বিষয়বস্তুতে চলুন

ইসলাম ও কমিউনিজ্‌ম্/ইসলামের সহিত কমিউনিজ্‌মের পার্থক্য

উইকিসংকলন থেকে

ইসলামের সহিত কমিউনিজ্‌মের পার্থক্য

 (১) কমিউনিজম্ ধর্ম্ম ও নীতি-বিরোধীঃ- সর্ব্বপ্রথম এবং সর্ব্বপ্রধান পার্থক্যই হইলঃ কমিউনিজম ধর্ম্মবিরোধী এবং আল্লাবিরোধী (Anti-God and anti-religious)। ঈশ্বরকে ত সে একদম উড়াইয়াই দিয়াছে, ধর্ম্মকেও বলিয়াছে “লোকদিগের আফিম” (Opiumof the people)। কার্ল মার্কস্ এবং লেনিন—উভয়েই ছিলেন ঘোর নাস্তিক। নাস্তিকতাই ছিল তাই বলশেভিকদিগের রাজধর্ম্ম। এই ধর্ম্ম সর্ব্বত্র প্রচারের জন্য রীতিমত ভাবে আয়োজন করা হইয়াছিল। লেনিন যখন সেণ্টপিটার এবং সেণ্ট পলের ক্যাথিড্রাল পরিদর্শন করিতে যান, তখন তথাকার প্রধান পুরোহিত এক হাতে বাইবেল ও অন্য হাতে ক্রুশ লইয়া প্রার্থনা করিতে আরম্ভ করেন। তাহা দেখিয়া লেনিন বলেনঃ

 "Stop this buffoonery. The power of the working classes comes from no gods, but from workshops, ploughs, from sweat of blood! Enough of your fables about gods. We want no more of the opium which binds the will of the people. There are no gods on earth or in heaven."

 “অর্থাৎঃ—আর তামাসা দেখাইও না। শ্রমিক-শ্রেণীর শক্তি কোন দেবতাদিগের নিকট হইতে আসে নাই—আসিয়াছে কারখানা হইতে, আসিয়াছে লাঙ্গল হইতে, আসিয়াছে দেহের ঘাম হইতে। দেবতা সম্বন্ধীয় ঝুটা গল্প অনেক শুনিয়াছি, আমরা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার প্রতিবন্ধক ঐ আফিম আর খাইতে চাহিনা। ঈশ্বর বলিয়া পৃথিবীতে বা স্বর্গে কেহ নাই।”

 কমিউনিজমের ধর্ম্মনীতি সম্বন্ধে একজন লেখক বলেনঃ—

 “It excludes, and dogmatically excludes, the supernatural, whether this takes the form of the primitive belief in good and evil spirits, of the more civilised reliance on a one omnipotent God (whether or not opposed by a Devil) involving the inmortality of all human beings destined for Heaven, Purgatory or Hell.

—Soviet Russia, by Sidney & Web, p. 42

 অর্থাৎঃ—কমিউনিজম্ অতিপ্রাকৃতিক কোন কিছুই মানে না—তা সে আদিম যুগের ভাল-মন্দের দুই দেবতাতে বিশ্বাসই হউক অথবা আধুনিক যুগের মার্জিত কোন সর্ব্বশক্তিমান ঈশ্বরে বিশ্বাসই হউক (সে ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী একজন শয়তান থাকুক বা নাই থাকুক) আর সেই সঙ্গে মানুষ যে অমর হইয়া স্বর্গে বা নরকে বাস করিবে, তাহাও সে মানে না।

 অন্যত্র দেখিতে পাওয়া যায়ঃ—

 “One of the most important tasks of the cultural revolution affecting the wide masses is the task of systematically and unswervingly combating religion—the opium of the people. The proletarian government must withdraw all State support from the Church which is the agency of the former ruling, class: it must prevent all church interference in state organised educational affairs, ruthlessly suppress the counter revolutionary activity of the ecclesiastical organisations on the basis of scientific materialism.”

—Program of the Communist International. p. 39

 অর্থাৎঃ—জনসাধারণের মধ্যে সংস্কৃতিগত বিপ্লব আনিবার পক্ষে আমাদের অন্যতম প্রধান কর্তব্য এই যে, ধর্ম্মকে রীতিমত ভাবে বাধাদান করিতে হইবে—সেই ধর্ম্ম যাহা মানুষের পক্ষে আফিম বিশেষ। গণশাসন তন্ত্র কিছুতেই কোন গীর্জ্জাকে রাজকীয় সাহায্য দান করিবে না, কারণ। গীর্জ্জা হইতেছে পূর্ব্ববর্ত্তী শাসক সম্প্রদায়ের সমর্থক। স্টেট-পরিচালিত যাবতীয় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ধর্ম্মের যেন কোন প্রভাব না থাকে। এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে গীর্জ্জা হইতে যদি কোন বিরুদ্ধ-আন্দোলন আসে, তবে তাহাও কঠোর হস্তে দমন করিতে হইবে। বৈজ্ঞানিক জড়বাদই হইবো আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টার ভিত্তি।

