বিষয়বস্তুতে চলুন

ইসলাম ও কমিউনিজ্‌ম্/সোভিয়েট রাশিয়ার বৈশিষ্ট্য

উইকিসংকলন থেকে

সোভিয়েট রাশিয়ার বৈশিষ্ট্য

 পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে, সোভিয়েট ইউনিয়নের’ মূল নীতি হইতেছেঃ প্রত্যেক জাতির স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করা। যতগুলি রিপাবলিক লইয়া এই ইউনিয়ন গঠিত হইয়াছে, তাহাদের প্রত্যেককেই শুধু যে আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকার (Right of Self-determination) দেওয়া হইয়াছে, তাহা নহে; বিচ্ছিন্ন হইয়া যাইবার অধিকার ও (Right of Cecession) তাহাদের আছে; অর্থাৎ ইচ্ছা করিলে তাহারা এই যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত হইয়া থাকিতেও পারে, নাও পারে। ইহার তাৎপর্য এই যে, সোভিয়েট ইউনিয়নকে তদন্তর্গত প্রত্যেক জাতির বা রিপাবলিকের স্বার্থ ও সুবিধা, অভাব ও অভিযোগের প্রতি সমদৃষ্টি রাখিতে হয়। রিপাবলিকগুলিকে এই সর্ভেই একত্রিত করা হইয়াছে যে, যদি কাহারও কোন অসুবিধা হয়, অথবা কাহারও স্বার্থ বিপন্ন হয়, তখনই সে ইউনিয়ন হইতে বাহির হইয়া যাইতে পারিবে। প্রত্যেক জাতির স্বাধীনতা, স্বাতন্ত্র্য, স্বার্থ, সংস্কৃতি ও সংস্কারকে মানিয়া লইবার মত উদার মনোভাব এবং সত্যিকার কল্যাণবোধ না থাকিলে এতবড় যুক্তরাষ্ট্র-গঠন কখনও সম্ভব হইতে পারিত না।

 রাশিয়াকে এখন তাই আর সাম্রাজ্য বলা চলে না। সাম্রাজ্য বলিলে তাহার সঙ্গে স্বেচ্ছাচারী সম্রাটের ধারণাও মনে জাগে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বলিলে বন্ধু বা সমান অংশদারের ধারণারই সঞ্চার হয়। রাশিয়া এখন রাশিয়ানদের সাধারণ সম্পত্তি।

 রাশিয়ায় এখন কোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমস্যা নাই। পূর্ব্বে যেরূপ সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে তাহাদের ন্যায্য অধিকার হইতে বঞ্চিত করিয়া রাখিত এবং সব সুখ-সুবিধা নিজেরাই ভোগ করিত, এখন আর সেরূপ নাই। এসব সমস্যা তখনই জাগে—যখন পাওয়ারদল না-পাওয়ার দলকে বঞ্চিত করিয়া রাখিতে চায়। সংকীর্ণ স্বজাতিপ্রীতি, জঘন্য স্বার্থপরতা ও মানুষে মানুষে ভেদবুদ্ধিই এই মানসিকতার উৎস-মূল। যোগ্যতা-অযোগ্যতার যুক্তিও আসে এই সংকীর্ণতা হইতে। এ-সমস্তই মানুষকে কিছু না-দিবার ফন্দী। আমরা শিক্ষায়, সভ্যতায়, ধনে, মানে, বড় হইয়াছি, কাজেই আমরা যোগ্য, আমরা যতকিছু সুখসুবিধার অধিকারী, আর উহারা অশিক্ষিত, অনুন্নত, অস্পৃশ্য, উহারা আমাদের নীচে থাকিতে বাধ্য; অথবা আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, কাজেই আমরাই অধিকাংশ সুযোগ ও সুবিধা ভোগ করিবার অধিকারী, আর উহারা সংখ্যালঘিষ্ঠ্য, কাজেই উহারা কম পাইবে—এ যুক্তি তাহারাই দিবে যাহারা নীচমনা ও স্বার্থপর। সত্যিকার দেশপ্রেম এ নয়। দেশের যাহারা মুক্তিকামী, দেশের যাহারা সেবক। তাহাদের যুক্তি ও চিন্তা অন্তরূপ। তাহারা বলিবেঃ সমগ্র দেশ আমাদের, ছোট-বড়, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সবই আমাদের দেশবাসী—সবই আমাদের ভাই। আমারা শিক্ষিত হইয়াছি, আমাদের ভাইদিগকেও শিক্ষিত কবিব; আমরা যে-সুখ ও সুবিধা ভোগ করিতেছি, আমাদের ভাইদিগকেও সেই সুখ ও সুবিধা দান কবিব; আমরা যোগ্য হইয়াছি, অনান্য সকলকেও যোগ্য করিয়া তুলিব; অনুন্নতদের কেহ নাই, আমরাই তাহাদের সুখ-সুবিধার বিধান করিব। একথা তাহারা বলিবে নাঃ এই যে স্কুল-কলেজ ও ইউনিভার্সিটী দেখিতেছ, এই সব আমাদের টাকায় স্থাপিত, আমরা কেন অনুন্নতদের ইহাতে অধিকার দিব? শিক্ষাক্ষেত্রে উহাদের আদৌ কোন দান নাই, উহারা কেন এটা-সেটা দাবী করিবে? তাহারা বরং ঠিক ইহার বিপরীত পথ দিয়া আসিবে। সমস্ত ভেদাভেদ, সমস্ত বাধা-বন্ধন দূর করিয়া দিয়া তাহারাই অনুন্নতদেব সর্ব্ববিধ উন্নতি সাধনের ব্রত গ্রহণ করিবে। লেনিন ও তাঁহার সহকর্মীরা ঠিক এই পন্থাই অবলম্বন করিয়াছিলেন। জাতিভেদ ও যোগ্য-অযোগ্যের প্রশ্ন মন হইতে সরাইয়া দিয়া সকল দেশবাসীকেই তাঁহারা সমভূমিতে আনিয়া দাড় করাইলেন, প্রত্যেককে সমান অধিকার দিলেন এবং অনুন্নত সমাজের যেখানে যে অভাব আছে, তাহা দূর করিয়া সকলকেই উন্নত ও সুসভ্য করিবার নীতি গ্রহণ করিলেন। কাজেই সোভিয়েট ইউনিয়নে এখন আর শ্রেণী-বিশেষের কোন গুরুত্ব নাই, সংখ্যার গুরুলঘুত্ব বা মেজুরিটী-মাইনরিটীরও কোন প্রশ্ন নাই। মেজরিটীই হউক, মাইনরিটীই হউক,—সকলেরই অধিকার ও দাবী এখন সমান—সকলেরই স্বার্থ এখন নিরাপদ।

 রাশিয়ায় মোট ১০৮টা জাতি ও উপজাতি বাস করে। ইহাদের ভাষা, ঐতিহ্য, সংস্কার ও আচার-ব্যবহার বিভিন্ন। এই এতগুলি জাতির কাহাকেও জোর করিয়। পরের ভাষার শিক্ষা দেওয়া হয় না। প্রত্যেকেই নিজের জাতীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখিয়া নিজের ভাষায় শিক্ষালাভ করিতে পারে। রাজনৈতিক স্বাধীনতার সহিত ভাষা, সংস্কৃতি ও আচারব্যবহারের স্বাধীনতাও আইন দ্বারা স্বীকৃত হইয়াছে।

