ইরাণী উপকথা/সমুদ্রের ডাক
সমুদ্রের ডাক।
সাঁইত্রিশ বৎসর বয়সে দক্ষিণা যখন পুত্র সন্তানটী প্রসব কর্লে তখন তাদের সেই এতদিনকার বিষাদঘেরা কুটীর খানি আনন্দের আলোতে হেসে উঠ্ল। সাগরের কিনারে তাদের কুটীর। আবহমানকাল থেকেই ত নীলাম্বুরাশি উচ্ছসিত সৃষ্টি হতেই ত তার তরঙ্গমালা কল কল ছল ছল মুখর——আজও তাই। তবে সে তরঙ্গমালার কল কল ধ্বনিতে আজ এত আনন্দ—মদিরা ঢেলে দিলে কে? নীলাম্বুরাশির সে উচ্ছাস আজ এত হাস্য—মুখরিত হ’য়ে উঠ্ল কেন? কুটীরের আশে পাশে তালবৃক্ষের সারি। বাতাসে তালবৃন্ত থির্ থির করে কাঁপছে——কিন্তু তা আজ এত উল্লাস—যুক্ত হ’ল কোন্ মন্ত্রে? দক্ষিণা যখন তার সাঁয়ত্রিশ বৎসর বয়সে একটি পুত্র সন্তান প্রসব কর্ল তখন এমনি করে মৎসজীবীর সেই নির্জ্জন শান্ত অথচ বিষাদমাখা কুটীরখানি আকাশ বাতাস দশদিক ভরে একেবারে হেসে উঠ্ল।
দক্ষিণা যখন পুত্র সন্তানটি প্রসব কর্লে তখন শ্রীমন্তের হৃদয়খানি ভক্তিতে ভরে’ উঠল এবং তারই আলোক তার চক্ষু দুটিকে উদ্ভাসিত করে’ তুল্ল। দেবতার দয়া তার অন্তরের অন্তস্থলে গিয়ে স্পর্শ করে’ শ্রীমন্তের জীবনকে এক মূহূর্ত্তে কৃতার্থ করে’ দিল। জোড়করে আকাশের পানে চেয়ে গদগদভাষে শ্রীমন্ত বল্ল—“দেখো ঠাকুর! আমার খোকাকে যেন বাঁচিয়ে রেখ—দেখো যেন আকাশের চাঁদ হাতে দিয়ে আবার তা কেড়ে নিয়ো না”—শ্রীমন্তের মুখে আর কথা সরল না—তার কণ্ঠ রুদ্ধ হ’য়ে এল—অন্তরের ভাব, ভাষা খুঁজে পেলে না!
যথাসময়ে অন্নপ্রাশনের সঙ্গে শিশুর নামকরণ হ’য়ে গেল। দেবতার দান বলে’ তার নাম রাখা হ’ল প্রসাদ’। যেদিন শিশু প্রথম আধ আধ কথায় মা ও বাবা ডাক্তে শিখল, সেদিন দক্ষিণা ও শ্রীমন্তের বুকের ভিতরটা আশায় আনন্দে কেঁপে উঠল—এবং সঙ্গে সঙ্গে তাদের চোখের সামনে একটা নতুন জগৎ খুলে গেল। যে জগতে পিতৃ—মাতৃ হৃদয়ে এত স্নেহ এত ভালবাস—সে—জগতের ত কঠোর হবার অবসর নেই। যে সংসারে শিশু রয়েছে—তার আধ আধ কথা রয়েছে—কালো চোখের হাসিমাখা দৃষ্টি রয়েছে—সে সংসারের ত নির্ম্মম হবার সাহস নেই। শ্রীমন্তের মরুভূমির মতো সংসার এক মুহূর্ত্তে যেন মন্দাকিণী প্রবাহে দ্রুমদলশোভিত হ’য়ে গেল। আর সে ক্লান্তি নেই, দুঃখ নেই, দৈন্য নেই——আর সে ব্যর্থতা নেই। শিশুর আনন্দময় স্পর্শে সমস্তই ধন্য ও সার্থক হ’য়ে উঠল।
প্রতিদিনের কাজগুলো যা এতদিন শ্রীমন্ত ও দক্ষিণার কাঁধে ভূতের বোঝার মতো চেপে তাদের জীবনকে এখানে সেখানে নির্ম্মম ভাবে টেনে নিয়ে বেড়াত, সে ভার শুধু একটী মাত্র শিশুর আবির্ভাবে একেবারে লঘু হ’য়ে গেল। শ্রীমন্ত যখন জাল কাঁধে নিয়ে মাছ মার্তে যায় তখন তার হৃদয়টা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোই আজকাল নৃত্য করতে থাকে—শ্রীমন্ত তখন ভাবে যে এই দিনমানব্যাপী পরিশ্রমের যে পুরস্কার, সে পুরস্কার এ পরিশ্রমের তুলনায় অনেক বেশী। সে পুরষ্কার একটি ক্ষুদ্র শিশুর স্পর্শ—একটি ক্ষুদ্র শিশুর মুখে বাবাডাক। দক্ষিণা যখন রন্ধনে যায় তখন আর সে তা যন্ত্রবৎ সম্পাদন করে না। রন্ধনের প্রতি বাঞ্জনটি যে, একটি ক্ষুদ্র শিশুর আনন্দের সামগ্রী হবে! সমস্ত দিনটার দিকে চেয়ে দক্ষিণার আর তা মরুভূমি বলে’ মনে হয় না। সমস্ত দিনমান যে সে অনেকগুলো স্নেহের কাজের অধিকারিণী। শিশুকে স্নান করান—আহার করান—ঘুম পাড়ান তা যে দক্ষিণাকেই করতে হবে। ধন্য ভগবান! যিনি শিশুকে অসহায় করে’ এখানে এনেছেন। পিতামাতা একটি ক্ষুদ্র শিশুর কাছ থেকে যে কতখানি আনন্দ কুড়িয়ে নেয়—তা শিশুও বোঝে না আর পিতামাতাও জানে না।
প্রসাদ ধীরে ধীরে ছ’ বছরে পড়ল।
একদিন রাতে ঘরের ভিতরে অসহ্য গরম বোধ হওয়ায় দক্ষিণা ঘরের দাওয়ায় একখানি মাদুর বিছিয়ে শয়ন করেছে। পাশে প্রসাদ। ভোরের মুখে দক্ষিণার ঘুম ভেঙে গেল। তখন একটি মাত্র কাক ডেকেছে—সমুদ্রের আর আকাশের যেখানে মিলন হয়েছে সেখানে কেবল একটি মাত্র রেখা শুভ্র হ’য়ে উঠেছে। শ্রীমন্ত তারও আগে জাল নিয়ে বেরিয়ে গেছে। দক্ষিণা তাড়াতাড়ি উঠ্তে যাচ্ছে, হঠাৎ চোখ পড়ে’ গেল প্রসাদের মুখের উপর। দক্ষিণার আর ওঠা হল না। প্রসাদকে ত সে এমন কোন দিন দেখে নি! নিদ্রিত শিশুর হাত দুটো সন্তর্পনে তার বুকের ওপর ন্যস্ত। চোখ দুটো ফুলের পাঁপড়ির মতো নিমীলিত। আর ঠোঁট্ দুখানিতে একটি মৃদু—অতি মৃদু হাসির রেখা। দক্ষিণা কি প্রসাদকে আর কোন দিন নিদ্রিত অবস্থায় দেখে নি?—দেখেছে; কিন্তু সে প্রসাদে আর এ প্রসাদে যেন আকাশ পাতাল তফাৎ। আর কি কোন দিন সে প্রসাদকে হাস্তে দেখে নি?—দেখেছে; কিন্তু সে হাসিতে আজকার এই নিদ্রিত শিশুর মৃদু হাসিটুকুতে যে কি প্রভেদ তা দক্ষিণা বলতে পারে না——কিন্তু সে—হাসি আর এ—হাসি এক নয়। এ কি দক্ষিণার পুত্র—না কোন দেবশিশু! এ কি এই ক্ষুদ্র পৃথিবীর ক্ষুদ্র পিতা মাতার স্নেহাবদ্ধ সন্তান——না অনন্ত আকাশের কোন জীব! এ কি মর্ত্তের মানুষ—না স্বর্গের দেবতা! দক্ষিণার কেমন ভয় করতে লাগ্ল। তাড়াতাড়ি ডাক্ল—“প্রসাদ, প্রসাদ!”
দক্ষিণার ডাকে যখন প্রসাদের ঘুম ভেঙে গেল তখন সে চারিদিকে চেয়ে প্রথম কিছু বুঝ্তে পারল না, তারপর হঠাৎ তার মাকে দেখ্তে পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে’ বল্ল—“জানিস্ মা ভারি একটা মজার স্বপ্ন দেখ্ছিলাম।
দক্ষিণা শিশুকে বক্ষে চেপে তার দুই গালে হাত বুলিয়ে বুঝ্ল এ তারই প্রসাদ বটে—জিজ্ঞেস্ কর্ল—“কি স্বপ্ন বাবা?”
“”ভারি মজার স্বপ্ন মা! সে কি যেন কেমন—একদিন যেন আমি খেলছিলাম—সেখানে সবাই আছে মা নরু অনঙ্গ বৈকোণ্ঠো শশী তারক—সবাই। হঠাৎ দেখি কেউ নেই! একলা আমি খালি দাঁড়িয়ে আছি—আর আমার সাম্নে মা খালি নীল—আর নীল—আর নীল! আর সেখানে থেকে কে যেন খালি ডাক্ছে—“প্রসাদ প্রসাদ,” আমি উত্তর দিতে যাই আর পারি না—হাঁট্তে যাই হাঁট্তে পারি না! আচ্ছা স্বপ্নে এ রকম হয় কেন মা? হাঁট্তে গেলে হাঁট্তে পারি না—কথা বল্তে পারি না?”
“কি জানি বাবা কেমন করে বল্ব স্বপ্নে কেন ওরকম হয়।”
“তারপর আরও কত যেন কি——সব আমার মনে নেই। কত যেন সুন্দর সুন্দর দেশ——কত ঘর বাড়ী——ফুল ফল ——কত যেন কি। সে এমন সুন্দর—সব বুঝি পরীদের দেশ —পরীদের দেশ কোথায় মা?”
“কি জানি বাবা তাদের দেশ কোথায় তা ত কেউ জানে না। তারা থাকে আকাশে——আকাশে আকাশেই ঘুরে বেড়ায়——তাদের দেশ কোথায় তা ত কেউ জানে না।”
প্রসাদ সন্দেহাকুল চিত্তে আকাশের দিকে চেয়ে দেখল। শিশুর চোখে পড়্ল শুধুই আকাশ—অনন্ত শূন্য——আর কিছুই না। একটু ম্রিয়মান হ’ল। হায় পরীদের দেশ কোথায় তা কেউই জানে না!
সে—দিন রাত্রিতে ভীষণ তুফান উঠ্ল। কালো কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে গেল—থেকে থেকে বিদ্যুৎ তাদের গায়ে দাঁত বসিয়ে দিতে লাগ্ল। দিগন্তের পার থেকে সাঁ সাঁ করে’ বাতাস ছুটল—সেই বাতাসের নাড়া খেয়ে লক্ষ ঢেউ যেন লক্ষ নিদ্রিত অজগরের মতো জেগে উঠে, তাদের লক্ষ ক্রুদ্ধ ফণা তুলে বেলাভূমে আছ্ড়ে আছ্ড়ে পড়তে লাগ্ল। সঙ্গে সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি! অর্দ্ধপ্রহর রাত থাক্তে জল ঝড় থেমে গিয়ে, প্রকৃতি শান্তমূর্ত্তি ধারণ কর্ল। দক্ষিণার যখন ঘুম ভাঙ্ল তখন পূর্ব্বদিকে ক্ষীণ ঊষার আলো দেখা দিয়েছে—আঁধার তখনো গাছে গাছে, তাদের ডালপালার পাশে পাশে, ঘরবাড়ীর কোণে কোণে আশ্রয় খুঁজে আরোও কিছুকাল থাকবার প্রয়াস পাচ্ছিল। দক্ষিণা উঠে ছড়া দিয়ে উঠান ঝাঁট দিল। তখন চারিদিক বেশ ফরসা হয়ে এসেছে। দক্ষিণা গিয়ে প্রসাদকে ডেকে তুল্ল—বল্ল—“কাল রাত্রে ঝড় হ’য়ে গিয়েছে—চল্, ঝিনুক কুড়তে যাবি নে?” প্রতি ঝড়ের শেষে সমুদ্রের প্রচণ্ড তরঙ্গাঘাতে যে—সব মরা ঝিনুক ইত্যাদি বেলা—ভূমে পড়ে থাক্ত দক্ষিণা তা কুড়িয়ে বেশ দু’ পয়সা উপায় করত। কখনও কখনও বা দু’ একটা বড় শঙ্খ বা কড়িও মিলে যেত। তা অবস্থাপন্ন গৃহস্থেরা বেশ দাম দিয়ে কিনে নিত। দক্ষিণা তাড়াতাড়ি প্রসাদকে কাপড় পরিয়ে দিল। কুটীরের দরজাটি টেনে দিয়ে মাতা এবং পুত্রে বের হ’য়ে পড়ল।
ছোট বড় নানা রঙের নানান্ আকৃতির ঝিনুকে যখন দক্ষিণার ঝাঁকাটী পূর্ণ হ’য়ে উঠ্ল সমুদ্রগর্ভস্থিত সূর্য্যের ক্রুদ্ধ রশ্মিগুলো পূর্ববদিগন্তে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত মেঘমালা তীরের মতো ভেদ করে’, উদ্ধে নীলিমায় আপনাদের ছড়িয়ে দিয়েচে। ঝিনুক কুড়োতে কুড়োতে তারা সমুদ্রের ধারে ধারে অনেক দূর গিয়ে পড়েছিল। ফিরবার পথও সেই সমুদ্রের ধারে ধারে। দক্ষিণা বাম কাঁকালে ঝিনুকপূর্ণ ঝাঁকাটি বহন করে’, দক্ষিণ হস্তে প্রসাদের ক্ষুদ্র হস্তটী ধারণ করে’ ছেলের সঙ্গে গল্প কর্তে কর্তে বাড়ী ফিরে চল্ল।
মাতা পুত্রে কথোপকথন করতে কর্তে চলছিল আর শিশুর চঞ্চল চোখ দুটী এদিক সেদিক ফিরছিল। একবার প্রসাদ সমুদ্রের দিকে চেয়ে দেখে, তারপর বলে উঠল—“দেখ্ দেখ্ মা কেমন একখানা জাহাজ কতদূর দিয়ে ছুটে চলেছে“—কিন্তু পরক্ষণেই তার উত্তেজিত অঙ্গুলি দাঁত দিয়ে কাম্ড়ে ধরে’ একেবারে দাঁড়িয়ে গেল—শিশু যেন কি স্মরণ করবার চেষ্টা করতে লাগ্ল। সহসা আনন্দে উৎফুল্ল হ’য়ে বলে উঠল—“মা জানিস!”
দক্ষিণাও প্রসাদের সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল—বল্ল “কি বাবা?”
“সেই যে সে—দিনকার স্বপ্ন।”
“হাঁ বাবা”
“খালি নীল—আর নীল—আর নীল!”
“হাঁ বাবা”
শিশু তার ক্ষুদ্র হস্তের ক্ষুদ্র অঙ্গুলি সমুদ্রের দিকে প্রসার করে’ বল্ল—“সে যেন ঐ রকম মা।”
“ছি ছি বাবা স্বপ্ন সব মিথ্যে। স্বপ্নের কথা মনে করে’ রাখ্তে নেই।”
দক্ষিণা প্রসাদকে টেনে নিয়ে গৃহ-অভিমুখে অগ্রসর হ’ল। শিশুও অন্যমনস্ক ভাবে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে চল্ল। সে মনে ভাবলে হায়! স্বপ্ন সব মিথ্যে! এমন মজার জিনিষগুলো মিথ্যে হয় কেন? এই ভেবে সে অত্যন্ত ক্ষুণ্ণ হ’ল।
সে দিন বেলা এগারটা বেজে গিয়েছে। গ্রামের উপকণ্ঠে যে মস্ত ছাতিম গাছটা ছাতার মতো ডাল বিস্তার করে’ পাতা বিছিয়ে দিব্যি ছায়া করে’ দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে তখনকার মতো খেলা ধুলো সাঙ্গ করে’ ছেলেরা যে যার মতো গৃহে ফিরেছে। কিন্তু প্রসাদের আর সে দিন দেখা নেই। দক্ষিণা রান্না শেষ করে’ তেলের বাটী নিয়ে প্রসাদের জন্যে অপেক্ষা কর্ছিল। ধীরে ধীরে যখন উঠানের কোণের ডালিম গাছটার ছায়া তার গায়ে মিশে গেল অথচ প্রসাদ ফির্ল না তখন দক্ষিণা তার খোঁজে চল্ল। দক্ষিণা সহজেই মনে কর্ল যে প্রসাদ হয়ত আর কোন বালকের সঙ্গে তাদের বাড়ীতে গিয়েছে। কিন্তু যখন সমস্ত প্রতিবেশীদের বাড়ীতে ঘুরে ঘুরে প্রসাদের খোঁজ মিল্ল না তখন তার মার মন অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হ’য়ে উঠ্ল। কিন্তু দক্ষিণা আবার মনে করল যে হয়ত প্রসাদ এতক্ষণ ঘরে ফিরেছে। এই মনে করে’ দক্ষিণা দ্রুতপদে গৃহে প্রত্যাগমন কর্ল। না,——কুটীরের দ্বার তেম্নি রুদ্ধ। কেউ কোথাও নেই। আশে পাশে কোনখানে প্রসাদ থাক্তে পারে মনে করে’ দক্ষিণা উচ্চৈঃস্বরে ডাক্ল “প্রসাদ প্রসাদ”, কোন উত্তর নেই। প্রসাদ ফেরে নি।
