উপদেশমালা (প্রথম ভাগ)/ইন্দ্রিয় জয়
ইন্দ্রিয় জয়।
শুনেছ পুরাণে পুত্র! নাম দশানন।
রামায়ণে আছে যার বীরত্ব বর্ণন॥
খ্যাতি যার এক বীর বলে ত্রিভুবনে।
দেবগণ নামে যার কাঁপিতা সঘনে॥
ত্রিলোকবিজয়ী বীর বল কি কারণ।
কি দোষে হইল তার সবংশে নিধন॥
কুরুরাজ দুর্য্যোধন প্রবল প্রতাপ।
শত্রুগণ যার তাপে পাইত সন্তাপ॥
মহারথ দেবসম দেহের আভায়।
ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ যার সমরসহায়॥
একাদশ অক্ষৌহিণী সেনা আজ্ঞাধীন।
সেবিত নৃপতিগণ বারে অনুদিন॥
অতুল বিভব যার নাহি হয় সীমা।
নিজ পরিজনে যার অপার মহিমা॥
আপনারা শত ভাই সব ধনুর্দ্ধর।
যাহাদের কেহ নয় সমরকাতর॥
এ হেন সহায় যার হেন কুরুবীর।
কি হেতু সমরে বল ত্যজিলা শরীর॥
কেবল জানিবে পুত্র! ইন্দ্রিয়বিকার।
দুর্য্যোধনে দশাননে করিল সংহার॥
কামের হইয়া বশ দুরাত্মা রাবণ!
বন হতে জানকীরে করিল হরণ॥
তাহাই হইল কাল বিধি হলো বাম।
ক্ষুধাতুর শমনের পূরাইল কাম॥
সাক্ষাৎ সতীত্ব ধর্ম্ম জনকনন্দিনী।
স্বপনেও হন নাই কভু দ্বিচারিণী॥
কামবশে দুরাচার হরিল তাহায়।
আপনি কুঠার মারে আপনার পার॥
সেই পাপে বিধি বাম হইল তাহার।
দুরাত্মা রাক্ষস বংশ হলো ছারখার॥
জিতেন্দ্রিয় হতো যদি লঙ্কা- অধিপতি।
কখনো হতো না তার হেন দুরগতি॥
উপজিল অভিমান হইল প্রবল।
মাতিল তাহাতে মূঢ় গেল রসাতল॥
ইন্দ্রিয়ে রাখিত যদি করিয়া দমন।
ঘটিত না কভু তার ঘটনা এমন॥
হিংসাবুদ্ধি অতি লোভ অতি অহঙ্কার।
মহামত দুর্য্যোধনে দেছে ছারখার॥
এ সবে রাখিলে বশে করিয়া যতন।
কভু না হইত তার সমূলে পতন॥
মূঢ়ে মাতাইল ঘোর বিষয়লালসা।
তাই ত ঘটিল তার যত দুরদশা॥
ভুঞ্জিব পাণ্ডবে বঞ্চি একা রাজপদ।
এই ইচ্ছা ঘটাইল যতেক আপদ॥
না হলে এমন মতি অতিঘৃণাকর।
কেন বা বাঁধিবে বল ভীষণ সময়॥
পৃথিবীর যেথা যত ছিল বীরবর।
কেন বা ত্যজিবে রণে তারা কলেবর॥
অপরে বঞ্চনা করে নিজে হব সুখী।
যে ভাবে, জানিবে পুত্র! সেই চিরদুখী॥
সংসার সাগর বড় ভয়ঙ্কর
নাহি পারাপার যার।
অনর্থতরঙ্গ করে কত রঙ্গ
বিরাম নাহিক তার।
প্রমাদপবন বহে ঘন ঘন
উথলে সাগরজল।
ভাষায় সকল করয়ে বিকল
নাহি দেখা যায় স্থল।
অসত করম আবর্ত্ত বিষম
ঘুরিছে নিয়ত বেগে।
পড়িলে সে পাকে নিস্তার না থাকে
চোখে ধাঁধা যায় লেগে॥
ক্রোধাদির দল হইয়া প্রবল
ঝড়ের আকার ধরে।
তনুতরি তায় ঠেলে লয়ে যায়
সন সন স্বন করে॥
কি বলিব হায়! বড় ঘটে দায়
বিবেক করণধার।
হতবুদ্ধিপ্রায় না উপায় পায়
দিশা লেগে যায় তার॥
ধৈর্য্য আদি দাঁড়ি সবাই আনাড়ি
হইয়া পড়ে তখন।
না হয় উপায় তরি ডুবে যায়
বিফল হয় যতন॥
যার রিপুগণ বশে অনুক্ষণ
তাহারি কেবল জয়!
