বিষয়বস্তুতে চলুন

ইরাণী উপকথা/ছোট উপকথা

উইকিসংকলন থেকে

ছোট উপকথা।

 মানুষ ছিল একদিন অতি নির্বোধ, তাই সে তার পাশের সঙ্গিনীটিকে রেখেছিল কৃতদাসী ক'রে। তার পায়ে সে বেঁধে দিয়েছিল লোহার শিকল—এমনি একটু লম্বা যে ঘরের কাজে সে ফদিক ওদিক করতে পারে; কিন্তু বাইরে দৌড়ে ছুটে না পালায়।

 সঙ্গিনীটিও থাকত, ঠিক কৃতদাসীর মতই।

 তার মনের কথা কে জানে? মানুষের কুটীরখানি সে মেজে ঘনে ধুয়ে মুছে চকচকে ঝকঝকে করে রাখত। উঠানে নিজ হাতে তুলসীগাছ গোড়ায় প্রতি সন্ধ্যায় ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে সকল অমঙ্গলকে দূরে রাখবার প্রার্থনা জানাত। মানুষের ক্ষুধার আহার জুগিয়ে দিত, তৃষ্ণার জল এনে দিত, পূজোর ফুল সাজিয়ে দিত। মানুষ মনে মনে ভাবত, ও যে আমার জন্যে এত করে, তা আমি না হ’লে ওর চলে না বলে’।

 মানুষের মনের কথা জেনে বিধাতা মনে মনে হাসলেন। তিনি মজা করবার জন্যে একদিন সঙ্গিনীটিকে তাঁর পাশ থেকে সরিয়ে নিলেন'।

 মানুষ সে দিন কুটিরে ফিরে এসে দেখলে যে ক্ষুধার আহার নেই, তৃষ্ণার জল নেই, পূজোর ফুল নেই।

 দেখে মানুষ একেবারে অগ্নিমূর্ত্তি চেঁচিয়ে ঘর মাথায় করলে; কার সঙ্গে কুরুক্ষেত্তর বাধাবে তা খুঁজতে লাগলে। এমন সময় বিধাতা এসে উপস্থিত হলেন। নিতান্ত ভাল মানুষটির মত জিজ্ঞেস করলেন—ব্যাপার কি?

 ব্যাপার কি? মানুষ রেগে বলে উঠল,—ব্যাপার কি? কোথায় গেল আমার সে? ক্ষুধার আহার নেই, তৃষ্ণার জল নেই, পূজোর ফুল নেই, সেই যে সব করত।

 বিধাতা বললেন—কেবল এই?

 মানুষ বললে —তা নয় ত কি!

 বিধাতা বললেন—বেশ তুমি সবই ঠিক ঠিক পাবে। তোমার ক্ষুধার আহার, তৃষ্ণার জল, পূজোর ফুল, সব, কিছুরই ত্রুটি হবে না।

 বিধাতার মন্ত্রগুণে মানুষ সব ঠিক ঠিক পেতে লাগল— তার ক্ষুধার আহার তৃষ্ণার জল পূজোর ফুল—সব ঠিক ঠিক আগেরই মত।

 কিন্তু সঙ্গিনীটি আর ফিরলে না।

 সেই ঠিক ঠিক সবই রইল ক্ষুধার আহার, তৃষ্ণার জল, পূজোর ফুল, কিন্তু সেই সুরটি ত তেমন করে বাজে না। সেই সুরটি—যে সুরটি তার আহার ও পানের মাঝামাঝি বিচ্ছেদটুকুকে পূর্ণ করে রাখত, তার পান ও পূজোর মাঝামাঝি অবসরটুকুকে সন্তোষ আর তৃপ্তি দিয়ে ভরিয়ে দিত। আজ এ যে আহারের পিছনে কেবল আহারই আছে, জলের পিছনে কেবল জল, ফুলের পিছনে কেবলই ফুল—মূর্তিমতী নিষ্ঠুরতার মত, ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায়, হৃদয়হীন যন্ত্রের মত আপন আপন কর্তব্য করে যায়।

 বাইরের কাজ সেরে মানুষ সেদিন ক্লান্তদেহে তার কুটীরে ফিরে এলো, দেখলে সব ঠিক ঠিক সাজান,—তার ক্ষুধার আহার, তৃষ্ণার জল, পূজোর ফুল।

 মানুষের সর্ববাঙ্গ জ্বলে উঠল। কে চায়, কে চায় তোমার এ সব? কে চায়, কে চায় তোমার এই হৃদয়হীন' বিদ্রূপ? কে চায়, কে চায় তোমার এই যন্ত্রচালিত নির্দয়তা?

 লাথি মেরে সে তার সমস্ত খাবার ছড়িয়ে দিল—জলের পাত্র উলটিয়ে দিল, ফুলের রাশি ছয়-নয় ক'রে দিল।

 বিধাতা এসে উপস্থিত হলেন, বললেন —আবার ব্যাপার কি?

 ব্যাপার কি? মানুষ ক্রুদ্ধস্বরে বললে, —ব্যাপার কি? চায় তোমার এ সব? নিয়ে যাও, নিয়ে যাও তোমার ওই হৃদয়হীন ভোগ-সামগ্রী। আমার তাকে ফিরিয়ে দাও।

 বিধাতা হাসলেন। তার সঙ্গিনীটিকে আবার ফিরিয়ে দিলেন।

 মানুষ সে দিন তার সঙ্গিনীটির পা থেকে লোহার শিকল খুলে নিয়ে তার হাত দুখানিতে সোনার কাঁকন পরিয়ে দিল, তার গলায় মুক্তাহার দুলিয়ে দিল, তাকে বক্ষে চেপে চুম্বন করে বললে তুমি ত কৃতদাসী নও, তুমি যে পূর্ণা, তুমি অসম্পূর্ণকে পূর্ণ কর, তুমি শূন্যকে সম্পদশালী করে তোল, তুমি কৃতদাসী নও।

 সে দিন মানুষ যে ফুল দিয়ে পূজো করতে বসল, সে ফুলের গন্ধে দেবতা জাগ্রত হয়ে উঠলেন।