উৎসর্গ/৩৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


আমার খোলা জানালাতে
শব্দবিহীন চরণপাতে
      কে এলে গো , কে গো তুমি এলে ।
একলা আমি বসে আছি
অস্তলোকের কাছাকাছি
      পশ্চিমেতে দুটি নয়ন মেলে ।
অতিসুদূর দীর্ঘ পথে
আকুল তব আঁচল হতে
      আঁধারতলে গন্ধরেখা রাখি
জোনাক - জ্বালা বনের শেষে
কখন এলে দুয়ারদেশে
      শিথিল কেশে ললাটখানি ঢাকি ।
  
তোমার সাথে আমার পাশে
কত গ্রামের নিদ্রা আসে —
      পান্থবিহীন পথের বিজনতা ,
ধূসর আলো কত মাঠের ,
বধূশূন্য কত ঘাটের
      আঁধার কোণে জলের কলকথা ।
শৈলতটের পায়ের'পরে
তরঙ্গদল ঘুমিয়ে পড়ে ,
      স্বপ্ন তারি আনলে বহন করি ।
কত বনের শাখে শাখে
পাখির যে গান সুপ্ত থাকে
      এনেছ তাই মৌন নূপুর ভরি ।
  
মোর ভালে ওই কোমল হস্ত
এনে দেয় গো সূর্য - অস্ত ,
      এনে দেয় গো কাজের অবসান —
সত্যমিথ্যা ভালোমন্দ
সকল সমাপনের ছন্দ ,
      সন্ধ্যানদীর নিঃশেষিত তান ।
আঁচল তব উড়ে এসে
লাগে আমার বক্ষে কেশে ,
      দেহ যেন মিলায় শূন্য ' পরি ,
চক্ষু তব মৃত্যুসম
স্তব্ধ আছে মুখে মম
      কালো আলোয় সর্বহৃদয় ভরি ।
  
যেমনি তব দখিন - পাণি
তুলে নিল প্রদীপখানি ,
      রেখে দিল আমার গৃহকোণে ,
গৃহ আমার এক নিমেষে
ব্যাপ্ত হল তারার দেশে
      তিমিরতটে আলোর উপবনে ।
আজি আমার ঘরের পাশে
গগনপারের কারা আসে
       অঙ্গ তাদের নীলাম্বরে ঢাকি ।
আজি আমার দ্বারের কাছে
অনাদি রাত স্তব্ধ আছে
      তোমার পানে মেলি তাহার আঁখি ।
  
এই মুহূর্তে আধেক ধরা
লয়ে তাহার আঁধার - ভরা
      কত বিরাম , কত গভীর প্রীতি ,
আমার বাতায়নে এসে
দাঁড়ালো আজ দিনের শেষে —
      শোনায় তোমায় গুঞ্জরিত গীতি ।
চক্ষে তব পলক নাহি ,
ধ্রুবতারার দিকে চাহি
      তাকিয়ে আছ নিরুদ্দেশের পানে ।
নীরব দুটি চরণ ফেলে
আঁধার হতে কে গো এলে
 আমার ঘরে আমার গীতে গানে । —
  
কত মাঠের শূন্যপথে ,
কত পুরীর প্রান্ত হতে ,
      কত সিন্ধুবালুর তীরে তীরে ,
কত শান্ত নদীর পারে ,
কত স্তব্ধ গ্রামের ধারে ,
      কত সুপ্ত গৃহদুয়ার ফিরে ,
কত বনের বায়ুর'পরে
এলো চুলের আঘাত করে
      আসিলে আজ হঠাৎ অকারণে ।
বহু দেশের বহু দূরের
বহু দিনের বহু সুরের
      আনিলে গান আমার বাতায়নে ।