ইসলাম ও কমিউনিজ্ম্/কমিউনিজমের ভবিষ্যৎ
কমিউনিজমের ভবিষ্যৎ
কমিউনিজমের ভবিষ্যৎ কী? যে-বেশে উহা আত্মপ্রকাশ করিয়াছে, সেই বেশেই উহা টিকিবে কি? বিশ্ববাসী কি এই মতবাদকে গ্রহণ করিতে পারিবে? এক কথায় কমিউনিজমের এই অভিযান কি জয়যুক্ত হইবে?
না। কমিউনিজম্ আজ যে মূর্ত্তিতে দেখা দিয়াছে, তাহা বেশীদিন টিকিবে না। নিম্নলিখিত কারণে কমিউনিজম, রূপান্তরিত হইতে বাধ্যঃ—
(১) জোর করিয়া ছোট-বড়, ধনী-নির্ধনকে সমভূমিতে টানিয়া আনিয়া এক করিবার রীতি বিশ্বপ্রকৃতিতে নাই। কার্লাইলের ভাষায় বলিতে গেলে বলিতে হয়ঃ সেই চিরদিনের ‘না’ (the everlasting ‘no’) এবং চিরদিনের ‘হাঁ’ (the everlasting yea)-কে লইয়াই এই জগৎ। অতএব স্বভাবে যে সমতা নাই, মানব-সমাজে তাহা-থাকিতে পারে না।
(২) কমিউনিজম্ দাড়াইয়া আছে ‘Dialectical Materialism’-এর উপর। এই কথাটী ‘সোনার পাথর বাটীর’ মতই অদ্ভূত। যাহা dialectic তাহা materialism হইতে পারে না, আবার যাহা materialism তাহা dialectic হইতে পারে না। Dialectic হইতে হইলেই materialism-এর সঙ্গে spiritualism-কেও স্বীকার করিতে হইবে, কারণ জড়বাদের সহিত অধ্যাত্মবাদের দ্বন্দ্বভাব বিমান ডায়লেটিক্ হইতে হইলে তাই চাই দুইটী পরস্পর-বিরোধী বস্তু। ডায়েলেটিক ঠিক দ্বন্দ্ব সমাসের ন্যায়; যেমন ‘নরনারী’। শুধু ‘নর’ বা ‘শুধু ‘নারী’ দ্বারা যেমন দ্বন্দ্ব সমাস হয় না, শুধু materialism লইয়া সেইরূপ ডায়েলেটিক্ হয় না। বিরোধীয় বস্তুই যদি না থাকে, তবে ‘conflict and unity of opposites’-ই বা কি করিয়া হইবে? জড়বাদও থাকিবে, অধ্যাত্মবাদও থাকিবে—তবেই ত বিরোধ আসিবে। পুঁজিবাদকে তাই একদম উড়াইয়া দিলে চলিবে না; দুইটীকে রাখিয়। উহাদের মধ্যে একটা মিলন বা সাম্য ঘটাইতে হইবে। ইহাই হইল প্রকৃতির নিয়ম; ইহাই হইল সত্যিকার ‘dialectic process’. কমিউনিজম্ মুখে খুব প্রচার করিতেছে যে dialectic process-ই সৃষ্টর মূলীভূত সত্য, কিন্তু কার্যতঃ নিজেই তাহার বিরুদ্ধাচরণ করিতেছে। এমন আত্মবিরোধী কোন মতবাদ দ্বিতীয় দেখা যায় না।
(৩) পুঁজিবাদকে যতটা নিন্দা করা হয়, ততটা নিন্দনীয় নয়। পুঁজিবাদের দ্বারা দেশের যে শুধু অকল্যাণই হইতেছে, তাহাও নয়। অনেক বড় বড় কাজ পুঁজিবাদীদের দ্বারাই সংঘটিত হইতেছে। তাহা ছাড়া পুঁজিবাদ এখন আর পূর্ব্বের হ্যায় উগ্র নাই। নানাবিধ শ্রমিক-আন্দোলনের ফলে উহার বহু দোষ কাটিয়া গিয়াছে।
এ গেল সাধারণ দিক। ইসলামের দিক দিয়া দেখিতে গেলেও বর্ত্তমান কমিউনিজম্ চলিবে না। ইসলামী আদর্শকে পুরাপুরি ভাবে স্বীকার না করিলে ইহা কখনই সম্পূর্ণ হইবে না। কমিউনিজম্ যখন আল্লাকে মানিবে, ধর্ম্মকে মানিবে, ছোট-বড়, ধনী-নির্ধনের পার্থক্য স্বীকার করিয়া সকলকেই কোলে টানিয়া লইতে পারিবে, সমস্ত দ্বন্দ্ব ও বৈষম্যকে মিলাইয়া সে যখন সকলের মধ্যে একটা সাম্য আনিতে পারিবে, তখনই সে পূর্ণত্ব প্রাপ্ত হইবে। আর তখনই আসিবে প্রকৃত সাম্যবাদ। ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র ইত্যাদির এক সেকে ধ্বংস করিয়া অন্য সেট্কে বজায় রাখার নাম সাম্য নয়; সকলকেই কায়েম রাখিয়া একটা সুষ্ঠু সমন্বয় আনিয়া দিতে পারিলে তাহাকেই বলে প্রকৃত সাম্য। বৈষম্যের ধ্বংসের নাম সাম্য নয়। বলা বাহুল্য, একমাত্র ইসলামেই আছে এই সাম্য; অন্য কোথাও নাই।
অতএব একথা পরিষ্কার ভাবেই বুঝা যাইতেছে যে, কমিউনিজ্মের পরবর্ত্তী সিঁড়িই হইতেছে ইসলামিজম্। জ্ঞাতসারেই হউক, অজ্ঞাত সারেই হউক, কমিউনিজম্ ইসলামের পথেই অগ্রসর হইতেছে। শুধু যে লেনিন বা স্ট্যালিনের হাতেই ইহ। রূপ পাইতেছে, তাহা নহে; ইসলামও অলক্ষ্যে ইহার মধ্যে ঢুকিয়া পড়িয়া ইহার গতিপথকে নিয়ন্ত্রিত করিতেছে। যে ১৬টি রিপাবলিক লইয়া বর্তমান সোভিয়েট রাশিয়া গঠিত, তাহার মধ্যে পাঁচটীই হইতেছে মুসলিম রাষ্ট্র। নবজাগ্রত এই রুশীয় মুসলমানদিগের মধ্যে বহু কবি, লেখক, বৈজ্ঞানিক ও সেনানায়কের আবির্ভাব হইয়াছে। শিল্প ও কৃষিও দ্রুত উন্নতিলাভ করিতেছে। কাজেই আশা করা যায়—ভবিষ্যতে এই সূত্র ধরিয়াই!ইসলাম এক নূতন ভূমিকায় অবতীর্ণ হইবে। রাশিয়া হইতেই ইসলামের নূতন বিশ্বঅভিযান আরম্ভ হইবে, ইহাই আমার বিশ্বাস। “লাইলাহা ইল্লাল্লাহো মোহাম্মাদার রসুলুল্লাহ্” এই মন্ত্রের প্রথমাংশ তাহারা গলাধঃকরণ করিয়া ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতেছে; কালে কালে বাকীটুকুও সে গিলিবে এবং তখন তাহার চেহারা বদলাইয়া যাইবে।
রাশিয়ার মুসলমান জাগিয়া উঠিলে ইসলামের সনাতন বাণী “আল্লাহু আকবর” ধ্বনি রাশিয়ার আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হইবে—এ আশা আদৌ দুরাশা নয়। সেদিন আর “World comrades, arise'—এই স্লোগান উত্থিত হইবে না, সেদিন ধ্বনিত হইবেঃ
“World Muslims, arise!”
—বিশ্বমুসলিম, জাগো! —