 লেনিনের মৃত্যুর পর নাস্তিকতাই সোভিয়েট ইউনিয়নের রাজধর্ম্ম হইয়াছিল বলিয়া জানা যায়ঃ—

 “It was some five years after the death of Lenin that a decree was issued (in May, 1929) giving atheism the status of a State dogma and granting to atheists the monopoly of the right to teach their belief. The Soviet Government soon after instructed the Commissar of Education to organise a special new Inspectorate of anti-religious propaganda, with branches in all district centres, to superintend the enforcement of the new Law restricting the liberties of the Church and forbidding all religious propaganda."

—Pan-Islamism & Bolshevism-pp. 416-17

 অর্থাৎঃ—লেনিনের মৃত্যুর পাঁচ বৎসর পরে (মে, ১৯২৯) নাস্তিকতাকে রাজকীয় ধর্ম্ম বলিয়া ঘোষণা করা হয় এবং নাস্তিকদিগকে নিজেদের মত-প্রচার করিবার একচেটিয়া অধিকার দিয়া একটী রাজকীয় ফরমান জারি করা হয়। অতঃপর সোভিয়েট গবর্ণমেণ্ট শীঘ্রই শিক্ষাসচিবকে ধর্ম্মহীনতা প্রচার করে একটা নূতন ইনস্পেক্টর-বিভাগ খুলিতে নির্দেশ দেন; নানাস্থানে উহার শাখাস্থাপনেরও ব্যবস্থা থাকে। উপরোক্ত নববিধান সর্ব্বত্র চালু করা, গীর্জার স্বাধীনতা খর্ব করা এবং কোন প্রকার ধর্মবিষয়ক প্রচারণা যাহাতে কেহ না চালায়—ইহারই তত্ত্বাবধান করা ছিল উক্ত বিভাগের উদ্দেশ্য।

 কমিউনিজম্ কোন নীতিরও ধার ধারে না। বিখ্যাত রুশ-গ্রন্থকার গর্কী এক সময় লেনিনকে প্রশ্ন করেন: আপনি কোন নীতি মানেন কি? লেনিন উত্তর দিয়াছিলেন:

 “Who ever told you, Comrade, that I had principles or believed in morality?”

 অর্থাৎঃ—কে তোমায় কবে বলিয়াছে, বন্ধু, যে আমি কোন নীতি বা ধর্ম্ম মানিয়া চলি?

 অন্য আর এক সময় লেনিন বলিয়াছিলেনঃ—  “Get rid of your prejudices, comrades. Do dot worry about rights and wrongs.”

 অর্থাৎঃ—বন্ধুগণ, তোমাদের ঐ সব কুসংস্কার বর্জ্জন কর। ন্যায়-অন্যায় লইয়া অত মাথা ঘামাইও না।

 ইহাই যদি হয় কমিউনিজমের স্বরূপ, তবে দূর হইতে ইহার প্রতি সহস্র নমস্কার! এরূপ মতবাদকে কোন মুসলমানই গ্রহণ করিতে পারে না—তা তার অন্য যত গুণই থাকুক। মুসলমানের জীবনের লক্ষ্য এবং আদর্শ ইহা অপেক্ষা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তার জীবনের লক্ষ্য শুধুই খাওয়াপরা এবং স্ফুর্ত্তি করা নয়; এই দুনিয়ার সুখ-সুবিধাকেই সে একমাত্র কাম্য বলিয়া মনে করে না। তার অস্তিত্বের অণুপরমাণুতে ঝঙ্কৃত হয় অসীম অনন্ত আকাশের সুর। তার মূল্য-জ্ঞান (Sense of Value) অনেক উন্নত। সে জহুরী, কাঁচের চাকচিক্যে সে ভুলে না! ধ্রুবের সন্ধানী সে। তার পথ ভুল হয় না। তার উৎপত্তি এবং পরিণতি সম্বন্ধে সে সজাগ। “তোমরা আমা হইতেই আসিয়াছ এবং আমাতেই ফিরিয়া যাইবে”—আল্লাহ, পরিষ্কার ভাবে তাহাকে এ কথা শুনাইয়া দিয়াছেন। মুসলমানের জীবন-মরণ তাই আল্লাকে কেন্দ্র করিয়াই পরিক্রমণ করে। সৌধ-নির্ম্মাণ করিতে গেলে তার নীচে যেমন একটা সুদৃঢ় ভিত্তি থাকে, মুসলমানের সমস্ত ধ্যান-ধারণা—তার রাষ্ট্র, সমাজ, জীবন ও মরণ—সকলেরই মূলে আছে তেমনি আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাস। ইসলাম তাকে শিক্ষা দিয়াছেঃ—