ত্রস্তপদে দক্ষিণা আবার বাটী থেকে বহির্গত হ’ল। আবার পাড় প্রতিবেশীদের বাড়ীতে বাড়ীতে গিয়ে জিজ্ঞেস কর্তে লগ্ল। কোথাও প্রসাদ নেই। এমনি করে, যখন দক্ষিণা চতুর্থবার গৃহ থেকে গৃহান্তরে কেঁদে কেঁদে প্রসাদের খোঁজ করে’ বেড়াচ্ছিল তখন একটি ছোটছেলে দক্ষিণাকে বল্ল যে, প্রসাদ খেলার মাঝখানে ছাতিমতলা থেকে চলে গিয়েছিল——আর তার যদ্দুর মনে পড়ে তাতে সে প্রসাদকে ছাতিমতলা থেকে যে পথটী সমুদ্রের দিকে গিয়েছে সেই পথ ধরে’ যেতে দেখেছে। দক্ষিণা মুহূর্ত্তমাত্র অপেক্ষা না করে’ দেবতার কাছে নানা মানত করতে করতে চলল। ছাতিমতলায় এসে দেখ্ল সে স্থান জনশূন্য। দক্ষিণা সেখান থেকে যে পথ সমুদ্রের দিকে গিয়েছে সেই পথ ধরে’ চল্ল। কিছুকালের মধ্যে দক্ষিণা সমুদ্রের ধারে এসে উপস্থিত হ’ল। সেখানে এসে সে ইতস্ততঃ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে’ যা দেখল তাতে তার চক্ষুস্থির হ’য়ে গেল!
দক্ষিণা দেখ্ল সমুদ্রের ধারে একখানে বন্য ঝাউ আর নারিকেল গাছে একটা কুঞ্জের মতো সৃষ্ট হয়েছে—আর সেখানে প্রসাদ একটি ঝাউয়ের গায়ে হেলান দিয়ে বসে’ একদৃষ্টে সমুদ্রের দিকে চেয়ে আছে। মধ্যাহ্ন—সূর্য্য—উদ্দীপ্ত আকাশ সমুদ্রকে একটা অতি মনোরম চোখজুড়ান নীল রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে। গত রাত্রির ঝঞ্ঝা—তাড়িত উর্ম্মিমালা এখনও যেন তাদের তাল সাম্লিয়ে ঊঠ্তে পারে নি—তাই তখন তারা গর্জ্জে’ গর্জ্জে’ বেলাভূমে এসে প্রতিহত হ’য়ে ফিরছিল। আর তারই উপকূলে ছায়া—সুনিবিড় কুঞ্জতলে ক্ষুদ্র শিশু আপনার ক্ষুদ্র দুটী হাতে ক্ষুদ্র দুটী হাঁটু জড়িয়ে ধরে বসে বসে তাই দেখছিল; শিশু পলকহীন—নির্বাক—নিস্তব্ধ!
দক্ষিণা তাড়াতাড়ি অগ্রসরর হ’য়ে প্রসাদকে কি ভর্ৎসনা করতে যাচ্ছিল, কিন্তু প্রসাদ মানুষের পায়ের শব্দ শুনে চম্কে চেয়ে দেখল, তারপর মাকে দেখে তৎক্ষণাৎ দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল ও উত্তেজিত ভাবে বল্লে “মা মা শুন্ছিস্ কি মা?”
শিশুকণ্ঠের মা—ডাকে মাতার মনের ক্রোধ মুহূর্ত্তে চোখের জলে পরিণত হয়ে গেল। দক্ষিণা প্রসাদকে বক্ষে তুলে নিয়ে মুখচুম্বর করে জিজ্ঞেস কর্ল—“কি বাবা?” প্রসাদ তেমনি উত্তেজিত কণ্ঠে বল্ল—“ঐ শোন্ শোন্ মা সমুদ্র কেবলি ডাক্ছে—‘প্রসাদ প্রসাদ।’ শুনিস্ না কি মা তুই?”
