বিষয়বস্তুতে চলুন

উপদেশমালা (প্রথম ভাগ)/অধ্যবসায়

উইকিসংকলন থেকে

অধ্যবসায়।

নীলিমরঞ্জিত কিবা রূপ মনোহর।
শোভিছে চাহিয়া দেখ মাথার উপর॥
আদি অন্ত-হীন যেন বৃহৎ কাসার।
তারাগুলি ফুটে যেন কুমুদ কহ‍লার॥
এগুলি বিচিত্র সৃষ্টি বিশ্ববিধাতার।
জানায়ে দিতেছে তাঁর মহিমা অপার॥
কুঁদফুল মত ক্ষুদ্র দেখিছ নয়নে।
এ গুলি কি তাই ঠিক ভাবিতেছ মনে॥
যে পৃথিবী আমাদের নিয়ত আলয়।
আকারে এদের কারো তুল্য নাহি হয়॥

কেহ শতগুণ বড় কেহ লক্ষগুণ।
গণিয়া বলেন যাঁরা জ্যোতিষে নিপুণ॥
অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড কত আছে কত ঠাঁই।
ঠিক করে বলে হেন সাধ্য কারো নাই॥
এই যে দেখিছ নীল গগনমণ্ডল।
অসীম অনন্ত ইহা শূন্যময় স্থল॥
কে বল এ সব পুত্র! দেয় বুঝাইয়া।
কেবল বিজ্ঞান এক দেয় জানাইয়া॥
নে বিজ্ঞান কোথা হতে লভিল জনম।
সবাই বুঝে কি এই! প্রশ্নের মরম!
এ কথার আছে এক উত্তর কেবল।
বিজ্ঞান অধ্যবসায়-পাদপের ফল॥
মানুষে করেছে যত অদভুত কাজ।
ধরা আলো করে বাহা করিছে বিরাজ॥
সকলি বিজ্ঞানফল জানিবে তনয়।
বিজ্ঞান চরচা বিনা কিছু নাহি হয়॥
দিয়াছে অধ্যবসায় বিজ্ঞানে জনম।
সেব তারে প্রাণপণে করিয়া যতন॥
জিদ বিনা কোন কাজ না হয় তনয়।
বিনা জিদে সব কাজ অসম্পন্ন রয়॥

যে সকল লোকে তুমি বড় বলে মান।
কি গুণে হয়েছে বড় তা কি তুমি জান॥
বনের অসভ্যে যাঁর ছিল আজ্ঞাবশ।
ভুবন ভরিয়া ব্যাপে আছে যাঁর ঘশ॥
কাজেতে কেমন জিদ দেখহ তাঁহার!
স্মরিলে সে সব কথা লাগে চমৎকার॥
দুরাচার দুষ্টমতি ধৃষ্ট দশানন।
বন হতে জানকীরে করিলে হরণ॥
যেরূপে উদ্ধার তাঁর করে রঘুবীর।
এখনো স্মরিলে পুত্র! শিহরে শরীর॥
বনেতে বিরলে দেখা জটায়ুর সনে।
কহিল যতেক কথা ছিল তার মনে॥
যেরূপে বাঁধিল রণ যেরূপে যুঝিল।
যেরূপে রাবণ পাখা কাটিয়া ফেলিল॥
যেরূপে সীতারে দুষ্ট বেগে গেল লয়ে।
পাখী একে একে রামে দিল সব কয়ে॥
পরাণ ত্যজিল খগ মিত্র কাজ করে।
সাধুর জনম পর উপকার তরে॥
হইল সুগ্রীব সহ সখ্যের বন্ধন।
তাহাতে ঘটিল কত দুর্ঘট ঘটন॥

মহাবল বালিব সোজা কাজ নয়।
জিদ বিনা বল পুত্র! কভু কি তা হয়॥
সীতা অন্বেষণ হেতু লঙ্কায় গমন।
সেখানে হইল কত অসাধ্য সাধন॥
সাগরেতে হলো সেতু শত্রুবধ লাগি।
পর অপরাধে হলো পরে দণ্ডভাগী॥
কুম্ভকর্ণ অতিকায় আদি বীরগণ।
লঙ্কার আছিল কত না হয় গণন॥
রাবণের পাপ তাহে করিল সঞ্চার।
একে একে হলো সবে প্রাণেতে সংহার॥
এ সব ভীষণ কাণ্ড অসাধ্য সাধন।
জিব না থাকিলে বল হয় কি কখন॥
কেমনে বাঁধিব সেতু সাগরহৃদয়ে।
কেমনে লঙ্কার যাব কপিগণ লয়ে॥
কতই রাক্ষস আছে লঙ্কার রক্ষক।
তাহারা জীয়ন্ত-নর-বানর-ভক্ষক॥
কেমনে বুঝিব হায় তাহাদের সনে।
কেমনে হইব স্থির সেই মহারণে॥
এ সব ভাবিয়া সেই মহাধনুর্ধর।
হতাশ হতেন যদি বীর রঘুবর॥

