ঊর্ম্মিমুখর

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

অনেকদিন এবার গ্রামে আসি নি। প্রায় মাস-তিনেক হোল । এবার দেশে গরমও খব। একটুকু বটি নেই কোনদিকে । দাপরের দিকে হাওয়া যেন আগমনের হল্যকার মত লাগে । এবার গ্রামে এসে আমাদের ঘাটে নাইতে গিয়ে দেখি সলতেখাগী আমগাছটা ঝড়ে ভেঙে গিয়েচে । অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কতক্ষণ। সলতেখাগী ঝড়ে ভেঙে গেল ! ও যে আমার জীবনের সঙ্গে বড় জড়ানো নানাদিক থেকে । ওরই তলায় সেই ময়না-কাঁটার ঝোপটা, যার সঙ্গে আবাল্য কত মধর সম্মবন্ধ । সলতেখাগীর সঙ্গে আর দেখা হবে না। ওকে কেটে নিয়ে জবালানী করবে এবার হাজারী কাকা । সত্যিই আমার চোখে জল এল । যেন অতি আপনার নিকট আত্মীয়ের বিয়োগ অনুভব করলাম । গাছপালাকে সবাই চেনে না । এতদিনের সলতেখাগী যে ভেঙে গেল, তা নিয়ে আমাদের পাড়ার লোকের মুখে কোনো দুঃখ করতে শুনি নি । পথের পাঁচালীতে সলতেখাগীর কথা লিখেচি ৷ লোকে হযতো মনে রাখবে ওকে কিছুদিন । খকদের কাল আসবার কথা গিয়েচে দু-ধার থেকে । আজও এল না, বোধহয় আবার জবর হয়ে থাকবে । অাজ বিকেলে বেলেডাঙার পথে বেড়াতে বার হয়েচি, পথে গিয়ে বসেচি গঙ্গাচরণের দোকানে, কবিরাজ মশায়ের সঙ্গে গল্পসল্প করচি, এমন সময়ে কি মেঘ করে এল সন্দরপরের দিক থেকে ! গঙ্গাচরণ বললে, খুব ব্যটি এলু, আমি ওর দোকান থেকে বার হয়ে যেমন এসে বাঁওড়ের ধারের পথে পা দিয়েচি, অমনি বেলেডাঙার ওপারের বাঁশ বনের মাথার ওপর কালবৈশাখীর মেঘের নীল নিবিড় রপে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম । কোথা থেকে আবার একসারি বক সেই সময় নীল মেঘের কোলে কোলে উড়ে চলেচে—সে কি অপরাপ রচনা ! এদিকে মনে ভয় হচ্চে যে তাড়াতাড়ি গাঁয়ে ফিরতে হবে, ঝড় মাথায় মাঠের মধ্যে থাকা ভাল নয়, অথচ যাবো তার সাধি কি ! পা কি নাড়াতে পারি ? তারপর সোঁদালী ফুলের-ঝাড়দোলা বনের ধার দিয়ে ছটতে ছুটতে এসে পৌঁছলাম আমাদের ঘাটে । সেখানে স্নান করে যখন আমাদের গয়াতেলির তলা দিয়ে যাচ্চি—হজরী জেলেনী সেখানে আম কুড়চ্চে --বড় চারার তলাতেও রথযাত্রার ভিড় । বটি এল দেখে পালিয়ে বাড়ি এসে ঢুকলাম । সলতেখাগী আমগাছটা একেবারে কেটে ফেলে করাতীর দল তক্তা তৈরী করচে । হাজারী ঘোষ রোডসেস নীলামে বাগান কিনেচে—ওই এখন তো কত্তা । ও কি জানে সলতেখাগীর সঙ্গে আমার বাল্যজীবনের কি সম্পক । কাল বিকেলে গোপালনগরে গিয়ে হাজারীর বৈঠকখানায় অনেকক্ষণ বসে ছিলাম। তার মেয়ের বিয়ে হবে, সেখানে ফন্দ" ইত্যাদি করা হচ্চে, সকলে খুব ব্যস্ত। এমন সময়ে অনেকদিন আগেকার দেখা সেই ভদ্রলোকটি, হলদিবাড়িতে যাঁর পাটের ব্যবসা ছিল, তিনি এলেন । আজ প্রায় পনেরো বছর তাঁর সঙ্গে দেখা হয় নি । আমি যখন কলেজে পড়তুম—ইনি তখন এই গ্রীমের বন্ধের সময়ই মাঝে মাঝে এখানে আসতেন । মতি দায়ের দোকানের বাইরের বারান্দায় বসে এর সঙ্গে কত কি আলাপ হোত । তখন এ’র বয়স ছিল পঞ্চাশ, এখন পয়ষট্টি। কিস্ত তখন ইনি বিদ্যোৎসাহী ছিলেন, ঘোর তাকি'ক ছিলেন, অনেক ব্যাপারের খোঁজখবর রাখতেন। এখন হয়ে পড়েচেন একেবারে অন্য রকম । আর কিছুতে উৎসাহ বি. র. (৩য়)—২৭ 8ՏԵ বিভূতি-রচনাবলী নেই, নানারকম বাতিকগ্রস্ত হয়ে উঠেচেন । একটা প্রধান বাতিক তার মধ্যে এই দেখলাম ষে ও'র বিশ্বাস, ওর শরীর খারাপ হয়ে গিয়েচে আর সারবে না। আমি কত বোঝালম, বললাম, "আপনার বয়েস হয়েচে, তার তুলনায় আপনার শরীর ঢের ভাল। কেন মিছে ভাবচেন ?" ভদ্রলোকের ছেলে আমার সঙ্গে গোপালনগর স্কুলে পড়তো অনেক দিন আগে । সে ছেলেটি শুনেচি মারা গিয়েচে । আমি সে কথা জিজ্ঞোস করিনি । ভদ্রলোক আমার সঙ্গে খানিকদরে এলেন । আমি তাঁকে বোঝাতে বোঝাতে এলমে । তুততলায় কুলের কাছে তিনি চলে গেলেন। সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হয়েচে, মাথার ওপর বশ্চিক উঠেচে, জল জল করচে নক্ষত্রগুলো—বাঁওড়ের মাথার ওপরে উঠেচে সপ্তষি" । এতক্ষণ বিয়ের বড়লোকী-ফদ রুপ বন্ধ হাওয়ার মধ্যে থেকে মনটা হাঁপিয়ে উঠেছিল, এইবার এসে আকাশের দিকে মুক্ত বহদের নাক্ষত্রিক জগতের দিকে সেটা ছড়িয়ে দিয়ে বাঁচলুম। হাট থেকে এসে কুঠীর মাঠে বেড়াতে গেলাম। বেলা খাব পড়ে গিয়েছে। আমাদের দেশে গ্রীষ্মকালের নিমোঘ অপরাহ্লের শোভা এত সন্দের যে যার অভিজ্ঞতা নেই তাকে ঠিক বোঝানো যাবে না। এই অপরাপ সৌন্দয্যলোকের মধ্যে বসে কত কথাই মনে আসে । g হাজার বছর কেটে যাবে—এই রঙীন মেঘমালা, এই গায়কপাখীর দল, এই সব নরনারী, গাছপালা-কোথায় ভেসে যাবে কালস্রোতে ; কিন্ত মানুষ তখন থাকবে । নতুন ধরনের কি রকম মানুষ আসবে, কি রকম হবে তাদের সভ্যতা, কি জ্ঞানের আলো তারা পথিবীতে জেলে দেবে—এই সব ভাবি ৷ নদীতে স্নান করতে নেমেচি, পটি দিদি তখনও ঘাটে । বশ্চিক রাশির একটা নক্ষত্র খুব জৰল জল করচে। নদীর ওপারে সইি বাবলা গাছগুলোতে অস্তদিগন্তের রঙীন মায়া-আলো পড়েচে । সারা রাত কাল আম কুড়িয়েচে লোকে লন্ঠন ধরে । আমার মাঝে মাঝে ঘাম ভাঙে, মাঝে মাঝে দেখি সবাই আম কুড়চ্চে । কাল কর্ণার সঙ্গে আকাইপরে গেলাম যেমন প্রতি বৎসর যাই । কর্ণার মায়ের মুখে সেখানের গল্প শুনে বড় তৃপ্তি পাই । সহায়হরি ডাক্তারের দ্বিতীয় বিবাহের কথা আবার শনলাম । সে এক করণ কাহিনী । তারপর শুনলাম মধ: মনুখুয্যে ও প্রেমচাঁদ মনুখুয্যের বাড়ির ডাকাতির গল্প। এ গল্প অবিশ্যি আমি ছেলেবেলায় শুনেচি, তবুও আবার ভাল করে শুনলাম। কর্ণাদের বাড়ির অতিথি-সেবা ও তার বাপের টাকা ওড়ার গল্প বড় মজার । টাকা আদায় করে নিয়ে আসছিল গোমস্তা । ২৫o টাকার হিসাব দিলে না । বললে, কত্তা মশায়, মাঠে ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল, টাকাগুলো উড়ে গিয়েচে, আর পেলাম না । ওর বাবা তাদের রেহাই দিলেন। মরবার আগে সবাইকে ডেকে বন্ধকী খত ছিড়ে ফেললেন । ও'র ছেলেরা কার নামে নালিশ কত্তে যাচ্ছিল, কর্ণার মা বললেন—শোন, তা তো হবে না, কত্তা বারণ করে গিয়েচেন মরবার সময়ে। ওদের পীড়ন করতে পারবে না। যা দেয় নাও গে বাও । f একদিকে যেমন কর্ণার বাবা, অন্যদিকে তেমনি সহায়হাঁর ডাক্তার। সহায়হরির মত অথপিশাচ মানুষ পাড়াগাঁয়ে বেশী নেই। খতে টাকা উশল দিয়ে নেয় না, অথচ আদায়ী টাকার জন্যে খাতকের নামে নালিশ করে । চকুবধি হারের সদের এক আধলা রেহাই দেবে না খাতককে । উমি্মখের 8sపీ বিকেলে একটু মেঘ করেছিল। গঙ্গাচরণের দোকানে কবিরাজ মশাইয়ের সঙ্গে গল্প করছিলাম। আমি বললাম—কি রাঁধলেন, কবিরাজ মশাই ?—কণ্টিকারীর ফল ভাজা আর ভাত । এই কবিরাজটি বড় অদ্ভুত মানুষ । বয়স প্রায় সত্তর হবে, কিন্ত সদানন্দ, মক্তপ্রাণ লোক। কোন দেশ থেকে এদেশে এসেচে কেউ জানে না । বিশেষ কিছু হয় না এই অঞ্জ পাড়াগাঁয়ে। তবুও আছে, বলে—এদেশের ওপর মায়া বসে গিয়েচে । সেদিলি ফুল দিয়ে একটা বালিশ তৈরী করেচে, সেই মাথায় দিয়ে শয়ে থাকে। 源 酸 একটু পরে ঘন মেঘ করে এল। বেলেডাঙার ওপারে বাঁশবনের মাথার ওপরকার আকাশে যে কি সুনীল নিবিড় মেঘসঞ্জা ! মেঘের কোলে আবার একসারি বক উড়ল । কি রপ যে হোল, আমি বন্টির ভয়ে পালাচ্ছিল,ম, কিন্ত সৌন্দৰ্য্য দেখে আর নড়তে পারি নে। কে একটি মেয়ে নদীর এপারে কালো চুলের রাশি খুলে দাঁড়িয়ে আছে । কি চমৎকার ছবিটি । আজ বেশ মনের আনন্দ নিয়েই সকলে সকাল বেলডাঙা গিয়েছিলাম। তখনও চারটের গাড়ি যায় নি । গঙ্গাচরণের দোকান খোলে নি । আইনন্দির বাড়িতে তেল-পড়া নেবার জন্যে পাঁচী পাঠিয়েছিল আবার সঙ্গে জগোকে ও বধোকে। আইনন্দির বাড়িতে ছেলেবেলাতে একবার গিয়েছিলাম, ওর ছেলে আহাদ মণ্ডল তখন বেচে ছিল। আইনন্দির বাড়িটা কি চমৎকার হানে ! সেখান থেকে দুরের মেঘভরা আকাশের নীচে প্রাচীন বট অশ্বখের সারি কি অদ্ভুত দেখাচ্ছিল । আইনন্দি চকমকি ঠুকে সোলা ধরিয়ে তামাক সাজলে ও একটা সোলা ফুটো করে আমায় তামাক খেতে দিলে । তারপর সে কত গল্প করলে বসে বসে। ১২৯২ সালে সে প্রথম এদেশে এসে বাস করে। তখন তার বয়েস বিয়াল্লিশ বছর। সে বছর বন্যার জল উঠেছিল তার উঠোনে । মরা গাঙ তখন ইছামতী ছিল, একথা কাল মতি মণ্ডল ওজলের ওপর দাঁড়িয়ে আমায় বলেছিল। আইনদি বললে—বন্ড ফুত্তি করেচি মশাই, যাত্রার দলে গাওনা করেচি, বহরপী সেজেচি, বেহালা বাজিয়েচি । আপনাদের শাস্তরটা খুব পড়েচি। ধরো গিয়ে বেরষোকেতু, সীতার বনবাস, বিদ্যেসন্দর সব আমার মুখস্ত। তারপর সে বিদ্যাসন্দর’ থেকে খানিকটা মুখসহ বলে গেল। মহাভারত থেকে দাতাকণ” খানিকটা বললে । এখন ওর বয়েস নব্বইয়ের কাছাকাছি, এই বয়সেও সে নিজে চাষবাস দেখে । সে হিসাবে আমি তো এখন নব্য যুবক । আমার সামনে এখন কত সময় পড়ে আছে । মনে করলে কত কাজ করতে পারি। কাল মতি মণ্ডলকে ঘনি তুলতে দেখেও ঠিক এই কথাই মনে হয়েছিল । আইনন্দির বাড়ি থেকে সন্দরপরের পথে খানিকটা বেড়াতে গেলাম। মরাগাঙের বাঁকে দাঁড়িয়ে আরামডাঙার ওপারের চক্লাকার আকাশের নীলমেঘের সহজার দশ্য যেন মনকে কতদরে কোথায় নিয়ে গিয়ে ফেলেছিল । 曼 পথে আসতে আসতে একটা করণে দশ্য দেখে সন্ধ্যাবেলাটা মন বড় খারাপ হয়ে গেল । গোয়ালাদের একটা ছোট মেয়েকে তার মা ঘরের উঠোনে এমন নিষ্ঠুরভাবে মারচে, আর মেয়েটা কাঁদচে । আহা, নিজের সস্তানের ওপর অত নিষ্ঠুরভাবে হাত ওঠায় কি করে তাই ভাবি ! কি করবো, আমার কিছই করবার নেই। এদিকে বণ্টি পড়চে টিপ টপ করে, সঙ্গে দটো ছোট ছোট ছেলে, তাড়াতাড়ি কুঠীর মাঠের বনের পথ দিয়ে আমাদের আর বছরের চড়ুইভাতির জায়গাটা বধোকে আর জগোকে একবার দেখিয়ে—তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এলমে । 8నీO বিভূতি রচনাবলী আজ দিনটা মেঘে মেঘে কেটেচে । কিন্তু সকালবেলায় একটু সয্যের মুখ দেখে ছিলাম । মেঘ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল। দুপুরে ঘামচ্চি, জগো এসে ওঠালে। একটু পরে খুকুও এল । জানলার গরাদটা ধরে দাঁড়িয়ে তার নানা গল্প। তার মাথা নেই, লেখাপড়া কি করে হবে-এই সব কথা । আমার কৰ্ত্তব্য হিসাবে তাকে যথেষ্ট আশ্বাস দিলাম। তারপর পাঁচীকে আর ওকে রোয়াকে বসে সয*্য ও গ্রহনক্ষত্র সম্বন্ধে অনেক কথা বললাম । খন্ধুে বেশ আগ্রহের সঙ্গে শনলে । বললে, এ আমার বেশ ভাল লাগে। সদ্য" সম্বন্ধে কিছুই জানতুম না। আরও বলবেন একদিন । তারপর আমি বেলেডাঙ্গার মাঠে বেড়াতে বার হোলাম। কি সুন্দর বিকেলটা আজ ! ঠান্ডা অথচ পথঘাট শকনো খটখট করচে । মাঠের গাছপালাতে সোনালী রোদ পড়েচে । কুঠীর মাঠে যেতে যেতে প্রত্যেক সোদালি গাছ, ঝোপঝাপ, বাঁশবন আমার মনে গভীর আনন্দের সঞ্চার করেচে। নতজান হয়ে ভগবানের কাছে তাই মনের আনন্দ জানালাম । কুঠীর মাঠে ঘাসের ওপর এখনও জল বেধে আছে । কবিরাজ ও গঙ্গাচরণ পথের ধারে মাদর পেতে বট অশ্বখের ছায়ায় বসে গল্প করচে । কাপড় কেটে কবিরাজ নিজেই জামা সেলাই করচে। শুকনো ভেষজ পাতালতা কলকাতায় চালান দেবে, তারই মতলব অটিচে । বড় ভাল লাগল বিশেয় করে আজ ওদের গল্পসল্প । আসবার সময় ছাতা নিয়ে এলাম, তখন রাত হয়ে গিয়েচে, আমাদের ঘাটে যখন নাইতে নেমেচি, আকাশে অনেক নক্ষত্র উঠেচে । ক-দিন মনে কেমন একটা অপৰব* আনন্দ । বিশেষ করে যখনই কুঠীর মাঠে যাবার সময় হয়, তখনই সেটা বিশেষ করে হয় । কাল যখন বিকেলে ঘন নীলকৃষ্ণ মেঘ করল, তার কোলে বক উড়ল, তখন আমি সেদিকে চেয়ে এক জায়গায় বসে আছি। আবার যখন পলের রেলিং ধরে উঠে দাঁড়াই অন্ত-আকাশের পটভূমিতে সবুজ বাঁশবনের দিকে চেয়ে থাকি, তখন আমি যেন শত যুগজীবী অমর আত্মা হয়ে যাই—সেদিন যেমন হয়েছিল, আজও তাই হোল । বেলেডাঙার ওদিকে মোড় থেকে চক্ৰাকৃতি দিগনলয়লীন শ্যাম বেণীবনের অপৰব শোভায় মেঘধসর আকাশতলে মন এক অপর্বে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠল । যখন এই শুকনো মরাগাঙে আবার ইছামতী বইবে, তখন আমি কোন নক্ষত্রে রইবো—কত কাল পরে—কে জানে সে খবর ? বাবলার সোনালী ফুল দোলানো গাছের তলা দিয়ে সেই পথ । ভাবতে ভাবতে চলে এলাম। পলের ওপর খানিকটা দাঁড়াই । সেই কত কালের প্রাচীন বট অশ্বথ, কত কালের আইনন্দি মণ্ডলের বাড়ি ও বশিবনের সারি। মনে এ কয়দিনই সেই অপব অনভূতিটা আছে ৷ পলের পাশে একটা হেলা বাবলা গাছে ফুলের কি বাহার । যখন নদীর ঘাটে এসে নামলম স্নান করতে তখন অন্ধকার হয়ে গিয়েচে । মেঘাচ্ছন্ন আকাশে শুধ বশ্চিকের একটা নক্ষত্র অস্পষ্টভাবে জলচে। মাথার ওপর দাতিলোক, চারিদিকে নীরব অন্ধকার, নদীজল ও গাছপালার দিকে চেয়ে মনে যে ভাব এল, তা মানুষকে অমরতার দিকে নিয়ে যায় । বড়ো ছকু পাড়ই এই সময় তার স্ত্রী আদাড়িকে সঙ্গে করে নদীতে গা ধতে এল । সে অন্ধকারে চোখে দেখতে পাবে না বলে শত্রী ওর সঙ্গে এসেচে । সকালে উঠে কুঠীর মাঠে বেড়াতে গিয়ে আজ বড় আনন্দ পেলাম। দুপুরে পাটশিমলে রওনা হওয়া গেল পায়ে হেটে । কবিরাজ মশায় পাঠশালায় ছেলে পড়াচ্চেন, তাঁর কাছে বসে একটু গল্প করে বট অশ্বখের ছায়াভরা পথ দিয়ে মোল্লাহাটির খেয়া ঘাটে গিয়ে পার ছলাম। কেউটে পাড়ার কাছে গিয়েচি, এক জায়গায় অনেকগুলো বেলগাছ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে । উমি্মখের ৪২১ সেখানে বড় বটি এল । পবেদিকের আকাশ বস্টিধোয়া, নীল, পরিৎকার সেই ইন্দ্র নীল রংএর আকাশের পটভূমিতে দরে গ্রামের তাল খেজুরের সারি, বশিবনের শীষ", কি চমৎকার দেখাচ্চে। আর এদিকে ঘন কালো বর্ষার মেঘ জমেচে । গোবরাপরের মোড় বেকে কু"দীপরের বাঁওড়ের ওপারের রানীনগর বলে ছোট একটা চাষা-গাঁয়ের দশ্য ঠিক যেন ছবির মত। এখানে একজন বন্ধাকে পথ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন—তোমার নাম বিভুতি ? সাতবেড়েতে একবার গিয়েছিলে না ? আমি বললাম—হ’্যা । আপনি কি করে চিনলেন ? তিনি নিজের পরিচয় দিলেন না। গোবরাপরের একটা দোকানে মণীন্দ্র চাটুয্যের ভট্টাচায্যির সঙ্গে দেখা। সেখানে বসে একটু গল্প করেই আবার পথে বেরিয়ে পড়ি । কি ঘন বন পথের দ-ধারে । বড় বড় লতা কালো কালো গাছের গড়ির গায়ে উঠেচে—এই কয়দিনের ব্যষ্টিতেই গাছের তলায় বনের ছোট ছোট গাছপালার জঙ্গল বেধে গিয়েচে । 'বেী-কথা-কও ডাকচে চারিধারে । কেউটে পাড়ার গায়ে পথের ধারের একটা সোঁদালি ফুল গাছে এই আষাঢ় মাসের প্রায় মাঝামাঝি সময়েও অজস্র ফুল দেখেছি। পাটশিমলের মধ্যে কি ভীষণ tropical forest-এর রাজত্ব ! ছোট ছোট জাম ফলে আছে বনো জামগাছে—বড় বড় লতা-বনের মধ্যেটা মিশ-কালো। পাটশিমলের মোহিনী কাকার সঙ্গে বাঁওড়ের ওপারে একটা চাষাগাঁয়ে দেখা হোল । তিনি আমার সঙ্গে গেলেন প্রায় বাগান গাঁ পর্যন্ত । পিসিমার বাড়ি গেলাম তখন সন্ধ্যা হয়েচে । পিসিমার সঙ্গে অনেকদিন পরে দেখা । দু-জনে অনেক রাত পৰ্য্যস্ত গল্পগজব করা গেল। সকালে কোদলার জলে নাইতে দিয়ে দেখি যে টলটলে জল আর নেই নদীর—কচুরি পানায় নদী মজে গিয়েচে, জল রাঙা, ঘোলা—সেইটুকু জলে সব লোকে নাইচে, গোর বাছরের গা ধোয়াচ্চে । পরদিন সকালে খাওয়া দাওয়া করে বটি মাথায় আবার বাড়ি রওনা হই । সারাপথটা বষ আর বাদলা—কিন্ত খুব ঠাণডা দিনটা । আমার সেই ঘন বন—পাটশিমলে থেকে গোবরাপরের পথে দু-জন চাষা লোকের সঙ্গে গল্প করতে করতে এলাম। আবার সেই ঘন tropical forest-এর মত বন, বড় বড় কাছির মত লতা—পথ নিষ্ঠজন, টুপটাপ করে জল ঝরে পড়ছে গাছের মাথা থেকে, আরণ্যশোভা কি অদ্ভুত । রানীনগরের এপারে একটা সাঁকোর ওপর কতক্ষণ বসে বসে নীল আকাশের পটভূমিতে অাঁকা গ্রামসীমার বাঁশবনের দিকে চেয়ে রইলাম। মোল্লাহাটির ঘাট যখন পার হই, তখনও খুব বেলা আছে । আজ মোল্লাহাটির হাটবার, হাটে গিয়ে একটা আনারসের দর করলাম। সুন্দরপরের গোয়ালাদের একটা ছেলের সঙ্গে দেখা হোল। মনে পড়ছিল আজ ওবেলা যখন আসছিলাম পাটশিমলের ঘন ক্ষদে জামবনের মধ্যের সেই পথটা দিয়ে—মনে হচ্ছিল আমি একজন বন্ধনহীন মন্ত পথিক, দেশে দেশে এই অপােব রপলোকের মধ্যে দিয়ে বেড়িয়ে বেড়ানোই আমার জীবনের পেশা। কি আনন্দ যে হয়েছিল, কি অপব পালক, মন্তির সে কি অম,তময়ী বাণী ! কেন মানুষে ঘরে থাকে তাই ভাবি । আর কেনই বা পয়সা খরচ করে মোটরে কি রেলের গাড়িতে বেড়ায় ? পায়ে হেটে পথ চলার মত আনন্দ কিসে আছে ? সে একমাত্র আছে ঘোড়ায় চড়ে বেড়ালে । ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে ঘোড়ায় চড়ার আনন্দ আমি জানি । তার সঙ্গে কিছরই তুলনা হয় না । - মোল্লাহাটির হাট ছাড়িয়েচি, পথে আমাদের গায়ের গণেশ মচি নকফুল গ্রামে ছেলের বিয়ের সম্বন্ধ করতে যাচ্চে । ওকে দেখে বড় আনন্দ হয়—শাস্ত, সরল, সাধপ্রেকৃতির লোক বলে বাল্যকাল থেকে ওকে আপনার-জনের মত দেখি । বেলা যাব-যাব হয়েচে দেখে একটু জোর-পায়ে পথ হাঁটতে শুরু করলাম। খুব রাঙা রোদ উঠেচে চারি ধারে । খাবরাপোতা ছাড়লাম, সামনে আইনন্দির বাড়ির পেছনের ৪২২ বিভূতি-রচনাবলী প্রাচীন বটগাছটা, আইনন্দির বাড়ির মোড় থেকে দেখতে পাওয়া সেই দরপ্রসারীদিগনলয়— আজ আবার মেঘভাঙা রাঙা অস্ত সমযে’র রোদ পড়েচে দরের সেই সব বাঁশবন, শিমলবনের মাথায়, ঝিঙে খেতে ফুল ফুটেচে, বৈশাখের গায়ক পাখী পাপিয়া আর 'বেী-কথা-কও’ চারিদিকে ডাকচে, বেলেডাঙার হাজারী ঘোষ গোরর পাল নিয়ে নতিডাঙার খড়ের মাঠ থেকে বাড়ি ফিরচে, মেয়েরা মরগাঙের ঘাট থেকে কলসী করে জল নিয়ে যাচ্চে,—কি সন্দের শাস্ত গ্রাম্য দশ্য, একবার মনে হ’ল পাটশিমলের সেই কালীবাড়ি ও দেবোত্তর বশিঝাড়ের কথা । আজ দােপর বেলা সেখানে ছিলাম, কালীবাড়ির পেছনের এক গহসেহর বাড়ির বেী প্রতিবেশিনীকে ডেকে বলছিল—ও সেজ বোঁ, একটু তরকারী দেবো, খাকীকে দিয়ে বাটি পাঠিয়ে দ্যাও তো ! সন্ধ্যার আগে কতদরে এসে গিয়েচি ৷ সন্ধ্যাও হল, বাড়ি এসে পা দিলাম, আমার পথ চলাও ফুরলে ৷ আজ শরতের অপব দাপরে পাগল করেচে আমায়। অনেক দিন লিখি নি—নানা গোলমালে অবসাদে মনটা ভাল ছিল না—আজ রবিবার দিনটা দাপরে একটু ঘুমিয়ে উঠেচি —কি পরিপণ ঝলমলে শরতের দাপরে। এর সঙ্গে জীবনের কি যে একটা বড় যোগ আছে— ভাদমাসের এই রোদভরা দােপর কেন যে আমায় পাগল করে তোলে । বনে বনে মটরলতার কথা মনে পড়ে, ইছামতীর ঘোলা জল, পাখীর ডাক—মনটা যেন কোথায় টেনে নিয়ে যায় ! সব কথা প্রকাশ করা যায় না—কারণ আনন্দের সবটা কারণ আমারই কি জানা আছে ? কি করচে খকু এই শরৎ দপরে, বকুলতলায় ছায়ায় ছায়ায়, একথাও মনে এসেছে। ওর কথা ভেবে কষ্ট হয় যে, ওর লেখাপড়া হ’ল না। কাল দিনটি বড় সদর কেটেচে, তাই আজ মনে হচ্চে আজ সকালটিও বড় চমৎকার । অনেকদিন কলকাতায় একঘেয়ে জীবনযাত্রার পরে কাল বাড়ি গিয়েছিলাম। প্রথমেই তো খয়রামারি মাঠে দর্পরের রোদে বেড়াতে গিয়ে সবুজ গাছপালা লতাপাতার গন্ধে নতুন জীবন অনুভব করলাম। হাওয়াতেও একটা তাজা গন্ধ আছে যা কিন্ত শহরে নেই। ঝোপে থোলো থোলো মাখম শিমের নীলফুল ফুটেচে, মটরলতার সবুজ ফল ও সৌদালি গাছের কাঁচা সীটি বন-জঙ্গলের শোভা কত বাড়িয়েচে—তাদের ওপর আছে শরতের মেঘমুক্ত সনীল আকাশ, আর আছে তপ্ত সযf্যালোক। প্রতিবারই দেখোঁচ নতুন যখন কলকাতা থেকে আসি এমন একটা আনন্দ পাই । মনে হয় এই তো নীলাকাশ আছে মাথার ওপর, চারিপাশে বেটন করে রয়েছে ঘন সবুজ গাছপালার ঝোপ, পাখীর ডাক আছে, বনফুলের দলনিও আছে—এ থেকে তো এতই আনন্দ পাচ্চি—তবে কেন মিথ্যে পয়সা খরচ করে দরে যাই । দর আমায় কি দেবে, এমন কি দেবে যা এখানে আমি পাচ্চি নে ? আসল কথা দরও কিছ নয়, নিকটও কিছ নয়—প্রকৃতি থেকে আনন্দ সংগ্রহ করবার মত মনের অবস্হা তৈরী হয়ে যদি বায় তবে যে কোনো জায়গায় বসে দটো গাছপালা, একটুখানি সবুজ ঘাসে ভরা মাঠ, দটো বন্য পক্ষীর কলকাকলী, বনফুলের শোভাতেই পরিপণ আনন্দ লাভ করা যায়। কাল বারাকপরে গেলাম সকাল বেলা। দপরে ইছামতীতে স্নান করতে গিয়ে সত্যি বড় আনন্দ পেয়েচি। কুলে কুলে ভরা নদী, দু-ধারে অজস্র কাশফুল, আরও কত কি লতা ঝোপ, বর্ষার জলে সব ঘনসবজে-চকচক করচে কালো কচুর পাতা, মাখম শিমের নীল ফুল ফুটেচে—একটা গাছে সাদা সাদা বড় বড় ঢোল-কলমীর ফুলও দেখলাম । উমি্মখের 8షిరి বৈকালে যখন, খরকু, আমি আর কালো নৌকোতে বনগ্রামে আসি, তখনও দেখলাম দধারে গাছপালার কি অপরপে রপে, বনের ফুলের কি শোভা । ছকু মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম-ওটা কি ফুল ছকু ? ছকু বললে—কোয়ারা--- খন্ধুেকে কাশফুল দিয়ে একটা বাংলা সেটেন্স তৈরী করতে দিলাম । রাঙা-রোদ বৈকালটি মেঘমুক্ত আকাশে, নদীতীরে অপদেব" শোভা বিস্তার করচে । কাল রাত্রের ট্রেনে তারাভরা আকাশের তলা দিয়ে যখন এলমে, সেও বেশ লাগছিল । আজ স্কুলের ছয়টি হবে । সুন্দর প্রভাতটি । 觀 আজ সকালটি বড় সন্দের । গয়া নদীতে হাতমুখ ধয়ে এসে বটতলায় এসেচি—দরে সবুজ পাহাড়শ্রেণী—সকালের হাওয়ায় একটু যেন শীতের আমেজ। কাল ঘন জঙ্গলের পথে আমরা অনেকদরে গিয়েছিলাম, পথে পড়ল দখোনা সাঁওতালী গ্রাম । বরমডেরা কুলামাতো । আর বছর যে রাস্তা ধরে সাটকিটা গ্রামে যাই, এবার সে রাস্তায় না গিয়ে চললাম সোঝা ধনঝরি পাহাড়ের দিকে । বামে সিদ্ধেশ্বর ভুংরি । সামনে ডাইনে পিছনে চারিদিকেই পাহাড় । নীলঝরণার ওদিকের পাহাড়ের বড় বড় সামনের চাইগলি নীল আকাশের পটভূমিতে লেখা আছে । ছোট একটি পাহাড়ী ঝরনা এক জায়গায়। ঝরনা পার হয়ে দু-ধারে শাল, মহীয়া, তমালের বন, বনো শিউলি গাছও আছে । একটা ভাল জায়গা দেখে নিয়ে আমরা চা খাবো ঠিক করলাম। বন সামনের দিকে ক্রমেই ঘন হচ্চে, ক্ৰমে একধারে উচু পাহাড়ের দেওয়াল, বড় বড় বনের গাছে ভরা, আর বা দিকে অনেক নিচে একটা ঝরণা বয়ে যাচ্চে ঘন-সন্নিবিষ্ট গাছপালার মধ্য দিয়ে। আমরা দরে থেকে ওর জলের শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম। সবাই মিলে নেমে গিয়ে বড় বড় গাছ ও মোটা কাছির মত লতা দিয়ে তৈরী প্রকৃতির একটি ছায়াশীতল ঘন কুঞ্জবনে একখানা বড় চৌরস কালো শিলাখণ্ডের ওপর দিয়ে বসে চা পান করা গেল । টাঙি হাতে একজন সাঁওতাল জঙ্গলে কাঠ কাটতে যাচ্ছে, বললে—বেশী দেরি করবেন না, একটু পরে এখানে বনো হাতী জল খেতে নামবে । গাছপালার মাথায় মাথায় শরতের অপরাহের রাঙা রোদ ৷ সামনে পেছনে বড় বড় পাথর, একথানার ওপর আর একখানা আকাশের দিকে ঠেলে উঠেচে–ওদিকে আরও ঘন জঙ্গলের দিকে ঝরনার পথ ধরে খানিকটা বেড়িয়েও এলমে । বেলা পড়লে রওনা হয়ে ছায়াভরা পান্বত্যপথে হেটে আমরা এলমে নীলঝরনার উপত্যকার মুখ পয্যন্ত । ডাইনে সিদ্ধেশ্বর ভুংরি মাথা খাড়া করে আছে। আশেপাশের বন্য সৌন্দয্য সন্ধ্যার ছায়ায় আরও সন্দেরতর হয়েচে—সেইদিনই যে সদরে পথে ইছামতীতে আসবার সময় আমাদের ভিটেটাতে গিয়ে মায়ের কড়াখানা দেখেছিলাম—সে কথা মনে পড়চে । নীরদবাব ও আমি নীল ঝরনা বেড়িয়ে অনেক রাত্রে বাংলোতে ফিরি। সকালে উঠে সবণরেখার পলের ধারে মাছ কিনতে এলমে । সকালটি বড় চমৎকার, নিমে'ব নীল আকাশের দিকে চাইলে কত কালের কত সব কথা যেন মনে পড়ে। পল থেকে চারি ধারে চেয়ে দেখি মাছ বা জলের সম্পকও নেই কোনো ধারে। নিচে নেমে ছায়ায় একটা শিলাখণ্ডে অনেকক্ষণ বসে রইলাম—ভাবচি সপ্রভার পত্রের আজ একটা উত্তর দেব । ওখান থেকে ফিরে এসে বাংলোর পেছনে যে পাহাড়ী নদী—তাতে নাইতে গেলাম আমি আর শঙ্কর। সন্দের নদীর ঘাটটি, পাথর একখানা বড় ঘাটে ফেলা আছে, জলের ধারে একটা অবখ গাছের নীচে জলজলিলি ফুটে । সামনে থৈ থৈ করচে পাহাড়শ্রেণী, ঘন সবুজ তার সানদেশ । দরে Governor's pool-এর কাছে একটা গাছের অাঁকাবাঁকা মাথা সবুজ পাহাড়ী ঢালর পটভূমিকে দেখা যায়। এ ক-দিনের প্রখর সন্যালোক আর বছরের এ সময়ের বর্ষা-বাদলের 8R8 বিভূতি-রচনাবলী কথা মনে করিয়ে দেয়-সযেf্যর আলো না থাকলে এসব পাহাড় শ্রেণী, এ পাহাড়ী নদী, এই গাছপালা—এই প্রসারতা এত ভাল লাগত ? এই এখন বসে আছি বাংলোর বারান্দাতে, দুরে দরে কালাঝোর ও অন্যান্য পাহাড় শ্রেণী অপরাহ্লের পড়ন্ত রোদে কি সুন্দরই না দেখাচ্চে । দুপুরে মহলিয়ার পোস্ট মাস্টার এসেছিল, কেট আবার এসেছিল—ওরা বললে সেদিন যে হাতীঝরনায় গিয়ে চা খেয়েছিলাম, তার ওদিকে বাঁকাই বলে গ্রাম আছে, গভীর জঙ্গল তার ওপারে—ধান পাকলে নিত্য হাতীর দল বার হয় । বাসাড়েরা ও ধাড়াগিরির পথ এখন নিরাপদ নয়; কেটে বলছিল। সেদিকে এখন জঙ্গলও খুব ঘন, তাছাড়া বড় বাঘের ভয় হয়েচে, অনেকগুলো মানুষ-গরকে বাঘে নিয়েচে এ বছর । সাতগড়মের পথেও বাঘের উপদ্রব হয়েছে এ বছর । পোস্ট মাস্টার বললে—আপনার জন্যে জমি রেখে দিলে বিলুটু প্রধান, আর আপনি মোটে এলেন না । নেন যদি, জমি এখনও আছে । বিজয়ার দিন মহলিয়া যাবো, সেখান থেকে টাটানগর ও চাইবাসা । এইমাত্র পাহাড়ের সান দেশে বসে হালয়া তৈরী করে চা খাওয়া গেল। মাথার ওপর অষ্টমীর চাঁদ, আকাশে দু-দশটা তারা, সামনে অরণ্যাবত পাহাড়ের অন্ধকার সীমারেখা, দরে বামদিকে অরণ্য আরও গভীর, মদন জ্যোৎস্নালোকে পাহাড়, উপত্যকা, সান দেশসহ বনানী অদ্ভুত হয়েচে দেখতে। আজই পট্টনায়েকবাব বলেছিলে ৪নং shift-এ বাঘ আছে, সেজন্যে সন্ধ্যার পরে আমাদের সকলের গা ছমছম করচে । রামধন কাঠ কুড়িয়ে আগুন জালিয়ে রেখেচে পাছে বাঘভাল্পক আসে সেই ভয়ে । কেবলই মনে পড়তে থাকে আজ মহাষ্টমীর সন্ধ্যা, বাংলাদেশের গ্রামে-গ্রামে এই সময়টিতে পুজোর চণ্ডীমণ্ডপে দেবীর আরতি হচ্চে শঙ্খঘণ্টা রবের মধ্যে, ছেলেমেয়েরা হাসিমুখে নতুন ফাপড় পড়ে ঘরচে—আর আমরা সিংডুমের এক নিৎজ’ন বন্যজন্ত-অধ্যুষিত পাহাড়ের মধ্যে বসে গল্প করচি ও প্রকৃতির শোভা দেখচি।* ওখান থেকে ফিরচি, রথোমের মদেীর দোকানের সামনে সাঁওতালী নাচ হচ্চে, মাদল বাজার তালে তালে । আমাদের একটা কবল পেতে দিলে, আমরা অষ্টমীর চাঁদের নিচে পাহাড়ের সামনের ছোট গ্রামে খাঁটি সাঁওতালী নাচ দেখে বড় আনন্দ পেলাম । কবিরাজের সঙ্গে বসে একটু গল্প করা গেল। তার বাংলোর সামনে কবে রাত্রে চিতাবাঘ এসে দাঁড়িয়েছিল। সাঁওতালদের গোরস্হানে সেবারে ভুত দেখেছিল, ইত্যাদি কত গল্প । মহলিয়াতে আজ সারা দরপর ঘরে বেড়িয়েচি ৷ বাদলবাবরে বাংলো থেকে কালাঝোরের দশ্যটি বেশ লাগল। বলরাম সায়েবের ধারে সেই গাছটি, নানারকমের পটভূমিতে দুপুরের পরিপণ সময"ালোকে কি অদ্ভুত যে দেখাচ্ছিল । তিনটের ট্রেনে গেলাম টাটানগর। বাসে কাশিডি নেমে আশর বাসা খোঁজ করে বার করি । সে একটা গন্ধরাজ ফুলগাছের তলায় চেয়ার পেতে বসে আছে । দু-জনে সন্ধ্যার পরে নিউ এল-টাউনে প্রতিমা দেখে এলাম। লোকজনের ভিড়, মেয়েদের ভিড়, তারপর ওল্ডএল-টাউনের প্রাইমারি স্কুলে ঠাকুর দেখি । একবার আশা বাড়ি এল মোটর লরি দেখতে—পাওয়া গেল না, তারা সব বামা জিকে ঠাকুর দেখতে যাচ্চে। হেটে বাম"া জিঙ্ক যাবার পথে ডুপ্লে প্ল্যান্ট ও slug ঢালার সময়কার রক্ত আভা থেকে মন হ’ল আগ্নেয়গিরি কখনো দেখি নি, বোধ হয় এই ধরনের জিনিস হবে । ওই সাদা আগনের স্রোতের মতই তার উষ্ণ লাভা-স্রোত। বামা মাইনসের ঠাকুর সাজিয়েচে খব ভাল, আবার তার সামনেই একটা কৃষ্ণলীলার ছবি সাজিয়েচে । বাসে স্টেশনে জগন্নাই ও

  • এই অংশটি ৪নং shift-এর বসে লেখা । উমি্মখের 8રહ

বিষ্ণুপরে ঘরে কাশিডি এলাম। পথে বাস হকিছে, টিনপ্লেট, বামা জিংক, যেমন কলকাতায় হাঁকে ‘ভবানীপুর’, ‘আলিপুর’ । সকালে টাটানগর থেকে প্যাসেঞ্জারে বাসায় নামলম । শ্যামপুর গ্রামখানা পাহাড়ী নদীর ঠিক ওপারে, কাঁকুরে জমি, কাছেই এদেশের ধরনের বনজঙ্গল । পথে সিংডুমের প্রকৃত রূপ দেখলাম, অর্থাৎ উচ্চাবচ ভুমি, পাথরের চাই, শাল ও কে’দ গাছ, রাঙা মাঠ । তিনটের ট্রেনে মহলিয়া থেকে বাদলবাব, বিশ্বনাথ বসন প্রভৃতি অনেকে এল । অশ্বখ তলায় বসে চা খাওয়া গেল। বেলা পড়ে এসেচে। দটো বাজে । সে সময় আমি একা গেলাম পাহাড়ী নদীর ধারে শালচারার জঙ্গলে—একা বসতে । সামনে পাহাড় শ্রেণী থৈ থৈ করচে, দুরে কালাঝোরের নীল সীমারেখা নীল আকাশের কোলে । ঐ দিকে আজ বাংলাদেশে আমাদের গ্রামের বাঁওড়ের ধারে আড়ং বসেচে, কত দোকানদারের কত বেচাকেনা, কত নতুন কাপড়-পরা ছেলেমেয়েদের ভিড়। পাথরের ওপর অপরাহের ঘনায়মান ছায়ায় এক জায়গায় বসে চারিধারের মুক্ত প্রসারতা দেখে কেবলই বাংলা-জোড়া বিজয়া দশমীর উৎসব ও কত হাজার হাজার ছেলেমেয়েদের হাসিমুখ মনে পড়ল। দু-দিনের বিজয়া দশমীর কথা আনার মনে আছে ছেলেবেলাকার।--যুগল কাকা সেদিন এসে রান্নাঘর ও বড় ঘরের মাঝখানে উঠোনেতে দাঁড়িয়ে বাবার সঙ্গে বিজয়ার আলিঙ্গন ও প্রণাম করলেন ।--আর যেদিন গঙ্গা বোস্টমকে আমরা আশদের চ"ডীমন্ডপে ব্রাহ্মণ ভেবে ভুলে পায়ের ধলো নিয়ে প্রণাম করেছিলাম । আজকার দিনে যেখানে যত লোককে ভালবাসি সকলের কথাই মনে পড়ল, তাদের মধ্যে কাছে কেউই নেই, অনেকে পৃথিবীতেই নেই, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যে আমার এ প্রীতিনিন্দেশ হয়তো বা ব্যথ যাবে না । গালডির হরিদাস ডাক্তারের সঙ্গে অনেককাল পরে আজ দেখা । সে গিয়েছিল ধলভূমগড়ের রাজবাড়িতে রোগী দেখতে, আমরা এখানে আছি শুনে বাদলবাবদের সঙ্গে এখানে ট্রেন থেকে নেমেচে ; তার সঙ্গে জ্যোৎস্নাফুল্ল সন্ধ্যায় পাহাড়ী নদীর ধারে তপ্ত শীলাখন্ডের ওপর গিয়ে বসলাম । অমনি যেন অন্য এক জগতে এসে পড়েচি মনে হ’ল । দুরে নদীর কুলকুলা জলস্রোত, ওপারের জ্যোৎস্নাশস্ত্ৰে পাহাড় শ্রেণী, খুব একটি অীকাবাঁকা কি গাছ, আর এক প্রকারের বন্যফুলের মিষ্টি স্বাস—মাথার ওপরের নক্ষত্রবিরল আকাশ—সবগুলো মিলে আমায় এমন এক রাজ্যে নিয়ে গেল যে চুপ করে সেদিকে চেয়ে বসেই থাকি, হরিদাস ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা আর আমার হয় না, কথা বলবার মত মনও নেই, কেমন যেন হয়ে গেলাম । দজেনেই চপচাপ, কতক্ষণ বসে থেকে রাত দশটার কাছাকাছি বাংলোতে ফিরি। বৈকালে নীলঝরনা বেড়াতে গেলাম কিস্ত বেলা গিয়েছিল বলে বেশীক্ষণ নীলঝরনার উপত্যকায় বসে থাকা সম্ভব হ’ল না। পাহাড়ের ওপারে উৎরাই-এর পথে বনতুলসীর জঙ্গলে ঘন ছায়া নেমেচে, তার মধ্যে বড় বড় কে’দ গাছ, সিদ্ধেশ্বর ডুংরির মাথায় অস্তমান সংয্যের আভা একটু। ঝরনা পেরিয়ে বরম-ডেরার পথে খানিকটা গিয়ে একটা উঁচু জায়গায় পাথরের স্তপে খাজাঁচ, জনকয়েক লোক কুলামাতোর দিক থেকে আসচে, ওদের সঙ্গ নিলাম । ওরা বললে, তুই এখানে কি করচিস রে ? বললাম পাথর কিনতে এসেচি । ৪নং shift-এর কাছে এসোঁচ তখনও জ্যোৎস্না ওঠে নি, মদীর দোকানটা আজ বন্ধ, রাধাচড়া গাছে যে ফুলের লতাটা সেদিন দেখেছিলাম, তাতে আজ আর ফুল নেই। এঞ্জিনিয়ারের বাংলোতে লোক খাটচে কারণ ডেপুটি কনজারভেটর অফ ফরেস্টস এখানে এক SRS বিভূতি-রচনাবলী মাসের মধ্যে এসে বাস করবে। পট্টনায়েক যে বাংলো দেবে বলেছিল, সেটা দেখলাম। বড় বড় গাছের মধ্যে বাংলোটা, বারান্দায় বসে সিদ্ধেশ্বর ডুংরির দশ্য উপভোগ করা যায় । নিকটেই নীলঝরনা, জলের কন্ট হবে না । কবিরাজ নেই, ডাক্তারও নেই ওদের বাংলোতে । কবিরাজ গিয়েচে টাটানগর; ডাক্তার গিয়েছে মহলিয়া, কাজেই বিজয়ার সম্ভাষণ এদের আর জানানো গেল না। ফিরবার পথে আমি গররা নদীর ধারের পলের ওপর বসে রইলাম অনেকক্ষণ । দরে কালাঝোর জ্যোৎস্না রাত্রে অঞ্চপল্ট দেখাচ্চে। পাহাড়ী নদীর কুলকুল শব্দ যেন সঙ্গীতের মধর শোনাচ্চে। তামা পাহাড়ের মাথার ওপর দু-একটা তারা মনকে নিয়ে যায় অনেক দর, কতদার, পথিবী পার করিয়ে অসীম দ্যতিলোকের মধ্যে । একটু পরে পট্টনায়েক এল পলের ওপরকার কাঠ ধরে । আমি বসে আছি দেখে বললে, চলন আমার বাসায় । একটু বিজয়ার মিটিমুখ করবেন। আমি বললাম—হেটে ক্লান্ত আছি, আজ আর নয় । তারপর সে অনেকক্ষণ বসে নানা গলপ করলে । রাত নটার সময় বাড়ি ফিরি। পশুপতিবাব আজ আসবেন কথা ছিল, এলেন না, সেজন্যে মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। আমি আর নীরদবাব বেরলাম সন্ধ্যায় ঠিক সময়ে । যাওয়ার পথে অপরাহের ঘন ছায়া নেমে এসেছে পাহাড়ের অধিত্যকায়, তার কোলে-কোলে এদিকে ওদিকে চারিদিকে সাদা সাদা বকের দল উড়চে । সমস্ত দিনের অবসাদ একমহেনত্তে কেটে গেলে যেন, সেদিকের অপরপে সন্ধ্যার পানে চাইলাম। ওখান থেকে এসে নীলঝরনার দিকে চলি । তামা পাহাড়ের ওপর উঠলমে পিয়ালতলা দিয়ে । বড় বট গাছটাতে একরাশ জোনাকী জলচে, ওধারে উঠেচে প্রয়োদশীর চাঁদ, তামা পাহাড়ের বিরাট অধিত্যকার গায়ে পর্ব থেকে পশ্চিমে দীঘ" বড় বড় ছায়া পড়েচে । আমরা দ-ধারে পাহাড়ের গিরিপথটা পার হয়ে নামলম ওপারের জ্যোৎস্নাশভ্ৰ উপত্যকায় । বনতুলসীর জঙ্গল আর তার মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে আছে শাল ও তমাল। চারিধারেরপ যেন থৈ থৈ করচে । পাহাড়ের মাথায় এদিকে ওদিকে দু-চারটি নক্ষত্র । নীলঝরনার জল পার হয়ে বরমডেরার পথে একজন পাহাড়ী লোকের সঙ্গে দেখা । সে একা একটা লাঠি হাতে গান গাইতে গাইতে চলেচে কুলামাতোর দিকে। তাকে বললাম—অত জঙ্গলে এত রাত্রে একা যাবি, যদি বাঘের হাতে পড়িস । সে বললে—খেদিয়ে দিব বাব । অর্থাৎ সে লাঠি দিয়ে বাঘ তাড়িয়ে দেবে। আমরা আর একটু এগিয়ে যেতেই চারিধারের পাহাড়ী অধিত্যকার নিজানতায় জ্যোৎস্না-ধোঁত সৌন্দয্যে যেন কেমন হয়ে গিয়েচি। একটা ভারি আশ্চৰ্য্য জিনিস দেখা গেল । দরে ধঞ্জরী শৈলমালার গায়ে একটা নক্ষত্র জলছিল, খানিকক্ষণ থেকে সেটা আমরা দেখচি। আর আমি মাঝে মাঝে দেখচি ডাইনের রথোম পাহাড়ের দিকে, বাংলা দেশের আলো ছায়া ভরা কোজাগরী পণিমা রাত্রের কথা ভাবচি, এমন সময় নক্ষত্রটা যেন টুপ করে খসে গেল পাহাড়ের ঢাল থেকে। আর সেটা দেখা গেল না। আমরা দু-জনেই অবাক হয়ে রইলাম । সবুজ ঝরনার কাছে এসে বসলম, ওখানে একটি সবাহৎ শিমল গাছের শাখা নত হয়ে আছে । ঝরনার জলের ওপর কুলকুল ক্ষীণ শব্দ হচ্চে ঝরনার জলধারার, জ্যোৎস্না রায়ে ঝরনার জল চিকচিক করচে, বড় শিমল গাছের মাথায় একরাশ জোনাকী জলচে, সে এক অপরপ ছবি। ছবিটা বহুদিন মনে থাকবে । তারপর রথোমের পাহাড়ের একেবারে মাথায় একটা বড় শিলাখণ্ডের ওপরে উঠে বসি । যেদিকে চাই, জ্যোৎস্নাবিধৌত বনরাজি উমি্মুখর 8షిళి শোভিত শৈলমালা, দরে টাটার কারখানার রক্ত-আভা যেন বহন্দরের কোন অজানা আগ্নেয়গিরি অগ্নি-গহবরের রক্তশিখার আভা বলে মনে হচ্ছে । পিছন দিকের ঢালটো সহজ বলে মনে হ’ল, সেখানেই নেমে জঙ্গলের মধ্যে পথ ঠিক করতে পারচি নে । নারীকন্ঠে বললে কে, এদিক দিয়ে বাব । চেয়ে দেখি নিচে একটা সাঁওতালদের ঘর। নেমে এলমে তাদের উঠোনে। দটি মেয়ে ও একটি পর্ষ উঠোনে আগন জেলে সম্ভবতঃ আগন পোয়াচ্চে । আমরা তাদের জিজ্ঞেস করলাম—এই বনে পাহাড়ের নিচে আছিস কেমন করে, হাতী নামে না ? তারা সবাই দেখলাম অদষ্টবাদী। বললে—বাব, ভয় করে কি হবে ? যেদিন বাঘে নেবে সেদিন নেবেই । রথম থেকে আমাদের বাংলো প্রায় দ-মাইল, এদিকে রাত হয়েচে, ন-টা বাজে। আর বেশীক্ষণ এ সব জায়গায় থাকা ভাল নয় বুঝে দু'জনে বেশ জোর পায়ে হেটে রাত পোনে দশটায় পরিপণ" কয়োদশীর জ্যোৎস্নার মধ্য দিয়ে বাংলোতে পৌঁছে গেলাম । আজকার রাতের জ্যোৎস্নাটি আমাকে ইসমাইলপরের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে কেন এত ? Shuqul সাহেবের বাগানের মধ্যের গাছগুলো ঠিক যেন ইসমাইলপুর কাছারীর চারিপাশের সেই বনঝাউ গাছ । আহারাদির পরে বাংলোর সামনে বসে গল্প করচি, একটা প্রকাণ্ড উল্কা জলতে জলতে অত জ্যোৎস্নাভরা আকাশেও ঠিক যেন হাউই বাজির মত আগনের রেখা সন্টি করে আকাশের গায়ে মিলিয়ে গেল । ভারি সন্দর ভুমিশ্ৰী সিংডুমের, ভারি চমৎকার জ্যোৎস্না-রারিটা আজ ! অনেককাল এদের কথা মনে থাকবে । রাখামাইনস থেকে এসেও যখন বারাকপুরের এই গাছগুলোর গন্ধ, ছায়া ও শ্যামলতা আমাকে এত মন্ধে করেচে তখন আমাদের এ অঞ্চলের সৌন্দয্য সম্বন্ধে আমার মত আরও দঢ় হয়ে গেল সন্দেহ নেই। সকালে একটু রোদ উঠলে যখন গাছপালায় ঝোপে, ছায়ায় ছায়ায় বেড়ান যায় তখন যে বনলতার কটুতিক্ত সৌরভ, বনফুলের সবাস পাই, পাখীর যে কলকাকলী শকুনি, কোথায় এর তুলনা ? পাহাড় শ্রেণী না থাকলে রাখামাইনস তো মরভূমি । তবে পাহাড়ের ওপরকার বন সকালের ছায়ায় ভাল হয় কিন্ত কেন জানি না সেখানে এ ধরনের কোমলতা নেই, নিধ নয় রক্ষ । শাল তমাল গাছের বৈচিত্র্য নেই, তারা মোহ সন্টি করতে পারে না, তাদের বনে লতা নেই, প্রাকৃতিক কুঞ্জ সটি করতে পারে এমন পপিত ব্যক্ষ বা লতা নেই। এই সব জন্যেই তো প্রথম হেমন্তে দেশের বন এত ভাল লাগে। সমিত জ্যোৎনা রাতে কোথায় এমন পপিত তৃণপণের মন মাতান সৌরভ । কাল বিকেলে বেড়াতে বেড়াতে কুঠির মাঠের বনশোভা দেখে আরও বেশী করে আমার থিওরীটার সত্যতা উপলব্ধি করলম অথাৎ আমাদের এ অঞ্চলের গাছপালার বৈচিত্র্য ও সৌন্দয্য সিংডুম সেন্ট্রাল ইন্ডিয়ার অরণ্যের শোভার অপেক্ষা অনেক বেশী। কত কি লতা, কত কি বিচিত্র বনফুল, কত ধরণের পত্রবিন্যাস—এত বৈচিত্র্য কোথায় ওসব দেশের অরণ্যে ? আমি রাখামাইনস থেকে বারো মাইল পাহাড় ও জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সবটাই হেটে মনসাবনি রোড পৰ্যন্ত গিয়েচি, সিংডুমের বিখ্যাত সারেণ্ডা ফরেস্ট দেখোঁচ, গবনমেণ্ট প্রোটেক্টড ফরেস্টের মধ্যে গিয়েচি । সেখানে বন খুব ঘন ও বহুবিস্তৃত বটে কিন্তু বনশোভা নিমবঙ্গের বনের মত নয় । ও অঞ্চলের বড় বড় গাছের মধ্যে শাল, কেন্দ, আসান, পলাশ ও মাঝে মাঝে আমলকী ও বন্য শেফালি এই কটি প্রধান । বন্যলতা আমার চোখে অন্ততঃ পড়ে নি । কোন কোন হানে শিমল বক্ষ আছে। সারবান কাঠ বাংলাদেশের বনে তত নেই যত ওদেশে ৪২৮ বিভূতি-রচনাবলী আছে কিন্ত আমার বলবার উদ্দেশ্য বাংলা দেশটাতে যদি আজ সারেন্ডা রিজাভ ফরেস্টের মত একটা অরণ্য গড়ে উঠত, তার বনবৈচিত্র্য ও সৌন্দয" এবং নিবিড়তা অনেক বেশী হ'ত— শ্রীনগরের ও ছঘরের পথের ধারের বন দেখে এ ধারণা আমার মনে আরও বদ্ধমতল হয়েছে । তবে বাংলার বনে পাহাড়ী নদী বা ঝরণা নেই, ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত শিলাখণ্ড নেই-তেমনি ও সব বনের পথে এত পাখী নেই, বিচিত্র বণের বনপল্পের সবাস নেই। এ আমি স্বীকার করি যদি বাংলা দেশের বনভূমির পিছনে থাকত দুরবিস্তৃত নীল গিরিমালা, মাঝে মাঝে যদি কানে আসত পাহাড়ী ঝরনার কুলকুল শব্দ, শিলাসন আস্তৃত থাকত স্নিগ্ধ ছায়া ঝোপের নিচে, চরত ময়র, চরত হরিণ-নন্দন—উপলাকীর্ণ বন্য নদীর শিলাময় দই তটে স্তবকে স্তবকে স্বাসভরা বনকুসুম ফুটে থাকত—গিরি-সান দেশে থাকত ঘনসন্নিবিষ্ট বাঁশবন—তবে এ বন আরও সদর হত । কলপলোক ছাড়া সে বন কোথায়—যেখানে এত সৌন্দষ্যের একত্র সমাবেশ সম্ভব ? অন্ততঃ আমি তো দেখি নি । যদি কোথাও এমন থাকে ভারতবষের মধ্যে তবে আমার সন্দেহ হয় তা আছে বা থাকা সম্ভব গোদাবরী তীরের অরণ্যে, রাজমহেন্দী থেকে গোদাবরীর উজান পথে গিয়ে উতকামন্দ ও কোদাই কানাল অঞ্চলে। মহীশর ও হিবাকুরের রিজাভ ফরেস্টে, হিমালয়ের নিম্ন অধিত্যকীয়, আসামের বনে । যদিও এদেশের প্রত্যেকটি সম্বন্ধে আমি যা কল্পনা করচি তা আছে কিনা সে বিষয়ে আমার যথেস্ট সন্দেহ । আজ মনে বড় আনন্দ ছিল । জগো আর গোপালকে সঙ্গে নিয়ে বন-ফুলের সবাসভরা বনপথ দিয়ে বেলেডাঙার আইনন্দি মণ্ডলের বাড়ি গেলাম। অইনদি যত্ন করে বসালে—ও নিজে কত গ্রামে পরিচিত সে গল্প করলে । বহরপী সেজেচি বাপ, কাটাম ডুর খেলা খেলেচি—নাগরদোলা ঘুরিয়েচি ।” আমি ওকে খুশি করবার জন্যে বললাম—চাচা তোমাকে অনেক দরের লোকে জানে । ও বড় খুশি হ’ল । বললে—শোন তবে আমার কত গায়ের লোকে জানে। এই কাটকোমরা, ইচ্ছেপর, মেটিরি, শলকো হানিডাঙা--- তার তালিকা আর শেষ হয় না । বললে—তা লাঠিতে বা বন্দকে মরব না, আমার গরের কৃপায় । আগন খাব । শ্যন্যে উড়ে যাব । মড়ে কেটে আবার জোড়া দেব । আমি বিস্ময়ের সরে বললাম-“বল কি চাচা ? • হ’্যা, তোমাদের বাপ-মার আশীবাদে, গণে কিছু ছেল শরীলে । ওই যেখানে চটকা তলায় সায়ের ছেল, ওখানে এক সমিসি এসে আস্তানা বাঁধে আজ চল্লিশ বছর আগে। আমার তখন অনুরাগ বয়েস। তিনিই আমার ওস্তাদ । সন্ধ্যা হয়ে গিয়েচে দেখে উঠলাম। জগো, গোপাল ও আমি ঘন বনের পথে আবার ফিরি। তখন কুঠীর মাঠের জঙ্গলে অন্ধকার বড় ঘন হয়েচে । ওরা বাঘের ভয়ে বনের মধ্যে কথাবাত্ত" বলে না। আমি যত সাহস দিই, ওরা তত ভয় করে। আমাদের ঘাটে যখন এসেচি, তখন নিস্তদ্ধ নদীচরের ওপরকার আকাশে অগণ্য দাতিলোক—বনশিমের ফুল ফোটা ঝোপটি ঘাটের ওপর নত হয়ে আছে, জোনাকী ঝাঁক জলচে অন্ধকারের ফাঁকে ফাঁকে । বাড়ি এসে দেখি সবাই বাড়ির চারিদিকে মাটির প্রদীপ জেলেচে, কারণ আজ দীপ দ্বান করবার নিয়ম । ক্ষদদের বোধনতলায়, আমার লেখবার ঘরের সামনে, পঢ়িদিদিদের উমি্মখের 8షీసి রোয়াকে, খিড়কীর পথে, বাঁশবনে—সম্ভবত প্রদীপ জলচে । ন-দি হেসে বললে—এই দ্যাখো, এবার তোমাদের কলকাতার হ্যারিসন রোড হয়ে গিয়েচে । না ? ক-দিনই বড় আনন্দে কাটল । আজ দাপরে একটা মালো এলো সাপ খেলাতে । আমতলায় চেয়ার পেতে আমরা সবাই বসে সাপ খেলানো দেখি । ন-দি, খড়ীমা, ক্ষদ, পাঁচী, জগো, গোপাল—সাপ খেলা দেখে সবাই খব খুশি । এবার পুজোর ছয়টিতে যত গান শনেচি দটো গান আমার মনে বড় ছাপ রেখে গিয়েচে, গানের সরের জন্যে নয়, যে বিশেষ সহানে ও বিশেষ অবস্হায় সেই গান দুটি গাওয়া হয়েছিল তার জন্যে। সেদিন পাহাড় পেরিয়ে এসে রথোমের মদীর দোকানে একটা ছোকরা যে গাইছিল ৪— হায় হায় শিশুকালে ছিলাম সখেএ গানটার এই পয্যন্ত মনে আছে । আর একটা আজকার সাপড়ের গানটা ঃ– সোনার বরণ লখাই আমার হয়ে গেল কালো ( ওগো ) কি সাপে দংশেচে তারে তাই আমাকে বলো । সাপড়ে উচ্চারণ করলে—‘ডুংশেচে”—তাই যেন আরো মিটি লাগলো । তার পরেই রোদ পড়ল। কুঠীর মাঠে বন ঝোপের ধারে কেলেকোঁড়ার লতায় ফুলের সুগন্ধে বৈকালের বাতাস ভারাক্লান্ত । তারই মধ্যে কতক্ষণ বসে রইলাম, বেড়াল মু। ছেলেমানুষের মত প্রকাণ্ড মাঠটার এদিকে ওদিকে ছাটোছুটি করে বেড়িয়ে আবার যেন বাল্যের আমোদ ফিরিয়ে পেলাম । ভাগ্যে ওদিকে কেউ লোকজন থাকে না তাহলে আমাকে হয়তো ভাবতো পাগল । পল্লীপ্রান্তের বনশোভা ও বনপল্পের সবাস আর এবারকার অপ্রতিহত পরিপািণ তপ্ত সষ*্যালোক—তার ওপর সব সময়ের জন্যে মাথার ওপরকার ঘন নীল আকাশ—আমাকে একেবারে মগধ করে দিয়েচে । দিনরাত এই মুক্ত প্রকৃতির মধ্যে বাস করেও যেন আমার আশ মেটে না—রাত্রির নক্ষত্ররাজি কি জলজন্লে, কত রকমের, দিকবিদিকে কতদরে ছড়ানো । বেজায় শীত পড়লো শেষ রাত্রে । অকালে নদীর ঘাট থেকে ফিরচি, আমাদের ঘাটের পথে গাবতলায় সাত-আটখানা বড় বড় মাকড়সার জাল পাতা । রোদ পড়ে বিচিত্র ইন্দ্ৰধনর রং-এর সটি করেচে। আমগাছের এডালে ওড়ালে টানা বেধে উচুতে নিচুতে কেমন জাল বলনেচে । প্রত্যেক জালেতে গোটাকতক মশা মরে রয়েচে । একটা মাকড়সা জাল গুটিয়ে একটা মাত্র টানা সতোতে পষ*্যবসিত করলে—সেই সাতোটা বেয়ে ছোট্ট মাকড়সাটা গাবগাছের ডালে উঠে গেল । বনে বনে এই সব দেখে বেড়ালেও কত শিক্ষা হয়। আমাদের দেশে কত ফুল, ফল, দামী ঝোপঝাপ, কীট পতঙ্গ । এদের জীবনের ইতিহাস আলোচনা করলে যে আনন্দ পাওয়া যায়—একরাশ প্রাণী-বিজ্ঞানের বই ঘটিলেও তা হয় না । “We live too much in books and not enough in nature, and we are very like that simpleton of a Pliner the younger who went on studying a Greek author while before his very eyes Vesuvius was overwhelming fine cities beneath the ashes.” তারপর কতক্ষণ দাপরে মানুষের বাড়ি ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার নিমন্ত্রণে গিয়ে ওদের সঙ্গে বসে গল্প করলাম। কে বলেছিল ‘অন্ধ নাচার বাবা ক্ষুদ খুব উৎসাহের সঙ্গে সে গল্প করলে । আমি বনপথ দিয়ে তালঘাট গেলাম । সেখানে নিরাপদদের বাড়ি চা খেয়ে কতক্ষণ গল্প করি। নিরাপদ এক অদ্ভুত লোক । সে বলে নাকি ভুত দেখে। মাঠে-ঘাটে সর্বদাই 8ෆ්o বিভূতি-রচনাবলী ভুত বেড়াচ্চে সর, সতোর মত। আমি বললাম—বলেন কি ? —হ’্যা, বিভূতিবাব । ওরা আবার তারা ধরে নামে । আমি সকালে উঠে দেখোঁচ বনের সব তারা পড়ে আছে । সমযf্য ওঠবার আগে তারার ঝকি আপনিই আকাশে উঠে যায়। কেবল যেগুলো শিশিরে খুব ভিজে যায়, সেগুলো ঝোপের তলায় খুব ভোরে পড়ে থাকে। ভিজে ভরি হয়ে যায় কিনা, তাই আর উঠতে পারে না। আমি খুব অবাক-মত মুখখানা করে নিরাপদর মুখের দিকে চেয়ে রইলাম । ও নাকি সযf্যালোক থেকে তাপ সংগ্রহ করে দেশের কাজ করবে, সেজন্যে সয"কে জয় করচে । রোজ মাঠে বসে সয্যের দিকে একদণ্টে চেয়ে থাকে । ঘন অন্ধকার । বড় বড় গাছের মাথায় অগণ্য নক্ষত্রদল জলজল করচে—কি অসীম দ্যতিলোক পৃথিবীর চারিধার ঘিরে। টচ্চোর ব্যাটারি ফুরিয়ে এসেচে বলে একরকম অন্ধকারেই চলে আসতে হোল। নিরাপদ সঙ্গে খানিকদরে এল গলপ করতে করতে—রাস্তার ধারে সাঁকোর ওপর দু-জনে কতক্ষণ বসলাম । আমি গল্প করি আর মাথার ওপর চেয়ে চেয়ে নক্ষত্র দেখি, একবার চারিধারের অন্ধকার বনানী দেখি । আজ বিকেলে কুঠীর মাঠে গিয়ে একটা চমৎকার সয্যাস্ত লক্ষ্য করলাম। আর সেই বন ঝোপের সগন্ধ । এ গন্ধটা আমায় বড় মগধ করে রেখেচে । এদের ছেড়ে কলকাতা চলে যাবার দিন নিকটবৰ্ত্তী হয়েচে মনে ভাবলেই মনটা খারাপ না হয়ে পারে না, কিস্ত এখানে নানা কারণে কাজ করা সম্ভব হয়ে উঠচে না—প্রথম কথা, সঙ্গে বই নেই—আমার নোটবইগলো নেই। এমন কি লেখবার উপযুক্ত খাতা বা কাগজপত্র পয্যন্ত বেশী আনি নি। বই ভিন্ন আমি থাকতে পারি নে। বই উপযুক্ত সংখ্যায় না আনা একটা বড় ভুল হয়ে গিয়েচে এ ছয়টিতে। এমন ভুল আর কখনো হবে না । দুটো ছোট গল্প লিখেচি—এবারকার পজোতে তার বেশী কিছদ হ’ল না । আমাদের পাড়ার সবাই কাল সকালে সাত-ভেয়ে কালীতলায় যাবে। অভিলাষের নেীকো বলে ওই পথে অমনি সইমাদের রান্নাঘরে গিয়ে বসলাম । কতকাল পরে যে ওদের রান্নাঘরে গেলাম ! নলিনীদিদি যত্ন করে বসালে—চা আর খাবার দিলে, তারপর কতকালের এ গল্প ও গল্প, কত ছেলেবেলার কথা, নলিনীদিদির বিয়ের সময়কার ঘটনা। ওর স্বামী উত্তর আফ্রিকায় ছিলেন সে সব গল্প । সোনার মেয়ে হয়েচে, কি সন্দের টুকটুকে মেয়েটি, কি চমৎকার মুখখানি, বছর দুই বয়েস হবে । আমায় দেখে কেমন ভয় পেলে, কিছুতেই আমার কোলে আসতে চাইলে না । * টেপি দিদিকে দেখলাম আজ সকালে বছর পনেরো পরে । একেবারে বড়ী হয়ে গিয়েচে । সেই ফস রঙ, সন্দের চোখমুখের আর কিছু নেই। মানুষের চেহারা এত বদলেও যায় কালে ! যা হোক, ষোল বছর পরে যে ওরা আবার দেশে এসেচে এই একটা বড় আনন্দের বিষয় । আমাদের গ্রামের প্রকৃতি অদ্ভুত, কিস্ত মানুষগুলো বড় খারাপ। পরপর ঝগড়াম্বলম্ব, ঈষা, পারিবারিক কলহ, জ্ঞাতিবিরোধ, সন্দেহ, কুসংস্কার এতে একেবারে ডুবে আছে । লেখাপড়া বা সৎচচ্চার বালাই নেই কারো । AEschylus-এর কথায় ঃ “They live like silly ants ln hollow caves unsunned ; To them comes no sun, no moon, উমি্মখের Bర్సీ No Stars, no music, no spring Flower-perfume...” আজ সকালে আমরা নৌকোয় সাত-ভেয়ে কালীতলায় গেলাম। পথে চালতেপোতার বাঁকে কত রকমের ফুল যে ফুটেচে—সেই আর বছরের কুচো কুচো হলদে ফুলগুলি, নীল ঘাসের একরকম ফুল, কলমীর ফুল—সকলের চেয়ে বেশী ফুটেচে তিতপল্লার ফুল, যে ঝোপের মাথা দেখি—সম্ভবত আলো করে রয়েচে ওই ফুলে। বেলা একটার সময় কালীতলায় গিয়ে পৌছনো গেল। তারপর আমরা গেলাম রেলের পলে বেড়াতে । বটতলায় রান্না করে খাওয়া হোল। ক্ষদ ছটে গেল আমাদের সঙ্গে রেলের রাস্তায় । আমরা পরোনো বনগাঁয়ের দিকে যাচ্চি—রামপদ সইকেল নিয়ে এসে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে গেল। খাবার পরে আবার একটু রেল লাইনে বেড়িয়ে সন্ধ্যার সময় নৌকোয় উঠে নেীকো ছাড়ি। পথে কত কি গল্প করতে করতে চমৎকার জ্যোৎস্না রাত্রির মায়া যেন আমাদের পেয়ে বসল। তখন চালতেপোতার বাঁকে এসেচি, তখন নিস্তব্ধ নিউজ’ন স্যগন্ধ বনের চরে কাটা চাঁদের শিশির-পাণ্ডুর জ্যোৎস্না ও নক্ষত্ৰলোকের শোভা যেন সমস্ত নদী ও বনকে মায়াময় করেচে মনে হোল । চাঁদ-ডোবা অন্ধকারের মধ্যে আমাদের ঘাটে এসে নৌকা লাগল । তব্যও মনে হয় এ সব জায়গায় বারো মাস আসা আমাদের মত লোকের চলে না। কারণ জীবন নদীর স্রোতধারা এখানে মন্দ গতিতে প্রবহমান—সক্লিয়, উন্নতিশীল, বেগমান জীবন এখানে অজ্ঞাত । বন্ধ জলে পানা-শেওলা জমে, জলকে শীঘ্ৰ দুষিত করে ফেলে । যে চায় জীবনকে পরিপািণ ভাবে ভোগ করতে, যাকে তার উপযুক্ত বন্ধিবৃত্তি ও ক্ষমতা নিয়ে ভগবান সন্টি করেচে, যাকে dull, bore এবং stupid করে সস্টি করেন নি, যার জীবনের প:জি অনেক বেশী, তার জন্যে এসব জায়গা নয়। কিছুকাল এসে বেশ কাটানো যায় বা আসাও উচিত । কিন্ত চিরদিন এখানে যে কাটাবে তাকে তাহলে নিজের বাথ সম্পণে বিসজ্জ’ন দিয়ে সেবারতে দীক্ষিত হতে হবে, যে বলবে, আমার নিজের কিছু চাই নে, দেশের ছেলেদের জন্যে স্কুল খলব, তাদের পড়াব, দরিদ্রদের দুঃখ মোচন করব, ম্যালেরিয়া তাড়াব ইত্যাদি—সে রকম মানুষ হাসিমুখে সমস্ত অসুবিধা ও অন্ধকারকে বরণ করে নিয়ে এখানে এসে চিরকাল বাস করতে পারে । আজ শেষরাত্রে ঘুম ভেঙে একবার বাইরে এলাম, মনে হোল খুব মদ জ্যোৎস্নালোক ঘরের দাওয়ায়—চাঁদ তো অনেকক্ষণ অস্ত গিয়েচে তবে এখন কিসের জ্যোৎসনা ? ক্ষীণ হলেও এটা জ্যোৎস্নালোক সে বিষয়ে কোন ভুল নেই, কারণ খাটির ছায়া পড়েচে, বেড়ার কঞ্চির ছায়া পড়েচে, আমার নিজের ছায়া পড়েচে ।” দীর আকাশে এক সময় হঠাৎ নজর পড়ল—দেখি শ’ইতে তারা উঠেচে । শক্ৰ-জ্যোৎস্না এত স্পষ্ট কখনও দেখি নি জীবনে—সত্যি কথা বলতে কি চপষ্টই কি বা অপষ্টইকি—শত্ৰু-জ্যোৎস্নাই দেখিনি কখনো । এমন অবাক হয়ে গেলাম, এত কথা মনে আসতে লাগল যে ঘমে আর হোল না । আমার মন পথিবীর গডি ছাড়িয়ে বহ-দর ব্যোমপথে গেল উড়ে—আমি যে গ্রহলোকের জীব, আমার বাসস্হান যে বিশাল শন্যের মধ্যে, অন্য আরও গ্রহ ও অগণ্য তারাদলের মধ্যে কত কোটি সমযf্য সেখানে দীপ্যমান, কত নীহারিকা পাজ, কত দশ্য অদৃশ্য শক্তি, বিদ্যুৎ, কসমিক রে,—এদের সঙ্গে আমার আত্মা যেন এক হয়ে গেল । আমার অথলিপস বৈষয়িক আত্মা মুক্তিলাভ করলে অলপ কয়েক মহত্তের জন্যে, ওই শক্লে তারার আলোর পথ বেয়ে উড়ে চলে গেল অসীম দ্যতিলোকের মধ্যে । কাল এখান থেকে চলে যাব । তাই যেন সব কিছর ওপর মায়া হচ্চে। ছায়াঘন 8లS * বিভূতি-রচনাবলী অপরাহ্লে আমাদের পোড়ো ভিটেয় পেছনকার বাশবনে বেড়াতে গিয়ে এক জায়গায় খানিকটা চুপ করে বসে রইলাম । রাঙা রোদ পড়েচে ওদিকের একটা বশিঝাড়ের গায়ে। সেই রাঙা রোদ মাখানো বাঁশঝাড়ের দিকে চেয়ে সমস্ত জীবনের গভীর রহস্যের অনুভুতি যেন মনে এসে জমল । কতকাল আগে এমন কাত্তিক মাসের দিনে মামার বাড়ি থেকে বাবার সঙ্গে এসে প্রথম এ গাঁয়ে উঠেছিলম আমার বাল্যকালে । চুপ করে ভাবলে সে দিনের হেমন্তদিনের কটুতিক্ত বনলতা-ফুলের গন্ধভরা দিনগুলির সমতি আজও আমার মনে আসে—কেমন একটা মধরে, উদাস ভাব নিয়ে আসে ওরা । তারপর কত পথ চলেচি, কখনও কণ্টকাকীণ* আরণ্যপথ বেয়ে, কখনও রৌদ্রদগধ মরবালার বকে চিরে, কখনও কোকিল-কুজিতপপেসরভিত কুঞ্জবনের মধ্যে দিয়ে, চলেচি“চলেচি“কত সঙ্গী-সাথীর হাসি-আশ্রভেরা নিবেদন আমার মনের মধ্যে সঞ্চিত হোল, কাউকে পেলাম চিরজীবনের মত, কাউকে হারালমে দু-দিনেই, কিন্ত অভিজ্ঞতার ঐশ্বযf্যই দেখলাম জীবনের সব চেয়ে বড় ঐশ্বয' । সুখ দুঃখ দু-দিনের —তাদের স্মৃতি চিরদিনের, তারাই থাকে । তারাই গভীরতার ও সাথ’কতার পাথেয় আনে জীবনে। আজ এই শুকনো বাঁশের খোলা বিছানো, পাখী-ডাকা, রাঙা রোদমাখানো বাঁশবনের ছায়ায় বসে সেই কথাই মনে হোল । সেই বাঁশের শুকনো খোলা ! মামার বাড়ি থেকে প্রথম যেদিন এ গ্রামে আসি তখন দাপরে আমাদের বাড়ির দরজার সামনে ধলোর ওপর যে বাঁশের খোলা নিয়ে রাজলক্ষী ও পটেশ্বরীকে খেলা করতে দেখেছিলাম ত্রিশ বছর আগে । আজ কোথায় তারা ? ইছামতীর ওপর দিয়ে নেীকো বেয়ে চলেচি। বেলা গিয়েচে । দু-ধারের অপৰব বনঝোপে রাঙা রোদ পড়েচে । কত কি ফুলের সুগন্ধ । কিন্ত চালতেপোতার ডান ধারে যে সাই বুবিলার নিভৃত পাখী-ডাকা বন ছিল, মনি গায়ের নতুন কাপালীরা এসে সব নষ্ট করে কেটে পড়িয়ে ফেলে পটল করেচে। আমার যে কি কষ্ট হোল ! পত্ৰশোকের মত কট। কত তিৎপল্লার ফুল ফুটে থাকত, বন কলমীর বেগনী ফুল ফুটে থাকত—আর বছরও দেখোঁচ । কত কাঁচ কচি জলজ ঘাসের বন, তার মাথায় নীল ফুল—এবার ডান ধার এরা সাফ করে ফেলেচে । আমার নেীকোর মাঝি সীতানাথ বলচে—'দা-ঠাকুর, বড় পটল হবে, চারখানা পটলে একখানা গেরস্তের তরকারি হবে । আমার জ্ঞানে কখনও এখানে কেউ আবাদ করে নি। কুলকুটির ফুল আর বন শিমের ফুল এবার অজস্র । এই দস্যি কাপালীরা, এই Destroyers of Beauty, কোথা থেকে এসে যে জটিল, ইছামতীর পাড়ের রুপ এরা কি নিষ্ঠুর ভাবে নষ্ট করে ফেলচে । রোদ একেবারে সিদরে হয়ে বশিঝাড়ের মাথায় উঠেচে । অপরাহের বাতাস নানা অজ্ঞাত বনফুলের মিষ্ট গন্ধে ভারাক্রান্ত । নদীপথে বিকেলে ভ্রমণের মত আনন্দ আর কিসে আছে ? কি গভীর শান্তি, কি বন-শোভা, কি অস্ত আকাশের মায়া । ছটাঁর দিন। কলকাতা ভাল লাগচে না । এই ক-দিনেই কলকাতা যেন কিবাদ হয়ে গিয়েচে । আজ বিকেলে বেড়াতে বেড়াতে থাকারের দোকানে গিয়ে একখানা বই পড়ছিলাম কাeজন পাকের সামনের জানলায় দাঁড়িয়ে । সেখানে থেকে মাঠে একটা জায়গায় অনেকক্ষণ বসে রইলাম। একটা বেঞ্চে বসে আছি, দেখি ডাঃ পি. সি. রায় সামনে দিয়ে যাচ্চেন। দু-জনে গল্প করতে করতে বেড়ালম অনেকদরে পয্যন্ত । উনি বেশীর ভাগ বললেন ‘প্রবাসী'র কথা। যোগেশ বাগল'প্রবাসী ছেড়ে গিয়েচে সেজন্যে দুঃখ করলেন। গিরিশবাবুও দেখি বিছানা পেতে লড রবার্টসের প্রতিমাত্তি'র পাদপীঠে বসে আছেন। আমরাও গিয়ে জটলাম। আজ রাত্রে মাদ্রাজ মেলে ডাঃ রায় বাঙ্গালোর যাবেন, সে কথা হচ্ছিল । তাঁর গাড়িতে ফিরে এলাম । Nineteenth Century Review tejtor ș’ĞI ETçalf STaTI উমি্মুখর £రి) কবিতা তুলোঁচ ঃ– Beyond the East the Sunrise, beyond the West the sea, And East and West wander-thirst that will not let me be. And come I may, but go I must, if men ask you why. You may put the blame on the stars and the sun, on tha white cloud and the sky. “To scorn all strife and to view all life y With the curious eves of a child.” “To travel hopefully is better than to arrive.” “To love Nature for the sake of what it brings forth, for its beauty, for its harmony will help you a little nearer to perfection.” “To feel love for humanity in the sweetness of spiritual communion. in the joy of helping one another, in the happiness of playing a part together in the everlasting work of the farm of worlds “aud universe, will bring you all the nearer to the goal of evolution.” আজ আশুতোষ হলে জাপানী কবি ইয়োনে নোগুচির বক্ততা শনতে গেলাম । চিত্রকর হিরোসিকের কতকগুলি ছবি, প্রধানতঃ ল্যান্ডস্কেপ, বড় ভাল লাগল—বিশেষতঃ অন্ধ চন্দ্র, পণচন্দ্র, নানারকমের চাঁদের রপে। প্রধানতঃ পল্লীদৃশ্য, ঝরনা, বশিঝাড়, গ্রাম্য নদী ইত্যাদি । হকুসাই ও হিরোসিকে এ দু-জনের শক্তিই এ বিষয়ে খুব অসাধারণ বলে মনে হয়েছে আমার । নোগুচির বক্ততাও বেশ সুন্দর—সকলের চেয়ে আমার ভাল লাগল ঐ spesiĝI—“In the twilight when the vision awakes” y Elffs 5 SISTE GEIR কতবার এটা দেখেচি বলেই আমার কথাটা বড় মনে ধরেচে। নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা না থাকলে অনেক ভালো কথাই যে বোঝা যায় না, আমাদের দেশের অনেক Self-styled সমালোচক সেই সব বোঝেন না । সেদিন বাঁশবাগানের রাঙা রোদ পড়ে যে দশ্যটার সটি করেছিল, আজ পনেরো-ষোল দিন হয়ে গেল এখনও এই নোগুচির বক্ততা শুনতে শুনতে সেই কথাটা মনে হোল । সে আনন্দ মনের গোপন মন্দিরে এখনও সেই রকম সতেজ ও নবীন আছে । ওই দশ্যটা মনে এলেই আনন্দটাও আসে সঙ্গে সঙ্গে । প্রকৃতিকে দেখবার চোখ না খুললে মানুষের জীবনে সত্যিকার আনন্দ নেই, একথা কতবার বলেচি আমার নানা লেখার মধ্যে—কিস্ত আমাদের দেশের লোকে শব এক জোটে চোখ বন্ধ করে আছে । চোখ খোলার সাধ্য কার ? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও হার মেনে গিয়েচেন । অনাব'র মর বালতে বীজ বপন করে ফল পাওয়ার আশা তো আকাশ কুসুম হতে বাধ্য। আজ রবিবার দিনটা দমদমার ওপারে একটা বাজে বাগান বাড়িতে গিয়ে নষ্ট হোল। আমার এ ধরনের Outing মোটে পছন্দ হয় না—কি করি, দলে পড়ে যেতে হোল— বিশেষ করে মহিলাদের কথা ঠেলতে পারা যায় না ; কিন্তু একটা কপির ক্ষেতের সামনে বসে সতরঞ্চি বিছিয়ে রবীন্দ্রনাথের গান শনে সদলবলে চা খাওয়ায় যে কি আনন্দ আছে, আমি তা বঝেলম না। আর কি মশা । কলকাতার উপকণ্ঠে এই শীতকালে যেমন ভয়ঙ্কর মশার উপদ্রব, পাড়াগাঁয়ে বর্ষাকালেও এর সিকি নেই। অথচ শহরের লোকে বিশ-বিশ হাজার টাকা খরচ করে শহরের উপকণ্ঠে—এই ধরনের সাজানো-গোছানো বাগান বাড়ি করে—মাঝে মাঝে সেখানে বন্ধবোন্ধব নিয়ে হল্লা করে। এই সব insipid ধরনের Outing-এর সংসগ' 何・研 (oリ)ーミb 898 বিভূতি-রচনাবলী আমায় ছাড়তে হবে এবার । সার অলিভার লজের পত্রাবলীর মধ্যে সেদিন পড়লম এই বিশাল বিশ্বের আকৃতি, গঠন 2FTāwī (Structure and extent of the Universe ) slo isosi Moos o osco —Eið GF EIAsIII fEfR AFT5R CTYFLSI—“Universc is thc body of God—this is one of His modes of manifestations,’ old offbo foto SIFT-I, soft, as Eosals, কীটপতঙ্গ, মানুষ, জীবজন্ত—সব মিলেই তিনি। তিনি এই ভাবে পদাথের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করচেন । তাই উপনিষদ বলেচে—‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ । একই আছে, দ্বিতীয় আর কিছু নেই । ঈশোপনিষদের—‘ঈশাবাস্য মিদং সৰব*ং যৎকিঞ্চি জগত্যাং জগৎ ।” আজ সন্ধ্যায় দমদমার বাগান বাড়ি থেকে ফিরে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নক্ষত্র জগতের পানে চেয়ে চেয়ে ঐ সব কথাই মনে হচ্ছিল । সেদিনকার সেই গানটা—“The home I was born.’ আমার কানে এখনও যেন বাজচে—তা থেকেই কথাটা মনে এল । এ রকম যে কতবার হয়েচে । একটা অনুভুতি পেলে মন শীঘ্ৰ চলে যায় আর এক শ্রেণীর অনুভুতিতে । শকেবারে বিকেলে বনগাঁয়ে গেলাম। সেখানে নেমে বাসায় গিয়েই খয়রামারির মাঠে বেড়াতে গেলাম তখন চাঁদ উঠেচে—মাটির সোঁদা সোঁদা সুগন্ধ ভুর ভুর করচে বাগানে । কেলেকোঁড়ার ফুল এখনও আছে বটে, সুগন্ধ নেই । দ-দিন বনগাঁয়ে থেকে আজ বিকেলের ট্রেনে এলমে কলকাতায়—জাপানী কবিনোগচিকে P. E. N.-এর পক্ষ থেকে অভ্যর্থনা করা হচ্ছে । প্রথমেই হোটেলের হলে ঢুকে দেখি তখনও "সবাই আসে নি, কেবল মণীন্দ্র বসু ও দ-পাঁচজন এখানে ওখানে আছে। কিরণশঙ্কর রায়ের সঙ্গে গালডি ও ঘাটশিলা সম্বন্ধে কথাবাত্তা বলচি, এমন সময়ে পবিত্র এসে বললে, তোমাকে ডাকচে, নলিনী পণ্ডিত তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায় । তাকে কে একজন তোমার সম্পকে পত্র লিখেচে সেজন্যে । * বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলচি, মণীন্দ্র এসে টেনে নিয়ে গেল । তারপর সবাই টেবিলে যে যার বসে গেল । সুরমা বস ও ক্ষীরোদের স্ত্রী, আমি এবং নিমলি বস এক টেবিলে । চা পরিবেশন হওয়ার পরে স্যান্ডউইচ চলেচে সেই সময় নোগচি এলেন । কালিদাস নাগ নিয়ে এলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দী কবি-সম্মেলন থেকে । রামানন্দবাব উঠে তাঁর ষষ্টিতম জন্মতিথি উপলক্ষে অভিনন্দন জানালেন । নরেন দেব আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন চার রায়ের স্ত্রীর সঙ্গে পরিচিত করতে । চার রায় কেন যে সাহেবী পোশাক পরে এসেচেন, এ আমি বুঝতে অক্ষম, যেখানে নোগুচি নিজে এসেচেন জাপানী পোশাকে । তারপর নোগুচি নিজের জাপানী কবিতা পাঠ করলেন এবং তারপর ইংরেজী অনুবাদ পড়লেন। কালিদাস নাগ আন্তজাতিক P. E. N.-এর সভাপতি H. G. Wells-এর একখানা চিঠি পড়লেন। আমাদের বঙ্গীয় P. E. N.-এর প্রতি শুভেচ্ছাজ্ঞাপক পত্র। জাপানী কনসাল জেনারেল কিছদ বললেন, কিস্ত তা কেউ বুঝতে পারলে না । যখন এ পর্য্যস্ত হয়েচে—তখন চপলা দেবীর ভাই ফণী চক্ৰবত্তী এসে আমাদের টেবিলে বসল। সুরমা বস তাকে চা করে দিলেন । ফণীর সঙ্গে মণীন্দ্র বস আমার আলাপ করিয়ে দিতে যাচ্ছিল—ফণী হেসে বললে অনেক কালের আলাপ আছে, আলাপ করিয়ে দিতে হবে না । তারপর জাপানী সাহিত্য সম্বন্ধে সে কিছু কিছ নিজের মত জানালে, বিশেষতঃ নোগচির কবিতা সম্বন্ধে। আমি, নিম’লবাব ও ফণী তিনজনেই তখন মজে গিয়েচি। সুরমা বসকে ইউরোপীয় সঙ্গীত বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। কারণ তিনি মিউনিকে বেহালা শিখতে গিয়েছিলেন এবং জামান ক্লাসিকাল উমি’ খের 8లీగ్రీ মিউজিক সম্বন্ধে কিছু কিছ জানেন। ক্ষীরোদের গাঁও বেশ মেয়ে। নোগচি জাপানী কবিতা পড়লেন, রামানন্দবাব সামান্য কিছু বক্ততা করলেন—তারপর আমরা মীরা গপ্তের দলে বসে কিছুক্ষণ গল্প করে নীরদবাব ও সোমনাথবাবর সঙ্গে মোটরে *REI -ā'ū on I got go vs. colon Regal-q A mid summer Night's Dream দেখতে । আমি বাড়ি চলে এলাম । আজ সুধীরবাবদের বইয়ের দোকান থেকে বার হয়ে গোলদীঘিতে গিয়ে যখন বসেচি, তখন রাত সাতটা । ধোঁয়া এত বেশী যে আকাশে সপ্তমীর চাঁদকে ঢেকে ফেলেচে ; ট্রামের আলো, বাড়ির আলো, রাস্তার আলো, ধোঁয়ার জালের মধ্যে মিটমিট করচে। মনে পড়ল ১৯১৪ সালের এমন দিনের কথা। আজ একুশ বছর আগেকার ব্যাপার। আমি তখন ফাস্ট ইয়ারের ছাত্র, সবে কলকাতায় এসেচি—এই রকম ধোঁয়া দেখে মন তখন দমে যেত । নতুন এসেচি গাছপালা ও ইছামতী নদীর সংসগ* ছেড়ে । তারপর কতদিন কেটে গেল—কত বিপদ, আনন্দ, দুঃখ ও আশার মধা দিয়ে। তখন আমরা সবাই তরণ । The world was very young then—মামাদের তখনও বিয়ে হয় নি । এই বৈশাখে ছোটমামার বিয়ে হোল। এখন মন পরিণত হয়েচে–কত ভুল শুধরে নিতে পেরেচি, অপরের মত সহ্য করবার ক্ষমতা অভ্যাস করেচি—আমার মনে হয় জীবনে এই জিনিসটাই সব চেয়ে বড় । Intolerence-এর চেয়ে বড় শত্র জীবনে আর কিছু নেই। ইউনিভাসিটির আলোগুলোর দিকে চেয়ে সেই সব দিনের কথাই মনে পড়ছিল, সঙ্গে সঙ্গে আনন্দও পেলাম খুব । জীবনের একটা গভীরতার দিক আছে, সেটা সব সময় আমাদের চোখে পড়ে না—এই রকম নিজনে বসে না ভাবলে । কাল মতিলাল ও আমি ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে কাজ’ন পাকে অনেকক্ষণ বেড়ালম ও গল্প করলাম, মতিলাল আমার ক্লাসফ্রেড, ও কলেজ থেকে বার হয়ে কিস্ত বিবাহ বা চাকরি করলে না, পৈতৃক কিছয় টাকা আশ্রয় করে আজ ষোলো বছর ধরে ইপিরিয়াল লাইব্রেরীতে পড়চে—জানবার জন্যে যে, মানুষের আত্মা সত্যিই অমর কি না । ও বললে, মা মারা যাওয়ার পরে এ প্রশ্ন আমার মনে জাগে-তারপর ঢুকলম ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরীতে, নিজেও অনেক বই কিনেচি । বললাম—কি সিদ্ধান্তে উপনীত হলে ? ও বললে—মানষের আত্মা অমর। আমার আর কোনো সন্দেহ নেই। —তা তো হোল, কিন্ত জীবনটাকে দাখো এইবার । পড়াশনো করেই জীবন কাটালে, এবার সংসার কর । জীবনের অভিজ্ঞতা কোথায় তোমার ? মতিলাল বললে—এবার ইপিরিয়াল লাইব্রেরী ছাড়বো। একখানা বই লিখচি এ বিষয়ে । সেখানা শেষ হতে আর বেশী দেরি নেই। এবার ছাড়বো । তারপর ওখান থেকে ইডেন গডেনে বেড়াতে গিয়ে দেখি শেরিফ বড়লাটকে যে গাডেনপাটি দিচ্ছে সেই উপলক্ষে বাগানে চমৎকার আলো দিয়ে সাজিয়েচে-গাছপালার ফাঁকে পণচন্দ্র উঠচে যখন ঝিলের ধারে ফুটন্ত ফুলগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ওখান থেকে গিয়ে মাঠের মধ্যে ক্লাবের সাদা বেঞ্চির ওপর বসলমে—সামনেই পণি'মার চাঁদ । হানটা নিজজ'ন—কেবল আধজ্যোৎস্না অন্ধকারের মধ্যে একজন অশ্বারোহী পলিস এল; গেল । আধঘণ্টা পরে লড রবার্টস-এর প্রতিমাত্তি'র পাদপীঠে গিয়ে দেখি শুধ; গিরিশ বোস এসে শয়ে আছেন, ডাঃ রায়ের চাদর পাতা, কিস্ত তিনি বালিগঞ্জে গিয়েচেন এখনও আসেন নি। 80& বিভূতি-রচনাবলী তাঁর আসতে একটু দেরিই হোল । সোয়েন হেডিনের তাকলা-মাকান মরুভূমি পার হওয়ার গল্প করলাম—ওরা খুব মন দিয়ে শনলেন । সকালে বীরেশ্বরবাব এলেন । তারপর বালিগঞ্জে অন্নদা দত্তের বাসায় গেলাম, দপরে নিমন্ত্রণ ছিল । অন্নদাবাবরে শরীর খুব খারাপ—পবে দেশের জন্যে খুব করেচেন—এখন কেউ মানে না, পৌঁছে না—অথচ চট্টগ্রাম মেডিকেল কুলের জন্যে উনি কি ভয়ানক পরিশ্রমই না করেচেন। আমি সব জানি । ১৯২২-২৩ সালের কাউন্সিলে উনি চট্টগ্রামের প্রথম M. L. C. ছিলেন । আমি ওর কাগজপত্র আমাদের League Office থেকে টাইপ করে এনে দিতুম । অন্নদাবাবর মেয়ে মণির সঙ্গে পনেরো বছর পরে দেখা । ওর ভাল নাম যে মণিকুন্তলা তা আমি আজ এতকাল পরে ওর মুখে শনলাম । মণি তখন ছোট মেয়ে ছিল, —আমি যখন ১৯২২ সালে অন্নদাবাবরে বাড়িতে গিয়েছিলাম চট্টগ্রামে । আমার মুখে গল্প শনতে ও ভালবাসত। মণি যে বত্তি পেয়ে ম্যাট্রিক ও আই-এ পাস করেছিল—সে সব খবর আমি আজই প্রথম জানলাম । ওর ছোট একটি মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে রইলাম—বেশ চার মাসের ছোট খকৌটি । পৃথিবী অস্তুত, জীবন অভূত। কে ভেবেছিল যে আজ এত বছর পরে মণির সঙ্গে বালিগঞ্জে এভাবে আবার দেখাশোনা হবে । মণির মখে শুনলাম সপ্রভা মণিদের নিচে পড়ত এবং দু-জনে এক সঙ্গে দেশে যেত । ওখান থেকে বার হয়ে আমি আর বেগন এলমে মণীন্দ্র বসরে বাড়ি । সেখান থেকে সরমা বসরে বাড়ি,—রামমোহন রায় রোডে । বেশ সাজানো বাড়ি, সাজানো ড্রয়িং রাম । সরমা বস ও তাঁর একটি বোন গান গাইলেন বড় চমৎকার। মেয়েটি মিউনিকে ছিলেন, ইউরোপীয়ান মিউজিক শিখতেন। দেখে মনে হোল এই সব মেয়ে, মণি, সুরমা বস কেমন চমৎকার ঘর বর পেয়েচে, বেশ আছে । কিন্ত যার আরও বেশী ভালভাবে এ সব জিনিস পাওয়া উচিত ছিল—সে কোথায় পড়ে কট পাচ্চে, তার কিছুই হোল না । জীবনে এমন ট্র্যাজেডি কতই যে হচ্চে প্রতিনিয়ত। অথচ সে কি বধিতে, কি বিদ্যায়—কোন অংশে এদের চেয়ে কম তো নয়ই—বরং অনেক বেশী। ভেবে সত্যিই বড় কাট হয় । সরমা বসর সদর গান শনিবার সময়ে আরও মনে হোল পল্লীগ্রামের সেই সব অভাগিনী মেয়েদের কথা, যারা জীবনে কোন সখেই কোনদিন পেলে না । এমন কত আছে, জীবনে তাদের সঙ্গে কত ভাবে কত পরিচয় । আজ সন্ধ্যায় তাদের সবারই করণ মখ মনে পড়ে আনন্দের পরিবত্তে গভীর দুঃখ ও সহানুভুতিতে মন ভরে উঠল । , আজ সাতভেয়ে তলায় আমাদের বনভোজন গেল। বনগাঁয়ের আমাদের বন্ধবোন্ধব উকীল মোক্তার সকলেই ছিল, তা ছাড়া সাবরেজিস্টার ও ডাক্তার। বেলা দশটার সময়ে নেীকো করে আমরা গান করতে করতে নদীপথে চলেচি—পরেনো বনগী ও শিমুলতলার সবাই ভাবচে এ আবার বাবদের কি খেয়াল ! তারপর বটতলায় গিয়ে মাদর পেতে বসে আমরা সবাই খব গল্পগজব করলাম। আমরা ধর্মপান করতে পারি নি, কারণ প্রবণের দল সম্ববাদা কাছে কাছে রয়েচে । সতীশ মামাকে অনেক কৌশল করে সরিয়ে একটু আমাদের সবিধে করে নেওয়া গেল। এর আগেও গত পজোর ছয়টিতে একদিন সাতভেয়ে তলায় এসে খদ, খড়ীমা, ন-দি আমরা সবাই বনভোজন করে খেয়েছিলাম। এত বড় বটগাছ এখানে আর কোথাও নেই,—এক রাজনগরের বট ছাড়া। নদীর দ-ধারে এড়াষ্টির ফুল ফুটে আছে—কিস্ত কুঠীর মাঠের সে শোভা নেই এখানে । রামায়ণে সেই শ্লোকটা মনে পড়ল— উমি মখের 80ο সন্তি নদ্যো দন্ডকেষ তথা পঞ্চবটী বনে। সরয বিচ্ছেদ শোকং রাঘবস্তু কথং সহেৎ ॥ পশুবটি ও দণ্ডকারণ্যে তো কত নদনদী বৰ্ত্তমান, কিন্ত সরয বিরহ দুঃখ কি রামচন্দ্র সহ্য করতে পারেন ? আমার মনে হয় বারাকপুরের ওদিকের বনশোভা নেই এই অঞ্চলে । মাঠে এদিকে চাষ অত্যন্ত বেশী, পোড়ো জমি কোথায় যে যদাচ্ছবিস্তৃত বনভূমি গড়ে উঠবে ? আরণ্য-প্রকৃতি এখানে মানযের সংস্পশে এসে ভীতা, সঙ্কুচিতা তার সে উদাম বাধীনতা নেই।. রান্না শেষ হবার কিছর আগে আমরা নদীর ধারে রৌদ্রে বসে তেল মেখে সাঁতার দিয়ে স্নান করলাম। আমি তো তেল মাখলাম বোধহয় তিন বৎসর পরে। সাঁতার দেবার সময়ে খবে আনন্দ হোল । ওপারে কচি মটরের ক্ষেতে কেমন সন্দের ফুল ফুটেচে—এই দলের মধ্যে མྰ་སྦྲུ”ཨ ভালবাসে দেখলাম কেবল একমাত্র সাবরেজিসট্রার। আর কারো সেদিকে খেয়াল নেহ । বেলা তিনটের সময় আমরা সবাই খেতে বসলাম । নিশিবাব ও সরেনবাব পরিবেশন করলেন। সকলের সঙ্গে আমোদ করে খাওয়া হয়ে গেল কিছ বেশী । সন্ধ্যার সময় সেই ঝোঁকে আমরা গল্প করতে করতে ফিরলাম । সন্ধ্যার সময় যতীন ডাক্তারের দোকানে, আমার বাল্যবন্ধ নিতাই পাড়াইয়ের সঙ্গে যতীনদার দোকানের অংশ নিয়ে খুব ঝগড়া হোল । নিতাই নিজের জিনিসপত্র লেপ বালিশ, দাঁড়িপাল্লা নিয়ে ছোট ছেলের হাত ধরে অন্ধকার রাত্রে বাড়ি চলে গেল ৷ যতীনদা ওর প্রাপ্য টাকা দিলে না, আরও বললে, তুমি দোকানের তালের মিছরি খেয়েচ, তোমার ছেলে দধ খেয়েচে,–টাকা আমার যখন খুশি হবে তখন দেব । কার যে দোষ তা দ-পক্ষের কেউই ববতে দিলে না—এ বলে ওর দোষ, ও বলে এর দোষ । বাঙ্গালীর ব্যবসায় এই রকম করেই নন্ট হয়ে যায় । র্যাস্কোর পল ভারলেনের জীবনী পড়ছিলাম। নিচের লাইন কটি বড় চমৎকার । Et je m'en vais And I going Au vent man vais Born by blowing Qui us” emporte Wind and grief Deac, deta Flutter here and there Parcil a la As on the air Feville morte The dying leaf. শেষের ছত্ৰ কয়টির ছন্দ ও সরে এর্ত মধর যে বার বার পড়লেও তৃপ্তি হয় না। ওর প্রথম দুটো stanzas " Le Sanglots longs Long sobbing wind Des violins The violins of a autumn drove De l’automre Wounding my heart Doune Languer With languor as smart MonotOne. In monotone. Fout suffo quant Choking and hale Et leteme, quand When on the gale Sonne l’heune The hours sound deep Je me Son viens I call to mind 8ථH বিভূতি-রচনাবলী Des jours anciens Dead year behind Et je pleune And I weep. Verlain-এর বিষয়ে এ কথাটা ঠিকই মনে হয় যে, লেখক বৰ্ত্তমান যুগের লোককে মজাতে না পারলে সে কোন যুগের লোককেই মজাতে পারবে না । Bernard Shaw তাঁর Sanity of Art-এ যে কথা লিখেচেন, ভারি সত্যি । The writer who aims at producing the platitudes which are ‘not for this age but for all time' has his reward in being unreadable in all ages. Whilst Plato and Aristophanes peopling Athens with living men and women, Shakespeare peopling with Elizabethan Mechanics and Warwickshire hunts, Carpaccio painting the life of St. Ursula exactly as if she were a lady living in the street next to him, are still alive and at home everywhere among the dust and ashes of thousands of academic, punctilious, archaeologically correct men of letters and art. Montaign siszczą gryfů posT qŲ ETH HISIGII I “He was the greatest artist of all—he knew the art of living”. অনেক দিন আগে ঠিক এই দিনে আজমাবাদ কাছারী থেকে ঘোড়া ছটিয়ে কলবলিয়া পার হয়ে কাটারিয়া পলের ওপরে সয"াস্ত দেখেছিলাম । মেসে বসে আজ ডালহাউসি কোয়ার ঘরে বেরিয়ে এসে সে কথা মনে পড়ল ডায়েরী দেখে । কি উম্মন্তে জীবনের পরে কি বন্ধ জীবন যাপন করেচি এখানে । ठिक সেই বিকেলেই আজ বইয়ের গদামে বসেছিলাম ! আজ সারাদিনটা অত্যন্ত ঘোরা হয়েচে, বেলা সাতটা থেকে রাত এগারোটা পয্যন্ত । আমার মেস থেকে বেরিয়ে নীরদ চৌধুরীর বাড়িতে চা খেয়ে পশুপতিবাবর বাড়ি গিয়ে পেনেটীর বাগান-বাড়ি যাবার কথা বলি। বন্ধদের নতুন বাসায় যাই, তার আগে একবার নতুন পত্রিকার আপিসেও যাই । বেশী আন্ডা দিলে একটা অবসাদ আসে—শারীরিক ও মানসিক, যদিও আমি তা আজ অনুভব করি নি, তবুও আমার মনে হয় এতে কোনো আনন্দ নেই। তবে সপ্তাহে একদিন এমন বেড়ানো যেতে পারে—যদি অন্য সব ক’টা দিন নিজের কাজ করা যায় । লেখাপড়া সম্বন্ধেও দিনের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণীর ও বিভিন্ন বিষয়ের বই পড়া খুব খারাপ । এক বিষয়ে মনোনিবেশ অভ্যাস করতে হয়, এবং যে এক বিষয়ে মনোনিবেশ করে, সে হয়তো আরও পাঁচটা জিনিস থেকে বঞ্চিত আছে, কিন্ত সে সটি করতে পারে। অনেকদিন পরে পানিতর গেলাম। রাত্রে ইটিল্ডা ঘাটে নেমে একজন লোক পাওয়া গেল। সে আবার ইটিল্ডা বাজারের ডাক্তার। হাটের ভিড় ঠেলে রাত্রে পানিতর গিয়ে পৌছাই । উপেনবাবরে বাড়ি বেড়াতে গেলাম, বন্ধ শয্যা আশ্রয় করেছেন। পট্টীর সঙ্গে দেখা করলাম বাড়ির মধ্যে গিয়ে, ওরা জল-খাবার খাওয়ালে। নরেনের বাড়িতেও আবার খাবার খেলাম । তারপর পানিতরের ওপরের ঘরে ( দোতলার উপরের ঘরে ) রাত্রে শলেম । কোণে সেই খাটখানা পাতা আছে, প্রথম পানিতরে গিয়ে ঐ খাটখানাতে আমি শয়েছিলাম মনে আছে । ঠিক সেই পরানো জায়গাতে খাটখানা এখনও পাতা। রাতে কত কথা মনে পড়ল। আজ কত দিনের কথা যেন সে সব । জাঙ্গিপাড়ার দিনের কথা, সেই অন্ধকারময় উমি্মুখর 8ర్చి দুঃখের দিন । তখন কি ছেলেমানুষ ছিলম আর কি নিবোধই ছিলম তাই এখন ভাবি ৷ তখন বি-এ পাস করে, কি না জানি ভাবতাম নিজেকে । আমি খেয়া পার হয়ে বাসে উঠে আসচি, বশীর মহাশয়ের সঙ্গে পথে দেখা । তাঁর সঙ্গে দেখা করে কথা বলে আবার বসিরহাট এলমে ওদের নতুন বাসায় । দিদি ও পাঁচী ওখানে আছেন । দিদিকে দেখলে চেনা যায় না এমন নয়, তবুও সে দিদি আর নেই—কি যেন নেই মুখে যা তখন ছিল । একথা বলা বড় কঠিন । বয়েস হলে মানুষের মুখের কি যেন চলে যায়, এর উত্তর কে দেবে ? পাঁচীকে তো চেনাই যায় না । দেড়টার গাড়িতে পাঁচীর সঙ্গে এক গাড়িতে কলকাতায় এলাম । * ঠাকুরমায়ের গ্রাধের পর সেই মাটি’ন লাইনের গাড়িতে বসিরহাট থেকে এসেছিলাম, তখন আমি জাঙ্গিপাড়া কুলে চাকরি করি। কলেজ থেকে বার হয়ে প্রথম চাকরিতে ঢুকেচি ৷ আর আজ এই সতেরো-আঠারো বছর পরে মাটিনের গাড়িতে চড়ে বসিরহাট থেকে এলাম । সতেরো-আঠারো বছরের আগের আমি আর আজকার আমার চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতা, জীবনের outlook সব বিষয়ে কি ভয়ানক বদলে গিয়েচে তাই ভাবচি । দিদি তাঁর মেয়ে মানীর বিয়ের জন্যে ট্রেনে উঠবার সময় পয্যন্ত বললেন । বললেন— ভেবেছিলাম তোমার সঙ্গে দেখা হোল না, এখানে যখন এলম, তখন দেখা হযে তোমার সঙ্গে। কিন্ত এ কথায় তেমন আনন্দ পেলাম না। আগে হলে দিদির কথায় কত খুশি হ’তাম কিন্তু আজ—মানুষের মন কি বদলেই যায় ! মন যে কি বহরপী দেবতা, কি বিচিত্র রহস্যময় তার প্রকৃতি, ভেবে দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয় । সন্ধ্যাবেলা বন্ধর বাসায় গিয়ে চা খেয়ে একটু গল্পগুজব করলাম রাত নটা পয্যন্ত । আসবার সময় ১০নং রটের বাসে অনেকদিনের অচল একটা টাকা চলে গেল । গত পুজোর সময় টাটানগরে খ্যাদা টাকাটা আমায় নোট ভাঙ্গানি দিয়েছিল, কিছুতেই এতদিন চলে নি । আজ সকাল থেকে কত ছবি চোখের সামনে এল গেল । ইটিডোর পথ, চাঁদা কাঁটার বন ইচ্ছামতীর ধারে। বিস্তৃত ইচ্ছামতী, ইটিল্ডার ঘাটে লোকে সব বসে রোদ পোয়াচ্চে, ইন্দবাবর ছেলে অনাদি, নরেনের ছেলে, দিদি, দিদির মেয়ে মানী, পাঁচী। ছোট লাইনে আসবার পথে মনে পড়ল, আগে রবীন্দ্রনাথের বলাকা থেকে কবিতা মনে মনে আবৃত্তি করতুম ‘এবার আমায় সিন্ধতীরের কুঞ্জবীথিকায় । কবিতাটি বড় প্রিয় ছিল তখন। কাল সারাদিন যে বসিরহাট পানিতর অঞ্চলে কাটিয়েছি, আজ যেন সে সব স্বপ্নের মত মনে হচে । ইচ্ছামতীর তীরের চাঁদী কাঁটার বনের পথে, ওই স্রোতাপসারিত কদমাক্ত তীরভূমির সঙ্গে প্রথম যৌবনের যে সব সমতি জড়িত, তা কাল একটু একটু অপষ্ট মনে এল । প্রসাদকে কাল বড় ভাল লেগেচে—আর প্রসাদের বাবাকে । আজ সকালে উঠে রমাপ্রসনের বাড়ি গিয়ে শনি সে গিয়েচে আপিসে । বাসায় ফিরেই হঠাৎ গিরীনবাব এসেচে দেখলাম । সে বললে, রাজা নাকি মারা গিয়েচেন শুনেচেন । আমি অবিশ্যি জানতুম পঞ্চম জৰ্জ খুব অসহে, কিন্তু এত শীঘ্ৰ যে তিনি মারা যাবেন, তা ভাবি নি। খবরের কাগজ মেসে আসে ‘অমৃতবাজার পত্রিকা”—তাতে মাত্র এই খবর দেখা to “King's life is peacefully drawing a close’—ion isson vssons: "[MI too স্টেটসম্যান দেখে এসে বললে রাজা মারা গিয়েছেন বাস্তবিকই । স্কুলে গিয়ে তখনি ছয়টি হয়ে গেল। নতুন একটি প্রকাশক আমার কাছে ঘরেছিল বই নেবার জন্যে, তাকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে গেলাম শৈলজাবাবরে বাড়ি, সেখান থেকে বিচিত্রা 880 বিভূতি-রচনাবলী আফিসে, সেখান থেকে নাট্যকার যোগেশ চৌধুরীর বাড়ি। রাত দশটায় বাড়ি ফিরলাম। সম্রাট বন্ধ হয়ে পড়েছিলেন এবং গত ১৯২৮ সালে অত বড় অসুখ থেকে উঠে কাব্য হয়েও পড়েছিলেন । মনে পড়ে ১৯১২ সালের কথা, যখন তাঁর দরবার উপলক্ষে আমাদের স্কুলে ভোজ হয়েছিল, আমি তখন বনগ্রাম স্কুলের ছাত্র। সেই উপলক্ষে জীবনে প্রথম বারোঁস্কোপ দেখলাম বনগ্রামে ডেপুটিবাবর বাসার প্রাঙ্গণে । সে সব বাল্যসমতিতে পৰ্য্যবসিত হয়েচে— তারপর দীঘ* চব্বিশ বৎসর কেটে গেল । জীবনের পথে আমিও কতদরে অগ্রসর হয়ে এসোঁচ । বত্তমান প্রিন্স অফ ওয়েলসকে বালক দেখেছি ( ফটোতে অবিশ্যি ), দেখতে দেখতে তাঁর বয়স এখন হোল তেতাল্লিশ বছর । জীবন, বছর, আয় হহে করে কেটে যাচ্চে । বিরাট স্রোতস্বতী এই রহস্যময়ী জীবনধারা, কে জানে একে ? ডিসরেলী বলেছিলেন জীবন সম্বন্ধে "youth is a blunder, maturity is a struggle and old age is a regret’—5Neos. f*IGoos & summing up j of: সত্যি কিনা কে জানে ? কাল রাজপরে অনেকদিন পরে বেশ কাটল । বেলা পড়লে আমি ও ভোবল ধ্বনি ডাক্তারের বাড়ি বসে গল্প করে বোসপুকুরে বেড়াতে গেলাম। তখন কি চমৎকার জ্যোৎস্না উঠেচে, বোসপুকুরের ওপারের নারকেল গাছগুলোর কি রপে ফুটেচে । ফিরবার পথে একটা বাঁধানো পাকুরের ধারে দু-জনে বনে গল্প করলাম। বাঁধা ঘাটটা বড় সদর । এই রাস্তাটার ধার দিয়ে একবার আমি কিশোরী বসর বাড়ি থেকে বোসপকূেরে বেড়াতে এসেছিলাম, তখন মা আছেন,—ওখানে পতুরঘাটে একটা ছেলে এসে জন্টল, সে থাইসিসে ভুগছিল বলে তার বাড়ির লোকে সবসান্ত হয়ে তাকে নৈনিতালে রেখেছিল । সে এসে বললে—এদেশে কোন কিছর ভাল বিষয়ের চচ্চা নেই, এখানে বসে মন টিকচে না। তারপর আমরা গেলাম খকেীদের বাড়ি, সেখানে আহারাদির পরে খলজী পাড়ার লোকের নানা দুঃখের কাহিনী বললে ? মহেন্দুবাবর পনেরো বছরের নাতনীটি বিধবা হয়েছে, তার মাও বিধবা, জায়ের ছেলের গলগ্রহ, কারণ ধীরেন ( ওই ছেলেটির নাম, এক সময়ে ও আমার ছাত্র ছিল ) বাড়ির মধ্যে একমাত্র রোজগারে লোক। ধীরেনের মায়ের কটক্তির জালায় ওদের মা ও মেয়ের জীবন অতিষ্ঠ হয়েচে । তারপর মেয়েটি আবার অন্তঃসত্বা। মা বলে মেয়েকে, তুই বিষ খেয়ে মরে যা, আমি তোকে নিয়ে কি করি । একাদশীর দিন মেয়েটা মরে যাওয়ার যোগাড় হয়। তার ওপর পেটের ছেলে টান ধরে, জলতেন্টায় ও খিদেতে, একাদশীতে বড় কট পেয়েচে। সবাই বলেছিল জল খেতে দাও, মহেন্দুবাবর স্ত্রী ও দেবী দু-জনেই বলেচে, একে তো বাড়ির দই ছেলে (মহেন্দুবাবরে মেজো ও সেজো ছেলে ) এর আগে মারা গিয়েচে, একাদশীতে বাড়ি বসে বিধবা জল খেলে, পাছে আরও কোন অকল্যাণ হয় ! দেবী বলেচে, আমার তো ওই বাচ্চা, আমার সে সাহস হয় না বাবা, জল খাওয়াতে হয় ও মেয়েকে নিয়ে তুমি অন্যত্র যাও । কাজেই মেয়ের জল খাওয়া হয় না। এরা একটা কথা ভুলে যাচ্চে— “By day and by night, year in and year out, century after century, there is going out a colossal broadcast of power which gives real life to all who will enter into it. Normal function of the organism is to act as a receiving set for Life Power. Clear out hatred, malice, lust, fear and all other frictions and you will find that entirely without any other effort উমি্মুখর 88్ఫ on your part, there will pervade your being and your life that hitherto unheard wave of spiritual power.” & আমরা আরও ভুলে যাই যে, পাপ জিনিসটাতে ভগবান রাগ করন বা না করন— "Sin should be synonymous with bad radio production. A bad man is known by its poor reproduction of God’s life.” “When we began to deny ourselves for the good of others it was a highly important step in the soul's development and destined to lead on to increasing concern for others’ good. Then we begin to realise God with a personal interest in our life and we decide to consider his wishes.” আরও কথা আছে । টাকা রোজগারই তো সংসারের উদ্দেশ্য নয়। জীবনের চরম সার্থকতা আসবে মনের পথ ধরে । কিন্ত সময় আসে যখন মনে হয় ভগবান জীবনের কেন্দ্র, তাঁর কাছ cost or soi STREA “It is well to have a clear-cut aim. Unless we are striving to attain, our policy is drift, and drift will not bring us the lost things. The lost things have to be thought for, prayed for, worked for and the supermost thing in earthly life is the development of soul qualifiication for a spacious and satisfying activity when entering the Beyond.” Qi “It is the outermost or highest sphere. Life there is realised more frmpersonally. One's whole work and activity on that sphere would be solely for the good of others. There would be no personal bias, selfiish aims of ambitions would be impossible.” আজ বেশ একটা অভিজ্ঞতা হোল। মাঘী পণিমা উপলক্ষে সকাল সকাল কুল বন্ধ হবার পরে গেলমে কাজ’ন পাকে ডালিয়া ফুল ফোটা দেখতে । সেখান থেকে বেরিয়ে একবার ভাবলাম ইপিরিয়াল লাইব্রেরী গিয়ে কিছু একটা পড়ব । সাত পাঁচ ভেবে সামনেই একখানা টালিগঞ্জের ট্রাম দেখে উঠে পড়লাম তাতে । টালিগঞ্জ ডিপোতে নেমে একটু ফাঁকা মাঠ কি পাড়াগাঁ খুজে নেবার জন্যে হোটে চলেচি, কালী ফিল্মের স্টুডিও পার হয়ে একটা খাল পেলাম। খালে খেয়া আছে, আধপয়সা করে তার পারানি । খাল পেরিয়ে যাচ্চি । একটা লোক আমার আগে যাচ্ছিল, তুার মাখে শনলাম যে নিকটে কোন গ্রামে মাঘীপণিমা উপলক্ষে কি একটা মেলা হয়। সেখানে চলেচে সে । আমি তার সঙ্গ নিলাম। ভাবলাম দেখাই যাক কি রকমের মেলা। চলেচি তো চলেইছি, দিব্যি পাড়াগাঁ, বশিঝাড়, শিমল গাছে রাঙা ফুল ধরেচে, ঘে"টুবনে মুকুল দেখা দিয়েচে, সজনে ফুলের মিষ্টি গন্ধ বেরচ্ছে, দু-একটা কোকিলও ডাকচে । ক্ৰমে দর থেকে লোকজনের কলরব শোনা গেল । দু-একটা দোকান বসেচে, অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে কাছে গিয়ে দেখলাম। একটা নীচু পাঁচলে ঘেরা বাগানবাড়ি মত জায়গায় অনেকগুলি মেয়ের ভিড়—প্রায় চার পাঁচ শো মেয়ে। পরষ তত বেশী নয়, সবাই মহা ব্যস্ত, ইতস্ততঃ ছটোছুটি করচে, ছেলেমেয়ে কাঁদচে, চীৎকার করচে । বাগানবাড়িতে ঢুকে দেখি ছোট একটা একতলা বাড়ির সামনের উঠোনে গাছতলায় প্রায় দু-তিনশো মেয়ে ছেলেপলে নিয়ে শালপাতা পেতে বসে আছে। শুনলাম তারা খেতে বসেচে কিন্ত আগের দল খিচুড়ি সব খেয়ে সাবাড় করে দিয়েছে। খিচুড়ি চড়েচে, আবার না নামলে এদের খেতে দেওয়া যাবে না। মেয়েরাই সেখানে কী, তারাই সবাইকে দিচ্চে থাচ্চে, ৪৪২ বিভূতি-রচনাবলী আদর-আহবান করচে, কাউকে বা শাসন করচে । একটা ছোট ঘরের মধ্যে সবাই ভিড় করে ঠাকুর দেখতে ঢুকচে দেখে আমিও ঢুকলমে । ছোট কালী প্রতিমা, নাম সশীলেশ্বরী। এক বন্ধ ভদ্রলোক বললেন, এখানে একজন বন্ধা থাকেন, তিনিই এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেচেন। একটু পরে সেই বন্ধাকেও দেখলাম, সবাই তাঁর পায়ের ধলো নিয়ে প্রণাম করচে । আর তিনি সবাইকে মিটি কথার বলচেন—না খেয়ে যেও না যেন বাবা । একটা ইট বাঁধানো চৌবাচ্চায় খিচুড়ি ঢালা হচ্চে, পাশেই আর একটা চৌবাচ্চায় কপির তরকারি। সকাল সকাল খাবার জন্যে সবাই উমেদারী করচে—অনেক দরে যাব, মেয়েছেলে নিয়ে এসেচি, ভাড়াটে গাড়ি, প্রসাদ দিয়ে দিন । আমাকে একটা ঘরে খাওয়াতে বসালে । আমার অত্যন্ত কৌতুহল হোল এখানে কি খাওয়ায় না দেখে যাবো না । তাই একটি মেয়েকে বলতেই সে আমায় ঐ ঘরটায় নিয়ে একখানা পাতা করে বসিয়ে দিলে । ঘরের মধ্যে আমার বসবার আসনের কাছেই আর একটি বাইশ-তেইশ বছরের মেয়ে বসে খাচ্ছে আর তার ছোট ছোট দটি ছেলে মেয়েকে খিচুড়ি মুখে তুলে খাওয়াচ্চে । যে মেয়েটি আমায় পাতা করে বসিয়ে দিয়েছিল সে কোথায় চলে গেল । আর একজন আমায় পরিবেশন করলে। খিচুড়ি, চচ্চড়ি, আলর দম, কপির তরকারি, বেগন ভাজা, চাটনি, পায়েস, দই, মড়কী ও রসগোল্লা। তা খর দিলে, পাতে ঘি দিলে। এটা নেবে, ওটা নেবে জিজ্ঞেস করে খাওয়ালে । কেমন যত্ন করলে যেন বাড়ির ছেলের মত, অথচ আমাকে তারা জীবনে এই প্রথম দেখলে । মেয়েদের এই একটা গণ, খাওয়াতে মাখাতে যত্ব করতে ওদের জড়ি মেলে না । খাওয়া শেষ হোল, আর একটি মেয়ে আবার সাজা পান দিলে । এমন মচ্ছবের খাওয়ায় যেখানে রবাহত অনাহত কত আসচে যাচ্চে তার ঠিকানা নেই, এখানে কে আবার খাওয়ার পরে পান দেয় ! এ আমি এই প্রথম দেখলাম । দেখে কন্ট হোল আমি যখন খাওয়া শেষ করে বাইরে এলাম, তখন সেই অলপ বয়সের বধাটি রোয়াকের সামনে পাত পেতে বসে আছে—তখনও তাদের কেউ খেতে দেয় নি। এদের জিনিসপত্র বেশী কিস্ত লোক কম । খাওয়ার সময়ে পরিবেশনকারিণী মেয়েরা বলাবলি কচ্ছিল—আর পারি নে বাপ । সকাল থেকে খাটচি, আর রাত বারোটা পৰ্য্যম্ভ কত খাটি ? আসচে বছর আর এখানে আসা চলবে না দেখচি । ওখান থেকে বার হয়ে একটা বশিবনের মধ্যের পথ ধরে অনেকটা হেটে গেলাম, বেলা পড়ে এসেচে, বাশবনে বেশ ঘন ছায়া, এক জায়গায় সাতটা ভাঙা শিব মন্দির সারি সারি, অনেকগুলো শিমল গাছ। ফুলে ফুলে রাঙা । বড় মাঠে বসে খানিকটা বিশ্রাম করলামতারপর এসে ট্রাম ধরে চৌরঙ্গির মোড়ে নামলম। সেন্ট্রাল এভিনিউ দিয়ে হেটে সন্ধীরবাবর দোকানে এসে ভাবলাম সরোজকে গল্পটা করব, দেখি সরোজ বেরিয়ে গিয়েচে । কি একটা অবণ'নীয় আনন্দ পেয়েছি আজ ! অথচ কেন যে সে ধরনের আনন্দ এল, এর কোন কারণ খুজে পাই নে। নীরদবাবর বাড়ি যখন বসে আছি, তখনই এটা প্রথম অনুভব করলাম, কিন্ত তখনই পপুপতিবাব ফোন করলেন এখনি আসন ইউনিভাসিটি ইনস্টিটিউটে প্রমথ বিশীর নাটক হচ্ছে । নীরদ যেতে পারলে না, আমি মিসেস দাসগুপ্তকে নিয়ে ওদের মোটরে ইনস্টিটিউটে এলম । সেখানে পরিমল গোস্বামী, প্রমথ বিশী এবং সবাই হাজির। পরিমল বললে, আপনার দণ্টিপ্রদীপ’ পড়েচি, কাল রাত্রে । বড় ভাল লেগেচে । আরও গল্পগুজব চলল। আমি গিয়ে বৌঠাকরনের সঙ্গে দেখা করে এলমে । তারপর ওখান থেকে পাক সাকর্ণসে মণীন্দ্র বসরে বাড়িতে চা-পাটিতে এলাম, কারণ সেখানে জ্যোৎস্নার উমি্মখের 880 বিবাহের কথা হবে অন্নদাশঙ্করের আত্মীয়ের সঙ্গে এবং আমিই তার ঘটক। পাক সাকাসের বাস থেকে নেমে যখন মণীন্দ্র বসার বাড়ি ষাচ্চি, তখন ছিন্নভিন্ন বাদলা মেঘের অন্তরালে প্রতিপদের চাঁদ উঠেচে, সে যে কি এক সৌন্দয্যভরা ছবি, না দেখলে বোঝানো যাবে না। তখনই আমার বিহারের জঙ্গলের ও তার হতভাগ্য দরিদ্র নরনারীদের কথা কি জানি হঠাৎ মনে পড়ল, তাদের মধ্যে ছ-বছর থেকেচি, তাদের সব অবস্হাতে দেখোঁচ, জানি। আর সেই নিজজন বনানী ! রাত্রে পরিপণ জ্যোৎস্না উঠেচে যখন বিছানাতে এসে শুই ; মণীন্দ্রবাবুর বাড়িতে চার রায়, সরেন্দ্র মৈত্র এদের সঙ্গে spiritualism নিয়ে ঘোর বাদানুবাদ করে বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েচি। তারপর হিমালয়ের শঙ্গরাজি ও গঙ্গার উৎপত্তিস্হান সম্বন্ধে আর একপালা বাদানবোদ । আজ ট্রামে স্কুল থেকে গেলমে গঙ্গার ধারে । গিরিজাপ্রসন্ন সেনের কবিরাজি ডিসপেনসারির মধ্যে আয়েল-পেণিটংখানা ঠিক সেই জায়গাটিতে আছে -- বাবার সঙ্গে কতবার ভগবতীপ্রসন্ন কবিরাজের কাছে আসতুম। বাড়িটা সেইরকমই আছে, তবে খাব পরোনো হয়ে পড়েচে । ভাবলাম আজ এই যে এই ঘরে ঢুকলম, জীবনে যা কিছল সব হয়েচে, সেবার এই ঘর থেকে বার হবার ও এবার পুনরায় ঢুকবার মধ্যে, সেই যে ছেলেবেলায় কিশোর কাকা সত্যনারায়ণের পুথি পড়তেন তাও,--যুগল কাকাদেরঢে’কশেলে আমি, ভরত, নেড়া বাদলার দিনে খেলা করতাম তাও, বাবার সঙ্গে আমি হ:কোর দোকানে বসে লুচি খেয়েছিলাম তাও, প্রথম যেদিন ধানবনের মধ্যে দিয়ে স্কুলে ভক্তি হতে যাই বনগাঁয়ে তাও, সব কিছল,—সব কিছ, কত কথা মনে হোল, সারা জীবনটা যেন এক চমকে দেখতে পেলাম গঙ্গাপ্রসাদ সেনের বড় অয়েল পেন্টিংটার সামনে বসে । তারপর গিরিজাবাবরে সঙ্গে ওদের বৈঠকখানায় অনেকক্ষণ বসে গল্প করি। কত পরোনো আমলের ছবি টাঙানো, যে সব ছবি আর এখন মেলে না। উঠোনের সেই জায়গাটি যেখানে বসে বাল্যে একদিন মধ্যছন্দার অভিনয় দেখেছিলাম ভূষণ দাসের যাত্রার দলে, সব সেই রকমই আছে তবে যেন বড় পরোনো হয়ে গিয়েচে । বারাকপরে শৈশবে যাপিত কত রাঙা সন্ধ্যা, পাখীর ডাক ও মায়ের মখ মনে পড়ল— বাড়ির পিছনে বাঁশবনের কত দিনের কত ছায়া গহন, রাঙা রোদ গাছের মাথায় মাখানো সন্ধ্যা। যে সন্ধ্যা, যে শৈশব, যে বারাকপর আর কখনও ফিরে আসবে না আমার জীবনে । ওখান থেকে বার হয়ে গঙ্গার ধারে বাঁধানো ঘাটের পৈঠায় অনেকক্ষণ বসে রইলাম। কালোর বৌভাতে শনিবার বাড়ি গিয়েছিলাম। দাপরে খয়রামারির মাঠে যেমন বেড়াতে যাই,—গিয়েচি। একটি ঝোপের ধারে বৈচি গাছে কচি বৈচি পাতা গজিয়েছে, মাথার ওপর নীল আকাশ, কি ঘন নীল, বাতাসে যেন সঞ্জীবনী মৰ্ম্ম, মাঠের সন্বলি ছড়ানো শিমল গাছ ফুলে রাঙা হয়ে রয়েচে । ট্রেনে আসতে কাল শনিবারে রাঙা শিমল ফুলের শোভা মন্ধে হয়ে শধে চেয়ে চেয়ে দেখোঁচ, মনে মনে ভাবি প্রতি বৎসর দেখচি আজ চল্লিশ বছর কিস্ত এরা তো পরোনো হোল না, কেন পরোনো হোল না—কেন প্রতি বৎসর শিরায় শিরায় আনন্দের স্রোত বইয়ে দেয়, তা কে বলবে ? গত শক্লেবারে আবার বসিরহাট গিয়েছিলাম। মাঠে মাঠে শিমল গাছগুলি রাঙা হয়ে উঠেচে ফুলে ফুলে, বৈচি ফুল ফুটেচে বাঁশবনের শুকনো ঝরা লতার মধ্যে, বাতাবী লেব 888 বিভূতি-রচনাবলী ফুলের গন্ধও মাঝে মাঝে পাচ্চি । বসিরহাটে নামলম বিকেলবেলা, প্রসাদের সঙ্গে বাঁধানো জেটির ঘাটে গিয়ে বসে রাঙা রোদ মাখানো ইছামতীর ওপারের দশ্যটি দেখলাম। এই সহানটিতে দাঁড়িয়ে একদিন গৌরী বলেছিল—“গাড়িতে কেমন কলের গান হচ্ছিল, শনছিলাম মজা করে । সে কথাটি বললাম প্রসাদকে। রাত্রে অনেকক্ষণ পয্যন্ত দিদির সঙ্গে গল্প করলাম। পরদিন সকালে অথাৎ শনিবার কবি ভুজঙ্গভূষণ রায় চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। বয়স চৌষট্টি-পয়ষট্টি বছর হয়েচে, কিন্ত মাথায় একটা চুলও পাকে নি, আমায় দখানা বই দিলেন, চা খাওয়ালেন। গীতার কাব্যানবাদ করচেন পড়ে শোনালেন, বেশ লোক ॥ " এই দিন বিকেলের ট্রেনে ফিরলমে কলকাতায়, ওপথে গাছপালার সৌন্দয্য তেমন নয়, একটি মেয়ে ট্রেনে কেমন গান করে শোনালে । সন্ধ্যার সময় নীরোদবাবর বাড়িতে সাহিত্য সেবক সমিতির অধিবেশনে যেতে যেতে নিউজনি অকল্যান্ড স্কোয়ারে বসে কি অপবে* আনন্দ পেলাম, দু-একটা নক্ষত্রের দিকে চেয়ে । এ আমার অতি সপরিচিত পুরাতন আনন্দ । ছেলেবেলা থেকে পেয়ে আসচি, এতে অবিশ্যি আশ্চয্যের কথা কিছু নেই। অনেকে আমার এ আনন্দটা বোঝে না, কিন্ত তাতে কিই বা যায় আসে—আনন্দের উপলব্ধিটুকু তো আর মিথ্যে নয়। a বাইরে কোথাও ভ্রমণের একটা পিপাসা আবার জেগে উঠেচে । ভাবচি আফ্রিকা যাব, শম্ভু আজ এসেছিল, সে বললে, তার কে একজন আত্মীয় ম্যাকিনন ম্যাকেঞ্জির আপিসে কাজ করে, তারই সাহায্যে যদি কিছদ হয় দেখবে ও চেষ্টা করে। আজ সারাদিন স্কুলেও ওই কথাই ভেবেচি, বেশীদর কোথাও যেতে চাই নে ৷ ~কিস্ত জগতের খানিকটা অন্ততঃ দেখতে চাই । সেদিন P. E. N. Club-এ যে মধ্যাহ ভোজ হোল বোটানিক্যাল গাডেনে—সেখানে অমিয়া বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ হোল । মেয়েটি খুব বৃদ্ধিমতী, অক্সফোড" থেকে এম-এ পাস করে এসেচে । পরের বহম্পতিবারে ইদের ছটিতে বাড়ি এলাম। আসার উদ্দেশ্য এই ফাগানে বাংলার বনে, মাঠে অজস্র ঘে"টুফুল ফোটে—অনেকদিন ঘেটুফুলের মেলা দেখিনি, তাই দেখব । তাই আজ সকালে এঞ্জিনিয়ার ও সাবডেপুটীবাবর সঙ্গে মোটরে বেড়াতে গেলাম চৌবেড়ে । সেখানে ওদের ইউনিয়ন বোডের এক কাজ ছিল, মিটিয়ে সবাই মিলে যাওয়া হোল দীনবন্ধ মিত্রের বাড়ি । ভাঙা সেকেলে পরোনো কোঠা, বট অশ্বখের গাছ গজিয়েচে—তাঁর জন্মস্হান দেখলাম—দীনবন্ধ মিত্রের এক জ্ঞাতি ভাইপো বাড়ির পিছনে একটা সজনে তলা দেখিয়ে বললেন—ঐ গাছতলায় তখনকার আমলে অতুিড় ঘর ছিল—ওইখানে দীনবন্ধু কাকা জন্মেছিলেন। আমি ও মনোরঞ্জনবাব সাকেলি অফিসার স্হানটির্তে প্রণাম করলাম। তারপর ঘে"টুফুলের বন দেখতে দেখতে মাঠে মাঠে অনেকগুলো চাষাদের গ্রাম ঘরে বেড়ানো গেল— চৌবেড়ে, নহাটা, সনেকপর, দমদমা, মামদপুর ইত্যাদি । বেলা একটার সময় এলাম কালীপদ চক্লবত্তীর বাড়ি । সেখানে কালীপদ খুব খাতির করলে । ওখান থেকে বার হয়ে আমি নামলমে চালকী। সেখানে খাওয়া দাওয়া করলাম। চালকীর পিছনের মাঠে কি ঘেটুবনের শোভা । দিদিদের বাড়ি বসে ঘটার বিয়ের বড়মানষি গল্প শুনলাম। সন্ধ্যার কিছ আগে বনগাঁয়ে গিয়ে খয়রামারির মাঠে ঘেটুফুলের বনের মধ্যে একটা শুকনো গাছের গাড়ির ওপর কতক্ষণ বসে রইলাম । দরে গাছের ফাঁকে চাঁদ উঠেচে-মাথার ওপর দু-চারটা তারা। মনের কি অপদেব আনন্দ । কাছে ছিল একখানা বই—বেদান্ত দশনের ব্যাখ্যা। সেখানে ঐ রকম স্থানে ফুটন্ত ঘেটুফুলের বনের মধ্যে বসে পড়ে যেন একটা মসল Tk উমি্মখের 88& অনুভূতি নিয়ে ফিরলাম। ঘোষপাড়ার দোলে এলমে অনেকদিন পরে । আজ সকালে বনগী থেকে নটার ট্রেনে বার হয়ে রানাঘাটে সাড়ে দশটায় শাস্তিপরে লোকাল ধরলাম, দোলের মেলায় আসতে হোল বেলা সাড়ে বারোটা । ছোট মাসীমা খেয়েদেয়ে ওপরে শয়ে ঘুমিয়েছিলেন, আমি আসতে চা করে দিলেন। দর্পরের রোদে বাঁশবাগান আমার বড় ভাল লাগে—আর এই সব বাঁশরনের সঙ্গে আমার আশৈশব সন্বন্ধ। বিকালে একটু ঘুমিয়ে