“বল (হে মোহাম্মদ), নিশ্চয়ই আমার আরাধনা, ত্যাগ, জীবন ও মরণ সমস্তই আল্লার জন্য।”

—(কোরান, সুরাআনাম: ১৬৩)

 ইহাই ইসলামের শিক্ষা। কাজেই আল্লাকে বাদ দিয়া বা ধর্ম্মকে বর্জ্জন করিয়। তার কোন কাজই সম্ভব নয়। ভিত্তিহীন সৌধের মতই সে হয় একটা অন্তঃসারশূন্য মিথ্যাবস্তু। কমিউনিজমের ব্যাপক অনুষ্ঠান দেখিলে তাই মনে হয়—এ যেন মস্তকবিহীন একটা বিরাটকায় জন্তু—যার হাত, পা, জবান, সবই কাজ করিতেছে, কিন্তু সব কিছুই উদ্দেশ্য বিহীন এলোমেলো।

 যে নীতির উপর কমিউনিজম্ আপন কাঠামটা দাঁড় করাইয়াছে, তাহার সঙ্গেই বা এই নিরীশ্বরবাদ খাপ খায় কি করিয়া? ছোট-ছোট সোভিয়েট লইয়া এক একটা রিপাবলিক, আবার সেই রিপাবলিকগুলি লইয়া একটী ইউনিয়ন এবং সেই ইউনিয়নের নিয়ামক হইতেছেন একজন ডিক্টেটর। ইহাই হইল সোভিয়েট রাষ্ট্রতন্ত্র। বর্ত্তমানে স্ট্যালিন হইলেন সেই ডিক্টেটর। কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয়, সোভিয়েট ইউনিয়ন সম্বন্ধে যাহা সত্য হইল, নিখিল বিশ্বের যুক্তরাষ্ট্র সম্বন্ধে তাহা সত্য হইল না! সেখানে আসিয়াই উহার ডিক্টেটরকে একদম অস্বীকার! এ যেন ঠিক স্ট্যালিন-হীন সোভিয়েট ইউনিয়ন! অথবা এ যেন একটা বিরাট বিবাহ-মহোৎসব, খাওয়া-দাওয়া, আমোদ-প্রমোদ—সবই হইল, কিন্তু বর নাই!

 সোশ্যালিজম্ কিসের জন্য? কমিউনিজম্ কিসের জন্য? মানুষের প্রতি এই দরদ, এই সাম্য, এই মৈত্রী, এই বিশ্বভ্রাতৃত্বের পরিকল্পনা—কিসের জন্য? সব কিছুই অর্থহীন হইয়া দাঁড়ায়—যদি এর পিছনে আল্লার স্বীকৃতি না থাকে। কেন্দ্রবিহীন বৃত্তের ন্যায় আমাদের সব আয়োজন—সব আবর্ত্তন ব্যর্থ হইয়া যায়। এক-পিতৃত্ব স্বীকার না করিলে যেমন ভায়ে ভায়ে সদ্ভাব হইতে পারে না, সম-উৎপত্তিস্থল স্বীকার না করিলে তেমনি বিশ্বভ্রাতৃত্ব স্থাপিত হইতে পারে না! এক আল্লাহ আমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন, সব মানুষই তাঁহার সৃষ্টি, কাজেই সব মানুই ভাই-ভাই—ইহাই হইবে আমাদের যুক্তিসঙ্গত মনোভাব। একই উৎস-মুখ স্বীকার করিলে তবেই আমরা পরস্পর সমান হইতে পারি। ইসলামের সোশ্যালিজম ঠিক এই আদর্শে ই গঠিত। আল্লাহ আমাদের একমাত্র প্রভু, বিশ্বনিখল তাঁরই সৃষ্টি, স্বর্গ-মর্ত্যের সব-কিছুই তাঁর; সব কিছুই আমাদের ভোগের জন্য তিনি সৃষ্ট করিয়াছেন, আমরা সকলে মিলিয়া সেই সম্পদ উপভোগ করিব এবং তাঁহারই গুণগান করিব—ইহাই ইসলামের শিক্ষা। মানুষের প্রতি মানুষের প্রেম, ভালবাসা, হাম্দদী, সেবা, সহানুভূতি, ন্যায়বিচার—সব-কিছু তথনই আসে—যখন আমর। আল্লাকে মানি। সত্য, সুন্দর এবং মঙ্গলের সেই চিরন্তন আদর্শকে বাদ দিলে আমাদের জীবন ও কর্ম্মের কোনই অর্থ হয় না, মূল্যও হয় না। মানুষের অন্তরের নিগূঢ়তম প্রদেশে এই বিশ্বাস—এই অনুভূতি নিহিত রহিয়াছে, কিন্তু জড়জীবনের ক্ষুধার তাড়নায় কমিউনিজম্ সে অনুভূতিকে চাপা দিয়াছে।

