উৎসর্গ/১৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


সব ঠাঁই মোর ঘর আছে , আমি
      সেই ঘর মরি খুঁজিয়া ।
দেশে দেশে মোর দেশ আছে , আমি
      সেই দেশ লব যুঝিয়া ।
পরবাসী আমি যে দুয়ারে চাই —
তারি মাঝে মোর আছে যেন ঠাঁই ,
কোথা দিয়া সেথা প্রবেশিতে পাই
      সন্ধান লব বুঝিয়া ।
ঘরে ঘরে আছে পরমাত্মীয় ,
      তারে আমি ফিরি খুঁজিয়া ।
  
রহিয়া রহিয়া নব বসন্তে
      ফুলসুগন্ধ গগনে
কেঁদে ফেরে হিয়া মিলনবিহীন
      মিলনের শুভ লগনে ।
আপনার যারা আছে চারি ভিতে
পারি নি তাদের আপন করিতে ,
তারা নিশিদিশি জাগাইছে চিতে
      বিরহবেদনা সঘনে ।
পাশে আছে যারা তাদেরই হারায়ে
      ফিরে প্রাণ সারা গগনে ।
  
তৃণে পুলকিত যে মাটির ধরা
      লুটায় আমার সামনে —
সে আমায় ডাকে এমন করিয়া
      কেন যে , কব তা কেমনে ।
মনে হয় যেন সে ধূলির তলে
যুগে যুগে আমি ছিনু তৃণে জলে ,
সে দুয়ার খুলি কবে কোন্‌ ছলে
      বাহির হয়েছি ভ্রমণে ।
সেই মূক মাটি মোর মুখ চেয়ে
লুটায় আমার সামনে ।
  
নিশার আকাশ কেমন করিয়া
      তাকায় আমার পানে সে ।
লক্ষযোজন দূরের তারকা
      মোর নাম যেন জানে সে ।
যে ভাষায় তারা করে কানাকানি
সাধ্য কী আর মনে তাহা আনি ;
চিরদিবসের ভুলে - যাওয়া বাণী
      কোন্‌ কথা মনে আনে সে ।
অনাদি উষায় বন্ধু আমার
      তাকায় আমার পানে সে ।
  
এ সাত - মহলা ভবনে আমার
      চির - জনমের ভিটাতে
স্থলে জলে আমি হাজার বাঁধনে
      বাঁধা যে গিঁঠাতে গিঁঠাতে ।
তবু হায় ভুলে যাই বারে বারে ,
দূরে এসে ঘর চাই বাঁধিবারে ,
আপনার বাঁধা ঘরেতে কি পারে
     ঘরের বাসনা মিটাতে ।
প্রবাসীর বেশে কেন ফিরি হায়
     চির - জনমের ভিটাতে ।
  
যদি চিনি , যদি জানিবারে পাই ,
     ধুলারেও মানি আপনা ।
ছেটো বড়ো হীন সবার মাঝারে
     করি চিত্তের স্থাপনা ।
হই যদি মাটি , হই যদি জল ,
হই যদি তৃণ , হই ফুলফল ,
জীব - সাথে যদি ফিরি ধরাতল
     কিছুতেই নাই ভাবনা ।
যেথা যাব সেথা অসীম বাঁধনে
     অন্তবিহীন আপনা ।
  
বিশাল বিশ্বে চারি দিক হতে
     প্রতি কণা মোরে টানিছে ।
আমার দুয়ারে নিখিল জগৎ
     শত কোটি কর হানিছে ।
ওরে মাটি , তুই আমারে কি চাস ।
মোর তরে জল দু হাত বাড়াস ?
নিশ্বাসে বুকে পশিয়া বাতাস
     চির - আহ্বান আনিছে ।
পর ভাবি যারে তারা বারে বারে
     সবাই আমারে টানিছে ।
  
আছে আছে প্রেম ধুলায় ধুলায় ,
     আনন্দ আছে নিখিলে ।
মিথ্যায় ঘেরে , ছোটো কণাটিরে
     তুচ্ছ করিয়া দেখিলে ।
জগতের যত অণু রেণু সব
আপনার মাঝে অচল নীরব
বহিছে একটি চিরগৌরব —
     এ কথা না যদি শিখিলে
জীবনে মরণে ভয়ে ভয়ে তবে
     প্রবাসী ফিরিবে নিখিলে ।
  
ধুলা - সাথে আমি ধুলা হয়ে রব
     সে গৌরবের চরণে ।
ফুলমাঝে আমি হব ফুলদল
     তাঁর পূজারতি - বরণে ।
যেথা যাই আর যেথায় চাহি রে
তিল ঠাঁই নাই তাঁহার বাহিরে ,
প্রবাস কোথাও নাহি রে নাহি রে
 জনমে জনমে মরণে ।
যাহা হই আমি তাই হয়ে রব
     সে গৌরবের চরণে ।
  
ধন্য রে আমি অনন্ত কাল ,
     ধন্য আমার ধরণী ।
ধন্য এ মাটি , ধন্য সুদূর
     তারকা হিরণ - বরনী ।
যেথা আছি আমি আছি তাঁরি দ্বারে ,
নাহি জানি ত্রাণ কেন বল কারে ।
আছে তাঁরি পারে তাঁরি পারাবারে
     বিপুল ভুবনতরণী ।
যা হয়েছি আমি ধন্য হয়েছি ,
     ধন্য এ মোর ধরণী ।