বিষয়বস্তুতে চলুন

ইসলাম ও কমিউনিজ্‌ম্/কমিউনিজ্‌ম্ কী?

উইকিসংকলন থেকে

কমিউনিজ্‌ম্‌ কী?

কমিউনিজ্‌ম্‌ কী?

কমিউনিজম্ হইল চরম সাম্যবাদ।
কিন্তু সাম্যবাদ কী?

 সেকথা বুঝাইতে হইলে মধ্যযুগের ইউরোপীয় সমাজ-ব্যবস্থা সম্বন্ধে আমাদিগকে কিছু বলিতে হয়।

 ইউরোপের ইতিহাস পড়িলে জানা যায়, মধ্যযুগে সর্ব্বত্রই একপ্রকার জায়গীর-প্রথা বিদ্যমান ছিল। সমস্ত ভূ-সম্পত্তির মালিক ছিলেন স্বয়ং রাজা। রাজা তাঁহার অধীন বিভিন্ন সামন্ত জমিদার (baron) দিগকে সেই জমি বণ্টন করিয়া দিতেন। জমিদারেরা আবার সেই জমি তাঁহাদের অধীন নিম্নভূস্বামীদিগকে বিলি করিতেন। এইরূপে সর্ব্বশেষে কৃষকদিগের মধ্যে সেই জমি বিতরিত হইত। কৃষক ও মজুররা সেই সব জমি চাষ-আবাদ করিত বটে, কিন্তু কোন জমিতে তাহাদের কোন অধিকার থাকিত না। তাহারা ছিল ‘চাষের মালিক’ কিন্তু ‘গ্রাসের মালিক’ নয়! হাড়ভাঙা খাটুনি খাটিয়া তাহারা ফসল উৎপন্ন করিত, কিন্তু সে ফসলের অতি সামান্তই তাহার। পাইত। কখনও বা নির্জলা বেগার খাটিয়াই তাহাদিগকে সন্তুষ্ট থাকিতে হইত। কৃষক ও মজুরদিগের তাই কষ্টের অবধি ছিল না। অভিযোগের নিবৃত্তি হয় না।

 কালক্রমে এই জায়গীর-প্রথার বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন উপস্থিত হয়। ইংলণ্ড ও ফ্রান্সে প্রজা-বিদ্রোহ দেখা দেয়। অনেক আন্দোলনের পর এই সামন্ততন্ত্র - উঠিয়া যায়। কিন্তু ইহাতেও সর্বসাধারণের অভাবস্বেচ্ছাতন্ত্রী সম্রাট ও পুঁজিবাদীদিগের অত্যাচার ও জুলুমে প্রজাকুল অতিষ্ঠ হইয়া উঠে। রুশো (Rousseau) ও ভলটেয়ার (Voltaire) নামক দুইজন ফরাসী মনীষী এই স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লেখনী চালনা করেন। রুশো তাঁহার 'Social Contract' নামক বিখ্যাত পুস্তকে এই মত প্রকাশ করেন যে, প্রত্যেক মানুষই সমান এবং জন্মতঃ স্বাধীন। মানুষের সমাজ ও রাষ্ট্র একটা সামাজিক চুক্তি ছাড়া কিছুই নয়। সম্রাট হইতে দীনদরিদ্র পর্যন্ত সকলের মধ্যেই একটা আদান-প্রদানের ব্যবস্থা থাকিবে,—পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করিবে,—এই চুক্তির উপরই সমাজ ও রাষ্ট্র গড়িয়া উঠিয়াছিল। কিন্তু কালে কালে রাজারা এবং অন্যান্য কুচক্রী লোকেরা শক্তি ও সুবিধা হাতে পাইয়া সেই পরিত্র চুক্তি ভঙ্গ করিয়াছে; তাহারই ফলে মানুষে মানুষে ভেদ-বৈষম্যের সৃষ্টি হইয়াছে। অন্যথায় সকল মানুষই সমান।

 এই সাম্যবাদ নিপীড়িত জনমনে বিপুল প্রেরণার সঞ্চার করে। ফলে ১৭৮৯ খৃষ্টাব্দে ফ্রান্সে বিখ্যাত ফরাসী বিপ্লব (French Revolution) সংঘটিত হয়। স্বৈরতন্ত্র ও জমিদারী জুলুম তাহাতে অনেকটা প্রশমিত হয়।  কিন্তু এইখানেই সমস্যার সমাধান হইল না। কৃষক ও শ্রমিক সম্প্রদায় আর এক নূতন বিপদের সম্মুখীন হইল।

 সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপের বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলে বহু কলকারখানা ও যন্ত্রপাতির আবিষ্কার হইল; সঙ্গে সঙ্গে বহু শিল্পকেন্দ্রও (Industrial Centres) গড়িয়া উঠিল। এতদিন যে-সমস্ত জিনিস হাতে তৈরী হইত, এখন তাহা কলে তৈরী হইতে লাগিল। পূর্ব্বে যাহারা জমিদার ও বড়লোক ছিল, তাহারা যখন দেখিল জমিদারীতে সুবিধা হইবে না, তখন তাহারা নূতন নূতন কলকারখানা স্থাপন করিয়া তাহাতে মূলধন খাটাইতে মনস্থ করিল। সেই সব কলকারখানায় বহু শ্রমিকের প্রয়োজন হইল। গরীব লোকেরা অভাবের তাড়নায় দলে দলে সেই সব কারখানায় কাজ করিতে বাধ্য হইল। কারখানার মালিকেরা শ্রমিকদিগকে নামমাত্র পারিশ্রমিক দিয়া নিজেরা প্রচুর লাভ করিতে লাগিল। ফলে সমাজে আবার ভীষণ ভেদ-বৈবম্য দেখা দিন। অন সংখ্যক লোক বড়লোক হইতে লাগিল আর লক্ষ লক্ষ লোক দীনদরিদ্রই রহিয়া গেল। এই ধন-বৈষম্য ক্রমেই তীব্র হইতে তীব্রতর হইতে লাগিল।

 সামন্তবাদের (feudalism) পরে তাই আসিল পুঁজিবাদ বা capitalism. দরিদ্র জনসাধারণকে শোষিত (exploit) করিয়া অর্থ সঞ্চয় করাই হইল পুঁজিবাদের বৈশিষ্ট্য।

 পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে তখন আবার আন্দোলন শুরু হইল। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দী ধরিয়াই এই আন্দোলন চলিতে লাগিল। পুঁজিবাদকে ধ্বংস করিয়া কিরূপে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত করা যায়, চিন্তাশীল মনীষীদিগের তাহাই হইল প্রধান লক্ষ্যবস্তু। ইহা হইতেই হইল সমাজতন্ত্র বা socialismএর সৃষ্টি। দেশের জাতীয় ধনসম্পদ ও উৎপন্ন আয়ের সমীকরণই হইল socialism-এর প্রধান লক্ষ্য।  এই সোশ্যালিজমেরই চরম রূপ হইল কমিউনিজম্। কমিউনিজম ও সাম্যবাদ, তবে উগ্র সাম্যবাদ। দেশের যাবতীয় ধনসম্পত্তি হইতে ব্যক্তিগত অধিকার (private ownership) তুলিয়া দিয়া সেগুলিকে সাধারণ সম্পত্তিতে পরিণত করা এবং সকলকেই সুখ-সুবিধা ভোগ করিবার সম অধিকার দান করাই হইল কমিউনিজমের উদ্দেশ্য।

 কমিউনিজম্ তাই পুঁজিবাদের বিরোধী। শুধু পুঁজিবাদ নয়; যেহেতু সাম্রাজ্যবাদ (Imperialism) এই পুঁজিবাদেরই পরিণতি, কাজেই কমিউনিজম সাম্রাজ্যবাদেরও বিরোধী। সাম্রাজ্যবাদের বিলোপ সাধন করিয়া সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাই কমিউনিজমের প্রধান লক্ষ্য।

 কমিউনিজম্ যখন প্রচলিত রাষ্ট্র ও সমাজ-ব্যবস্থার কোন-কিছুই রাখিতে চায় না; জমিদার, মহাজন, ধনিক ও অভিজাত সম্প্রদায়কে সে যখন একেবারে নির্মূল করিতে চায়, তখন ধনিক সম্প্রদায়ই বা ইহাকে ছাড়িবে কেন? এমন বেকুফ কে আছে যে, নিজের ধনসম্পত্তি ও রাজ্য-মান পরকে বিলাইয়া দেয়? কাজেই সাম্রাজ্যবাদী, ধনিক বা অভিজাত-সম্প্রদায় কেহই কমিউনিজকে দুচোখ পাতিয়া দেখিতে পারে না। কমিউনিজম্ব চায় তাহারাই—যাহারা নিঃস্ব দরিদ্র বা না-পাওয়ার দল।

 তাহা হইলে দেখা যাইতেছে, গোটা সমাজ মোটামুটি ভাবে দুইটা দলে বিভক্ত হইয়া আছেঃ (১) পাওয়ার দল (haves), আর (২) না-পাওয়ার দল (have nots). পাওয়ার দলকে বুর্জোয়া সম্প্রদায় (bourgeouis) আখ্যা দেওয়া হইয়াছে, আর না-পাওয়ার দলকে বলা হইয়াছে প্রোলেটারিয়েট (proletariat) বা বঞ্চিতদের দল। কমিউনিজমের ইতিহাস প্রকৃতপক্ষে এই দুই দলের সংঘর্ষেরই ইতিহাস।

 কমিউনিজম্ শক্তির পূজারী। শান্ত প্রচারণায় তাহার বিশ্বাস নাই। সে বলেঃ শক্তিহীনের অলস আবেদন শুনিবে কে? সাম্যবাদ ইসলাম ও কমিউনিজম আনিতে হইলে তাই তার পিছনে চাই শক্তির সাধনা। কমিউনিজম্‌ তাই বিপ্লবপন্থী।

 শুধু আবার একদেশে কমিউনিজম্ প্রতিষ্ঠিত হইলেই কমিউনিস্টদল সন্তুষ্ট নয়। সমস্ত জগতে তাহার। নিজেদের আদর্শকে জয়যুক্ত দেখিতে চায়। অধিকাংশ দেশই তাই কমিউনিজকে বড় ভয় করিয়া চলে কমিউনিস্ট, দল প্রবল হইয়া পাছে সব-কিছুর ওলট-পালট ঘটাইয়া দেয়—এই ভয়ে সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদীরা সতত সন্ত্রস্ত।

 বর্তমানে একমাত্র রাশিয়াতেই পুরাপুরি ভাবে কমিউনিজম্ গৃহীত হইয়াছে। তাও বেশী দিনের কথা নয়——এই সেদিন—মাত্র ১৯১৭ খৃষ্টাব্দে। জারতন্ত্রের (Tsarism) বিলোপ সাধন করিয়া তথায় এই নূতন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। দেশের শাসন, সংরক্ষণ, শিল্প, বাণিজ্য, কবি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—সমস্ত কিছুর ব্যবস্থাভার এখন জনসাধারণের হাতে। সেখানে রাজা নাই, প্রজা নাই, জমিদারনাই, মহাজন নাই। রাষ্ট্র (State) সেখানে সাধারণের সম্পত্তি। রাষ্ট্রের সংরক্ষণ ও উন্নতির জন্য প্রত্যেকেই সেখানে নিজ নিজ শক্তি ও সামর্থ্য অনুসারে খাটিতেছে, তদ্বিনিময়ে রাষ্ট্রই তাহার সকল অভাব-অভিযোগের ও সুখ-শান্তির প্রতি দৃষ্টি রাখিতেছে।

 বিশ্ববিশ্রুত রুশজননায়ক লেনিনই (Lenin) রাশিয়াতে কমিউ নিজমের প্রবর্ত্তক। তিনিই ছিলেন এই নবপ্রবর্তিত শাসনতন্ত্রের প্রথম ডিক্টেটর (Dictator). লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিন (Marshal y Stalin) এখন রাশিয়ার কর্ণধার। স্ট্যালিনের হস্তেও কমিউনিজম বিরাট শক্তি ও পরিপুষ্টি লাভ করিয়াছে।

 ইংলণ্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালি, আমেরিকা, জাপান, চীন—কোন দেশেই কমিউনিজম্ শাসন-নীতি হিসাবে গৃহীত হয় নাই। তবে প্রায় প্রত্যেক দেশেই এক একটা কমিউনিস্ট পার্টি আছে। বিরুদ্ধ রাজশক্তির চাপে পড়িয়া তাহারা বিশেষ কিছুই করিয়া উঠিতে না পারিলেও তলে তলে অশান্তি ও অন্তবিপ্লবের সৃষ্টি করিতেছে।

 ইংলণ্ড ও জাপানে সাম্রাজ্যবাদ (Imperialism), ফ্রান্স, তুরস্ক, স্পেন ও আমেরিকায় সাধারণতন্ত্র (Republicanism), ইটালীতে ফ্যাসিতন্ত্র (Facism) এবং জার্মানিতে নাৎসীতন্ত্র (Nazism) প্রচলিত। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ইউরোপে বহুদিন হইতে একটা আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্র-আন্দোলন (International Socialist Movement) চলিয়া আসিতেছে বটে, কিন্তু আজ পর্যন্ত রাশিয়ার অনুসৃত সাম্যবাদ বা কমিউনিজম্ অন্য কোথায়ও গৃহীত হয় নাই। যদিও রাজনৈতিক কারণে রাশিয়ার সহিত আজ ইংলণ্ড ও আমেরিকার মিলন ঘটিয়াছে, তবু একথা ঢাকিবার উপায় নাই যে রাশিয়ার কমিউনিজমকে ইংলণ্ড ও আমেরিকা দস্তুর মত ভয় করে। শুধু ইংলণ্ড ও আমেরিকা কেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইটালি—ইহারও কমিউনিজমের ঘোর বিরোধী।

 ইহাই হইল বর্ত্তমান জগতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি!