উৎসর্গ/৪৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


 আমাদের এই পল্লিখানি পাহাড় দিয়ে ঘেরা ,
            দেবদারুর কুঞ্জে ধেনু চরায় রাখালেরা ।
কোথা হতে চৈত্রমাসে হাঁসের শ্রেণী উড়ে আসে ,
            অঘ্রানেতে আকাশপথে যায় যে তারা কোথা
            আমরা কিছুই জানি নেকো সেই সুদূরের কথা ।
            আমরা জানি গ্রাম ক ' খানি , চিনি দশটি গিরি —
            মা ধরণী রাখেন মোদের কোলের মধ্যে ঘিরি ।
  
            সে ছিল ওই বনের ধারে ভুট্টাখেতের পাশে
            যেখানে ওই ছায়ার তলে জলটি ঝরে আসে ।
ঝর্না হতে আনতে বারি জুটত হোথা অনেক নারী ,
            উঠত কত হাসির ধ্বনি তারি ঘরের দ্বারে —
            সকাল - সাঁঝে আনাগোনা তারি পথের ধারে ।
            মিশত কুলুকুলুধ্বনি তারি দিনের কাজে ,
            ওই রাগিনী পথ হারাত তারি ঘুমের মাঝে ।
  
            সন্ধ্যাবেলায় সন্ন্যাসী এক , বিপুল জটা শিরে ,
            মেঘে - ঢাকা শিখর হতে নেমে এলেন ধীরে ।
বিস্ময়েতে আমরা সবে শুধাই , ‘ তুমি কে গো হবে । '
            বসল যোগী নিরুত্তরে নির্ঝরিণীর কূলে
            নীরবে সেই ঘরের পানে স্থির নয়ন তুলে ।
            অজানা কোন্‌ অমঙ্গলে বক্ষ কাঁপে ডরে —
            রাত্রি হল , ফিরে এলেম যে যার আপন ঘরে ।
  
            পরদিনে প্রভাত হল দেবদারুর বনে ,
            ঝর্নাতলায় আনতে বারি জুটল নারীগণে ।
দুয়ার খোলা দেখে আসি — নাই সে খুশি , নাই সে হাসি ,
            জলশূন্য কলসখানি গড়ায় গৃহতলে ,
            নিব - নিব প্রদীপটি সেই ঘরের কোণে জ্বলে ।
            কোথায় সে যে চলে গেল রাত না পোহাতেই ,
            শূন্য ঘরের দ্বারের কাছে সন্ন্যাসীও নেই ।
চৈত্রমাসে রৌদ্র বাড়ে , বরফ গলে পড়ে —
            ঝর্নাতলায় বসে মোরা কাঁদি তাহার তরে ।
 আজিকে এই তৃষার দিনে কোথায় ফিরে নিঝর বিনে ,
            শুষ্ক কলস ভরে নিতে কোথায় পাবে ধারা ।
           কে জানে সে নিরুদ্দেশে কোথায় হল হারা ।
            কোথাও কিছু আছে কি গো , শুধাই যারে তারে —
            আমাদের এই আকাশ - ঢাকা দশ পাহাড়ের পারে ।
  
            গ্রীষ্মরাতে বাতায়নে বাতাস হু হু করে ,
            বসে আছি প্রদীপ - নেবা তাহার শূন্য ঘরে ।
শুনি বসে দ্বারের কাছে ঝর্না যেন তারেই যাচে —
            বলে , ‘ ওগো , আজকে তোমার নাই কি কোনো তৃষা ।
            জলে তোমার নাই প্রয়োজন , এমন গ্রীষ্মনিশা ? '
            আমিও কেঁদে কেঁদে বলি , ‘ হে অজ্ঞাতচারী ,
           তৃষ্ণা যদি হারাও তবু ভুলো না এই বারি । '
  
           হেনকালে হঠাৎ যেন লাগল চোখে ধাঁধা ,
           চারি দিকে চেয়ে দেখি নাই পাহাড়ের বাধা ।
ওই - যে আসে , কারে দেখি — আমাদের যে ছিল সে কি ।
            ওগো , তুমি কেমন আছ , আছ মনের সুখে ?
            খোলা আকাশতলে হেথা ঘর কোথা কোন্‌ মুখে ?
            নাইকো পাহাড় , কোনোখানে ঝর্না নাহি ঝরে ,
            তৃষ্ণা পেলে কোথায় যাবে বারিপানের তরে ?
  
            সে কহিল , ‘ যে ঝর্না বয় সেথা মোদের দ্বারে ,
            নদী হয়ে সেই চলেছে হেথা উদার ধারে ।
 সে আকাশ সেই পাহাড় ছেড়ে সীম - পানে গেছে বেড়ে
          সেই ধরারেই নাইকো হেথা পাষাণ - বাঁধা বেঁধে । '
        ‘ সবই আছে , আমরা তো নেই ' কইনু তারে কেঁদে ।
           সে কহিল করুণ হেসে , ‘ আছ হৃদয়মূলে । '
            স্বপন ভেঙে চেয়ে দেখি আছি ঝর্নাকূলে ।