আশ্রমপীড়া

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

প্রথম দৃশ্য

নবকান্ত

নবকান্ত । ওঃ! প্রেমের রহস্য কে ভেদ করতে পারে! না জানি সে কিসের বন্ধন যাতে এক হৃদয়ের সঙ্গে আর-এক হৃদয় বাঁধা পড়ে! কী জ্যোৎ স্নাপাশ , কী পুষ্পসৌরভের ডোর , কী মুকুলিত মধুমাসের মধুর মলয়ানিলের বন্ধন!

নরোত্তমের প্রবেশ

নরোত্তম । কী সর্বনাশ! নবকান্তের হাতে পড়লে তো রক্ষা নেই! ধরলে বুঝি!

নবকান্ত । ( নরোত্তমকে ধরিয়া) ভাই , প্রেমের কী মহান শক্তি!

নরোত্তম । খিদের শক্তি তার চেয়ে বেশি । আমি খেতে যাই , আমাকে ছাড়ো-

নবকান্ত । হৃদয়ের ক্ষুধা-

নরোত্তম । হৃদয়ের নয় , উদরের । আমি খেয়ে আসি-

নবকান্ত । খাওয়ার কথা বলছি নে ।

নরোত্তম । তুমি কেন বলবে , আমি বলছি । একটু রোসো , আমি — ঐ যে আদ্যানাথবাবু আসছেন । ওঁকে ধরো , প্রেমের শক্তি বোঝবার লোক এমন আর পাবে না ।

[ প্রস্থান

আদ্যানাথের প্রবেশ

নবকান্ত । ( আদ্যানাথকে ধরিয়া) মশায় , প্রেমের কী মহান শক্তি!

আদ্যানাথ । মহান শক্তি কী বাপু! মহতী শক্তি । কারণ , শক্তি শব্দ স্ত্রীলিঙ্গ , তৎপূর্বে -

নবকান্ত । ভেবে দেখুন , প্রেমের সৈন্য নেই , সামন্ত নেই , অথচ প্রেম বিশ্ববিজয়ী । সে আপন জীবন্ত-

আদ্যানাথ । জীবন্ত হতেই পারে না ।

নবকান্ত । আজ্ঞে হাঁ , সে আপনার জীবন্ত প্রভাবেই-

আদ্যানাথ । জীবিত বলো-না কেন , তা হলে ব্যাকরণ-

নবকান্ত । জীবন্ত প্রভাবে সর্বত্র আপনার পথ সৃজন-

আদ্যানাথ । সৃজন নয় । সর্জন ।

নবকান্ত । পথ সৃজন করে নেয় । এই-যে সূর্যতারাখচিত-

আদ্যানাথ । সর্জন , কেননা সৃজ্‌ ধা-

নবকান্ত । নীলাকাশ , এই-যে বিচিত্রপুষ্পশোভিত-

আদ্যানাথ । সৃজ্‌ ধাতুর উত্তর-

নবকান্ত । পুষ্পকানন-

[ কথোপকথন করিতে করিতে প্রস্থান

গণেশের প্রবেশ

গণেশ । লেখাটা তো শেষ করেছি , এখন শোনাই কাকে ? খাতা হাতে যেখানেই যাই কাউকে দেখতে পাই নে । আজ কাউকে শোনাতেই হবে — সন্ধান দেখি গে ।

দ্বিতীয় দৃশ্য

হরিচরণ নবীনমাধব নরোত্তম

হরিচরণ । ওহে , এতদিন ছিলেম ভালো , কোনো আপদ ছিল না । এখন কী করা যায়!

নবীন । তাই তো , কী করা যায়!

নরোত্তম । তাই তো হে , উপায় কী!

হরিচরণ । এতদিন আমাদের বাসায় আপদের মধ্যে নবকান্ত ছিল , তাকে সয়ে গিয়েছিল , এখন কোথা থেকে একটা লেখক এসেছে ।

নরোত্তম । বাসায় লেখক থাকা কাজের কথা নয় ।

নবীন । কাল জাতিভেদের উপর এক কবিতা লিখে শোনাতে এসেছিল ।

হরিচরণ । কাল রাত্রি সাড়ে-দশটা , সবে আমার একটু তন্দ্রা এসেছে , এমন সময় লেখক এসে উপস্থিত । তন্দ্রা তো ছুটলই , আমিও তার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটলুম ।

নরোত্তম । আরে ভাই , আমাকেও — ঐ আসছে!

