ইসলাম ও কমিউনিজ্ম্/কমিউনিজ্মের দার্শনিকতা
কমিউনিজ্মের দার্শনিকতা
দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ
কমিউনিজমের পৃষ্ঠপটে কোন দার্শনিকতা আছে কি? না কি ইহা কেবলই একটা নিছক স্বপ্ন-বিলাস?
শুনিলে আশ্চর্য লাগে, এমন একটা বস্তুতান্ত্রিক ব্যাপারের পিছনেও আছে একটা মস্তবড় দার্শনিক মতবাদ। Dialectic Materialism + অর্থাৎ ‘দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ’ই হইতেছে সেই পশ্চাভূমি। এই পটভূমির উপরেই কমিউনিজমের বিরাট সৌধ দাড়াইয়া আছে।
বলা বাহুল্য, কার্ল মার্কসই এই নব দার্শনিক মতবাদের জন্মদাতা।
দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ কী?
পাশ্চাত্য দর্শন সম্বন্ধে যাহারা একটুও জ্ঞান রাখেন, তাহারাই জানেন, এই বিশ্বপ্রকৃতির মূলে যে জড় ও চৈতন্যের নানা রূপ প্রকাশ পাইতেছে, তাহার ব্যাখ্যা করিতে গিয়া ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা মোটামুটি ভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছেন। যাহারা চৈত্যকে প্রাধান্য দিয়াছেন, তাহারা অধ্যাত্মবাদী বা ভাববাদী (Idealists), আর যাহারা জড়কে প্রাধান্য দিয়াছেন, তাহারা জড়বাদী বা বস্তুবাদী (Materialists)। ভাববাদীরা বলেনঃ এই বস্তু-জগতের কোন প্রকৃত সত্তা নাই, আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের অতীতে আর একটা অশরীরী ভাবজগৎ আছে; বস্তুজগৎ তাহারই রূপান্তর মাত্র; অর্থাৎঃ যাহাকিছু আমরা বস্তুজগতে ঘটিতে দেখি, তাহা পূর্ব্বেই আমাদের মনোজগতে ঘটে। আমাদের মনে যে-সব চৈতন্য-চিত্র খেলা করে, তাহাই বাহিরের জগতে রূপ পায়। কাজেই বিশ্বজগতের সমস্ত ঘটনারই মূল কারণ ও উৎস থাকে আমাদের মনে। বাহিরের জগতের কোথাও কোন বিপর্য্যয় দেখিলে ভাবিতে হইবে, এই বিপর্য্যয় পূর্ব্বেই আমাদের মনে আসিয়াছে। এক কথায়ঃ Idea-ই হইতেছে সত্য বস্তু, Matter তাহার প্রতিবিম্ব মাত্র। কোন্ সুদূর হইতে Idea-র লীলাখেল। বিশ্বপ্রকৃতির চিত্রপটে ছায়া ফেলিতেছে, তাহারই ফলে এই দৃশ্য-জগৎ আমাদের নয়ন-কোণে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিতেছে। আসল বস্তু দেখিতেছি না। আমরা শুধু ছায়াচিত্রই দেখিতেছি, আসল বস্তুটা যে কী (what is the thing-in-itself) তাহা আমরা জানিনা, বস্তুর আসল সত্তা অজ্ঞেয়। আমাদের ইন্দ্রিয়-জ্ঞানের অতীতে আছে সেই ধ্রুবলোক (world of noumena), কাজেই বস্তুজগৎ মায়াময়, মিথ্যা, আর ধ্যান-জগৎই একমাত্র সত্য।
বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক ক্যাণ্ট (Kant) ছিলেন এই মতবলম্বী। Idea বা ভাবকেই তিনি মুখ্য বলিয়া মনে করিতেন, বস্তুকে দিতেন গৌণ স্থান। এই জন্যই তাঁহার দর্শনকে অধ্যাত্মবাদ অথবা Idealism বলে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে হেগেল এই মতকে আরও পরিবর্দ্ধিত করিয়া বলেন যে, আমাদের জ্ঞান জন্মে দ্বন্দ্বমূলক ধারণা হইতে। সমস্ত ধারণাই দ্বন্দ্বমূলক, অর্থাৎ কোন একটি ধারণার মধ্যে তাহার বিরুদ্ধ ধারণাটাও নিহিত থাকে। এই পরস্পর বিরোধী ধারণার মধ্যে প্রতিনয়ত সংঘর্ষ চলিতেছে এবং পরিণামে উভয়ের মধ্যে একটা আপোষ বা মিলন ঘটিতেছে। এইরূপেই আমাদের চিন্তা ও ধারণা পরস্পরের ঘাতপ্রতিঘাতে পরিবর্তিত ও পরিবন্ধিত হইয়া আমাদের জ্ঞানের সীমানাকে বাড়াইয়া দিতেছে। কোন ধারণাই বিচ্ছিন্ন অবস্থায় নাই। কাজেই কোন একটি বিষয়ে ধারণা করিতে গেলে, তার সঙ্গে তার বিপরীত ধারণাটীও জড়াইয়া যায়। ধরুন সুখ। সুখ বলিলেই দুঃখের ধারণা আমাদের মনের মধ্যে জাগিয়া যায়। সেইরূপ আলো বলিলেই অন্ধকারের ধারণা সঙ্গে সঙ্গেই মনে জাগে। ধারণায়-ধারণায় এই যে বিরোধ ও সংঘর্ষ এবং পরে পরস্পরের মধ্যে সমন্বয়, ইহাকে বলা হইয়াছে “Dialectic Process” বা দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি। Dialectic শব্দটি গ্রীক দর্শন হইতে আসিয়াছে, উহার ধাতুগত অর্থ হইল প্রশ্নোত্তরে কথোপকথন (dialogue) বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক পণ্ডিত সক্রেটিস্ এই পদ্ধতিতেই তর্ক করিতেন। কেহ কোন কথা জিজ্ঞাসা করিলে তিনি সেই বিষয়টির অন্তর্নিহিত সঙ্গতি-অসঙ্গতিগুলি প্রশ্নোত্তর দ্বারা বাহির করিয়া আনিতেন এবং পরে সেই বিষয়টি সম্বন্ধে প্রকৃত তথ্য নিরূপণ করিয়া দিতেন। হেগেল এই পদ্ধতিকেই গ্রহণ করিয়া বলিলেন, ধারণা সমূহ এই উপায়েই পরিবর্তিত ও পরিবর্দ্ধিত হয় এবং এই ঘাত-প্রতিঘাতের ফলে বস্তু জগতেও পরিবর্ত্তন ও পরিবর্দ্ধন আসে। আমাদের বস্তু-জগতের পরিবর্ত্তন ও বিকাশ তাই আমাদের বিশ্বপ্রকৃতির অন্তর্নিহিত সেই বৈষম্য ও পরস্পর বিরোধী শক্তির ঘাত-প্রতিঘাতেরই ফল।
কোন বিষয় সম্বন্ধে আমাদের মনে প্রথম যে ধারণাটি জন্মে, তাহাকে বলা হয় ‘thesis’ বা হাঁ-মূলক ধারণা; তাহার বিপরীত ধারণাটিকে বলা হয় ‘antithesis’ বা না-মূলক ধারণা, আর উভয়ের সমন্বয়কে বলা হয় ‘synthesis’ বা মিলনাত্মক ধারণা। প্রত্যেক বিষয়েই এইরূপ thesis, antithesis ও synthesis এর ক্রিয়া চলিতেছে।
একটি দৃষ্টান্ত লওয়া যাক। দিন বলিলে রাতের ধারণাও সঙ্গে সঙ্গে মনে আসে, কারণ রাতকে না বুঝিলে দিনকে বুঝা যায় না। এখন এই দুই বিরুদ্ধ ধারণাকে আর একটা বৃহত্তর ধারণার মধ্যে আনিয়া মিলানো যায়; সেটি হইতেছে সময়। সময় বলিলে দিন ও রাত—দুইটিকেই বুঝায়। এখানে দিন হইল thesis, রাত হইল antithesis, আর সময় হইল synthesis.
তাহা হইল দেখা যাইতেছে, মানবীয় ইতিহাসে যে-সমস্ত ঘটনা ও রাষ্ট্রবিপ্লব সংঘটিত হইতেছে, অথবা সামাজিক, অর্থনৈতিক বা অন্য যে-কোন পরিবর্তন দেখা দিতেছে, হেগেলের মতে তাহার মূল কারণ রহিয়াছে আমাদের মনে বা ধারণায়। ধারণার ওলট-পালটের ফলেই সমাজ ও রাষ্ট্রে ওলট-পালট দেখা দিতেছে। দুনিয়ার সমন্ত যুদ্ধ-বিগ্রহ ও বিপ্লব মানুষের চিন্তার পরিবর্তন বা বিকৃতিরই ফল। অন্য কথায় বস্তুজগৎ মনোজগতেরই একখানি প্রতিবিম্ব মাত্র।
ইহাই হইল ভাববাদীদের কথা। পক্ষান্তরে জড়বাদীরা বলেন, ধারণা বলিয়া স্বতন্ত্র কিছুই নাই। বস্তুই আসল সত্য—ভাব নয়। বস্তু হইতেই ধারণা, ধারণা হইতে বস্তু নয়। অন্য কথায় আগে বস্তু, পরে ভাব। ভাব বলিয়া স্বতন্ত্র কিছুই নাই, বস্তুই বর্দ্ধিত বা উন্নত অবস্থায় চিন্তা বা মনন-শক্তি লাভ করে। বস্তু মনের সৃষ্টি নয়, মনই হইল বস্তুর সৃষ্টি; কাজেই এই দৃশ্যমান জগতের পিছনে যে অজ্ঞেয় কোন রহস্যলোক বা অশরীরী কোন ধারণা (Idea) থাকিতে পারে, জড়বাদী তাহা স্বীকার করেন না। এই বিশ্ব-জগতকে তাহারা প্রকাণ্ড একটা মেশিন বলিয়া মনে করেন। এমন কি মানুষও তাহাদের কাছে একটা মেশিন ছাড়া আর কিছুই নয়, তাই মানুষকে তাহারা বলেন—“Man the Machine.”
জড়বাদীদের নিকট তাই ঈশ্বর বা ঐরূপ কোন অদৃশ্য বস্তুর কোন স্থান নাই। যে কোন ব্যাপারকেই যন্ত্র-বিজ্ঞানের আলোকে তাঁহারা ব্যাখ্যা করিতে পারেন, ইহাই তাঁহাদের বিশ্বাস।
মার্কস্ও ছিলেন এইরূপই একজন জড়বাদী। প্রথম জীবনে তিনি অবশ্য হেগেলেরই শিষ্য ছিলেন। পরে তিনি হেগেল হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক মত প্রকাশ করেন। অধ্যাত্মবাদ (Idealism) হইতে তিনি একেবারে জড়বাদে (Materialism) নামিয়া পড়েন। হেগেলের চিন্তাধারাকে তিনি সম্পূর্ণ উল্টাইয়া দেন। তিনি বলেন, ধারণার ঘাত-প্রতিঘাতেই যে আমাদের বস্তু-জগতে ওলট-পালট ঘটে, তাহা নহে; বস্তুজগৎ আপন অন্তর্নিহিত শক্তির ঘাত-প্রতিঘাতেই নব নব রূপে প্রকাশ পাইতেছে; তাহারই প্রতিক্রিয়াস্বরূপ আমাদের মনে নানা ধারণার উদ্ভব হইতেছে। বস্তুনিরপেক্ষ ধারণা-জগৎ বলিয়া কিছু নাই, ওটা মনের খেয়াল মাত্র। বস্তু ছাড়া কোন কিছুই সত্য নয়।