 মানুষকে দুইটা সম্বন্ধ মানিয়া চলিতে হয়ঃ (১) মানুষের সহিত মানুষের সম্বন্ধ (২) আল্লার সহিত মানুষের সম্বন্ধ। কমিউনিজ্‌ম্‌ আল্লার সম্বন্ধের কথা ভুলিয়া গিয়া মানুষের সম্বন্ধ লইয়াই মাথা ঘামাইতেছে। এই জন্যই ইহা একপার্শ্বিক হইয়াছে।

 জড়বাদীরা আজ আত্মাকে (Spirit) অস্বীকার করিয়া জড়জীবনকেই চরম এবং পরম বলিয়া মনে করিতেছে, কিন্তু ইসলামের শিক্ষা তাহা নয়। কোরান বলিতেছেঃ—

“অতঃপর তিনি (আল্লাহ্) তাহাকে (মানুষকে) সর্ব্বাঙ্গসুন্দর করিলেন এবং তাঁহার (আল্লার) রুহ্ (Spirit) তাহার (মানুষের) মধ্যে প্রবিষ্ট করাইলেন।”—(৩২৯)

 বাস্তবিকই তাই। জড় (Matter) এবং আত্মা (Spirit)—এই দুইএর সমন্বয় হইয়াছে বলিয়াই মানুষ সর্ব্বাঙ্গসুন্দর হইয়াছে। কাজেই কমিউনিজম্ যখন একটীকে স্বীকার করিয়া অপরটীকে অস্বীকার করিতেছে, তখন ইহা যত ভালই হউক,—ঠিক পূর্ণাঙ্গ নয়, এ কথা নিশ্চয়। ইহার গোড়াতেই রহিয়াছে মস্ত বড় গলং। মানুষের প্রকৃতির সহিত তার সমাজ ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থার সামঞ্জস্য থাকিতেই হইবে, অন্যথায় ইহা অস্বাভাবিক এবং অসম্পূর্ণ হইতে বাধ্য।

 আর একটী কথা। জড়বাদ এখন বৈজ্ঞানিক-জগতে অচল। ঈশ্বর (God) বলিয়া কিছু নাই, সমস্তই জড়ের লীলাখেলা—এ মতবাদ বহুপূর্ব্বেই প্রত্যাখ্যাত হইয়াছে। Sir Jene Jeams প্রমুখ বৈজ্ঞানিকেরা এখন মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিতেছেন যে, এই পরিদৃশ্যমান জগতের পশ্চাতে নিশ্চয়ই একজন নিয়ন্তা আছেন। অথচ আশ্চর্য্যের বিষয়, ঊনবিংশ শতাব্দীর সেই পুরাতন জড়বাদের ভিত্তির উপরেই কমিউনিজম্ দাড়াইয়া আছে! বিংশ শতাব্দীর নববিজ্ঞানের আলোকে কমিউনিজকে পরীক্ষা করিতে গেলে ইহার বুনিয়াদ চুরমার হইয়া যায় না কি? ‘দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ’ (Dialectical Materialism) হইতে যদি বস্তুবাদ (Materialism) টুকুই মিথ্যা হইয়া যায়, তবে আর থাকে কি? মার্কস্বাদ (Marxism) যে সুদৃঢ় বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত বলিয়া কমিউনিস্টরা এত ভড়ং করে, সেই গর্ব্ব অলীক বলিয়া মনে হয় না কি? সত্যই মার্কসের মতবাদ যে বিজ্ঞানসম্মত নয়, একথা এখন অনেকেই বলেন। “Marxism—Is it Science?” এই ধরণের প্রশ্ন পূর্ব্বেই উঠিয়াছে। বিরুদ্ধবাদীরা দেখাইয়াছেন যে, মার্কস, যাহাকে বৈজ্ঞানিক সত্য বলিয়া চালাইতে চান, তাহাও মূলতঃ একটা ব্যক্তিগত মত বা বিশ্বাস ছাড়া আর কিছুই নয়।

 কমিউনিজমের দার্শনিকতা অস্বাভাবিক এবং ইসলামবিরোধীঃ— দুঃখ ও অভাবকে দূর করিয়া সকল মানুষকে সুখী করা এবং প্রত্যেককেই তুল্য জ্ঞান করা—এই দুইটাই হইল কমিউনিজমের মূল লক্ষ্য। আপাতদৃষ্টিতে এই দুইটী উদ্দেশ্য খুবই মহৎ বলিয়া মনে হয়। মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করা এবং মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ দূর করিয়া সাম্য স্থাপন করা খুবই বড় কথা, সন্দেহ নাই। কিন্তু কমিউনিজম্ যাহা বলিতে চায় বা যে-সংস্কার আনিতে চায়, তাহা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। সব মানুষকেই তুল্যরূপে সুখ-সুবিধা দান করিতে যাওয়া, অথবা সব মানুষকেই এক-সমান মনে করা নিতান্ত ভুল। প্রকৃতিতে এইরূপ সমতা নাই। ছোট-বড়, কম-বেশী, ভাল-মন্দ, সুখী-দুঃখী—ইহাই প্রকৃতির নিয়ম। সৃষ্টি-তত্ত্বের গোপন রহস্যই এইখানে। ছোটর পাশে বড়, সবলের পাশে দুর্ব্বল, ধনীর পাশে দরিদ্র, আলোর পাশে অন্ধকার, সুখের পাশে দুঃখ—ইহাই আল্লার বিধান। আকাশে চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র—সকলেই সমান নয়; জমিনে গাছ-পালা-পাহাড়-পর্ব্বত-নদ-নদী—কেহই সমান নয়। জীবজন্তু, তরুলতা, কীট-পতঙ্গ—কোন খানেই সমতার নীতি দেখা যায় না। মানুষ সবাই মূলতঃ সমান বটে, কিন্তু তার অর্থ এ নয় যে, সকলেরই অভাব-অভিযোগ, সুখ-দুঃখ, বুদ্ধি-জ্ঞান বাব শক্তি-সম্ভাবনা এক। সৃষ্টির মূলে দেখিতে পাওয়া যায়, প্রত্যেক জিনিসেরই তারতম্য বা ইতর-বিশেষ আছে। কয়লা ও হীরক মূলতঃ এক, কিন্তু তাই বলিয়া উহারা একই মূল্যে বিকায় না। নিখিল সৃষ্টির মূলে আছে বৈচিত্র্য বা বৈষম্য; এই বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়াই ঐক্য বা মিলনের সুর ধ্বনিত হইতেছে, বৈচিত্র্য আছে বলিয়াই প্রত্যেক বস্তুটা নিজ নিজ স্থানে পরিপূর্ণরূপে অভিব্যক্ত হইতে পারিতেছে। সবাই যদি সুখী হইত, তবে সুখ বলিয়া আমাদের মনে কোন ধারণাই জন্মিত না। দুঃখ আছে বলিয়াই সুখকে বুঝি, সুখ আছে বলিয়াই দুঃখকে বুঝি। সেইরূপ ছোট না থাকিলে বড়কে বুঝা যায় না, অন্ধকার না থাকিলে আলোককে বুঝা যায় না। একটীর বিরুদ্ধে আর একটী দাড়াইয়া আছে, তাইত এই বিশ্বজগৎ এমন রূপ-সুষমায় প্রকাশ পাইতেছে। ইটই যদি নিজেকে চূর্ণ করিয়া দিয়া সুর্কী হইতে না চাইত, অথবা প্রত্যেক ইটই যদি বলিত, আমি ভিত্তিমূলের নীচে পড়িয়া থাকিব না,—আমি মিনারে উঠিব, তবে অমন সুন্দর তাজমহল আর গড়া হইত না! ইহাই প্রকৃতির নিয়ম। এই প্রাকৃতিক নিয়মকে অতিক্রম করিয়ামানুষের ধর্ম্ম, সমাজ ও রাষ্ট্র দাড়াইতে পারে না।

 দুঃখ-দৈন্যের দার্শনিক তত্ত্ব সম্যকরূপে উপলব্ধি করিতে না পারিলেই এই সব অদ্ভূত মতবাদ দেখা দেয়। দুঃখের প্রকৃত কারণ ও উদ্দেশ্য না বুঝিতে পারায় যেমন জন্মান্তরবাদের সৃষ্টি হইয়াছে, দুঃখকে না বুঝিয়া উহার সমাধান করিতে যাওয়ায় তেমনি হইয়াছে—কমিউনিজমের সৃষ্টি। সুখ ও দুঃখের কোন নির্দ্দিষ্ট মাপকাঠি নাই। আমার নিকট যাহা দুঃখ, অপরের নিকট তাহা দুঃখ নহে; আমি যাহাকে অভাব মনে করি, অপরে তাহাকে অভাব নাও মনে করিতে পারে। আবার যেটাকে আমি দুঃখ বলিয়া মনে করিতেছি, সেটাই বৃহত্তর কোন কল্যাণের উৎস-মুখ হইতে পারে। মনে করুন, কলিকাতা হইতে দেশে যাইব বলিয়া ঢাকা মেল ধরিবার জন্য তাড়াতাড়ি শিয়ালদা স্টেশনে পৌছিলাম; কিন্তু অত্যধিক ভিড়ের জন্য টিকিট করিতে না পারায় গাড়ী ফেল করিলাম। মনে বড়ই দুঃখ হইল যে সেদিন বাড়ী যাইতে পারিলাম না। কিন্তু পরদিন সকালেই যদি খবরের কাগজে দেখা যায় যে, সেই ঢাকা-মেলেই ভীষণ দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে এবং বহু লোক হতাহত হইয়াছে, তবে অমনি খুশিতে বুক ভরিয়া উঠিবে এবং বারে বারে খোদাতালাকে ধন্যবাদ দিব যে, কাল ট্রেণটী ফেল করাতেই আজ বাঁচিয়া গিয়াছি। ইহাতেই বুঝা যায় যে আমাদের সুখ-দুঃখের কোন চিরস্থির মাপকাঠি নাই। একটু পূর্ব্বে বাহা দুঃখ বলিয়া মনে হয়, একটু পরে তাহাই আনন্দের কারণ হইয়া উঠে। আজ যেটাকে খুব সুখের বলিয়া মনে করিতেছি, হয় ত উহাই দু’দিন পরে পরম অকল্যাণ রূপে দেখা দিবে। অসম্পূর্ণ জ্ঞান লইয়া মানুষ তাই কোণ্টা প্রকৃত সুখ, কোটী প্রকৃত দুঃখ, কিছুই বুঝিতে পারে না।

