বিষয়বস্তুতে চলুন

উপদেশমালা (প্রথম ভাগ)/সৌভ্রাত্র

উইকিসংকলন থেকে

সৌভ্রাত্র।

কে তোমারে ভালবাসে প্রাণের সহিত।
কে তোমারে হেরে সুখী হয় হরষিত॥
কে থাকিতে ভালবাসে তব সহবাসে।
তব মুখ হেরে সুখ-সাগরেতে ভাসে॥
কার বল তোমা সহ করিয়া আলাপ।
মনের বেদনা যায় দূরে যায় তাপ॥
করিয়া তোমার সহ আহার বিহার।
উথলে আনন্দসিন্ধু বলহ কাহার॥
তোমার হিতের কথা করণ-কুহরে।
পশিলে কাহার মুখে হাসি নাহি ধরে॥

মিলনে কে সুখী তব বিরহে কাতর।
বিপদে উথলে কার বিষাদ-সাগর॥
কার বল তব যশ করিলে শ্রবণ।
বুক পাঁচ হাত হয় জুড়ায় শ্রবণ॥
কে শুনিয়া বল তব নিন্দার বারতা।
মরমে মরিয়া যায় হেঁট করে মাথা॥
রটিলে কলঙ্ক তব মন উচাটন।
হয় কার অবিরল ঝোরে দুনয়ন॥
তোমার হৃদয়ে হলে ভাবের উচ্ছ্বাস।
কাহার মনেতে বল বাড়য়ে উল্লাস॥
তোমার হৃদয় হলে নত দুখভারে।
তোমার মনের কথা কে বুঝিতে পারে॥
তোমার করিয়া কাজ কে সুখী অন্তরে।
কে নিয়ত ফিরে তব উপকার তরে॥
তব সুখে সুখী তব দুখে দুখী হয়।
এখন কে আছে ভেবে বলহ তনয়॥
যে সব গুণের কথা সুধানু তোমায়।
বন্ধু বিনা আর কাছে শোভা নাহি পায়॥
যেথায় দেখিবে যত বন্ধুজন আছে।
কেহ নহে জেনো ভাই ভগিনীর কাছে॥

এমন প্রাণের বন্ধু আর কোথা নাই।
এমন পরম বন্ধু দেখিতে না পাই॥
খা(ও)য়া শো(ও)য়া উঠা বসা সব এক ঠাঁই।
পরস্পর ভিন্নতার মনে কিছু নাই॥
এক পিতা এক মাতা এক জন্মস্থান
সম যত্নে সকলারি পালন সমান॥
সে কারণ ভালবাসা হয় গাঢ়তর।
স্নেহ পাশ দৃঢ় বাঁধা রয় পরস্পর॥
এক চিন্তা এক ভাব একই মনন।
এক চেষ্টা এক কাজ এক আচরণ॥
পরস্পর পরস্পর মঙ্গল সাধন।
করয়ে সকলে মিলে পাইয়া ষতন॥
ভায়ের হইলে ভাল যে কোন কারণে।
আপন মঙ্গল হবে এই ভাব মনে॥
যে করে কূলের সদা উন্নতিকামনা।
ভায়ের মঙ্গলে তার নিয়ত বাসনা॥
ভাই ভাল হলে হবে কুলের গৌরব।
ছুটিবে চৌদিকে তার যশের সৌরভ॥
সদা এই মনে জাগে সেই অনুরাগে।
ভায়ের কল্যাণে ভাই ধেয়ে যায় আগে॥

এমন বিশুদ্ধ উচ্চ উদার হৃদয়।
ভাই বিনা কোথা নাহি দরশন হয়॥
পাণ্ডবেরা পাঁচ ভাই এর নিদর্শন।
ভায়ে ভায়ে কিবা ছিল স্নেহের বন্ধন॥
যুধিষ্ঠির পাশাখেলে কুমন্ত্রণার বলে।
রাখিল না কিছু যাহা আপনার বলে॥
বসন ভূষণ আদি যাহা কিছু ছিল।
সকলি দুর্ম্মতি হেতু জুয়ায় অর্পিল॥
ভায়েরা সহিল সব মমতা কারণ।
কেহ না কহিল তারে এ হেন বচন॥
“সকলের বড় হয়ে তার এই কাজ।
কি লাজ মাথায় যেন হানিতেছে রাজ॥
তাহারে শোভে কি কভু এমন করম।
শেষে কি হইল এই জ্যেষ্ঠের ধরম॥
তাহার দৃষ্টান্ত কোথা করি দরশন।
অনুজেরা ভালপথে করিবে গমন॥
তা না হয়ে হায় হায় ঘটিল কি দায়।
এ কথা কহিব কার বুক ফেটে যায়॥
কেন বা ঘটিল তার হেন দুরমতি।
নিদয় হইলা কেন ভাইগুলি প্রতি॥

