বিষয়বস্তুতে চলুন

ইরাণী উপকথা/ইরাণী উপকথা

উইকিসংকলন থেকে

ইরাণী উপকথা।

 একান্ন বৎসর বয়সে ইরাণ-তুরাণের বাদশা হুশেন শাহ্, যখন সাতান্ন সংখ্যক বেগমের পাণি-পীড়ন করলেন, তখন—তখন কে জান্ত যে তাঁরই রাজপ্রাসাদে আরব্য উপন্যাসের নিছক রূপকথাগুলোর একটা এসে নিজের বাস্তবতা প্রমাণ করে' যাবে?

 সে যাই হোক্। বাদশা নতুন বেগমের পাণি-পীড়ন ক'রে তাঁর হারেমে পুরলেন, এদিকে সেই সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দরবারের আমীর ওমরাহ্ দের মধ্যে কেমন করে' জানাজানি হয়ে গেল যে, নতুন বেগমের মত সুন্দরী ত্রিভুবনে নেই। অপ্সরী?—অপ্সরীরা ত সব চির-যৌবনা। যা চিরদিনের, যার ক্ষয়বৃদ্ধি নেই, যা স্থির, তা হাজার সুন্দর হোক কিন্তু তাতে মোহের অবসর নেই। ফুলগুলো ফুটে উঠে ঝরে' যায় বলেই ত ওর সৌন্দর্য্য মুহূর্ত্তের তরে নিবিড়তম হ'য়ে দেখা দেয়, সেই জন্যেই ওর মোহ অনন্ত কালের। নতুন বেগমের ভোম্রা রঙের রেশমী চুলের রাশ যে একদিন শণের নুড়ি হ'য়ে উঠবে—তার আঙুরের রসে ভিজান হিঙ্গুল রঙের ঠোঁট দুখানি যে একদিন শুকিয়ে চামড়ার মত হ'য়ে উঠবে—তাজা ফুলের মত গাল দুটো যে শুকনো পাতার মত চূমড়ে যাবে—চোখের কোণ থেকে তড়িৎ ঢালাঢালি যে আর চলবে না—তার বুক যে আর দুলবে না, গ্রীবা যে আর হেলবে না, হৃদয় যে আর টলবে না——এই চিন্তাই যে হুশেন শাহ্ কে চতুর্গুণ মাতিয়ে তুলেছে। সুতরাং অপ্সরী?—না, নতুন বেগমের সঙ্গে অপ্সরীর তুলনাই হয় না। অপ্সরী ত নয়ই—মানব মানবীর মধ্যেও এমন রূপ আর কখনও সৃষ্ট হয় নি—আর ভবিষ্যতেও হবে কিনা সে বিষয়ে বাদশা হুশেন শাহের ঘোর সন্দেহ।

 কিন্তু আমীর ওমরাহ্ দের মধ্যে নতুন বেগমের রূপের কথা রটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা আপশোষের কথাও জেগে উঠল। এমন সুন্দরী যে নতুন বেগম—যার দেহে বিশ্বকর্ম্মা তাঁর শ্রেষ্ঠ প্রতিভার ছাপ অঙ্কিত করে দিয়েছেন—যার তুল্য সুন্দরী সসাগরা পৃথিবীতে নেই, অমরাবতীতে নেই, গন্ধর্ব্বলোকে নেই— তেমন রূপ একদিনের জন্যেও কারো নয়নগোচর হবে না, এই হচ্ছে তাঁদের আপশোষের কথা। তাঁদের মধ্যে দু' একজনা দার্শনিক ওমরাহ্ তাঁদের লম্বা শুভ্র দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে গালিচার বুনোনো রঙিন ময়ূরগুলোকে নিরীক্ষণ করে করে বলতে লাগলেন—তা’ আসলে সৌন্দর্য্য জিনিসটা সকলের জন্যেই হওয়া উচিত—বিশেষতঃ রূপ দেখলে রূপের কোন ক্ষতি নেই অথচ দর্শকের মহা লাভ।

 আমীর ওমরাহ্ দের কানাকানি বাদশা হুশেন শাহের কানে পৌঁছিতে বড় বিশেষ বিলম্ব হ'ল না! হুশেন শাহ্, ছিলেন প্রজারঞ্জক রাজা। কাজেই আমীর ওমরাহ্ দের এই আপশোষের কারণ দূর করবার জন্যে ইচ্ছা করলেন। তাই মনস্থ করলেন যে, নতুন বেগমের একখানি পূর্ণায়তন তসবীর অঙ্কিত করিয়ে তাঁর আমদরবারের বিশাল কক্ষে মসনদের পিছনে দেয়ালের গায়ে ঝুলিয়ে দেবেন। বাদশা মনে মনে এই ব্যবস্থা ঠিক করেই তাঁর প্রধান উজিরকে ডাকলেন—“ফজলু খাঁ”।

 ফজলু খাঁ পামিরের মাথার উপরকার বরফের মত সাদা লম্বাদাড়ি হেলিয়ে এসে কুর্ণিস করে' দাঁড়াল—“জাঁহাপনা”

 বাদশা বললেন—“উজির, বর্তমানে এ সসাগরা পৃথিবীতে সবশ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী কে?”

 উজির হাতের পাঁচ আঙুল তাঁর লম্বা দাড়ির মধ্যে চালাতে চালাতে স্মৃতিশক্তিটাকে উগ্র করে' নিয়ে উত্তর করলেন—“জাঁহাপনা, বর্তমানে এ সসাগরা পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী হচ্ছে হিন্দুস্থানের কোশল রাজসভার চিত্রকর নাম মৌকূল দেব।”

 হিন্দুস্থানের নাম শুনে বাদশা মুহূর্তের জন্যে চিন্তান্বিত হলেন— যেন তাঁর মনে কোন সংশয় উদিত হয়েছে; কিন্তু তৎক্ষণাৎ যেন সে সংশয়ের একটা সমাধান করে বললেন—“ফজলু খাঁ, কোশল রাজসভার চিত্রশিল্পী ইরাণ-তুরাণের বাদশার দরবারের তরফ থেকে ইস্পাহানে আমন্ত্রিত হোক।”

 ফজলু খাঁ তাঁর উষ্ণীষ হেলিয়ে কুর্ণিশ করে বললেন - “প্রবল প্রতাপান্বিত সুজনের রক্ষক দুর্জ্জনের শাসক ইরান-তুরানের বাদশা হুশেন শাহের যে আজ্ঞা।”

 তার পরদিন পূব গগনে ঊষাসুন্দরী যখন আপনার অবগুণ্ঠন উন্মোচন করবেন কি করবেন না ভাবছিলেন, তখন ইস্পাহানের প্রশস্ত পাথর-বাঁধা রাজপথ কাঁপিয়ে বাদশার পাঞ্জাঙ্কিত পত্র নিয়ে তুরুক সোয়ার কাবুলের পথে হিন্দুস্থান অভিমুখে যাত্রা করল। দ্রুতগামী অশ্বখুরের খটাখট্ শব্দে নিদ্রিত নাগরিকেরা চকিত হ'য়ে উঠে বসল। বেলা হলে ইস্পাহানের বাজারে বাজারে রটে গেল যে, হিন্দুস্থান থেকে চিত্রকর আসছে—নতুন বেগমের তসবীর আঁকবার জন্যে।

(২)

 বাদশা আমীর ওমরাহ্ দের নিয়ে তাঁর খাস দরবারে বসে' ছিলেন। ইরাণ-তুরাণের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি তায়েজউদ্দিন সেদিন হেমন্তসন্ধ্যার মত করুণ কণ্ঠস্বরে বাদশা-সমীপে সুন্দরী তরুণীর অশ্রুভেজা ব্যথিত কালো আঁখি-তারার মত একটা নব রচিত গজল সারেঙ্গী সহযোগে গান করছিলেন। গজল বলছিল—“রূপোর দেয়ালী লেগেছে - এমনি নিবিড় জোছনা, যেন মনে হয় তা মুঠো বেঁধে দলা পাকিয়ে ঢিল ছোঁড়াছোঁড়ি খেলা যায়, শিশির-ভেজা পাতায় পাতায় জোছনা ছলকে উঠে পিছলে পড়ছে—দূর এলবুরুজ পাহাড়তলীর বুবুল্লা সব আর সেদিন ঘুমুতে যায় নি―তাদের গানের সুর ঘন জোছনার বুক চিরে চিরে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছেএমনি রাতে নিঠুরা পিয়ারী বাহুর বাঁধন আলগা করে কাউকে কিছু না বলে ক’য়ে কোন্ অজানার পথ ধরে' কোথায় চ'লে গেল— কোথায় গেল.....”

