উড়িষ্যার চিত্র (১৯১১)/প্রথম খণ্ড/প্রথম অধ্যায়
উড়িষ্যার চিত্র
প্রথম খণ্ড
প্রথম অধ্যায়
নীলকণ্ঠপুর
খোড়দহ বা খুড়দহ পুরী জেলার একটি মহকুমা। এই দেশটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শৈলমালা সমাকীর্ণ; সেজন্য ইহার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য বড়ই মনোরম। সেই ছোট ছোট পাহাড়গুলি প্রায়ই বনে আবৃত; এই জন্য দূর হইতে গাঢ় নীলবর্ণ দেখায়। যখন চারি দিকের ক্ষেত্রসকল শ্যামল শস্যরাশিতে পরিপূর্ণ থাকে, তখন এই সকল পাহাড় দেখিয়া দূর হইতে মনে হয়, ইহারা কাহার ঢেউ?—নীল আকাশের ঢেউ, না সেই শ্যামল শস্যরাশির ঢেউ?
খোড়দহ মহকুমার পূর্ব্ব প্রান্তে এইরূপ একটি ক্ষুদ্র পাহাড়ের পাদদেশে নীলকণ্ঠপুর গ্রাম অবস্থিত। গ্রামটির দক্ষিণাংশ নিবিড় জঙ্গলে আবৃত, তাহার মধ্যস্থলে সেই ক্ষুদ্র পাহাড়টি মস্তক উত্তোলন করিয়া রহিয়াছে। জঙ্গলের উত্তরে, গ্রামের মধ্যস্থলে সুবিস্তৃত ক্ষেত্ররাজি; এবং তাহার উত্তরে, গ্রামের পূর্ব্ব হইতে পশ্চিম সীমা পর্য্যন্ত বিস্তৃত বসতি বা “বস্তি”। বাসগৃহ সকলের চারিদিকে বিরল-সন্নিবিষ্ট দুই চারিটি আম, বাঁশ, তাল, তেঁতুল গাছ। মাঠ হইতে গ্রামে প্রবেশ করিবার পথে একটি প্রকাণ্ড বটগাছ তাহার তলে একটি সিন্দুরলিপ্ত প্রস্তর-মূর্ত্তি বিরাজমান রহিয়াছেন। এটি গ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা “বটমঙ্গলার” মূর্ত্তি।
গ্রামের গৃহগুলির সন্নিবেশ সম্বন্ধে বাঙ্গালীর চক্ষে একটু নূতনত্ব আছে। উড়িষ্যার একটি গ্রাম যেন সহরের একটি ক্ষুদ্র গলি। প্রত্যেক গ্রামের মধ্য দিয়া একটি রাস্তা বা গলি আছে, তাহাকে “রাজদাণ্ড” বা “গ্রামদাণ্ড” বলে। ঘরগুলি তাহার দুই পার্শ্বে এরূপভাবে পরস্পর সংলগ্ন হইয়া চলিয়াছে যে, এক ব্যক্তির বাড়ী কোথায় শেষ হইয়াছে ও অন্যের বাড়ী কোথায় আরম্ভ ইয়াছে, তাহা স্থির করা দুরূহ। তবে প্রত্যেক গৃহস্থের বাড়ীর সম্মুখে একটি সদর দরজা আছে বলিয়া তাহা বুঝা যায়। এই গ্রামের “রাজদাণ্ড”টির পূর্ব্ব প্রান্ত হইতে আর একটি শাখা “দাণ্ড” বাহির হইয়া উত্তরদিকে গিয়াছে; কিন্তু বেশী দূরে যায় নাই, ২/৪ খানা বাড়ীর পরেই শেষ হইয়াছে। আমদাণ্ডের মধ্যস্থলে এবং গ্রামবসতিরও প্রায় মধ্যস্থলে একখানি ক্ষুদ্র কুটীর; ইহা গ্রামবাসি- গণের “ভাগবত-ঘর”। এই ঘরে প্রত্যহ সন্ধ্যার পর ভাগবত পাঠ শুনিবার জন্য এবং আবশ্যকমত পরচর্চ্চা করিবার জন্য গ্রামের লোকেরা মিলিত হইয়া থাকে। যে গ্রামে অন্ততঃ একখানি ভাগবত-ঘর নাই, তাহা গ্রামের মধ্যেই গণ্য নহে। এই গ্রামের প্রায় সমস্ত ঘরগুলিরই মাটীর দেওয়াল ও খড়ের ছাউনি।
নীলকণ্ঠপুর গ্রামে প্রায় একশত ঘর লোকের বাস। তাহার মধ্যে চারিঘর ব্রাহ্মণ, দুই ঘর “করণ”, সাত ঘর “গউড়”, দুই ঘর “তেলী”,এক ঘর “ভণ্ডারি”, দুই ঘর “বঢ়ই,” এক ঘর “ধোপা,” আর অবশিষ্ট প্রায় সকলেই “খণ্ডাইত” এবং “চাষা” বা “তসা”। ব্রাহ্মণের ব্যবসায় পৌরোহিত্য ও ঠাকুরসেবা। করণের ব্যবসায় লেখাপড়া করা, সাধারণতঃ জমিদার ও মহাজনের গোমস্তাগিরি ও অন্যান্য চাকরি। করণ জাতি বাঙ্গালার কায়স্থের অনুরূপ। গউড়ের ব্যবসায় দধিদুগ্ধের কারবার, গরু মহিষ চরাণ এবং পাল্কী-“কান্ধান”। অনেক সময়ে, বিশেষতঃ বিদেশে ইহারা চাকরের কাজও করে। কিন্তু “ভণ্ডারি” বা নাপিতেরই তাহা প্রকৃত ব্যবসায়, অবশ্য ক্ষৌরকার্য্য বাদে। বঢ়ই জাতি ব্যবসায়ে সূত্রধর ও লোহার কামার; হয়ত এক ভাই লোহার কাজ করে, আর এক ভাই কাঠের কাজ করে। এইরূপে রজকেরও দুইটি ব্যবসায়, যথা কাপড় ধোয়া ও কাঠ চেরা। জ্বালানী কাঠের জন্য একটি আমগাছ কাটিতে হইলে, যদিও অন্য জাতি তাহার মূল ও ডাল ছেদন করিতে পারিবে কিন্তু তাহা চিরিতে হইলে রজকের শরণাপন্ন হইতে হইবে। ধোপা ভিন্ন অন্য জাতি তাহা চিরিলে তাহার জাতি যাইবে। উড়িষ্যার এই সকল জাতিগত ব্যবসায়ের বড়ই কড়াকড়ি নিয়ম; এক জাতি অন্য জাতির ব্যবসার অবলম্ব করিলে জাতিচ্যুত হয়। তবে আজকাল এই নিয়ম অনেকটা শিথিল হইয়াছে।
“খণ্ডাইত” শব্দ “খণ্ডা"[১] বা খাঁড়া (খড়গ) হইতে উৎপন্ন ইয়াছে। এই জাতি এক সময়ে, বোধ হয় মারাট্টাদের আমলে, যুদ্ধব্যবসায়ী ছিল। কিন্তু তাহারা অনেক দিন হইল, সেই খণ্ডা ভাঙ্গিয়া লাঙ্গলের ফাল গড়াইয়াছে। এখন ইহাদের অধিকাংশই কৃষিজীবী; তবে যাহাদের বেশী টাকাকড়ি হয়, তাহারা করণের সঙ্গে বিবাহাদি সম্বন্ধ দ্বারা ক্রণে করণ জাতিতে উন্নীত হইতে পারে। যখন খণ্ডাইত থাকে তখন ইহাদের মধ্যে বিধবাবিবাহ চলে, পরে করণ হইলে তাহা রহিত হইয়া যায়।
উল্লিখিত জাতি ছাড়া, এ গ্রামের দক্ষিণভাগে মাঠের দিকে আরও কয়েক ঘর লোক আছে। তাহার মধ্যে এক ঘর জাতিতে, “কণ্ড্রা"—ইহাদের ব্যবসায় চৌকীদারী ও সুযোগ পাইলে চুরি। (তবে সকল কণ্ড্রাই চোর, এ কথা আমি বলি না)। অন্য দুই ঘর “বাউরী”; ইহারা “মূল লাগায়”— অর্থাৎ মজুরী খাটিয়া জীবিকা নির্ব্বাহ করে। সাধারণতঃ প্রতিদিন /০ আনা কি /১০ আনা কিম্বা সেই মূল্যের ধান্য পাইয়া মজুরী খাটে। আর দুই ঘর “চমার”। চমার জাতির ব্যবসায় জুতা সেলাই নহে; উড়িষ্যায় তাহা মুচির কাজ। চমার জাতি তালগাছ ও খেজুরগাছের কারবার করে। তালগাছের কারবার অর্থে তালপাতা কাটিয়া, তাহা দিয়া “টাটী” প্রস্তুত করা ও অন্য কাজের জন্য তালপাতা বিক্রয় করা। খেজুরগাছের কারবার অর্থে খেজুরগাছের রস বাহির করিয়া, তাড়ি প্রস্তুত করিয়া বিক্রয় করা। খেজুরের রস যে গুড় হইতে পারে, তাহা উড়িষ্যায় আকাশকুসুমের ন্যায় অবিশ্বাস্য কথা। সেই তাড়িকে মদ বলে। এই খেজুরগাছ সম্বন্ধে উড়িষ্যায় একটি খুব কল্যাণকর সংস্কার আছে। বাস্তবিকই উড়িষ্যাবাসীর নিকট “মদ্যমপেয়মদেয়মগ্রাহ্যং”। সেইজন্য ইহারা সেই মদের জন্মদাতা খেজুরগাছকেও বড় ঘৃণার চক্ষে দেখিয়া থাকে। খেজুরের রস খাওয়া দুরে থাকুক, একটু উচ্চজাতীয় লোকে খেজুরগাছও ছুঁইতে রাজি হয় না। একজন ব্রাহ্মণের বাড়ীতে দৈবাৎ একটি খেজুরগাছ জন্মিলে, একজন “চমার” কি “বাউরী”কে ডাকিয়া আনিয়া সেই গাছ কাটিয়া ফেলিলে, তবে তাঁহার নিস্তার। 'চমার’ ‘বাউরী’, ‘কণ্ড্রা” ইহারা অস্পৃশ্য জাতি; ইহাদের ছুঁইলে, স্নান করিয়া শুচি হইতে হয়। এইজন্য ইহাদের ঘর অল্প লোকের বাসস্থান হইতে একটু দূরে। ধোপাও তথৈবচ!
চৈত্রমাস পড়িয়াছে। বসন্ত-সমাগমে নীলকণ্ঠপুর গ্রামের জঙ্গলে ও পাহাড়ে নানা জাতীয় বনফুল ফুটিয়া চারি দিক্ উজ্জ্বল করিয়াছে। যে সকল গাছে ফুল হয় নাই, তাহারা নবপত্র-ভূষিত হইয়া ঋতুরাজের সম্মান রক্ষা করিতেছে। মলয়ানিল বনকুসুমসৌরভ গায় মাথিয়া, বনে সঞ্চরণশীল কলাপিকুলের কেকাধ্বনি লইয়া, গ্রামের দিকে মন্দ মন্দ বহিতেছে। বেলা প্রায় এক প্রহর, কিন্তু ইহারই মধ্যে রৌদ্রের তেজ অসহনীয় হইয়া উঠিয়াছে। রৌদ্রের প্রখর তেজে মাঠের ঘাস ঝলসিয়া, শুকাইয়া গিয়াছে। চতুর্দ্দিকে পরিব্যাপ্ত বালুকাকণাসকল জ্বলন্ত অগ্নি স্ফুলিঙ্গের ন্যায় উত্তপ্ত হইয়াছে। গ্রামের প্রান্তভাগে বটবৃক্ষটি স্নিগ্ধশ্যামল কিশলয় চয়ে সজ্জিত হইয়া এক অপরূপ শোভা ধারণ করিয়াছে—যেন সেই বটবৃক্ষের গাঢ় শ্যামবর্ণ রবিভাপে গলিয়া, ঝরিয়া পড়িয়া এই স্নিগ্ধণ্ডামলবর্ণে পরিণত হইয়াছে। সদ্যঃপ্রস্ফুটিত-কুসুমসুকুমার সেই অভিনব সমুজ্জ্বল পত্ররাজি রবিকর-সম্পাতে অধিকতর উজ্জ্বল হইয়া, তড়িদালোকে সমুদ্ভাসিত নৃত্যশালা-সঞ্চরণশীলা ইংরেজরমণীর স্নিগ্ধোজ্জ্বল সাটিনের পরিচ্ছদকেও পরাভব করিয়াছে।
ইতিমধ্যে মৃদু পবন-হিল্লোলে সেই বটবৃক্ষের শাখা-প্রশাখা আন্দোলিত হওয়াতে, আলো ও ছায়ার নব নব সমাবেশে তাহার রূপ যেন উছলিয়া পড়িতে লাগিল। সেই পবন সঞ্চালনে, পার্শ্বস্থিত আম্রবৃক্ষের পরিণত মুকুল সকল ঝর্ ঝর্ করিয়া ঝরিয়া পড়িল; বাঁশগাছের পত্রভারনত অগ্রভাগ হেলিয়া দুলিয়া নাচিতে লাগিল; তেঁতুলগাছের দীর্ঘবিলম্বিত কুত্তলকলাপে টেউ খেলিতে লাগিল; গগনস্পর্শী তাল-তরুর একটি ঊর্দ্ধসমুন্নত নবপত্র তর্ ভর্ করিয়া কাঁপিতে লাগিল।
হে তালবৃক্ষ! তোমার এ দুর্দশা কেন? বঙ্গদেশে তোমাকে কবিগণ জটাজুটধারী সন্ন্যাসীর সহিত তুলনা করিয়া থাকেন, কিন্তু এ দেশে তোমার মস্তক মুণ্ডিতপ্রায় কেন? অথবা এ দেশে তোমার জন্ম বলিয়া, তুমি এই দেশের লোকদিগের অনুকরণ করিতে ভালবাস? না, তাহা নহে। তুমি সকলের উপরে মস্তক উন্নত করিয়া অনন্ত আকাশ পানে তাকাইয়া আছ, তোমার আকাঙ্ক্ষাও কত উচ্চ। তোমার কি কখনও ক্ষুদ্র মানবের অণুকরণ করা সম্ভবে? তোমার মস্তক মুণ্ডিত, ইহাও তোমার সেই মহত্বের পরিচয়! তুমি অকাতরে অম্লানচিত্তে তোমার অঙ্গের পত্রসকল বিতরণ করিয়া উৎকলবাসীর মহোপকার সাধন করিতেছ! তোমার পত্র তিনটি জাতির উপজীবিকাস্বরূপ। চমার জাতি তোমার পত্র কাটিয়া তারা “টাটী” প্রস্তুত করিয়া বিক্রয় করে—সে সকল টাটী আবার কুলকামিনীগণের