বিষয়বস্তুতে চলুন

ইসলাম ও কমিউনিজ্‌ম্/কমিউনিজ্‌মের স্বাভাবিকতা

উইকিসংকলন থেকে

কমিউনিজ্‌মের স্বাভাবিকতা

 কমিউনিজ্‌ম্‌ স্বাভাবিক, না অস্বাভাবিক? মানুষের বাস্তব জীবনের সহিত ইহার কোন সুসঙ্গতি আছে, না-কি এ একটা সম্পূর্ণ আজগৈবী নূতন-কিছু? এইবার আমরা তাহাই আলোচনা করিব।

 গভীর ভাবে তলাইয়া দেখিলে দেখা যাইবে, কমিউনিজম্‌কে আমরা একেবারে অস্বাভাবিক বলিতে পারি না। জ্ঞাতসারেই হউক, অজ্ঞাতসারেই হউক, ইহার নীতি ও নির্দেশকে আমরা অনেক ক্ষেত্রে মানিয়া চলি। কমিউনিজমের মূলমন্ত্র হইলঃ ব্যষ্টিকে সমষ্টির মধ্যে বিসর্জ্জন দিয়া সবার মাঝারে একজন হইয়া জীবনকে উপভোগ করা। কমিউনিজম্ আমাদিগকে তাই আত্মকেন্দ্রিক না করিয়া সমাজকেন্দ্রিক করিতে চায়; আমাদের চিন্তা ও কর্ম্মকে অন্তর্মুখীন না করিয়া বহির্মুখীন করিতে চায়। এই নীতি কি আমাদের পারিবারিক, সামাজিক বা নাগরিক জীবনে আমরা অনেক ক্ষেত্রে মানিয়া চলি না?

 ধরুন একটা একান্নবর্তী পরিবার। স্বামী, স্ত্রী, দুইটী ছেলে, একটা মেয়ে, একটা চাকর, একটী চাকরাণী। বাপ এবং বড় ছেলে রোজগার করে; ছোট ছেলে এবং মেয়েটা স্কুলে পড়ে। বড় ছেলেটী তাহার যাবতীয় উপার্জ্জন আনিয়া বাপের হাতে দেয়; বাপ কর্ত্তা হইয়া সেই পরিবারকে চালনা করে। প্রতিদিন এক হাঁড়িতেই সকলের জন রান্না হয়; তারপর যার যতটুকু প্রয়োজন, তাই তাহাকে খাইতে দেওয়া হয়। যার যখন কাপড়-জামার দরকার, যার যখন চিকিৎসার দরকার, সমস্তই সেই সাধারণ ভাঙার হইতে যায়। কে কতটাকা রোজগার করে, কে কতটু কাজ করে, সে হিসাব করিয়া বণ্টন করা হয় না; প্রত্যেকের অভাবের প্রতিই সমান দৃষ্টি রাখা হয়। এইখানে বলা যাইতে পারেঃ এই পরিবারে কমিউনিজম্ আসিয়াছে। কিন্তু আবার এই পরিবারেই যদি প্রত্যেকে রোজগার করিয়া নিজের নিজের খোরপোষের ব্যবস্থা করে এবং উদ্বৃক্ত অর্থ গোপনে গোপনে সঞ্চয় করিতে আরম্ভ করে, তবে আর সেখানে কমিউনিজম্ থাকে না; সেখানে আসে পুঁজিবাদের মনোবৃত্তি।

 কিন্তু কোন একান্নবর্তী পরিবারের দৃষ্টান্তও ঠিক কমিউনিজমের আদর্শ দৃষ্টান্ত নয়। একান্নবর্তী পরিবারের কর্তা ও সভ্যেরা শুধু সেই পরিবারের সুখসুবিধার কথাই চিন্তা করে, তাদের প্রতিবেশীর কথা, গ্রামবাসীর কথা, অথবা দেশবাসীর কথা চিন্তা করে না। কোন প্রতিবেশী না খাইতে পাইয়া মারা গেলেও তাহাদের কিছু যায় আসে না। কাজেই প্রত্যেক পরিবার একান্নবর্ত্তী হইলেই যে সেদেশে কমিউনিজম্ আসিল, একথা বলিতেছি না। সমস্ত দেশকে যদি একটা বিরাট পরিবার মনে করা যায় এবং দেশবাসীর সকলেই যদি তাহাদের শক্তি ও সামর্থ্য অনুসারে কাজকর্ম্ম করিয়া নিজেদের উপার্জন একটা সাধারণ ভাণ্ডারে রাখিয়া সমভাবে ভাগ করিয়া লয়, তবেই সেখানে সত্যিকার কমিউনিজম্ আসে।

 নাগরিক জীবনেও আমরা এইরূপ আংশিক ভাবে কমিউনিজমকে স্বীকার করি। আমরা মিউনিসিপ্যাল ট্যাক্স দেই। সকলেই একরূপ দেই না; কেউ বেশী দেই, কেউ কম দেই। সেই সব ট্যাক্স, একত্র করিয়া। কর্তৃপক্ষ জল সরবরাহ করে, রাস্তা তৈরী করে, রাস্তায় আলো দেয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। ট্যাক্সের কমবেশি থাকিলেও প্রত্যেক নাগরিক যদৃচ্ছাক্রমে সেই রাস্তা দিয়া চলে, সেই জন, সেই আলো সমানভাবে উপভোগ করে। একথা কেহ বলিতে পারে না: আমি অমুক রাস্তা দিয়া কোনদিন যাইবও না, ট্যাক্সও দিব না; অথবা কে কত ট্যাক্স দেয়, সেই হিসাব করিয়াও তাহাকে ঐ সব সুখ-সুবিধা ভোগ করিবার অধিকার দেওয়া হয় না। ট্যাক্স না দিলেও, অথবা কম দিলেও, রাস্তার আলো-জল যার যত খুশী ভোগ করিতে পারে। এখানেও আমরা দেখি কমিউনিজম্। পথ-ঘাট, নদ-নদী, আলো-বাতাস, চন্দ্র-সূর্য্য —প্রত্যেকটাই কমিউনিজমের দৃষ্টান্ত। অফুরন্ত সূর্য্যালোক ছড়ান রহিয়াছে, যার যত দরকার লও; নদীভরা জল আছে, যার যত খুশী ব্যবহার কর।

 এইরূপে চৌকিদারী ট্যাক্‌স্ বা ইউনিয়ন রেট, এডুকেশন সেস, রোড সেস, ইত্যাদিকেও কমিউনিজমের দৃষ্টান্ত বলা যায়।

 অতএব দেখা যাইতেছে, ধন ও সম্পত্তির বণ্টন-ব্যবস্থার উপরেই কমিউনিজম্ নির্ভর করিতেছে। অপরকে বঞ্চিত করিয়া আত্মসুখের জন্য দেশের ধনসম্পদ নিজ হাতে মজুদ করিয়া ভোগ করিতে গেলে হয় পুঁজিবাদ, আর সবার সঙ্গে ভোগ করিতে গেলে হয় কমিউনিজম। ধন-সম্পদের উৎপত্তি ও বিতরণ (Production and Distribution) লইয়াই যত গণ্ডগোল। উৎপত্তির উপায় একচেটিয়া ভাবে কাহারও হাতে থাকিলে চলিবে না, আবার বিতরণের ব্যবস্থাও সমান রাখিতে হইবে; তারতম্য করিতে গেলেই মুষ্কিল। উৎপন্নের ব্যবস্থা ও আয়ের বিতরণ—উভয়কেই নিয়ন্ত্রিত করিতে হইবে। যাহার যেরূপ খুশী উৎপন্ন করিবে এবং যেরূপ খুশী বিতরণ করিবে, ইহা চলিবে না। ইহার জন্য একটা সুনির্দিষ্ট নীতি ও পদ্ধতি চাই।

 ধনসম্পদের বিতরণ-সমস্যাই প্রধান সমস্যা। দেখা যাউক, কিরূপে এই সমস্যার সমাধান করিতে পারা যায়ঃ

 বিশ্লেষণ করিলে দেখা যাইবে, আটটী উপায়ে দেশের ধনসম্পত্তি বিতরিত হইতে পারেঃ

(১) To each what he produces:—অর্থাৎ যে যাহা উৎপন্ন করে, সে তাহাই পাইবে।
(২) To each what he deserves:—অর্থাৎ যাহার যোগ্যতা যেরূপ, সে সেইরূপ পাইবে।
(৩) To each what he can grab:—অর্থাৎ যে যেরূপ ভাবে হাত করিতে পারে, সেইটাই পাইবে।
(8) The plan of the few rich and many poor:—অর্থাৎ অল্পসংখ্যককে বড়লোক হইতে দিয়। বাদবাকী সকলকেই গরীব রাখিতে হইবে।
(৫) To each what he wants:—অর্থাৎ যাহার যেরূপ দরকার, সে তাহাই পাইবে।
(৬) Distibution by Class:—অর্থাৎ শ্রেণী-বিভাগ করিয়া অগ্রে প্রত্যেক শ্রেণীর হার নির্দ্দিষ্ট করিতে হইবে, পরে সেই নির্দ্ধারিত হার অনুযায়ী প্রত্যেককে দিতে হইবে।
(৭) Laissez fair:—অর্থাৎ যেরূপ চলিয়া আসিতেছে, সেইরূপ চলিবে।
(৮) To give everybody an equal share:—অর্থাৎ ছোট-বড় নির্বিশেষে প্রত্যেককে সমান ভাগ দিতে হইবে।

 এই আটটী নীতির কোনটী গ্রহণযোগ্য, সেই বিচার করা যাউকঃ

(১)

 যে যাহা উপার্জ্জন করে, সে তাহাই পাইবে—এই নীতি শুনিতে ভাল, কিন্তু কাজে লাগানো কঠিন। এই নীতি অনুসারে প্রত্যেককেই খাটিয়া খাইতে হইবে, কারণ যে খাটিবে না, সে কিছুই পাইবে না। ইহা দ্বারা অলসতা দূর হইবে, দেশের কর্ম্মশক্তি বাড়িবে এবং প্রত্যেক লোক স্বাবলম্বী হইতে শিখিবে। কিন্তু মুস্কিল হইতেছে, কে যে কতখানি কাজ করিল, তাহা ঠিক ভাবে বুঝিব কেমন করিয়া? ধরুন একজন গৃহস্থ জন-মজুর খাটাইয়া জমিতে ধান উৎপন্ন করিল। গরু, লাঙ্গল, বীজধান—সবই গৃহস্থের, শুধু পরিশ্রম মঞ্জুরদের। অবশ্য গৃহস্থ নিজেও তত্ত্বাবধান করিতে ভুলে নাই। এখন উৎপন্ন ধান্যের বিতরণ কিরূপ হইবে? কে কতখানি উৎপন্ন করিল, কে বলিয়া দিবে? অথবা মনে করুন, কোন কাপড়ের কলে (mill) কাপড় প্রস্তুত হইতেছে। কাপড় প্রস্তুত হইয়া গেলে সেই কাপড় বিক্রয় করিয়া অনেক টাকা আসিল। এখন সেই টাকার বিতরণ কিরূপে করা যাইবে? কেহ মেশিন চালাইয়াছে, কেহ সূতায় রং দিয়াছে, কেহ সূতা কাটিয়াছে, কেহ তূন। বহন করিয়া আনিয়াছে, কেহ সেই তূলা উৎপন্ন করিয়াছে—ইত্যাদি ভাবে বহু হাত ঘুরিয়া আসিয়া তবে কাপড় তৈরী হইয়াছে। শুধু তাই নয়; মিলের মালিক বহু অর্থ ব্যয় করিয়া বিদেশ হইতে মেশিন ও অন্যান্য সাজ-সরঞ্জাম আনিয়াছে, কারখানা তৈরী করিয়াছে, মেশিন বসাইয়াছে, লোকজন খাটাইয়াছে, তবে না মেশিনটী চালু রহিয়াছে! এখন এই উৎপন্ন আয়ে কার কতটুকু অংশ? কে কম পাইবে, কে বেশী পাইবে? কারো দানই ত তুচ্ছ নয়! কোন্ নীতি অনুসারে অংশ-নির্দ্ধারণ হইবে? সুমীমাংসা করিতে পারিবে না। কেহই এ প্রশ্নের

 কেহ হয়ত বলিবেন: সময়ের নিক্তিতে প্রত্যেককে পারিশ্রমিক দিবার ব্যবস্থা করা যায়; অর্থাৎ যে যত সময় কাজ করিবে, তত পরিমাণ দিতে হইবে। ধরুন ঘণ্টা প্রতি প্রত্যেককে এক টাকা করিয়া দেওয়া হইবে সাব্যস্ত হইল। এখন যে ব্যক্তি দুই ঘণ্টা কাজ করিল, তাহাকে দুই টাকা দিলাম, যে আধঘণ্টা কাজ করিল, তাহাকে আট আনা দিলাম। কিন্তু এ নীতিও অচল। সময় দেখিয়া সব কাজের মূল্য নিরূপণ করা যায় না। সব কাজ এক রকম নয়, সব লোকও একরকম নয়। কাজের এবং লোকের তারতম্য আছে। কোন ডাক্তারের বা ২ টাকা ফি, কোন ডাক্তারের বা ১৬ টাকা ফি; কোন ব্যারিষ্টারকে দৈনিক ১৬ টাকা দিলেই তিনি খুশী হন, আবার কোন ব্যারিষ্টারকে দৈনিক ৫০০ টাকা দিয়াও পাওয়া যায় না। শ্রমিকদিগের সম্বন্ধেও একথা ঘাটে। একজন রাজমিস্ত্রী এবং একজন যোগাড়ের একই মূল্য নয়; অথবা সব রাজমিস্ত্রীও সমান যোগ নয়। চাহিদা (demand) এবং সরবরাহ (supply) এর উপরেও মজুরীর তারতম্য ঘটিয়া যায়। যেখানে ডাক্তার কম এবং রোগী ডাক্তারকেও বেশী ভিজিট বেশী সেখানে অনুপযুক্ত আবার যেখানে রোগী কম কিন্তু ডাক্তারকেও কম ভিজিট লইতে হয়। ডাক্তার বেশী, দিতে হয়। সেখানে ভাল আবার একই স্থানে অনেকগুলি অভিজ্ঞ লোক জড় হইলে তাহাদের মূল্য ও কমিয়া যায়। পছন্দ-অপছন্দ ও আচার-ব্যবহারের প্রশ্নও এ সমস্যাকে কম জটিল করিয়া তুলে না। সিনেমাতে যাহারা অভিনয় করে, তাহাদের সকলেরই মূল্য এক নয়। কোন সুন্দরী তরুণী তারকা বয়স্কা কোন অভিজ্ঞ অভিনেত্রী অপেক্ষা ঢের বেশী টাকা পায়। সময়ের উপর তাই আয়ের পরিমাণ নির্ভর করে না। চব্বিশ ঘণ্টায় কেউ এক টাকা উপার্জ্জন করিতে পারে না, আবার এক ঘণ্টায় কেউ হাজার টাকা উপার্জ্জন করে।

 যাহারা কবি, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিক, তাহাদের উৎপন্ন দ্রব্য আবার স্বতন্ত্র ধরণের। সময়ের নিক্তিতে তাহার মূল্য নিরূপণ করা অসম্ভব।

 নারীরা সন্তান উৎপাদন ও লালন-পালন করে, ঘর-সংসার করে, তাহাদিগকে ঘণ্টা হিসাবে মূল্য দিতে গেলে একটা বিশ্রী ব্যাপার ঘটে না কি?

 বৃদ্ধ, অক্ষম, দুর্ব্বল ও শিশুদের অবস্থাই বা কী হইবে? তাহারা ত’ উপার্জন করিতে অসমর্থ। তাহারা কি তবে কিছুই খাইতে পাইবে না?

 এই ধরণের বহু ফ্যাক্‌ড়াই এই নীতিকে অচল করিয়া দেয়।

(২)

 যে যেরূপ যোগ্য সেইরূপ পাইবে—এই নীতিও কার্য্যতঃ অচল। আপাততঃ দেখিয়া মনে হয় বটে যে, এই নীতি অনুসারে অর্থ-বণ্টন হওয়াই উচিত; কিন্তু কার্য্যতঃ তাহা হয় না। যাহারা মেধাবী, সচ্চরিত্র, অধ্যবসায়ী, মিতব্যয়ী ও উদ্যমশীল, তাহারা যদি বড়লোক হইত এবং যাহারা অলস, দুশ্চরিত্র, অমিতব্যয়ী বা জুয়াচোর, তাহারা যদি দীন-দরিদ্র হইত, তবে বলিবার কিছুই ছিল না; কিন্তু তাহা হয় কি? অধিকাংশ স্থলেই এই নীতির অমর্য্যাদা দেখিতে পাই না কি? লম্পট ও ঘড়িবাজ লোকেরাই অনেকক্ষেত্রে উন্নতি করিতেছে আর সাধু ব্যক্তিরা পচিয়া মরিতেছে।

 যোগ্যতার মাপকাঠি কী হইবে, তাহাও স্থির করা কঠিন। নীতির দিক দিয়া যাহাকে যোগ্য বলা যায়, কর্ম্মের দিক দিয়া হয়ত সে যোগ্য নয়; আবার নীতির দিয়া যে অযোগ্য, রাজনীতির দিক দিয়া সে হয়ত সম্পূর্ণ যোগ্য। কেমন করিয়া তবে যোগ্য-অযোগ্যের বিচার হইবে? কোন্ যোগ্যতাকে আমরা গ্রহণ করিব? নীতির যোগ্যতা, না দুর্নীতির যোগ্যতা?