শিশুর কথা শুনে দক্ষিণার বুক দুর্দুর্ করে’ কেঁপে উঠল। কোন্ অজ্ঞাত আশঙ্কার আশু সম্ভাবনায় তার চিত্ত মন প্রাণ খিন্ন হয়ে উঠল। দক্ষিণা বল্ল—“ছিঃ বাবা পাগলামি করে না। সমুদ্র কি ডাক্তে পারে! ও যে ঢেউয়ের শব্দ।”
দক্ষিণা প্রসাদকে কোলে নিয়ে বাড়ী ফির্ল।
এর পর থেকে সুযোগ পেলেই প্রসাদ সেই ঝাউকুঞ্জতলে গিয়ে বসে একদৃষ্টে সমুদ্রের দিকে চেয়ে থাকত! এই ক্ষুদ্র শিশুটী সমস্ত খেলাধূলা ফেলে, একা একা সমুদ্রের দিকে চেয়ে কি ভাবে তা কে জানে? সিন্ধুর ছলছলয়িত কলরোল সে ক্ষুদ্র হৃদয়ের পরতে পরতে কোন্ ভাবের তরঙ্গ তুলে যায় তা কে বল্তে পারে? কে জানে কোন্ রহস্যের যবনিকা ভেদ করে’ কোন স্বপ্নের সন্ধানে শিশু তার কালো চোখের নির্ম্মল দৃষ্টি সীমাহীন দিগন্তে বন্ধ করে’ সিন্ধুকূলে বসে থাকে? কেউ জানে না। শিশু কি জানে? কে জানে শিশু জানে কি না। কিন্তু তবুও শিশু যায়। একা একা—সমস্ত ছেড়ে খেলাধূলো হাসি—গল্প সমস্ত পরিত্যাগ করে’ শিশু যায়, সেই ঝাউকুঞ্জতলে আপনাকে ভুলিয়ে দিতে—ভাসিয়ে দিতে—ডুবিয়ে দিতে! ক্রমে ক্রমে দক্ষিণা যখন জান্ল যে, প্রসাদ খেলবার নামে প্রকৃতপক্ষে সমুদ্রের ধারে গিয়ে একা একা বসে’ থাকে, তখন সে প্রসাদকে প্রথমে মিষ্টি কথায় তারপর ভর্ৎসনায় ও অবশেষে ভয় প্রদর্শনে সেখানে যেতে নিরস্ত করতে চেষ্টা কর্ল কিন্তু যখন দেখল কিছুতেই কিছু হ’ল না তখন দক্ষিণা হতাশ হয়ে শ্রীমন্তকে একে একে সব কথা বল্ল।
এর পর থেকে প্রসাদের বাহুমূল ও কণ্ঠদেশ ত্রিকোণ চতুষ্কোণ ঢোলোকাকৃতি নানা বর্ণের নানা রকমের কবজে ও তাবিজে ভরে’ উঠতে লাগল। কত জনের কত মন্ত্র ঔষধী ইত্যাদির ছড়াছড়ি হতে লাগ্ল। কিন্তু প্রসাদের মনের কোন পরিবর্ত্তন দেখা গেল না। ফাঁক পেলেই সে ঐ ঝাউকুঞ্জতলে গিয়ে একলা সমুদ্রের দিকে পলকহীন নেত্রে চেয়ে থাক—বুঝি কান পেতে কি শুন্তে থাকে। এই রকমে যখন কিছুতেই কিছু হল না—তখন শ্রীমন্ত ও দক্ষিণা পরামর্শ কর্তে বস্ল। অনেক কথাবার্ত্তার পর ঠিক হল যে, দক্ষিণা প্রসাদকে নিয়ে তার এক আত্মীয়ের বাড়ীতে গিয়ে কিছুদিন থাকবে। সে আত্মীয়ের বাড়ী সমুদ্রের উপকূল থেকে দশ ক্রোশ দূরে। আর শ্রীমন্ত মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে প্রসাদকে দেখে আস্বে। তারপর একটি শুভদিন দেখে দক্ষিণা ও প্রসাদকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীমন্ত সেই আত্মীয়ের বাড়ীতে ছেলেকে রেখে তার নির্জ্জন কুটীরখানিতে ফিরে এল।
পৃথিবীর বুকে পুরোণো দাগ মিশিয়ে নতুন দাগ বসিয়ে দশ বছর কেটে গেল। শ্রীমন্ত যখন একদিন দক্ষিণা ও প্রসাদকে সেই আত্মীয়ের বাড়ী থেকে ফিরিয়ে আন্তে গেল তখন প্রসাদের ছেলেবেলার খেয়ালের কথা সবাই ভুলেছে—ভোলে নি শুধু দক্ষিণা। তাই দক্ষিণা যখন শ্রীমন্তকে সে—কথা স্মরণ করিয়ে দিল—তখন দক্ষিণা যে নিতান্তই একটা পাগলী সেই কথাটাই শ্রীমন্ত তাকে বুঝিয়ে দিল। আরও বুঝিয়ে দিল যে শ্রীমন্তের এখন বয়েস হয়েছে—কবে পরপারের ডাক আস্বে তার ঠিক নেই—প্রসাদকে পৈতৃক ব্যবসাটা ত শিখতে হবে—খাওয়া পরার উপায়টা ত করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই শুভদিন দেখে প্রসাদ ও দক্ষিণা শ্রীমন্তের সঙ্গে আবার তাদের সমুদ্রের ধারে কুঁড়ে ঘরটিতে ফিরে এল। দক্ষিণা হৃষ্ট হয়ে দেখল যে সমুদ্র দেখে প্রসাদের কোনই ভাবান্তর হল না। তিন মাসের মধ্যে শ্রীমন্তের শিক্ষায় প্রসাদ একজন পাকা মাঝি হয়ে উঠল——জাল টান্তে দাঁড় ফেল্তে, পাল খাটাতে প্রসাদের সমকক্ষ আর কেউই সেই ধীবরপল্লীতে রইল না।
সেদিন বৈশাখী পূর্ণিমা। রাত্রির এমন রূপ আর কেউ কখনও দেখেনি। লক্ষ পরী বুঝি সেদিন আকাশপথে তাদের প্রিয়ের উদ্দেশে অভিসারে বেরিয়েছি—আর তাদের লক্ষ গা থেকে বুঝি রূপোর স্বচ্ছ তরল রাগ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল—তাদের লক্ষ হৃদয়ের প্রেমের অনুভব বুঝি আকাশে বাতাসে পৃথিবীর জলে স্থলে বিছিয়ে যাচ্ছিল—তাদের দু’লক্ষ পায়ের নূপুরের “যে—গান কানে যায় না শোনা”—তাই বুঝি দিগন্তের গায়ে গায়ে মাতলামি করে ফিরছিল।
সেদিন রাত্রে খাওয়া দাওয়া শেষ করে যখন প্রসাদের কাঁধে জাল চাপিয়ে আপনার কাঁধে দাঁড়, পাল ও পাল তুলবার খুঁটিটা নিয়ে শ্রীমন্ত গৃহ থেকে বের হল তখন পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদ আকাশে অনেকখানি উঠে গেছে। তারা দু’জনে সমুদ্রের কিনারে এসে তাদের তিন খণ্ড লম্বা পুরু তক্তায় বাঁধা ভেলাটা ডাঙ্গা থেকে জলে নামিয়ে দিল। তারপর পাল খাটাবার খুঁটিটা ঠিক জায়গায় বসিয়ে দিয়ে পাল খাটিয়ে দিল—ভেলা অনুকূল বাতাসে তরতরিয়ে দিগন্তের পাণে—যেন উড়ে গেল—ভেলার পিছন দিকটায় প্রসাদ বৈঠা হাতে তার মাথা ঠিক রাখতে লাগল আর তার আগায় বসে’ শ্রীমন্ত জালটা গুছিয়ে রাখতে লাগল।
সেদিন সাগরে রূপোর ও রূপের বাণ ডেকেছিল। দুধের চাইতেও সাদা রূপোর পাত গায় জড়িয়ে রূপসী উর্ম্মিবালাবা চিক্-চিক্ ঝিক্-ঝিক্ করছিল— খিল্ খিল্ করে’ হেসে লুটোপুটি খাচ্ছিল। তীরের গাছগুলো যখন ঝাপসা হয়ে এল তখন ভেলার পাল নামিয়ে নেওয়া হল। তারপর ভেলার পিছল দিকটায় বসে প্রসাদ একটু একটু করে বৈঠা মারতে লাগল আব গলুইয়ের কাছে স্তুপাকৃতি করা জালটা শ্রীমন্ত, ভাঁজ খুলে খুলে জলে নামিয়ে দিতে লাগল।
“জানিস্ প্রসাদ, পূর্ণিমে রাত্তিরে যেমন জালে গল্দা চিংড়ি পড়ে তেমন আর কখনও না। আর চাঁদ্নী রাত যদি মেঘলা মেঘলা হয় তবে কাঁকড়ার লেখাজোকা নেই”, শ্রীমন্ত জাল ফেল্তে ফেল্তে অজস্র ব’কে যাচ্ছিল আর প্রসাদ তাই নির্ব্বাক হয়ে শুনে যাচ্ছিল। “জানিস রে প্রসাদ সেই যেবার আমি তোর মাকে বিয়ে করলাম— সেই সেবার যে এই খানটাতে কোথা থেকে এক পাল হাঙ্গর এসে পড়ল—” “প্রসাদ প্রসাদ” প্রসাদের কানে এসে বাজল কে যেন ঠিক তার পিছন থেকে তাকে ডাকল—“প্রসাদ প্রসাদ” চমকে পিছন ফিরে চেয়ে দেখল। কই, কেউ ত নেই! প্রসাদের সমস্ত শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল। প্রসাদের মনে পড়ে গেল একটা বহু দিনের কথা—বহুদিনের স্বপ্ন—বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা। দশ বছর ধরে যার ওপরে বিস্মৃতির কালো পরদা পড়েছিল তা এক মুহূর্ত্তে কোথায় সব ছিন্ন ভিন্ন করে’ বেরিয়ে এলো মুক্ত স্পষ্ট উজ্জ্বল। প্রসাদ শ্রীমন্তের দিকে ফিরে দেখল। বৃদ্ধ তেমনি আপন মনে জাল ফেলছিল আর কত কালের কত কথা বলে’ বলে’ যাচ্ছিল! “প্রসাদ প্রসাদ।” প্রসাদ ফিরে চাইল। সহস্র সহস্র তরুণীর মতো অজস্র ঊর্ম্মিবালার কল কল ছল ছল হাসি—ঐ যে তারাই ডাক্ছে—“প্রসাদ প্রসাদ।” চাঁদের আলোয় চিক্ মিক্ করে উঠে ঐ যে তাদের তরলিত তনু বিভঙ্গিত করে তাদের কমকণ্ঠে ডাক্ছে - “প্রসাদ প্রসাদ।” ঐ যে সহস্র কিশোরীর কলহাসির মতো, সহস্র রূপসীর রূপরাশির মতো মাদকতা ছড়িয়ে দিয়ে ডাক্ছে—“প্রসাদ প্রসাদ।” এ তাদের কিসের আমন্ত্রণ? কোথায় নেবে তারা? সিন্ধুর কোন্ অতল তলে? কোন্ রহস্য যবনিকার অন্তরালে? ঐ যে তরঙ্গটি ভেলার গায়ে প্রতিহত হয়ে ফিরে গেল সে ডাক্ল—“প্রসাদ প্রসাদ।” ঐ যে লহরীটি বহুদূর হতে দৌড়ে এসে ভেলার কিনারে কিনারে লুটিয়ে গেল, সে ডাকল—“প্রসাদ প্রসাদ।” প্রসাদ শ্রীমন্তের দিকে চেয়ে দেখল। বৃদ্ধ তেমনি তার দিকে পিঠ ফিরে জাল ফেলছিল। প্রসাদ ধীরে ধীরে নিঃশব্দে তার হাতের বৈঠাটী ভেলার ওপরে রেখে দিল। তারপর ধীরে ধীরে তার দু’পা জলে নামিয়ে দিল। ধীরে ধীরে ভেলার কাঠ ধরে আপনাকে জলে নামিয়ে দিল। কোমর, বুক, কণ্ঠ, চিবুক, নাসিকা, চক্ষু, ললাট, মস্তক, মস্তকের কেশরাশি ধীরে ধীরে অদৃশ্য হ’য়ে গেল। দ্বিগুণ উৎসাহে লক্ষ লক্ষ উর্ম্মিবালারা চিক্-চিক্ ঝিক্-ঝিক্ করে উঠল—যেখানটায় সাগরের বুক চিরে প্রসাদের সমস্ত শরীরটা অদৃশ্য হয়ে গেল সেখানটার উপর দিয়ে মহাছুটোছুটি লাগিয়ে দিল আর খিল্-খিল্ করে’ হাসতে লাগল।
“বৈঠে ঠেলছিস্ না ক্যান্ রে প্রসাদ?” যখন প্রসাদের কোন উত্তর মিল্ল না, তখন শ্রীমন্ত মুখ ফিরিয়ে চেয়ে দেখ্ল—দেখ্ল শুধু শূন্য—প্রসাদ যেখানটায় বসে’ ছিল সেখানটা শূন্য—সমস্ত ভেলাটাই শূন্য—শুধুই শ্রীমন্ত—আর কেউ নেই!
মুহূর্ত্তে শ্রীমন্তের হৃদয় থেকে একটা তপ্ত আগুনের ঝলক্ উঠে তার সমস্ত শিরায় শিরায় ছড়িয়ে গেল। শ্রীমন্তের হাত থেকে জালের দড়ি খসে পড়ল! মন্ত্রমুগ্ধের মতো উঠে দাঁড়িয়ে সংজ্ঞালুপ্ত চোখ দুটো দিয়ে প্রসাদ যেখানটায় বসে ছিল সেখানটায় অর্থহীন দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। তারপর মর্ম্মভেদী চীৎকার করে একবার খালি “প্রসাদ” বলে ডেকে ভেলার উপরে পড়ে গেল। উত্তরে লক্ষ ঊর্ম্মিবালারা চাঁদের কিরণে চিক্-মিক্ করে' লক্ষ নিষ্ঠুরা তরুণীর মতো ভেলার আশে পাশে প্রতিহত হ’য়ে খিল্ খিল্ করে’ হাস্তে লাগল আর কৌতুক করে ডাকতে লাগল—“প্রসাদ প্রসাদ!”
সমাপ্ত।