বিষয়বস্তুতে চলুন

ইরাণী উপকথা/একটা আষাঢ়ে গল্প

উইকিসংকলন থেকে

একটা আষাঢ়ে গল্প।

 কিসে যে কি হ’ল, আঠার বছর বয়সের রাজপুত্র চাঁদের মত মুখ, আকাশের মত চোখ, তারার মত দৃষ্টি, পদ্মের মত হাত, কবাটের মত বুক, একদিন মাকে এসে বললে—“মা, আমি রাজ্যও করব না, সংসারও করব না!”

 প্রৌঢ় রাজমহিষী সামনে একখানা আর্‌শি ধরে সিঁথিতে মোটা করে একটা সিঁদূরের রেখা টানতে যাচ্ছিলেন, রাজপুত্রের কথা শুনে তাঁর হাত কেঁপে উঠল, সিঁদূরের রেখাটা বেঁকে গেল। জিজ্ঞেস করলেন—“রাজ্যও করবি নে, সংসারও করবি নে তবে কি করবি?”

 রাজপুত্র উত্তর দিলেন—“একদিক বলে’ বেরিয়ে যাব মা।”

 মা জিজ্ঞেস করলেন—“সে দিকটা কোন্‌ দিক?”

 ছেলে উত্তর দিলেন—“সে—দিকটা কোনো একটা দিক নয় মা, সে—দিকটা সকল দিক।”

 রাজরাণী অনুনয়ের স্বরে বললেন— “এ কি পাগলামি বাবা রাজ্যও করবি নে, সংসারও করবি নে, এ রাজ্য দেখবে কে? প্রজাপালন করবে কে?”

 রাজপুত্র উত্তর করলেন—“কে করবে জানি নে মা, শুধু এই জানি যে, আমি এখানে হাঁপিয়ে উঠেছি। এই সাতমহলা পুরী, দ্বারে দ্বারে দ্বারী, উঠতে বসতে কায়দা—কানুন, খেতে—শুতে দণ্ড প্রহর গণা, দু’পা যেতে সঙ্গে সাত শ’ লোকের হৈ হৈ রৈ রৈ, একবার মুখ খুললে দশবার “যুবরাজের জয় হোক” শোনা! জীবনের প্রবাহ থেকে সব রস শুকিয়ে ফেলে যেন শক্ত পাথর দিয়ে ভরে’ দিয়েছে। এ থেকে আমি একবার ছুটী চাই, কেবল ছুটতে, খোলা আকাশের তলে মুক্ত বাতাসের মাঝে, সামনে পিছনে ডানে বাঁয়ে কোন শৃঙ্খল নেই, কেবল ছুট্‌তে, বন্ধনহীন শৃঙ্খলহীন কেবল ছুট্‌তে, আর ছুট্‌তে আর ছুট্‌তে; ব্রহ্মাণ্ডের আকাশটাকে চোখ ভরে’ দেখে নিতে, দিগন্তের বাতাসটাকে বুক পুরে টেনে নিতে; একবার, একবার আমি ছুটী চাই।”

 রাজরাণী মনে করলেন রাজপুত্র পাগলই হ’ল না কি। তৎক্ষণাৎ রাজার কাছে খবর পাঠালেন।

 রাজা এলেন! বৃদ্ধ রাজা, মাথার চুল সাদা, ভুরু সাদা, চোখের পাতা পয্যন্ত পেকে গেছে। যুবরাজ পিতৃচরণ বন্দনা করলেন। তারপর বললেন—“মহারাজ আপনার দাসানুদাস একবার মুক্তি চায়।” রাজরাজেশ্বর পরাজয় মানল, বৃদ্ধ পিতা তার সন্তানের মাথার হাত বুলোতে বুলোতে বললেন —“এখানে কিসের অভাব বাবা, যে বনবাসী হবে, কোন দুঃখে এ সংসার ছেড়ে যাবে?”

 যুবরাজ উত্তর করলেন—“মহারাজ! এখানে সব চাইতে বড় অভাব যে কোনো অভাব নেই। মহারাজ, আমি ঠিক জানিনে কোন্ দুঃখ বড়—অভাবের, না অভাবহীনতার। যেখানে মনে ইচ্ছার উদয় হতে না হতেই তা প্রতিপালিত হচ্ছে সেখানে মানুষ থাকে কি করে’, কোন্ অবলম্বনকে ধরে’ মানুষ সেখানে বাঁচবে? তার চাইতে মহারাজ আমার মনে হয় পথের মুটেটা পর্য্যন্ত সুখী, তার সামর্থের চাইতে যে তার আকাঙ্ক্ষা বড়, তাই তার বাঁচবার মধ্যে একটা চিরন্তনের কৌতুক, চিরন্তনের রহস্য আছে যা কোনদিনই নষ্ট হয় না। মানুষের জীবনে একটা চিরন্তনের চেষ্টার দিক আছে বলেই সে—জীবনকে মানুষ সত্য করে পায়। যে জীবনে এই চেষ্টার দিকের আয়োজন নেই, আকাঙ্ক্ষা করবার কিছু নেই, সে জীবন মৃত্যুরই সামিল। সে জীবন স্বাস্থ্যবান দেহ—মন—প্রাণের পক্ষে বিষ। মহারাজ, এই মৃত্যু থেকে, এই বিষের সংস্পর্শ থেকে আমি ছুটী চাই। অন্ততঃ আমার দেহটাকে একবার ছুটিয়ে দিয়ে দেখতে চাই—মহারাজ অনুমতি দিন।”

 বৃদ্ধ রাজা একবার মুহূর্ত্তের জন্যে অতিপ্রয়াস করে মেরুদণ্ডটাকে ঋজু করে দাঁড়ালেন, দৃঢ়কণ্ঠে বলিলেন——“যুবরাজ! আমার অবসর গ্রহণের কাল উপস্থিত, রাজ্যের ভার তোমার, সেই রাজ্যের অবহেলা করে’ কর্ত্তব্যের অবমাননা করবে? শাস্ত্রবিরোধী ধর্ম্ম আচরণ করবে?”

 যুবরাজ উত্তর করলেন—“রাজরাজেশ্বর! রাজধর্ম্মের চাইতে মানুষের ধর্ম্ম বড়, মানুষের ধর্ম্ম যেখানে রাজার ধর্ম্মকে পরিত্যাগ করেই সফল হ’তে চায় সেখানে তাই—ই তার সত্য, তাই—ই তার শাস্ত্র। মানুষ রাজসিংহাসনে বসে গৌরব অনুভব করুক কিন্তু মানুষ রাজার চাইতে চিরকালের বড়। মহারাজ, আপনার পুত্রদের মধ্যে যারা রাজসিংহাসন আকাঙ্ক্ষা করে তারা রাজ্যশাসন করুক প্রজাপালন করুক, আমাকে এই বর্ণহীন বৈচিত্র্যহীন অভ্যাসের জঠর-চক্র থেকে মুক্তি দিন। আমি ঘুরতে চাই; কিন্তু তা চক্রে নয়—দিগন্তের পানে, আর নিজের ইচ্ছায়।”  কিছুতেই কিছু হ’ল না। পাটরাণীর চোখের জল, বৃদ্ধ রাজার কাতর বচন, বুড়ো মন্ত্রীর অনুনয় বিনয় অনুরোধ উপরোধ কত বুঝোনো কত পড়ানো কিছুতেই কিছু হ’ল না। রাজপুত্রের কেবল এক কথা—মুক্তি চাই, মুক্তি চাই, মুক্তি চাই।

 মন্দ সংবাদ বাতাসের আগে ধায়। সূর্য্যদেব আকাশের এক পোয়া—পথ যেতে না যেতে সারা রাজধানীতে দুঃসংবাদ ছড়িয়ে পড়ল,—যুবরাজ যে মনের দুঃখে রাজ্য ছেড়ে চলে’ যাবেন!

 দেখতে দেখতে সেই আনন্দ—কোলাহলময়ী রাজধানী থমকে—থাকা অশ্রুভরা আঁখির মত ভার হয়ে উঠল, বিষন্ন হয়ে উঠল। যুবরাজ—যাঁর চাঁদের মত মুখ, আকাশের মত চোখ, তারার মত দৃষ্টি, পদ্মের মত হাত, কবাটের মত বুক, সেই যুবরাজ মনের দুঃখে কিনা বনবাসী হবেন! দোকানী দোকান পাট বন্ধ করল, ব্যবসায়ী তার আড়ত বন্ধ করল, ভিক্ষুক তার ভিক্ষা বন্ধ করল, নাগরিকেরা তাদের গৃহ হতে তাদের কর্ম্মস্থান হ’তে দলে দলে বেরিয়ে পড়ল। দলে দলে লোক রাজপ্রাসাদের দিকে ছুটতে লাগল। ধনী দরিদ্র উচ্চ-নীচ স্ত্রী—পুরুষ যুবক—যুবতী বৃদ্ধ—বৃদ্ধা ব্রাহ্মণ—বৈশ্য রাজপুরীর সামনে ক্রমে ক্রমে কোটী লোক জমা হ’ল। সকলেরই এক প্রতিজ্ঞা—আমরা যুবরাজকে যেতে দেব না। কোন্ দুঃখে কিসের অভাবে যুবরাজ এমন সোণার রাজ্য ছেড়ে বনবাসী হবেন? আমাদের যুবরাজ—যাঁর চাঁদের মত মুখ, আকাশের মত চোখ, তারার মত দৃষ্টি, পদ্মের মত হাত, কবাটের মত বুক, তাঁর দুঃখ কিসের? কি অভাব? আমাদের জানান সে অভাব, প্রাণ দিয়ে আমরা সে অভাব পূরণ করব, না পারি তাতে জীবন দেব; কিন্তু যুবরাজকে ছাড়ব না।

 রাজপ্রাসাদের সামনে লোক গিস্ গিস্ করতে লাগল। কেবল মাথা আর মাথা আর মাথা—একটা মাথার বিরাট অরণ্য। সেই বিশাল জনারণ্য থেকে বিরাট গম্ভীর জলধি-কল্লোলের মত কোটী কণ্ঠে এক সঙ্গে ধ্বনিত হ’য়ে উঠল—“জয় যুবরাজের জয়”, “অঙ্গ-বঙ্গ-মগধ-মিথিলা-কাশী-কাঞ্চীর যুবরাজ জয় তরুণাদিত্যের জয়।”

 সেই কোটী কণ্ঠের বজ্র-নির্ঘোষনাদে সাতমহলা রাজপুরীর সাত-মহল কেঁপে উঠল, মহলে মহলে সব খাট পালঙ্ক আচমকা নড়ে উঠল, সাত মহলে শত রাণীর পোষা পাখীর দল তাদের খাঁচার ভিতরে ভীষণ চাঞ্চল্যের সঙ্গে এধার ওধার করে অর্থহীনভাবে উড়ে বেড়াতে লাগল, টিয়ে পাখীরা দাঁড়ে বসে’ ভীষণ ব্যস্ততা সহকারে তাদের পায়ের শিকল কাটবার বৃথা চেষ্টা করতে লাগল, ময়ূরের দল মেঘ ডাকছে মনে করে তাদের পেখম খুলে দাঁড়াল।

 বজ্র-নিনাদে কোটী কণ্ঠ থেকে আবার ধ্বনি উঠল—“জয় যুবরাজের জয়”, ‘অঙ্গ-বঙ্গ-মগধ-মিথিলা-কাশী-কাঞ্চীর যুবরাজ জয় তরুণাদিত্যের জয়।”

 বৃদ্ধ মন্ত্রী বললেন, “যুবরাজ, সৌরজনের জনপদবাসীর এই স্নেহ এই অনুরক্তি অবহেলা করবার বিষয় নয়। সমস্ত সাম্রাজ্যের স্নেহ ভালবাসা উপেক্ষা করে’ সংসারে আপনাকে বিচ্ছিন্ন করে একা একা থাকলে কোন্ উদ্দেশ্য সফল হবে যুবরাজ?”  যুবরাজ উত্তর করলেন, “সংসারে বিচ্ছিন্ন হ’য়ে থাকতে কে চায় মন্ত্রী? কিন্তু অঙ্গ—বঙ্গ—মগধ—মিথিলা—কাশী—কাঞ্চীতে, এই বিশাল সাম্রাজ্যে সবার চাইতে বিচ্ছিন্ন কি, সবার চাইতে বিচ্ছিন্ন কে মন্ত্রী? এই সাম্রাজ্যের রাজসিংহাসন, এই সাম্রাজ্যের রাজা—নয় কি? এই বিরাট বিচ্ছিন্নতা যে আমাদের চোখে পড়ে না, তার কারণ সে শূন্য জায়গাটাকে যে আমরা অসংখ্য অসংখ্য আসবাব দিয়ে ভরে’ দিয়েছি—এই বিচ্ছিন্নতা ঢাকবার জন্যেই এই বিচ্ছিন্নতাকে ভুলিয়ে দেবার জন্যেই সে—সব আসবাবের এত আড়ম্বর, রাজা যত বড় তাঁর প্রজামণ্ডলী থেকে তার পারিপার্শিক থেকে তাঁর বিচ্ছিন্নতাও তত সম্পূর্ণ আর তাঁর আসবাব পত্রের আড়ম্বরও তত বেশি। বহু শতাব্দী বহু পুরুষ এই আড়ম্বর এই জাঁকজমকে আমরা ভুলে ছিলেম। মন্ত্রী, আর সম্ভব নয়, আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়, আমি থাকতে চাই সংসারে সহজ হয়ে, সংসারের নিবিড়তম সংস্পর্শে। তাই আমি রাজসিংহাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি চাই।”

 মন্ত্রী বললেন, “যুবরাজ এই সাম্রাজ্যের সমস্ত প্রজামণ্ডলীর দাবী অগ্রাহ্য হবে? উপেক্ষিত হবে?”

 রাজপুত্র উত্তর করলেন, “মন্ত্রী প্রজামণ্ডলীর দাবী রক্ষা করতে আমি তখনই পারব যখন আমার দাবীও সেই সঙ্গে সঙ্গে সফল হয়ে উঠবে! আমার মিথ্যা দিয়ে প্রজামণ্ডলীকে সত্য উপহার কেমন করে’ দেব? তাতে যে সার্থক কেউ—ই হ’য়ে উঠবে না।”

 কিছুতেই কিছু হোল না। প্রজামগুলীর মুহুর্মুহূ জয়ধ্বনি, চতুর মন্ত্রীর যুক্তিতর্ক, বৃদ্ধ রাজার কাতর ভাব, কিছুতেই কিছু হোল না। রাজপুত্রের কেবল এক কথা, আমি ছুটতে চাই, ছুটতে চাই, ছুটতে চাই, উদার আকাশের তলে অন্তহীন দিগন্তের পানে।

 বিশাল সাত মহল। রাজপুরী—কত হাসি কত গান কত আমোদ কত উৎসব কত কলরব, সব এক বিরাট নৈরাশ্যের ছায়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। নহবতে নহবতে রসুনচৌকির সুর আর ফুটল না, ঘোড়াশালে লক্ষ ঘোড়া তাদের খাওয়া বন্ধ করল, হাতীশালে হাজার হাতীর চোখ দিয়ে টস্ টস্ করে’ জল পড়তে লাগল, ময়ূরের দল আর নাচল না, শারী শুকেরা ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে কাঁদতে বসল, হায়! যুবরাজ, যাঁর চাঁদের মত মুখ, আকাশের মত চোখ, তারার মত দৃষ্টি, পদ্মের মত হাত, কবাটের মত বুক, তিনি কি না এমন সোণারসংসার ছেড়ে চলে যাবেন! আনন্দের পুরী অশ্রুতে অশ্রুতে ভরে’ উঠল।

 কিছুতেই যখন কিছু হোল না তখন রাজা সর্ব্ববিঘ্ননাশন এক যজ্ঞ করতে আদেশ করলেন।

 প্রকাণ্ড এক যজ্ঞমণ্ডপ উঠল। যজ্ঞমণ্ডপ আগাগোড়া শুভ্র বস্ত্রমণ্ডিত হ’য়ে সত্য প্রস্ফুটিত শ্বেত পদ্মের মত শোভা পেতে লাগল। দেশ বিদেশ থেকে কত ব্রাহ্মণ কত পণ্ডিত এলেন, কাশী কাঞ্চী মগধ মিথিলা কোশল পাঞ্চাল, উত্তর দক্ষিণ পূর্ব্ব পশ্চিম, কত কত দিক দেশ থেকে ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত সব এসে যজ্ঞমণ্ডপ জুড়ে’ বসলেল। যজ্ঞমণ্ডপ একেবারে গম্ গম্ করতে লাগল। কত পুরোহিত ঋত্বিক! বৈদিক মন্ত্রের গম্ভীর ধ্বনিতে যজ্ঞমণ্ডপ গুম্ গুম্ করে’ উঠল। হোমের আগুন লক্ লক্‌ জিহ্বা মেলে দিয়ে আকাশপানে দব, দব করে’ জ্বলে উঠল। অঞ্জলি অঞ্জলি আজ্যির সঙ্গে স্বাহা স্বাহা ধ্বনিতে সমস্ত ঘর ধ্বনিত হয়ে উঠল। যজ্ঞ শেষ হয়ে গেল। রাজপুত্র যজ্ঞভষ্মের ফোঁটা কপালে এঁকে লক্ষ ব্রাহ্মণের আশীবর্বাদ সঙ্গে নিয়ে প্রকাণ্ড এক সাদা ঘোড়ায় সোয়ার হলেন। রাজা এসে বললেন—“কুমার, আবার যেন ফিরে এসো।” রাণী এসে বললেন—“বাবা, আবার যেন ফিরো।” মন্ত্রী এসে বললেন—“যুবরাজ, আবার যেন ফিরে আসেন।” মন্ত্রীপুত্র কোটালের পুত্র এসে বললেন—“বন্ধু দেখো যেন চিরকাল ভুলে থেকো না—আবার ফিরে এসো।” রাজপুত্র হাসি মুখে সবাইকে বিদায় দিয়ে, সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সিংহদ্বার দিয়ে বেরিয়ে বায়ুবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন।

(২)

 প্রকাণ্ড ঘোড়া—দুধের মত রঙ্, রাজহংসীর মত গ্রীবা, রেশমের মত গা, বায়ুবেগে ছুটে চলল। রোদ পড়ে’ তার সাদা রেশমী গা চিক্ মিক্ করতে লাগল, খোলা আকাশের মুক্ত বাতাস তার নাসারন্ধে প্রবেশ করে’ যেন তাকে উন্মত্ত করে’ তুলল, ঘোড়া যেন পাখা লাগিয়ে বাতাসের আগে উড়ে চলল। রাজপুত্র ছুটে চললেন যেদিকে দু’চোখ যায়। এ রাজার মুল্লুক ছেড়ে ও—রাজার মুল্লুকে, ও-রাজার মুল্লুক ছেড়ে সে—রাজার মুল্লুকে, সে—রাজার মুল্লুক ছেড়ে আর রাজার মুল্লুকে, এমনি করে ছুটে চললেন। কত নদ নদী পর্ব্বত পল্লী নগর কত কানন প্রান্তর পার হয়ে রাজপুত্র ছুটে চললেন, ক্লান্তি নেই, শ্রান্তি নেই, আহার নেই, নিদ্রা নেই। যে রাজ্যের ভিতর দিয়ে যান সেখানেই পুরুষরা বলাবলি করে—“আঃ কে এমন ভাগ্যবান যে এমন পুত্রের জন্ম দিয়েছে। কুলাঙ্গনারা বলে, “উঃ, কেমন নিষ্ঠুর ম। যে এমন ছেলেকে ছেড়ে জীবনধারণ করছে।” রাজপুত্র কত রাজ্য ছাড়িয়ে গেলেন অঙ্গ বঙ্গ, মগধ মিথিলা, কৌশল পাঞ্চাল, চোল চালুক্য, পল্লব পাণ্ড্য, অবন্তী দ্বারকা— কত কত রাজ্য। এর পর ছুটতে ছুটতে একেবারে পৃথিবীর শেষপ্রান্তে এসে পৌঁছিলেন। আর চলবার উপায় নেই। সামনে ডা’নে বায়ে কেবল জল আর জল আর জল, কেবল নীল আর নীল আর নীল। সেই নীল জলের বুকে সাদা ফেনার মুকুট মাথায় দিয়ে লক্ষ ঊর্ম্মিবালারা সব হেলছে দুলছে উঠছে পড়ছে হাসছে, নাচছে। নৃত্যেরও বিরাম নেই মুখরতারও ক্লান্তি নেই। এখানে ছল্ ছল্ ছল্ ছল্ ছলাৎ, ওখানে চল্ চল্ চলাৎ; এমনি করে’ সব লুটো—পুটি খাচ্ছে। পিছনের সমস্ত পৃথিবীর কল কোলাহল এখানে এসে থমকে গেছে, সমস্ত সংগ্রাম এখানে এসে লজ্জায় অবশ হ’য়ে গিয়েছে। এখানে কেবল একটা বিরাট নির্লিপ্ততা, সকল প্রকার সংকীর্ণতাকে যা মুক্তি দিয়েছে, সকল প্রকার বিরোধকে যা অসত্য করে’ তুলেছে।

 নোনাজলের গন্ধ পেয়ে রাজপুত্রের ঘোড়া আনন্দে চিঁহিঁহিঁ করে উঠল। রাজপুত্র ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন। তার পর লাগাম ঘোড়ার ঘাড়ের উপর ফেলে দিয়ে সমুদ্রের শুভ্র সৈকতে চিক্কণ বালির উপরে বসে পড়লেন। রাজপুত্রের দৃষ্টি নিবদ্ধ হ’য়ে গেল সেইখানে যেখানে সমস্ত আকাশটা নীচু হ’য়ে নেমে এসে সমস্ত সাগরটাকে আপনার বুকে জড়িয়ে ধরেছে।