 ইহাই যখন মানুষের অবস্থা, তখন মানুষ কোন্ সাহসে মানুষের সমতা বিধান করিতে চায়? আল্লাহ্‌ যাহা করেন নাই, মানুষ কেমন করিয়া তাহা করিবে?

 মানুষের দুঃখ-কষ্ট সম্বন্ধে আল্লাহ্‌-তালা কী বলিতেছেন, দেখুন:—

“নিশ্চয়ই আমরা মানুষকে দুঃখ-কষ্টে ফেলিবার জন্যই সৃষ্টি করিয়াছি।”—(কোরান, ৯ : ৪)

“আমরা নিশ্চয়ই তোমাদিগকে কখনও কখনও ভীতি, অনশন, সম্পদহানি, প্রাণহানি অথবা শস্যহানি দ্বারা পরীক্ষা করিব এবং ধৈর্য্যশীলদিগকে সুসংবাদ দাও।”—

(কোরান, ২: ১৫৫)

“মানুষেরা কি মনে করে যে ‘আমরা বিশ্বাসী’ এই কথা মুখে বলিলেই তাহাদিগকে ছাড়িয়া দেওয়া হইবে এবং পরীক্ষা, করা হইবে না? নিশ্চয়ই তাহাদের পূর্ব্বে যাহারা গিয়াছে, তাহাদিগকেও আমরা পরীক্ষা করিয়াছি। এতএব আল্লাহ্ অবশ্যই জানিয়া লইবেন কাহারা সত্যবাদী এবং কাহারা মিথ্যাবাদী।”—(কোরান, ২৯: ২—৩)

“নিশ্চয়ই কষ্টের সহিত সুখ আছে; কষ্টের সহিত নিশ্চয়ই সুখ আছে।”—(সুরা ইনশেরাহ,, ৫-৬ আয়েত।)

 দুনিয়ার প্রাচুর্য্য যে মানুষের নৈতিক অধঃপতন আনিতে পারে, সে সম্বন্ধেও আল্লাহ, এই সতর্কবাণী পাঠাইয়াছেন:—

“দুনিয়ার প্রাচুর্য্য তোমাদিগকে বিপথগামী করে।”—

(কোরান, ১০২: ১)

 তাহা হইলে দেখা যাইতেছে, সুখ-দুঃখ সম্বন্ধে আমাদের প্রচলিত ধারণার কোনই মূল্য নাই। মানব-জীবনে দুঃখেরও প্রয়োজন আছে; ইহা আল্লারই বিধান। দুঃখ-কষ্টকে একদম তুলিয়া দিবার পরিকল্পনা তাই বাতুলতা মাত্র। ইহা খোদার উপরে খোদকারী ছাড়া কিছু না। ভাত-কাপড়ের কষ্ট এই প্রকারে নিবারিত হইলেও হইতে পারে, কিন্তু তাহাই ত মানুষের প্রকৃত সুখ নয়! দুঃখ বহুরূপী, সহস্র পথে তার আনাগোনা। এক দুয়ার বন্ধ করিলে অন্য দুয়ার দিয়া সে আসে। কে তাহাকে রুদ্ধ করিবে?

 বাহু প্রকৃতিতে যেমন কোথায়ও সমতা দেখা যায় না, মানুষের বুদ্ধি বা রুচির মধ্যেও তেমনি সমতা নাই। একই ঘরের একই বয়সের দুইটী ছেলেকে একই সুযোগ ও সুবিধা দিয়া শিক্ষা দিলেও দেখা যাইবে, উভয়ের গঠন স্বতন্ত্র হইয়াছে। কমিউনিজম এই স্বাতন্ত্র্য্য ও স্বকীয়তাকে স্বীকার করে না, কাজেই ইহা অস্বাভাবিক।

 কমিউনিজম্ মানুষের ব্যক্তিগত অধিকারকে হরণ করিয়াছে। মানুষকে সে করিয়াছে একটা যন্ত্র-বিশেষ। নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় মানুষ কিছুই করিতে পারে না; সব সময়েই তার মনের উপর একটা নিয়মতন্ত্রের বোঝা চাপিয়াই আছে; প্রশান্ত অবসর বা সহজ মনের সহজ আনন্দ কোনদিনই সে পায় না; একটা কঠিন বন্ধনের অনুভূতি তার মনকে সব সময়েই আচ্ছন্ন করিয়া রাখে। ঈশ্বর ও দেবদেবীকে তুলিয়া দিলেও ‘স্টেট্’ এবং ‘ডিটেটর’ই এখন কমিউনিস্টদের ঈশ্বর! লেলিনকে সত্য সত্যই তাহারা পূজা করে।

 কোন ধনরত্ন কেহ সঞ্চয় করিতে পারিবে না, স্টেট হইতে সকলেরই ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা হইবে, এ বিধানও বেশী দিন টিকিতে পারে না, কারণ মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তির সহিত ইহার সামঞ্জস্য নাই। মানুষ স্বভাবতই সঞ্চয়-প্রয়াসী; কোন কিছু উপার্জ্জন করিয়া সে তাহা নিজের বলিয়া দাবী করিতে ভালবাসে। কমিউনিজম এই সহজাত প্রবৃত্তিকে নষ্ট করিয়া দিয়াছে, ফলে মানুষের জীবন হইয়া উঠিয়াছে একটা প্রাণহীন যন্ত্রবিশেষ। সৃষ্টির উল্লাস তাহার নাই, মনের স্বাধীন গতিবিধির আনন্দ তাহার নাই। নিজে সে স্বাধীনভাবে কোন কিছু সঞ্চয়ও করিতে পারিবে না, ব্যয়ও করিতে পারিবে না—ইহা মানুষের পক্ষে এক মস্ত বড় অভিশাপ! মানুষের অন্তরে যে সৃষ্টিধর্মী প্রতিভা আছে, নব নব পথে আত্মপ্রকাশ করিবার যে স্বাভাবিক আকাঙ্খা আছে, কমিউনিজম তাহাকে গলা টিপিয়া মারিয়া ফেলিয়াছে। একটা স্বাধীন জীবন্ত মানুষের মনের উপর এরূপ নৈতিক জবরদস্তি শোভা পায় না।

 (৩) ইস্‌লামে পুঁজিবাদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়ঃ—কমিউনিজম চায় জগৎ হইতে পুঁজিবাদকে সম্পূর্ণ রূপে নির্মূল করিতে। কিন্তু ইসলামে এরূপ বিধান নাই। স্টেট্ বা অন্য কোন রাজশক্তি আসিয়া ধনীদিগের ধন ও সম্পত্তি কাড়িয়া লইয়া সকলের মধ্যে ভাগ করিয়া দিবে, এ বিধান সঙ্গত নয়। পুঁজিবাদ যে থাকিতেই পারিবে না, অথবা সঞ্চয় করিলেই যে সে ঘোর অপরাধী হইবে, ইসলাম ইহা বলে না। নিজে চেষ্টা করিয়া যত পার অর্থ সঞ্চয় কর, বড় লোক হও, কিন্তু সেই অর্থ হইতে দীনদরিদ্রের সেবায় এবং অন্যান্য সৎকর্ম্মে দান কর—ইহাই ইসলামী ফরমান। এই বিধানই কি সর্ব্বাঙ্গসুন্দর নয়? পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের কী চমৎকার সমন্বয় এ!

 ধন-সম্পত্তি সম্বন্ধে ইসলামের বিধান অপূর্ব্ব। ইসলাম সমন্বয়ের ধর্ম্ম। ধর্ম্ম ও কর্ম্ম, দীন ও দুনিয়া, দেহ ও আত্মা, কোরান ও তলোয়ার—সবাইকে সে একসঙ্গে মিলাইয়াছে। একদিকে সে যেমন বলিয়াছেঃ সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করিও না, এই বিশাল পৃথিবীতে আল্লাহ্, তোমাদের জন্য যাহা বৈধ করিয়াছেন, তোমরা তাহা অবৈধ করিও না, অপর দিকে তেমনই বলিয়াছেঃ সাবধান! দুনিয়ার প্রাচুর্য্য তোমাদিগকে যেন বিপথগামী না করে, কারণ এই ঐশ্বর্য্য, এই সুখ ক্ষণস্থায়ী; ইহাদের কোনই স্থায়ী মূল্য নাই।