এই জড়বাদের সহিত মার্কস্ হেগেলের ডায়লেটিক্ পদ্ধতি জুড়িয়া দিলেন। বলিলেনঃ জড়-জগতের সকল কিছুই এই ডায়লেটিক্ পদ্ধতিতে সাধিত হইতেছে। বিচ্ছিন্ন অবস্থায় একা কোন ঘটনা ঘটিতেছে না। কোন ঘটনা বুঝিতে হইলে তাই তাহার পারিপার্শ্বিকতাকেও বুঝিতে হয়। বস্তু জগতের সমস্ত কিছু পরস্পর নির্ভরশীল— প্রত্যেকের সহিত প্রত্যেকের সম্বন্ধ আছে। জড়জগতের অন্তর্নিহিত পরস্পরবিরোধী যে শক্তি আছে, তাঁহারই সংঘর্য ও সমন্বয়ের ফলে আমাদের এই বস্তুজগৎ বিকাশ লাভ করিতেছে। সংঘর্ষ তাই দোষের নয়, উহা বিকাশেরই ধর্ম্ম। যে-কোন ঘটনাই তার বিপরীদ্ধর্মী বৈষম্যকে সঙ্গে করিয়া আনে। একটা-কিছু ঘটিলে বুঝিতে হইবে তার বিপরীতটাও ইহার মধ্যে নিহিত আছে। এই আত্মদ্বন্দ্বের ফলেই এক বস্তু অন্য বস্তুতে রূপান্তরিত হয়। পৃথিবীর সমস্ত দ্বন্দ্ব-কোলাহল ও যুদ্ধ-বিগ্রহ এই সংঘর্ষ ও সমন্বয়েরই ইতিহাস। মার্কস আরও বলেনঃ অর্থনৈতিক বুনিয়াদের (economic basis) উপরেই মানুষের যতকিছু প্রতিষ্ঠান দাঁড়াইয়া আছে। শিল্প, বিজ্ঞান, রাজনীতি—সকলের মূলেই আছে এই অর্থনৈতিক প্রশ্ন। প্রাচীন কাল হইতে এ-পর্যন্ত ইতিহাসের যত ঘটনা ঘটিয়া আসিতেছে, তার প্রত্যেকটীর মূলে এই অর্থসমাই কোন-না-কোন রূপে প্রকাশ পাইয়াছে।
মার্কস্ তাঁহার সুবিখ্যাত গ্রন্থ “ক্যাপিটালে” (Das Kapital) এই সমস্ত অর্থনৈতিক সমস্যার বিস্তৃত ব্যাখ্যা ও আলোচনা করিয়াছেন। কিরূপ করিয়া একটা অবস্থা অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত হয়, কোন্ অবস্থার পরিণতি কী হয়, ইত্যাদি বিষয় তিনি বিজ্ঞানসম্মত ভাবে আলোচনা করিয়াছেন। এই জন্তুই তাঁহার সমাজতন্ত্রকে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ (Scientific Socialism) বলা হয়।
ডায়লেটিক্ জড়দর্শনে তাই কোন আদর্শের বা নীতির বালাই নাই। ঘটনার স্রোতে গা ঢালিয়া ভাসিয়া যাও—যেখানে গিয়া লাগে লাগুক,—ইহাই হইল উহার ধর্ম্ম। খাঁটী মাক্র্স্বাদী তাই কখনো ভুল করিতে ভয় পায় না!
মার্কস্ যখন পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লেখনী ধারণ করিলেন, তখন এই ডায়লেটিক পদ্ধতি অনুসারেই তিনি দেখাইলেন যে, স্বভাব-ধর্ম্মের তাকিদেই পুঁজিবাদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে, কারণ উহার মধ্যেই উহার বিরুদ্ধধর্ম্মী সাম্যবাদও নিহিত আছে। অন্য কথায়, পুঁজিবাদের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি সাম্যবাদে। কাজেই পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালাইলে বিজয়লাভ স্থিরনিশ্চিত। মার্কসের এই দর্শন কমিউনিস্টদের মনে তাই দিল এক বিপুল প্রেরণা। মার্কসের ‘Capital’ তাই হইল ‘শ্রমিকদিগের বাইবেল’ (the Bible of the labour class).
অতএব আমরা দেখিলাম, কমিউনিজম্ শুধু একটা খেয়ালের সৃষ্টি নয়; এর পশ্চাতে আছে একটা দার্শনিক বুনিয়াদ, আর সেটা হইতেছে নিছক নিরীশ্বরমূলক জড়বাদ।