 তখন সন্ধ্যা লেগে এসেছে। সমুদ্রের ঠাণ্ডা হাওয়া রাজপুত্রের সারা শরীরে স্নিগ্ধ আদর ঢেলে দিতে লাগল। সে স্নিগ্ধ আদরের স্পর্শে রাজপুত্রের চোখ দুটো অম্‌নি বুঁজে বুঁজে আসতে লাগল। রাজপুত্র আর বসে’ থাকতে পারলেন না, ধীরে ধীরে তন্ত্রামগ্ন হ’য়ে শুভ্র বালুশয্যায় ঢলে’ পড়লেন।

 সেই আধ—জাগা আধ—ঘুমের অবস্থায় রাজপুত্রের মনে হল’ যেন হঠাৎ তার দু’কানের উপর থেকে দুটো পরদা খসে গেল। আর ঐ যে সমুদ্রের বিরামহীন মুখরতা, ও ত কেবল অর্থহীন কল্ কল্ ছল্ ছল্ ছলাৎ নয়। ঐ যে সমুদ্র আবহমান কাল ধরে’ স্পষ্ট ভাষায় গান গাচ্ছে! আধ—ঘুমে রাজপুত্র শুনলেন সমুদ্র গাচ্ছে—

দুল্‌বি ওরে দুল্‌বি যদি আমার সুনীল দোলাতে
নাম্‌রে আসি’ আমার বুকের জীবন—মরণ-খেলাতে।

দিগন্তে যে বইছে বায়
অনন্তে যে স্বপ্ন ছায়

অন্তিমেতে পারব আমি তোদের সে সব মিলাতে।


কূলের মায়া করিস্ কে রে? অকূলে কার নাইরে টান?
একটি বারে সাহস কর,’ শোন্‌রে আমার বুকের গান।

পলে পলে নিত্য করি’
হিয়ায় পুলক উঠ্বে‌ ভরি’

ছুটবে তরী আকুল বায়ে লব্ধ করি’ শ্রেষ্ঠ দান।


আমার বুকেই মুক্তি পেল ওই রে তোদের জাহ্নবী।
আমার বুকের নেয় নি স্নেহ কোন্ কবি সে কোন্ কবি?

আমার বুকেই চন্দ্র-তারা
সারা নিশীথ তন্দ্রাহারা

এই বুকেরই পাঁজরা থেকে ঊষায় জাগে হেম রবি।


এই বুকেতেই গুপ্ত ছিল সুর—অন্তরের সুধা রে
এই বুকেতেই মুক্ত চির মর্ত্ত্য—মনের ক্ষুধা রে।

এই হিয়ার তলে তলে
শুক্তিবুকে মুক্তা জ্বলে

ঊর্মিমালার সঙ্গে চলে মর্ত্ত্য—মনের সুধা রে।


এই বুকেরই’ পরে আকাশ নামায় অসীম তার কায়া
মুক্ত ওরে কুণ্ঠাবিহীন হেথায় মাটীর সব মায়া।

বদ্ধ মাটীর ক্ষুদ্র প্রাণী
আমার বুকের নিশাস্ টানি’

দেখ্লে প্রাণে তার গোপনে লুকিয়ে অসীম কোন্ ছায়া!


 রাজপুত্র ফিরে ফিরে যেন কেবলই শুনতে লাগলেন—

দুল্‌বি ওরে দুল্‌বি যদি আমার সুনীল দোলাতে

 শুনতে শুনতে যেন স্থনীল দোলায় দোল খেতে খেতে রাজপুত্র একেবারে সংজ্ঞাহীন হ’য়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।

 রাজপুত্রের যখন ঘুম ভাঙল তখন আকাশগায়ে অপ্সরীদের জ্যোছনার আল্‌পনা দেওয়া শেষ হ’য়ে গেছে। আধার কেটে চারিদিক একটা অস্পষ্টতার মাধুর্য্যে ভ’রে গিয়েছে। রাজপুত্র এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলেন—হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল তাঁর ডান দিকে কিছু দূরে একেবারে সমুদ্রের বুক থেকে একটা ছোট্ট কালো পাহাড় উঠেছে আর সেই কালো পাহাড়ের উপরে একটা কি সাদা ধব্ ধব করছে। রাজপুত্র উঠে সেই দিকে যাত্রা করলেন।

 রাজপুত্র পাহাড়ে উঠে দেখলেন এক প্রকাণ্ড রাজপুরী শঙ্খে গড়া। শঙ্খের দরজা শঙ্খের জান্লা‌ শঙ্খের ঘর শঙ্খের দেয়াল শঙ্খের সিঁড়ি, আগাগোড়া শঙ্খে গড়া। কিন্তু জনপ্রাণী শূন্য। শঙ্খের প্রকাণ্ড সিংহদরজা খোলা, শাস্ত্রী নেই প্রহরী নেই, নবৎখানায় রসুনচৌকি নেই। রাজপুত্র সিংহদ্বার দিয়ে প্রবেশ করে’ অশ্বশালে গেলেন। দেখলেন অশ্বশালে অশ্ব নেই, অশ্বপাল নেই, সব শূন্য। সেইখানে আপন ঘোড়া বেঁধে দানা-জল দিয়ে রাজপুত্র রাজপ্রাসাদে গিয়ে প্রবেশ করলেন।

 রাজপ্রাসাদে জনপ্রাণী বলতে কেউ নেই। চারিদিকে থম্ থম্ করছে। শঙ্খে—গড়া প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড থামে জ্যোছনা পড়ে চক্‌ চক্‌ করছে, খোলা জান্লা‌ দিয়ে জ্যোছনা এসে শঙ্খ,—গড়া মেঝেতে পড়ে’ তা ধব্ ধব্ করছে। মহলে মহলে জ্যোছনার আলো আর ঘরের ছায়া জড়িয়ে চারদিক যেন আরও নিবিড় আরও গভীর হয়ে উঠেছে। রাজপুত্র এ ঘর থেকে সে—ঘর, এ—কক্ষ থেকে সে—কক্ষ, এ—মহল থেকে সে—মহল করে’ ফিরলেন। কোথাও একটু মানুষের ভাঁজ নেই। যেন সাগর—পারের কোন্ মায়াবিনী সাগর বুকের কোটি শঙ্খ কুড়িয়ে অমনি অমনি এক রাজপুরী তৈরী করে’ রেখেছে।

 শাদা ধব্‌ ধবে শঙ্খের সিঁড়ি। তাই বেয়ে রাজপুত্র দ্বিতলে উঠলেন। কক্ষে কক্ষে কত আসবাব—পত্র। শয়ন কক্ষে শঙ্খের পালঙ্ক পাতা, ভোজন কক্ষে শঙ্খের গালিচা বিছানো, স্নানের ঘরে সব আড়—দেওয়া শঙ্খের চৌবাচ্চা, কেবল জনপ্রাণী বলতে কেউ নেই। আর সার সার শঙ্খের পিজরে ঝুলছে সব শূন্য, একটায়ও পাখী নেই। সার দেওয়া টিয়েপাখীর দাঁড় ঝলছে, সব শূন্য একটা টিয়ে নেই। এমনি সুন্দর সে রাজপুরী আর এমনি নিস্তব্ধ, যেন তা এক পরমা সুন্দরী রাজকন্যা কিন্তু রূপোর কাঠি ছোঁয়ান। কোথায় সে সোণার কাঠি যে কাঠিতে রাজকন্যা জাগবে। কোন্ সে রাজপুত্র যে সোণার কাঠি খুঁজে আনবে! রাজপুত্র এ—ঘর ও—ঘর আর কত করবেন, তাঁর দু’পা ধরে’ গেল। ক্লান্ত দেহে তখন তিনি গিয়ে একটা পালঙ্কে বসে’ পড়লেন। অমনি যেন পালঙ্ক ধীরে ধীরে দুলতে লাগল রাজপুত্রের চোখ বুঁজে বুঁজে আসতে লাগল। চারিদিকে গম্ভীর নিস্তব্ধতা, আর মধ্যে রাজপুত্র যেন কেবল শুনতে লাগলেন—

দুল্‌বি ওরে দুল্‌বি যদি আমার সুনীল দোলাতে—

 শুনতে শুনতে পালঙ্কের উপরে রাজপুত্র একেবারে বেঘোরে ঘুমিয়ে পড়লেন।

(৩)

 তার পরদিন রাজপুত্রের যখন ঘুম ভাঙল তখন সূর্য্যদেব সমুদ্রের নীল বুক থেকে একটুকু কেবল মাথা তুলেছেন, ঘুমের জড়িমা তখনও তাঁর চোখ থেকে যায় নি, লম্পট সেই ঢুলু ঢুলু নেত্রেই ঊর্মিমালাদের গায়ে গায়ে সোণালি সোহাগ ঢেলে দিয়েছেন! দু’ একটা অশান্ত রশ্মি তাঁর চোখ থেকে ছুট দিয়ে একেবারে রাজপ্রাসাদের উঁচু চূড়াতে গিয়ে চড়ে বসেছে। রাজপুত্র চোখ মেলেই দেখেন তাঁর পালঙ্কের পাশে দাঁড়িয়ে এক পরমা সুন্দরী বালিকা।

 পরমা সুন্দরী! জ্যোস্নাবরণ তার রঙ, সোনার বরণ তার চুল, আকাশবরণ তার চোখ। সে রঙে চারিদিক উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, সে চুল একেবারে হাঁটুতে এসে পড়েছে, সে চোখে আকাশের বুকের মত প্রশান্ত আর সাগরের বুকের মত গভীর দৃষ্টি, রক্ত কমলের মত দু’খানি হাত, পা দেখা যায় না, কটিদেশ থেকে সাগরবরণ একটা ঘাঘ্‌রা নেমে পা দুটি ঢেকে একেবারে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, সারা দেহে আর দ্বিতীয় বস্ত্র নেই, সব অনাবৃত। দুটি হাতে দুখানি মুক্তা বসান শঙ্খের কাঁকন—আর দ্বিতীয় অলঙ্কার নেই।

 রাজপুত্র বিস্মিত হয়ে পালঙ্কের উপরে উঠে বসলেন, প্রশংসার আলোকে তাঁর দুটি চোখ উজ্জ্বল হ’য়ে উঠল। রাজপুত্র বালিকার দিকে কতক্ষণ চেয়েই রইলেন, মনে মনে বললেন, এমন ত কখন ও দেখিনি। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “বালা তুমি কে? তোমা আমি ভালবাসব।”

 অমনি নবৎখানায় রসুনচৌকি বেজে উঠল। রাজপুত্র আশ্চর্য্য হত’য়ে বললেন—“একি! রসুনচৌকি বাজে কোথা থেকে, কাল যে সব শূন্য ছিল!”

 বালিকা বললে—“আজ যে আমি এসেছি!”

 অমনি হাজার পাখীর সুমিষ্ট কাকলি জেগে উঠল। রাজকুমার বিস্মিত হ’য়ে বললেন—“একি! এত পাখী ডাকে কোথা থেকে, পিঁজরে যে সব শূন্য ছিল!”

 বালিকা তেমনি উত্তর দিলে—“আমি যে আজ এসেছি!”

 অমনি হাতীশালে হাজার হাতী বৃংহতিনাদ করে উঠল, ঘোড়শালে লক্ষ ঘোড়া চিঁহিঁহিঁ করে উঠল। রাজপুত্র চমৎকৃত হয়ে বললেন——“এত হাতী এত ঘোড়া এল কোথা থেকে, কাল ত কিছুই ছিল না?”

 বালিকা আবার তেমনি উত্তর করলে——“রাজকুমার, আজ যে আমি এসেছি!”

 রাজপুত্র ছুটে ঘর থেকে বেরুলেন। দেখলেন বারান্দায় সার সার পিঁজরেতে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখী উড়ছে, নাচছে, গাচ্ছে, ডানা নাড়ছে, গা ঠোকরাচ্ছে। রাজপুত্র নীচে নামলেন। কোথায় সে নিস্তব্ধ পুরী। চারিদিকে লোকজনে একেবারে গম্ গম্ করছে। দাস দাসী শাস্ত্রী প্রহরী দৌবারিক প্রতিহারী যেন মুহূর্ত্তে কোন্ সোনার কাঠির স্পর্শে সব জেগে উঠেছে। দরজায় দরজায় শাস্ত্রীরা সসম্ভ্রমে অভিবাদন করে’ রাজপুত্রের পথ ছেড়ে দিলে। রাজপুত্র হাতীশালে গিয়ে দেখেন হাজার হাতী হাজার মাহুত। ঘোড়াশালে গিয়ে দেখেন লক্ষ ঘোড়া লক্ষ সোয়ার। রাজপুত্র তেমনি ছুটে আবার উপরে উঠলেন। বালিকাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন——“তুমি কে?”

 বালিকা একটু মৃদু হাসলে। যেন রক্তকমলের ন্যায় দুটি পাঁপড়ির ফাঁকে এক সার ঘন বিন্যস্ত যূথীর কলি জেগে উঠল। বালিকা হেসে বললে——“আমার নাম প্রেম।”

 “প্রেম?——বড় ত সুন্দর!” রাজপুত্র প্রেমের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সে নীল চোখে কি এক গভীর দৃষ্টি, তার তলই পাওয়া যায় না। সে-দৃষ্টিতে রাজপুত্র যেন একেবারে হারিয়ে গেলেন। বললেন—“প্রেম, আমি তোমায় ভালবাসি——আমাকে ভালবাসবে?”

 প্রেম উত্তর দিলে——“রাজকুমার, আমাকে যে ভালবাসে আমিও তাকে ভালবাসি।

 রাজপুত্রের বুকের কাছটায় যেন কি একটা ফেটে গিয়ে তার ভিতরকার রঙীন স্রোত তাঁর সমস্ত শিরায় উপশিরায় চারিয়ে গেল, তারি নেশায় তাঁর দেহের প্রত্যেক অণু পরমাণু নেচে উঠল। ওরে মুর্খ, ওরে নির্ব্বোধ! ব্যর্থতা কোথায়?—— সাতমহলা পুরীতে নয়, দ্বারে দ্বারে দ্বারীতে নয়, খেতে শুতে দণ্ড প্রহর জানানোতে নয়, সাত শ’ লোকের হৈ হৈ রৈ রৈ—তে নয়——আছে তা কেবল হৃদয়ের সুন্দরহীনতায়, আছে তা কেবল জীবনের জডত্বে। এই ত আজ সাতমহলা পুরী, দ্বারে দ্বারে দ্বারী, তবে এর দেয়াল এমন রঙীন হয়ে উঠল কেন?——অন্তরের ঐ আগুন লেগে রে নির্ব্বোধ! শিরায় উপশিরায় ঐ নেশা লেগে। রাজপুত্র বললেন——“প্রেম, যদি তোমায় পেতেম তবে আমার নিজ রাজ্য ছেড়ে আসতেম না।”

 প্রেম জিজ্ঞেস করল——“তোমার নিজ রাজ্য? সে কোথায় রাজকুমার?”

 দু’জনে গিয়ে পালঙ্কে বসল। তারপর রাজপুত্র আপনার কাহিনী বলতে শুরু করলেন। কেমন করে’ তাঁর সংসারে বিতৃষ্ণা জন্মিল, কেমন করে’ পিতার ইচ্ছা, মন্ত্রীর অনুরোধ, মায়ের চখের জল, প্রজামগুলীর অনুরাগ, সমস্ত উপেক্ষা করে’ তিনি রাজা ছেড়ে চলে’ এলেন। তারপর কত রাজ্যের ভিতর দিয়ে দিন নেই রাত নেই নিদ্রা নেই, আহার নেই, ক্লান্তি নেই, শ্রান্তি নেই——তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে রাত দিন কেবল ভ্রমণ করেই বেড়ালেন। তারপর অবশেষে কেমন করে’ এই শঙ্খের রাজপুরীতে এসে পৌঁছিলেন, রাজপুত্র অনর্গল কথা বলে’ যেতে লাগলেন যে, সে কত গল্প, তাঁর মুখ দিয়ে যেন গল্পের স্রোত বেরিয়ে আসতে লাগল। কোন্ দিক দিয়ে দিন কেটে গেল। সূর্য্য সারা আকাশ দিয়ে গড়িয়ে গিয়ে পশ্চিম সমুদ্রে ঝুপ করে’ ডুব দিলেন, পশ্চিম আকাশে সোনালি আবির উড়তে লাগল, নবৎখানায় পূরবী রাগিনি বেজে উঠল, ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এল, রাজপুরীর লক্ষ কক্ষে লক্ষ দীপ জ্বলে উঠল প্রেম পালঙ্ক থেকে চম্কে নেমে দাঁড়াল, বলল——“রাজকুমার, আমার যাবার সময় হ’ল আজ তবে আসি।”

 ——“আজ তবে আসি? সে কি প্রেম! সে কি প্রেম!”——রাজপুত্র ব্যথিত আকুল কণ্ঠে বললেন——“তুমি এই যে বললে আমায় ভাল বাসবে, তবে আবার কোথায় যাবে?”

 প্রেম বললে——রাজকুমার, আমাকে এখন নিজ ঘরে ফিরতে হবে, কাল আবার আসব।”

 রাজপুত্র আশ্চর্য্য হয়ে বললেন——“তোমার নিজ ঘর!——সে আবার কেথায়? আমি যে মনে করেছিলেম তুমি এই রাজপুরীরই রাজকন্যা, কাল কোথায় কোন্ মহলে লুকিয়ে ছিলে।”

 প্রেম উত্তর করলে——“না রাজকুমার আমি রাজপুরীর রাজকন্যা নই। আমার ঘর ঐ ওখানে——সাগরবুকে।” বালিকা আঙুল দিয়ে বাতায়নের ফাঁকে দেখিয়ে দিলে সমুদ্র।

 রাজপুত্র অমনি ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে সমুদ্রের ধারের ছাদে গেলেন। ছাদের আলসেতে কনুই রেখে যতদূর দৃষ্টি চলে তাঁর সামনে ডানে বায়ে দেখতে লাগলেন। দেখলেন কেবল জল আর, জল, আর জল। রাজপুত্র ফিরে এসে প্রেমকে বললেন——“কই সাগর বুকে ত কোন ঘর বাড়ীর চিহ্ন নেই।”

 প্রেম বললে “সাগরবুকের উপরে নেই তার নীচে আছে। কুমার, আমার ঘর সাগরবুকের যেখানে প্রায় অতল সেইখানে। যেখানে সাগরবুকের ঊর্ম্মিবালারা তাদের নৃত্যে নৃত্যে আকাশের আলোক আর বাতাস মিশিয়ে আমার ঘর তৈরি করে দিয়েছে, সেইখানে আমি থাকি।”

 রাজপুত্র বিস্ময়ে সংশয়ে কতক্ষণ চুপ করেই রইলেন। তারপর বললেন, “প্রেম, কাল আসবে ত?”

 প্রেম উত্তর দিলে——“আসব বই কি রাজকুমার——নিশ্চয়ই আসব।

 —“আচ্ছা তবে এসো।”

 বালিকা রাজপুরী ত্যাগ করে’ চলে গেল।

 রাজকুমার গিয়ে পালঙ্কে বসলেন। তাঁর সমস্ত অঙ্গ—প্রত্যঙ্গে পুলক খেলে বেড়াতে লাগল। দু’—বছরের দেশ—বিদেশে ভ্রমণ তাঁর, আজ সে কত দূর। আর আজ এই রাজপুরী তাঁর ছেড়ে যাবার উপায়ই সেই। আজ তিনি শৃঙ্খলাবদ্ধ। কিন্তু সে শৃঙ্খল, সে কি হালকা! কেবলই হালকা, না তার চাইতেও বেশি, সে কি তৃপ্তির কি শান্তির, সে কি সার্থক! এই শৃঙ্খলে আজ তাঁর এ কী মুক্তি! বাইরের দু’ বছরের তাঁর স্বাধীনতার মুক্তি, কেবল শূন্যের বোঝায় সে কী ভারাক্রান্ত! কী অশান্ত! আর আজ এই শৃঙ্খলে মুক্তি ঐশ্বর্য্যে সে কী সম্পদময়, কী শান্তিপূর্ণ!

 রাজপুত্র স্বপ্নে কেবল বালিকাকেই দেখতে লাগলেন, তার আকাশ—বরণ চোখ——সে চোখের সাগর—গভীর দৃষ্টি।

(৪)

 দু’ বছর কেটে গেল। রোজ সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে প্রেম তার জ্যোছনা—বরণ রঙ, সোনার—বরণ চুল, আকাশ—বরণ চোখ, সাগর—বরণ ঘাঘরা নিয়ে রাজপুরীতে উপস্থিত হয়। রাজপুত্রের সঙ্গে গল্পে—গানে সারা দিন কাটীয়ে আবার সূর্য্য—ডোবার সঙ্গে সঙ্গে চলে’ যায়। দুটি বছরের প্রত্যেক দিনটি ঠিক একই ভাবে কেটে গেল। সেই একই রাজপুরী, মহলে মহলে একই দাসদাসী, তাদের একই আনাগোনা, দেউড়ীতে দেউড়ীতে একই শাস্ত্রী প্রহরী, এদের একই সোর—গোল, নহবতে নহবতে একই রসুনচৌকি, তার ভোর—দুপুর সন্ধ্যায় একই সুর, সেই সবই এক, কেবল এক যা’ রইল না সে হচ্ছে রাজপুত্র নিজে।