হরিচরণ । ঐ এল রে!

নবীন । ঐ খাতা!

হরিচরণ । পালাই!

[প্রস্থান

নবীন । আমিও পালাই!

[ প্রস্থান

নরোত্তম । আমি মোটা মানুষ ছুটতে পারব না , করি কী!

গণেশের প্রবেশ

গণেশ । তিনটে প্রবন্ধ-

নরোত্তম । কটা বাজল কে জানে!

গণেশ । একটা হচ্ছে আধুনিক স্ত্রীজাতির-

নরোত্তম । মশায় , ঘড়ি আছে ? দেখুন তো সময়-

গণেশ । আজ্ঞে , ঘড়ি নেই । আমার প্রবন্ধের একটা হচ্ছে-

নরোত্তম । ( উচ্চস্বরে) ওরে মোধো , আপিসের চাপকানটা কোথায় রাখলি ?

গণেশ । বুঝেছেন নরোত্তমবাবু , একটা প্রবন্ধ হিন্দুধর্মের-

নরোত্তম । ( নেপথ্যে চাহিয়া) ঐ ঐ , ঐ সর্বনাশ হল! ছেলেটা প'ল বুঝি!

[ প্রস্থান

গণেশ । কাল থেকে চেষ্টা করছি , কাউকে পাচ্ছি নে । কে যেন কাকের বাসায় ঢিল ছুঁড়ছে — বাসাসুদ্ধ প্রাণী চঞ্চল হয়ে বেড়াচ্ছে । পূর্বে যে বাসায় ছিলুম সেখানে একটি লোকও বাকি রইল না , কাজেই ছেড়ে আসতে হল । এখানেই বা এরা দু দণ্ড স্থির হয়ে বসতে পারে না কেন! যাই , নরোত্তমবাবুকে ধরি গে । লোকটি বেশ মোটাসোটা ভালোমানুষ ।

তৃতীয় দৃশ্য

নরোত্তম ও নবকান্ত

নবকান্ত । দেখো নরোত্তম , হৃদয়ের রহস্য-

নরোত্তম । এখন নয় ভাই , আপিস আছে ।

নবকান্ত । ( সনিশ্বাসে) আহা , তোমার তো আপিস আছে , আমার কী আছে বলো তো । আমার যে occupation gone! Othello's occupation gone ! শেক্‌স্‌পিয়ার যে লিখেছে — কোথায় যাও — আঃ , শোনো-না—

নরোত্তম । না ভাই , আমাকে মাপ করো — সাহেব রাগ করবে , আমারও occupation যাবার জো হবে ।

নবকান্ত । আমি বলছিলুম উভয় পক্ষের যদি — আহা শোনো-না — উভয় পক্ষের-

নরোত্তম । ও-সব কথা আমার জানা নেই , উভয় পক্ষের কথা শুনলে আমার ভারি গোল বেধে যায় , মাথা ঘুরতে থাকে ।

নবকান্ত । তুমি আমার কথা না শুনেই যে ভয় পাচ্ছ , আমি যা বলছি তা তর্কের কথা নয় — হৃদয়ের কথা , সহজ কথা ।

নরোত্তম । কিন্তু ঐ সহজ কথাতেই সাড়ে-চারটে বেজে যাবে — আমায় ছাড়ো ।

নবকান্ত । আচ্ছা দেখো , দশ মিনিটের বেশি লাগবে না — ঘড়ি ধরে থাকো , আমি বলে যাই ।

নরোত্তম । ( সকাতরে) নবকান্ত , কেন তোমরা সকলে আমাকে নিয়েই পড়েছ ? ও ঘরে হরি আছে , নবীন আছে , তাদের কাছে তো ঘেঁষ না । সেদিন ঠিক এমনি সময়ে হৃদয়ের রহস্যের কথা পাড়লে , সাড়ে-দুপুর বেজে গেল — সাহেবের কাছে জরিমানা দিতে হল । আবার আজও সেই হৃদয়ের রহস্য! গরিবের চাকরিটি গেলে হৃদয়ের রহস্য আমার কোন্‌ কাজে লাগবে!

[প্রস্থানোদ্যম

নবকান্ত । ( ধরিয়া) রাগ করলে ভাই!

নরোত্তম । না , রাগের কথা হচ্ছে না । আপিসের বেলা হল , তাই তাড়াতাড়ি করছি ।

[প্রস্থানোদ্যম

নবকান্ত । ( ধরিয়া ) না ভাই , তুমি রাগ করছ ।

নরোত্তম । এও তো বিষম মুশকিলে ফেললে! কিন্তু শীতকালের দিনে কথায় কথায় বেলা হয়ে যায় ।

[ প্রস্থানোদ্যম

নবকান্ত । ( ধরিয়া) না ভাই , তুমি রাগ করে চলে যাচ্ছ , আমার সমস্ত দিন মন খারাপ থাকবে ।

নরোত্তম । আচ্ছা ভাই , আপিস থেকে ফিরে এসে কথা হবে ।

[প্রস্থানোদ্যম

নবকান্ত । না , তুমি বলো আমাকে মাপ করলে ।

নরোত্তম । মাপ করলুম ।

[প্রস্থানোদ্যম

নবকান্ত । ( ধরিয়া ) না ভাই , তোমার মুখ যে প্রসন্ন দেখছি নে ।

নরোত্তম । প্রসন্ন হবে কী করে! বেলা যে বিস্তর হল ।

নবকান্ত । ( আটক করিয়া) প্রসন্ন মুখে মাপ করে যাও , তবে ছাড়ব ।

নরোত্তম । তোমাকে মাপ করব কী , তুমি আমাকে মাপ করো — আমি পায়ে ধরছি , নাকে খত দিচ্ছি , আর যা বল তাই করছি — কিন্তু এই অবেলায় হৃদয়ের রহস্য শুনতে পারব না ।

[ প্রস্থান

চতুর্থ দৃশ্য

নরোত্তমের পশ্চাতে গণেশ

গণেশ । অত হাঁপাচ্ছেন কেন ? একটু স্থির হোন-না । আমার প্রবন্ধে-

নরোত্তম । কী ভয়ানক! মশায়ের খাওয়া হয়েছে ?

গণেশ । আজ্ঞে , না । কিন্তু আমার লেখায়-

নরোত্তম । মাছি পড়ছে ।

গণেশ । আজ্ঞে , মাছি পড়বে কেন ?

নরোত্তম । আপনার লেখার নয় — আমার দুধে মাছি পড়েছে ।

[প্রস্থানোদ্যম

নবকান্তের প্রবেশ

নবকান্ত । তুমি ভাই রাগ করে এলে — আমার মন স্থির হচ্ছে না ।

নরোত্তম । আমারও মন অত্যন্ত অস্থির ।

[ তাড়াতাড়ি প্রস্থান

নবকান্ত । যাই , নরোত্তমের মুখ প্রফুল্ল না দেখে তাকে তো কিছুতেই ছাড়তে পারি নে ।

[ প্রস্থান

গণেশ । নরোত্তমবাবু গেলেন কোথায় দেখে আসি ।

[ প্রস্থান

পঞ্চম দৃশ্য

নরোত্তম আহারে প্রবৃত্ত। গণেশের প্রবেশ

গণেশ । এত সকাল-সকাল আহারে বসেছেন যে!

নরোত্তম । সকাল আর কই ? আপিসে বেরোতে হবে যে ।

গণেশ । এখনি যেতে হবে! তবে যতক্ষণ খাচ্ছেন ততক্ষণ যদি আমার-

নরোত্তম । মশায় , আমার খাওয়া হয়েছে , আমি উঠলুম ।

গণেশ । কিছুই যে খেলেন না , সবই যে পড়ে রইল । পান-তামাক তো খাবেন , ততক্ষণ যদি-

নরোত্তম । ( নেপথ্যে চাহিয়া) ঐ রে , নবকান্ত মুখ বিমর্ষ করে আসছে । আজ্ঞে না , পান-তামাকে প্রয়োজন নেই , আমি চললুম ।

[ প্রস্থান

নবকান্তের প্রবেশ

নবকান্ত । নরোত্তম কোথায় মশায় ?

গণেশ । ( খাতা বাহির করিয়া) তিনি চলে গেছেন । তা হোক-না , আপনি বসুন-না ।

নবকান্ত । ( দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া) হায় , আমার কী অবস্থা হল!

গণেশ । কিছুই হয় নি , আপনি ভাববেন না , বেশ আছেন । হিন্দুপ্রকাশে আমার লেখা-

নবকান্ত । কিছুই নয়! বলেন কী! হৃদয়ের-

গনেশ । হৃদয়ের কথা তো হচ্ছিল না । আর্যমনীষিগণের-

নবকান্ত । আর্যমনীষী আবার কোত্থেকে এল! হৃদয়ের কথাই তো হচ্ছিল । আমি বলছিলুম , হৃদয় যখন-

গণেশ । আমি যা লিখেছি তার বিষয়টা হচ্ছে আর্যমনীষিগণ যে-সকল বিধান করে গেছেন আমাদের বর্তমান অবস্থায় তার কী করা উচিত ।

নবকান্ত । শ্রাদ্ধ করা উচিত । সে যাক গে — যার হৃদয়ে তুষানল ধিকি ধিকি জ্বলছে-

গণেশ । যে যেন ভদ্রলোকের ঘরের চালের উপর গিয়ে না বসে , তা হলেই লঙ্কাকাণ্ড বাধবে । আমার প্রশ্ন এই , শাস্ত্রের মূলে কী আছে-

নবকান্ত । কচু ।

গণেশ । এবং তার থেকে কী ফলছে ?

নবকান্ত । কলা ।

গণেশ । এবং সে মূল উদ্ধার কে করবে ?

নবকান্ত । বরাহ অবতার ।

গণেশ । সে ফল ভোগ করবে কে ?

নবকান্ত । হনুমান অবতার । এখন আমর প্রশ্ন এই , জগতে সকলের চেয়ে গভীর রহস্য কী ?

গণেশ । আর্যশাস্ত্র ।

নবকান্ত । প্রেম ।

গণেশ । মনু এবং-

নবকান্ত । অভিমানের অশ্রুজল-

গণেশ । এবং গৃহ্যসূত্র-

নবকান্ত । এবং চোখে চোখে চাহনি-

গণেশ । দায়ভাগ-

নবকান্ত । এবং প্রাণে প্রাণে মিলন ।

ষষ্ঠ দৃশ্য

গণেশ লিখিতে প্রবৃত্ত

গণেশ । বিষয়টা গুরুতর , ‘ নারদের ঢেঁকি এবং আধুনিক বেলুন ' — আরম্ভটা দিব্যি হয়েছে , শেষটা মেলাতে পারছি নে । তা শেষটা না হলেও চলবে । কিন্তু শোনাই কাকে ? নরোত্তমবাবু বাসা ছেড়ে গেছেন । হরিহরবাবুর কাছে ঘেঁষতে ভয় হয় ।

নবকান্তের প্রবেশ

নবকান্ত । হায় হায় , নরোত্তম বাসা ছেড়েছে , এখন যাই কার কাছে ?

গণেশ । এই-যে নবকান্তবাবু , নারদের ঢেঁকি-

নবকান্ত । নিথর জ্যোৎস্নাজালে নধর নবীন-

আদ্যানাথের প্রবেশ

গণেশ । বাঁচা গেল! আদ্যানাথবাবু , আমার নারদের ঢেঁকি-

নবকান্ত । নয়ননলিনীদল নিদ্রায় নিলীন-

গনেশ । সনাতনশাস্ত্র মন্থন করে নারদের ঢেঁকি-

আদ্যানাথ । ঢেঁকি শব্দটা কি গ্রাম্যতাদোষদুষ্ট নয় ? সাহিত্যদর্পণে-

ভৃত্যের প্রবেশ

ভৃত্য । বাবুরা পালাও গো , আগুন লেগেছেন ।

আদ্যানাথ । বেটার ব্যাকরণজ্ঞান দেখো ।

নবকান্ত । ( সনিশ্বাসে) আগুন! হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশে-

গণেশ । নল যে বিনা-আয়োজনে আগুন জ্বালাতেন সে অক্সিজেন-হাইড্রোজেন-যোগে ।

আদ্যানাথ । ওটা যাবনিক প্রয়োগ হল । ও স্থলে-

ঘরে অগ্নির আবির্ভাব