ইসলাম ও কমিউনিজ্ম্/ইসলামের আলোকে কমিউনিজ্ম্
ইসলামের আলোকে কমিউনিজ্ম্
এতক্ষণ আমরা কমিউনিজম সম্বন্ধে যাহা বলিলাম, তাহা হইতেই আশা করা যায়, পাঠক ইহার স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে একটা পরিপুষ্ট ধারণা করিতে পারিবেন। এ সম্বন্ধে তাই আমরা আর অধিকদূর অগ্রসর হইব না। এইবার আমরা ইসলামের আলোকে ইহার দোষগুণ বিচার করিব।
এ-কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়ঃ কমিউনিজমের মূল নীতিগুলি ইসলাম হইতেই গৃহীত। ইসলামই এই নূতন আন্দোলনের মূলে প্রেরণা ও শক্তি যোগাইয়াছে। তবে জড়বাদী নাস্তিকদের হাতে পড়িয়া জিনিসটা যেভাবে গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহা সর্ব্বত্র ইসলাম-অনুমোদিত হয় নাই। এইজন্যই কমিউনিজমের সহিত ইসলামের সাদৃশ্যও যেমন আছে, পার্থক্যও ঠিক তেমনি আছে। আমরা একে একে সেইগুলিই পাঠককে দেখাইব।
ইসলামের সহিত কমিউনিজমের সাদৃশ্য
(১) সমাজতন্ত্র-স্থাপনেঃ—সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্র স্থাপনই কমিউনিজমের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু এত তোড়জোড়, এত বিপ্লব, এত রক্তপাত, এত দর্শন-বিজ্ঞান খাটাইয়াও পাশ্চাত্য জগৎ আজ যে-সাম্য আনিতে পারিতেছে না, চৌদ্দশত বৎসর পূর্ব্বে আরবের মরু-দুলাল মহানবী মোহাম্মদ সেই সাম্য শুধু মুখে প্রচার করিয়া যান নাই, বাস্তব রূপে তাহাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়া গিয়াছেন! মুসলমান জাতির সমাজব্যবস্থা সেই সাম্যনীতির উপরেই সুবিন্যস্ত। ইসলামের সমন্ত ধ্যান-ধারণা, সমস্ত অনুষ্ঠান, সমস্ত ক্রিয়াকলাপই যে সমাজকেন্দ্রিক—এ কথা কে জানে? ইসলাম হইল সমাজ-রাষ্ট্রিক ধর্ম্ম (Socio-political religion), অর্থাৎ এই ধর্ম্মের সহিত সমাজ ও রাষ্ট্র ওতপ্রোত ভাবে বিজড়িত। অন্য কোন ধর্ম্মে এই বৈশিষ্ট্য নাই। রাষ্ট্র (State) হইতে ধর্ম্ম (Church) সেখানে বিচ্ছিন্ন। কাজেই, অন্য সমাজের কাছে যে-সমাজতন্ত্র হইয়া উঠে একটা সাধনার বস্তু, মুসলমানের কাছে তাহাই হয় তাহার সহজ স্বাভাবিক জীবন-ধর্ম্ম।
মুসলমানের জীবনে চারিটী প্রধান ফরজ বা কর্ত্তব্য কর্ম্ম: নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত। এর প্রত্যেকটীর ভিতরেই পাওয়া যায় মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ব-বোধের পরিচয়। মুসলমান নামাজ পড়ে শুধু তার নিজের আত্মশুদ্ধি বা আধ্যাত্মিক উন্নয়নের জন্য নয়,—সকল মুসলমানের কল্যাণ ও মুক্তির জন্য; তার প্রার্থনা ব্যক্তিগত নয়—জাতিগত। সকল মুসলমানের কল্যাণ সে কামনা করে। বাড়ীতে নির্জ্জন গৃহে একা-একা নামাজ পড়ার চেয়ে জামাতে নামাজ পড়িলে তার বেশী সওয়াব হয়। নিশিভোরে নীরবে উঠিয়া সে নিজের নামাজটা সমাধা করিবার জন্যই ব্যগ্র হয় না, তন্দ্রাতুর অপর মুসলমান ভাইদিগকেও সে উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান করেঃ এস, নামাজে এস, সফলতার দিকে এস; নিদ্রা হইতে নামাজ শ্রেয়ঃ। এইরূপে পুণ্য ও কল্যাণকে তাহারা ভাগাভাগি করিয়া লয়। তার জুমার নামাজ যতটা না আধ্যাত্মিক, ততটা সামাজিক ও রাজনৈতিক। নামাজের খোতবার মধ্যে, অথবা নামাজ শেষে মসজিদে বসিয়াই সে সমাজ ও রাষ্ট্রের আলোচনা করে। তারপর আসে তার রোজা। এই মাসে বাদশা-গোলাম, ধনী-দরিদ্র, স্ত্রী-পুরুষ—সকল মুসলমানই উপবাস করিতে বাধ্য। একই সময় তারা রোজা রাখে, একই সময় তারা রোজা খুলে। দুনিয়ার যে কোন স্থানে যে-কোন মুসলমান থাকুক না কেন, এই পবিত্র মাসে সকলেই সাম্যের সমভূমিতে আসিয়া দাড়ায় এবং পরস্পরের সুখ-দুঃখকে সমান ভাবে ভাগ করিয়া লয়। কোটীপতিকেও ভুখারীর অনশন-বেদনা আপন প্রাণ দিয়া উপলব্ধি করিতে হয়। এই যে দলগত ঐক্যবোধ বা “আমরা” ভাব (we feeling)—ইহা মুসলমানের কাছে কোন স্বপ্নবিলাস নয়—ইহাই তাহার ধর্ম্ম। তারপর আসে খুশীর ঈদ—মিলনের ঈদ। এই ঈদে প্রত্যেক মুসলমানকে মাথা-পিছু হিসাব করিয়া ‘ফিৎরা’ দিতে হয়; সেই ফিৎরার অর্থ দরিদ্রদিগের মধ্যে বিতরিত হয়। কমিউনিজ্মের এমন দৃষ্টান্ত আর কোথায় আছে?
বিশ্বমানবতার চরম রূপ প্রকাশ পায় মুসলমানের হজে। বিশ্বের সমস্ত দিক হইতে দলে দলে মুসলমানগণ একই মিলন-কেন্দ্রে একই কা’বা শরীফে আসিয়া সমবেত হয়; আরবী, পার্শী, তুর্কী, তাতারী, মিশরী, বোগদাদী, কাফ্রী, নিগ্রো, হিন্দুস্থানী, চীনাম্যান, জাপানী, ইংরাজ, ফরাসী, জার্মানী—সব মুসলমানের সেদিন এক বেশ, এক ভূষা, এক আশা, এক ভাষা, এক লক্ষ্য এক ধ্যান। বিশ্বের মুসলমান সেদিন এক হইয়া একের বন্দনা করে। এককে কেন্দ্র করিয়া বহুর এমন মহামিলন—বিশ্বমানবতার এমন বাস্তব রূপ—জগতের আর কোন ধর্ম্মে নাই।
তারপর জাকাৎ। মানব-প্রেমের এও এক চূড়ান্ত নিদর্শন। অন্য ধর্ম্মে দরিদ্রকে কেহ কিছু দানকরুক না করুক, ততটা যায় আসে না; কিন্তু মুসলমানের কাছে দান-খয়রাত্ তাহার ধর্ম্মেরই অঙ্গীভূত অবশ্য করণীয়। মুসলমানকে বাধ্য হইয়া তাহার আয়ের একটা নির্দ্দিষ্ট অংশ দরিদ্রকে দান করিতেই হয়। উদ্বৃত্ত আয়ের উপর শতকরা বার্ষিক আড়াই টাকা হিসাবে তাহাকে জাকাত দিতে হয়। ইসলামী আমলে এই জাকাতের অর্থ বা মাল ‘বায়তুল মাল’ তহবিলে (সাধারণ ধনাগারে) রাখার ব্যবস্থা ছিল। এই তহবিল হইতে নিঃস্ব দরিদ্র ও অসহায় ব্যক্তিদিগকে সাহায্য করা হইত। স্বয়ং খলিফা ছিলেন এই ‘বায়তুল মালের’ রক্ষক। সমগ্র মুসলমান জগৎ যাঁহার অঙ্গুলি হেলনে পরিচালিত হইত, যিনি ইচ্ছা করিলে ধনরত্নের মধ্যে ডুবিয়া থাকিতে পারিতেন, তিনি দরিদ্রদিগের ধন আগুলিয়া বসিয়া থাকিতেন! শুধু তাই নয়, তাঁহার নিজের ব্যয়বরাদ্দও এই ‘বায়তুল-মাল’ তহবিল হইতে করা হইত। নির্দিষ্ট হারের এক কপর্দকও তিনি বেশী লইতে পারিতেন না। মহাপ্রাণ খলিফা হজরত ওমরের কথা ভাবুন। নিশীথ রাত্রে তিনি নিজে আটার বস্তা বহন করিয়া অনাথিনীর কুটীরে পৌঁছাইয়া দিতেছেন! এ দৃশ্যের কি তুলনা আছে!
(২) বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও মহামানবতারঃ— কমিউনিজমে জাতিভেদ নাই, ছোট-বড়-ইতর-ভদ্রের প্রভেদ নাই—মানুষ হিসাবে সকলেই এখানে সমান। বংশ বা জাত্যভিমান তুলিয়া দিয়া সে আনিয়াছে মানুষে-মানুষে সমতা-জ্ঞান। এইখানে ইসলামের সহিত কমিউনিজ্মের সাদৃশ্য আছে। চৌদ্দশত বৎসর পূর্ব্বে ইসলাম এই আদর্শই প্রতিষ্ঠিত করিয়া গিয়াছে। সব মানুষই সমান—এই হইল ইসলামের প্রধান শিক্ষা। মুসলমানেরা এক সঙ্গে উপাসনা করে, একসঙ্গে নামাজ পড়ে, একসঙ্গে খানাপিনা করে। তাহাদের আল্লাহ, এক, রসুল এক, কোরান এক, লক্ষ্য এক—উদ্দেশ্য এক। এই জন্তুই প্রত্যেকের সুখদুঃখের খবর তাহারা রাখে এবং একের দুঃখ-কষ্টে অপরে সাহায্য করে। আদর্শ মুসলমান হইতে হইলে তাহাকে তাহার প্রতিবেশীর খবরও রাখিতে হয়, নৈলে পাপ হয়।
বিশ্বমানবতাই ইসলামের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তার মানব-প্রেম সংকীর্ণ নয়, সমস্ত বিশ্বকেই সে আপনার বলিয়া জানে।
কোন দেশের চতুঃসীমার মধ্যে তাই তার মন বন্দী হইয়া থাকে না। সমস্ত মানব জাতিকেই সে এক বলিয়া জানে। তার কোরানই তাকে শিক্ষা দিয়াছে:
“কানান্নাসে। উম্মাতান্ ওয়াহেদাতান”
—(কোরান, ২ : ২১৩)
অর্থাৎঃ সমস্ত মানব-মণ্ডলী একজাতি।
অন্যত্র বলা হইয়াছেঃ
“হে লোক সকল, নিশ্চয়ই আমরা তোমাদিগকে একজন পুরুষ এবং একজন নারী হইতে সৃজন করিয়াছি এবং তোমাদিগকে পরিবার ও গোত্রে বিভক্ত করিয়াছি— যাহাতে তোমরা পরস্পর পরস্পরকে চিনিতে পার।”
—(কোরান, ৪৯ : ১৩)
হজরত বলিয়াছেন:
“প্রত্যেক মুসলমান প্রত্যেক মুসলমানের ভাই।”
সুতরাং স্পষ্টই দেখা যাইতেছে, বিশ্বমানবতা ও বিশ্বভ্রাতৃত্বই হইল ইসলামের সারকথা। মানুষের অন্তরে অন্তরে এমন নিগূঢ় আত্মীয়তার বন্ধন আর কোন ধর্ম্ম দিতে পারে নাই। “আচ্ছালামো আলায়কুম” বলিলে অতি দূরের মানুষও মুসলমানের কাছে আপন হইয়া যায়। ইসলামের কবি সাধে কি গাহিয়াছেনঃ
“মুসলিম হয়ে হাম ওয়াতান্ হ্যঁয়
সারা জাহাঁ হামারা!”
অর্থাৎ: আমি মুসলিম, নিখিল বিশ্বই আমার স্বদেশ।
এই যে অন্তরের সম্প্রসারণ এবং দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপকতা, ইহা ইসলামের এক মস্তবড় অবদান। কমিউনিজম্ এই জিনিসটাই আনিতে চায়।
(৩) আন্তর্জাতীয়তায়ঃ- সোভিয়েট রাশিয়ায় বর্ত্তমানে ১৬টা রিপাবলিক আছে। প্রত্যেকেরই জাতীয় বৈশিষ্ট্য, ভাষা ও সভ্যতা স্বতন্ত্র। কমিউনিজম এই স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করিয়া লইয়া একটা আন্তর্জাতীয়তার সৃষ্টি করিয়াছে। এই যে জাতিতে-জাতিতে মৈত্রীভাব ও শান্তিপ্রতিষ্ঠা—ইহাও ইসলামই সর্ব্ব প্রথম মানুষকে শিক্ষা দিয়াছে। ইসলামে স্বদেশ-প্রেমের মূল্যও যথেষ্ট। “স্বদেশ-প্রেম ঈমানেরই অংশ” (হাব্বুল ওয়াতান মিনাল ঈমান) ইহা হজরত মোহাম্মদের বাণী। কিন্তু মুসলমানের স্বদেশ-প্রেম অপর সকল জাতির ন্যায় সংকীর্ণ নয়। স্বাদেশিকতাই তার কাছে চরম কাম্য নয়। ভৌগলিক সীমারেখাকে অতিক্রম করিয়া তাহার প্রেম নিখিল বিশ্বে ছড়াইয়া পড়িতে চায়। জাতীয়তা (Nationalism) তার কাছে তাই খুব বড় জিনিস নয়, আন্তর্জাতীয়তাই (Inter-nationalism) তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য; অন্যান্য জাতির সহিত মিলিয়া মিশিয়া কাজ করাই তার বিধান। হজরত মোহাম্মদ যখন হিজরত করিয়া মদিনায় প্রস্থান করেন, তখন সেখানে ইহুদী, খৃষ্টান, আউস, খাজরাজ, মুসলমান প্রভৃতি বিভিন্ন গোত্রের লোকদিগকে লইয়া তিনি একটী ইসলামী রাষ্ট্র রচনা করেন। এই সম্পর্কে তিনি যে একটা সনদ দান করেন, তাহা আন্তর্জাতীয়তার এক অত্যুজ্জল নিদর্শন। সেই সনদের প্রধান সর্ত্ত এই ছিল যে-কেহ কাহারও ধর্ম্ম, সংস্কার বা স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করিবে না এবং পরস্পর মিলিয়া মিশিয়া দেশ রক্ষা করিবে। এ সম্বন্ধে কোরানের আদেশও অত্যন্ত সুস্পষ্ট:
ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদিগের প্রতি ইসলাম কিরূপ ব্যবহার করিয়াছে এবং কতখানি অধিকার দিয়াছে, ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মুসলিমশাসনের ইতিহাসই তার প্রমাণ।“(হে মোহাম্মদ, বিধর্মীদিগকে বল) তোমাদের ধর্ম্ম তোমাদের কাছে, আমাদের ধর্ম্ম আমাদের কাছে।”
—সুরা কাফেরুণ
“ইসলামে বলপ্রয়োগ নাই।”
—কোরান, ২ : ২৫৬
(৪) পুজিবাদের বিরুদ্ধতায়ঃ—কমিউনিজ্ম পুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদের ঘোর বিরোধী। পৌত্তলিকতার সহিত ইসলামের যেমন বিরোধ, পুঁজিবাদের সহিত কমিউনিজমের ঠিক তেমনি বিরোধ। পুঁজিবাদকে ধ্বংস করার জন্যই কমিউনিজমের জন্ম। ইসলামও পুঁজিবাদের বিরোধী। তবে কমিউনিজম্ যেরূপ পুঁজিবাদকে একেবারে ধ্বংস করিতে চায়, ইসলাম ঠিক সেরূপ চায় না। পুঁজিবাদের দোষ-ত্রুটীকে ইসলাম সংশোধন করিতে চায়। পুঁজিবাদের মারাত্মক ত্রুটী এই যে, সমাজের অর্থ-সম্পদকে সে বিচরণশীল হইতে দেয় না; মুষ্টিমেয় কতিপয় লোকের হস্তেই এই অর্থশক্তি আবদ্ধ হইয়া থাকে। পুঁজিবাদীদিগের মজুদ করিবার প্রবৃত্তিই হইল যত অনর্থের মূল। ইসলাম এই প্রকার ধনসঞ্চয়ের ঘোর বিরোধী। সমাজের অর্থ যাহাতে হাতে-হাতে ঘুরাফেরা করিতে পারে এবং এই উপায়ে সকলেই যাহাতে অভাব হইতে মুক্ত হয়, ইসলাম সেই ব্যবস্থা করিয়াছে। কাহারও হস্তে অর্থ সঞ্চিত হইলেই শতকরা বার্ষিক ২০০ টাকা তাহাকে দান করিতেই হয়। ইহা ছাড়াও অর্থ না খাটাইয়া ঘরে মজুদ করিয়া রাখা ইসলামের বিধানে মহাপাপ। কোরান বলিতেছে:
“এবং যাহারা স্বর্ণ ও রৌপ্য মজুত করিয়া রাখে এবং আল্লার রাহে (অর্থাৎ সৎকর্ম্মে) ব্যয় না করে, তাহাদের জন্য ঘোর শাস্তি আছে, এ কথা ঘোষণা করিয়া দাও।” —(৯:৩৫)
ঠিক ইহারই সমর্থনে হাদিস শরীফে বর্ণিত হইয়াছেঃ
“আবু হোরায়রা বলিতেছেন—হজারত রসুলে করিম বলিয়াছেন: যে সমস্ত লোক টাকাকড়ি মজুত করিয়া রাখে এবং দরিদ্রদিগের প্রাপ্য দান করে না, বিচারদিনে তাহাদের কপালে, পার্শ্বদেশে এবং পৃষ্ঠে আগুনদিয়া দাগ কাটিয়া দেওয়া হইবে।”
এই সমস্ত কোরানিক আদর্শকেই কি কমিউনিজম্ নবভাবে প্রচার করে নাই? ইসলামের পূর্ব্বে ধনিক বা পুঁজিবাদীদিগকে এমন তীব্র কশাঘাত আর কে করিয়াছে? একদিকে মজুত না করিবার তাকিদ, অ্যদিকে বিতরণ করিবার তাকিদ্। দুইটীর উদ্দেশ্যই হইল সমাজে ধনসাম্যের ব্যবস্থা এবং দারিদ্র্য-নিবারণ।
অতএব দেখা যাইতেছে, কমিউনিজম্, যে-উদ্দেশ্যে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে এত লড়াই করিতেছে, সেই উদ্দেশ্য সাধন করিবার জন্য ইসলাম বহু পূর্ব্বেই তাহার ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছে।
হজরত মোহাম্মদের নিজের জীবনে এই আদর্শই আমরা প্রতিফলিত দেখিতে পাই। বিবি খাদিজার অগাধ ধন-সম্পত্তির তিনি মালিক হইয়াছিলেন। এতদ্ব্যতীত ইসলাম যখন বিজয়ী হইল, তখন যুদ্ধলব্ধ ধনরত্ন ও অন্ত্য দ্রব্যের এক-পঞ্চমাংশ তাঁহার প্রাপ্য ছিল। কিন্তু কোথায় গেল সেই বিপুল অর্থ ও সম্পদ? সমস্তই তিনি দীন-দরিদ্রের সেবায় ব্যয় করিয়া দিলেন। বহুভাবে বহু অর্থ তাঁহার হাতে আসিত, কিন্তু মহামানব তিন দিনের বেশী তাহা ঘরে মজুত করিয়া রাখিতেন না। মৃত্যুর সময়েও সঞ্চিত তিনটি দিনার বিতরণ করা হইয়াছে কি না, বার বার করিয়া তাহা বিবি আয়েষাকে শুধাইয়াছেন এবং সেগুলি বিতরণ না করা পর্য্যন্ত তিনি শান্ত হন নাই। কিছু যৎসামান্য ধন-সম্পত্তি ছিল—সমস্তই তিনি মৃত্যুকালে নিজের যাহা দুহুদিগের কল্যাণে দান করিয়া যান এবং বলেন: “পয়গম্বরদিগের সম্পত্তির কোন উত্তরাধিকারী নাই।”
(৫) সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধতায়ঃ— শুধু পুঁজিবাদের বিলোপ সাধনই কমিউনিজমের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়; যেহেতু পুঁজিবাদ হইতেই সাম্রাজ্যবাদ জন্মলাভ করে, এ কারণ সাম্রাজ্যবাদকে ধ্বংস করাও কমিউনিজমের অন্যতম লক্ষ্য। অন্য কথায়ঃ সাম্রাজ্যতন্ত্র তুলিয়া দিয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাই কমিউনিজমের উদ্দেশ্য। বলা বাহুল্য, ইসলামের লক্ষ্যও তাই। ইসলাম স্বৈরতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের বিরোধী। গণতন্ত্রই ইসলামের রাষ্ট্র-আদর্শ। কমিউনিজম যেমন রাজতন্ত্র তুলিয়া দিয়া প্রতিনিধিত্বমূলক গণশাসন প্রবর্তন করিয়াছে, ইসলাম চৌদ্দশত বৎসর পূর্ব্বে অবিকল ইহাই করিয়া রাখিয়াছে। ইসলামের খেলাফৎ-তন্ত্র সোভিয়েট-তন্ত্রেরই জন্মদাতা। মুসলমানের ‘খলিফা’ বা ‘আমিরুল মুমেনিন’ও যা, সোভিয়েট রাশিয়ার ‘ডিক্টেটর’ও ঠিক তাই। হজরত মোহাম্মদের জীবদ্দশাতেই এই নূতন রাষ্ট্রতন্ত্রের প্রথম প্রচলন হয়। হজরত নিজেই ছিলেন ইহার পথ-প্রদর্শক। তারপর তাঁহার মৃত্যুর পর বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের জন্য কোন সম্রাট নির্বাচিত হন নাই—হইয়াছেন খলিফা অর্থাৎ প্রতিনিধি। অবশ্য এই ইসলামিক সাধারণতন্ত্র বেশীদিন স্থায়ী হয় নাই; ‘খোলাফায়ে রাশেদীন’ অর্থাৎ প্রথম খলিফা-চতুষ্টয় (হজরত আবু বকর, হজরত ওমর, হজরত ওসমান ও হজরত আলি) এই আদর্শকে বজায় রাখিয়া গিয়াছেন। ইহার পরই মুসলিম-জগতে বংশানুক্রমিক ভাবে খলিফা-নির্বাচন আরম্ভ হয় এবং অন্যান্য স্থানে সাম্রাজ্যতন্ত্রও প্রতিষ্ঠিত হয়। খলিফাদিগের শাসনকাল দীর্ঘ হয় নাই, সত্য; কিন্তু তাহাতে কিছুই যায় আসে না। নূতন আদর্শ-প্রদর্শনের পক্ষে উহাই যথেষ্ট। হজরত মোহাম্মদ বহু আদর্শের শুধু রেখাপাতই করিয়া গিয়াছেন মাত্র, সেই সব আদর্শ লইয়া ভবিষ্যৎ জগৎ গড়িয়া উঠিবে—ইহাই ছিল তাহার উদ্দেশ্য। এই হিসাবে সন্নকালস্থায়ী খোলাফায়ে রাশেদীন বিশ্ববাসীর পক্ষে এক পরম সম্পদ। দীর্ঘ চতুর্দশ শতাব্দী পরে এই খোলাফায়ে রাশেদীনেরই পাশ্চাত্য রূপ আমরা রাশিয়া-ফ্রান্স-আমেরিকা প্রভৃতি দেশে দেখিতে পাইতেছি। লেনিন বা স্ট্যালিন নবযুগের এক একজন বিধর্মী খলিফা বিশেষ! নয় কি? ইসলামের প্রেরণা লাভ করিয়াই কি তাহারা এই নূতন শাসনতন্ত্র প্রবর্তন করে নাই? ইসলামের অনুকরণ ছাড়া ইহাকে আর কী বলা যায়? মুসলমানের কাছে কমিউনিজম তাই আদৌ কোন বিস্ময়ের বস্তু নয়। কমিউনিজম ইসলামেরই অনুকরণ মাত্র— নূতন সৃষ্টি নয়। আর—যে হেতু ইহা অনুকরণ, এই কারণেই ইহা অসম্পূর্ণ এবং মৌলিক হইতে এক ধাপ নীচু।
(৬) শক্তির সাধনায়ঃ— কমিউনিস্টরা শক্তির পূজারী। তাহাদের ধ্যান-ধারণা অপর সকলে সহজে গ্রহণ না করিতে চাহিলে শক্তি-প্রয়োগ দ্বারা অথবা বিপ্লব ঘটাইয়া তাহারা নিজেদের মতকে সুপ্রতিষ্ঠিত করিতে চায়। এই শক্তিমন্ত্র কমিউনিস্টরা ইসলামের ‘জেহাদ’ হইতে গ্রহণ করিয়াছে। অবশ্য জেহাদের তাৎপর্য্য আরও মহৎ। ইসলামের ধ্যান-ধারণা যাহাতে বিনা বাধায় পথ কাটিয়া অগ্রসর হইতে পারে, সেই জন্যই তার পিছনে ছিল শক্তির এই সতর্ক পাহারা। যেখানে সত্য, সুন্দর এবং মঙ্গলের প্রশ্ন, সেখানে শক্তির প্রয়োজন আছে বৈ কি! সত্য, ন্যায় ও আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করিতে গেলে অহিংসা দ্বারা তাহা সম্ভব হয় না। সত্য ও আদর্শের জন্য সংগ্রাম করার নামই জেহাদ। এই জেহাদের মন্ত্রই কমিউনিস্টরা আজ বিকৃত ভাবে নিজেদের কাজে লাগাইতেছে।
(৭) সম্পত্তির বণ্টন-ব্যবস্থায়ঃ— কমিউনিজম্ ধনসম্পত্তি হইতে ব্যক্তিগত অধিকার তুলিয়া দিয়াছে এবং সমস্ত সম্পত্তিই স্টেটের—এই নীতি গ্রহণ করিয়াছে। এখানেও ইসলামী আদর্শ প্রকাশ পাইয়াছে। কমিউনিজম্ সমস্ত সম্পত্তি স্টেট্কে অপর্ণ করিয়াই সন্তুষ্ট হইয়াছে, কিন্তু ইসলাম ইহা অপেক্ষাও আর এক ধাপ উর্দ্ধে উঠিয়াছে। কোরান বলিতেছেঃ—
“লা হু মা ফিচ্ছামাওয়াতে ওয়া মা ফিল আরদে”
অর্থাৎ: আকাশ-পৃথিবীর যাহা-কিছু সমস্তই আল্লার।
‘সমস্ত সম্পত্তি স্টেটের’ এই কথার চেয়ে ‘সমস্ত সম্পত্তি আল্লার’—একথার মধ্যেই কি বৃহত্তর কমিউনিজম নাই? সমস্ত কিছুর মালিকই আল্লাহ—এ কথা দ্বারা সবকিছুতেই যে মানব-সমাজের তুল্য অধিকার আছে, তাহাই বলা হইয়াছে। যেমন উপভোগ্য আলো-বাতাস, তেমনি উপভোগ্য ধন-সম্পদ। উপভোগের এই অধিকার আল্লাহ্-তা’লারই দান কাজেই সেই অধিকার হইতে যদি কেহ কোন মানুষকে বঞ্চিত করিয়া রাখিতে চায়, তবে তাহা গুরুতর অন্যায় ও পাপ। ধন-সম্পত্তির বণ্টনব্যবস্থা তাই এমন হওয়া উচিত—যেন সকলেই উহা উপভোগ করিতে পারে। মুষ্টিমেয় কতিপয় লোক যদি যত পায় ততই গ্রাস করিয়া বসে, তবে তার অর্থ দাড়ায় এই যে, সে অপরের ন্যায্য প্রাপ্যই গ্রাস করিয়াছে। কোরান এই সর্ব্বগ্রাসী লোভাতুরদিগের উদ্দেশ্যেই বলিতেছে:
“হে বিশ্বাসীগণ, অন্যায় করিয়া তোমরা কাহারও কোন সম্পত্তি গ্রাস করিও না।”
—(৪:২৯)
অন্যায় করিয়া যাহারা ধন-সম্পত্তি মজুদ করিয়া রাখিবে, তাহাদের প্রতি আন্নার ভীষণ শান্তির কথাও কোরান বারে বারে ঘোষণা করিয়াছে:
“(তাহারা এই ভীষণ আগুনে পুড়িবে) যাহারা ধন-সম্পত্তি মজুত করিয়া বা বন্ধ করিয়া রাখে।”
—(৭০ঃ১৮)
ধন-সম্পত্তিতে যে নিঃস্ব ও বঞ্চিতদের একটা বিশিষ্ট অংশ আছে, সে সম্বন্ধে কোরান বলিতেছেঃ
“(তাহারাই শাস্তি পাইবে না) যাহারা তাহাদের সম্পত্তি হইতে একটা নির্দ্দিষ্ট অংশ ভিক্ষুক এবং অভাবগ্রস্তদিগকে দান করে।” —(৭০ঃ২৪—২৫)
হাদিস-শরীফে উক্ত হইয়াছেঃ—
“আদম সন্তানের মাত্র এইটুকুই অধিকার আছে যে, সে শুধু একখানি বাসোপযোগী গৃহ পাইবে, লজ্জানিবারণের উপযোগী একখানি বস্ত্র পাইবে এবং এক টুকরা রুটী এবং কিছু পানি পাইবে।”
—(তিরমিজী)
আর একটা হাদিসে আছেঃ
মুসলমানের ‘ওয়াক্ফ’-আইনে কোরান ও হাদিসের এই আদর্শই অভিব্যক্ত হইয়াছে। মুসলমান তাহার ধন ও সম্পত্তিকে ‘ওয়াক্ফ’ করিয়া আল্লার হাতে তুলিয়া দেয়। আর্দ্র, পীড়িত, অত্যাচারিত এবং অভাবগ্রস্তের সেবা ও সাহায্য এবং দেশের বহু জনহিতকর কার্য্য ওয়াক্ফ স্টেট্ হইতে সাধিত হয়।“যাহার প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভারবাহী পশু আছে, সে যেন যাহার নাই তাহাকে বেশীটা দান করে; যাহার বেশী খাদ্যশস্য আছে, সে যেন যাহার নাই তাহাকে বেশীটা দেয়,...এইরূপে হজরত আরও অনেক জিনিষের নাম করিলেন যদ্দ্বারা আমরা পরিষ্কার বুঝিতে পারিলাম যে, আমাদের যে-কোন অতিরিক্ত জিনিসই থাকিবে, তাহাতেই আমাদের কোন অধিকার নাই।”
—(মুসলিম ও আবু দাউদ)
এইখানেই শেষ নয়। মুসলিমের ধন-সম্পত্তি যে বিতরণের জন্য এক হাতে মজুত করিয়া রাখিবার জন্য নয়—তাহার আর একটা বড় প্রমাণঃ সম্পত্তির ফারায়েজ ব্যবস্থা। মুসলমানের সম্পত্তিতে বহু আত্মীয়স্বজনের অংশ ও দাবী থাকে। শুধু যে পুরুষেরাই অংশীদার হয়, তাহাও নহে; মেয়েরাও অংশ পায়। মুসলমানের সম্পত্তি তাই এক হাতে পুরুষানুক্রমে ধরিয়া রাখিবার উপায় নাই। ইহা বিচরণশীল, হাতে হাতে ইহা ঘুরাফেরা করে। মুসলমানের জমিদারী বা সম্পত্তি ভাগ হইয়া যায় বলিয়া অনেক অজ্ঞ ব্যক্তি ইসলামী উত্তরাধিকার-আইনকে নিন্দা করিত; কিন্তু কমিউনিজমের কল্যাণে ঐ নিন্দাই এখন প্রশংসায় পরিণত হইয়াছে। হিন্দু সমাজে এখন আইন করিয়া এই বণ্টন-ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রয়াস চলিতেছে। আজ সকলেই বুঝিতে পারিতেছে, হজরত মোহাম্মদ কী অপরিসীম কল্যাণই না বিশ্ববাসীর জন্য বহন করিয়া আনিয়াছেন! পুঁজিবাদী এবং স্বার্থপর আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তিরাই ইসলামের এই বিতরণ-মূলক ব্যবস্থাকে নিন্দা করিবে, কিন্তু যাহারা আদর্শবাদী, যাহারা মানবপ্রেমিক, ও গণতন্ত্রের উপাসক, তাহারা ইসলামের এই দূরদর্শিতা দেখিয়া অবাক হইবে। জগতের চিন্তাধারা ঘুরিয়া ফিরিয়া ইসলামের দিকেই আসিতেছে কিনা, পাঠক তাহা চিন্তা করুন।
(৮) সুদপ্রথা নিবারণেঃ—সুদপ্রথা পুঁজিবাদের প্রধান সহায়ক। কমিউনিজম্ তাই এই সুদপ্রথা একেবারে তুলিয়া দিয়াছে। সোভিয়েট রাশিয়ায় কোনরূপ মহাজনী কারবার নাই। বলা বাহুল্য, ইহাও ইসলামের জয়-ঘোষণা। ইসলাম সুদকে যে কিরূপ ভাবে নিন্দা করিয়াছে, একথা সকলেই জানেন। কোরান বলিতেছেঃ
“যাহারা সুদ খায় তাহারা উন্নতি করিতে পারে না... আল্লাহ্, তেজারতি হালাল করিয়াছেন, কিন্তু সুদকে হারাম করিয়াছেন।” —(২ : ২৭৫)
“হে বিশ্বাসীগণ, কখনও সুদ খাইও না—একটার পর একটী (চক্রবৃদ্ধি হারে) এবং আল্লার প্রতি তোমাদের কর্ত্তব্য সম্বন্ধে সতর্ক হও—যাহাতে তোমরা কৃতকার্য্য হইতে পার।” —(৩ : ১২৯)
অন্যত্র আছেঃ
“এবং ধন-সম্পত্তি বাড়াইবার আশায় সুদের দ্বারা যাহাই কেন উপার্জ্জন কর না, উহাতে আল্লার নিকট তোমাদের সম্পত্তি বৃদ্ধি পাইবে না, বরং যাহা কিছু তোমরা আল্লার খুশীর জন্য দান কর,—তাহারাই সেই লোক যাহারা বহুগুণ বেশী পাইবে।
—(৩০:৩৯)
সুদ মানুয়ের অন্তরকে পাষাণ করিয়া তুলে। Shylock যে Antonioর বুক হইতে এক পাউণ্ড মাংস কাটিয়া লইতে চাইয়াছিল, তাহার পক্ষে খুবই স্বাভাবিক হইয়াছিল। ইহা অন্তরের সুকুমার বৃত্তিগুলি মরিয়া গেলে মানুষের এই দশাই হয়। মানুষকে শোষণ করিয়া নিজে বড় হইবার এই জঘন্য প্রবৃত্তি সমাজতন্ত্রের ঘোর প্রতিকূল (anti-social)। কাজেই ইসলাম ইহাকে এত ঘৃণা করিয়াছে। শুধু যাহারা সুদ খায়, তাহাদিগকেই যে ইসলাম শাস্তির ভয় দেখাইয়াছে, তাহা নয়। সুদ যাহারা দেয়, সুদের দলিল যাহারা লিখে এবং সেই দলিলে যাহারা সাক্ষী হয়—সকলেই তুল্যরূপে অপরাধী বলিয়া ঘোষিত হইয়াছে। ইসলামের সত্য আজ কমিউনিজমের মধ্য দিয়া কী উজ্জল বেশেই না আত্মপ্রকাশ করিয়াছে!