সে পড়ে না পাঁকে সদা দূরে থাকে
মঙ্গল তাহার হয়॥
জিতেন্দ্রিয় হয়ে শম দম লয়ে
ইন্দ্রিয়ে যে রাখে বশে।
তাহার বিঘন না হয় কখন
ভাসে শান্তিসুখরসে॥
লাগরে যেমন জন্তু অগণন
করে বিচরণ নিতি।
সংসার তেমনি বহু-জন্তু-খনি
তেমনি সঞ্চররীতি।
কাহার দশন খরপ্রহরণ
কত প্রাণী বধ করে।
কাহার নখর আয়ুধ প্রখর
ভীষণ মুরতি ধরে॥
নিরীহ স্বভাব নাহি হিংসাভাব
এমন শরীরী শত।
আছে কত স্থানে কে গণনে আনে
বিচিত্র গঠন কত।
যত জন্তু আছে, মানুষের কাছে,
কাহার তুলনা নয়।
বড় মজবুত, জীব অদভুত,
সবারে ছাড়ায়ে রয়।
বাঘের বিক্রম, হিংসার ধরম
কত জনে দেখা যাবে।
মেষের স্বভাব, নিরীহের ভাব,
তাহে দরশন পাবে॥
এই ক্ষিতিতল, স্বরগ বিমল,
তাহার সদ্গুণে করে।
ইহাই আবার, দোষেতে তাহার
নরক মূরতি ধরে॥
একই মানবে দরশন হবে,
ক্ষণে ক্ষণে কত ভাব।
নটেতে যেমন হয় দরশন,
নানারূপ আবির্ভাব॥
দেখিবে কখন, বরষিছে ঘন,
করুণা-মূরতি ধরে।
দীন জনগণে, অকপট মনে,
হেরিলে নয়ন ঝরে॥
তারি দেখ গুণ, পর ক্ষণে পুন
আর ত বে ভাব নাই।
সে যেন সে নয়, আর জন হয়,
এরূপ দেখিতে পাই॥
দেখ অপরূপ, বিষম বিরূপ,
কোপের মুরতি ধরে।
দয়া বিসর্জ্জিয়া, নিদয় হইয়া,
সকলে তাপিত করে॥
আজ তুমি যারে, পাবে দেখিবারে,
পরম-ধরম-খনি।
দেখিবে যে নরে, এক দিন পরে,
অসতের চূড়ামণি॥
স্বার্থহেতু নর, হয় নিরন্তর,
শত-শত-রূপ-ধারী।
তা সহ আচার, কিবা ব্যবহার,
করে উঠা বড় ভারী॥
হইলে উদ্ধত, রোষবশগত,
ক্ষণকাল নাহি চলে।
থাকিবে সতত, হইয়া সংযত,
ইন্দ্রিয়-দমন বলে॥
মুখরজ্জু কষে, অপনার বশে,
দুরন্ত ইন্দ্রিয়গণে।
কর আনয়ন, হবে দরশন,
বিমল সুখের সনে॥
ধৈর্য্যগুণ সহ, হইলে বিরহ,
পাইবে অশেষ ক্লেশ।
ক্রোধাদির দল, হইলে প্রবল,
না রবে সুখের লেশ॥
বিবেক বিশাল, খর করবাল,
সঙ্গে যেন সদা রয়।
সদা যতমান, হলে সাবধান,
না রবে বিপদ ভয়॥
হেন মনে লয়, জান না তনয়।
সংসার কেমন ঠাঁই।
কোন হেতু বলে, যদি পদ টলে,
জানিবে নিস্তার নাই॥
শমাদি-তৎপর, হয়ে নিরন্তর,
করিয়া ইন্দ্রিয় জয়।
ধর্ম্মে করে বল, ন্যায়পথে চল,
রহিবে না কোন ভয়॥
শত শত বীর, রণে হয়ে স্থির,
নাশিয়া অরাতিকুল।
শেষে বলি দেছে, ইন্দ্রিয়ের কাছে,
যশ মান জাতি কুল॥
শুনহ তনয়! ইন্দ্রিয়ের জয়,
সহজ করম নয়।
জেনে মুনিগণ, তাজে নিকেতন,
অরণ্যে আশ্রয় লয়॥
ধর উপদেশ, কর সবিশেষ,
যতন ইন্দ্রিয়জয়ে।
দেখিবে কেবল, গাইবে মঙ্গল,
সকলে তোমার হয়ে॥