উপদেশমালা (প্রথম ভাগ)/গুরুজনের আজ্ঞাপালন ও উপদেশ গ্রহণ
গুরুজনের আজ্ঞাপালন
ও উপদেশ গ্রহণ।
চৌদিকে চাহিয়া দেখ পৃথিবীর গতি।
কেমন অপূর্ব্ব তার উর্ব্বরা শকতি॥
অনুকূল বিধি তাহে সদয় হইয়া।
ভাল মন্দ কত বীজ দেছে ছড়াইয়া॥
বিধাতা করেছে সত্য বীজের সৃজন।
মানুষের চাই কিন্তু ক্ষেত্র করষণ॥
মানুষ যে ক্ষেতে পুত্র! হাত নাহি দিবে।
দেখিবে কণ্টকে তাহা ছাইয়া ফেলিবে॥
জনমিবে ভাল শস্য থাকে যদি সাধ।
প্রাণপণে কর তবে ক্ষেতেতে আবাদ॥
চষো ফুঁড়ো সার দাও কর পরিষ্কার।
তবে ত মিলিবে তব শ্রমপুরস্কার॥
তবে ত ফলিবে তব মনোরথতরু
পড়িয়া রবে না ক্ষেত হয়ে যেন মরু॥
জনমিবে বহু শস্য এই বাসনায়।
সহজ করেছে বিধি কৃষির উপায়॥
তবু চাই কৃষিশিক্ষা উপদেশ চাই।
বিনা শিক্ষা ফল লাভ দেখিতে না পাই॥
যত শেখা হবে তত বেশী হবে ফল।
শিক্ষা বিনা কোন কাজে নাহি হয় বল্॥
যেখানে ঘটিবে পুত্র! শিক্ষাব্যতিক্রম।
সেখানে নিশ্চয় হবে পণ্ড পরিশ্রম॥
ভেবো না চাষার নাই কৃষি-উপদেশ।
এ কথা বলে না পুত্র! যে জানে বিশেষ॥
চাষাদের নাই বটে বিশেষ উন্নতি।
কিন্তু আছে চিরকেলে শিক্ষার পদ্ধতি॥
কি শস্য কিরূপ ক্ষেতে জনমে কিরূপ।
দিলে কত চাষ ফলে ফল অনুরূপ॥
পূরব পুরুষ হতে তারা তাহা জানে।
পিতা হতে তনয়ের উঠে গিয়া কাণে॥
তেমনি মানস-ক্ষেত্রে মানুষের বিধি।
করিয়াছে নানা বীজ বপনের বিধি॥
বাজারে দিয়েছে মন নানা বৃত্তি দিয়া।
নিয়ত হতেছে তার শত শত ক্রিয়া॥
মন বৃত্তিগুলি যদি না কর দমন।
ভালগুলি রসাতলে করিবে গমন॥
কিন্তু এ দমনকার্য সুখসাধ্য নয়।
শুরু উপদেশ বিনা কভু নাহি হয়॥
শিক্ষা চাই চাই পুত্র! সুদৃঢ় অভ্যাস।
ক্রোধাদির বল্ যদি তবে হয় হ্রাস॥
কাম ক্রোধ লোভ মোহ মত্ততা মৎসর।
ইহাদের কেহ নয় বেগে ক্ষীণতর॥
ইহারা দুরন্ত বড় নাহি শুনে মানা।
বড়ই কঠিন কাজ নিজবশে আনা॥
অশিক্ষিত অশ্বসম চঞ্চলম্বভাব।
সহজে ত্যজে না তারা অবাধ্যতাভাব॥
যেমন বনের ঘোড়া নগরে আনিয়া।
শিখাইতে হয় তারে খতন পাইয়া॥
তবে সে শিক্ষিত হয়ে বশে আসে ধীরে।
যে দিকে ফিরাও তারে সেই দিকে ফিরে॥
তেমনি ইন্দ্রিয়গণে বশে আনিবারে।
অশেষ যতন চাই বিশেষ প্রকারে॥
গুরু উপদেশ পুত্র! সে যতনমূল।
তাঁহার বচনে সদা হও অনুকূল॥
তাঁর মতে চল সদা পাইয়া যতন।
তবেই হইবে তব ইন্দ্রিয়দমন॥
গুরু-উপদেশে আছে যে বা প্রয়োজন।
শুনিলে করিনু পুত্র! তার বরণন॥
হিতের উদ্দেশে যিনি ভাল কথা কন।
তাঁর বাক্য শিরোধার্য্য তিনি গুরুজন॥
তাঁহার বচনে কভু না করিও হেলা।
উদ্ধার করিবে তাহা বিপদের বেলা॥
পিতামাতাসম পুত্র! নাহি গুরুজন।
প্রমাণ করিয়া চল তাঁদের বচন॥
যেথা যত বন্ধু আছে করহ সন্ধান।
কেহ নহে হিতকারী তাঁদের সমান॥
সন্তানের হিতহেতু তাঁদের যতন।
হইবার আছে পুত্র! দুইটী কারণ॥
প্রকৃতি মায়ার ভোরে বেধেছে কষিয়া।
সে ফাঁশ পারে না কেহ ফেলিতে ছিঁড়িয়া॥
সেই পাশে বাঁধা রয়ে জনক জননী!
কল্যাণ কামনা করে দিবস রজনী॥
হইলে পুত্রের ভাল বাড়য়ে উল্লাস।
কিসে পুত্র ভাল রবে সদা এই আশ॥
অপর জানিবে নিজ উপকার আশা॥
তাহাতে জনমে পুত্রে দৃঢ় ভালবাসা॥
পুত্র যদি ভাল হয় তবেই মঙ্গল।
আশা পূরে বিপরীতে বিপরীত ফল॥
তেঁ কারণ পিতা মাতা হয়ে একমনা।
পুত্রের নিয়ত করে কল্যাণ কামনা॥
জনক জননী দোহে বয়সেতে বড়।
কিসে ভাল মন্দ কিনে বুঝিবারে দঢ়॥
তাঁহারা বুঝিয়া যেবা দিবেন আদেশ!
তাহাতে পুত্রের নাই অকল্যাণলেশ॥
পুত্র তাহে কভু নাহি করে অন্য মন।
নতভাবে শিরে করে করিবে ধারণ॥
ক্ষিতিতলে যত বস্তু দেখিবারে পাই।
মাতাপিতাবাক্যসম কোন কিছু নাই॥
এক দিকে সব রাখ করিয়া যতন।
তুলাদণ্ডে কর মান তাঁদের বচন॥
তাঁদের বচন ভারী সবা চেয়ে হবে।
সময়ে পুত্রের তাহা অজ্ঞাত না রবে॥
দশরথসুত রাম রাজীবলোচন।
কিরূপে পিতার বাক্য করয়ে পালন॥
কভু কি তনয় তুমি শুন নাই কাণে।
পুরাণে পুরাণ জনে কতই বাখানে॥
রামেরে বলিলা পিতা তুমি যাও বনে।
তখনি সসজ্জ রাম দ্বৈধ নাই মনে॥
জটাচীরধারী হয়ে চলিলা কাননে।
ত্যজিলা সমস্ত বস্তু সহাস্য বদনে॥
পড়িয়া রহিল দণ্ড ছত্র সিংহাসন।
রাজবেশ রাজভূষা বান্ধব স্বজন॥
অশ্ব হস্তী দাসদাসী অতুল সম্পদ।
কিছুই হলো না তার প্রেমের আস্পদ॥
কারো তরে ক্ষণ তার কাঁদিল না মন।
কারো তবে নাহি তার ঝুরিল নয়ন॥
পিতৃসত্য পালিবারে হয়ে একমনা।
করিলা যতেক বস্তু তৃণের গণনা॥
তে কারণ বলি শুন বুঝহ তনয়।
গুরুবাক্যসম শুরু কোন কিছু নয়॥
যবে মূঢ় দুঃশাসন কৌরবসভায়।
দ্রুপদসুতারে লয়ে অনাথার প্রায়॥
বিবসনা করে তারে করে অপমান।
পার্থবীর ভীমসেন হয়ে প্রিয়মাণ॥
কি হেতু আছিলা তারা কাষ্ঠসম হয়ে।
বধির বোবার মত অপমান সয়ে॥
কি হেতু করিলা তারা কোপসম্বরণ।
কি হেতু গায়ের জ্বালা করে নিবারণ॥
কি হেতু মূঢ়ের মুণ্ড করে খান খান।
না করিলা কাক শিবা পূজাসমাধান॥
তারা কি পৌরুষহীন কাপুরুষ জন।
তাই ছিলা দোহে হয়ে তরে অচেতন॥
বীরেরা জানে কি কভু ভয় কাকে বলে।
কেমনে নিবাল তবে সংগ্রাম-অনলে॥
কি হেতু হইলা তারা বল বনচারী।
ভ্রমিলা কান্তারে কেন হইয়া ভিখারী॥
করিলা কেন বা তারা অজ্ঞাত নিবাস।
রাজা হয়ে পরগৃহে হৈলা কেন দাস।
তুমি কি করিতে চাও উত্তর শ্রবণ।
গুরু-আজ্ঞা একমাত্র ইহার কারণ॥
শাস্ত্রে বলে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পিতার সমান।
করিবে পিতার মত তাহার সম্মান॥
অনুজেরা রবে তার হয়ে আজ্ঞাকারী।
করিবে যতেক কাজ যেন কর্ম্মচারী॥
ইহাতে জনমে পুত্র! সকলের হিত।
করে যদি বিপরীত ঘটে বিপরীত॥
রাজা যুধিষ্ঠির জ্যেষ্ঠ পাণ্ডুর নন্দন!
তার অনুগত ছিলা ভাই কয়জন॥
তার অনুমতি বিনা কভু কোন ভাই।
আপন ইচ্ছায় কোন কাজ করে নাই॥
লভার মাঝারে যবে দুই দুঃশাসন।
করিল দ্রুপদস্থতার বসন-কর্ষণ॥
যুধিষ্ঠিরে যুধিষ্ঠির ছিল না তখন।
লাজভরে হরে গেল অঙ্গার যেমন॥
কোন দিকে না চাহিয়া শির নত করে।
আছিলা অবশ ভাবে আসন উপরে॥
ভীমসেন বার বার আজ্ঞার আশায়।
জ্যেষ্ঠের অধীর ভাবে মুখপানে চায়॥
বিফল হইল চেষ্টা বিফল যতন।
কোনরূপে না মিলিল আদেশ বচন॥
তাই তারা রৈলা হয়ে কাপুরুষের মত।
দুষ্টের শাসনে তাই হইলা বিরত॥
পুরাণের কথা শুনিলে তনয়।
গুরুবশে থাকা হয় সাধুনয়॥
তাহাতে বিনয় সৌজন্য উদয়।
কত ফল ফলে গণনা না হয়॥
অনত জনের ত্যজ সহবান।
কুকাজে কর না মনের উল্লাস॥
ভাল কাজে সদা করহ সাহস।
হও না তনয়! কভু পরবশ॥
স্বাধীন হইয়া কর সব কাজ।
কারো কাছে তাতে নাহি পারে লাজ॥
কভু না হইও পরের অধীন।
অশেষ যাতনা পারে চিরদিন॥
অধীন হইলে হয় বহু দোষ।
কিছুতে না হয় মনের সন্তোষ॥
চিত্তবৃত্তি না হয় কলুষিত।
কাহার উন্নতি না থাকে উচিত॥
হৃদয়ের বল ক্রমে হয় ক্ষীণ।
যত গুণরাশি সকলি মলিন॥
মানুষের আছে যত কিছু দোষ!
বাড়ে অনুদিন তাহাদের রোষ॥
পরভাগ্যজীবী পরপিওভুক্।
কখন হও না বড় পাবে দুখ॥
তেজ যেন তব সদা মনে জাগে।
কোন গুণ নহে তাহার আগে॥
সুদীন বচনে পর উপাসনা।
জানিবে তনয় বড় বিড়ম্বনা॥
বড় হবে। যদি থাকে অভিলাষ।
স্বাধীনতালাভে করহ প্রয়াস॥
স্বাধীন ভাবেতে হইলে আদর।
আর সব গুণ হবে সহচর॥
এখনো আমার উপদেশ শুন।
দোষ পরিহর উপার্জ্জয় গুণ॥
দোষী হলে কভু নাহি পাবে সুখ।
দোষী জনে বিধি সতত বিমুখ॥
![]()
![]()