ইসলাম ও কমিউনিজ্ম্/রাশিয়ায় কমিউনিজ্ম্
রাশিয়ায় কমিউনিজ্ম্
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে মার্কসের নব সাম্যবাদ রাশিয়াতে প্রথম প্রবেশলাভ করে। এই সময় মার্কসের মতবাদ অন্যান্য দেশেও (ইংলণ্ড, ফ্রান্স, অষ্ট্রিয়া, জার্মানি ইত্যাদি) প্রচারিত হয়; ফলে সকল দেশেই এক একটি সমাজতন্ত্রী দল (Socialist Party) গড়িয়া উঠে। ইহাদের দেখাদেখি রাশিয়াতেও একটি সমাজতন্ত্রী দলের সৃষ্টি হয়।
লেনিন ছিলেন মার্কস-পন্থী। ১৮৭০ খৃষ্টাব্দে রাশিয়ার অন্তর্গত Simbrisk নামক স্থানে তাঁহার জন্ম হয়। তাঁহার পিতা ছিলেন একজন স্কুলমাষ্টার। শিক্ষা শেষ করিয়া লেনিন আইন-ব্যবসার আরম্ভ করেন। এই সময়েই তাঁহার রাজনৈতিক জীবন আরম্ভ হয়; গোপনে গোপনে তিনি তথাকার শ্রমিক আন্দোলনে যোগ দেন। নানাস্থানে সভাসমিতি করিয়া তিনি শ্রমিকদিগের মধ্যে পুঁজিবাদীদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ সৃষ্টি করিতে থাকেন। তিনি রাশিয়াতে বলশেভিক পার্টি গঠন করেন।
১৯০৩ খৃষ্টাব্দে রাশিয়ার বলশেভিক পার্টিতে মতভেদ দেখা দেয়। ফলে দুইটী শাখার উদ্ভব হয়: মেনশেভিক ও বলশেভিক। মেনশেভিকেরা নরমপন্থী, বলশেভিকেরা উগ্রপন্থী। লেনিন এই শেষোক্ত দলকে চালিত করেন এবং পরে ইহার নাম পরিবর্ত্তন করিয়া ‘কমিউনিস্ট পার্টি’ রাখেন। ১৯০৫ খৃষ্টাব্দে তিনি তাঁহার কমিউনিস্ট পার্টির দ্বারা একটা ছোট-খাটো বিদ্রোহের সৃষ্টি করেন; কিন্তু মেনশেভিকদিগের বিরোধিতায় তাহা তত ফল প্রস্থ হয় না। লেনিন ইহাতেও নিরুৎসাহ না হইয়া জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালাইতে থাকেন; ফলে তিনি কর্তৃপক্ষের কোপদৃষ্টিতে পড়েন এবং শীঘ্রই দেশ হইতে নির্ব্বাসিত হন।
১৯০৭ হইতে ১৯১৭ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত লেনিন প্যারী, ভিয়েনা এবং জার্মানিতে নির্ব্বাসিত জীবন যাপন করেন।
১৯১২ খৃষ্টাব্দে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সোশ্যালিস্ট পার্টি একত্রে একটী মন্তব্য গ্রহণ করিয়া ধনতান্ত্রিক দেশগুলিকে (ইংলণ্ড, জার্মানি, রাশিয়া, ফ্রান্স ইত্যাদি) এই মর্ম্মে এক সতর্কবাণী প্রেরণ করে যে, তাহারা যদি কোন দেশের বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধ বাধায়, তবে সোশ্যালিস্টরা তাহাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ উপস্থিত করিবে। সোশ্যালিস্টরা মনে করে, ধনতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির মানসেই দুর্ব্বল জাতিদের সহিত যুদ্ধ বাধায়। কল-কারখানা, খনি প্রভৃতির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাদীদের নূতন নূতন বাজারের (market) প্রয়োজন হয়। নিজেদের কল-কারখানায় উৎপন্ন দ্রব্যাদি বিভিন্ন দেশে প্রচুর পরিমাণে বিক্রয় করিবার উদ্দেশ্যে এবং নূতন নূতন দেশ হইতে কয়লা, তেল, ভূলা, পাট প্রভৃতি উপকরণ সংগ্রহের মতলবে পুঁজিবাদীরা নূতন নূতন দেশজয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। তাহারা জানে, যে-সব দেশের সহিত তাহাদের স্বার্থ জড়িত আছে, সেই সব দেশ নিজেদের আয়ত্তাধীনে না আনিলে তাহাদের সুবিধা হয় না। তাছাড়া দেশে দেশে যুদ্ধ লাগিলে নিজেদের কল-কারখানায় প্রচুর যুদ্ধোপকরণ তৈরী করিবার এবং সেগুলি বিক্রয় করিয়া আশাতীতরূপে লাভবান হইবার মহাসুযোগও তাহাদের জুটে। এক একটা বড় বড় মিলিটারী অর্ডার বা কনটাক্ট লইতে পারিলে কত লাভ! এইজন্যই পুঁজিবাদীরা চায় যুদ্ধ। অনেক সময় বড় বড় যুদ্ধের মূলে থাকে তাই এই পুঁজিবাদীদের কারসাজি। কমিউনিজম্এ ইজন্যই এই শ্রেণীর যুদ্ধবিগ্রহের ঘোর বিরোধী। একেই ত ইহাদ্বারা দুর্ব্বল জাতিদের স্বাধীনতা হরণ করা হয়, তাহার উপর অবার পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ অধিকতর পরিপুষ্টি লাভ করে। এইজন্যই সোশ্যালিস্টরা এইরূপ একটী এশতেহার দিয়া সকলকে সাবধান করিয়া দিয়াছিলেন।
কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয়, ১৯১৪ খৃষ্টাব্দে ইউরোপে যেই মহাযুদ্ধ আরম্ভ হইল, অমনি প্রত্যেক দেশের সোশ্যালিস্টরা নিজেদের নীতি ও আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়া জাতীয়তাবাদী সাজিয়া বসিলেন এবং স্বদেশের গবর্ণমেণ্টকে যথাসাধ্য সাহায্য করিতে লাগিলেন। এমন কি অবশেষে রাশিয়াও জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিল এবং মেনশেভিকেরা দস্তুরমত জারের সহায়তা করিতে লাগিল। নরমপন্থী সোশ্যালিস্টদের এই অধঃপতন দেখিয়া লেনিন দূর হইতেই তীব্রস্বরে ইহার প্রতিবাদ জানাইলেন এবং ইহার প্রতিকারের পথ খুঁজিতে লাগিলেন।
চারি বৎসর বুদ্ধ চলিল। লেনিন তখন জার্মানিতে। কাইজার দেখিলেন, লেনিনকে যদি এই সময় রাশিয়াতে ছাড়িয়া দেওয়া যায়, তবে জারের বিরুদ্ধে সে নিশ্চয়ই বিদ্রোহ ঘোষণা করিবে এবং এই অন্তর্বিপ্লবের ফলে জার্মানির বিশেষ সুবিধা হইবে। এই মতলবে কাইজার লেনিনকে দেশে পাঠাইবার নির্দেশ দিলেন। ট্রেণের দরজায় সিল-মোহর করিয়া লেনিনকে রাশিয়ায় পাঠান হইল।
১৯১৭ খৃষ্টাব্দে লেনিন বলশেভিকদিগের মহাউল্লাস-ধ্বনির মধ্যে পিটার্স বার্গ স্টেশনে আসিয়া অবতরণ করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বলশেভিকদের অন্তরে নূতন উদ্দীপণার সৃষ্টি হইল; লেনিনের নেতৃত্বে তাহার জারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করিল। এই বিদ্রোহ ‘ফেব্রুয়ারী বিদ্রোহ’ (February Revolution) নামে পরিচিত। এই সময়ে আর একজন উপযুক্ত রুশ-নেতাও লেনিনের সহিত যোগ দেন। ইনি ট্রটস্কী (Trotsky). ১৯১৭ হইতে ১৯২১ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত এই গৃহযুদ্ধ চলিতে থাকে। ইহার ফলে রাশিয়ায় জারতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং বলশেভিক পার্টীই জয়যুক্ত হইয়া দেশের শাসনভার গ্রহণ করে। তখন হইতেই রাশিয়ায় গণতন্ত্রমূলক নেতৃশাসন (Dictatorship) প্রবর্ত্তিত হইয়াছে। লেনিনই এই গণতন্ত্রের প্রথম ডিক্টেটর।
১৯২১ খৃষ্টাব্দে লেনিন আর একটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক-সম্মেলন আহ্বান করিবার প্রয়োজন অনুভব করেন। মস্কোতে এই সম্মেলন আহূত হয়। এই সম্মেলন “তৃতীয় অথবা কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক সম্মেলন” (Third or the Communist International) নামে সুপরিচিত। এই সম্মেলনে কমিউনিস্ট, পার্টীর নীতি ও কর্মপদ্ধতি সম্বন্ধে বহু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯২৪ খৃষ্টাব্দে লেনিনের মৃত্যু হয়।
লেনিনের মৃত্যুর পর ট্রটস্কী রাশিয়ার কর্ণধার হইবার প্রয়াস পান। কিন্তু তাঁহাকে আর একজন প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্মুখীন হইতে হয়; ইনি মার্শাল স্ট্যালিন (Marshal Stalin) ট্রঙ্কী ও স্ট্যালিনের মধ্যে মতের ঐক্য হয় নাই। স্ট্যালিন রাশিয়াতেই কমিউনিজকে সীমাবন্ধ রাখিতে চান; ট্রটস্কী রাশিয়া ছাড়া অন্যান্য দেশেও বিপ্লবের মধ্য দিয়া কমিউনিজম প্রচার করিতে চান। এই মতানৈক্য পরস্পরের মধ্যে বিরোধ ও সংঘর্ষ আনিয়া দেয়, ফলে স্ট্যালিন জয়লাভ করেন এবং ট্রটস্কী ককেশাস প্রদেশে নির্ব্বাসিত হন। সেখান হইতে পরে তাঁহাকে ফ্রান্সে স্থানান্তরিত করা হয়। ট্রটস্কী ছিলেন খাঁটি মার্কপন্থী। স্ট্যালিনের নীতি ও পদ্ধতিকে তাই তিনি তীব্রভাবে সমালোচনা করেন। ইহাতে তাঁহার বিরুদ্ধদল আরও চটিয়া যায়। ১৯৪০ খৃষ্টাব্দে গুপ্তঘাতকের হস্তে ট্রটস্কী নিহত হন।
সেই হইতে স্ট্যালিনই নির্বিঘ্নে রাশিয়ার ডিক্টেটর পদে বাহাল রহিয়াছেন। স্ট্যালিনের আমলে রাশিয়ায় যে অভূতপূর্ব উন্নতি ও পরিবর্ত্তন সাধিত হইয়াছে, পাঠক তাহা অল্পবিস্তর জানেন।
রাশিয়া এখন আর পূর্ব্বের রাশিয়া নাই। ইহার নামকরণ ইসলাম ও কমিউনিজম্ হইয়াছে, ‘সোভিয়েট ইউনিয়ন’ বা ‘ইউনিয়ন অব্ সোভিয়েট সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক্স্ (Union of Soviet Socialist Republics). ইহারই নাম ‘ইউ-এস-এস্-আর’ (U.S.S.R.)
আমরা সোভিয়েট রাশিয়া সম্বন্ধে এইবার কিছু বলিব।