 রাশিয়ায় এখন কোন জমিদারী প্রথা বা জাইগারদারী-প্রথা নাই। ব্যক্তিগত ভাবে এখন সেখানে কেহই জমাজমি বা টাকাকড়ি রাখিতে পারে না। সমস্ত সম্পত্তি হইতে ব্যক্তিগত অধিকার তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে। দেশের যাবতীয় আয়, উৎপন্ন দ্রব্য বা কলকারখানা—এখন স্টেটের অধীন, স্টেট্ই‌ সব-কিছুর মালিক। প্রত্যেক নাগরিক স্টেটের জন্য কাজ করে, তার বিনিময়ে স্টেটই তাহার ভরণ-পোষণ, শিক্ষা-দীক্ষা স্বাস্থ্য ও অনান্য সুখ-সুবিধার বিধান করে। টাকা না জমাইলে বা জমাজমি না রাখিলে ভবিষ্যতে আমার বা আমার ছেলেমেয়ের কী দশা ঘটিবে, এ প্রশ্ন লইয়া আর এখন কাহাকেও মাথা ঘামাইতে হয় না। স্টেটই সকলের মা-বাপ, স্টেটই সকলের সাধারণ ধনাগার। শিক্ষা, শিল্প, বাণিজ্য—সকলই এখন স্টেট-নিয়ন্ত্রিত।  পূর্ব্বে স্ত্রীলোক ও ছোট ছোট বালক বালিকাকেও মিল ও খনিতে কাজ করিতে হইত। এই নিষ্ঠুর প্রথা এখন রহিত হইয়াছে। অতিলাভের লোভে অনেকে শ্রমিকদিগকে উপরি সময় (extra time:) খাটাইত; সে প্রথাও এখন নাই। রাশিয়ানদের জীবন ও কর্ম্ম এখন সুনিয়ন্ত্রিত। শ্রমিকই হউক, কৃষকই হউক, হাড়ভাঙা খাটুনি খাটিয়া কাহাকেও মরিতে হয় না। প্রত্যেকের জীবনেই বিশ্রাম ও আনন্দের ব্যবস্থা করা হইয়াছে। পক্ষান্তরে অলস নিষ্কর্ম্মা হইয়া বসিয়া থাকিবারও উপায় নাই। প্রত্যেক রাশিয়ানকেই তাহার যোগ্যতা অনুসারে কাজ করিতে হয়—ইহাই স্টেটের বিধান।

 সোভিয়েট ইউনিয়নের বালক-বালিকাদিগের স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার সুব্যবস্থা করা হইয়াছে। শারীরিক শিক্ষার (Physical Education) জন্য ব্যাপক বন্দবস্ত আছে। স্টেট হইতেই সর্ব্বত্র স্কুলকলেজ স্থাপন করা হইয়াছে, সেখানে সকলকেই বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষা দান করা হয়।

 ধর্ম্ম সম্বন্ধে সোভিয়েট রাশিয়া এক অদ্ভূত নীতি অবলম্বন করিয়াছে। ধর্ম্মকে সে স্টেট হইতে একদম নির্ব্বাসিত করিয়াছে। স্টেট হইতে কাহাকেও ধর্ম্ম শিক্ষা দেওয়া হয় না, বা কোন ধর্মমন্দিরকেও কোন সাহায্য করা হয় না। সোভিয়েট রাশিয়া পুরাতন অনেক কিছুই তুলিয়া দিয়াছে, তার মধ্যে ধর্ম্মই হইতেছে প্রধান। ধর্ম্মকে কমিউনিস্টরা ‘জাতির পক্ষে আফিম’ (Opium of the people) বলিয়া আখ্যা দিয়াছে। কমিউনিস্ট সমাজের আদর্শই হইতেছে ঈশ্বরহীন ধর্মহীন ও শ্রেণীহীন সমাজ (Godless, religionless and classless society) গঠন করা। মার্কস্ যখন এই আদর্শ প্রচার করেন, তখন ইউরোপে ধর্ম্মের নামে বহু অনাচার ঢুকিয়াছিল। পাদ্রীদের প্রাধান্য খুবই তখন প্রবল ছিল; অনেক বিষয়ে স্টেটের (State) উপর গীর্জার (Church) আধিপত্য ছিল। স্টেট ও গীর্জা তাই পরস্পর হাত ধরাধরি করিয়া চলিত; এই কারণে গীর্জ্জা সব সময়েই রাজা-মহারাজা ও বড়লোকদিগকে সমর্থন করিত। সমাজে যখনই কোন জণজাগরণের চেষ্টা হইয়াছে, তখনই রাজশক্তি পাদ্রী ও পুরোহিত দিগের সহায়তায় তাহা দমন করিয়া দিয়াছে। এই সব লক্ষ্য করিয়া এবং নানা ধর্ম্মের নানা লোক লইয়া ঐক্যশক্তি গঠন করা অসম্ভব—ইহাই ভাবিয়া মার্কস্ ধর্ম্মকে একদম উড়াইয়া দেন। তিনি মনে করেন, ধর্ম্মই যত অনিষ্টের মূল, সুতরাং দেও ইহাকে কবর! বলা বাহুল্য, লেনিনও সেই মতাবলম্বী ছিলেন; তিনিও ধর্ম্ম ও নীতিকে আদৌ কোন আমল দেন নাই।