লজ্জাশীলতার বহিরাবণস্বরূপ। করণজাতি তোমার পত্র লেখাপড়াতে কাগজের ন্যায় ব্যবহার করিয়া জীবিকা নির্ব্বাহ করে। ব্রাহ্মণ জাতি তোমার পাতার পুঁথি পড়িয়া, লোকদিগকে ধর্ম্মকথা শুনাইয়া, তাঁহাদের চাল কলার সংস্থান করিয়া থাকেন। তোমার পত্র না পাইলে জমিদারের “জমা-ওয়াশীল-বাকী,” মহাজনের দাদনের হিসাব, প্রস্বার “পাউতি” (দাখিলা), পঞ্চায়েতের ফয়সালা, বালকের লেখন শিক্ষা[২] বৃদ্ধের ভাগবত পাঠ, বিষয়ীর বিষয়লিপি ও প্রেমিকের প্রেমলিপি কোথা হইতে আসিত? ঐ যে কৃষক শ্রাবণের মূষলধারার মধ্যে, তাহার ক্ষেত্রে জলরক্ষা করিবার জন্য, আলি বাঁধিতে বাঁধিতে মনের উল্লাসে উচ্চৈঃস্বরে গান গাইতেছে, উহার সে স্ফূর্ত্তি সে উল্লাস কোথায় থাকিত, যদি উহার মস্তকের উপর তোমার পত্রনির্ম্মিত “পখিয়া” বিলম্বিত না থাকিত? কেবল তাহা নহে,—উৎকলের প্রসিদ্ধ কবি উপেন্দ্রভঞ্জ[৩] যে আভিধানিক কবিত্বের গর্ব্বে স্ফীত হইয়া একদিন বলিয়াছিলেন:—
তাঁহার সে অহঙ্কার কোথায় থাকিত, যদি তোমার পত্রের উপর তাঁহার সে কবিতা লেখা না চলিত? উৎকলের কাশীরামদাস কবির জগন্নাথদাস[৬] সমগ্র শ্রীমদ্ভাগবত গ্রন্থের যে পদ্যানুবাদ প্রণয়ন করিয়া প্রাসাদবাসী রাজা হইতে কুটীরবাসী কৃষক পর্য্যন্ত সর্ব্বসাধারণের মধ্যে ভক্তিমাহাত্ম্য প্রচার করিয়া চিরযশস্বী হইয়াছেন, সেই অমূল্য গ্রন্থ কোথায় থাকিত? আর্য্যজাতির জ্ঞান-বিজ্ঞানের অক্ষয়-ভাণ্ডার, আর্যসভ্যতার পূর্বতন ইতিহাসের একমাত্র-আকর, আর্য্যধর্ম্মের একমাত্র ভিত্তি বেদবেদান্ত তোমারই পত্রে লিখিত হইয়া দুর্দ্দমনীয় কালের হস্ত অতিক্রম করিয়া এ পর্য্যন্ত পরিরক্ষিত হইয়া আসিতেছে; হে তালবৃক্ষ! ইহাও তোমার কম গৌরবের কথা নহে। তাই তুমি ধন্য, তুমি সকল বৃক্ষের মধ্যে অশেষ গৌরবান্বিত। ঐ যে একটি কাক তোমার মস্তকরূপ মানমন্দিরের চূড়ায় বসিয়া চারি দিকে তাহার আহারের অন্বেষণ করিবার জন্য, ধীরে ধীরে তোমার দিকে আসিতেছে, উহাকে তুমি বসিতে দাও।
দেখিতে দেখিতে কাক আসিয়া তরুশিরে উপবেশন করিল এবং কি যেন দেখিয়া “কা কা” রবে চীৎকার করিয়া উঠিল। তাহার সেই কর্ণভেদী রব শুনিয়া, একটি কোকিল বটবৃক্ষের শ্যামল পত্ররাশির মধ্যে তাহার উজ্জ্বল কাল দেহ লুকাইয়া রাখিয়া, কুহু কুহু রবে পঞ্চম তানে, ডাকিয়া উঠিল। সেই কুহুধ্বনি, গাছের পাতা কাঁপাইয়া ধরাতল প্লাবিত করিয়া, নীল আকাশে প্রতিধ্বনির তরঙ্গ তুলিয়া লীন হইয়া গেল। পার্শ্ববর্তী আম্রশাখায় উপবিষ্ট হইয়া