বিষয়বস্তুতে চলুন

ইসলাম ও কমিউনিজ্‌ম্/কমিউনিস্ট্ এশতেহার

উইকিসংকলন থেকে

কমিউনিস্ট্ এশতেহার

 এশতেহারের প্রথমে দেখান হইয়াছে ধনতন্ত্রের (Capitalism) কুফলের নানাদিক। শ্রমিকশ্রেণী (proletariats) বুর্জোয়া শ্রেণীর (bourgeoisie) দ্বারা কি ভাবে শোষিত হইতেছে, অতি বিস্তৃতভাবে তাহার আলোচনা করা হইয়াছে। জগতের ইতিহাসে যত যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হইয়াছে, তার সবগুলিই যে শ্রেণী-সংঘর্ষ ছাড়া আর কিছু নয়, সকলেরই মূল কারণ যে অর্থ নৈতিক এবং সকলেরই মূলে আছে যে ধন-বৈষম্যের অভিশাপ, এই কথাই এশতেহারে প্রতিপন্ন করিবার চেষ্টা করা হইয়াছে। মার্কস্ ও এঙ্গেলসের মত এই যে, যতদিন এই ধনবৈষম্য থাকিবে, ততদিন জগতে শান্তি আসিবে না। তাই চাই ধনসম্পত্তির সমবিতরণ-ব্যবস্থা, অর্থাৎ ধনিকদিগের হাত হইতে সমস্ত অর্থ ও ভূসম্পত্তি ছিনাইয়া লইয়া সকলের মধ্যে তুল্যরূপে বণ্টন। একাজ কোনরূপ শান্তিপূর্ণ উপায়ে সম্ভব নয়। ইহার জন্য চাই শ্রমিক-আন্দোলন বা শ্রমিক-বিদ্রোহ।  এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য দশটী উপায় নির্দ্ধারিত করা হইয়াছে, সেগুলি এইঃ

(১) ব্যক্তিগত ভূসম্পত্তি তুলিয়া দিয়া সেগুলিকে সাধারণ সম্পত্তিতে পরিণত করিতে হইবে এবং দেশের যাবতীয় আয় সাধারণের কাজে লাগাইতে হইবে;
(২) খুব মোটা রকমের আয়-কর বসাইতে হইবে;
(৩) ভূ-সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার আইন তুলিয়া দিতে হইবে;
(৪) যাহারা বিদেশী, অথবা কমিউনিজমের বিরোধী, তাহাদিগের ধন-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করিতে হইবে;
(৫) সমস্ত আয় ষ্টেটের মূলধন (State Capital) রূপে পরিগণিত হইবে;
(৬) সমস্ত যাতায়াতের উপায় (means of communication) ষ্টেটের কর্তৃাধীনে আসিবে;
(৭) ষ্টেটের তত্ত্বাবধানে দেশে শিল্প ও কৃষির বিস্তার করিতে হইবে এবং একটা নির্দিষ্ট পরিকল্পনা গঠন করিয়া অমিত জমির উৎপাদন-শক্তি বাড়াইতে হইবে;
(৮) প্রত্যেক ব্যক্তিকে কাজ করিতে হইবে;
(৯) কৃষি ও শিল্পের সময়সাধন করিতে হইবে; শহর ও পল্লীর পার্থক্য দূর করিতে হইবে, জনসংখ্যাকে সমানভাবে শহর ও পল্লীগ্রামে ছড়াইয়া দিতে হইবে;
(১০) সরকারী স্কুল-কলেজ স্থাপন করিয়া ছেলেমেয়েদিগকে বিনা বেতনে শিক্ষা দিতে হইবে; অবয়স্ক বালক-বালিকাদিগকে শ্রম হইতে নিষ্কৃতি দিতে হইবে; শিক্ষার সহিত শিল্পের যোগসাধনা করিতে হইবে।
 সর্ব্বশেষে বিপ্লবের মধ্য দিয়া যে এই পরিবর্ত্তন আনিতে হইবে, তাহা বুঝাইয়া দিয়। এই বলিয়া উপসংহার করা হইয়াছে:

 "Working men of all countries, unite"
 অর্থাৎঃ সকল দেশের শ্রমিকদল, সংঘবদ্ধ হও।

 এই এশতেহার প্রথমতঃ জার্মান ভাষায় লিখিত হয়, পরে ইউরোপ ও অন্যান্য দেশের বিভিন্ন ভাষায় ইহার অনুবাদ হইয়াছে।

 ইংলণ্ডে অবস্থান কালে মার্কসের জীবন খুব অভাব-অনটনের মধ্য দিয়া অতিবাহিত হয়। এই সময়ে এঙ্গেলস্ যথাসাধ্য তাঁহাকে সাহায্য করিয়া ত্যাগ ও বন্ধুত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন।

 ১৮৫০ হইতে ১৮৬০——এই দশবৎসর কাল মার্কস্ ইংলণ্ডের বৃটীশ মিউজিয়ম লাইব্রেরীতে বসিয়া নিজের মতবাদ সম্বন্ধে গবেষণা করিতে থাকেন। মার্কসের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ The Capital (Das Kapital) এই নীরব সাধনারই ফল।

 ১৮৬৪ খৃষ্টাব্দে মার্কন্ International Workers' Association নামক একটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক-সংঘ গঠন করেন। ইহাই পরে First International নামে অভিহিত হয়। এই সম্মেলন বিশেষ কার্য্যকরী হয় নাই। অল্পসংখ্যক প্রতিনিধিই এই সম্মেলনে যোগদান করে। কিন্তু ইহাতেও মার্কস্ নিরুৎসাহ হন নাই; তাঁহার আন্দোলন সমভাবে তিনি চালু রাখেন।

 ১৮৮৩ খৃষ্টাব্দে ইংলণ্ডে মার্কসের মৃত্যু হয়। কিন্তু ইহাতে তাঁহার আন্দোলনের মৃত্যু হয় না। মার্কসের পর এঙ্গেলস্ এই আন্দোলনের নৈতৃত্বভার গ্রহণ করেন। ১৮৮৯ খৃষ্টাব্দে এঙ্গেলসের উদ্যোগে লণ্ডননগরে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনের অধিবেশন হয়। ইহারই নাম Second International. প্রায় সমস্ত দেশের শ্রমিক-প্রতিনিধিই এই সম্মেলনে যোগদান করে। এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য বহুল পরিমাণে সিদ্ধ হয় বটে, কিন্তু বিভিন্ন দেশের শ্রমিক নেতারা তাহাদের কর্ম্মপদ্ধতি সম্বন্ধে একমত হইতে পারেন না। ফলে দুইটা দলের সৃষ্টি হয়: একদল নরমপন্থী, আর একদল উগ্রপন্থী। নরমপন্থীরা বলেঃ শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও প্রচারণাদ্বারা পুঁজিবাদকে ধ্বংস করিয়া সাম্যবাদের প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে, এবং যেদেশ ইহাকে গ্রহণ করিবে, সেই দেশেই ইহা সীমাবদ্ধ থাকিবে। কিন্তু উগ্রপন্থীরা বলেঃ শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাজতন্ত্র আসিবে না; বিপ্লবের মধ্য দিয়া উহাকে আনিতে হইবে এবং এই বিপ্লবের বন্যা সমস্ত পৃথিবীতে ছড়াইয়া দিতে হইবে।

 বিভিন্নদেশে এই মতবিরোধ কিরূপ বিভিন্ন বেশে আত্মপ্রকাশ করে, সেকথা যথাস্থানে বলা হইবে।

 অন্যান্য দেশে কমিউনিজম্ বিশেষ কোনই পরিবর্তন আনিতে পারিল না, কিন্তু রাশিয়াতে ইহা এক অভূতপূর্ব্ব পরিবর্ত্তন আনিল।

 তখন রাশিয়াতে ছিল স্বেচ্ছাচারী জারের (Tsar) শাসন। জারের অত্যাচারে প্রজাকুল অতিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছিল। সম্রাট, জমিদার, মহাজন—সকলেই শ্রমিক ও কৃষকদিগের উপর অমানুষিক অত্যাচার করিত। মার্কসের বাণী তাই তাহাদের প্রাণে নব উন্মাদনার সৃষ্টি করিল। কৃষক ও শ্রমিক সম্প্রদায় জারতন্ত্রের উচ্ছেদ সাধনের নিমিত্ত বদ্ধপরিকর হইয়া উঠিল। অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন গণনেতা লেনিনের (Lenin) অধীনে তাহারা সংঘবদ্ধ হইল। এই সংঘের নাম হইল বলশেভিক পার্টি (Bolshevik Party)। ১৯১৮ খৃষ্টাব্দে এই বলশেভিক পার্টি জারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ বলশেভিকদের মধ্যেও দুইটি দল গঠিত হইয়া গেল: একদল নরম দল, আর একদল গরম দল। নরমদলকে বলা হইল ‘মেনশেভিক পার্টি’ (Menshevik Party), আর গরমদলের নাম ‘বলশেভিক পার্টি’ই রহিয়া গেল। লেনিন ছিলেন এই বলশেভিক পার্টির নেতা। মেনশেভিকেরা সশস্ত্র বিদ্রোহ পছন্দ করিল না; কিন্তু লেনিন দেখিলেন, বিপ্লব ও রক্তপাত ব্যতীত গত্যন্তর নাই। তখন তিনি যেনশেভিকদিগের হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র হইবার উদ্দেশ্যে নিজ পার্টির নামকরণ করিলেন ‘কমিউনিস্ট পার্টি’ এবং নিজদিগকে পরিচয় দিলেন ‘কমিউনিস্ট’ (Communist) - বলিয়া। সেই হইতেই ‘কমিউনিস্ট’ ও ‘কমিউনিজম্’ কথাগুলি জনসাধারণের মধ্যে প্রচলিত হইয়া গেল। শুধু রাশিয়ায় নয়, অন্যান্য দেশের উগ্রপন্থী সমাজতন্ত্রীরাও এই নাম গ্রহণ করিল।

 তাহা হইলে দেখা যাইতেছেঃ লেনিনই কমিউনিজমের কার্যকরী প্রতিষ্ঠাতা। কমিউনিজমকে তাই অনেক সময় ‘লেনিনিজম’ (Leninism) বলা হয়। বলশেভিজম্ ও কমিউনিজম্ মূলতঃ এক।

 লেনিনের হাতেই কমিউনিজমের মোড় ফিরিল। জারতন্ত্রের অবসান ঘটাইয়া কমিউনিস্ট পার্টি যখন রাশিয়ার শাসনভার গ্রহণ করিল, তখন মার্কস্-প্রচারিত কমিউনিজমের শুষ্কদেহে যেন প্রাণসঞ্চার হইল। সত্যই কমিউনিজম্ রাশিয়াতে এক অভূতপূর্ব্ব পরিবর্তন আনিল। লেনিনের সময় হইতে রাশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস তাই কমিউনিজমেরই ইতিহাস। সুতরাং আমরা এখন দেখিব—রাশিয়াতে কমিউনিজম্ কি ভাবে প্রসার লাভ করিল এবং তাহার ফল কী হইল।