয়া ইলিশ মাছ ধরে ও দুই প্রহরে সময় মাল্লারা প্রায় আহার করিতে যায় এজন্য বৈদ্যবাটীর ঘাটে খেয়া কিংবা চলতি নৌকা ছিল না। বাবুরামবাবু চৌগোঁপ্পা-নাকে তিলক-কস্তাপেড়ে ধুতি পরা-ফুলপুকুরে জুতা পায়-উদরটি গণেশের মতো-কোঁচনো চাদরখানি কাঁধে-একগাল পান-ইতস্ততঃ বেড়াইয়া চাকরকে বলছেন-ওরে হরে ! শীঘ্র বালী যাইতে হইবে দুই-চার পয়সায় একখানা চলতি পানসি ভাড়া কর তো। বড়ো মানুষের খানসামারা মধ্যে মধ্যে বেআদব হয়, হরি বলিল-মোশায়ের যেমন কান্ড ! ভাত খেতে বস্তেছিনু-ডাকাডাকিতে ভাত ফেলে রেখে এসেচি-ভেটেল পান্‌সি হইলে অল্প ভাড়ায় হইত-এখন জোয়ার-দাঁড় টান্তে ও ঝিঁকে মারতে মাঝিদের কাল ঘাম ছুটবে-গহনার নৌকায় গেলে দুই-চার পয়সা হতে পারে-চলতি পান চার পয়সায় ভাড়া করা আমার কর্ম নয়-এ কি থুতকুড়ি দিয়া ছাতু গোলা?

বাবুরামবাবু দুটা চক্ষু কট্মট্ করিয়া বলিলেন-তোবেটার বড়ো মুখ বেড়েছে-ফের যদি এমন কথা কবি তো ঠাস্ করে চড় মারবো। বাঙালী ছোট জাতিরা একটু ঠোকর খাইলেই ঠক্ ঠক্ করিয়া কাঁপে, হরি তিরস্কার খাইয়া জড়সড় হইয়া বলিল-এজ্ঞে না, বলি এখন কি নৌকা পাওয়া যায় ? এই বল্তে বল্তে একখানা বোট গুণ টেনে ফিরিয়া যাইতেছিল, মাঝির সহিত অনেক কস্তাকস্তি ধস্তাধস্তি করিয়া ।।০ ভাড়া চুক্তি হইল-বাবুরামবাবু চাকর ও পাইকের সহিত বোটের উপর উঠিলেন। কিঞ্চিৎদূর আসিয়া দুই দিগ্ দেখিতে দেখিতে বলিতেছেন-ওরে হরে ! বোটখানা পাওয়া গিয়াছে ভালো-মাঝি ! ও বাড়িটা কার রে ? ওটা কি চিনির কল ? অহে চকমকি ঝেড়ে এক ছিলিম তামাক সাজো তো ? পরে ভড় ভড় করিয়া হুঁকা টানিতেছেন-শুশুকগুলা এক এক বার ভেসে ভেসে উঠতেছে-বাবু স্বয়ং উঁচু হইয়া দেখ্তেছেন ও গুন গুন করিয়া সখীসংবাদ গাইতেছেন-‘‘দেখে এলাম শ্যাম তোমার বৃন্দাবন ধাম কেবল আছে নাম’’। ভাঁটা হাওয়াতে বোট সাঁ সাঁ করিয়া চলিতে লাগিল-মাঝিরাও অবকাশ পাইল-কেহ বা গলুয়ে বসিল, কেহ বা বোকা ছাগলের দাড়ি বাহির করিয়া চারি দিগে দেখিতে লাগিল ও চাটগেঁয়ে সুরে গান আরম্ভ করিল ‘‘খুলে পড়বে কানের সোনা শুনে বাঁশির সুর’’- সূর্য অস্ত না হইতে হইতে বোট দেওনাগাজির ঘাটেতে গিয়া লাগিল। বাবুরামবাবুর শরীরটি কেবল মাংসপিন্ড-চারিজন মাঝিতে কুঁতিয়া ধরাধরি করিয়া উপরে তুলিয়া দিল। বেণীবাবু কুটুম্বকে দেখিয়া ‘‘আস্‌তে আজ্ঞা হউক, বসতে আজ্ঞা হউক’’ প্রভৃতি নানবিধ শিষ্টালাপ করিলেন। বাবুর বাটীর চাকর রাম তৎক্ষণাৎ তামুক সাজিয়া আনিয়া দিল। বাবুরামবাবু ঘোর হুঁকারি, দুই-এক টান টানিয়া বলিলেন-ওহে হুঁকাটা পীসে পীসে বল্ছে, খুড়া খুড়া বল্‌ছে না কেন ? বুদ্ধিমান লোকের নিকট চাকর থাকিলে সেও বুদ্ধিমান হয়। রাম অমনি হুঁকায় ছিঁচ্কা দিয়া-জল ফিরাইয়া-মিঠেকড়া তামাক সেজে-বড়ো দেকে নল করে হুঁকা আনিয়া দিল। বাবুরামবাবু হুঁকা সম্মুখে পাইয়া একবারে যেন ইজারা করিয়া লইলেন-ভড়র ভড়র টানছেন- ধুঁয়া সৃষ্টি করছেন-ও বিজর বিজর বক্‌ছেন।

বেণীবাবু। মহাশয় একবার উঠে একটা পান খেলে ভালো হয় না?