একটি মর্কট আমের মুকুল ভাঙ্গিয়া মহানন্দে ভোজন করিতেছিল। সে সেই কুহুধ্বনি শুনিয়া চকিতের ন্যায় “হুপ্ হুপ্” শব্দ করিয়া, সে গাছ হইতে অন্য গাছে লাফাইয়া পড়িল। গ্রামের বৃদ্ধ যণ্ডটি (প্রায় প্রত্যেক গ্রামেই একটি ধর্ম্মের ষাঁড় আছে) তাহার স্থূল-কৃষ্ণ ভীষণ শরীর বটগাছের শীতল ছায়ায় বিস্তৃত করিয়া অর্দ্ধনিমীলিত-নেত্রে রোমন্থন করিতেছিল; সে সেই “কুহু কুহু” রব শুনিয়া চক্ষু মেলিয়া তাকাইল ও ফোঁস্ ফোঁস্ শব্দ করিয়া, সেই কোকিলের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করিতে লাগিল। ইতিমধ্যে লাঙ্গলে বাধা দুইটি রলদ, লাঙ্গল টানিয়া হড় হড় শব্দ করিতে করিতে সেই গাছের তলে আসিতে লাগিল। তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ একজন কৃষক একগাছা পাচন হাতে করিয়া “পিকা” (চুরট) খাইতে খাইতে, সেই বলদ দুটিকে তাড়াইয়া নিয়া চলিল। এই কৃষকের নাম মণিনায়ক।
- ↑ তাহার প্রমাণ, ইহাদের নামের “সন্তক” বা চিহ্ন “খণ্ডা” যেমন “এহি খণ্ডা সন্তক মধুপধানর সহি।”
- ↑ উড়িষ্যাবাসীরা তালপত্রের উপর যে লোহার কবর দিয়া লেখে বা খোঁড়ে (engrave করে) তাহাকে লেখন বলে।
- ↑ উপেন্দ্রভঞ্জ উৎকলের সর্বপ্রধান কবি বলিয়া সুপ্রসিদ্ধ। তিনি এই সকল 'কাব্য রচনা করিয়াছেন,—চৈতন্যচন্দ্রোদয় (সংস্কৃত), বৈদেহীশ-বিলাস, লাবণ্যবতী, রসিক-হারাবলী, প্রেম-সূধানিধি, রসপঞ্চক, কোটী-ব্রহ্মাণ্ডসুন্দরী, সুভদ্রা-পরিণয়, রাসলীলামৃত, সুবর্ণরেখা ইত্যাদি। ইহার মধ্যে বৈদেহীপ- বিলাসই উপহার সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ।
- ↑ দীন কৃষ্ণদাস আর এক জন প্রধান কবি। তিনি “রসকল্লোল” “রসবিনোদ” “আর্ত্তত্রাণ চৌতিশা” ইত্যাদি গ্রন্থরচনা করিয়াছেন।
- ↑ আর সব কবিদের মস্তকে চরণ। উক্ত কবিতাটির প্রথম চরণ এই—
উপ ইন্দ্র ভঞ্জ কুহে ঢেঁকি বেণী বাহুকু।
রথিতলে কবি বোলি ন কহিবুঁ কাঁহিকু॥
অর্থাৎ উপেন্দ্র ভঞ্জ দুই বাহু তুলিয়া বলেন রবিতলে (এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে) আর কাহাকেও কবি বলিয়া স্বীকার করি না; অর্থাৎ বাল্মীকি, ব্যাস, হোমার প্রভৃতি কবিগণও তাহার নিকট কবিনামের যোগ্য নহেন!
- ↑ ইনি একজন শ্রীশ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সময়ের কবি। চৈতন্য মহাপ্রভু ইহাকে নাকি প্রেমালিঙ্গন দিয়াছিলেন। ইনি শ্রীমদ্ভাগবতের উড়িয়া ভাষার পদ্যানুবাদ করিয়াছিলেন। এই ভাগবত গ্রন্থ উড়িষ্যার “বেদ।”