 চারিদিকে মেঘে মেঘে ছেয়ে গিয়েছে— কালো কালো মেঘ, বিদ্যুৎ বুকে করা মেঘ। এলবুরুজ পাহাড়তলীর ময়ুরের দল পেখম তুলে নৃত্য করে করে' তাদের কেকা রবে চারিদিক মুখর করে তুলেছে। বারি ঝরতে আরম্ভ করল, ঝর্ ঝর্ ঝর্—বিরাম নেই বিরতি নেই—কত দিনকার কার অশ্রু-কোন্ অলকার কোন্ অপ্সরীর—এমনি বাদল-বুকের মধ্যে বসে বসে কে যে বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে—এমন দিন, তবুও পিয়ারী ফিরে এল নাএল না.......... “

 “পিয়ারী কেমন করে ফিরবে—পিয়ারী যে পথ ধরে গিয়েছে, সে ত ফেরবার পথ নয়— সে যে কেবল যাবারই পথ—সে পথ সে যে মরণের পথ...... “

 সারেঙ্গীর মিষ্টি সুরের সঙ্গে কবির মিষ্টি সুর মিলে গজলের ব্যথাভরা কাহিনী, বাদশার খাস দরবারের প্রশস্ত কক্ষের কোণে কোণে কোন্-হারিয়ে-যাওয়া কা'কে খুঁজে বেড়াতে লাগল। যে আমীর ওমরাহ্ রা যুবক, তাদের কি একটা ব্যথার আনন্দে বুক ফুলে উঠল, টলে উঠল—বাদশার খুড়ো আশী বছর বয়সের বৃদ্ধ বৈরাম খাঁর পর্য্যন্ত কুয়াশা-ঢাকা চোখ দুটো ছল্ ছল্ করে উঠল। গান শেষ করে' কবি সারেঙ্গী ও ছড়টা গালিচার উপরে নামিয়ে রাখলেন— চারিদিকে নিস্তব্ধতা, কেবল সদ্য সমাপ্ত গজলের সুর বাতাসের বুক চিরে আকাশের গায়ে গায়ে একটা রেশের চিহ্ন এঁকে দিয়ে দূর হতে দূরান্তরে চলে যেতে লাগল—মুহূর্ত্ত ধরে যেন কারো নিশ্বাস প্রশ্বাসও পড়ছে না—এমনি নিবিড় নিস্তব্ধতা। তারপর দরবারের সবাই যেন হঠাৎ চমক ভেঙ্গে জেগে সমস্বরে বলে উঠলেন “ক্যাবাৎ ক্যাবাৎ!”

 বাদশা সস্মিত হাস্যে কবির দিকে ফিরে বললেন—“তায়েজ, তোমার কাব্য সাধনা, সঙ্গীত সাধনা, যন্ত্র সাধনা, সবই সার্থক!”

 কবি তায়েজ তাঁর বিনম্র শির আরও নত করে কি বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় উজির ফজলু খাঁ প্রবেশ করে' বাদশা-সমীপে নিবেদন করলেন—“জাঁহাপনা, হিন্দুস্থান হ'তে কোশল-রাজসভার চিত্রশিল্পী মৌকূল দেব ইরাণ-তুরাণের বাদশা, দুর্বলের রক্ষক দুর্জ্জনের শাসক প্রবল প্রতাপান্বিত হুশেন শাহের দরবারে হাজির।”

 বাদশা বললেন—“তাকে এইখানে নিয়ে আসা হোক!”

 উজির তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে গেলেন, আবার পরক্ষণেই ফিরে এলেনসবাই দেখলেন, তাঁর সঙ্গে প্রবেশ করল এক অতি সুন্দর তরুণ যুবক।

 অতি সুন্দর তরুণ যুবক। তার চোখ দুটোতে যেন বিদ্যুতের রেখা টানা—কুঞ্চিত কেশ গুচ্ছে গুচ্ছে এসে তার বলিষ্ঠ স্কন্ধ ছেয়ে ফেলেছে—অতি চিক্কণ গোঁফের রেখার চিহ্ন তার স্ফুটনোন্মুখ যৌবনের ঘোষণা করছে—আঙুলগুলো যেন ছবির মত সুশ্রী—বাদশা বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন—“এই যুবক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চিত্রকর?”

 যুবক তার মাথা অবনত করল, উজির ফজলু খাঁ উত্তর দিলেন— “হাঁ জাঁহাপনা।”

 “এমনি তরুণ বয়সে!”

 উজির উত্তর দিলেন—“জাঁহাপনা, প্রতিভাসুন্দরী তরুণের গলেই তাঁর বরমাল্য প্রদান করতে ভালবাসেন।”

 বাদশা প্রসন্ন দৃষ্টিতে শিল্পীর দিকে ফিরে বললেন—“সুন্দর বিদেশী যুবক, চিত্রবিদ্যায় তোমার কতদূর পারদর্শিতা?”

 যুবক উত্তর দিলে—“জাঁহাপনা, কবি, চিত্রকর, গায়ক এদের পারদর্শিতার মাপযন্ত্র অন্যের কাছে। আমার যে কি রকম পারদর্শিতার তা আমি নিজে কেমন করে' বলব? তবে আমার অঙ্কিত চিত্রে হিন্দুস্থানের অনেক নৃপতি অনুগ্রহ করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।”

 বাদশা বললেন-“শোন যুবক, ইসলাম-রমণী কোনদিন বিধর্ম্মীপুরুষের কাছে তার মুখাবরণ উন্মোচন করবে না, শাস্ত্রের নিষেধনা দেখে তুমি তার আলেখ্য অঙ্কিত করতে পারবে?”

 শিল্পী বিস্মিত হ'য়ে জিজ্ঞাসা করলে “না দেখে কি করে ছবি আঁকা চলতে পারে জাঁহাপনা?”

 বাঁধা দিয়ে বাদশা জিজ্ঞাসার সুরে বললেন “কেবল তার বর্ণনা শুনে।”

 যুবক বললে-“এমন কবি কে আছে জাঁহাপনা যে শব্দ অর্থ ও সুর দিয়ে রক্তমাংস ও বর্ণকে এমনি করে মূর্তিমান করে তুলতে পারে যা আবার রঙে ও তুলিতে পরিবর্তিত করা যেতে পারে!”

 গৌরবান্বিত দৃষ্টিতে বাদশা উত্তর দিলেন “বিদেশী যুবক! আছে, ইরাণ-তুরাণের শ্রেষ্ঠ কবি—যার কণ্ঠসুরে শরৎ-উষার উজ্জ্বল আকাশ সান্ধ্য গগনের মত ব্যথিত হ'য়ে ওঠে—হেমন্ত-সন্ধ্যার করুণ রাগিণী বসন্ত-উষার মত হাস্যময় হ'য়ে ওঠে—যার সারেঙ্গীর আলাপে প্রচণ্ড নিদাঘে বর্ষার শৈত্য আমন্ত্রন করে আনে—শীতের শুভ্র মাটীতে সবুজ রঙ জাগিয়ে তোলে—যুবক তুমি নিজেই বিচার করবে”—বাদশা কবি তায়েজকে গান করতে আদেশ করলেন।

 সারেঙ্গীর সুর জেগে উঠল—কিশোরী প্রিয়ার সলজ্জ চাউনির মত মিষ্টি, তার রেশমী চুলের স্পর্শের মত মোলায়েম—সে সুরের রেশ প্রিয়ার অঙ্গের স্পর্শেরই মত শ্রবণেন্দ্রিয়কে বুলিয়ে যায়।

 “সুরমা-আঁকা চোখ—পিয়ারি সে কেমন চাতুরি?—রজনীর কালো আঁধারের মাঝে পুঞ্জ মেঘের বুক থেকে বিদ্যুৎ কেমন জিলিক্ হানে?—তাই পিয়ারীর কালো চোখের চার পাশে সুরমা আঁকা পিয়ারীর কালো চোখের তারা সে মেঘ— চোখের পাতায়আঁকা সুরমা সে রজনীর আঁধার—পিয়ারীর দৃষ্টি সে বিদ্যুৎ—সে বিদ্যুৎ কেমন উজ্জ্বল, কেমন নিবিড়, কেমন তীব্র—সুরমা আঁকা চোখ—পিয়ারি সে কেমন চাতুরী?”

 “সুরমা-আঁকা চোখ—পিয়ারি জানি জানি সে কেমন চাতুরী। পিয়ারী যে চোখ দুটোতে সুরমা ঢেকে তার সারা দেহের আকাঙ্ক্ষা রাশিকে গোপন করতে চায়—তার মনের শঙ্কা সঙ্কোচ সরম স্পষ্ট করে তুলতে চায়—তার চঞ্চল দৃষ্টিকে নিবিড় করতে চায় ——তার হাস্যময় দৃষ্টিতে ব্যথা ভরা দেখতে চায়— সুরমা-আঁকা চোখ পিয়ারী জানি জানি সে কেমন চাতুরী।”

 গান থামল—রইল শুধু একটা সূচী-সূক্ষ্ম রেশের আধ-লুপ্ত আধ-সুপ্ত রণন্।

 তরুণ চিত্রকর প্রশংসমান নেত্রে বললে—“ইরাণ-তুরাণের কবি, হিন্দুস্থানের চিত্রকরের অভিবাদন গ্রহণ” করুন।” তার পর বাদশার দিকে ফিরে বললে— “জাঁহাপনা, কবি তায়েজের ক্ষমতা অসাধারণ। কবির সুরে সুরে আমার তুলি চলবে—তাঁর গানের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বেগমের ছবি ফুটে উঠবে—তাঁর চোখ জেগে উঠবে—তাঁর বুক দুলে উঠবে—গণ্ডে তাঁর গোলাপ ফুটবে—হাতে তাঁর চাঁপার কলি জাগবে—পায়ে তাঁর রক্তকমল বিকশিত হবেতাঁর ওড়না উড়বে, বেণী দুলবে, ঘাগরা ঝুলবে; কিন্তু তাঁর আত্মার কথা আমি বলতে পারব না জাঁহাপনা। কবি তায়েজের সুরের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বেগমের বাহিরকেই আমি দিতে পারব——জাঁহাপনা, তাঁর আত্মার সন্ধান আমি দিতে পারব না।”

 বাদশা জিজ্ঞাসা করলেন—“কেন শিল্পী?”

 শিল্পী উত্তর দিলে— “জাঁহাপনা, আত্মা যে সামনা সামনি দেখবার জিনিষ—হাজার বর্ণনাতেও তার আসল পরিচয় নেই। শিল্পীর আত্মা দিয়ে নতুন বেগমের আত্মা স্পর্শ করতে না পারলে তার তুলির সঙ্গে তা কখন ধরা পড়বে না। এ আত্মায় আত্মায় স্পর্শ অনুবাদের ভিতর দিয়ে হতে পারে না। জাঁহাপনা, আমি ছবি আঁকব; কিন্তু তাতে আত্মার সন্ধান করবেন না।”

 বাদশা বলে উঠলেন—“কিন্তু নতুন বেগমের যে দেহের চাইতে আত্মা 'সুন্দর—আত্মা সুন্দর বলেই ত তার দেহ সুন্দর সেই আত্মাকে বাদ দিয়ে শুধু দেহের ছবি আঁকা—যেন গন্ধ বাদ দিয়ে গোলাপ ফোটান—নেশা বাদ দিয়ে মদ চোয়ান; কিন্তু বিধর্মীর কাছে ইস্‌লাম-রমণী কেমন করে মুখ খুলবে?—উপায় কি?” বাদশা তাঁর দরবারের আমীর ওমরাহ্দের দিকে তাকিয়ে উজিরকে সম্বোধন করে বললেন—“ফজলু খাঁ উপায় কি?”

 ইরাণ সাম্রাজ্যের প্রধান উজির বিমনা হলেন। আমীর ওমরাহরা পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলেন। সভা নিস্তব্ধ—চারিদিকে একটুকু শব্দ নেই। সেই নিস্তব্ধতার মাঝে বৈরাম খাঁ তাঁর সুদীর্ঘ শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তার পর তাঁর দীর্ঘোন্নত শরীর বেঁকিয়ে কুর্ণিস করে বললেন—“জাঁহাপনা, উপায় আছে। নতুন বেগমকে বিধর্মীর সামনে মুখ খুলতে হবে না—তা একখানি দর্পণের সামনে করলেই চলবে। সেই দর্পণে প্রতিবিম্বিত নতুন বেগমকে দেখলেই শিল্পীর উদ্দেশ্য সফল হবে। শাস্ত্রও রক্ষা হবে কর্ম্মও ঠেকা থাকবে না।”

 বৈরাম খাঁর কথা শুনে সবার বিষণ্ণ মুখ প্রসন্ন হয়ে উঠল বাদশা প্রশংসমান নেত্রে খুল্লতাত বৈরাম খাঁর দিকে তাকিয়ে উজিরকে লক্ষ্য করে বললেন—“ফজলু খাঁ, খুল্লতাত বৈরাম খাঁর যুক্তি গৃহীত হোক।”

 দরবার ভাঙল। আমীর ওমরাহরা বৈরাম খাঁর বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করতে করতে নিজ নিজ আবাসে ফিরলেন।

(৩)

 দ্বারে দ্বারে পুরু রেশমি পরদা—তারি পাশে পাশে উলঙ্গ কৃপাণ হাতে যমদূতের মত কালো হাবসী খোজা। এখানে বুঝি ক্ষুদ্র মধু মক্ষিকাটিরও প্রবেশ করবার পথ নেই। এখানে বুঝি আর কোন শব্দ নেই, কেবল দুধের মত সাদা কঠিন পাথরের উপরে রক্ত কমলের মত রাঙা কোমল পা ফেলে চলে-যাওয়া রূপসীদের নূপুর-নিক্কন, কেবল লীলায়িত তনুর ভঙ্গীতে ভঙ্গীতে তাদের জঙ্ঘা-স্পর্শ-সুখে বিহ্বল ঘাগরার খস্ খস্ শব্দ, কেবল তাদের কৌতুক-উচ্ছ্বাস-উদ্দীপ্ত হাসির ছন্দময় গিটকিরি, কেবল কত কত উৎস হতে উচ্ছসিত গোলাপজলের বিরতিহীন ঝর্ ঝর্ শব্দ। এখানে বুঝি আর কোন গন্ধ নেই—কেবল কত কত তরুণীদের নিঃশ্বাস -বিচ্ছুরিত সুরভি, কেবল তাদের সুদীর্ঘ সুদীর্ঘ-বেণী কুন্তল হতে উৎসারিত স্বপ্নময় গন্ধাবলেপ, কেবল তাদের সারা অঙ্গ হতে উৎসৃষ্ট এক আবেশময় আভাস। এখানে বুঝি আর কোন রূপ নেই, কেবল সদ্য ফোটা গোলাপরাশির স্তবক, কেবল ফুল্ল প্রস্ফুটিত চম্পকদলের উগ্রতা। এখানে বুঝি আর কোন রস নেই, কেবল সাকির আপন-ভোলা বিফলতা, কেবল সিরাজির সকল - ভোলা মাদকতা। মানুষ জীবনকে ধরে রাখতে পারে না, কিন্তু যৌবনকে ধরে রাখতে চায়। এমনি বাদশার হারেম।

 এখানে কত কত রূপসী তরুণীর কমল-চোখের কোমল দৃষ্টি কুয়াশায় ঢেকে গেল—কোমল মুখের কমল-হাসি শুকিয়ে উঠল— গ্রীবা আর হেল্ল না, বুক আর দুলল না, চরণ আর চল না; কিন্তু শেষ নেই, আবার কত কত নব নব তরুণী এসে তাদের রূপ-যৌবন দিয়ে এখানটাকে ভরে তুলল। বাদশা হুশেন শাহের কালো চুল শাদা হ'য়ে গেল, দন্তাভাবে গণ্ড শীর্ণ হয়ে পড়ল, তড়িতাভাবে দৃষ্টি মলিন হয়ে উঠল, কিন্তু এখানটায় তাঁর রূপ-যৌবনের সম্পদ অব্যাহত। এমনি ইরাণ-তুরাণের বাদশার হারেম। সেই হারেমে কত কত দ্বারে কত কত পরদা সরিয়ে কত কত কক্ষ অতিক্রম করে কত কত হাবসী খোজার ক্রুর শার্দুল-দৃষ্টির সামনে দিয়ে তরুণ শিল্পী বাদশা হুশেন শাহ্ ও উজির ফজলু খাঁর সঙ্গে প্রবেশ করল। হারেমে বিদেশী বিধর্মীর আভাস পেয়ে বেগমদের পোষা ময়ূরের দল একবার ভাষণ 'কেকারবে যেন তাদের আপত্তি জানিয়ে দিল। তার পর হারেমের এক প্রান্ত হতে আর এক প্রান্ত পর্য্যন্ত যাদুমন্ত্র বলে নিমেষে যেন একটা পুরু নিস্তব্ধতার গালিচা বিছিয়ে গেল। কত কত মরাল গতির ছন্দে ছন্দে শিঞ্জিনীনিক্কনীর অর্দ্ধেক ফুটে আর অর্দ্ধ ফোটার আর অবসর পেলে না— কত কত হাসির গিটকিরি মাঝপথে এসে হঠাৎ চকিতে থেমে গেল— যেন সজীব যা যেখানে ছিল সব সেই সেইখানেই সেই অবস্থাতেই সহসা প্রস্তরের মত কঠিন হয়ে গেল—চারিদিকে কেবল নিস্তব্ধতা —সেই নিবিড় নিস্তব্ধতার মাঝে কেবল গোলাপবারির ঝর্ ঝর্ শব্দ। সেই নিস্তব্ধতার মাঝে বাদশা শিল্পী ও উজিরকে নিয়ে একটি প্রকাণ্ড কক্ষে প্রবেশ করলেন।

 কক্ষের এক পার্শ্বে দেয়ালে-গাঁথা এক সুবৃহৎ দর্পণ—একটা ক্রুদ্ধ-চক্ষু ঘোর রক্তবর্ণ সাটিনের মাঝখানে জড়োয়া কাজের একটা প্রকাণ্ড অর্দ্ধচন্দ্র আঁকা পরদায় আগাগোড়া ঢাকা। বাদশা উজির ও শিল্পী তিন জনে এসে সেই দর্পণের সামনা সামনি কক্ষের অপর প্রান্তে দাঁড়ালেন। অদৃশ্য হস্তের টানে পরদা সরে গেল। রত্নখচিত সিংহাসনে উপবিষ্ট নতুন বেগমের প্রতিবিম্ব দর্পণের গায়ে ফুটে উঠল—

 যেন মসী-লিপ্ত আমাবস্যার অন্ধকারের বিরাট গহ্বর হতে শরৎ পূর্ণিমার লক্ষ চাঁদ সহসা এককালে জেগে উঠল—যেন কঠিন রসহীন প্রাণহীন পাষাণের বুক চিরে এককালে-ফোটা বসোরার গোলাপ ফুটে উঠল—যেন ঘোর অমানিশার পুঞ্জ মেঘের বুক চিরে বিদ্যুতের রেখা ফুটে অচঞ্চল হয়ে চারিদিক উদ্ভাসিত করে' রাখল—যেন—। বাদশা বললেন—“শিল্পী, এই তোমার আলেখ্য।”

 বাদশা শিল্পীর দিকে চোখ ফিরিয়ে কথা শিল্পীর কানে যায় নি—তার দৃষ্টি— দেখলেন, বুঝলেন তাঁর দর্পণে নিবন্ধ শিল্পী মন্ত্রমুগ্ধ - বাহ্যজগত তার কাছে লোপ পেয়েছে। বাদশার ঠোঁট দুখানিতে একটা তৃপ্তির, একটা গৌরবের, যেন একটা বিজয়ের নিঃশব্দ হাসির রেখা অঙ্কিত হ'য়ে গেল।

 শিল্পীর দৃষ্টিতে কি ছিল—দর্পণে প্রতিবিম্বিত মূর্ত্তির অবনত চোখ দুটি ধীরে ধীরে যেন মন্ত্রচালিত হ'য়ে উত্তোলিত হয়ে মন্ত্রমুগ্ধ শিল্পীর প্রতি নিবন্ধ হল—সেই চোখ দুটিতে বিস্ময়ের একটা ক্ষণিক প্রভা যেন মুহূর্ত্তের জন্য খেলে গেল—তার আজীবন সংগোপিত অনন্ত গোপন আকাঙ্ক্ষা আকুলতার আড়াল থেকে দুটি তরুণ চোখ আর দুটি তরুণ চোখের সঙ্গে মিলিত হ'ল—দর্পণের মূর্ত্তি যেন তার রন্ধে রন্ধে একটা পুলক নিয়ে কেঁপে উঠল—শিল্পীর স্নায়ুতে স্নায়ুতে যেন একটা তড়িৎ প্রবাহ চারিয়ে গেল—তার পর নারীর দৃষ্টি অবনত হয়ে গেল—পুরুষের চোখে পলক পড়ল না। দর্পণের মসৃণ গায়ের উপরে মনে হ'ল কে যেন সিঁদূর ঢেলে দিল। অদৃশ্য হস্তের টানে পরদার দর্পণ ঢাকা পড়ল। শিল্পী চমক ভেঙ্গে জেগে উঠল—দেখলে চারিদিক যেন সন্ধ্যার মত মলিন হ'য়ে উঠেছে।

 বাদশা বললেন—“শিল্পী—”

 তরুণ যুবক সংযত স্বরে বললে- জাহাপনা, আমি হিন্দুস্থানের রাজন্যবর্গের অনেক অনেক অন্তঃপুর-মহিলাদের দেখেছি, কিন্তু এমন রূপ কখনও আমার নয়নগোচর হয় নি।”

 স্মিত হাস্যে বাদশা বললেন—“শিল্পী, যা চোখে দেখলে, তাই যদি চিত্রপটে ফুটিয়ে তুলতে পার, তবে লক্ষ সুবর্ণ মুদ্রা তোমার পুরস্কার।”

 শিল্পী উত্তর করলে—“জাঁহাপনা, আমাকে ছয় মাস সময় দিন। আর আমি চাই একটি নির্জ্জন নিভৃত স্থান, অতি নিভৃত, যেখানে বাইরের জগতের রাগ রঙ্গ হাসি অশ্রু আমার প্রাণে কোন ঢেউ-ই তুলবার সুযোগ পাবে না—যেখানে একান্ত ভাবে থাকবে আমি আর আমার আলেখ্য।”

 বাদশা উজিরের দিকে ফিরে বললেন—“ফজলু মতিমঞ্জিলে শিল্পীর বাসস্থান নির্দ্দিষ্ট হোক।”

 তিন জনে হারেম ত্যাগ করলেন।

 আবার তরুণীদের কলকণ্ঠ ফুটে উঠল। তাদের পায়ে পায়ে কত কত লাস্য নিয়ে নূপুর নিক্কণ জেগে উঠল, তাদের হাস্যোচ্ছ্বাস কক্ষে কক্ষে রণিত হ'য়ে উঠল কিন্তু সেদিন সেই হারেমে একটি নিভৃত কক্ষে একটি তরুণীর অন্তরে অন্তরে একটা নবীন স্বপ্নের আভাসে যে একটা নব তন্ত্রী বাজতে লাগল, তার সঙ্গে সেই তুচ্ছ প্রতিদিনকার উদ্দেশ্যহীন হাসি-গানের কোনই মিল রইল না।

(৪)

 সসাগরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চিত্রকর সে, দেশ বিদেশে কোটা কোটী নর নারীর মুখে মুখে তার নাম ফিরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু সে নিজে এতদিন কোথায় ছিল? কোথায় আপন-ভোলা হ'য়ে ঘুরছিল? কি জীবন সে এতদিন যাপন করেছে? কি জীবন? কোন্ একান্ত বাইরে বাইরে সে তুলি আর রঙ নিয়ে কেবল কি এক তুচ্ছ খেলা করে' বেড়িয়েছে? শিল্পী সে কিন্তু এই এত দিন তার কাছ থেকে জীবনের অমৃতের উৎস এমনি করে গুপ্ত হয়েছিল যে, তার অস্তিত্বের সন্দেহমাত্র তার মনে জাগে নি! তার তুলির মুখে কত কত সুন্দরীর ভোমরা-কালো আঁখি-তারা বিশ্ব-বিমোহিনী দৃষ্টি নিয়ে জেগে উঠেছে, আর তুলির সোহাগে সোহাগে কত কত তরুণীর হৃদয়ের উপরে অঞ্চল-ঢাকা ভরা-বুক আধ আভাস নিয়ে মাথা তুলেছে, তার তুলির আদরে আদরে কত কত কমলের মত হাত চাঁপার কলির মত আঙুল নিয়ে ফুটে উঠেছে, কিন্তু তার পিছনে কি ছিল? আজ যে সে জানে যে, তার পিছনে ছিল তার কেবল অপূর্ণতা—আর অপূর্ণতা—আর অপূর্ণতা। তার পিছনে ছিল না শিল্পী তার সবখানি নিয়ে, ছিল না শিল্পীর নিগূঢ় জীবনের নিবিড় চরম আনন্দের অনুভূতি, ছিল না শিল্পীর নিজেকে নিঃশেষে ঢেলে দেওয়া। সে কেমন করে' কাটিয়েছে, কেমন করে'!—এই অসম্পূর্ণতা নিয়ে, এই বিরাট শূন্যতা নিয়ে—কেমন করে' সে এতদিন ছিল, কেবল এই রঙ তুলি ও চিত্রপটের বিরাট ব্যর্থতাভরা ব্যঙ্গ নিয়ে? হায়! তার নিগুঢ় আনন্দের উৎসটি এতদিন কে এমন করে' নিষ্ঠুর ভাবে তার অলক্ষ্য করে রেখেছিল!

 কিন্তু আজ তার কোন্ নিগূঢ় অন্তরের গোপন কক্ষে কোন্ একটা মণি- মুক্তা খচিত বীণার স্বর্ণ-তারে কার অদৃশ্য অঙ্গুলির স্পর্শ পড়ল-—সেই স্পর্শে যে সুর বেজে উঠল—সেই সুরে তার আজ একি হয়ে গেল! একি বেদনা, একি আনন্দ! তা ত আজ তার বুঝবারও ক্ষমতা নেই—আজ যে কেমন তার বেদনা আর আনন্দ একেবারে ছড়িয়ে গেছে, দুটোকে আর ত তার আলাদা করবার উপায় নেই—আজ যে কেমন তার মনে হচ্ছে, বেদনা ও আনন্দ—আনন্দ ও বেদনা। মৌকূল, মৌকূল, এতদিন কোন মরুভূমির মধ্যে পিপাসা নিবারণের জন্যে ঘুরে ঘুরে মরছিলে!

 ঐ যে নিগূঢ় গোপন বীণার তারে ঝঙ্কার—কি ঐশ্বর্যময় সে ঝঙ্কার—সেই ঝঙ্কারের সঙ্গে সঙ্গে যে আজ এক নিমেষে সব নিবিড় অর্থপূর্ণ হয়ে উঠল—চোখে যে কিসের অঞ্জন লেগে গেল—এই ধরিত্রীর মাটিতে মাটিতে এত গান, এত সুখ, এত সৌন্দর্য—এই যে মতিমঞ্জিল, ঐ যে তরুশ্রেণী, ঐ যে কুসুমকুঞ্জ, ঐ যে লতাবিজন— সব যেন কেমন উজ্জ্বল কেমন সজীব হয়ে উঠল। শিল্পী, শিল্পী, তুমি এতদিন কোন্ অন্ধ-করা অরণ্যে কেবল মুক্তির পথ খুঁজে মরছিলে!

 দুটি তরুণ চোখ আর দুটি তরুণ চোখ—তাদের মিলনে এমনি রহস্যের সৃষ্টি, এমনি অমৃতের উৎস, এমনি দিকে দিকে পুলক জেগে উঠল, আকাশে বাতাসে হিল্লোল খেলে গেল, জল স্থল রঙিন হয়ে উঠল!

 সে আজ ছবি আঁকবে—নতুন বেগমের। নতুন বেগম! নানা—না—নতুন বেগম কে? তাকে ত সে তেমন করে জানে না তার সঙ্গে ত শিল্পীর কোনই পরিচয় হয় নি। না-না সে নতুন বেগম নয়,—ইরাণ-তুরাণের কেউ নয়——বাদশা হুসেন শাহের কেউ নয়—তার হারেমের কেউ নয়— সে যে শিল্পীর নিভৃত গোপন মনের মন্দিরের দেবী—যে কোমল স্পর্শে তার হৃদয়-বীণায় মোহন রাগিণী বাজিয়ে তুলেছে—তার দৃষ্টিসম্পাতে তার হৃদয়-পদ্ম প্রত্যেক দলটি নিয়ে ফুটে উঠেছে। না— না—সে নতুন বেগম নয়— ইরাণ-তুরাণের কেউ নয়—বাদশা হুসেন শাহের কেউ নয়—তার হারেমের কেউ নয়—সে যে শিল্পীর নিভৃত গোপন হৃদয়-মন্দিরের প্রণয়িনী—যার গণ্ড কপোল কণ্ঠ শিল্পীর দৃষ্টিতে লাজ- লালিমার রক্তিমাভায় ছেয়ে গিয়েছে— যে শিল্পীর দৃষ্টি-বিনিময়ে তার রন্ধে রন্ধে, পুলক নিয়ে কেঁপে উঠেছে -না, সে বৃদ্ধ হুসেন শাহের নতুন বেগম নয়—সে যে চিরতারুণ্যের জীবন-মন্দিরে যুগযুগান্তরের সঙ্গিনী!

 তারি, কেবল তারি ছবি সে আঁকবে? নতুন বেগম? নতুন বেগম?—নতুন বেগম বলে কেউ এই পৃথিবীতে নেই নেই নেই। নেই —এই ব্রহ্মাণ্ডে ইরাণ-তুরাণ বলে কোন স্থান নেই—বাদশা হুশেন শাহ্ বলে' কোন ব্যক্তি নেই তার হারেম বলে কোন কারাগার নেই—সেখানে নতুন বেগম বলে কোন বন্দিনী নেই। আছে শুধু অনন্ত শূন্য অনন্ত অবসরের মাঝে দুটি তরুণ তরুণী, দুটি প্রেমিক প্রেমিকা—আছে শুধু দুটি হৃদয়, চারটি আঁখি, একটি অনন্তকালের নিবিড় চুম্বন। এই আর কিছুই নয়।

 কেবল তারই ছবি সে আঁকবে। যে-ছবি সে আঁকবে—কেবলই কি তুচ্ছ রঙ দিয়ে? তুচ্ছ রঙ দিয়ে! তার হৃদয় শোণিতের বিন্দুতে বিন্দুতে যে আলেখ্যের প্রত্যেক অণু পরমাণু প্রাণ পাবে—তার নিশ্বাসে নিশ্বাসে যে তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ জেগে উঠবে, তার আত্মার স্পর্শে স্পর্শে তা চিত্রপটে ফুটে উঠবে—তুচ্ছ তুলি আর রঙ?—না।

 শিল্পী এক মনে মতিমঞ্জিলে ছবি আঁকতে লাগল।

 ধীরে ধীরে তার কাছে বাহ্যজগত লোপ পেয়ে গেল। মতিমঞ্জিল তার বিস্তীর্ণ উদ্যান—বিশাল তরুশ্রেণী—নিবিড় লতাবিতান, সব অদৃশ্য হ'য়ে গেল—রইল শুধু তার চোখের সামনে একটি তরুণীর মূর্ত্তি—কুন্তল যার নিবিড়, দৃষ্টি যার গভীর, বক্ষে যার ইঙ্গিত, কক্ষে যার সঙ্গীত, জঙ্ঘা যার বিরহ-কাতর, চরণ যার নিগড় বাঁধা। শিল্পী এক মনে ছবি আঁকতে লাগল।

(৫)

 দেখতে দেখতে ছ'মাস কেটে গেল।

 গোধূলির স্বর্ণে স্বর্ণে পশ্চিমাকাশে গৈরিক ওড়না উড়িয়ে পূরবী রাগিণী বেজে উঠেছে—বাদশা হুশেন শাহ্ ফজলু খাঁকে সঙ্গে নিয়ে মতিমঞ্জিলে এসে উপস্থিত হলেন। শিল্পীকে বললেন— “শিল্পী, তোমার ছ'মাস শেষ।”

 শিল্পী আভূমি প্রণত হ'য়ে উত্তর দিলে—“জাঁহাপনা, আলেখ্য ও শেষ।”

 বাদশা বললেন—“আজ হিন্দুস্থানের চিত্রকরের ক্ষমতা কতদূর, তার বিচার হবে শিল্পী।”

 শিল্পী বিনম্র শিরে বহু কক্ষ অতিক্রম করে' বাদশা ও উজিরকে মতিমঞ্জিলের নিভৃততম অংশে একটি কক্ষে নিয়ে এল। গোধূলি লগ্নে কক্ষের মধ্যে আঁধার হ'য়ে এসেছে। শিল্পী রৌপ্য-দীপদানে দুটি দীপ জ্বালিয়ে তার চিত্রপটের দু'পাশে রক্ষা করল। চিত্রপটের উপরে পরদা ঢাকা।

 পরদা-ঢাকা চিত্রপটের সামনে এসে বাদশা ও উজির দাঁড়ালেন। শিল্পী ধীরে ধীরে চিত্রপটের উপর থেকে পরদা সরিয়ে নিয়ে এক পাশে এসে দাঁড়াল।

 বাদশার কোষের অসি ঝন্ ঝন্ করে বেজে উঠল, তাঁর হাতের আকর্ষণে খাপ থেকে তা' অর্দ্ধেক বেরিয়ে এল। শিল্পী তৃপ্তির হাস্যে শান্তস্বরে বললে—“জাঁহাপনা, এ আলেখ্য মাত্র।”

 ইরাণ-তুরাণের বাদশা লজ্জিত হয়ে তরবারি আবার খাপে পুরলেন। কণ্ঠ হতে বহুমূল্য মণিহার খুলে শিল্পীর গলায় পরিয়ে দিলেন। তারপর বাদশা আর উজির দুজনে বিস্ময়বিস্ফারিত চোখে আলেখ্যের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এ ত রঙ দিয়ে আঁকা ছবি নয়—এ এ যে মূর্ত্তিমান রক্তমাংসের শরীর! কে বলবে নতুন বেগম আজ বাদশা হুশেন শাহের হারেমে— সে আজ মতিমঞ্জিলের একটি নিভৃত কক্ষে রত্নখচিত সিংহাসনে উপবিষ্টা!

 প্রথম বিস্ময়ের কথঞ্চিৎ উপশমে বাদশা বললেন—“শিল্পী, তোমার শক্তি অলৌকিক, ঐশ্বরিক—লক্ষ সুবর্ণ মুদ্রার পরিবর্তে পাঁচ লক্ষ তোমার পুরস্কার—হিন্দুস্থানের নৃপতিরা না বলে ইরাণতুরাণের বাদশা গুণের আদর করতে জানে না! অর শিল্পী, কাল প্রাতে অনুচরবর্গ নিয়ে কোতোয়াল আসবে, আলেখ্য রাজপ্রাসাদে স্থানান্তরিত করবার জন্যে—সেজন্যে প্রস্তুত হয়ে থেকো। শিল্পী, তুমি নতুন বেগমের ছবি আঁক নি, দ্বিতীয় নতুন বেগমের সৃষ্টি করেছ।”

 বাদশা ও উজির মতিমঞ্জিল ত্যাগ করলেন।

 ওঃ প্রলয়! মুহূর্ত্তের মধ্যে শিল্পীর পায়ের নীচেকার কক্ষতল প্রলয়-ঘুর্ণনে ঘুরতে লাগল! কক্ষের আসবাব সব তার চোখের সুমুখে যেন মত্ত হয়ে নাচতে লাগল, চারিদিকের দেয়াল যেন দুলতে লাগল, দীপদানে দীপ যেন মরণাহত মানুষের হাসির মত বীভৎস হয়ে উঠল, শিল্পী টলতে টলতে চিত্রপটের সামনে মেঝের উপরে বসে পড়ল!

 স্বপ্ন! স্বপ্ন! সব স্বপ্ন —আপনার চারিদিকে স্বপ্নের জাল বুনে এতদিন কি প্রবঞ্চনার মাঝেই না সে এই ছমাস কাটিয়েছে! কোথায় সে? কে সে!—মিথ্যা—মিথ্যা সব মিথ্যা। তার চাইতে অনেক বেশি সত্যি, লক্ষ কোটী গুণ সত্যি, ভয়ঙ্কররূপে সত্যি এই ইরাণ-তুরাণ, ইরাণ-তুরাণের বাদশা হুশেন শাহ্, হুশেন শাহের হারেম, আর সেই হারেমে বন্দিনী নতুন বেগম সত্যি সত্যি, ওগো অতি সত্যি, নিষ্ঠুর ভাবে সত্যি, নির্ম্মম ভাবে সত্যি, মৃত্যুর মত সত্যি।

 সেই হুশেন শাহের রাজপ্রাসাদে এই আলেখ্য স্থানান্তরিত হবে কাল - একটি মাত্র রজনীর অবসানে। এই আলেখ্য, যে আলেখ্যের প্রতি অণুতে অণুতে তার অস্তিত্ব বিছিয়ে আছে, যে আলেখ্য মাসে মাসে দিনে দিনে নিমেষে নিমেষে আপনার প্রত্যেক চিন্তাটি দিয়ে, প্রত্যেক বিশ্বাসটি দিয়ে, প্রত্যেক ইচ্ছাটি দিয়ে, প্রত্যেক আকাঙ্ক্ষাটি দিয়ে, সে জাগিয়ে তুলেছে—তাই একজনে একটি মাত্র কথায় চিরদিনের জন্যে তার কাছ থেকে অপসারিত হবে। বাদশার আমদরবারে এই আলেখ্য ঝুলবে, লক্ষ লোকের চোখের তৃপ্তির জন্যে— তার জন্যে রইবে শুধু লক্ষ কণ্ঠে অজস্র বাহবা। শিরা হতে বিন্দু বিন্দু করে রক্ত চুইয়ে বাহবা লাভ! না —না—চাই নে বাহবা, চাইনে লক্ষ দশ লক্ষ কোটী লক্ষ সুবর্ণ মুদ্রা, আমায় ফিরিয়ে দাও— ফিরিয়ে দাও কেবল এই আলেখ্যখানা!

 বাতুল—বাতুল, এই আলেখ্য? কোথায় তোর মানসী কোথায়? ওরে শিল্পী, ওরে মূর্খ মৌকূল, এই আলেখা? তোর মানসী হুশেন শাহের অন্তঃপুরবাসিনী, যে প্রত্যেক নিমেষটিতে বাদশা সূর্য্যের আলোর পর্যন্ত যার মুখ দেখবার অধিকার নেই, এই আলেখ্য? জড় জড়— কেবল রঙ আর রঙ আর রঙ-জড়জড় অতি জড়। জড়? না—না-কে বললে জড়। ওরে নাস্তিক —ঐ যে, ঐ যে বুক দুলছে না কি? ঐ যে চোখের পাতায় অশ্রুবিন্দু কাঁপছে, ঐ যে ঠোঁট দুখানি পাংশু হয়ে উঠল—জড়? নয়—নয় কিছুতেই নয়- ঐ যে দীর্ঘ নিশ্বাসে বুক দমে গেল—ঐ যে ঘাঘরার প্রান্তটা কেঁপে উঠল না কি? পাগল—পাগল এ যে একেবারেই জড় —শক্তিহীন, গতিহীন, ইচ্ছাহীন!

 শিল্পী উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে সেই কক্ষতলে বসে আলেখ্যের দিকে অনিমেষ চোখে চেয়ে রইল। ঐ ঠোঁট দু'খানি যদি একবার কেবল একবার মাত্র নড়ে ওঠে, একবার মাত্র ডাকে— “শিল্পী”। ঐ চোখের তারা দুটি যদি কেবল একটিমাত্র নিমেষের জন্যে চঞ্চল হয়ে ওঠে, যদি—যদি —যদি—আঃ কি নিষ্ঠুর শাণিত তরবারির একটুকু স্পর্শে তার সূক্ষ্ম কোমল স্বপ্নের জাল একেবারে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে অদৃশ্য হ'য়ে গেল, হাওয়ায় মিশিয়ে গেল। শিল্পী নিস্তব্ধ হয়ে বসেই রইল—দণ্ডের পর দণ্ড কেটে যেতে লাগল, সন্ধ্যার আঁধার ধীরে ধীরে নিবিড় কালো হয়ে উঠল, মর্তিমঞ্জিলের বৃক্ষে বৃক্ষে পাখীর ডাক সব নীরব হয়ে গেল, দণ্ডে দণ্ডে প্রহর কাটতে লাগল, শিল্পী ক্লান্ত দেহ মন নিয়ে ধীরে ধীরে কখন নিদ্রাভিভূত হয়ে গালিচার উপরে টলে পড়ল তা জানলও না।

 * * * *

 এদিকে মধ্যরজনীর নীরবতাকে মুখরতায় ভরিয়ে দিয়ে বাদশা হুশেন শাহর হারেমে মহা উৎসব চলছে। সহস্র দীপালোক রাত্রির অন্ধকার দূর করছে, অথচ তা দিনের একান্ত স্পষ্টতায় কোন দিকেই সমাপ্তি টানে নি—সবই কেমন রহস্যময়, আভাসময় ইঙ্গিতময়। বেলোয়ারী ঝাড়ের ঠুণ্টান, বলয় কঙ্কনের ঠিনি ঠিনি,নূপুর নিক্কনের রিনি-ঝিনি। কত কত রূপসী তরুণী হীরে মণি মুক্তা জহরতে ভূষিত। প্রত্যেক অঙ্গ সঞ্চালনে দীপ-রশ্মি স্পর্শে তাদের সারা দেহ হ'তে যেন তারার টুকরো ছিটিয়ে ছিটিয়ে পড়ছে। তাদের নিবিড় কালো আঁখিতারা হতে অবিরাম ক্ষরিত হচ্ছে অমৃত ও হলাহল, জীবন ও মৃত্যু—ঐ যে দেখা যায় তাদের আবেশবিহ্বল আঁখি পাতে পাতে অঙ্কিত অমরার সিংহাসন আর গভীর গহন রসাতলের বিরাট গহবর।

 অসংখ্য তরুণী রূপসী তাদের রূপের ডালি নিয়ে, চটুল চাহনি নিয়ে, হাসির তরঙ্গ তুলে, উঠছে, বসছে, ঘুরছে, ফিরছে, চলছে। এই তরুণীদের মেলার মধ্যে বৃদ্ধ হুশেন শাহ্।

 কি নিষ্ঠুর উৎসব! কি নির্ম্মম এই অসংখ্য তরুণীদের একটি বৃদ্ধকে ঘিরে তাদের আশা আকাঙ্ক্ষা সাধ আহ্লাদের সমাপ্তি! না জানি ঐ চটুল, চাহনীর পিছনে কত শত দীর্ঘ নিশ্বাস সংগোপিত, ঐ হাল্কা হাসির পশ্চাতে কত শত হতাশার গুরুভার অটুট, কত কত জীবনের ব্যর্থতা, ঐ উৎসব রক্তনীর পশ্চাতে আপনার কড়া ক্রান্তির হিসেব টেনে চলেছে! প্রবল প্রতাপশালী হুশেন শাহ্, বিরাট ব্যর্থতার বিনিময়ে কিছু দান করবার ক্ষমতা তোমার হাতে নেই।

 নতুন বেগম গান গাচ্ছিল কি করুণ কি কোমল সে সুর! যেন তার আঁখির পাতে বিশ্বের অশ্রুরাশি থমকে আছে, যেন তার ঠোঁটের কোণে সারা জগতের বিষাদ গুমরে মরছে, আর তার কণ্ঠসুরে কি মিষ্টি বীণার তানেই অশ্রুসাগর উথলে উঠছে!

 “ওগো অচেনা, তুমি এমনি পরিচিত—এতদিন তবে কোথায় ছিলে? যখন প্রথম বুল্ ডেকেছিল, যখন প্রথম সিরাজির স্পর্শ স্নায়ুতে স্নায়ুতে চারিয়ে গিয়েছিল, যেদিন প্রথম দিগন্তের কোণে কোণে চোখ দুটি তোমার সন্ধানে ফিরছিল, সেদিন তুমি কোথায় ছিলে —কোথায় ছিলে?”

