উপদেশমালা (প্রথম ভাগ)/শ্রম
শ্রম।
এই যে বিশাল বিশ্ব দেখিছ সমুখে।
কোন কাজ নাহি ইথে শ্রম বিনিমুখে॥
যতেক উন্নতি-সৌধ কর দরশন।
শ্রমভিত্তি একমাত্র তার আলম্বন॥
একমাত্র পরিশ্রম বাজিকর মত।
জগতে আশ্চর্য্য কাণ্ড দেখাইছে কত॥
এত যে দেখিছ পুত্র। বিজ্ঞান-কৌশল!
এ নহে কি দৃঢ়তর পরিশ্রমফল॥
জগতের সব লোক অকর্ম্মা অবশ।
তোমা সম হতো যদি একান্ত অলস॥
জগতের এ উন্নতি কোথায় থাকিত।
বিজ্ঞান দর্শন আদি দেখা নাহি দিত॥
এক মস দূরপথে গেছে বন্ধু জন!
হেথা হতে তার সহ কর আলাপন॥
এ বল কাহার বলে হতেছে সাধন।
নিমেষে কে দূরে করে সংবাদ বহন॥
কেমন সুখেতে রেলে করিছ ভ্রমণ।
মুহূর্ত্তে দিনের পথ করিছ গমন॥
এ বল্ কাহার পুত্র! কার প্রাদুর্ভাব।
এ নহে কি বিজ্ঞানের বিচিত্র প্রভাব॥
কে দেয় বিজ্ঞানে বল্ কে দেয় জনম।
নহে কি নিদান তার দৃঢ় পরিশ্রম॥
তোমাকে বলিব কিবা অধিক বচন।
শ্রম বিনা কোন কার্য্য না হয় সাধন॥
এই যে নিয়ত আছে, আহার বিধান।
এই যে বসন নিত্য কর পরিধান॥
শ্রম বিনা এ সবার নাহি হয় যোগ।
শ্রম বিনা কোন্ বস্তু বল হয় ভোগ॥
যতেক বিলাসবস্তু সুখের সাধন।
পায় না অসভ্য লোকে জান কি কারণ॥
করে না তাহারা শ্রম করে না যতন।
তেই তাহাদের নাই সভ্যতালক্ষণ॥
ভোজ্য বস্তু বনজাত কন্দ মূল ফল।
পরিধের যদি থাকে, গাছের বাকল॥
অসভ্যেরা এ দশায় করে তৃপ্তি লাভ।
এ কি নহে বল পুত্র! আলস্যপ্রভাব॥
যার শ্রমে অনুরাগ শ্রমের অভ্যাস।
শ্রম করে যার হয় মনের উল্লাস॥
শরীরে যে স্বস্তিবোধ করে শ্রমবলে।
শ্রমের যতেক কাজ সাধে কুতূহলে॥
সে জন কি সুখী হয় বন্য মূল ফলে।
যে জন কি সুখী হয় শুয়ে ধরাতলে॥
তার সুধাস্বাদু নানা ভোজ্য আয়োজন।
চর্ব্ব-চূষ্য লেহ্য-পেয় বিবিধরচন॥
অপূর্ব্ব পালঙ্ক তার শয়নবিধান।
সুকোমল-শয্যা-শোভী বহু উপধান॥
উর্দ্ধমুখ কৃতাঞ্জলি আজ্ঞা-অভিলাষী।
সদা সেবা করে তার কত দাস দাসী॥
এ সব অসভ্য জনে স্বপনসমান।
চায় না খাটিতে তাই পায় না সন্ধান॥
কি হেতু সভ্যের এত অতুল সম্পদ।
কি হেতু বা তাঁর এত উচ্চতর পদ॥
অন্বেষিয়া দেখ যদি শ্রম এর মূল।
শ্রমশীল জনে সদা বিধি অনুকূল॥
তাহার শ্রমের বিধি দেন পুরস্কার।
অলস জনের যাহে নাহি অধিকার॥
অসভ্যে সত্যেতে পুত্র! এত ভেদ কিসে।
তুমি কি কখন তার পাইয়াছ দিশে॥
বুঝ যদি অসভ্যতা সভ্যতা লক্ষণ।
জানিতে পারিবে দোহে ভেদের কারণ॥
অসভ্যতা আলস্যের অবস্থা তনয়।
সভ্যতা শ্রমের দশা জানিহ নিশ্চয়॥
কল্পবৃক্ষে সাকোটকে যেমন অন্তর।
তেমনি ঐ দুয়ে জেনো প্রভেদবিস্তর॥
উপাদেয় খাদ্য দ্রব্য বসন ভূষণ।
যে কিছু উত্তমে তব হবে প্রয়োজন॥
যাহা চাবে তাই পাবে কল্পতরু কাছে।
কি ফল পাইবে বল সেওড়ার গাছে॥
উন্নতিশিখরে যদি উঠিবারে চাও।
তাহার পত্তনে আগে মন তবে দাও॥
নিরমিতে উচ্চ সৌধ কি কি বস্তু লাগে।
কি মাল মসলা চাই জেনে লও আগে॥
শ্রমই ইষ্টক তার শ্রম চূণ বালি।
শ্রমই সুরকি তার শ্রমই সকলি॥
শ্রম সিড়ি শ্রম কড়ি দরজা জানলা।
শ্রমই বরগা তার আর মিছে বলা॥
শ্রমই গাঁথনি তার গাঁথে সভ্যজন।
সভ্য তাহে ভোগ করে সুখ অগণন॥
অসভ্য তাহার স্বাদ জানিতে না পারে।
তার অধিকার নাই তাহা জানিবারে॥
সৃষ্টির প্রণালী দেখ বারেক চিন্তিয়া।
পার না থাকিতে কেহ সুস্থির হইয়া॥
গগনমণ্ডলগামী যত গ্রহগণ।
করিছে আপন পথে নিয়ত ভ্রমণ॥
যে পৃথিবী আমাদের চিরনিবসতি।
ক্ষণকাল স্থির নয় সদা তার গতি॥
জড়পিণ্ড বটে কিন্তু ক্রিয়া আছে তার।
সমুদায় জড়ে দেখ ক্রিয়ার সঞ্চার॥
নদী নদ উপনদী জলধি জঙ্গল।
কেহ স্থির ভাবে নয় সতত চঞ্চল॥
নদীতে বহিছে স্রোত সাগরে তরঙ্গ।
বারেক হেরিয়া দেখ জঙ্গলের রঙ্গ॥
জঙ্গল স্থাবর বটে নিজে গতিহীন।
কিন্তু বায়ু আলোড়িছে তারে রাতি দিন॥
স্থাবরের গতি নাই কথা মিছা নয়।
কিন্তু তার ক্রিয়া আছে এ কথা নিশ্চয়॥
দেখ তরু ক্ষিতি হতে রস আকর্ষিয়া।
তিলে তিলে বাড়ে শাখাশোভিত হইয়া॥
এমন যে জড়পিণ্ড পাহাড় পর্ব্বত।
তারো ক্রিয়া আছে দেখ অবয়বগত॥
তিলে তিলে বাড়ে গিরি লয়ে মৃৎসার।
যোজন ব্যাপিয়া হয় তাহার বিস্তার॥
অনল পবন এরা দু’টা মহাভূত।
নিয়ত করিছে ক্রিয়া কিবা অদভুত॥
বায়ু-নাম সদাগতি ক্ষণ নহে স্থির।
নিয়ত জমিছে দেখ হইয়া অধীর॥
জীব দেহে প্রবেশিয়া দিতেছে জীবন।
তেই সে পেয়েছে নাম জগতজীবন॥
অনলের শিখা দেখ দেখ তার ক্রিয়া
উঠিবে বিস্ময়রসসিন্ধু উথলিয়া॥
যে অন্ন পানীয় নিত্য হয় উপযোগ।
অপর যতেক বস্তু করে থাক ভোগ॥
যাইয়া জঠরমাঝে নেই সমুদায়।
যখন পরণ করে ক্রমে পাকাশয়॥
পবন অনলযোগে ময়রার মত।
তাহাতে ভেয়ান করে বস্তু শত শত॥
রক্ত মাংস অস্থি মজ্জা আদি যত নাম।
সকলি জানিবে বৎস! তারি পরিণাম॥
এই যে দেখিছ দেহ আর কিছু নয়।
ভুক্ত-জীর্ণ-অন্ন-রস পরিণামময়॥
অন্তর্নয়ন যদি থাকিত তোমার।
দেখিতে দেহের মাঝে যদি একবার॥
করিছে কেমন কাণ্ড মিলে পঞ্চভূত।
সতত হতেছে কিবা ঘটনা অদ্ভুত॥
শোণিত তাড়িত বেগে শিরায় শিরায়।
হেন স্থান নাই যেথা ছুটে নাহি যায়॥
তাহাই দেহের স্থিতি গতির কারণ।
রক্ত বন্ধ হলে হয় দেহের পতন॥
পবন কেমন দেখ বিজ্ঞ কারিকর!
সারে রেখে অসারেরে করে দূরতর॥
তেই দিবানিশি এই নবদ্বার দিয়া।
যেতেছে অসার অংশ বাহির হইয়া॥
হেরিয়া মনুষ্যকৃত কলের কৌশল।
হয়ে থাক চিত্রহেন বিস্ময়ে অচল॥
সে কল আর কিছু নয় জেনো অবিকল।
বিধিকৃত এই দেহযন্ত্রের নকল॥
সে কলেও পঞ্চভূত করিতেছে ক্রিয়া।
বুঝিতে পারিবে যদি বুঝ মন দিয়া॥
জগতে পদার্থচয়, স্থাবরজঙ্গমময়,
কেহ নহে শ্রম-ক্রিয়া-হীন।
তুমি শুধু ত্যজে লাজ, না করিবে কোন কাজ,
জড় হেন রবে রাতি দিন।
বিধাতা বিমুখ হবে, সদা দুখ পেতে রবে,
না হইবে অবস্থা উন্নতি।
নাহি আদরিবে কেহ, না করিবে মারাস্নেহ,
ক্রমে হবে নানা দূরগতি।
এখনো সময় আছে, যাও গুরুজন কাছে,
নত হয়ে উপদেশ লও।
বিধিমত শ্রম কর, আলন্যেরে পরিহর,
মানুষের মত তুমি হও।
অধর্ম্মে না কর মতি, সদা সৎ পথে গতি
সাধু সহ সদা সহবাস।
সদা বিদ্যা আরাধনা, গুরুজন-সন্মাননা,
সদা কর মনের উল্লাস।
পরহিত-ব্রতধর, দশেরে পালন কর,
যুষুক জগতে তব যশ।
সব কাজে অগ্রসর, সব কাজে তৎপর,
ক্ষণকাল না হও অলস।
এরূপ হইলে তবে, চিরকাল সুখী হবে,
কভু কষ্ট না হবে তোমার।
আমার বচন ধর, দুরাগ্রহ পরিহর,
অবাধ্যতা কেন কর আর।