 যোগ্যতার মানদণ্ড যদি নিরূপিতও হয়, তবু এই নীতি অনুসারে ধনবণ্টন করিলে ন্যায্যের মর্যাদা রক্ষা হয় না। ধরুন একটি বড়ঘরের ছেলে আর একটী মজুরের ছেলে। বড় লোকটীর ছেলে এম-এ পাশ করিল, মজুরের ছেলেটী অর্থাভাবে ম্যাট্রিকও পাশ করিতে পারিল না। ইহাদের মধ্যে যোগ্য কে? নিশ্চয়ই বলিবেন এম-এ পাশ ছেলেটি। কিন্তু কেন? যে-ছেলেটী এম-এ পাশ করিল, তার যোগ্যতা কিসে বেশী? আর যে ছেলেটা ম্যাট্রিক পাশ করিতে পারিল না, তার অযোগ্যতাই বা কী? বড়ঘরের ছেলেটা পূর্ব্ব হইতেই উন্নত পরিবেশের মধ্যে লালিত পালিত হইয়া সর্ব্বপ্রকারের সুযোগ ও সুবিধা লাভ করিয়াছে, কাজেই সে এম-এ পাশ করিতে পারিয়াছে। অনুরূপ সুযোগ ও সুবিধা পাইলে মজুরের ছেলেটাও যে এম-এ পাশ করিতে পারিত না, তাহা কে বলিল? কাজেই যাহারা আজ যোগ্য, বলিয়া বিবেচিত হইতেছে, তাহারা যে সত্যই যোগ্য, আর যাহারা অযোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইতেছে, তাহারা যে সত্যই অযোগ্য, তাহা ত নয়!

 তারপর যোগ্যতার ক্রম নির্ধারণ করাও এক দুরূহ ব্যাপার। মেথর, কৃষক, কর্ম্মকার, শিক্ষক, পুরোহিত, মোল্লা, মৌলভী, উকিল, ব্যারিষ্টার, ডাক্তার, সওদাগর, ইঞ্জিনিয়ার—কার চেয়ে কে বড়? কার চেয়ে কে যোগ্য? বলুন ত? কৃষক জমি চাষ করিয়া শস্য উৎপাদন করে, সে লেখাপড়া জানে না; আর জজসাহেব লেখাপড়া জানেন, বিচার করেন; উহাতেই কৃষক অপেক্ষা জজসাহেব কেন বড় হইবেন? কৃষক যেমন লেখাপড়া জানে না, তেমনি জজসাহেবও ত জমি চাষ করিতে জানে না! জজসাহেব কৃষক অপেক্ষা নিজেকে উন্নততর মনে করিতে পারেন, কিন্তু কৃষকের উৎপন্ন ধান্যশস্য না হইলে জজসাহেবের একদিনও চলে না। কৃষক না হইলে সমাজ চলে কি? সেইরূপ মেথর, কুলি, মজুর ইত্যাদি না থাকিলে বড় বড় বাবুদের কী দশা হয়, ভাবুন ত? কাজেই বলিতে হয়, যোগ্যতার কোন ধ্রুব আদর্শ নাই। এক হিসাবে প্রত্যেকেই যোগ্য, প্রত্যেকেরই প্রয়োজন আছে। পরস্পরের আদান-প্রদানের উপরেই আমাদের সমাজ ও সভ্যতা গড়িয়া উঠিয়াছে! এখানে কোন ছোট-বড়র প্রশ্ন নাই। আল্লার চোখে সবাই সমান।

 অতএব যোগ্যতার মাপকাঠিতে ধন-বণ্টন সম্ভব নয়।

(৩)

 তৃতীয় উপায়ও (অর্থাৎ যে যেরূপ ভাবে পারে লউক)—গ্রহণযোগ্য নয়। ইহা ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতিরই অনুরূপ। এই নীতিই ত বর্ত্তমান জগতে অনুসৃত হইতেছে এবং ইহার ফলেই ত দুনিয়ায় যত মারামারি, কাটাকাটি, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও অশান্তি! ইহারই প্রতিকার কল্পেই ত কমিউনিজমের প্রবর্তন! দুনিয়ার সব লোকই যদি সমান বলবান হইত, অথবা সমান সুবিধা পাইত, তাহা হইলেও না হয় এ নীতি খাটিত। কিন্তু তাহা ত না! স্ত্রী-পুরুষ—সব রকমের মানুষই আছে। এখানে শিশু-বৃদ্ধ, ছোট-বড় কাজেই জোর যার মুলুক তার নীতি চলিলে সবলেরাই প্রবল হইবে, দুর্ব্বল মারা যাইবে। পক্ষান্তরে কাড়াকাড়ির ফলে একটা ভীষণ অরাজকতা ও অশান্তির সৃষ্টি হইবে।

(8)

 চতুর্থ নীতি হইল: সাধারণলোককে কোনরূপে বাঁচাইয়া রাখিয়া তাহাদের উপরে দুই-চারি জনকে বড়লোক হইতে দেওয়া। বর্ত্তমানেও এই নীতি চলিতেছে। মুষ্টিমেয় লোক শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানে, শিল্পকলায় পারদর্শী হইয়া সকল সুখ-সুবিধা ভোগ করিতেছে, আর অধিকাংশ লোক দুঃখে কষ্টে দিন কাটাইতেছে। মুষ্টিমেয় বড়লোকদেরই জমিদারী, বাড়ী, গাড়ী—সব কিছু। বহুকে বঞ্চিত করিয়া অল্প লোকের এই সুখভোগ আদৌ সমর্থনযোগ্য নয়। ইহাতে দেশের অকল্যাণ হয়। একটা অভিজাত সম্প্রদায় আপনা-আপনি গড়িয়া উঠে; তাহারা হয় ভীষণ আত্মাভিমানী, জনসাধারণকে তাহারা ঘৃণা করিতে শিখে, দেশের নাড়ীর সহিত তাহাদের প্রায়ই যোগ থাকে না। দেশবাসীর অভাব-অভিযোগ তাহারা বুঝে না, আপন স্বার্থের জন্য তাহারা গরীবকে গরীবই রাখিতে চায়, কোনরূপ সুখ-সুবিধা তাহাদিগকে দিতে চায় না, বরং নানাভাবে তাহাদিগকে বঞ্চিত করে।

 এইরূপ একশ্রেণীর লোককে বড়লোক হইতে দেওয়া রাজনৈতিক। কারণেও যুক্তিসঙ্গত নয়। যে-কোন বিপ্লবের সময় তাহারই বাধার সৃষ্টি করে এবং অনেক উদ্দেশ্য পণ্ড করিয়া দেয়।

(৫)

 পঞ্চম উপায় হইতেছেঃ যাহার যেরূপ অভাব সেইরূপ বণ্টন ব্যবস্থা করা। কিন্তু এখানেও ঐ একই বিভ্রাট। কার কিরূপ অভাব, তাহা কে ঠিক করিয়া দিবে? অভাবের কোন মানদণ্ড নাই। আমার যাহা অভাব, অপরের তাহা বিলাস। আমি সরু চালের ভাত ভালবাসি, কিন্তু একজন কুলি সে-ভাত খাইয়া খুশি হইবে না; সে চায় মোটা ভাত। একই পরিবারে একজন রাত্রে রুটী খায়, একজন ভাত খায়; একজন মিষ্টি চায়, একজন আদৌ চায় না। এইরূপ ভাবের অসংখ্য ব্যক্তিগত অভাব দুনিয়ায় আছে। বাহির হইতে কে সেই অভাবের পরিমাপ করিবে? অভাব অনেকখনি ব্যক্তিগত অনুভূতি, অনেকখানি অন্তরের জিনিস। বাহির হইতে ইহার বরাদ্দ করিতে গেলে কিছুতেই তাহা মিল খাইবে না, একটা গোঁজামিলেরই সৃষ্টি হইবে। কেহ সন্তুষ্ট হইবে, কেহ হইবে না। ফলে যে অশান্তি সেই অশান্তিই রহিয়া যাইবে।

(৬)