(৯) শ্রমের মর্য্যাদা-দানেঃ— কমিউনিজম্ শ্রমের মর্য্যাদা (Dignity of Labour) দিয়াছে। “No work, no bread” (কাজ না করিলে খাইতে পাইবে না)—ইহাই কমিউনিজমের মূলমন্ত্র। অলস নিঙ্কর্ম্মা হইয়া সঞ্চিত অর্থ উপভোগ করা—সে হইবে না, প্রত্যেককেই কাজ করিয়া খাইতে হইবে। কমিউনিজম্ তাই ভিখারী ও নিষ্কর্ম্মাদিগকে দু’চোখ পাতিয়া দেখিতে পারে না। বস্তুতঃ কমিউনিজম্ হইতেছে শ্রমিকদিগেরই (Labour Class) ব্যাপার; ইহাদের হাতেই দেশের শাসন এবং পরিচালন। কান্তে এবং লাঙলই হইল কমিউনিজমের প্রতীক। কাজেই কমিউনিজম্ যে শ্রমকে যথেষ্ট মর্যাদা দিয়াছে, এ কথা বলাই বাহুল্য।
এই যে কর্ম্মপ্রীতি এবং শ্রমের মর্য্যাদা-দান, ইহাও ইসলামের শিক্ষা। ইসলাম আসিবার পূর্ব্বে জগতের কোন ধর্ম্মই শ্রম বা কর্ম্মকে শ্রদ্ধার চক্ষে দেখে নাই। বৌদ্ধ ধর্ম্ম ছিল নির্ব্বাণের ধর্ম্ম—অহিংসার ধর্ম্ম। কর্ম্মবিমুখতাই ছিল ইহার প্রধান বৈশিষ্ট্য; ‘শ্রমণ’ ও ‘ভিক্ষু’ গঠনই ছিল ইহার মূল উদ্দেশ্য। ভিক্ষাপাত্র হাতে করিয়া নির্ব্বাক ভাবে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরিয়া বেড়ানই হইল আদর্শ বৌদ্ধের কাজ। হিন্দুধর্ম্মের আদর্শও ছিল সন্ন্যাস। ষড়দর্শনের কোথাও কর্ম্মকে প্রাধান্য দেওয়া হয় নাই। এই জগৎ দুঃখময়, এই দুঃখ হইতে মুক্তি বা কৈবল্যলাভই হইল হিন্দু-দর্শনের সার কথা। এই মুক্তির শ্রেষ্ঠ পন্থা হইতেছে কর্মবর্জ্জন, কারণ কর্মই হইতেছে বন্ধন, কর্ম্মই হইতেছে সকল দুঃখের মূল, কেননা কর্ম্মফলেই মানুষকে বারে বারে জন্মগ্রহণ করিতে হয়। কর্ম্ম ঘৃণ্য বলিয়াই ত যত-কিছু শ্রমসাধ্য কর্ম্ম শূদ্রদিগকে করিতে বলা হইয়াছে; আর তাহাদিগকে নানাবিধ নীচ কর্ম্ম করিতে হয় বলিয়াইত সমাজে তাহারা পতিত এবং অস্পৃশ্য। সংসারের কর্মে লিপ্ত হইয়া পাছে শূদ্রকূলে জন্মিতে হয়, এ ভয় প্রত্যেক হিন্দুর আছে। পুনর্জন্মবাদের ধারণা তাই হিন্দু-মনকে নিষ্ক্রিয় উদাসীন করিয়া রাখিতে বাধ্য। কর্ম্মই যখন জীবনের বন্ধন এবং সেই বন্ধনের ফলেই যখন তাহার বারে বারে প্রত্যাবর্ত্তন, তখন কর্ম্ম হইতে যতটা দূরে থাকা যায়, ততই মঙ্গল—ইহাই হিন্দুধর্ম্মের কর্ম্ম-দর্শন।
খৃষ্টধর্ম্মও মূলতঃ সন্ন্যাসের (renunciation) ধর্ম্ম। সেখানেও কর্ম্মকে উচ্চ আসন দেওয়া হয় নাই। বরং শ্রীকৃষ্ণকে আমরা যেরূপেই হউক কর্ম্মীরূপে দেখিতে পাই; কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের তিনিই ছিলেন প্রধান নায়ক, কিন্তু যিশুখৃষ্টকে আমরা কোন অবস্থাতেই কর্মীরূপে দেখি নাই। শুধু প্রেম-প্রীতি এবং নীতি-বাক্যই তিনি শিক্ষা দিয়া গিয়াছেন।
কিন্তু হজরত মোহাম্মদ আনিলেন জীবনের এক নূতন দর্শন। বংশকে মর্য্যাদা না দিয়া মর্য্যাদা দিলেন তিনি কর্ম্মকে। কর্ম্মে যে বড় হইবে, সেই বড়—ইহাই তাঁহার কথা! জীবনের অর্থই হইল কর্ম্ম; এ জীবন কর্ম্মময়; কর্ম্মের জন্যই মানুষকে দুনিয়ায় পাঠান হইয়াছে। মানব-জীবন একটি ক্ষেত্র বিশেষ; পরিশ্রম দ্বারা চাষ করিয়া এখানে সুকর্ম্মের বীজ বপন করিলে পরিণামে তাহা হইতে সুফল পাওয়া যাইবে, পক্ষান্তরে এজমি পতিত রাখিলে কোন ফলই ফলিবে না—ইহাই জীবনের সহজ ব্যাখ্যা। ইসলাম তাই শুধু নীতি বাক্যের ধর্ম্ম নয়; ইহা কর্ম্মের ধর্ম্ম।
কর্ম্ম সম্বন্ধে কোরান কি বলিতেছে, দেখুনঃ—
“উৎকৃষ্ট পুরস্কার হইতেছে কর্মীর পুরস্কার।”—(৩: ১৩৫)
“এবং নিশ্চয়ই মানুষের জন্য তাহার কৃতকর্ম্মের পুরস্কার ছাড়া আর, কিছুই নাই।”—(৫৩: ৩৯)
“যাহারা অলস ভাবে বসিয়া থাকে, তাহাদের চেয়ে যাহারা কাজ করে তাহাদিগকেই আল্লাহ্, ভালবাসেন।—(৪: ৯৫)
শ্রমিকদিগকে উৎসাহ দিবার জন্য আল্লাহ্, তাঁহার প্রিয় রসুলকে দিয়া বলাইতেছেন:
“বল, হে লোক সকল, তোমরা তোমাদের নিজ নিজ স্থানে থাকিয়া কাজ কর, নিশ্চয়ই জানিও (তোমাদের মত) আমিও একজন শ্রমিক।”—(কোরান, ৩৯: ৩৯)
হজরত মোহাম্মদ বলিয়াছেন:—
“যাহার শরীরে সামর্থ্য আছে, অথচ কাজ করে না, আল্লাহ্, তাহাকে ভালবাসেন না।”
“নিজ হাতে কর্ম্ম করিয়া যাহা খাওয়া যায়, তাহার চেয়ে সুন্দর জিনিষ আর কেহ কখনও খাইতে পারে না।—
(বোখারী)
“খাঁটী মুসলমান কপালে ঘর্ম্ম লইয়া মরে।”
—(তিরমিজী ও নেসাঈ)
ইহাই ইসলামের আদর্শ। এই আদর্শ হজরত মোহাম্মদ কেবল যে মুখে প্রচার করিয়াছেন, তাহা নয়,— কার্য্যতও দেখাইয়া গিয়াছেন। তিনি নিজ হাতে মাটি কাটিয়াছেন, নিজ হাতে কাঠ সংগ্রহ করিয়াছেন, নিজ হাতে মলমূত্রাদি পরিষ্কার করিয়াছেন, জুতা মেরামত করিয়াছেন, পিরহান সেলাই করিয়াছেন, যুদ্ধ করিয়াছেন, সৈন্য চালনা করিয়াছেন, রাজ্যশাসন করিয়াছেন। এক কথায় বলিতে গেলে হজরতের ছিল কর্ম্মময় জীবন। শৈশব হইতে আরম্ভ করিয়া মৃত্যু পর্যন্ত তিনি কঠোর জীবন-সংগ্রামে ব্যাপৃত ছিলেন।
অতএব আমরা দেখিলাম, ইসলাম জীবনকে যে অর্থে গ্রহণ করিয়াছে, কমিউনিজমও ঠিক তাহাই করিয়াছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে ভ্রান্ত পথে চলিয়াছে, এই বা পার্থক্য।
(১০) দাসপ্রথার উচ্ছেদ সাধনেঃ—সোভিয়েট রাশিয়ায় দাস প্রথা নাই। সকলকেই সম-অধিকার দান করায় এবং ধনসম্পত্তি সকলের মধ্যেই বিভাগ করিয়া দেওয়ায়, দাসপ্রথা আপনা-আপনিই উঠিয়া গিয়াছে। ইসলামেরও আদর্শ ঠিক ইহাই ছিল। ইসলাম দাসকে সর্ব্বপ্রকারে স্বাধীন মানুষের অধিকার দিয়াছে। হজরতের জীবনী যাহারা পাঠ করিয়াছেন, তাহারা জানেন—‘ওকাজ’ মেলা হইতে বিবি খাদিজা ‘জায়েদ’ নামক একটী দাসকে খরিদ করিয়া হজরতকে উপহার দিয়াছিলেন। হজরত জায়েদকে পাওয়া মাত্র তাহাকে মুক্ত করিয়া দিলেন। শুধু তাই নয়, জায়েদকে সঙ্গে লইয়া গিয়া প্রকাশ্য স্থানে তিনি ঘোষণা করিয়া দিলেন: “তোমরা সকলে সাক্ষী থাক, জায়েদ আমার পুত্র!” এইখানেই শেষ নয়; এই জায়েদের সঙ্গেই তিনি আপন ফুফাতো বোন জয়নবকে বিবাহ দিয়াছিলেন। তারপর এই জায়েদের পুত্র ‘ওসামা’ই সিরিয়া অভিযানে সেনাপতিপদে বরিত হইয়াছিলেন। পরবর্ত্তী কালে ক্রীতদাস কুতুবুদ্দীন ও ভারতের প্রথম মুসলমান সম্রাট হইবার গৌরব অর্জন করিয়াছিলেন। দাসমুক্তির এমন অত্যুজ্জল দৃষ্টান্ত জগতের ইতিহাসে কোথাও নাই।
(১১) শিক্ষা-বিস্তারেঃ- সোভিয়েট রাশিয়ায় শিক্ষা এখন বাধ্যতামূলক। প্রত্যেকেই শিক্ষার আলোক পাইবার অধিকার লাভ করিয়াছে। পূর্ব্বে শিক্ষা শুধুই উচ্চশ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কি ভারত, কি পারস্য, কি মিশর, কি ইউরোপ—সর্ব্বত্রই শিক্ষা ছিল অভিজাত সম্প্রদায়ের একচেটিয়া অধিকার। নিম্নশ্রেণীর লোকদিগকে কোনরূপ শিক্ষা দেওয়া হইত না। ইসলাম এই জঘন্ত প্রথা তুলিয়া দিয়া সকল মানুষকেই জ্ঞানের আলোকে মুক্তিস্নান করিবার অধিকার দিয়াছে। “প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর বিদ্যাশিক্ষা করা ফরজ”—ইহাই হজরতের বাণী। তিনি আরও বলিয়াছেনঃ—
“এক মুহূর্ত্তের জ্ঞান-চিন্তা সহস্র রজনীর উপাসনা অপেক্ষা শ্রেয়ঃ।”
কাজেই দেখা যাইতেছে, এই যে রাশিয়া এবং অন্যান্য দেশে বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তিত হইয়াছে, ইহা ইসলামের প্রেরণারই ফল। ইসলামের পূর্ব্বে সর্ব্বসাধারণকে শিক্ষা দিবার কথা কেহ স্বপ্নেও ভাবিতে পারে নাই।
(১২) নারীর মুক্তি-সাধনেঃ—সোভিয়েট রাশিয়ায় পুরুষের সঙ্গে সঙ্গে নারীরাও মুক্তি পাইয়াছে। সর্ব্ববিষয়ে তাহারা পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিয়াছে। বলা বাহুল্য, এখানেও ইসলাম তলে তলে ক্রিয়া করিতেছে। চৌদ্দশত বৎসর পূর্ব্বে ইসলাম নারীজাতিকে যে স্বাধীনতা ও অধিকার দান করিয়া রাখিয়াছে, আজ পর্যন্ত তাহা বিশ্ববাসীর অনুকরণীয় হইয়া রহিয়াছে। ইসলামের পূর্ব্বে কোন ধর্ম্মেই নারীর কোন মর্য্যাদা ছিল না, নারীকে অস্থাবর সম্পত্তির মতই মনে করা হইত। সর্ব্বপ্রকারে সে ছিল পুরুষের অধীন; ঘৃণ্য ছিল তার জীবন ও কর্ম্ম; কোন প্রকারের আইন ঘটিত অধিকার ছিল না তার। ঠিক এই অবস্থায় ইসলাম উদাত্ত স্বরে ঘোষণা করিলঃ—
“হে মানব সকল, তোমাদের প্রভুর প্রতি কর্ত্তব্য সম্বন্ধে তোমরা সজাগ হও—যে প্রভু একজন হইতে তোমাদিগকে সৃজন করিয়াছেন এবং তাহার সঙ্গিনীকে একই উপাদানে সৃষ্টি করিয়াছেন এবং তাহাদের দুইজন হইতে বহু নরনারীকে উৎপন্ন করিয়াছেন।”—(কোরান, ৪: ১)
“এবং পুরুষদের উপর স্ত্রীদের ঠিক সেইরূপ অধিকার আছে—যেমন স্ত্রীদের উপর পুরুষদের আছে।”
—(কোরান, ২: ২২)
“তোমরা তাহাদের ভূষণ এবং তাহারা তোমাদের ভূষণ।”
—(কোরান)
“পুরুষ যাহা উপার্জ্জন করিবে তাহার ফল সে ভোগ করিবে। নারী যাহা উপার্জ্জন করিবে তাহার ফল সে ভোগ করিবে।—(কোরান, ৪: ৩২)
“যে কেহই সৎকর্ম্ম করিবে—পুরুষই হউক, নারীই হউক—আমরা তাহাদের জীবনকে আনন্দময় করিব।”
—(কোরান, ১৬: ৯৭)
শুধু ইহজীবনে নয়; পরজীবনেও স্ত্রী-পুরুষের অধিকার সমান থাকিবে বলিয়া কোরান ঘোষণা করিতেছেঃ—
“যে কেহই সৎকর্ম্ম করিবে—পুরুষই হউক, নারীই হউক—এবং তাহারা যদি বিশ্বাসী হয়—স্বর্গোদ্যানে প্রবেশ করিবে।”
—(কোরান, ৪: ১২৪)
বিবাহের সময় স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর দেনমহরের ব্যবস্থা, স্বামী ও পিতার সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকার, সম্পত্তির ফারায়েজ-ব্যবস্থায় নারীর স্থান—ইত্যাদি সবকিছুই নারীর প্রতি ইসলামের মর্য্যাদাবোধের চুড়ান্ত নিদর্শন।
(১৩) অন্যান্য বিষয়েঃ—কমিউনিজমের অন্যান্য ধারণাও ইসলাম হইতে ধার করা। প্রত্যেক কমিউনিস্ট কে ‘কম্রেড’ (Comrade) বলা হয়। এই ‘কমরেড’ কথাটাও ইসলামী কায়দা-মাফিক। ‘কমরেডের’ অর্থ সহচর বা সহকর্মী। হজরত মোহাম্মদের সমসাময়িক শিষ্যদিগকেও সহচর নামেই অভিহিত করা হইত। আরবী ভাষায় এই সহচর বা সহকর্মীর পরিভাষাই হইল ‘সাহাবী’। সাহাবী শব্দটী সমতা বা ভ্রাতৃত্ব-বোধক। স্বয়ং হজরত মোহাম্মদকেও আল্লাহ তালা অ্যান্য মুসলমানদের ‘সাহাবী’ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেনঃ—
“মাদাল্লাহ সাহাবোকুম ওয়া না গাওয়া”
অর্থাৎঃ—তোমাদের সাহাবী (বন্ধু) মোহাম্মদ কখনও ভুল করেন না অথবা ব্যর্থ হন না।—(কোরান, ৫৩ : ২)
বলশেভিকদিগের জাগরণ-মন্ত্রে ও ইসলামের ছাপ পড়িয়াছে! বলশেভিক দিগের বাণী হইতেছে: “World comrades, arise!” অর্থাৎঃ “বিশ্ব-কমরেড, জাগো!” এই ‘জাগো’ (arise) কথাটা—কোরানের। এটী কর্ম্মে উদ্বুদ্ধ করিবারই বাণী। আল্লাহ্তালা ঠিক এই কথাটী বলিয়াই হজরত মোহাম্মদের কর্মজীবনকে জাগাইয়া দিয়াছিলেন:—
“হে বস্ত্রাচ্ছাদিত, জাগো, এবং সকলকে সতর্ক কর।”
— (কোরান, ৭৩ : ১)
কমিউনিস্টরা কোন-এক বিশেষ দেশে নিজেদের মত প্রতিষ্ঠিত করিয়াই সন্তুষ্ট হইতে চায় না—সমস্ত বিশ্বকে তাহারা নিজেদের মতে দীক্ষিত করিতে চায়। “World Communism” অর্থাৎ বিশ্ব-কমিউনিজমই তাহাদের লক্ষ্য। স্বীয় মতকে নিখিল বিশ্বে ছড়াইয়া দিবার এই যে স্বপ্ন—ইহাও ইসলাম হইতে গৃহীত। Pan-Islamই World Communismএর জন্মদাতা। প্যান্-ইসলাম অ-মুসলমানদের নিকট যেমন ভয়ের বস্তু, World Communismও তেমনি ভয়ের বস্তু অন্যান্য দেশের পক্ষে।
ইসলামের মূলমন্ত্র “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহো মোহাম্মাদর রসুলুল্লাহ” ইহার সহিতও কমিউনিজমের আশ্চর্যভাবে খানিকটা মিল ঘটিয়াছে। ইসলাম বলিতেছেঃ কোন ঈশ্বর নাই একমাত্র আল্লাহ ছাড়া। অতএব দেখা যাইতেছে সর্ব্বপ্রথমেই ইসলাম যাবতীয় মিথ্যা ঈশ্বরকে অস্বীকার করিতেছে। মুসলমানকে সর্ব্বাগ্রে বিশ্বাস করিতে হয় যে, তাদের উপাঙ্গ অন্য কোন ঈশ্বর নাই। এই ‘না’—এর তরবারি দ্বারা সমস্ত মনগড়া মিথ্যা ঈশ্বরের মাথা কাটিয়া তারপর সেই এক ও অদ্বিতীয় আল্লাকে অন্তরের সিংহাসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করিতে হয়। কমিউনিস্ট রাও ঈশ্বরকে একদম উড়াইয়া দিয়াছে। “কোন ঈশ্বর নাই” ইহাই তাহাদের মত। তাহা হইলে দেখা যাইতেছে: ইসলামের মূল-মন্ত্রের না-মূলক অংশটীকে (Negative portion) অর্থাৎ: ‘লা-ইলাহা’-টুকু তাহারা গ্রহণ করিয়াছে; এখন হা-মূলক অংশটুকু গ্রহণ করিতে বাকী! “ইল্লাল্লাহো মোহাম্মদার রসুলুল্লাহ” টুকু লইলেই—পুরাপুরি ইসলামকে গ্রহণ করা হইবে। সেই সময়ে কমিউনিজমের সমস্ত দোষক্রটাও দূর হইয়া যাইবে। পতিত জমীতে ভাল শস্য বুনিতে হইলে পূর্ব হইতেই যেমন সমস্ত অগাছা কাটিয়া চাষ করিয়া রাখিতে হয়, কমিউনিজম ও ঠিক যেন সেইরূপই রাশিয়াবাসীদের অন্তরভূমি হইতে সমস্ত মিথ্যা ঈশ্বররূপ অগাছাকে কাটিয়া মাটি চষিয়া ‘জো’-এর অপেক্ষায় আছে! উপযুক্ত সময়ে বীজ বপণ করিলেই সুফল অনিবার্য্য।
মার্কস্ ও লেনিন যখন ঈশ্বরকে উড়াইয়া দেন, তখনকার খৃষ্টানজগতের কথা চিন্তা করিলে তাঁহাদিগকে দোষ দেওয়া যায় না। পাদ্রী-পুরোহিতদিগের মনগড়া বহু দেবদেবী মানুষের মন ও মস্তিষ্ককে তখন আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছিল। ইহারই ফলে মানুষে মানুষে ঘৃণা-বিদ্বেষ, দুর্ণীতি ও কুসংস্কার পর্ব্বতপ্রমাণ স্তূপীকৃত হইয়া উঠিয়াছিল। তা ছাড়া পুরোহিতদিগের (Churchএর) এমনই অপ্রতিহত প্রভাব ছিল যে, যখনই কোন সংস্কারমূলক কর্ম্মে দেশনেতারা হস্তক্ষেপ করিতে যাইতেন, তখনই দেশের সম্রাট পুরোহিত দিগকে হাত করিয়া সকল প্রচেষ্টাকে নষ্ট করিয়া দিতেন। এই জন্যই মার্কস্ ও লেনিন ভাবিয়াছিলেন, মানুষে মানুষে সাম্য ও একতা। স্থাপনের পথে ধর্ম্মই যখন পদে পদে বাধা দিতেছে, তখন ধর্ম্মকে দাও একদম উড়াইয়া! ইহাই ভাবিয়া তাঁহারা ঘোষণা করিলেনঃ ঈশ্বর বা ধর্ম্মকে আমরা মানি না। বলা বাহুল্য, এই ঘোষণাদ্বারা নাস্তিকতা প্রচলিত হইলেও সঙ্গে সঙ্গে বহু অন্ধবিশ্বাসের মুলেও কুঠারাঘাত করা হইয়াছে—মিথ্যা কুসংস্কার ও ভেদবৈষম্যের প্রভাব হইতে মানুষের মনকে মুক্ত করিয়া আনিয়া উদার নীল আকাশের তলে তাহাকে দাঁড় করান হইয়াছে। এই কারণেই অত জাতিভেদ ও পার্থক্যের মধ্যেও মানুষ অত সহজে মানুষকে ‘ভাই’ (Camrade) বলিয়া কাছে ডাকিয়া লইতে পারিয়াছে। সুতরাং বলা যাইতে পারে, এই নাস্তিকতা কমিউনিজমের চরম কথা নয়, ইহা তাহার প্রাথমিক অবস্থা মাত্র।
তাহা হইলে দেখা যাইতেছে, কমিউনিজমের যতকিছু ধ্যান-ধারণা ও পরিকল্পনা, সমস্তই ইসলাম হইতে ধার করা। কাজেই মুসলমানের কাছে ইহা কোন নূতন-বস্তু নয় বা বে-খাপ্পা ও নয়। অবশ্য, ইহার সব-কিছুই ইসলামের সহিত হুবহু মিলিয়া যায় না; যেখানে মিলেনা, সেখানে ইহার ত্রুটি এবং সেইখানেই আমাদের আপত্তি।
এইবার আমরা সেই দোষত্রুটী ও পার্থক্যের কথাই বলিব।