পুঁজিপাটা যাহা কিছু ছিল সমুদায়।
বুদ্ধি শুদ্ধিহারা হয়ে ধরিল জুয়ায়॥
আমাদের স্বত্বে তার কিবা অধিকার।
আমরা মজি বা কেন কথাতে তাহার॥”
ভায়েরা কেহই হেন দারুণ বচনে।
ব্যথা নাহি দেয় কভু যুধিষ্ঠির মনে॥
সকলে হইয়া তার আজ্ঞার অধীন।
এক ভাবে অনুগত ছিল চির দিন।
সহেছিল কত কষ্ট কে না তাহা জানে।
সুখে দুখে এক ভাবে ছিল সব স্থানে॥
ঘরেতে আছিল। যবে তখন যেমন।
কাননেতে নেই ভাব হয় দরশন॥
যুদ্ধকালে সেই ভাব ছিল না অন্যথা।
কভু কারো মনে কেহ দেয় নাই ব্যথা॥
যখন হইলা রাজা জ্যেষ্ঠ সহোদর।
সকলে সেবিলা তারে হয়ে তৎপর॥
কেহ বা ধরিল ছত্র যতন করিয়া।
কেহ বা বীজন করে চামর লইয়া॥
ভৃত্যভাবে সেবা করে জ্যেষ্ঠসহোদরে।
অনুজগণের মনে আনন্দ না ধরে॥

দেখায়ে গিয়াছে আর রামেরা ক ভাই।
ভায়ে ভায়ে ভালবাসা যার পর নাই॥
লক্ষ্মণ রামের তরে কি কাজ না করে।
ভৃত্যভাবে সেবে তারে কাননভিতরে॥
আহার যোগায় কল মূল আহরিয়া।
রাত্রিকালে রক্ষা করে প্রহরী হইয়া॥
শক্তিশেলে পড়ে তারে সেবয়ে সমরে।
রাজা হলে সেবে তারে করে ছত্র ধরে॥
ভায়ে ভায়ে ভালবাসা চাই এইরূপ।
কদাচ ভায়ের প্রতি হও না বিরূপ॥
যাহারা বিরূপ হয় তারা কভু নয়।
সুজন স্থধীর সাধু সরলহৃদয়॥
ধনুমত তাহাদের বড় বাঁকা মন।
বাঁকা কাজ বাঁকা ভাব বাঁকা আচরণ॥
স্বার্থে অন্ধ হয়ে সদা হয় দিশাহারা।
কিবা ভাল কিবা মন্দ নাহি বুঝে তারা॥
সকল বিষয়ে চটা বড়ই ধোঁয়ার।
ধৈর্য্য ক্ষয়া উপেক্ষার নাহি ধারে ধার॥
ভায়ের দেখিলে দোষ উপেক্ষিতে হবে।
তবে ত ভায়ের সহ ভালবাসা রবে॥

অনেক সহিতে হয় সংসারে থাকিয়া।
অসহিষ্ণু হলে নাহি ফলে কোন ক্রিয়া॥
যদি থাকে তব সুখ অভিলাষ।
প্রাণের সহিত ভায়ে ভালবাস॥
তাহার সহিত কর না বিরোধ।
বিরোধে হইবে সুখপথরোধ॥
বিবাদ করিলে উন্নতির আশা।
দূরে যাবে হবে অলক্ষ্মীর বাসা॥
ভায়ের সমান এমন বান্ধব!
পাইবে না ভবে হয় অনুভব॥
তার হিতে সদা করহ যতন।
তা হলে মিলিবে অমূল্য রতন॥
সে তোমার তরে করি প্রাণপণ।
তোমার হিতের করিবে সাধন॥
ভায়ে ভায়ে হলে প্রগাঢ় প্রণয়।
সকলে গাইবে তোমাদের জয়॥
ফলিবে ইহার উপাদেয় ফল।
কুলের গৌরব হইবে উজল॥

সমাপ্ত