 নারীজাতিকে অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া হইয়াছে। শিক্ষা, শিল্প, দেশসেবা— সর্ব্বত্রই নারীর প্রবেশাধিকার আছে। নারীর মর্য্যাদাও পূর্ব্বাপেক্ষা অনেক বাড়িয়াছে। সন্তানলক্ষণা এবং নবপ্রভৃতি উভয়কেই যথারীতি সাহায্যদান ও পরিচর্য্যার ব্যবস্থা আছে। সন্তান পালন সম্বন্ধে তাহাদিগকে রীতিমত শিক্ষা দেওয়া হয়।

 শিশুদিগের প্রতি সোভিয়েট রাশিয়া অত্যন্ত যত্নশীল। শিশুদিগের উপযোগী পুষ্টিকর খাদ্য বিচক্ষণ ডাক্তারদের তত্ত্বাবধানে স্টেট হইতে প্রস্তুত হইয়া প্রচুর পরিমাণে বিতরিত হয়। শিশুদিগের লালনপালন, চিকিৎসা ও শিক্ষা সম্বন্ধেও উৎকৃষ্ট ব্যবস্থ। প্রবর্ত্তিত হইয়াছে। শিশুদিগকে রাশিয়ানরা দেশের আমূল্য সম্পদ বলিয়া মনে করে। “Our children—the hope of the future”—ইহাই তাহাদের নীতি। সর্ব্বশ্রেণীর শিশুকেই এই আলোকে দেখা হয়। জার-আমলে কেবলমাত্র বড়লোক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের সন্তান-সন্তুতিদিগেরই শিক্ষা ও লালনপালনের ব্যবস্থা ছিল। সাধারণ লোকের ছেলেমেয়েরা যাহাতে কোনরূপে শিক্ষা না পায়, ইহাই ছিল জারের মতলব। জারের শিক্ষা-নীতিকিরূপ ছিল, তাহা তাঁহার নিয়োজিত শিক্ষামন্ত্রীর রিপোর্ট হইতেই পরিষ্কার বুঝা যাইবেঃ  “To teach the mass of the children or even the majority of them how to read will bring more harm than good.”

 অর্থাৎঃ—সর্ব্বসাধারণের ছেলেমেয়েকে, অথবা তাহাদের অধিকাংশকে লেখাপড়া শিখাইলে মঙ্গল অপেক্ষা অমঙ্গলই হইবে বেশী।

 শিক্ষা-মন্দিরে অস্পৃশ্যতা দোষও ছিল প্রবল। শিক্ষিত অভিজাত সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা যেখানে পড়িবে, সেখানে অশিক্ষিত নীচজাতীয় ছেলেমেয়েরা যাহাতে না পড়িতে পারে, ইহাই ছিল জারতন্ত্রের নিয়মঃ

 “Children of the wealthy class should be protected from an influx into the schools of children of the poor and middle classes.”

 অর্থাৎঃ- বড়লোকদের ছেলে-মেয়েরা যে-স্কুলে পড়িবে, সেখানে গরীব এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ছেলেমেয়েরা যাহাতে না ঢুকিতে পায়—তাহার ব্যবস্থা করিতে হইবে।

 কিন্তু সোভিয়েট-শাসনে এই নীতিকে সম্পূর্ণ উল্টাইয়া দেওয়া হইয়াছে। তথাকথিত ছোটলোক এবং অস্পৃশ্যদের ছেলে মেয়েদিগকে তুল্যরূপে শিক্ষা দেওয়া হইতেছে। সোভিয়েট গভর্ণমেণ্টের কাছে বড়লোক বা অভিজাত সম্প্রদায়ই যখন নাই, তখন ছোটলোকের কোন প্রশ্নও আর নাই। মানুষ হিসাবে এখন প্রত্যেককে একই আলোকে দেখা হইতেছে।

 জ্ঞানবিজ্ঞান, শিক্ষাদীক্ষা, শিল্প-কলা, কৃষি-বাণিজ্য—যা-কিছু উন্নতিই এখন সোভিয়েট গবর্ণমেণ্ট করিতেছে, তার সকলের পিছনেই আছে সমগ্র দেশের সমষ্টিগত কল্যাণ, সুখসুবিধা ও জীবনকে পরিপূর্ণরূপে উপভোগ করিবার পরিকল্পনা।