 ইসলাম তাই মধ্যপন্থী। ধন-উপার্জ্জনে তার বাধা নাই, কিন্তু নিঃস্ব ও অভাবগ্রস্তদিগকে বঞ্চিত করিয়া সেই ধন সে সঞ্চিত করিয়া রাখিতে পারিবে না। নিজে বড় হও, অভাবগ্রস্তকে সাহায্য কর এবং তাহাদের ষড় হইবার সুযোগ দাও, দেশ ও জাতির সেবায় সেই অর্থ ব্যয় কর—ইহাই ইসলামের নীতি।

 ইসলামে তিন উপায়ে ধন-সম্পত্তি লাভ করা যায়ঃ (১) উপার্জ্জন দ্বারা, (২) উত্তরাধিকার সূত্রে, (৩) দানসূত্রে। কত পর্য্যন্ত ধন-সম্পত্তি মজুত করা যায়, ইসলাম তাহার কোন সীমা-নির্দ্দেশ করে নাই। বাহার যত খুশী, উপার্জ্জন করিতে পারে। রাশি রাশি স্বর্ণ বা মণিমাণিক্যও একজনের অধিকারে থাকিতে পারে। কোরান বলিতেছেঃ

“এবং তোমরা যদি কেহ তাহাদের (স্ত্রীলোকদের) কাহাকেও পবর্বত প্রমাণ স্বর্ণও যৌতুক স্বরূপ দান কর, তাহা হইলেও তাহা হইতে কিছু ফিরাইয়া লইবে না”—(৪ : ৭)

 স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই তুল্যরূপে ধন-সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হইতে পারে। তাহাতেও কোন বাধা নাই।

 অতএব দেখা যাইতেছে, কমিউনিজমের সহিত এই বিষয়ে ইসলামের মতভেদ আছে। ইসলামের হজ, জাকাৎ, ফিরা, দেন-মহর, ও উত্তরাধিকার-আইন প্রমাণ করে যে, ধনসম্পত্তিতে প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত অধিকার আছে এবং ধনসঞ্চয়ে কোন বাধা নাই। ধনসম্পত্তির হস্তান্তর করিবার ক্ষমাতাও ইসলাম প্রত্যেককে দিয়াছে।)

 তাহা হইলে দেখা যাইতেছে,—আয়ের বা উৎপন্নের দিকে ইসলাম কোন সীমা-নির্দ্দেশ করে নাই; এ-পথ একদম খোলা। শুধু ব্যয়ের দিকেই বিধি-নিষেধের বেড়া আছে। উৎপাদন বা সঞ্চয় করিতে পারিবে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বিতরণও করিতে হইবে—ইহাই ইসলামের নির্দেশ।

 ইসলামে ধন-সম্পত্তির বণ্টন-ব্যবস্থা কিরূপ, তাহা কোরানের নিম্নলিখিত আয়েতগুলি হইতে স্পষ্ট বুঝা যাইবে:—

“তিনিই (আল্লাই) তোমাদিগকে ভূসম্পত্তিতে অধিকারী করিয়াছেন এবং একজনকে অপর অপেক্ষা বিভিন্ন ক্রমে বড় করিয়াছেন, যাহাতে তিনি তাঁহার দান সম্বন্ধে। তোমাদিগকে পরীক্ষা করিতে পারেন।”

—(৬ : ১৬৬)

“আল্লাহ, যাহাকে খুশি তাহারই রুজি (উপার্জ্জন) বাড়ান বা কমান এবং তাহারা এই দুনিয়াদারীতেই আনন্দ পায়; কিন্তু এই দুনিয়ার জীবন পরলোকের তুলনায় ক্ষণিক সুখের ছাড়া অন্য কিছুই নয়।”—(১৩ : ২৬)

“এবং আল্লাহ, তোমাদের মধ্যে কোন কোন লোককে অপর লোক অপেক্ষা উপার্জ্জনের দিক দিয়া বড়, করিয়াছেন।” —(১৬ : ৭১)

“নিশ্চয়ই তোমার প্রভু যাহাকে ইচ্ছা করেন তাহারই রুজি (উপার্জ্জন) প্রচুর বাড়াইয়া দেন এবং তিনি একটা নির্দ্দিষ্ট পরিমাণ দান করেন।” —(১৭:৬০)

 উপরের উদ্ধৃতিগুলি হইতে এ-কথা সম্পদের কোন সমতা হইতে পারে না! পরিষ্কার বুঝা যায় যে, অর্থকেহ ধনী, কেহ নির্ধন, কেহ বড়, কেহ ছোট,—ইহা থাকিবেই, কারণ ইহাই আল্লার বিধান। এই বিধানকে তুলিয়া দিয়া মনগড়া কোন সাম্য আনিতে গেলে সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হইতে বাধ্য।