বিষয়বস্তুতে চলুন

ইসলাম ও কমিউনিজ্‌ম্/ইসলাম ও কমিউনিজ্‌ম্

উইকিসংকলন থেকে

 

ইসলাম ও কমিউনিজ্‌ম্‌

কমিউনিজ্‌ম্‌!...

 কথাটা আজ আর নূতন নয়,—দোষেরও নয়। বর্ত্তমান যুগে মানুষের সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে যে-সমস্ত নূতন সম্যা ও নূতন চিন্তা আসিয়া দেখা দিয়াছে, কমিউনিজ্‌ম্‌ তাহাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। এই অভিনব মতবাদ সমস্ত দেশের রাজনৈতিক দর্শন ও সমাজ-বিজ্ঞানকে আজ প্রভাবান্বিত করিতেছে। এমন দেশ খুব কমই আছে—যেখানে কমিউনিজমের বাণী পৌঁছায় নাই, অথবা ইহার ভাব ও আদর্শ সংক্রমিত হইয়া পড়ে নাই। সারা পৃথিবীতে সে আনিয়াছে একটা বিপ্লব—একটা বিভীষিকা, সঙ্গে সঙ্গে একটা অপূর্ব্ব বিস্ময়! তার চলার ছন্দে একদিকে বাজে ভাঙার গান, অপরদিকে জাগে নবসৃষ্টির উল্লাস। একটা প্রচণ্ড ঘুর্ণি হাওয়ার মত সে চলিয়াছে দিক হইতে দিগন্তরে, দেশ হইতে দেশান্তরে! প্রাচীন পৃথিবীর সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উল্টাইয়া দিয়া সে গড়িতে চায় এক নূতন জগৎ—যেখানে থাকিবে না কোন মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, থাকিবে না কোন আভিজাত্য, থাকিবে না কোন ধনসম্পত্তির অসমতা। এই শ্যামল পৃথিবীর মাটিকে—তার ধনরত্নকে সকল মানুষের মধ্যে তুল্যরূপে বণ্টন করিয়া দিয়া সে আনিবে এক নবসাম্য—নূতন রাষ্ট্রতন্ত্র। সাম্রাজ্যবাদ বা পুঁজিবাদ সেখানে চলিবে না, সেখানে আসিবে সাধারণতন্ত্র; সর্ব্বসাধারণই হইবে সে দেশের মালিক, তাহারাই করিবে শাসন, তাহারাই করিবে নিয়ন্ত্রণ।

 এই অভিনব সাম্যব্যবস্থাই হইতেছে কমিউনিজম্। কাজেই দেখা যাইতেছে, দেশের প্রচলিত শাসনতন্ত্র ও রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থার সহিত ইহার সংঘর্ষ অনিবার্য্য। কার্য্যতঃ ঘটিয়াছেও তাই। এই নূতন মতবাদের গ্রহণ-বর্জন সমস্যা লইয়াই আজ দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে, শ্রেণীতে শ্রেণীতে আরম্ভ হইয়াছে এক ভয়াবহ বিরোধ ও আত্মকলহ। কোন দেশ ইহাকে গ্রহণ করিয়াছে, কোন দেশ করে নাই; কোন দেশ ইহার সমর্থক, কোন দেশ ইহার বিরোধী; কোন দেশ ইহাকে বিপ্লবের মধ্য দিয়া সারা পৃথিবীতে প্রবর্ত্তিত করিতে চায়, কোন দেশ ইহার ধ্বংসকামনা করে। দেশের অভ্যন্তরেও এই প্রশ্ন লইয়া নানা দল গঠিত হইয়াছে। রাজশক্তির ভয়ে কমিউনিজ্‌ম্ যেখানে প্রসার লাভ করিতে পারিতেছে না, সেখানেও সে তলে তলে ক্রিয়া করিতেছে। প্রায় প্রত্যেক দেশেই কমিউনিজ্মের অনুরাগী এক একটা গোপন বা প্রকাশ্য দল আছে, তাহাদিগকে ‘কমিউনিস্ট্‌ পার্টী’ বলা হয়। দেশের মধ্যে আন্দোলন অথবা বিপ্লব আনিয়া প্রচলিত সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদকে ধ্বংস করাই হইল তাহাদের উদ্দেশ্য। তাহাদের মতে কমিউনিজমই হইল সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সর্ব্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। পক্ষান্তরে যাহারা ইহার বিরোধী, তাহারা বলে: এমন উৎকট সাম্য জগতে অচল; মানুষের ধর্ম্ম, সমাজ, কৃষ্টি ও প্রগতির পক্ষে ইহা অত্যন্ত মারাত্মক, অতএব ইহা সর্ব্বথা পরিত্যজ্য। কাজেই দেখা যাইতেছে, এই কমিউনিজ মকে ঘিরিয়া সর্ব্বত্রই একটা বিরোধ ও অশান্তি চলিয়াছে। দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে, শ্রেণীতে শ্রেণীতে আজ শুধুই অনৈক্য ও স্বার্থ-সংঘাত। এই যে পৃথিবীব্যাপী আজ অশান্তির আগুন জ্বলিতেছে, আকাশে-বাতাসে স্থলে-জলে এই যে কামান-গোলা, বোমা-টর্পেডোর ধ্বংস-লীলা চলিতেছে, এত যে দুর্ভিক্ষ, এত যে মহামারি, এত যে হাহাকার—ইহার জন্য দায়ী কে? দায়ী কি শুধুই হিটলারমুসোলিনী-তোজো? অথবা স্ট্যালিন-চার্চিল-রুজভেল্ট?—না। ইহার মূলে আছে এই কমিউনিজমের কারসাজি। সমস্ত ঘটনার অন্তরালে থাকিয়া শয়তান যেন আজ কমিউনিজমের বেশে দেখা দিয়াছে। ভেদ-বৈষম্য তুলিয়া দিবার নামে সে আজ মানুষে মানুষে যে ভেদ-বৈষম্য ও হানাহানির সৃষ্টি করিয়াছে, তাহা সত্যই ভয়াবহ। মানুষের এই দারুণ হিংস্ররূপ ও আত্মঘাতী সমরায়োজন দেখিয়া সে আজ নিশ্চয়ই মনে মনে খুব কৌতুক অনুভব করিতেছে। আদম-বংশকে ধ্বংস করিবার জন্য সৃষ্টির আদিকাল হইতে তাহার মনে যে দুরভিসন্ধি ও দুর্জ্জয় প্রতিজ্ঞা জাগিয়া ছিল, এইবার তাহা কি চরিতার্থ হইবে?

 বস্তুতঃ একটা নূতন যুগসন্ধিক্ষণে আসিয়া আমরা দাড়াইয়াছি। কমিউনিজ্‌ম্‌ সেই নবযুগেরই প্রতীক। এই যুগপ্রবাহকে ঠেকাইয়া রাখাও যেমন মুস্কিল, গ্রহণ করাও ঠিক তেমনি মুষ্কিল। সকলকেই তাই আজ ভাবিতে হইতেছ: কমিউনিজম্ আমরা গ্রহণ করিব, না করিব না? আমাদের জাতীয় আদর্শ, ধ্যান-ধারণা, স্বভাব ও প্রকৃতি, ধর্ম্ম ও সমাজ কি ইহার অনুকূল? কোথায় ইহার অপকারিতা, কোথায়ই বা ইহার কল্যাণ-রূপ? এই সব জিজ্ঞাসা আজ সকলেরই মনকে দোলা দিতেছে। আমাদিগকে তাই একটা স্থির-সিদ্ধান্তে আসিতেই হইতেছে; বসিয়া থাকা আর চলিতেছে না; যুগের গতিবেগ আজ অত্যন্ত প্রবল।

 এই যুগধর্ম্মের আবেদন অন্য সকলের নিকট যেমন আসিয়াছে, মুসলমানের নিকটও ঠিক তেমনি আসিয়াছে। তবে মুসলমানের সমাজ, রাষ্ট্র ও জীবন ইসলামের আদর্শে অনুপ্রাণিত ও নিয়ন্ত্রিত হয় বলিয়া মুসলমান কোন নূতন মত বা পথকে সহজে গ্রহণ করিতে চায় না। প্রত্যেক নূতনকেই সে ইসলামের আলোকে পরখ করিয়া দেখিতে চায়। কমিউনিজমের বেলাও ঠিক তাহাই ঘটিয়াছে। মুসলমানের মনের দুয়ারে আজ প্রশ্ন জাগিয়াছে: কমিউনিজম্ কি মুসলমানের গ্রহণযোগ্য? ইহার কোন প্রয়োজন বা আবেদন তাহার কাছে আছে কি? তাহার ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা এই নূতন যুগসমস্যার সমাধান করিতে কি অক্ষম? অন্য কথায়, ইসলামের সহিত কমিউনিজমের সম্বন্ধ কী? কোটী সে গ্রহণ করিবে: কমিউনিজ্‌ম্‌, না ইসলামিজ্‌ম্?

 বলা বাহুল্য, এই প্রশ্নের আলোচনা ও সমাধানই হইতেছে আমাদের মূল লক্ষ্য ও প্রতিপাদ্য বিষয়।

 কিন্তু এ প্রশ্নের জবাব তখনই সম্ভব—যখন ভালরূপে জানা যায় কমিউনিজম্‌ই বা কী আর ইসলামই বা কী। উভয়ের সহিত সম্যকরূপে পরিচিত না হইলে কোন্‌টী ভাল কোন্‌টী মন্দ— কেমন করিয়া বলা যায়?

আমরা তাই প্রথমেই কমিউনিজমের উৎপত্তি, বিকাশ, বৈশিষ্ট্য ও লক্ষ্য সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করিব। তারপর ইসলামের সহিত ইহাকে মিলাইয়া দেখিয়া ইহার দোষগুণের বিচার করিব।