 “বুলবুলকে খাঁচায় পুরে দিলে, সিরাজি জহরত-মণ্ডিত পিয়ালায় রক্ষিত হল, চোখের সামনে আঁধার নেমে এল, অচেনা তুমি আজ কেমন ক'রে, কোথায় থেকে এলে?—" “ওগো পরিচিত—কেবলই জল ঝরবে, মেঘ থেকে কেবলই জল ঝরবে, জোছনা আর খেলবে না, ফুল আর ফুটবে না, বুল্ আর ডাকবে না, ওগো তুমি চির-পরিচিত—

 “ওঃ”— গান আর শেষ হল না। সহসা নতুন বেগম দু-হাতে বুক চেপে গালিচার উপরে লুটিয়ে পড়ল, তার মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে গেছে, চোখের তড়িৎ মলিন হয়ে গেছে।

 বাদশা হুশেন শাহ্ চক্ষের পলকে এসে লুণ্ঠিতা, নতুন বেগমের পার্শ্বে নতজানু হয়ে বসলেন—দেখলেন নতুন বেগম অতি কষ্টে নিশ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছে। বাদশা শঙ্কিত কণ্ঠে ডাকলেন—“পিয়ারী’ পিয়ারী—”

 হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে অতি কষ্টে নতুন বেগম উত্তর দিলে “জাহাপনা” বাঁদীর গোস্তাকি মাপ করবেন। বুকের ভিতরটা হৃপিণ্ডটা যেন কে চেপে চেপে ধরছে”— বেগমের শ্বাস ফুরিয়ে এল, আর কোন কথা ফুটল না।

 তৎক্ষণাৎ বাঁদিরা ধরাধরি করে নতুন বেগমকে কক্ষান্তরে নিয়ে গেল, শয্যায় শায়িত করে দিলে, প্রতি মুহূর্তে তার শ্বাসকষ্ট উত্তরোত্তর বর্দ্ধিত হতে লাগল। হাকিমের জন্যে লোক প্রেরিত হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নতুন বেগমের যেন নিশ্বাস প্রশ্বাসের কষ্টের কতকটা উপশম হল, তার মুখ থেকে ধীরে ধীরে যন্ত্রণার চিহ্ন দূরীভূত হয়ে গেল, শাস্তির নিশ্বাস ফেলে নতুন বেগম ধীরে ধীরে চোখ দুটি নিমীলিত করল, ধীরে ধীরে তার রঙিন ঠোঁটে রঙিনতর একটা হাসির রেখা অঙ্কিত হয়ে গেল। হাকিম এলেন, নিদ্রিতা নতুন বেগমের নাড়ী স্পর্শ করলেন, একটা বিস্ময়ের ক্ষণিক আভা তাঁর চোখ দুটোতে খেলে গেল, আত্মসম্বরণ করে তিনি আবার দ্বিগুণ মনোযোগের সঙ্গে নাড়ী অনুভব করলেন, তারপর ধীরে ধীরে হাতখানিকে শয্যায় নামিয়ে রাখলেন। গম্ভীর কণ্ঠে হুশেন শাহের দিকে ফিরে বললেন—“ইরাণ-তুরাণের প্রবল পরাক্রান্ত বাদশা, জাহাপনা, নতুন বেগম এ নশ্বর জগত তাগি করে বেহেস্তের পথে যাত্রা করেছেন।”

 বাদশার মুখ দিয়ে কথা সরল না।

 শিল্পী স্বপ্ন দেখছিল। হিমাদ্রির কোন্ গহন গভীর নির্জ্জন গুহায় একমনে সে আপনার মানসীর ছবি আঁকছিল। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বৎসরের পর বৎসর সে অনাহারে অনিদ্রায় ছবি আঁকছিল।’ সহস্র বৎসর পরে তার ছবি আঁকা শেষ হল। তখন শিল্পী সভয়ে দেখলে, এ ত আর কেউ নয়—এ যে নতুন বেগম। দেখতে দেখতে গিরিগুহা পরিবর্তিত হয়ে মতিমঞ্জিল হয়ে গেল। হতাশায় শিল্পী তার অঙ্কিত আলেখ্যের সামনে লুটিয়ে পড়ল।

 সহসা শিল্পী দেখলে ছবিতে আঁকা ওড়না যেন একটু কেঁপে উঠল, আলেখ্যের চোখের পাতা মিট্‌মিট্ করে উঠল, চোখের তারা উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ঠোঁট দুটো নড়ে উঠল, ধীরে ধীরে আঁকা মানসীমুর্ত্তি চিত্রপট থেকে কক্ষতলে নেমে পড়ল তার কানে এসে বাজল— “শিল্পী—”

 শিল্পী ঘুম থেকে চমকে উঠল জেগে দেখলে, তার সামনে দাঁড়িয়ে এক তরুণী! স্তিমিত আলোকে তার মুখ দেখলে, ভয়ে বিস্ময়ে তার মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ল —“নতুন বেগম!”

 স্বপ্নময়ী বললে-“শিল্পী নতুন বেগম মরেছে, আমি তোমার

 প্রণয়িনী, এস—রাত আর বেশি নেই—”

 নিমেষে শিল্পীর ঘুমে ঘোর কেটে গেল—তার দেহের প্রত্যেক অণু-পরমাণু জাগ্রত হয়ে উঠল, তার শিরায় শিরায় তড়িৎ চারিয়ে গেল। এত স্বপ্ন নয়-এ যে সত্যি—অতি সত্যি! তৎক্ষণাৎ তরুণ যুবক উঠে দাঁড়াল, তরুণীর হাত ধরে বাইরে এলো। রজনীর শেষ শুকতারা পূর্ব গগনে জ্বল্-জ্বল্ করছিল। সেই শুকতারার আলোকে আলোকে প্রেমিক প্রেমিকা হাত ধরাধরি করে দূর দিগন্তে কোথায় মিশিয়ে গেল।

(৬)

 মানুষের হাজার শোক হোক রাজার রাজকার্য্য বন্ধ থাকে না। পরদিন বাদশা হুশেন শাহ্ কোতোয়ালকে মতিমঞ্জিল থেকে নতুন বেগমের তসবীর আনবার জন্য পাঠালেন। কোতোয়াল অনুচরবর্গ নিয়ে মতিমঞ্জিল উদ্দেশ্যে চললেন। যথাসময়ে ফিরে এসে বাদশা-সমীপে নিবেদন করলেন—“জাঁহাপনা, মতিমঞ্জিলে শিল্পীর সাক্ষাৎ পাওয়া গেল না।”

 বাদশা বিস্মিত হলেন, উজিরকে সঙ্গে নিয়ে মতিমঞ্জিল উদ্দেশে যাত্রা করলেন। এসে দেখলেন শিল্পী অদৃশ্য। শিল্পী যে কক্ষে ছবি আঁকছিল সেই কক্ষে দুজনে প্রবেশ করলেন। দেখলেন কেউ কোথাও নেই আপনার স্থানে পরদা ঢাকা চিত্রপট—তার দুপাশে রজতাধারে তৈলহীন প্রদীপ দুটিতে সলতের ভস্মাবশেষ।

 বাদশা চিত্রপট দেখে হৃষ্ট হলেন। বললেন—“উজির, চিত্রকর না থাক, চিত্রপট রয়েছে—তাই আমাদের যথেষ্ট। চিত্রকর যদি পুরস্কার প্রত্যাশা না করে সে দোষ ইরাণ-তুরাণের বাদশার নয়—”বলতে বলতে তিনি চিত্রপটের পরদা অপসারিত করলেন।

 বাদশার মুখের কথা মুখেই মিলিয়ে গেল। দুজনে মন্ত্রমুগ্ধের মত ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন। চিত্রপটে রত্নক্ষচিত সিংহাসন যেমন আঁকা ছিল তেমনি আছে; কিন্তু তার উপরকার নতুন বেগমের চিহ্নমাত্র নেই।

 রত্নসিংহাসনের রত্নগুলো যেন প্রাণ পেয়ে জ্বল্ জ্বল্ করছে।