কাজেতে শিথিল হতো যদি তাঁর নন।
কভু কি হইত বধ দুরাত্মা রাবণ॥
কভু কি হইত সেতু সাগরের বুকে।
কভু কি পেতেন বার্ত্তা জটায়ুর মুখে॥
কভু কি সুগ্রীব সহ হইত মিত্রতা।
কভু কি মিলিত ঠিক সীতার বারতা॥
মহাবল ভীমদেহ বীর হনুমান।
সাগর লঙ্ঘনে কভু হতো আগুয়ান॥
মন দিয়া শুন যদি থাকে কুতূহল।
ফলেছে জিদের গাছে এ সকল ফল॥
মহেস্বাস মহাবীর কুন্তীর নন্দন।
কাজেতে তাহার জিদ জান কি কেমন॥
যে দিন দুরাত্মা ধৃতরাষ্ট্রের সন্তান।
সভামাঝে দ্রৌপদীর করে অপমান॥
সে দিন অবধি এক নিমেষের তরে।
ছিল না অর্জ্জুন বীর প্রফুল্ল অন্তরে॥
কিরূপে অরাতিগণে করিবে সংহার।
নিয়ত আছিল মন সন্ধানে তাহার॥
এক দিন ব্যাসদেব আসিয়া কাননে।
কহিলা কতই কথা বুধিষ্ঠির সনে॥

প্রসঙ্গে উঠিল ক্রমে দুর্য্যোধনকথা।
দূরাত্ম পাণ্ডবমনে দেছে যত ব্যথা॥
পরাশরসুত সব করিলা বর্ণন।
কহিলা হিতার্থ তার মহার্থ বচন॥
মন দিয়া শুন বলি ধর্ম্মের তনয়।
তোমার বিপক্ষগণ দুরবল নয়॥
অস্ত্রশস্ত্রে সৈন্যে যারা বলবান্ হয়।
তাহাদের জয়লাভ জানিবে নিশ্চয়॥
তোমার বুদ্ধের সজ্জা যাহা কিছু আছে।
সকলি হইবে হীন বিপক্ষের কাছে॥
দুর্ব্বলে করুণা করে যাহারা মহত।
বিজয়লক্ষ্মীর কিন্তু বিপরীত পথ॥
দুর্ব্বলে নিদয়া ইনি প্রবলের প্রিয়া।
প্রবলে বরিয়া লন হৃদয় খুলিয়া॥
যাতে শত্রু নীচে পড়ে তুমি হও বড়।
নে বিধি বিধানে বংস! মতি কর দড়॥
অর্জ্জুনে পাঠায়ে কর তপস্যার বল।
তপোবলে হবে তব সকল মঙ্গল॥
দিব্য অস্ত্রে সুশোভিত হয়ে ধনঞ্জয়।
জানিবে নিশ্চয় হবে শত্রুর দুর্জ্জয়॥

তপস্যায় তুষ্ট হয়ে দেব দিগম্বর।
দিবেন নিজের অস্ত্র মনোমত বর॥
তখন ত্রিলোকীলোক যদি এক হয়।
তবুও নারিবে এরে করিবারে জয়॥
এতেক কহিয়া হিত মহার্থ বচন।
হইলা অদৃশ্য পুত্র! ব্যাস তপোধন॥
ইন্দ্রকীল শৈলে গিয়া বীর ধনঞ্জয়।
লইলা আদেশমত ব্রতের আশ্রয়।
সহায় হইল তার ধৃতি শম দম।
বাড়িল তপের তেজ অতি নিরুপম॥
অনাহারে দীর্ঘ তপ আরম্ভিলা বীর।
দেবতা গন্ধর্ব্ব আদি সবাই অস্থির॥
পরীক্ষা করিতে বুড়ো বামুনের বেশে।
আইলা ত্রিদশনাথ ছল করে শেষে॥
যষ্টি হাতে থর থর কাঁপে কলেবর।
নয়নযুগল গেছে কোটর ভিতর॥
ছোট কথা কাণে নাহি শুনিবারে পায়।
চলিতে চরণযুগ জড়াইয়া যায়॥
মাংস লোল কলেবর অস্থিমাত্রসার।
সর্ব্বাঙ্গে উঠেছে শির পৃষ্ঠে জটাভার॥