উঠে মেলায় গিয়ে একটি বড় সাংঘাতিক ঘটনা চোখের ওপর ঘটতে দেখলাম। একজন গন্ডা জনৈক যাত্রীর পকেট কেটেছিল, পাশেই ছিল একজন হিন্দুস্হানী ভলাণ্টিয়ার, সে যেমন ধরতে গিয়েচে, আর গণডাটি ওকে মেরে দিয়েচে ছরি। আমি যখন গেলাম, তখন আহত লোকটাকে ওদের তাঁবুতে এনে শুইয়েচে, খব লোকের ভিড়। একটু পরেই সে মারা গেল । ওদিকে সেই গডোটিকেও পলিশে ধরে ধরে ফেলেচে—তাকেও লোকে মেরে আধ-মরা করেছে । মেলাসন্ধ লোক সম্প্রস্ত—সবাই বলচে, এমন কাণ্ড কেউ কখনও এমন সহানে ঘটতে দেখে নি ! আমি আরও খানিকটা এদিক ওদিক ঘরে ফিরে চলে এলমে । রায়বাড়ির পাশের একটা ঘন বনের মধ্যের পথ দিয়ে ঢুকে একটা শুকনো পুকুরের পাড়ে ঘাসের ওপর গিয়ে বসলাম । ফিরে যখন আসচি তখন একটা শিমল গাছের বাঁকা ডালপালার পেছনে পণচন্দ্র উঠচে—স্থানটি আফ্রিকা হতে পারতো, কি নিজজন, আর কি ভীষণ জঙ্গল—বাংলাদেশের গ্রামে এমন জঙ্গল আছে, না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে ? কি মহিমময় দশ্য সেই উদীয়মান পণচন্দের, সেই ঘন জঙ্গলের মধ্যে, অাঁকাবাঁকা শিমল গাছের ফাঁকে । আজ আমার ঘোষপাড়ার দোলে বেড়াতে আসা সাথ’ক হোল মনে হচ্চে শধ্যে এই দশ্যটা দেখবার সংযোগ পেলাম বলে । সেদিনের সেই খয়রামারির মাঠে শুকনো ডালের ওপর বসে থাকা ঘেটুবনের মধ্যে, আর আজকার কামারপুকুরের পাড়ের জঙ্গলে এই পাণচন্দ্রের উদয়—এবারের দোলের ছয়টির মধ্যে এই দটো ঘটনা জীবনের অনেক মল্যবান অভিজ্ঞতার মধ্যে আসন পেতে পারে । তারপর মাসীমা ছাদে বসে চা করে দিলেন, লুচি ভাজলেন, আমি কাছে বসে গলপ করলাম। অনেকদিন আগের কথা তুললেন, আমি, গৌরী, মণি ও মাসীমা ছাদে বসে কত তাস খেলতুম । আমি তো ভুলেই গেছলাম, এতদিন পরে আবার সেকথা মনে এল । সপ্রভার কথা জিজ্ঞেস করলেন। এর মধ্যে একদিন কাঞ্চজন পাকে একটা গাছে হেলান দিয়ে বসে জনৈক জাপানী চোরের আত্মকাহিনী পড়ছিলাম। বইখানাতে আছে, সে নিজে ভয়ানক বদমাইশ থেকে যীশুখন্টের বাণীর প্রভাবে কেমন করে হঠাৎ ভাল লোক হয়ে পড়ল । আমার ডাইনে এক গাছে ফুটেচে চেরী ফুল, সামনে লাটসাহেবের বাড়ির কম্পাউণ্ডে সারি সারি দেওদার গাছে নতুন কাঁচ পাতা গজিয়েচে—সেদিন ভুলে গেলাম যে কলকাতায় বসে আছি—ট্রাম, বাস আসচে যাচ্ছে, সে যেন আমার চোখেই লাগে না—আমি যেন বহন্দরে হিমালয়ের কোন অরণ্যে বসে আছি —সে গভীর হিমারণ্যের নিস্তব্ধতা শধে ভঙ্গ করচে তুষার নদীমুক্ত স্রোতধারা আর দেওদারের শাখা-প্রশাখার মধ্যে বায়রে স্বনন । তারপরেই একদিন গেলাম রাজপরে ৷ সন্ধ্যার সময় গিয়ে মাঠের ধারে বসলাম, মাথার ওপরে এক আধটা নক্ষত্র উঠেচে, হনুহ দক্ষিণ হাওয়া বইচে, সামনে একটা বটগাছ, দরবিসপী" দিকচক্রবাল সন্ধ্যার অন্ধকারে অস্পষ্ট দেখাচ্চে। আমার মনে কেমন একটা আনন্দ হোল–গত শনিবারে শালি* টেম্পলের ছবি দেখে যেমন আনন্দ পেয়েছিলাম, এ যেন তার চেয়েও বেশী—যদিও শালি'কে আমার খুবই ভাল লাগে এবং ঐ ছোট্ট মেয়েটির ছবি 88& বিভূতি-রচনাবলী থাকলেই আমি দেখি । “To those who have some feeling that the natural world has beauty in it, I would say, cultivate this feeling and encourage it in every way you can. Consider the seasons, the joy of spring, the splendour" of the summer, the sunset colours of the autumn, the delicate and graceful bareness of winter tress, the beauty of snow, the beauty of light upon water, what the old Greek called the unnumbered smiling of the sea.” “In the feeling for that beauty, if we have it, we possess a pearl of great price.” —Lord Grey of Falloden এ দিনটি প্রথম এক বাণিডল পরীক্ষার কাগজ সমনীতিবাবর বাড়ি নিয়ে গিয়ে দিয়ে এলাম। কথা ছিল মণিকুন্তলারা আজ রাজপরে যাবে পিকনিক করতে, ৮t৫৪ লোকাল ট্রেনে। আমিও ওদের সঙ্গে যাব, কিন্ত স্টেশনে যেমনি পা দেওয়া অমনি ট্রেন গেল চলে। পরের ট্রেনে গেলাম । বেগমনের মা খুব রান্না-বান্না করেছেন গিয়ে দেখি । মণিকুন্তলাকে বললাম—দ-দিন তোমার ওখানে গিয়ে দেখা পাই নি, এখানে এসেচ ভালই হয়েচে । আমরা খুব আনন্দ করে চা ও কলার বড়া খেলাম। মণির বোন রেণুর সঙ্গে আলাপ হোল, বেশ মেয়েটি, বৃদ্ধিমতী খাব ৷ রেণ যে ভাল নাচতে পারে, এ আমি এই প্রথম শনলম মণির মুখে । রেণ আমার কাছে এসে বললে–গলপ বলন। ছেলেমানষে—দু-একটি ভুতের গল্প শোনালমে। তারপর সে আর আমার কাছছাড়া হয় না । যেখানে আমি যাব সে সেইখানেই আছে উপস্হিত । বললে—আপনাকে আমার বড় ভাল লাগচে । তারপর সবাই মিলে বোসপুকুরে নাইতে গেলাম। থকাঁকে ডেকে নিলাম ওর বাড়ি থেকে । বোসপুকুরে সাঁতার দিয়ে পার হয়ে গেলাম । তারপর আর একটা পুকুরে নাইলাম । রেণ বললে—এক একজনকে কেমন হঠাৎ বড় ভাল লাগে, আপনাকে যেমন লেগেচে । দেখচেন না সব সময় আপনার সঙ্গে সঙ্গে আচি । তারপর বাড়ি এসে আমার আঙুলগুলো মটকাতে লাগল। বললে আর-জন্মে আপনার সঙ্গে সঙ্গবন্ধ ছিল । আমি বললাম—আমি তোর বাবা হব, আমার মেয়ে হবি ? সে বললে—তাহলে মেয়ের মতই দেখন। বলে—পাশে এসে আমার কাঁধে মাথা রেখে বসল । মণিকুন্তলা গান গাইলে আর ও নাচলে। ‘মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর নমো নমো, নমো নমো" বাবার শোকে রেণ নাকি পৰব'জন্মে আত্মহত্যা করেছিল, ওকে কে বলেচে নাকি । অদ্ভুত মেয়ে । ওর দিদি জ্ঞানবাবরে বাড়ি গেল—ও গেল না । বললে—ওরা মোটরে যাক, আপনি আর আমি যাব হে'টে। ബ সারা পথ ট্রেনে দ-বোনে গান গাইলে । বালিগঞ্জে জোর করে আমায় নামিয়ে নিলে । একটা গন্ধরাজ ফুল কোথা থেকে তুলে নিয়ে এসে আমায় দিলে । চেয়ারের পাশে জ্যোৎস্নায় বসে রইল সব সময়। বললে—ঠিকানা দেবেন, বাড়ি গিয়ে পত্র দেব। দুঃখ এই যে শীগগির উমি্মুখর 884 চলে যাচ্ছি। আগে কেন ভাব হোল না।•••ইত্যাদি । অদ্ভুত মেয়ে বটে । ভারী ভাল লাগে ওকে, সব সময়ে ‘বাবা" বলে ডাকবে আমাকে । রেণুর কথাটা কেমন এক ধরণের আনন্দে আমায় ক-দিন যেন ডুবিয়ে রেখেচে । এমন একটা মনের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটল—যার সন্ধান পথে ঘাটে পাওয়া যায় না। তাই সবাইকে গল্প করে বেড়াচ্চি। আজ বিকেলে নীরদবাব, বউঠাকরান, পশুপতিবাবু, মিসেস দাশগুপ্ত সবাই মিলে গড়িয়ার মাঠে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে হারমোনিয়াম গিয়েছিল, স্টেশনে নেমে মাঠের মধ্যে বসে আমরা গান গাইলম । আমি হালয়া তৈরী করলাম উন্ন জেলে। চা খাওয়ার পরে গল্পগুজব হোল। আমার কিস্ত রেণর কথা বার বার মনে হয়ে বিকালটা কি রকম হয়ে গেল। কেবলই মনে হয়, আহা, রেণ থাকলে বেশ হত ! ওদের কাছে কথাটা বললাম। ওরা তো শুনেই বললে, আগে কেন বললেন না, আমরা গিয়ে তাকে নিয়ে আসতুম । কাল রেণদের বাড়ি গিয়েছিলাম। যেমন গিয়েচি ও তখনই দৌড়ে একখানা পাখা নিয়ে আমায় বাতাস করতে বসল, বললে,—শরবৎ করে নিয়ে আসি, দড়িান। তারপর সব সময়েই মণি, আমি আর ওর বাবা গল্প করচি, রেণ, আমার পাশে জানলার ধারে বসে রইল । লক্ষীপুজো গিয়েচে কাল ওদের বাড়িতে, তা ও ভুলেই গিয়েচে । ওর বাবা বুলে, আপনি এসেচেন আর ও সব ভুলে গিয়েচে । বাইরের বারান্দাতে জ্যোৎস্নায় মণি ওর কলেজ-জীবনের কত কথা বললে। রেণ বললে—আপনার জন্যে রজনীগন্ধা রেখেছিলাম, শকিয়ে গিয়েচে, পদ্ম আছে, দেব এখন ? আসবার সময় নিচু পয্যন্ত নেমে এল সঙ্গে, আর কেউ নয়, মণি এসেছিল, কিস্ত ওর বাবা ডাকলেন বলে আমি আবার ওপরে গেলাম উঠে, তাই মণি এবার আর আসে নি কিন্ত রেণ্য দু-বারই এল । আমার কোলের কাছটি ঘেষে দাঁড়িয়ে বললে— আপনি বুধবারে আসবেন তো ? আমি পথের দিকে চেয়ে থাকি, কখন আসবেন । কি সন্দের মেয়ে ! ছ-বছর পরে খন্দদের ওখান থেকে বেড়িয়ে এসে দপুর বেলাতে মনে বেশ আনন্দ হোল, কারণ পথে পথে নতুন-পাতা-ওঠা গাছ, কোকিলের ডাক । রাত দশটার পরে জ্যোৎসনা উঠেচে, চেয়ার পেতে বাইরে বসে দেখি আর ভাবি, কাল ঠিক জ্যোৎস্না উঠতে দেখে মণি আমার সঙ্গে তক করলে যে এটা নাকি শক্লেপক্ষ—ওদের বাড়ির ছাদে । তারপর, তিন আর আমি খয়রামারির মাঠে গেলাম বেড়াত্ত্বে । বেশ জ্যোৎসনা উঠেচে–পথে ঝোপেঝাড়ে কত কি ফুলের সগন্ধ। এই গ্রীষ্মকালে বনঝোপে রাত্রে নানারকম বনফুল ফোটে—তার মধ্যে বনমল্লিকা বেশী । মনে এমন একটা অঙ্গভূত আনন্দ ও উত্তেজনা আসে যে মনে হয় খয়রামারির মাঠেই সারারাত বসে থাকি। খনতুর কথা ও রেণ-র কথা যত মনে হয় আর তত আনন্দ বেশী পাই। মাথার ওপরে কেমন নক্ষত্র উঠেচে, এই জ্যোৎস্না রাত্রে সারা বিশ্বের কেন্দ্রগহলে ষে প্রীতি ও ভালবাসা উৎসারিত হচ্চে, পবিত্র প্রাণের অবলম্বনে তারা আমার জন্যে, তোমার জন্যে, সেই প্রীতি ভালবাসার কিছু অংশ homely ভাবে পরিবেশন করবে। কতরাত্রে ফিরে এলাম, তবুও ঘমে আসে না । একে গরম, তাতে আনন্দের উচ্ছাস মনের মধ্যে, কি করে ঘমোই ? জীবনে আজকাল বড় বেশী আনন্দ পাচ্চি, খানিকটা মানুষের সঙ্গে মানষের সম্পক' থেকে । নৌকো করে সকালে বারাকপরে যাচ্চি। এ সময়টা আর কখনও ইছামতীতে নেীকো 88% বিভূতি-রচনাবলী করে যাই নি, বষাকালের চেয়ে প্রকৃতি এখন আরও সবজি—সত্যিই আরও সবুজ । গাছে গাছে নতুন শোভা । চারিদিকে পাখী ডাকচে পিড়িং পিড়িং, কোকিল ডাকচে, ঠ্যাং উচু করে বকগলি শেওলার দামে বসে আছে—শিমল গাছগুলোর রপ কি অদ্ভুত 1 , শিমল ষাঁড়া আর বাবলা গাছে নদীর শোভা বাড়িয়েচে । আমি বসে কাগজ দেখাঁচ মেয়েদের, প্রায়ই সব পাস করিয়ে দিচ্চি—মেয়েদের ফেল করাতে মন সরে না—আর রেণুর কথা ভাবচি, কাল খন্দ বলেছিল বিকেলে—“আপনার সঙ্গে কথা বলে যেমন অভূত আনন্দ পাই, এমন আর কারও সঙ্গে কথা বলে পাই নে’ সেই কথা ভাবচি। খাদ্য কাল যেতে বলে দিয়েচে কিন্তু আজ রাত্রেই আমি যাব চলে, সুতরাং কাল কি করে তার সঙ্গে আর দেখা করব ? এ ক-দিনই কি অদ্ভুত আনন্দে কাটচে। আমাদের ঘাটে গিয়ে নেীকো লাগল। এবার বন জঙ্গল কেটে দেশের শোভা অনেকটা নষ্ট করে ফেলেচে । দীপাব হয়ে গিয়েছিল, আমি কুঠীর মাঠের দিকে একটু বেড়াতে গেলাম—প্রটি দিদিদের বাড়ি ব্যাগ রেখেই । বাশবনে পাতা পড়িয়েচে–চারিদিক যেন ফাঁকা ফাঁকা দেখাচ্ছে । স্নান করতে গেলাম ঘাটে, সেই বননিমের ঝাড় দাঁড়িয়ে আছে, খুকু আর আমি সেই ঘাটে নাইতে আসতুম, খুকু ওর তলায় দাঁড়িয়ে থাকত—মনে হোল যেন কত কাল হয়ে গেল । খেয়ে বিশ্রাম করে চড়ক-তলায় গেলাম । উমা এসেচে অনেকদিন পরে, তার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম । মণিকুন্তলার পত্ৰখানা ও আবার দেখলে । চড়কতলায় এসে কতয়াগ পরে কাদামাটি দেখি । সোনা, নলিনীদির মেয়ে তাকেও দেখলাম কতকাল পরে। পাগলা জেলে সন্ন্যাসী সেজেচে, ওকে কত ছোট দেখোঁচ । অজয় মন্ডল বড় বড়ো হয়ে গিয়েচে । সে জিজ্ঞেস করলে আমার বাড়ির কথা, আমার ভাই কেমন আছে । চালতেপোতার বাঁধ দিয়ে যেতে যেতে এখন এই অংশটা লিখচি। কি অপব্ব গাছপালার শোভা,—বারাকপরের পলে,—আর এই চালতেপোতার পলে । নদীর জলের ও হাকরা বনের এই যে সুগন্ধ এটা আমাদের ইছামতীর নিজস্ব। এবার গড় ফ্রাইডের ছুটিটা সব রকমে বড় আনন্দেই কাটল । এত আনন্দ জীবনে অনেক দিনই পাই নি। রোদ রাঙা হয়ে আসচে। ডাইনে চালকীর পথের ধারে কচি পাতা ওঠা শিমল গাছটায় চাইলে চোখ যেন আর ফেরানো যায় না । যখন এ সব দশ্য দেখি, তখন অনৰ্থক অথব্যয় করে দেশভ্রমণ করতে প্রবত্তি হয় না। এর চেয়ে ভাল কোন দেশ আছে ! এত বিচিত্র বনশোভা কি ট্রপিক্যাল আফ্রিকার ? একটা পাপড়ি ফাটা শিমল গাছের কি শোভা হয়েচে । পাপড়ি ফেটে তুলো বেরিয়ে আছে অাঁকাবাঁকা গাছের ডালে ডালে । নদীর জলে মাঝে মাঝে কচ্ছপ ভেসে উঠে, মথে বার করে ভু-উ-উস’ শব্দে নিশ্বাস নিচ্চে। আজ অনেকদিন পরে জালিপাড়ার সেই বায়োস্কোপওয়ালা সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দু-চারজন আছে বাল্য জীবনের আলাপী, তাদের সঙ্গে যখন পথে ঘাটে এইভাবে হঠাৎ দেখা হয়ে যায়, তখন বড়ই আনন্দ হয় । একজন আমাদের আচ্চার-দা’, একজন হচ্চে চালকীর শশিবাবর বাড়ি থেকে ফিরে যাচ্ছিল মোল্লাহাটীতে আম কিনতে সেই যে ছোকরা, যাকে আমি ও ছোটমামা আমাদের বাড়ি ডেকে নিয়ে গিয়ে খাইয়েছিলাম, আর একজন হচ্চে পেরর কনসাল ডন মটয়াসকি, যাকে পায়েস খাইয়েছিলাম, বনগাঁয়ের বাসা থেকে তৈরি করে । এই বছরটাতে কি যোগ আছে জানি নে, যত সব পরোনো বন্ধর সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল আবার—যেমন ধরি মণিকুন্তলাদের সঙ্গে, এই বছরই বিশেষ করে আবার যোগ পনেঃ- . স্থাপিত হয়েচে রাজপরের অন্নপণাদের সঙ্গে, রমাপ্রসন্নদের সঙ্গে, সরেনদের সঙ্গে। মিনও সেদিন আমার কথা গ্রামে এসে বলেছিল বড়োর কাছে, বড়ো বললে, সেদিন রাত্রের ট্রেনে উমি্মুখর 88ఫీ বনগী থেকে আসবার সময়ে । এই বছরেই কতকাল পরে দেখা হয়ে গেল রাজলক্ষীর সঙ্গে— সেদিন রাণাঘাট স্টেশনে । আচ্চারদার সঙ্গে রাণাঘাট মেডিকেল মিশনে, চড়কের দিন দেখা হোল । উমার সঙ্গেও বারাকপরে প"চিশ-ছাবিশ বছর পরে। এই বছরেই ডাঃ পি. সি. রায়েদের আন্ডাতে আবার যাচ্চি ১৯১৪ সালের ছাত্র-জীবনের মত । এই বছরেই বনগাঁয়ে মিনদের বাসায় গিয়ে রোজ গান শনি, সেখানে ১৯১৮ সালের পরে আর কোনদিন পদাপণ করি নি। আবার এই গত গ্রীমাবসানেই বাগান গাঁয়ে রাখালী পিসীমার বাড়ি গিয়েছিলাম, তের বছর পরে। এই বছরেই এই সেদিন কবিরাজ গঙ্গাপ্রসাদ সেনের সেই ডিসপেনসারি ঘরটাতে গিয়ে গিরিজাপ্রসন্নবাবর সঙ্গে কথা বলে এলমে—যেখানে আমার ন-বছর বয়সের শৈশবে শেষ বার গিয়েছিলাম। এ সবের চেয়েও বড় ও আমার কাছে সকলের চেয়ে মধর— এই বছরেই এই সেদিন শনিবার গিয়ে পানিতরে সেই ওপরের ঘরটাতে রাত্রিযাপন করলাম বহুকাল পরে, আমার বিয়ের পরে যে ঘরটাতে আমি ও গৌরী থাকতুম । ওদের সঙ্গেও আবার একটা যোগ স্হাপিত হয়েচে এই বছরেই ; জীবনে কখনোও যে আবার যাব তার আশা ছিল না । বশুরবাড়িতে ওদের বাড়িটার পিছনে কি আছে জানতুম না—তা এবার জেনেচি ৷ বহুকাল পরে মারাতপুরে মামার বাড়ির ওপরের ও নিচের ঘরে এবার দোলের সময় আবার রাত্রি কাটিয়ে এসোঁচ । আমির সঙ্গে দেখা হয়েচে এবছরে, দিদির সঙ্গে দেখা হয়েচে তাও এবছরে । 彎 অপদ্রবণ ১৩৪২ সাল কেটে গেল আমার পক্ষে । পরোনো বন্ধদের হারাতে চাই নে, বড় কষ্ট হয়। যে যেখানে আছে, যাদের কতভাবে, কতরপে পেয়েচি—সব ভাল থাকুক, মাঝে মাঝে তাদের যেন দেখতে পাই । ওঃ সেই বায়োকোপওয়ালা সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়ে কি আনন্দই পেয়েছিলাম আজ বিকেলে। ভাল কথা—লিখতে ভুল হয়ে গিয়েচে, এই কালই বিকেলে ভাগলপুরের যতীন বাবরে মেয়ে সত্যপ্রিয়ার সংবাদ পেয়েচি । কেবল দটি কন্ট মনে রয়েচে—উষার সঙ্গে দেখা হয় নি বহনকাল—ভাবচি গরমের ছুটিতে, কি পজোর ছয়টিতে একবার এলাহাবাদে যাব। আবার একদিন রাজপরের বিন্দদের শ্বশুরবাড়িতে গেলাম রাধানাথ মল্লিকের লেনে। বিন্দ বড় ভাল মেয়ে, ভারি আদরযত্ন করলে ৷ একে ছোট অবস্হায় দেখেছিলাম—আবার দেখলাম এই বছরই প্রথম । আবার বড়মামার ছেলে গলকে আজ আট বছর পরে এই বছরই দেখলাম । কত বছর পরে কুসুমের সঙ্গেও দেখা হয় গত ২৫ই মে । রেণদের বাড়ি আর একদিন গিয়েছিলাম। ওরা ছেলেমানযে, ভূতের গল্প শনে খুব খুশি । আমায় আবার একটা লেবেণুষের কোঁটা উপহার দিলে রেণ । বললে, আপনি আমাদের মত ছেলেমানুষ, তাই এটা দিলাম আপনাকে । ওরা কাল রবিধারে চাটগাঁ চলে গেল, আমি সকালে তুলে দিতে গেছলাম, ওরা ঠিকনা দিয়ে চিঠি দিতে বললে । রেণর তো কথাই নেই, সে জেতনকে বললে, আপনাকে ধন্যবাদ যে আপনি এ’র সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছেন । রেণ্যর পত্র পেয়েচি । সে গিয়েই পত্র লিখেচে, আর তাতে লিখেচে, আসন শীগগির একবার চাটগাঁয়ে । আমি আর একদিন রাজপরে গিয়েছিলাম । বদনাথ ও খকেী বলছিল, রেণ আর একদিন ওখানে গিয়েছিল বেড়াতে, সেদিন আমি ছিলাম না তাই শুধই আমার নাম করেচে।“ওইখানে বাবা শয়েছিলেন, এখানে বসে বাবার সঙ্গে কত গল্প করেছিলাম--- শধে এই সব কথাই হয়েচে । সেদিন রাজপর থেকে ফিরবার পথে জ্যোৎস্নালোকিত প্ল্যাটফর্মে" বসে বসে কেবল এই সব ভেবেচি। বি. র. (৩য়)—২৯ 860 বিভূতি-রচনাবলী আজ একটি অদ্ভুত তালজাতীয় গাছের কথা পড়লম, নাম Microzeminar Plum । অস্ট্রেলিয়ার Tambourine mountain-এ বিস্তর রয়েচে । এই গাছ নাকি বহুকাল বাঁচে । সেখানে পনেরো হাজার বছর একটা গাছ বেচে ছিল, সেটা দশো ফুট উচু হয় । Prof. Chamberlain সেখানে অত উচু গাছ দেখে খুব উৎসাহিত হয়ে গিয়েছিলেন । পনেরো হাজার বছর বয়সী প্রাচীন গাছটা কে সেদিন কেটে ফেলে দিয়েচে, তাই নিয়ে অস্ট্রেলিয়াতে হৈ হৈ পড়ে গিয়েচে, ব্রিসবেনের টেলিগ্রামে প্রকাশ ( রয়টার, ৮ই মে, ১৯৩৫, অমত বাজার পত্রিকাতে পড়লম ) বাকী গাছ যা সব আছে, তার মধ্যে একটার বয়েস এগারো হাজার বছর, বাকীগুলি তিন-চার হাজার বছরের শিশ । কাল স্কুলের ছয়টি হবে । আজ ছেলেরা খুব খাওয়ালে । আমি নানা জায়গায় ঘরে টরকে সঙ্গে নিয়ে রমাপ্রসন্নদের বাড়ি গেলাম। কুসমের সন্ধান করে তার ঠিকানা পেলাম । টরকে সঙ্গে নিয়ে তেত্রিশ বছর পরে গিয়ে কুসমের সঙ্গে দেখা করলাম । আমার ন-বছর বয়সে কুসম আমায় কত গলপ বলত। এখন তার বয়স যাট-এর কম নয়—গরীব, লোকের বাড়ির ঝি। সে চেহারাই আর নেই। ওর সে চেহারা আমার মনে আছে। মানুষের চেহারার কি ভয়ানক পরিবত্তন হয় । g তপর সঙ্গে সেদিন দেখা হয়েচে, আজ দিন তিনেক আগে । তাকে দেখেছিলম ছ-বছরের ছেলে—এখন তার বয়েস তের-চৌদ্দ বছর। এ বছরটিতে পরোনো আলাপী লোকের সঙ্গে দেখা হচেচ ॥ আজ এ বছর গ্রীমের ছয়টির প্রথম দিন এখানকার । বাড়িতে কেউ নেই, পাড়া নিৎজ’ন। একমাত্র পাঁচী ও ন-দিদি আছে । বকুলতলায় দপেরে অনেকক্ষণ বসে Valia গলপটি পড়ছিলাম। একটা দাঁড়াশ সাপ সৃপদের নারকেল গাছটাতে উঠে পাখীর বাসায় পাখীর ছানা খ:জচে । আর পাখীগুলো তাকে ঠুকরে কি বিরউই করচে । গঙ্গাহাঁর, তুলসী, হাজ সবাই আমার কাছে এল । দুপুরের পরে একটু ঘুমিয়েচি, নিজ'ন মেঘমেদ,র অপরাহ, বশিবনের দিকে গরম চরচে, মেজ খুড়ীমার বাড়ির দিক থেকে মেজ খড়ীমার গলার সর পাওয়া যাচ্চে। বাবার একটা শ্লোকের খানিকটা মনে এল ঘুমের ঘোরে । এত সপস্ট মনে এল যেন বাবার সঙ্গে বসে আমি কবিতা আবৃত্তি করiচ বাল্যদিনের মত । কথাটি এই —‘নীচৈমবভিরচিঃ' এই টুকরোটুকু যেন উদ্ভট শ্লোকে ছেলেবেলায় পড়েছিলাম। আমাদের ভিটের পিছনের বাঁশবাগানে গেলাম বেড়াতে ও আমগাছের ফল গানতে । ওখান থেকে বেলেডাঙার মাঠ। কুঠীর মাঠের বাড়ির দু-ধারে বন কেঁটে উড়িয়ে দিয়েচে—সেই লতাবিতান সেই ঝোপ-ঝাপ এবার কোথায় উড়ে গিয়েচে । দেশময়ই দেখচি এই অবজ্ঞা । বেলেডাঙ্গার পথের ধারে একটা কামারের দোকানে দশ-বারো জন লোক বসে আছে—তার মধ্যে বিরাশি বছরের সেই হরমোতীও বসে আছে। বহু বছর আগের মোল্লাহাটী কুঠীর সাহেবদের গল্প সে করলে ৷ পলের ওপারে গিয়ে দাঁড়ালম—এক ফকির সেখানে গোয়ালপাড়ায় একটা মেয়ের সঙ্গে বসে গল্প করচে । আমায় আবার সে ভক্তি করে একটা বিড়ি খাওয়ালে। আমি তাকে একটা পয়সা দিলাম। হরমোতী এসে বললে—‘বাব, দকেখের কথা বলব কি, আমার ছেলেডা বলে, তোমাকে আর ভাত দেব না । বিরাশি বছর বয়স আমার, কোথায় এখন যাই আমি এই বেগধ বয়সে ?’ সন্ধ্যাবেলা ন-দির সঙ্গে রেণুর গলপ করি । রাত্রে এখন ঢোল বাজচে, জিতেন কামারের বাড়ি নাকি মনসার ভাসান হচ্ছে । একবার ভাবচি যাই, কিস্ত বাড়িতে আমি একা, তার ওপর উমি্মুখর 8&S আজ অমাবস্যার রাত—জিনিসটা-পত্রটা আছে, ফেলে রেখে ভরসা করে যেতে পারচি নে । রোয়াকে বসে লিখচি ভারী আরামে, বকুলগাছে, কুলগাছে কত কি পাখী ডাকচে— বিবেপাপের মধর গন্ধ ভেসে আসচে বাতাসে—দটো বিড়ালছানা আমার মাদরের ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে খেলা করচে, সামনের রাস্তা দিয়ে ছেলেরা আম পাড়তে যাচ্চে, জেলেরা মাছ নিয়ে যাচে । একবার পটল যাচ্ছিল, আমি ডেকে বললাম—ও পটল, উমা চলে গিয়েচে ? পটল বড় লাজকে মেয়ে । পেয়াগ্নাতলা পয্যন্ত এসে নিচুমুখে দাঁড়িয়ে বললে—দি্রদ ২৭শে জ্যৈষ্ঠ চলে গিয়েচে, দাদা । ছেলেবেলার সেই বড়ো আকন্দ গাছটায় থোলো-থোলো ফুল ফুটেচে। পাখীর ডাক আর পীপের সবাসে স্হানটা মাতিয়ে রেখেচে । বিকেলে হাটে গেলাম। এ বছর গ্রীমের ছয়টির প্রথম হাট। পথেই আফজলের সঙ্গে দেখা, সে হাটে পটল বেচতে যাচে । তুততলার স্কুলের ভিটে দেখিয়ে বললে—দা-ঠাকুর, এখেনে মোরা পড়িচি, কত আনন্দই করিচি এথেনে, মনে আছে ? তা আছে। তুততলার স্কুলের কথায় হাঁড়ি-বেচা মাস্টারের কথা উঠল, আর কে কে আমাদের সঙ্গে পড়তো, সে কথাও উঠল । অনেকদিন পরে গোপালনগরের হাটে গিয়েচি । সেই আবিন মাসের পুজোর ছয়টির পর আর আসি নি। সবাই ডাকে, সবাই বসতে বলে । মহেন্দ্র সেকয়ার দোকান থেকে আরম্ভ করে সবজির গোলা পয্যন্ত । হাটে কত ঘরামী ও চাষী জিজ্ঞেস করে—কবে এলেন বাব ? ওদের সকলকে যে কত ভালবাসি, কত ভালবাসি ওদের ওই সরল আত্মীয়তাটুকু, ওদের মখের মিষ্টি আলাপ । যুগল বৈষ্ণব এসে আমার ছেলেবেলার গল্প করলে, আশা ঠাকুর এসে আমায় অনযোগ করতে বসলো, আমি বিয়ে করচি না কেন এই বলে । ব্ৰজেন মাস্টার নতুন লাইব্রেরী দেখাতে নিয়ে গেল, মন রায় তার বিড়ির দোকানে ডেকে নিয়ে বসিয়ে বিড়ি খাওয়ালে, যুগল ময়রা নতুন তৈরী দোকান ঘরে বসিয়ে তামাক সেজে দিলে—এদের ষত্ব— আত্মীয়তার ঋণ কখনো শ,ধতে পারবো না। গৌর কলর দোকানে চা কিনতে গেলাম, সে আর আমায় কিছুতেই ছাড়তে চায় না। সেও আমার এক সহপাঠী, ওই তুততলার স্কুলে ১৩১০-১১ সালে তার সঙ্গেও পড়েচি । সে সেই কথা ওঠালে, আবার একবার হিসেব হোল কে কে আমাদের সঙ্গে পড়তো । একবছর পরে দেশে যখন আসি, সবাই আমায় পেয়ে আবার সেই পরানো কথাগুলো ঝালিয়ে নেয় । এ বছরটা কলকাতায় বড়.কমব্যস্ত জীবন কাটিয়েচি। এই একটা মাস এদের সরল সাহচৰ্য্য, সপ্রচুর গাছপালার সান্নিধ্য, নদী, মাঠ বনের রপবিলাস আমার সমস্ত ক্লাস্তি, সমস্ত অবসাদ জড়িয়ে দেয়। গত দেড় মাস রোজ রাত সাড়ে তিনটার সময় উঠে ইলেকট্রিক লাইট জেলে খাতা দেখতে বসেচি, সেই কাজ শুরু করেচি আর রাত বারোটা পযf্যস্ত চলেচে নানা কাজ, চাকরি, লেখা, পাটি, টাকার তাগাদা, বক্ততা করা ও শোনা, বন্ধ-বান্ধবদের বাড়ি দেখা করতে যাওয়া, আমার এখানে যাঁরা আসেন তাঁদের সঙ্গে কথাবাত্তfা—সমানে চলেচে । এদিকে শয়েচি রাত সাড়ে বারোটা—আবার ওদিকে উঠোঁচ রাত সাড়ে তিনটাতে। এখানে এসে বেচেছি একটু মন ছড়িয়ে বিশ্রাম করে । হাট থেকে এসে নদীর ধারের মাঠে বেড়াতে গিয়ে এই কথাই ভাবছিলাম। ঝির-ঝির করচে হাওয়া, সৌদালি ফুল ফুটেচে নদীর ধারে । কোকিল ডাকচে-বেলা পড়ে গিয়েচে একবারে---কি সন্দের যে লাগছিল। আর উঠতে ইচ্ছে যায় না নদীর ধার থেকে,কি অদ্ভুত শান্তি ! 8& বিভুতি-রচনাবলী এখন বসে লিখচি, অনেক রাত হয়েচে । বাঁশজঙ্গলের মাথায় বিশাল বশ্চিক রাশি অধে'ক আকাশ জুড়ে জলজল করচে। অনেক দরে একটা কি পাখী একটা নিদিষ্ট সময়ের ব্যবধানে একঘেয়ে কুবর করে ডাকচে । নায়েব-বাড়ির দিকে একপাল কুকুর তুকারণে ঘেউ ঘেউ করচে । আজ সকালে গোয়াড়ী কৃষ্ণনগর গেলাম সকালের গাড়িতে। অনেক জায়গায় গেলাম, কারণ বাবার সঙ্গে সেই ছেলেবেলায় একবার গিয়েছিলাম, আজ সাতাশ বছর আগে । আবার সেই রাজবাড়ির ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হোল জীবনের যে সব সমরণীয় ঘটনা ঘটেচে এর পরে। সেই ব্রাহ্মসমাজ, A. V. School, সেই লীলাদিদিদের বাড়ি । লীলাদির সঙ্গে দেখা হোল না । বিকেলে আজ সইমাদের বাড়ি বেড়াতে গেলাম । বীণাকে দেখলাম অনেকদিন পরে, সে এত মোটা হয়েচে যে তাকে আর চিনতে পারা যায় না । তার দটি সতীনঝিও এসেচে, ছেলেমানষে—কিন্তু একজন আবার ওদের মধ্যে বিধবা । আমাদের দেশে বিধবা হবার যে কি কট তা অন্নপ্রণার মুখে, ধীরেনের খুড়তুত বোনের গলপ শুনে বুঝতে পারি। তারপর গেলাম কুঠীর মাঠে বেড়াতে । যেতে যেতে দেখি নদীর ধারে মাধবপুরের চরের গাছপালার . গায়ে মেঘে চাপা হলদে রোদ পড়েচে–তার নিছক সৌন্দয' আমায় মুগ্ধ, অভিভুত করলে। বেলা সাড়ে ছ-টা হবে, সন্ধ্যার দেরি নেই, সেই শান্ত গ্রীমের অপরাহ্লে উষ্ণমণ্ডলের বনপ্রকৃতি, সয", আকাশ, নদী, মাঠ, তার সমস্ত ইন্দ্রজাল, সমস্ত রপ-বিভব আমার চোখের সামনে মেলে ধরেচে। শুধ; শিমল গাছের ডালগুলোর অাঁকা-বীকা সৌন্দৰ্য্যময় রপে, মেঘপহবতের পাশ দিয়ে বলাকা সারির ভেসে যাওয়া, শুধুই বনফুলের দেবলোকের দলনি, আর বন্যপাখীর গান। কতবার দেখোঁচ, আজ বত্রিশ বছর ধরে দেখে আসাঁচ । কিন্তু এরা কখনো পরোনো হোল না আমার কাছে । কখনো যেন হয়ও না, এই প্রাথনা করি, এদের আসন যেন মৃত্যুঞ্জয় হয় আমার জীবনে । অতি ভয়ানক দ্বযেf্যাগ, ভয়ানক বষ । আজ ক-দিন চলেচে এমন । থানা ডোবা সব ভত্তি", জলে থৈ থৈ করচে । এমন ভয়ানক বষ জ্যৈষ্ঠমাসে দেখেছিলাম কেবল সেইবার, ষেবার কলকাতা থেকে আবার ফিরে এলমে বেলাদের তত্ত্ব নিয়ে, ষেবার খকুর সঙ্গে প্রথম আলাপ হয়, ১৯৩২ সালে । তারপর কত পরিবত্তনই না হয়ে গেল জীবনে ! ১৯৩২ সালের সেই সময়ের এবং ১৯৩৬ সালের এই আমিতে বহয় তফাত হয়ে গিয়েচে । বিলবিলের ডোবাতে ব্যাঙ ডাকচে । বধো, কেতো এরা এই ভয়ানক দ্বযোগ অগ্রাহ্য করে ভিজতে ভিজতে আম কুড়িয়ে বেড়াচ্চে । সাবি ওদের বাড়ি থেকে বিড়ি নিয়ে এল আমার জন্যে, কারণ ওবেলা ওর ভাইকে বলেছিলাম এনে দিতে । মনোর মা আবার দটো কলমের আম এনেছিল । অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গলপ করলে । আমি পাঁচীর বাড়ি গেলাম মাংসের ভাগ নিতে, কারণ ওখানে পঠিা কাটা হয়েচে সকালে। পাঁচী চা করে দিলে, শম্ভুর অসুখের জন্যে অনেক দুঃখ করলে । সবাই ওকে ঘৃণা করে আমাদের গাঁয়ে। কিন্তু আমি দেখি ও ঘণার পাত্রী নয়, অন্যকপার পাত্রী । বন্ধ স্বামীর সঙ্গে ওর বিয়ে হয়েছিল, তখন ওর বয়েস ছিল মোটে তের বছর—কি বা বঝেত বিয়ের ? সে স্বামী মারা গেল, তখন ওর বয়েস বছর পনেরো। ওদের ওই গরীব সংসার, ভাইগলো অপদাথ’, কেউ এক পয়সা রোজগার করে না । ভাইয়ের ছেলেমেয়েগলো একবেলা খায়, একবেলা খায় না। ওদের এই দুঃখ ঘন্চোতে ও এই কাজ উমি্মখের 860 করেচে কিনা তাই বা কে জানে ? কারণ হরিপদ দাদার টাকা আছে সবাই জানে। ও আজ কাঁদতে কাঁদতে সে কথার কিছু আভাস দিলে । এই ব্যাপারের পর ওর সঙ্গে এই প্রথম আমি দেখা করলাম,—যতটা খারাপ লোকে ওকে মনে করে, আমি ততটা ভাবতে পারলাম না। তবে একটা কথা ঠিকই যে, সমাজের পক্ষে এই আদশটা বড় খারাপ। গ্রামের বাইরে গিয়ে যা খুশি কর বাপ, গ্রামের মধ্যে কেন ? গহধমে'র আদশ" ক্ষণ করে লাভ কি ? আবার সজোরে বটি এল । 鹼 তারপর বেলা পাঁচটা থেকে ভীষণ ঝড় উপস্হিত হোল। গাছপালায় বেধে কুমবর্ধমান ঝটিকার সে কি ভীষণ শব্দ ! আমি ভাবলাম যে রকম কান্ড, একটা সাইক্লোন না হয়ে আর যায় না । গতিক সেই রকমই দেখাতে লাগল বটে। সন্ধ্যার আগে এমন ভয়ানক বাড়ল যে আমি আর ঘরে থাকতে না পেরে বাঁশবাগানের পথ দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম নদীর দিকে। দেখব ঝড়ের দশ্যটা। আমাদের বাড়ি যেতে বড় একটা বাঁশ পড়েচে—পাড়ার শ্যামাচরণ দাদাদের বাগানেও বড় বtশ পড়েচে । গাছপালা, বাঁশবনে ঝড়ের কি শবদ—আর সে কি দশ্য ! প্রত্যেক গাছতলায় আম পড়ে তলা বিছিয়ে আছে ঠিক যেন পিটুলি ফলের মত, কিন্তু সন্ধ্যার অন্ধকারে আর এই ভয়ানক দুযেf্যাগ মাথায় জনপ্রাণী বাড়ির বার হয় নি। আমি যা পারলাম কুড়িয়ে নিলাম-কিন্তু কোন পাত্র সঙ্গে আনি নি, আম রাখি কিসে? মাঠের মধ্যে নদীর ধারে গিয়ে আর অগ্রসর হতে পারি নে। যে-দিকে যাব, সে-দিক থেকেই ঝড় উড়িয়ে আনছে বটির ধারা, ঠিক যেন বন্দকের ছররার বেগে । ধোঁয়ার মত ব্যটির ঢেউ উড়ে চলেচে । গাছপালা মাটিতে লটিয়ে লুটিয়ে পড়েচে । ঝড়ের শব্দে কান পাতা যায় না। সে দশ্য আমাকে মগধ ও বিস্মিত করল । অনেকদিন প্রকৃতির এ রপে দেখি নি, কেবল শান্ত সন্দের রপেই দেখে আসচি । 翻 তারপর মনে হোল আমিই বা কম কি ? এই ঝড়ের বেগ আমার নিজের মধ্যে আছে । আমি একদিন উড়ে যাব মণ্ডপক্ষে ওই বিদ্যুৎগভ* মেঘপুঞ্জের পাশ দিয়ে, ওই বিষম ঝটিকা ঝঞ্চাকে তুচ্ছ করে ওদের চেয়েও বহন গণ বেগে । আমি সামান্য হয়ে আছি—তাই সামান্য । এই কথাটা যখন ভাবি, তখন আমার মধ্যে যেন কেমন একটা নতুন শক্তির আবিভাব হয়। সে শক্তি কিন্তু বেশীক্ষণ সহায়ী হয় না, সেদিন সেখানেই শেষ । কাল সপ্রভার চিঠিখানা ডাকে ফেলে দিয়ে আজ সকালে বাগান-গাঁয়ে পিসিমার বাড়ি যাব বলে বেরিয়ে পড়েচি । আজ দিনটা সকাল থেকে মেঘ ও বটি, পথ হাঁটার পক্ষে উপযুক্ত দিন, রোদ নেই, অথচ বটি খুব বেশীও হচ্চে না। ঠাণ্ডা জোলো হাওয়া বইচে মাঝে মাঝে । কুঠীর মাঠে আসতেই আমাদের ঘাটের পথে শায়োখালী আমগাছে অনেকগলো আম পড়ল দুবঢ়াব করে। গোটাকতক আম কুড়িয়ে পথের ধারে বসেই খেলাম। কারণ যেতে হবে প্রায় তের চোদ মাইল পথ, কখন গিয়ে পৌছবে তার নেই ঠিকানা। কুঠীর মাঠ দিয়ে, বণ্টিধোয়া বনঝোপের মধ্যে দিয়ে আসতে আসতে কি আনন্দই পেলাম। পথ হাঁটতে আমার বড় আনন্দ । এই যে বাড়ি থেকে বেরিয়েচি, পথে পথে অনিন্দ্ৰি'ষ্ট গন্তব্য হানের উদ্দেশ্যে চলেচি, এতেই আমার আনন্দ । কচি-কাটার পল পার হয়ে একটা লতা-ঝোপওয়ালা সন্দের বাবলা গাছ ভেঙে পড়েচে রাস্তার ওপরে, এ রকম সন্দের গাছ ভাঙলে আমার বড় কষ্ট হয় । বড় বড় বট অশখ গাছের ঘন ছায়া, পথের দু-ধারে বনো খেজর গাছে কাঁদ কাদি গণবণ খেজর দলচে, বউ-কথা-কও পাখী ডাকচে-বাংলা দেশের রােপ যদি কেউ দেখতে চায়, তবে এই সব গ্রাম্য পথে যেন প্রথম বর্ষার দিনে পায়ে হেটে বহৃদর গ্রামের উদ্দেশ্যে যায়, তবেই সে বাংলাকে চিনবে, পাখী আর বনসম্পদ, তার 8ტ8 বিভূতি-রচনাবলী পাপরাজি, তার মেয়েদের দেখবে, চিনবে, ভালও বাসবে । আমি এই নেশাতেই প্রতি বৎসর এই সময় বেরিয়ে পড়ি । বাগানগায়ের পথে বড় একটা বট গাছের তলায় বসে লিখচি । চারি ধারে মাঠ, বটি পড়চে ঝর ঝর করে, বেলা কত হয়েচে মেঘে আন্দাজ করা যায় না, জোলো হাওয়ায় আউশের ভু’ই থেকে ধানের কচি জাওলার মদ সগন্ধ ভেসে আসচে, বট গাছের ডালে কত কি পাখী ডাকচে, মাঠের মধ্যে অসংখ্য খেজুর গাছ । চাষারা ক্ষেতে নিড়েন দিচ্চে, তামাক খাচ্চে, নীল মেঘের কোলে বক উড়চে । কাঁচিকাটা পলে পার হয়ে খানিকটা এসেই একটা লোকের সঙ্গে আলাপ হোল। তার বয়েস ষাট-বাষটি হবে, রঙটা বেজায় কালো, হাতে একটা পেটিলা, কাঁধে ছাতি । আমি বললাম—কোথায় যাবে হে ? সে বললে—আজ্ঞে দাদাবাব, ষাঁড়াপোতা ঠাকুরতলা যাব । বাড়ি শান্তিপর গোঁসাইপাড়া। লোকটা বললে—একটা বিড়ি খান দাদাবাধ । বেশ লোকটা । ও রকম লোক আমার ভাল লাগে । সহজ সরল মানুষ, এমন সব কথা বলে যা আমি সাধারণতঃ শনি নে । সন্দরপরে আসতে প্রমথ ঘোষ সাইকেল চেপে কোথায় যাচ্চে দেখলাম। আমি আর আমার সঙ্গীদ-জনে মোল্লাহাটির খেয়াঘাটে পার হই। সদর মেঘাচ্ছন্ন সকাল বেলা নদীজল শাস্ত, ওখানে সবজে কষাড় বন । খেয়া পার হয়ে কেউটে পাড়া, মড়িঘাটা ছাড়িয়ে আমরা গোবরাপর এলাম। আর বছর বাজারের যে দোকানে তামাক খেয়েছিলাম, সেখানে আমরা তামাক খাবার জন্যে বসতে গিয়ে দেখি গোবরাপরের জজবাবর সেজছেলে মল্লিনাথ বসে আছে । সে আমাকে দেখে টানাটানি করতে লাগল তাদের বাড়ি নিয়ে যাবার জন্যে । অন্ততঃ চা খেয়েও যেন যাই । তার দাদা রামকৃষ্ণ-মিশনের সন্ন্যাসী, অনেকদিন পরে বাড়ি এসেচেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করতেই হবে । তিনি নাকি আমার বই-এর খুব অনুরাগী ইত্যাদি বলে বাড়ি নিয়ে গেল । আমার সঙ্গীকেও সে নিমন্ত্রণ করলে । ওদের মস্ত বড় বাড়ি, আর কত যে ছেলে মেয়ে । সব ভাইগুলি বড় চাকরি করে বিদেশে, এবার বাড়িতে ওদের সন্ন্যাসী ভাই এসে রামকৃষ্ণ-উৎসব করচেন সেই উপলক্ষে সবাই এসেচে। ওপরের ঘরে মেয়েরা গান গাইচে, বাইরের বৈঠকখানায় ছেলেরা তাস খেলচে-হৈ হৈ কাণ্ড। আমরা চা খাবার থেয়ে ভদ্রতা বজায় রাখার উপযুক্ত একটু গল্পগুজব করে তখনি আবার পথে বার হলাম। পথে বার হয়ে কোথাও একদণ্ড থাকতে আমার ভাল লাগে না । আমার সঙ্গীটি যাবে পাশেরই গ্রামে তার জামাই-বাড়িতে। ওরা আচাৰ্য' বামন, এতক্ষণ নিজের মেয়ের ভাসরের কথা বলতে বলতে আসছিল। সেই ব্যক্তিটি ঘরে খবে সন্দরী শী থাকা সত্ত্বেও পয়তাল্লিশ বছর বয়সে ছেলে না হওয়ার অজুহাতে, আজ দ্ব-মাস হোল পনরায় দ্বিতীয় বার দার-পরিগ্রহ করেচে। সেই গল্প সে আমাকে নানাভাবে শোনাচ্ছিল । হঠাৎ জজ বাবদের বাড়ি থেকে বেরিয়েই সে আমার ওপর অত্যন্ত ভক্তিমান হয়ে উঠল। জজ বাবদের বাড়িতে আমার আদর-ষত্ব দেখেই বোধ হয় ওর মনের ভাবের এ পরিবত্তনটুকু হোল। বললে, দাদাবাব, আপনাকে এতক্ষণ চিনতে তো পারি নি। আপনি মাথা থেকে বের করে এমন একখানা বই লিখেচেন যার অত বড় দামী দামী লোকে এত সংখ্যাতি করলেন, তখন তো আপনি সাধারণ মানুষ नन ! সম্বমে ও শ্রদ্ধায় তার সর গদগদ হবে উঠেচে, তারপর বললে, তবে বাব; যদি অনুমতি করেন, আমিও নিজের পরিচয়টা দিই। এতক্ষণ দিই নি, কারণ বিদেশে, পথঘাটে, নিজের পরিচয় না দেওয়াই ভাল। দিয়ে কি হবে ? আমার নাম নদে শান্তিপর থেকে আরম্ভ করে উমি্মখের 866. কলকাতা পৰ্যন্ত সবাই জানে, আপনার শ্ৰীগরের চরণকৃপায়, হে’ হে । কৌতুহলের সহিত ওর মুখের দিকে চাইলাম। কোন ছদ্মবেশী মহাপরেষের সঙ্গে এতক্ষণ আমার ভ্রমণ করবার সৌভাগ্য ঘটেচে না জানি । লোকটা বললে—আমার নাম, দাদাবাব, হাজারী পরটা । আমি অবাক হয়ে বললাম—হাজারী—? —আজ্ঞে, হাজারী পরটা । —হাজারী পরটা ? —আজ্ঞে, সেই আমিই এই অধীন। বলে সে আমার মুখের ভাব পরিবত্তন লক্ষ্য করবার জন্যে আমার মথের দিকে চেয়ে রইল। বোধ হয় আমার বিস্ময়কে পণ বিকাশের সময় দেওয়ার জন্যে। কিন্তু আমি তখনও সেই অবাক ভাবে চেয়ে আছি দেখে বললে, দাদাবাব, যদিও আমরা ভট্চাযি কিন্তু আমার উপাধি পরটা । মানে এমন পরটা আর কেউ তৈরি করতে পারতো না নদে-শাস্তিপরের মধ্যে। পাঁচ সের ওজনের একখানা খাস্তা পরটা—যেখানে ধরন খসে আসবে। আমার দোকান ছিল গ্রাম চাঁদপাড়ায়, দৈনিক দশ-বারো টাকা বিক্লি, পরটা, লাচি, আলর দম, ডিম, মাংস। আমার দোকানে যে একবার খেয়েচে দাদাবাব, সে আপনাদের বাপ-মার আশীবাদে কখনো ভুলতো না । কলকাতা পয্যন্ত আমার নাম-ডাক। খু’্যাদা মিত্তিরের বাড়ি রশনই করেচি এক হাতা-বেড়ীতে পাঁচ বছর। to তার গল্প তখনও ভাল করে শেষ হয় নি, একজন ডেকে বললে,—এই যে, বেয়াই মশাই যে ! আসনে আসন, কি সৌভাগ্য আমার । নমস্কার, নমস্কার । হাজারী পরটা সিমতহাস্যে বললে—নমস্কার। তা আপনারা তো খোঁজ করবেন না, মেয়েটা আছে পড়ে, বলি এই একবার-আচ্ছা দাদাবাব, আসন একটু পায়ের ধলো নিই। বলেই লোকটা ঝুকে পড়ে আমার পায়ের ধলো নিয়ে বসলো। তারপর তার বেয়াই-এর দিকে চেয়ে বললে—দাদাবাবর সঙ্গে দেখা হয়েই ববেচি উনি মহৎ লোক। ও’র সঙ্গে জজবাবর বাড়িতে গিয়ে খাসা আম, উৎকৃষ্ট সন্দেশ, চা কত কি খেলাম। কি আদর সেখানে ও’র। শনেই তার বেয়াই আমায় বিনীত ভাবে অনুরোধ করতে লাগলো, সেখানে পেরে থাকবার জন্যে। ভাবলে, জজ বাবরা যখন খাতির করেচে, তখন আমিই বা কোন ডেপুটি কি অন্ততঃ পক্ষে একজন পলিসের দারোগা না হব ? আমি আমার অক্ষমতা জানিয়ে বিদায় নিলাম। তারা সকলে যতক্ষণ আমাকে দেখতে পায়, আমার দিকে প্রশংসমান দটিতে চেয়ে রইল এবং আমার সম্বন্ধে কি সব কথা বলাবলি করতে লাগলো। আমি বেরিয়ে এসে মাঠে পড়লাম। দ-ধারে আউশ ধানের ক্ষেত। একটা বহৎ জিউলি গাছের তলায় যখন পে'ছেচি, তখন জোর ব্যষ্টি আসাতে গাছের নিচে বসলাম । DD DBD DBBS BB BBB BBBBBBB BBBB BBB BB BBSBB BB সপ্রভার চিঠি আটবার জন্যে বারাকপুরে একটু জিউলির আঠা খুজে পাই নি । কি সন্দের লাগছিল উন্মুক্ত মাঠের হাওয়া, দু-ধারে সবুজ ধানের ক্ষেত, বর্ষান্নাত গাছপালায় ঝোপঝাড়। একটা প্রকাণ্ড বটগাছ মাঠের মধ্যে, তার তলায় অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করলাম বটি না থামা পয্যন্ত । ট্যাঙরা সন্দেরপুর, কমলাপর প্রভৃতি গ্রাম পার হয়ে একটা সন্দের জলাশয়ের তীরে এক প্রকাণ্ড বট গাছের তলায় কলের গান হচ্চে দেখে সেখানে গেলাম। অনেক গ্রাম্য লোক জড় হয়েচে । গ্রামবধরা ওপারের ঘাট থেকে গান শনচে । জন-দুই পথ-চলতি লোক কলের গান নিয়ে যেতে যেতে এখানে বট গাছের তলায় প্লাস্তি দর করবার জন্যে বসে কল বাজাচ্ছে । আমিও গিয়ে দটো রেকড বাজাতে বললাম। 