 শ্রেণী-বিভাগ করিয়। বণ্টন করিতে গেলেও বিপদ আছে। কুলি, মজুর, কামার, কুমোর, ধোপা, নাপিত, কৃষক, সওদাগর, মোল্লা, মৌলভী, পুরোহিত, শিক্ষক, উকিল, মোক্তার, জজ, ম্যাজিষ্ট্রেট—ইত্যাদি ভাবে না হয় শ্রেণী-নির্ণয় করা গেল। কিন্তু কোন্ শ্রেণীকে কত দেওয়া হইবে—কে তাহা সাব্যস্ত করিবে? কাহার চেয়ে কে বড়? কাহার চেয়ে কে বেশী পাইবে? এ-প্রশ্নের সন্তোষজনক মীমাংসা কিছুতেই হইতে পারে না। তাছাড়া এরূপ ভাবে ভাগ করিতে গেলে সমাজ শতধা বিভক্ত হইয়া যাইবে এবং পরস্পরের মধ্যে দ্বেষ-হিংসা অত্যধিকরূপে বাড়িয়া যাইবে। কাজেই এ প্রথা অগ্রাহ্য।

(৭)

 যেরূপ চলিতেছে, সেইরূপই চলুক—এ নীতিও যুক্তিযুক্ত নয়। ইচ্ছা করিলেই সব সময়ে সব কাজ হয় না। যেরূপ চলিতেছে সেইরূপই চলুক, কিন্তু দুনিয়া আমি ইচ্ছা করিলাম যে সেভাবে চলে না। ঘটনাপ্রবাহ কাহারও কথা মানে না, সে তার নিজের পথ কাটিয়া চলে। কাজেই চুপ করিয়া বসিয়া থাকার নীতি গ্রহণযোগ্য নহে। সময় মত হস্তক্ষেপ করিতে পারিলে কোন ঘটনার মোড় ফিরাইয়া দেওয়া বরং সম্ভব, কিন্তু সুযোগ ছাড়িয়া দিলে স্বভাবের টানে ঘটনা প্রবাহ এমন জটিল আকার ধারণ করে যে, তখন আর কোন-কিছু করা সম্ভব হয় না। জগতের কোন জিনিসই একভাবে পড়িয়া থাকে না, একটা প্রতিক্রিয়া আরম্ভ হয়ই হয়। কাজেই চুপচাপ বসিয়া থাকিলেই যে ঝঞ্ঝাট এড়ান যায়, এমন নয়। ঘরের দাওয়ায় বিড়াল ঘুমাইতেছে দেখিয়া গৃহিনী যদি মনে করেন যে, ও যেমন আছে, তেমনি থাকিবে, একঘণ্টা পরেই আমি ফিরিয়া আসিব,—এই বলিয়া রান্নাঘরের দরজা খুলিয়া রাখিয়াই পাড়া বেড়াইতে যান, তবে তিনি পস্তাইবেন! এক ঘণ্টা পরে ফিরিয়া আসিয়া তিনি দেখিবেন, বিড়ালও ঘুমাইয়া নাই, রান্নাঘরের দুধটুকুও নাই!

(৮)

 উপরে যে সাতটী উপায়ের কথা আলোচনা করা হইল, আমরা দেখিলাম, তাহার একটাও সন্তোষজনক ভাবে ধনবণ্টন-সমস্যার সমাধান করিতে পারে না। একটীমাত্র উপায়ই এখন আমাদের বাকী আছে, সেটী হইতেছে সাম্যবাদ বা কমিউনিজম্। কমিউনিজম্ বলেঃ উপরের কোন নীতিই যখন পুরাপুরি ভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, তখন ধন-সম্পদকে সকল মানুষের মধ্যে তুল্যরূপে বিভাগ করিয়া দেওয়াই উচিত। কোনরূপ তারতম্য করা যখন সম্ভবপর নয়, অথবা করিলেও যখন অবিচার দূর হয় না, তখন সর্ব্বাপেক্ষা উত্তম ব্যবস্থা হইতেছে প্রত্যেককে সমান অংশ দান করা। ছোট-বড়, স্ত্রী-পুরুষ, ধনী-নিধন—সকলেরই অধিকার সমান, কাহারও চেয়ে কেহ বড় নয়, কাহারও চেয়ে কেহ ছোট নয়—এই নীতিই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ।

 বলা বাহুল্য, এ ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও অনেক কিছু বলিবার আছে। আমরা যথাস্থানে সে কথা বলিব।