পার্থের মনের ভাব বুঝিবার তরে।
হেসে হেসে কৈলা কথা কত ছল করে॥
কতই কৌশল কৈলা দেব শচীপতি।
তার মন ফিরাবারে কতই যুকতি॥
কিছুতে হলো না কিছু সব গেল ভেসে।
হইলা ত্রিদশপতি অপ্রতিভ শেষে॥
কে বল চপেটাঘাতে হিমগিরিবরে।
কাঁপাইতে দোলাইতে নাড়াইতে পারে॥
বিচলিত না হইলা পার্থ ধনুর্দ্ধর।
দৃঢ়তা হইল তার অতি দৃঢ়তর॥
দেখিয়া বিস্ময়-রসে প্লাবিল হৃদয়।
অর্জ্জুনে দর্শন দিলা কশ্যপতনয়॥
দিব্য অস্ত্র দিয়া তারে তুষিলা যতনে।
অদৃশ্য হইলা দেব আনন্দিত মনে॥
পুন আরম্ভিলা বীর তপ উর্জ্জস্বল।
ধেয়াইয়া পশুপতি-চরণকমল॥
ধরিয়া কিরতিরূপ দেব ত্রিলোচন।
বাঁধাইলা পার্থসনে ঘ্যেতর রণ॥
যত ছিল অর্জ্জুনের শিক্ষার কৌশল।
যত ছিল অস্ত্র শস্ত্র যত ছিল বল॥

সকলি হইল ব্যর্থ পার্থ ধনুর্দ্ধর।
কিছু না উপায় পায় হইলা ফাঁফর॥
অক্ষয় তৃণেতে তার ছিল যত শর।
সকলি করিলা গ্রাস দেব দিগম্বর॥
ধনু গেল শর গেল অসি নিষ্কোষিয়া।
বেগেতে ধাইয়া গেল কাটিবে বলিয়া॥
তাহাও কিরাতদেহে পড়িল যেমন।
অদৃশ্য হইল কোথা না পায় দর্শন॥
আছিল তাহার বংস! যে কিছু সম্বল!
কাপুরুষ-চেষ্টা-সম হইল বিফল॥
কিছুতেই ভীত নয় ধনঞ্জয় বীর।
কোপেতে হইলা বৎস! একান্ত অধীর॥
করিলা কিরাতবক্ষে মুষ্টির আঘাত।
বোধ হলো হলো যেন অশনিনিপাত॥
অদভুত দৃঢ়ভাব অসম সাহস।
কুন্তীপুত্র মূর্ত্তিমান্ যেন বীররস॥
হেরিয়া হরিষহিয়া দেব পঞ্চানন।
আলিঙ্গিয়া পার্থে কহে গদগদ বচন॥
তোমা সম ত্রিভুবনে নাহি বীরবর।
তোমা সম ত্রিভুবনে নাহি ধনুর্দ্ধর॥

এমন সাহস বৎস। কভু হেরি নাই।
এমন বিক্রম কারো দেখিতে না পাই॥
এমন অটলভাব আছে বল কার।
এমন দৃঢ়তা অন্যে দেখা বড় ভার॥
হেরে তব গুণরাশি অতি বিচিত্রিত।
হয়েছে আমার দেহ পুলকে পূরিত॥
বর লও বৎস! তব যাহা আছে মনে।
তোমাকে তুষিব আমি পরম যতনে॥
যে অস্ত্র দিতেছি তাতে হবে তব জয়।
সমরে দুর্জ্জয় তুমি হইবে নিশ্চয়॥
এতেক কহিয়া দেব বাড়াইয়া মান।
পাশুপত অস্ত্র দিয়া হৈলা অন্তর্দ্ধান॥
পাণ্ডুর নন্দন বীর সেই অস্ত্রবলে।
ভীষ্ম দ্রোণ সহ রণে চরে কুতূহলে॥
এমন আশ্চর্য্য জিদ না হলে পার্থের।
দাঁড়াতে পারিত সে কি আগে বিপক্ষের॥
ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ সহ সমরসাগর।
মথিতে পারিত সে কি হয়ে একেশ্বর॥
কেবল অধ্যবসায়-গুণের কারণ।
করেছে বাহুর বলে সংগ্রাম তরণ॥

আমার বচন ধর, কর কাজে নিরন্তর,
প্রাণপণে দৃঢ়তা বিধান!
সব কাজে জয়ী হবে, চিরকাল সুখে রবে,
বাড়িবে তোমার কত মান॥
সাহস দৃঢ়তা শ্রম, হলে তার ব্যতিক্রম,
কার্য্যসিদ্ধি কভু নাহি হয়।
যাহারা হয়েছে বড়, তাদের জানিবে দঢ়,
মূলে ঐ তিনটী গুণ রয়॥
ন্যায়পথে বিচরিয়া, হিতাহিত বিবেকিয়া,
করিলে ঐ তিনটী সহায়।
না ঠেকিবে কোন দায় আঁচ না লাগিবে গায়,
কেহ নাহি আঁটিবে তোমায়॥