বাবুরামবাবু। সন্ধ্যা হল-আর জল খাওয়া থাকুক-এ আমার ঘর-আমাকে বলতে হবে কেন ?

দেখো মতিলালের বুদ্ধিশুদ্ধি ভালো হইয়াছে-ছেলেটিকে দেখে চক্ষু জুড়ায়। সম্প্রতি ইংরেজী পড়াইতে বাঞ্ছা করি-অল্প-স্বল্প মাহিনাতে একজন মাস্টার দিতে পারো ?

বেণীবাবু। মাস্টার অনেক আছে, কিন্তু ২০/২৫ টাকা মাসে দিলে একজন মাঝারি গোছের লোক পাওয়া যায়।

বাবুরামবাবু। কত- ২৫ টাকা !!! অহে ভাই, বাটীতে নিত্যনৈমিত্তিক ক্রিয়াকলাপ-প্রতিদিন একশত পাত পড়ে-আবার কিছুকাল পরেই ছেলেটির বিবাহ দিতে হইবে। যদি এত টাকা দিব তবে তোমার নিকট নৌকা ভাড়া করিয়া কেন এলাম ?এই বলিয়া বেণীবাবুর গায়ে হাত দিয়া হা হা করিয়া হাসিতে লাগিলেন।

বেণীবাবু। তবে কলিকাতার কোনো স্কুলে ভর্তি করিয়া দিউন। একজন আত্মীয়-কুটুম্বের বাটীতে ছেলেটি থাকিবে, মাসে ৩/৪ টাকার মধ্যে পড়াশুনা হইতে পারিবে।

বাবুরামবাবু। এত ? তুমি বলে-কয়ে কমজম করিয়া দিতে পারো না ? স্কুলে পড়া কি ঘরে পড়ার চেয়ে ভালো ?

বেণীবাবু। যদ্যপি ঘরে একজন বিচক্ষণ শিক্ষক রাখিয়া ছেলেকে পড়ানো যায় তবে বড়ো ভালো হয়, কিন্তু তেমন শিক্ষক অল্প টাকায় পাওয়া যায় না, স্কুলে পড়ার গুণও আছে-দোষও আছে। ছেলেদিগের সঙ্গে একত্র পড়াশুনা করিলে পরস্পরের উৎসাহ জন্মে কিন্তু সঙ্গদোষ হইলে কোনো কোনো ছেলে বিগড়িয়া যাইতে পারে, আর ২৫/৩০ জন বালক এক শ্রেণীতে পড়িলে হট্টগোল হয়, প্রতিদিন সকলের প্রতি সমান তদারকও হয়না, সুতরাং সকলের সমানরূপ শিক্ষাও হয় না।

বাবুরামবাবু। তা যাহা হউক-মতিকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দিব, দেখেশুনে যাহাতে সুলভ হয় তাহাই করিয়া দিও। যে সকল সাহেবের কর্মকাজ করিয়াছিলাম এক্ষণে তাহাদের কেহ নাই-থাকিলে ধরে-পড়ে অমনি ভর্তি করিতে পারিতাম। আর আমার ছেলে মোটামুটি শিখিলেই বস্ আছে, বড়ো পড়াশুনা করিলে স্বধর্মে থাকিবে না। ছেলেটি যাহাতে মানুষ হয় তাহাই করিয়া দিও-ভাই সকল ভার তোমার উপর।

বেণীবাবু। ছেলেকে মানুষ করিতে গেলে ঘরে-বাইরে তদারক চাই। বাপকে স্বচক্ষে সব দেখ্তে হয়-ছেলের সঙ্গে ছেলে খাটতে হয়। অনেক কর্ম বরাতে চলে বটে কিন্তু এ কর্মে পরের মুখেঝাল খাওয়া হয় না।

বাবুরামবাবু। সে সব বটে-মতি কি তোমার ছেলে নয় ? আমি এক্ষণে গঙ্গাস্নান করিব-পুরাণ শুনিব-বিষয়-আশয় দেখিব-আমার অবকাশ কই ভাই ? আর আমার ইংরেজী শেখা সেকেলে রকম। মতি তোমার-তোমার-তোমার !!! আমি তাকে তোমার কাছে পাঠাইয়া দিয়া নিশ্চন্ত হইব, তুমি যা জানো তাই করিবে কিন্তু ভাই ! দেখো যেন বড়ো ব্যয় হয় না- আমি কাচ্চাবাচ্চাওয়ালা মানুষ-তুমি সকল তো বুঝতে পারো ?

অনন্তর অনেক শিষ্টালাপের পর বাবুরামবাবু বৈদ্যবাটিতে প্রত্যাগমন করিলেন।