8&o বিভূতি-রচনাবলী তারা আমায় খাতির করে বসালে, বিড়ি খেতে দিলে, রেকডের বাক্স এগিয়ে দিয়ে বললে,— বলন বাব, কোন গান আপনার পছন্দ ! সামনের জলাশয়টা শুনলাম জামদার বাঁওড়ের আগড় । কি সুন্দর যে তার দশ্য সেই বটতলা থেকে । বাঁওড় অথাৎ মজা নদী । তার ওপারে যতদর দটি যায় বড় বড় নিবিড় বাঁশবন জলের ওপর ঝুকে পড়েচে–পদমফুল আর পদমপাতায় জল দেখা যায় না, আরও ওদিকে শেওলার দাম বেধে গিয়েচে । আমি গান শনতে শুনতে সেই দিকে চেয়ে চেয়ে দেখি। মনে একটা অপদেব মুক্তির সােথ । বেলা সাড়ে দশটা কি এগারোটা-কলকাতা হলে এতক্ষণ ছািটতে হোত স্কুলে । রাটিন বাঁধা জীবন স্বপ্ন বলে মনে হচ্চে এই সদর পল্লীগ্রামের পদমফুলে ভরা জলাশয়ের তীরে প্রাচীন বটতলায় বসে । পিসিমার বাড়ি বেলা একটার সময় এসে পৌছে দেখি পিসিমা খেতে বসেচেন। আমিও স্নান করে এসে খেয়ে নিয়ে একটু বিশ্রাম করলাম। পিসিমার ঘরটাতে কেমন একটা পরানো পরানো গন্ধ পাওয়া যায়। ১৩oo সালের পরে আর এঘরে নতুন পাঁজি আসে নি ( ১৩oo সালে পিসেমহাশয় মারা গিয়েছিলেন ) । সেকালের গন্ধে, সেকালের আবহাওয়ায় ঘরটা ভত্তি’। কড়ির আলনা, সেকালের কাঁথা, কড়ির চুবড়ি, কাঁঠাল কাঠের সিন্দুক, গড়র মুক্তি বসানো পেতলের ঘন্টা, বেতের প’্যাটরা—যে সব জিনিস একালে কোনও বাড়িতে দেখা যায় না । একখানা কাশীদাসী মহাভারত আছে ১২৭৬ সালে ছাপা । অনেকক্ষণ ভয়ে ভয়ে সেই সব প্রাচীন দিনের বাতাসে নিঃশ্বাস প্রশ্বাস নিলাম, কত পরোনো দিনের কথা মনে হয়,--"যেদিন মেনকা পিসিমা আমার বল্যে বাবার ওপর রাগ করে এখানে চলে এসেছিলেন, বাবা এসে একবার কথকতা করেছিলেন । - বিকেলে হাটতলায় এক ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ হোল । ডাক্তারটি অত্যন্ত দুরবস্হাগ্ৰস্ত । একটা বাঁশের মাচায় মলিন শয্যা, একখানা ভাঙা টেবিল, গোটা বিশ-পাঁচশ শিশি, অন্যদিকে আর একটা মাচাতে এক বস্তা তামাক । একটুখানি বসবার পরই তিনি নিজের দুঃখের কাহিনী বলতে আরম্ভ করলেন । আজ চার মাস থেকে এখানে এক পয়সা রোজগার নেই । হাটখোলার মুজিবর মিঞার দোকানে চালডাল ধার নিয়ে আজ চার পাঁচ মাস চলচে । এদিকে বাড়িতে মেয়ের বিয়ের দিন স্হির হয়েছিল চৌঠো জ্যৈষ্ঠ । টাকা যোগাড় না করতে পারায় বিয়ে ওদিনে হয় নি। তারপর বললেন—দেখন এখানে একঘর বামন আছে, বেশ বড় গতিদার, তাদের বাড়ির এক বেী আজ চার মাস শয্যাগত, তা মশায় একবার ডাকে না । বলে ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়ে কি হবে, আমরা ফকির দেখাচি । হাটখোলার এক দোকানে এক মৌলবী সাহেব আমাদের ডাকাডাকি করলেন বলে গেলাম, —এখানকার মন্তবে তিনি নতুন মৌলবী হিসেবে এসেচেন । মাসে বারোটা টাকা পাবেন, হাটখোলাতে একটা মুসলমানদের দরগা ঘর আছে, সেখানেই" আপাততঃ থাকবেন। তাঁর মুখে মধুবাব সাব-ইনস্পেক্টরের গল্প শুনলাম। মধুবাব আমাদের কালে, আমরা যে পাঠশালায় পড়তাম, সেখানে গিয়ে আমায় একবার ‘গ্রন্থ" বানান জিজ্ঞেস করেছিলেন। সে ১৯o৫ সালের কথা হবে । সন্ধ্যার পরেই ব্যটি এল । আমি হাটখোলা থেকে চলে এলাম । রাত্রে একটা গোয়ালার ছেলে অনেক গল্পগুজব করলে । সকালে স্নান করে পিসিমার কাছে বিদায় নিয়ে পাটশিমলে মোহিনী কাকার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে রওনা হোলাম । আজ খাব রোদ উঠবে, আকাশ নীল, সকালের হাওয়ায় বিলের জল আর ধানের জাওলার গন্ধ । হাটখোলার ডাক্তার বাবর সঙ্গে দেখা করে মাঠের পথে হাঁটি। এদেশে যেখানে সেখানে আমগাছের তলায়, পিটুলি ফলের মত, দিব্যি বড় বড় উমি্মখের 86 a রাঙা রাঙা আম তলাবিছিয়ে পড়ে রয়েচে, কেউ কুড়োয় না দেখে আশ্চৰ্য্য হয়ে গেলাম। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম—তোমাদের এখানে আম কুড়োয় না কেন ? সে বললে—বাব, এখানে এক পয়সা আমের পণ বিক্রি হয়—এত আম এখানে । কে কত খাবে । পাটশিমলে ঢুকতেই একপাশে একটা বড় বন, একটা উ"চু শিমল গাছ বনের মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে—তার ডালে পাতা মড়ে পিপড়ে বাসা বেধেছে। দশ্যটা দেখে আমার মনে হোল এই সব সত্যিকার বাংলার বনের দশ্য, ট্রপিক্যাল বনানীর দশ্য না দেখলে বাংলাকে চিনব কি করে ? শহরের লোকের শহরেই জন্ম, শহরেই বিবাহ, শহরেই মৃত্যু—তারা সত্যিকার বাংলার রুপ কখনও দেখে ? যে বাংলার মাটির বৈষ্ণব কবিতা, গ্রাম্য সঙ্গীত, ভাটিয়ালি গান, কীত্তন, শ্যামাসঙ্গীত, পাঁচালি, কবি—এরা সে বাংলাকে কখনও দেখলে না । যে-বাংলার শিপে কাঁথা, শীতলপাটী, মাদর, কড়ির আলনা, কড়ির চুবড়ী, খাগড়াই পিতল-কাঁসার জিনিস সে বাংলাকে এরা কখনও জানলে না । অথচ সমস্ত জাতিটার যোগ রয়েচে যার সঙ্গে—আর সে কি গভীর যোগ রয়েচে, তা এই পল্লীপথে পায়ে হেটে বেড়িয়ে আমি খুব ভাল বুঝতে পারচি । পাটশিমলে ঢুকে একটা ক্ষদে জাম গাছতলায় শিকড়ের গায়ে বসে এই কথা কটা লিখচি, চারিধারে পাটশিমলের বন । আমার মনে হয় সমগ্র বাংলা দেশের মধ্যে যদি কোথাও বন জঙ্গল ও বাঁশবনকে যথেচ্ছা বধির সংযোগ দেওয়া হোত—তবে এই ধরনের নিবিড়, দাভেদ্য বনানীর সন্টি হোত দেশে । এর প্রকৃতি মালয় উপদ্বীপের বা সন্মাত্রা, যবদ্বীপের ট্রপিক্যাল ( Rain forest )-এর সমান না গেলেও বিহার, সাঁওতাল পরগণা বা মধ্যভারতের অরণ্যের চেয়ে স্বতন্ত্র । ট্রপিক্যাল রেন ফরেস্টের সঙ্গে এর সাদৃশ্য আছে লতা জাতীয় উদ্ভিদের প্রাদাভাবে । এত নানা আকারের লতার প্রাচুযf্য শধ্যে উষ্ণমণ্ডলের বনানীরই নিজস্ব সম্পদ । এই জন্যে এই সব বনের রপে স্বতন্ত্র। এত বংশ আন্ডারগ্রোথ ( Bush undergrowth )-ও নেই সিংডুম বা মধ্যভারতের বনে । অলপ জায়গার মধ্যে এত বিভিন্ন শ্রেণীর উদ্ভিদের সমাবেশও সে সব বনে নেই। মোহিনী কাকাদের চন্ডীমণ্ডপে বসে দেখছিলাম—সামনের বণ্টিবিধৌত বনপলসলভারের শোভা, নিম'ল নীল আকাশ, সেই আকাশ অনেকদিন পরে মেঘশন্যে, আশ্চয" মরকত-শ্যাম পত্রপঞ্জের ওপর ঝলমলে পরিপণ সময‘্যালোক। চণ্ডীমণ্ডপের উঠোনে একটা তরণে নারকোল বক্ষের শাখাপত্রের পন্দন বড় ভাল লাগচে । প্রাচীন কালের ছোট ইটের ভাঙা বাড়ি, ভাঙা চণ্ডীমণ্ডপ, ছাদভাঙা পুজোর দালান পবেকার সম্পন্ন গহচ্ছের বক্তমান শ্ৰীহীনতার সপরিচিত চিহ্ন চারিদিকুে । দর্পরের একটু পরেই পাটশিমলে থেকে বার হই । দধারে প্রকাণ্ড বাঁশঝাড়, আরবছরে দেখা সেই কালীবাড়ির বাঁশঝাড়টা। বাঁশ না কাটলে কি ভাবে বাড়তে পারে তা কালীবাড়ির বশিঝাড় না দেখলে বোঝা যাবে না । বাঁশের দাভেদ্য জঙ্গল । এ বাঁশ কালীগজোর দিন ভিন্ন এবং ঠাকুরের প্রয়োজন ভিন্ন কেউ কাটতে পারে না, এ গ্রামের এই রীতি। এ গ্রামেও সদ্বর আম গাছের তলায় যথেষ্ট আম পড়ে আছে, কেউ কুড়োয় না। মাঠে পড়লম, অতি ভীষণ রৌদ্র আজ, তবু একটু হাওয়া আছে তাই ঠান্ডা। রাস্তায় এসে ছায়া পাওয়া গেল, কিন্তু দধানে যেমনি জঙ্গল, তেমনি মশা । এক জায়গায় একটা লাল টুকটুকে আম কুড়তে একটুখানি দাঁড়িয়েচি, অমনি মশাতে একেবারে ছে"কে ধরেচে। সাঁড়াপোতার বাজার ছাড়িয়ে কল্যকার সঙ্গী সেই হাজারী পরটার বেয়াই বাড়ি গেলাম । হাজারী পরটা বাইরে বসে তামাক খাচ্ছিল, আমায় দেখে লাফিয়ে উঠল, 'আসন, দাদাবাব, মহা সৌভাগ্য যে আপনি এলেন, এঃ, মখ যে লাল হয়ে গিয়েচে রোদে—(মখে লাল হওয়ার 8ፅሀፉ বিভূতি-রচনাবলী যদিও আমার কোনো উপায় নেই, আমার কালো রং-এ ) আসন, বসন । তারপর সে নিজেই একখানা পাখা নিয়ে এল ছুটে । বাতাস দিতে আরম্ভ করলে নিজেই, তার বেয়াইকে ডেকে নিয়ে এল, আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলে—মহা খাতির। অনেকক্ষণ—প্রায় ঘণ্টাখানেক সেখানে বসে গল্প করে সেখান থেকে বার হই। ওরা আবার একটু জলযোগ করালে, কিছুতেই ছাড়লে না। আবার রাত্রেও থাকতে বললে। আমি অবিশ্যি তাদের সে অনুরোধ রাখতে পারলাম না। গোবরাপরের বাজারের কাছে এসে দেখি মণীন্দ্র চাটুয্যে যাচ্ছেন। মণীন্দ্রবাব প্রথমে আমায় চিনতে পারেন নি, নাম বলতে চিনতে পারলেন, বললেন—চল আমার ধাড়ি। আমি বললাম—বাড়ি গিয়ে তো থাকতে পারব না, সতরাং গিয়ে কোন লাভ নেই। আপনি কেমন আছেন বলন। তারপর দু-জনে পথে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ গল্প করলাম। মণীন্দ্রবাব এ অঞ্চলের মধ্যে একজন মানুষের মত মানুষ । অমন উদারহৃদয় পরোপকারী, সদাশয় বন্ধ এ সব দেশে নেই। আমি ও'র কাছে গম্ভীরতর অপরাধে অপরাধী । সে কথা এখানে আর ওঠাতে চাই নে। তিনিও সে বিষয়ের কোন উল্লেখ করলেন না। বললাম, শনিবারে আসতেই হবে আমাদের এখানে উপেন ভটচাজের মেয়ের বিয়েতে, সেদিন আবার কথাবাৰ্ত্তণ হবে । আজ আসি । আর কোথাও দাঁড়ালম না। সয' হেলে পড়েচে । রোদ নিস্তেজ হয়ে আসচে। আমায় যেতে হবে এখনও সাত মাইল পথ । কেউটে পাড়ার পথে এক বড়ী জিজ্ঞেস করলে—বাব, এত রোদে বেরিয়েচ কেন ? বললাম—যাব অনেকদরে পথ । বড়ীটি টিকে বেচতে যাচ্চে গোবরাপরের বাজারে । মোল্লাহাটির খেয়া যখন পার হই, তখন স্য' হেলে পড়েচে । মোল্লাহাটির হাট বসেচে, আজ আর-বছরের মত হাটে গেলাম । খবে আমের আমদানি । বেলা গিয়েচে দেখে বেশীক্ষণ দাঁড়াতে পারলাম না । মোল্লাহাটি থেকে খাবরাপোতা পয্যন্ত আসতে রোদটুকু একেবারেই গেল। কিন্তু পথের পাশের আরামডাঙ্গার খড়ের মাঠের দশ্য মনে হোল আমাদের এ অঞ্চলটি সুন্দর বেশী । এত নদী বাঁওড়ের সমাবেশ অন্যত্র নেই। আইনন্দি মণ্ডলের বাড়ির পিছনে সেই বাঁকে এসে খানিকটা বসে বিশ্রাম করি। এই জায়গাটা বড় ভাল লাগে আমার। মরাগাঙ, চক্ৰবত্তে ঘরে গিয়েচে, বাঁশবনের শীষ" অপরাহের ছায়ায় আর নীল আকাশের তলায় বেশ দেখাচ্চে। পলে পার হয়ে এসে দেখি গঙ্গাচরণের দোকানে তালা, দোকান নাকি উঠে গিয়েচে স্টেশনের ধারে । কুঠীর মাঠের পথ দিয়ে ঠিক সন্ধ্যার সময় বাড়ি পৌছই। খাদরা, আসে নি, আসবার কথা ছিল কাল । উষার চিঠি এসেচে, দেখি খাটের ওপরে পড়ে আছে । চার বছর পরে ওর খবর পেলাম । আবার ব্যষ্টি নামল, খুব ঠাণ্ডা পড়ল—কিস্ত; কি জানি সারারাত আমার ভাল ঘাম হোল না । শেষ রাত্রের দিকে একটু ঘাম এল । এসেই উষার চিঠি পেলাম, আর একখানা হাওড়ার রমেন ভট্টাচায্যের । তার পত্ৰখানার উত্তর দিতে হবে। উষা এসেচে কলকাতায় বহুদিন পরে, এর মধ্যে একদিন গিয়ে দেখা করতে হবে । একটা শিমল গাছের গড়িতে বসে কত কথা ভাবলাম। বাল্যে ওই সব বাদলার দিনে কেমন নৌকো বেয়ে একা বেড়াতুম, ওদিকে চালতেপোতার বাঁক, চটকা তলার খালের নাম রেখেছিলাম Oysterbrook ( অল্টাররাক )—তখন সমুদ্রপ্রমণের নানা বই পড়তুম, সবাদা সেই স্বপ্ন দেখতুম। সেই সমদ্র ও আমাদের এই ছোট্ট ইছামতী, তার জল একই কালো উমি্মখের 8&సి জল। সন্ধ্যায় একটা তারা উঠল মাধবপুরের নিজ’ন চরের একটা অতি সন্দর তরণ সাঁই-বাবলা গাছের মাথায় । কত অভূত চিন্তা মনে আসে তারাটার দিকে চেয়ে । বড় ভাল লাগে এই দ্রাবসপিত আউশ ধানের ক্ষেত, বশিঝাড়ের সারি—বসে বসে এই সখদুঃখময় ভাবনা । কলকাতায় ফিরে এসব দিনের কথা বড় মনে হবে। এর মধ্যে একটা আধ্যাত্মিক পরিতৃপ্তি আছে, কলকাতায় মন থাকে উপবাসী প্রকৃতির উপভোগের দিক থেকে, এখানে দুদিন এসে বাঁচি । * তবুও তো এবার রোদ না ওঠার জন্যে ছয়টির শেষের দিকটা মন বড় ভাল নয়। নীল আকাশ দেখা এবার ভাগ্যে বড় একটা জটবে না । মুসলমান মাস্টারটি এল। দু-জনে গিয়ে পাঠশালার পেছনে মরাগাঙের ধারে বসব, এমন সময়ে এল ঝোড়ো কালো মেঘের রাশি, বারাকপুরের দিক থেকে উড়ে এল—সঙ্গে সঙ্গে ঝমঝেম বর্ষার বটি । দৌড়, দৌড়, সবাই মিলে ছুটে গিয়ে পাঠশালার ঘরে আশ্রয় নিলাম। সেখানে বসে ও অবিকাপরের মিটিং-এর কথা বলতে লাগল, আমায় সেখানে নিয়ে যেতে চায় তারা,—কবে আমার যাবার সবিধে হবে ইত্যাদি । আধঘণ্টা পরে থামল বটি । দু-জনে গিয়ে বসলাম পাঠশালার পেছনে মাঠে মরাগাঙের ধারে, আরামডাঙার চরের এপারে । মুসলমান মাস্টারটির বাড়ি বরিশাল জেলা। অনেকদিন থেকে সে এদেশে আছে। তার খেয়াল গ্রামে গ্রামে চাষাদের মধ্যে শিক্ষার প্রচার করা । অশ্বিকাপুর, মামুদপুর, শচীনন্দনপুর, মহৎপর, হলুদো, মানিককোল, বউজড়ি, সপরিাজপুর—এসব গাঁয়ে সে পাঠশালা বসিয়েচে, নিজে দেখাশুনো করে, চাষামহলে তার খুব খাতির । নিঃসবাথ সেবাৱতে ব্ৰতী উদার ধরনের যুবক । তাই ওকে বড় ভাল লাগে। বললে—আসন, বেশ জায়গাটা, বসে একটু গল্প করি । বিড়ি নেই পকেটে—মশকিল হয়েচে, কাকে দিয়ে আনাই বলন তো । আমি গামছা পাতলাম ব্যটিসিক্ত কচি ভেদলা ঘাসের ওপর। ওকে বললাম—বসন । ও বললে—আপনার গামছায় বসব ? জোর করে তাকে বসালাম । তারপরে সে একটা গল্প ফাঁদলে । বললে—শনেন, সেদিন অম্বিকাপরে একটা বড় করণ ব্যাপার হয়ে গিয়েচে । অবিকাপরে আমার যে পাঠশালা আছে, সেখানে একটি মসলমান মেয়ে পড়ত, তার নাম মোমেনা, ও-বছর উচ্চপ্রাইমারী পরীক্ষায় বত্তি পেয়ে পাস করেচে। চাষার মেয়ে, কিন্ত চাষার ঘরে অমন রুপে কেউ দেখে নি। এই টকটকে গায়ের রং, এই পটল-চেরা চোখ, এই স্বাস্থ্য, এই গড়ন-—সবদিক থেকে মেয়েটি যেন আপনাদের বামন কায়হের ঘরের সন্দরী মেয়ের মত। তার ওপর.তার লেখাপড়ার খুব ঝোঁক, গান জানে, শিল্পকাজ শিখেচে স্কুলে, বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। - মেয়েটির এগারো বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল, সেই বছরেই বিধবা হয় । উচ্চপ্রাইমারী পরীক্ষা দেবার পর যখন পাসের খবর বেরলে, তখন তার দেওর তার বাপ মার কাছে যাতায়াত শরে করলে তাকে বিয়ে করবার জন্যে। মেয়েটির বাপ মা রাজি হয়ে গেল । কিন্ত মেয়ের তাতে ঘোর আপত্তি । তার দেওর নিতান্ত মুখ চাষা। সবাহা অতি খারাপ, •চেহারা কালো। মেয়েটি ওই গ্রামেরই একটা ছেলেকে ভালবাসে, মুসলমানেরই ছেলে, থাড" 8&O বিভূতি-রচনাবলী ক্লাস পয্যন্ত পড়েছিল রাণাঘাট কুলে, এখনও বাড়িতে বই, খবরের কাগজ আনিয়ে পড়ে। বয়েস পঁচিশ-ছাব্বিশ, সন্ত্রীও বটে, মেয়েটির বয়েস সতেরো। মেয়ে বাপ-মাকে নাকি গোপনে বলেছিল,—যদি তোমরা আমার বিয়ে দিতেই চাও, তবে অমকের সঙ্গে দিও,আমার দেওরকে আমি বিয়ে করব না। বাপ মা তাতে ঘোর গররাজি। দেওরদের নাকি খুব ধানের গোলা আছে, ক্ষেত খামার আছে, এ ছোকরার কিছুই নেই। মেয়েটির কথা কেউই শনলে না । তাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিলে তার দেওরের সঙ্গে। বিয়ের সময় আমাদের মুসলমানদের প্রথা আছে বিবিকে মোল্লা জিজ্ঞেস করবে, তুমি একে বিয়ে করতে সম্মত আছ তো ? মোল্লা সে কথা মেয়েকে জিজ্ঞেস করতেই মেয়ের ফিট হয়ে গেল সেই বিয়ের আসরে । ভাবন, কতটা দুঃখ সে বকে চেপে রেখেছিল নীরবে মুখ বুজে । আমি বললাম—বিয়ের কি হোল ? সে বললে—বিয়ে কি আটকে আছে ? হয়ে গেল। তারা শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে গেল । —বড় লক্ষী মেয়ে, কিন্তু তার জীবনটা— The usual story—অনেক শানেচি এমন ধরনের গল্প। কিন্তু কেন এমন হয়, তা কে জানে ? , সযf্য অস্ত যাচে । বাবই পাখীদের অত্যাচার বড় বেড়ে গিয়েচে । জোলো ধানের ক্ষেতে বেজায় পটপটির আওয়াজ ও ভাঙা টিনের বাজনা ! ময়রকণ্ঠী রংয়ের আকাশে যেন একটা কালো আভা লেগেচে । অমন সন্দের মহান, অমন মরাগাঙের ধারে, আরামডাঙ্গার চরের এপারে, অমন ইন্দ্রনীল আকাশের নীচে বসে গল্পটা বড়ই করণ লাগল । হয়ত গল্পটা কিছু নয়—মানষের ব্যথাহত আত্মার আকুতি—সেটাই আসল জিনিস । আইভ্যান বনিনের কথায় বলি ৪—

  • Then what is Art It is the prayer, the music, the song of the

human soul”—এই কথাটা আমাদের দেশের পন্ডিতমন্য সমালোচকদের বাবতে দেরি লাগবে । শুধ, teller of tales হওয়া আর প্রাণের ভাষার ব্যঞ্জনা—দটো সম্পণে আলাদা জিনিস, আমাদের অনেকে বলে—গলপ তো বলা হয়ে গেল, আর কেন ? পাঠকে বঝে নিক না বাকীটুকু।“পাঠকে বুঝবে কাঁকুড় । রোজই যখন হাট করে ফিরি, তখন আমার চোখে পড়ে বটগাছ, বাঁশবন, আমবন, বড় বড় কুকুরে-আলর লতা গাছের গায়ে জড়িয়ে জড়িয়ে উঠেচে । পানের মত তার চকচকে সবুজ পাতা, গাছে-গাছে কাঁঠাল ঝুলচে, নারকেলগাছ, কলাগাছ, পে'পেগাছ, ঘন আগাছার জঙ্গল, বাঁওড়ের চর, কচুরিপানার দাম, কোকিল ও বেী-কথা-কও পাখীর ডাক, কুচ ঝোপ, শিমলগাছ, সোনালী-ফুল-দোলানো বাবলাগাছ, উলঙ্গ শিশুর দল, মাছ ধরা দেয়াড়ী, কুমোর পাড়ায় হাঁড়ি পোড়াবার পণ, কলসী কাঁখে গ্রামবধরে দল—ট্রপিকসের কোনও একটা দেশের পরিচিত দশ্য। যেমন দেখা যায় যবদ্বীপে, সমান্নায়, মালয় উপদ্বীপে, বোণিও ও ভারত সাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে । ইউরোপ আমেরিকা থেকে সপণ" পথক এদের জীবনযাত্রা, চিন্তাধারা, শিল্প, খাদ্য, পরিচ্ছদ, দেশের দশ্য । আমরা বলি আমাদের ভাল, ওরা বলে ওদের ভাল । ওদের বিজ্ঞান আছে, কলকব্জা আছে, সাহস আছে, অধ্যবসায় আছে— আমাদের দর্শন আছে, প্রাচীন ঋষিরা আছেন, পাঁজিপথি বিস্তর আছে-“আমরা বলিই উমি্মখের Šes আমরাই বা কম কি ? আমি তো দেখি এসব কিছুই নয় । এবার ট্রপিকসের কোনও দেশে ( যদিও বাংলা ওর মধ্যে পড়ে না ) জন্মেচি, দীর কোনও জন্মাস্তরে যাব ইউরোপে কি মাকিন যুক্তরাষ্ট্রে কিংবা বহিস্পতি কি অন্য কোথাও গ্রহান্তরে, কি কোন দরে নক্ষত্রে—আমি অমর আত্মা, আমি দেশকালের অতীত—কোন দেশ আমার, কোন দেশ পর ? সকলকেই ভালবাসতে চাই চবদেশ বিদেশ নিবিশেষে, সকলের সব ভালটুকু নিতে চাই—এই আমার, এই তোমার— এ সংকীর্ণতা যেন থাকে না । এই দেশে জমেচি, মানুষ হয়েচি, কিন্ত এদেশের সঙ্গে নিজেকে অনেকটা মিশিয়ে দিলেও যেন খানিকটা আছি কৌতুহলী দশকের মত, যেন এই বক্ষলতাবহল সবুজ দেশে এসে দেখে এবার আশ্চৰ্য্য হয়ে গেছি, প্রতিদিন দেখচি আজ চল্লিশ বছর ধরে, তব তৃপ্তি নেই, এ নিত্য নতুন আমার কাছে, কোনও দিন বুঝি এর রপ একঘেয়ে লাগবে না । সাতবেড়ের একটি ছেলে গল্প ও কবিতা লিখে মাঝে মাঝে আমার হাতে দেয়। গত দু-তিন বছর থেকে দিচ্ছে । গরীবের ছেলে, পয়সার অভাবে লেখাপড়া শিখতে পারে নি, কিস্ত লেখে মন্দ নয়। গলেশ্বর হাত আছে, তবে টেকনিকের ওপর তেমন দখল নেই, থাকবার কথাও নয়—টেকনিক জিনিসটা কতকটা আসে এমনি, কতকটা আসে ভাল লেখকদের গল্পের রচনারীতি দেখে । তার জন্যে পড়াশুনোর দরকার হয় । এ ছেলেটির সেরাপ বই পড়বার সংযোগ কোথায় ? মচি-বাড়ির সামনে বটতলায় তার সঙ্গে দেখা । সে আমার সঙ্গে আলাপ করবে বলেই ওখানে বসে অপেক্ষা করছিল, বললে । কাঁচুমাচু হয়ে জিজ্ঞেস করলে—আর-বছরের সেই লেখাগুলো কি দেখেছিলেন ? 懿 ওর সঙ্গে আমার দেখা হয় বছরে একবার, এই জ্যৈষ্ঠ মাসের ছটিতে। সেই সময় ও আমার কাছে ওর লেখা দেয়, ইচ্ছেটা এই ষে কলকাতার কোনও কাগজে ছাপিয়ে দেবো । কিন্ত কাগজে ছাপাবার উপর্যন্ত হয় না ওর লেখা। তবুও আমি প্রতি বৎসর উৎসাহ দিই, এবারও দিলাম। মিথ্যে করে বললাম, তোমার গল্প বেশ ভাল হয়েছিল, কলকাতার অনেকে পড়ে খুব সংখ্যাতি করেচে। ও আগ্রহের সঙ্গে বললে—কোন গল্পটা ? আমার নাম মনে নেই ওর কোনও গল্পেরই, কাগজগুলোও কোন কালে কোথায় হারিয়ে গিয়েছে । ভেবে চিন্তে বললাম—সেই যে একটা মেয়ে ; বলতেই ও তাড়াতাড়ি বললে—ও বিয়ের কনে ? —হ’্যা, হ্যা, ও বিয়ের কনে । একটা মিথ্যে কথা পাঁচটা মিথ্যে কথা এনে ফেলে । কাঁচকাটার পল পয্যন্ত বটতলার ছায়ায় ছায়ায় ও আমার সঙ্গে সঙ্গে অতীব আগ্রহ ও কৌতুহলের সঙ্গে শুনতে শুনতে এল, কলকাতার কোন কোন বড় লোক ওর গল্পের কি রকম সংখ্যাতি করেচে–কোন কাগজের সপাদক বলেচে যে, আর একটু ভাল লেখা হোলেই তারা তাদের কাগজে ছাপাবে, তার কবিতা পড়ে কোন মেয়ের খুব ভাল লেগেছিল বলে হাতের লেখা কবিতাটা আমার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে রেখে দিয়েচে কাছে ৷ সন্ধ্যার দেরি নেই, আমি বললাম—তবে আজ যাই, আবার ফিরে নদীর ধারে মাঠে বেড়াতে যাবো । কি করো আজকাল ! ও বললে—বাড়ি বসে তো আর চলে না, তাই ওই পথের ধারে ধান চালের আড়তে কাজ নিইচে । আজ এই তিন মাস কাজ করচি। সকালে আসি আর সন্দের সময় ছটি পাই । তারপর একটু লজামিশ্ৰিত সকোচের সