ইরাণী উপকথা/একটি সত্যি গল্প
একটা সত্যি গল্প।
উচ্ছল উদ্দাম পার্ব্বত্য ঝরণা হু হু শব্দে পাহাড়ের গা দিয়ে ছুটে চলেছে—যেন সে জানিয়ে দিতে চায় যে, এ জগতে গতির চাইতে বড় সত্য আর কিছু নেই। সেই ঝরণার ধারে একটুখানি সমতল জায়গার উপরে ছোট্ট একটি কুটীর—আর সেই কুটীরে বাস কর্ত এক তরুণ পাহাড়ি। তরুণ পাহাড়ির দিনমান কোনই কাজ ছিল না—সে তার কুটিরের চার পাশ বন্য গোলাপের গাছে গাছে ভরে’ তুলেছিল—বন্য গোলাপ আরও কত রকমের ফুল লতা পাতা দিয়ে তার কুটীর খানিকে কুঞ্জবনের মত করে তুলেছিল। দিনমান সে সেই ফুল লতা পাতার চর্চ্চা করেই কাটিয়ে দিত—কেবল সকাল বেলায় যখন প্রভাতী সূর্য্যের আলোর স্পর্শে পাহাড়ের গায়ের বরফ চিক্মিক্ করে’ উঠত তখন সে একবার সেই ঝরণাটির ধারে গিয়ে উপস্থিত হ’ত। সেখানে গিয়ে ঝরণার অপর দিকে বহুক্ষণ ধরে চেয়ে থাক্ত, যেন কার আসবার কথা আছে—যেন সে কার অপেক্ষায় সেখানে কুটীর বেঁধে রয়েছে। কিন্তু সারাবেলা দেখে দেখে যখন মাথার উপরে উঁচু পাহাড়ের বরফের সোনালি রঙ্ চলে’ গিয়ে তা রূপোলি রঙে ঝিক্ ঝিক্ করে’ উঠ্ত তখন সে একটা দীর্ঘ—নিশ্বাস ফেলে কুটীরে ফিরে আস্ত—আবার ফুলগাছগুলোর তত্ত্বাবধান, পরিচর্য্যা কর্ত।
এমনি করে কিছু দিন কেটে গেল! একদিন তাকে আর অমনি ফিরে অস্তে হ’ল না। সে ঝরণার ধারে গিয়ে দেখলে যে অপর পারে একটা পাথরের উপরে চুপ করে’ বসে রয়েছে এক সুন্দরী তরুণী, যেন পাষাণ ফেটে পদ্মফুল ফুটেছে!
মুহূর্ত্তে পাহাড়িকে কে যেন বলে’ দিয়ে গেল যে এ সেই—যার অপেক্ষার সে প্রতিদিন ঘুরে বেড়াত। মুহূর্ত্তে পাহাড়ির অন্তরটা সার্থকতায় ভরে’ উঠ্ল—তার চোখে পলক পড়্ল না— অনিমেষ নয়নে সে দেখতে লাগল সেই সুন্দরী আপরিচিতা তরুণীকে।
অচেনা? আচেনা ত বটেই; কিন্তু তার মত চেনা ত আর কেউ নেই—আর কিছু নেই। বর্যে বর্যে দিনে দিনে পলে পলে তারই অন্তরের সঙ্গে সঙ্গে যে সে গড়ে’ উঠেছে—তারই আনন্দের ভিতর দিয়েই যে তরুণীর সঙ্গে তার পরিচয়। এ পরিচয় ত এক দিনের নয়—এক কালের নয়—এ পরিচয় যে বহু দিনের, বহু কালের—কত জন্মের। অচেনাই বটে—কিন্তু অতি অন্তরতম।
পাহাড়ি জিজ্ঞেস করল—“ওগো তরুণি, তোমার নামটি কি? তুমি আসছ কোথা থেকে?”
তরুণী উত্তর দিলে—“নাম আমার তরুণী—আস্ছি আমি বহুদিন হ’তে—বহুদূর থেকে।”
“বহুদিন হ’তে?—তবে ত তুমিই সেই—যার অপেক্ষায় আমি এতদিন কাটিয়েছি। বহুদূর থেকে!—তাই বুঝি আমি দিগন্তের কোলে কোলে তোমারই পায়ের নূপুরের গুঞ্জন শুন্তে পেতুম—ঐ দূর বনান্তরাল থেকে যে বাতাস বয়ে’ আস্ত তাতে তোমারই কুন্তলের সুরভী—ঘ্রাণ পেতুম—ঐ উদ্ধে বহুদূরে সুনীল গগনে তোমারই নীল নয়নের অসীম দৃষ্টির গভীরতা আমার চোখে ধরা পড়্ত। তবে ত তুমিই সেই—তবে ত তুমি আমার—ই। ওগো তরুণি, আমাদের মিলন হবে কেমন করে? ওপার ছেড়ে এ পারে আস্বে না কি?”
“তোমার নামটী কি?”
“নাম আমার কল্পশেখর।”
“কল্পশেখর, তোমার সাধ্য কি আমায় ধরে’ রাখবে তোমার ঐ ছোট্ট কুটীরে—তোমার ঐ ছোট্ট কুটীরে ত আমার জায়গা হবে না। আর এই খরস্রোতা নির্ঝরিণীকেই বা আমি পেরিয়ে যাব কেমন করে—এ স্রোত যে মত্ত—মাতঙ্গকেও ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তার চাইতে কল্পশেখর, তুমিই এধারে এস। ওধারে ঐ কুটার তোমার গণ্ডী। কিন্তু এধারে ত কোন গণ্ডী নেই—এধারে দিগন্তের আলো, দিগন্তের বাতাস। সার দিয়ে ঐ যে পাহাড়ের পর পাহাড় অনন্ত যুগ ধরে’ মৌন হ’য়ে দাঁড়িয়ে আছে—সেই অনন্ত যুগের স্বপ্ন এধারে। ঐ অনন্ত যুগের স্বপ্ন নিয়ে অনন্ত যুগের সাক্ষী হ’য়ে যে পাহাড়গুলো দাঁড়িয়ে আছে তার আশে পাশে ভিতরে বাহিরে উপরে নীচে কত পথ কত অপথ—কত উপত্যকা আধিত্যকা—কত অসমাপ্তি। এই পথ অ—পথ ধরে’ উপত্যকা অধিতাকার ভিতর দিয়ে এই অসমাপ্তির দিকেই আমরা যাত্রা করব্, কল্পশেখর—তুমিই ওধার ত্যাগ করে এধারে এস না।”
“তবে তাই আস্ব তরুণী।”
কল্পশেখর জলে নামল। তৎক্ষণাৎ অনুভব করলে যে তাকে নিঝরিণীর খরস্রোত কোথায় নিয়ে গিয়ে ফেলবে। কল্পশেখর তাড়াতাড়ি জল ছেড়ে উঠে নির্ঝরিণীর তটে দাঁড়ালে। সাধ্য কি মানুষের এই খরস্রোতা অগভীর নির্ঝরিণী পায়ে হেঁটে পার হয়।
কল্পশেখর বল্লে —“শোনো তরুণী, মানুষের সাধ্য নেই এই খরস্রোতা নির্ঝরিণী হেঁটে পার হয়। শোনো, আমরা দুজনে এই ঝরণা ধরে’ উজানের দিকে চলে যাই। যেখানে এর পরিসব স্বল্প হবে সেখানে এটাকে আমি ডিঙ্গিয়ে যাব।” তরুণী বল্লে——“আচ্ছা চল।”
দু’জনে দু’পার দিয়ে ঝরণার উজানে যাত্রা করল।
দু’জনে ধীরে ধীরে চল্তে লাগ্ল। ধীরে ধীরে সোনালি সূর্য্য পূব গগনে উঠে মাঝ গগনে গিয়ে পড়ল—আবার সেখান থেকে ক্লান্ত দেহে রাঙ্গা মুখে পশ্চিমে ঢলে’ পড়ল, কিন্ত,ঝরণা তেমনি হুহু শব্দে ছুটে চলেছে, কোনখানেই তার পরিসর এমন সঙ্কীর্ণ হয় নি যে, কল্পশেখর তা ডিঙ্গেয়ে যেতে পারে। সন্ধ্যা যখন তার কাজল আঁখি নিয়ে, তার কালো আঁচল আকাশে উড়িয়ে প্রকৃতিকে নিস্তব্ধ হ’তে ইঙ্গিত কর্ল তখন তরুণী ব্যাথিত কণ্ঠে ডক্ল—“কল্পশেখর।”
“কি?”
“আর ত আমি হাঁট্তে পারিনা, কল্পশেখর।”
কল্পশেখর বল্লে—“তবে আজকার মত আমাদের যাত্রা শেষ। শোনো তরুণী, এইখানে আমরা দু’জনে রাত কাটাব। তারপর প্রভাত হ’লে আবার চল্ব।”
তারা সেইখানে নির্ঝরিণীর দু’ধারে দুজনে শ্রান্ত দেহে বসে পড়ল, দু’জন দু’জনের দিকে চেয়ে রইল। চারিদিকের স্তব্ধতার বুক চিরে হুহু শব্দে উদ্দাম উচ্ছল ঝরণা তাদের দুজনার মাঝ দিয়ে একটা অনন্ত বাধার মতো অক্লান্ত বেগে ছুটে চল্ল।
ধীরে ধীরে চারিদিকে আঁধার নিবিড় হয়ে এল, সুন্দরীর নীলাঞ্চলে চুম্কির মতো, নীলাকাশে লক্ষ তারা জ্বল্ জ্বল্ করে’ উঠল। কৌতূহলী হয়ে বুঝি তারা মুখর ঝরণার দু’পাশে এই দুটী মৌন প্রাণীকে দেখ্তে লাগল। কি চায় এরা? কোন মরীচিকার পিছনে ছুটে চলেছে এরা? পরিণাম কি হবে এদের? তাই বুঝি তারা পরস্পরের মাঝে বলাবলি করতে লাগ্ল।
তার পরদিন প্রভাত হলে তারা আবার চল্তে লাগ্ল— কিন্তু যেমন ঝরণা তেমনি, কোথাও একটু সংকীর্ণ হয় নি, কোথাও তার গতিবেগ একটু মন্দ হয় নি—এ যেন অনন্ত কালের পথে অনাদি কাল থেকে ছুটে চলেছে। তারা জ্বল্ জ্বল্ করে উঠল। আবার সন্ধ্যা হল আবার নীলাকাশে লক্ষ আবার তারা বিশ্রাম করতে বল।
পরদিন প্রভাতে আবার তারা চলতে লাগল, তার পরদিন—তার পর দিন, এমনি করে তারা চল্তেই লাগ্ল। যতই তাদের আশা ব্যর্থ হচ্ছিল—ততই তাদের আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে উঠ্ছিল যতই তাদের আকাঙ্ক্ষা প্রবল হচ্ছিল ততই তাদের উৎসাহ উদ্যম অদম্য হয়ে উঠ্ছিল। এমনি করে কত দিনের পর রাত, রাতের পর দিন কত উপত্যকা অধিত্যকা অতিক্রম করে, কত পর্ব্বচূড়া প্রদক্ষিণ করে তারা সেই পার্ব্বত ঝরণার উজানে চল্ল। কিন্তু সে ঝরণার কোন পরিবর্ত্তন নেই—একই গতি, একই পরিসর, কোথায়ও এমন অবসর নেই যেখানে কল্পশেখর তা ডিঙ্গিয়ে যেতে পাৱে, সাহস করে উল্লম্ফনের চেষ্টা কর্তে পারে! এমনি করে পাঁচটী বৎসর কেটে গেল।
সেদিনও তারা চলছিল, হঠাৎ নির্ঝরিণীর হুহু শব্দকে ডুবিয়ে ছাপিয়ে এক বিশাল গর্জ্জন তাদের কানে এসে বাজল। যেন সহস্র প্রভঞ্জন এ সৃষ্টিকে ছিঁড়ে ফেলবার জন্যে সহস্র দিকে একসঙ্গে ছুটেছে—যেন সপ্ত সিন্ধুর লক্ষ উর্ম্মি সহসা ক্ষিপ্ত হয়ে একসঙ্গে পৃথিবীর পায়ে এসে মাথা খুঁড়ছে। কল্পশেখর একটু থেমে তরুণীকে বল্লে—“তরুণি শুন্ছ?”
“শুন্ছি।”
“কিসের শব্দ এ?”
“বুঝি মহাপ্রলয়ের?”
“অগ্রসর হবার সাহস আছে?”
“তুমি যেখানে যাবে সেখানে আমার ভয় নেই।”
“তবে চল।”
দুজনে আবার চল্তে লাগল। তারা যতই অগ্রসর হতে লাগ্ল ততই সে গর্জ্জন প্রবল হতে প্রবলতর হয়ে উঠ্তে লাগ্ল। অবশেষে তারা সেই বিশাল গর্জ্জনের কারণ আবিষ্কার কর্ল। সঙ্গে সঙ্গে তাদের চলাও বন্ধ হল। কিন্তু হায় তাদের যাত্রা শেষ হল না?
তারা যেখানটায় এসে পড়্ল সেখানে তাদের, সাম্নে বিশাল প্রাচীরের মত এক খাড়া পাহাড় আপনার মাথা তুলে রয়েছে—একেবারে খাড়া—দক্ষিণে বামে যতদূর দৃষ্টি চলে, ততদূর এই খাড়া পাহাড়। উপরে তাকিয়ে তার উচ্চতার শেষ দেখা যায় না। যেন বিশ্বকর্ম্মা পৃথিবীর সকল কৌতূহলের, সকল আশা-আকাঙ্ক্ষার বাধা স্বরূপ যোজন—দীর্ঘ যোজন—উচ্চ এক খাড়া প্রাচীর তৈরী করে এখানে বসিয়ে দিয়েছেন। পৃথিবীর মানুষের এখানেই গতির শেষ—আর অগ্রসর হবার উপায় নেই। আর সেই পাহাড়ের মাথার উপর থেকে একটি প্রকাণ্ড জল—প্রপাত বিরাট গর্জ্জন করে এসে পড়্ছে। এই প্রপাতই সেই ঝরণা হ’য়ে বয়ে গিয়েছে যার তীরে তীরে তারা এই পাঁচ বৎসর হেঁটে এসেছে। এই প্রপাতের শব্দই পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে চতুর্গুণ শব্দে তাদের কানে এসে বাজ্ছিল। তারা সেই প্রপাত ও নির্ঝরিণীর সঙ্গম স্থলে নির্ঝরিণীর দু’পারে কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কল্পশেখর ভাব্তে লাগ্ল।
এতদিন অন্তত তাদের মিলনের চেষ্টা করবার উপায় ছিল, আজ তারও শেষ। হয় মিলন, নয় মিলনের চেষ্ট। চেষ্টাও যখন অসম্ভব তখন জীবনে কাজ কি? কিন্তু এত সহজেই নিরস্ত হব? প্রথম বাধাতেই আ-জীবনের সাধনা পরাজয় মানবে? অসম্ভব! কল্পশেখরের অন্তর দেবতা ত তা মানতে চায় না। এই দুরারোহ পাহাড়ে ওঠ্বার কি কোন উপায় নেই—কোন পথই নেই? এই জলপ্রপাতেই নির্ঝরিণীর উৎপত্তি। সুতরাং সেখানেই এর শেষ। এই পাহাড়ের ওপরেই তাদের যাত্রা শেষ হবে—তাদের মিলন হবে। কল্পশেখর তার বামে দক্ষিণে তাকিয়ে দেখ্ল। যতদূর দৃষ্টি চলে খাড়া পাহাড় পূর্ব্বে পশ্চিমে আপনাকে বিস্তার করে’ নিষ্ঠুরতার প্রতিমূর্ত্তি স্বরূপ দাঁড়িয়ে আছে। যেন বল্ছে—মানুষ, তোমার আশা আকাঙ্ক্ষা কল্পনা জল্পনা উদ্যম উৎসাহের এইখানে শেষ—যাও ধরিত্রীর সন্তান আপনার মাতৃক্রোড়ে ফিরে যাও।
এমন সময়ে সেখানে এক অপূর্ব্ব সুন্দর পুরুষের আবির্ভাব হ’ল। বিস্ময়-বিস্ফারিত নেত্রে সে একবার কল্পশেখরকে আরবার তরুণীকে দেখ্তে লাগ্ল—যেন তাদের সেখানে উপস্থিতির অর্থ সে কিছুই খুঁজে পাচ্ছিল না। অবশেষে সে কল্পাশেখরকে সম্বোধন করে’ বললে—“তুমি কে?”
“আমি মানব।”
তরুণীর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস কর্ল—তুমি কে?”
“আমি মানবী।”
“কোথা থেকে আসছ তোমরা?”
কল্পশেখর বল্লে—“আমরা আস্ছি সেই দেশ থেকে, যেখানে ফুল ফোটে আবার ঝরে’ যায়—মানুষ জন্মে আবার মরে’ যায়—যেখানে গড়ে আবার ভাঙে—ভাঙে আবার গড়ে—যেখানে আশার অন্ত নেই, আকাঙ্ক্ষার শেষ নেই, সাহসের সীমা নেই।”
“তোমরা মর্ত্তের জীব”
“আমরা মর্ত্তের জীব।”
“কি চাও তোমরা?”
“তুমি কে?”
“আমি গন্ধর্ব্ব।”
“শোনো গন্ধর্ব্ব——আমরা চাই পরস্পরের মিলন। এই পাঁচ বৎসর ধরে’ আমরা এই নির্ঝরিণীর দু’তীর দিয়ে দু’জনে হেঁটে এসেছি—আর এই পাঁচ বৎসর ধরে’ এই নির্ঝরিণী আমাদের মাঝ দিয়ে একটা অনন্ত বাধার মত বয়ে’ গিয়েছে। জানি আজ আমাদের যাত্রার শেষ। কোথায়? ওইখানে—যেখান থেকে জলপ্রপাত পড়্ছে——ঐখানে নির্ঝরিণীর শেষ, ঐখানে বাধার শেষ, ঐখানে আমাদের মিলন হবে।”
“অসম্ভব।”
“কি অসম্ভব গন্ধর্ব্ব?”
“তোমাদের মিলন।”
“কেন অসম্ভব গন্ধর্ব্ব”
“কেন অসম্ভব তা বল্তে পারিনে। তবে বোধ হয় মিলন হলে’ সকল পাওয়ার, সকল চাওয়ার শেষ—তাই বুঝি অসম্ভব। শোনো মানব, এ চেষ্টা ছাড়—তোমরা ফিরে যাও।”
মানব উন্নত—শিরে বজ্রকণ্ঠে বল্ল—“কখনও না।”
মানবী নত—নয়নে মৃদুস্বরে প্রতিধ্বনি কর্লে—“কখনও না।”
কল্পশেখর জিজ্ঞেস কর্ল—“এ পাহাড়ে ওঠ্বার কি কোন উপায় নে,—কোন রাস্তা নেই গন্ধর্ব্ব?”
“তোমরা ফিরে যাও।”
“এ পর্ব্বতে আরোহণ করা কি অসম্ভব গন্ধর্ব্ব?
“শোনো—তোমরা ফিরে যাও।”
“একি মানুষের অসাধ্য গন্ধর্ব্ব?”
“অসাধ্য নয়—দুঃসাধ্য।”
“তবে সাধা।”
“আপনার অদৃষ্টকে বশ করতে চাও?”
“চাই।”
“নিতান্তই ফিরবে না?”
“শোনো গন্ধর্ব্ব——ফিরব কোথায়? ফেরা মানে মৃত্যু। আজন্ম যে স্বপ্ন অন্তরে সুপ্ত হয়েছিল—কৈশোরে যে স্বপ্ন অস্পণ্ট আকাঙ্ক্ষার নিরুদ্দেশ সন্ধানে ঘরছাড়া করেছিল— যৌবনে গত পাঁচ বৎসর ধরে’ যে আকাঙ্ক্ষার মাদকতা এ দেহের অণু—পরমাণুতে পর্য্যন্ত প্রবিষ্ট হয়েছে—সেই স্বপ্ন সেই আকাঙ্ক্ষাকে ছাড়তে বল, গন্ধর্ব্ব! মানুষের মন তুমি জান না!”
“বেশ তবে শোন। এ পাহাড়ে ওঠ্বার রাস্তা আছে। কুন্তু সেখানে যাবার জন্যে চাই অসীম ধৈয্য। তোমাদের তা আছে?”
“মানুষের ধৈর্যের সীমা নেই।”
গন্ধর্ব্ব বল্তে লাগ্ল—“এই যে পাহাড় এ প্রাচীরের মতো, যোজন দীর্ঘ—একেবারে প্রাচীরের মতো খাড়া। কিন্তু এই পর্ব্ব—প্রাচীর যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে দুই প্রান্ত শুধু উপর থেকে ঢালু হ’য়ে নেমেছে। সেই চালু জায়গা দিয়ে এর উপরে ওঠ্বার পথ! এখন তোমাদের দু’জনকে নির্ঝরিণীর দু’তীর থেকে পর্ব্বতের দু’প্রান্তে পৌঁছিতে হবে। সেখানে পৌঁছে পাহাড়ে ওঠ্বার রাস্তা দেখ্বে। দু’ধার থেকে দু’রাস্তা বরাবর চলে’ পাহাড়ের উপরের একটা হ্রদের তীরে প্রকাণ্ড একটা শাল্মলী তরুর মূলে এসে মিলেছে। সেই হ্রদ থেকেই এই ঝরণার উৎপত্তি। ওই রাস্তায় যদি তোমরা পথ হারিয়ে না ফেল তবে সেই হ্রদের তীরে তোমাদের মিলন হ’তে পারে।”
কল্পশেখর জিজ্ঞেস কর্ল—“এ যাত্রা শেষ হবে কত দিনে?”
গন্ধর্ব্ব উত্তর দিল—“কত দিনে তা কে জানে—কে বল্বে সে কথা?”
গন্ধর্ব্ব অন্তর্ধান হল।
কল্পশেখর তরুণীর দিকে ফিরে বল্ল— “তরুণী সাহস আছে?” তরুণী উত্তর দিলে—“আছে।”
“লক্ষ্য—ভ্রষ্ট হবে না?”
“না।”
দু’জনে দু’দিকে যাত্রা করল। কত দিনের জন্য কে বলবে?
সে দিন সূর্য্য ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কল্পশেখর বাতাসের গায় তাজা পদ্ম ও ভিজে শেওলার গন্ধ পেলে। কল্পশেখর বুঝ্ল যে গন্ধর্ব্ব যে হ্রদের কথা বলেছিল সে হ্রদ আর বেশি দূরে নয়—তার যাত্রা শেষ হবার আর বেশি বিলম্ব নেই। কল্পশেখর দ্রুতপদে চল্তে লাগ্ল। যখন চারিদিক আঁধার হয়ে এল তখন সে হ্রদের তীরে এসে পৌঁছিল। চারিদিকে চেয়ে সে হ্রদের উত্তর তীরে একটা প্রকাণ্ড গাছ দেখ্তে পেলে। বুঝ্লে এই সেই শাল্মলী তরু। কল্পশেখর হ্রদের তীর দিয়ে গিয়ে সেই শাল্মলী তরুর মূলে পৌঁছিল। তারপর তারি নীচে বসে’ পড়্ল।
চারিদিক তখন নিবিড় কালো আঁধারে ঢেকে গেছে—গভীর নিস্তব্ধতায় ভরে’ উঠেছে। আলকাৎরার চাইতেও কালো সে আঁধার, মৃত্যুর চাইতেও গভীর সে নিস্তব্ধতা। এমনি আঁধারের মাঝে, এমনি নিস্তব্ধতার মাঝে কল্পশেখর বসে‘ বসে’ হাজার চিন্তার জালে তার মনটাকে জড়াতে লাগ্ল।
কল্পশেখরের ত আজ যাত্রা শেষ। কিন্তু তরুণী!—কোথায় সে? সে কি এই কঠিন বন্ধুর পথ অতিক্রম করে আস্তে পারবে এই তার গম্য—স্থানে—এই তার কাম্য স্থানে? পথে কত বিপদ কত আপদ অতিক্রম করে’ না কল্পশেখর আজ এই হ্রদের তীরে কত বৎসর পরে পৌঁছেছে—ওঃ কত বন সে যেন সৃষ্টির আগে হতে সারাজীবন যেন সে পথই চলেছে— এই সাহস এই ধৈর্য্য কি তরুণীর হবে?—ওঃ—তরুণি—তরুণি!
সহসা সেই গভীর নিস্তব্ধতা বিভিন্ন করে’ কার পায়ের শব্দ কল্পশেখরের কানে এসে বাজ্ল। কল্পশেখর উৎকর্ণ হায় সেই দিকে চেয়ে দেখ্ল। নিবিড় আঁধারে কিছুই দেখা যায় না—কিন্তু স্পষ্ট পদশব্দ স্পষ্ট হতে স্পষ্টতর হ’তে লগ্ল। ধীরে ধীরে কল্পশেখরের দৃষ্টি আঁধার ভেদ করতে সমর্থ হ’ল। সে দেখ্লে একটা মানুষের মূর্ত্তিই বটে—তারই পানে আস্ছে।
কল্পশেখরের শিরায় শিরায় শোণিত দুরন্ত নৃত্য লাগিয়ে দিল—তার হৃদয়ে যেন অসংখ্য বিদ্যুত—প্রবাহ পরস্পর মারামারি কাটাকাটি কর্তে লাগল। কল্পশেখর উঠে সেই মূর্তিটির পানে অগ্রসর হ’ল। যখন তারা পরস্পর কাছাকাছি হ’ল তখন কল্পশেখর যেন অপরিচিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস কর্ল—“তুমি কে?”
“আমি তরুণী।”
মুহূর্ত্তে চারটি বাহু দুইটি দেহাকে জড়িয়ে নিল—তাদের আজীবন ব্যর্থ প্রাণের অনন্ত পিপাসা নিয়ে, চারটি অধর একটা নিবিড় চুম্বনে যুক্ত হ’ল—তাদের আজীবন পরিপুষ্ট হৃদয়ের অদম্য কামনা নিয়ে। তারপর আজীবন সাধনার সিদ্ধিলাভের শেষে জীবনব্যাপী ক্লান্তি যেন তাদের দুটি শরীরের ওপরে একেবারে ভেঙে পড়্ল—তারা সেইখানে বসে’ পড়্ল—তারপর ধীরে ধীরে পরস্পরের আলিঙ্গনাবদ্ধ হ’য়ে সেই পাষাণ শয্যায় ঘোর নিদ্রায় অভিভূত হয়ে পড়ল। পাষাণশয্যা?—না, সে—শয্যা পুষ্পের চাইতেও কোমল।
পরদিন প্রথম ঊষার সঙ্গে সঙ্গে কল্পশেখরের ঘুম ভাঙ্ল। ধীরে ধীরে তার সব কথা মনে পড়্ল। সফল তার জীবন। আজীবনসাধনার ধন আজ তার আলিঙ্গনে। কল্পশেখর আলিঙ্গন—বদ্ধার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখ্ল—একি!!!
উদ্যতফণা ফণিনীকে সামনে দেখ্লে পথিক যেমন লাফিয়ে উঠে দশ হাত পিছিয়ে যায়, তেমনি চক্ষের পলকে কল্লশেখর তাকে আপনার আলিঙ্গন—মুক্ত করে’ লাফিয়ে উঠে সেই পাষাণ শয্যার কাছ থেকে পিছিয়ে গেল। তারপর বজ্রাহতের মতো শূন্যদৃষ্টিতে তারি সারানিশার আলিঙ্গনবদ্ধা নিদ্রাভিভূতার দিকে তাকিয়ে রইল।
নিদ্রাভিভূতা আলিঙ্গনচ্যুতা হ’য়ে ধীরে ধীরে চোখ মেল্ল। পাষাণ শয্যা ত্যাগ করে উঠে বস্ল। তারপর কল্পশেখরের দিকে তাকিয়ে দেখ্ল!
কল্পশেখর কর্কশকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল-“কে তুমি?”
“আমি তরুণী।”
কল্পশেখর পাগলের মতো হেসে উঠ্ল। সে হাসি আশে পাশে পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিহত হ’য়ে কোন এক প্রেতলোকের বিকট বীভৎস শব্দের মতো প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠ্ল। চীৎকার করে’ নিশির সঙ্গিনীর মুখমণ্ডলের দিকে দেখিয়ে দিয়ে ঘৃণার স্বরে বলে ঊঠ্ল—তুমি—তুমি তরুণী—ওই লোল চর্ম্ম, বিরল দন্ত, মুখের উপরে শুক্নো চামড়ার মতো দুখানা ঠোঁট—দীপ্তিহীন কোটরগত ঐ দুটি চোখ মাথায় কাশফুলের মতো সাদা একরাশ চুল—তুমি—তুমি—তরুণী!”
জরাগ্রস্ত রমণী করুণ বিষাদের হাসি হেসে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল তারপর কল্পশেখরের কাছে এসে তার হাতখানি ধরে’ তাকে হ্রদের তীরে জলের কিনারে নিয়ে গেল। তারপর আপনার কৃশ হস্তের শুষ্ক অঙ্গুলি বিস্তার করে জলের দিকে দেখিয়ে দিয়ে বল্লে “দেখ।” কল্পশেখর দেখ্ল।
কল্পশেখর দেখ্ল হ্রদের জলে আপনার প্রতিবিম্ব। পেশীহীন গণ্ডদ্বয়ে রসহীন চামড়া ঝুল্ছে—সাদা ভূরুর নীচে কোটরগত দুটি চক্ষু কুয়াসায় ঢেকে গেছে—মসৃণ ললাটে করাল কাল তার নিষ্ঠুর দাঁত বসিয়েছে—আর মাথার ওপরে বরফের চাইতেও সাদা একরাশ চুল গুচ্ছে গুচ্ছে তার অস্থি—চর্ম্ম—সম্বল কাঁধের ওপরে এসে পড়েছে। তরুণীর ধ্যানে এতদিন তার তা চোখেই পড়েনি। কল্পশেখর দুই হাতে মুখ চোখ ঢেকে সেইখানে বসে পড়ল।
মানুষের দেহ তার মনকে ব্যর্থ করেছে।