 সেই সাতমহলা পুরীতে রাজপুত্র আর এক রইলেন না! দু’বছর আগে যখন তাঁর প্রেমের সঙ্গে দেখা হয় তখন কি তৃপ্তিতেই তাঁর অন্তরাত্মা ভরে’ গিয়েছিল, কি আনন্দের আলোকেই তাঁর চোখ দু’টি উজ্জ্বল হ’য়ে উঠেছিল, কি শান্তিতেই তাঁর অস্তিত্ব জুড়িয়ে গিয়েছিল। আর আজ, আজ তাঁর অন্তরাত্মার এ কি আসোয়াস্তি, তাঁর চোখ দু’টিতে কি এক জ্বালা, কি এক বিরাট রাক্ষসী ক্ষুধার অবলেপ, এ কি নিবিড় ব্যথা! রাজপুত্রের চোখ দুটি তার সমস্ত জ্বালা নিয়ে প্রেমের মুখ থেকে ধীরে ধীরে নেমে তার বুকে গিয়ে নিবদ্ধ হ’ল। আঃ ঐ যে ঐ বুকের উপরে ঠিক তাঁরই হাতের মাপে মাপে দুটি পদ্মের কলি কে জাগিয়ে তুলছে। ঐ যে’ সেই পদ্মকোরক দু’টির শীর্ষদেশটায় লালচে আভা, তা বুঝি তাঁরই হৃদয় শোণিতের অবলেপ।

 ছিলে গো ছিলে, প্রেম! তুমি একদিন অতি সুকুমার ছিলে, আমি একদিন অতি কিশোর ছিলেম, সেদিন আমাদের মিলন ছিল একটু হাসির মিলন, একটি দৃষ্টি বিনিময়ের মিলন। আজ এ প্রদীপ্ত যৌবনে সে অল্পে সুখ কোথায়, তৃপ্তি কোথায়, আনন্দ কোথায়? এ যৌবনের উন্মত্ততাকে কি দিয়ে শান্ত করবে প্রেম? একটি দৃষ্টি দিয়ে? দু’টো কথা দিয়ে? একটুকু হাসি দিয়ে?——সে স্বল্পতাকে জীবন যে কখন ছাড়িয়ে গেছে!

 না, না প্রেম! আজ আমি চাই তোমার নিবিড়তম আলিঙ্গন। তোমার কথা, তোমার গান, সে যে আজ কত ব্যবধানের। আজ চাই তোমার ঐ দেহ—বল্লরী আমার এই বিশাল বুকের উপরে পিষ্ট হ’য়ে যাবে, তোমার হাসি তোমার দৃষ্টি, সে যে আজ কত স্বল্পতার! বুকে বুকে মুখে মুখে চোখে চোখে দেহের প্রত্যেক অণুতে অণুতে আজ মিলন, আজ বিনিময়——তবেই আজ তৃপ্তি, তবেই আজ আমার এ আত্মার বিদ্রোহের শান্তি। আমার এ রাক্ষসী ক্ষুধার কাছ থেকে কি দিয়ে অত্মরক্ষা করবে প্রেম? কি দিয়ে? আমি চাই এর চাইতে কোন্ আর তোমার বড় সত্য আছে প্রেম? কোন্ বড়? আমি চাই——কেবল অশরীরী তোমাকে নয়, তোমার দেহের প্রত্যেক অণুটির জন্যে আজ আমার দেহের প্রত্যেক অণুটি উন্মাদ। এ উন্মাদকে কি দিয়ে ঠেকাবে? এ উন্মাদকে কিসের সান্ত্বনা দেবে? একটু হাসির? একটু গানের?——পাগল!

 সূর্য্য ডুবে গেল, নবৎখানায় পূরবী রাগিনী বেজে উঠল, হাজার কক্ষে হাজার দীপ জ্বলে’ উঠল। প্রেম পালঙ্ক থেকে নামতেই রাজপুত্র উঠে দাঁড়িয়ে বললেন——“প্রেম! একদিন ও কি আমার এই রাজপুরীতে রাত্রিযাপন করবে না? অমরত্বকে কি চিরকাল এড়িয়ে চলবে?”

 প্রেম চমকে উঠল, তার শঙ্খের মত কান দুটো গোলাপের মত লাল হ’য়ে উঠল, গোলাপের মত গণ্ড দুটি শঙ্খের মত সাদা হয়ে গেল, শুকনো চোখ সজল হয়ে এলো, সরস ঠোঁট শুকনো হয়ে গেল। প্রেম তার দৃষ্টি রাজপুত্রের চোখের উপরে স্থাপিত করে’ বললে——“রাজকুমার, তোমার জন্যে আমি জীবন দিতে পারি কিন্তু এখানে রাত্রিবাসের আমার উপায় নেই।”

 রাজপুত্র দেখলেন প্রেমের চোখ দুটিতে কি এক দৃষ্টি, সে দৃষ্টিতে কি এক নীরব মিনতি, কি এক করুণ ভর্ৎসনা। রাজপুত্র সে দৃষ্টি সহ্য করতে পারলেন না। তাঁর দৃষ্টি অবনত হ’য়ে গেল। রাজপুত্র যখন চোখ তুললেন তখন দেখলেন তিনি একা। প্রেম কখন চলে গিয়েছে।  রাজপুত্রের অন্তরে যেন সহস্র শার্দুল গর্জ্জে উঠল, লক্ষ ফণী ফণা বিস্তার করে’ রক্ত চক্ষু মেলে দিল। অত্যাচার, অত্যাচার, আমি এ অত্যাচার সহ করব না। আমি চাই চাই—ই প্রেমকে, আরও কাছেআরও কাছে, আরও কাছে। এ চাওয়াকে চিরকাল ব্যর্থ হতে দেব না।

 রাজপুত্র ডাকলেন—“প্রতিহারী, প্রতিহারী।”

 প্রতিহারী ত্রস্তে এসে অভিবাদন করে দাঁড়াল। রাজপুত্র খানিকক্ষণ শির নত করে’ কি চিন্তা করলেন তারপর মাথা তুলে বললেন—“আচ্ছা তুমি যাও।”

 রাজপুত্র সেদিন সারারাত পিঞ্জরাবদ্ধ শার্দ্দুলের মত পায়চারি করে বেড়ালেন।

 পরদিন সূর্য্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন প্রেম এলো তখন রাজপুত্র তাকিয়ে দেখলেন, সে কি সুন্দর, কি স্নিগ্ধ, কি কোমল। যেন শিশির—ভেজা সদ্যফোটা পদ্মটি, সে পদ্মের পাঁপ্ড়িতে পাঁপ্ড়িতে হাসি, সে হাসির অন্তরালে অন্তরালে আমন্ত্রণ। এ কি সত্য সত্যই আমন্ত্রণ, না শুধু তাঁর নিজের প্রাণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিবিম্ব?

 দিন কেটে গেল, সূর্য্যদেব পাটে বসলেন। নবৎখানায় পূরবী রাগিনী বেজে উঠল, কক্ষে কক্ষে লক্ষ দীপ জ্বলে উঠল, প্রেম পালঙ্ক থেকে নেমে বললে—“কুমার, তবে আজ আসি।”

 রাজপুত্র উঠে দাঁড়ালেন, তারপর দুই বাহু তাঁর বুকের উপরে ন্যস্ত করে বললেন—“প্রেম! আমার আদেশে আজ পুরীর সিংহদ্বার রুদ্ধ, আমার আদেশ ব্যতীত তা খুলবে না।”  অমনি নহবৎখানার রাগ—আলাপ থমকে গেল, পাখীদের কাকলীরব স্তব্ধ হ’য়ে গেল, কক্ষে কক্ষে দীপশিখা সব স্থির নিস্পন্দ হ’য়ে গেল। সমস্ত রাজপুরীটার প্রত্যেক বস্তুটি যেন কান খাড়া করে’ সজাগ হ’য়ে উঠল।

 কক্ষতলে দু’জনে দাঁড়িয়ে রইলেন। কারো মুখে একটি কথা নেই। নিমেষের পর নিমেষ কেটে যেতে লাগল। পূর্ণিমার চাঁদ আকাশের অনেক পথ উঠে উর্ম্মিবালাদের গায়ে রূপোর বসন জড়িয়ে দিল। প্রেম বললে—“রাজকুমার, আমার মুক্তি দাও।”

 রাজকুমার উচ্ছসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন—“প্রেম, প্রেম, যদি আমার অন্তরের তীব্র দাহ বুঝতে পারতে, যদি জানতে কেমন করে আমার হৃদ্পিণ্ডের পরতে পরতে সূক্ষ শৃঙ্খল কেটে বসেছে, যদি জানতে”——রাজপুত্রের উচ্ছসিত কণ্ঠ ক্রমে ক্রমে উম্মাদের মত হ’য়ে উঠল, তাঁর চোখ দুটি জ্বল জ্বল করতে লাগল, রাজপুত্র দুই বাহু বিস্তার করে’ গদ গদ কণ্ঠে বললেন——“প্রেম, প্রেম, এসো আজ সমস্ত দূরত্ব সমস্ত ব্যবধান নির্ব্বাসিত হোক!”

 প্রেম কেঁপে উঠল, পরমুহূঅর্ত্তে আপনাকে সংযত করে’ ছুটে পাশের দরজা দিয়ে সমুদ্রের দিক্‌কার ছাদের উপরে বেরিয়ে গেল।

 রাজপুত্র ক্ষুধিত শার্দ্দলের মত তার পিছনে পিছনে ছুটে বেরুলেন। প্রেম ছাদের আলিসাতে উঠতর—না—উঠতে বাম বাহু দিয়ে তার কটি আকর্ষণ করে’ আপনার বক্ষের উপর টেনে নিলেন, রাজপুত্রের দক্ষিণ হস্তের নিষ্ঠুরতার নীচে তার হৃদয়পদ্ম পিষিত হ’য়ে গেল, আর ঠোঁট দুখানির উপর রাজপুত্রের ঠোঁট দু’টি যেন একটি শেষ মৃত্যু—আলিঙ্গনে কঠিন হ’য়ে বসে’ গেল।

 সে চুম্বনে প্রেমের শিরায় শিরায় একটা তড়িৎ প্রবাহ উন্মাদের মত ছুটে গেল, তার অঙ্গ—প্রত্যঙ্গ থর থর করে কেঁপে উঠল, সে কম্পনে তার নীবিবন্ধের গ্রন্থি শিথিল হ’য়ে গেল, ঘাঘ্‌রা খস্ খস্ করে উঠল, তারপর সর সর করে’ তা প্রেমের কটিচ্যুত হয়ে খসে পড়ল।

 প্রেমের কণ্ঠ থেকে একটা নিদারুণ “ও” শব্দ রাজপুত্রকে যেন মুহূর্ত্তের জন্যে চেতনা ফিরে দিল, প্রেম দু’হাতে চরম শক্তি সংগ্রহ কর’ রাজপুত্রকে ঠেলে দিলে, তারপর দু’হাতে চোক মুখ ঢেকে শির অবনত করে’ দাঁড়িয়ে রইল।

 রাজপুত্র তখন দেখলেন তাঁর সামনে নগ্ন নারী মূর্ত্তিটিকে। দেখতে দেখতে, দেখতে দেখতে তাঁর সমস্ত দেহ স্থির নিশ্চল নিস্পন্দ হ’য়ে গেল, তাঁর চোখ দুটি ধীরে ধীরে, ধীরে ধীরে পাথরের মত কঠিন হ’য়ে উঠল।

 রাজপুত্র দেখলেন সেই নগ্ন মূর্ত্তিকে। দেখলেন মাথা থেকে কটি পর্য্যন্ত পরিপুষ্ট সুন্দর এক বালিকা মূর্ত্তি, আর কটি থেকে নেমেছে একটি নিটোল নিরেট শঙ্খাবৃত মৎসপুচ্ছ।

 প্রেম ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তারপর বিশ্বের বেদনার কণ্ঠ নিয়ে বললে—“রাজকুমার, আমি অর্দ্ধেক নারী অর্দ্ধেক মাছ, অর্দ্ধেক মানুষ অর্দ্ধেক পশু। আমার যে অংশ পশু সে অংশকে আমি অতি যত্নে তোমার কাছ থেকে গোপন করে’ রেখেছিলেম, সেই পশুকে আজ তুমি অনাবৃত করলে, আর আমার সাধ্য নেই তোমার জীবনে স্বর্গের পরশ ব’য়ে আনতে, আজ এইখানে আমাদের চির বিদায়।”

 রাজপুত্র স্তব্ধ হ’য়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। মৎস্যনারী ধীরে ধীরে আলিশার উপর উঠে আপনাকে নীচ সাগরে ছেড়ে দিল। মুহূর্ত্তে চাঁদের কিরণে মৎস্যপুচ্ছের আঁশগুলো চিক্‌মিকিয়ে উঠল, তারপর ঝুপ করে’ একটা শব্দ হল, মুষ্টিখানেক হীরকচূর্ণ চারিদিকে ছড়িয়ে গেল, এক নিমেষ তরে জলবুদবুদেরা পুঞ্জ বাঁধল, তারপর সাগরবুকের সেই চিরন্তনের গান—

দুল্‌বি ওরে দুল্‌বি যদি আমার সুনীল দোলাতে।—

 রাজপুত্র কাঁদতে কাঁদতে ছাদ থেকে ভিতরে ফিরলেন। ভিতরে এক পা ফেলতেই রাজপুত্র থম্‌কে দাঁড়ালেন। কোথায়, কোথায়? সে কক্ষে কক্ষে দীপের মালা, সে পিঞ্জরে পিঞ্জরে পাখী, দাঁড়ে দাঁড়ে টিয়ের দল! চারিদিকে নিস্তব্ধ নিঝুম, চারিদিকে আঁধার। রাজপুত্র ছুটে নীচে নামলেন, কোথায় সে দাস দাসী শাস্ত্রী প্রহরী দৌবারিক প্রতিহারী সব শূন্য, কোথায়ও একটি জনপ্রাণী নেই, রাজপুত্র গিয়ে দেখেন হাতীশালে একটি হাতী নেই একজন মাহুত নেই, ঘোড়াশালে একটি ঘোড়া নেই একজন শোয়ার নেই, নহবতে রসুনচৌকি নেই। রাজপুত্র রাজপ্রাসাদে ফিরে এলেন চারিদিক শূন্য নিঝুম, নিঝুম চাঁদের আলো থামের ফাঁকে ফাঁকে আড় হয়ে এসে মেঝেয় পড়ে চারিদিক আরও নিবিড় আরও গভীর করে’ তুলেছে। রাজপুত্র হাজার মণ পাথর পায়ে নিয়ে যেন ধীরে ধীরে অতি কষ্টে সিঁড়ি ভেঙে দ্বিতলে উঠলেন, তারপর পালঙ্কে গিয়ে আকুল হয়ে লুটিয়ে পড়লেন। তাঁর দীর্ঘ প্রকাও নিশ্বাসে নিশ্বাসে প্রকাণ্ড রাজপুরী থম্‌থমে হ’য়ে উঠল।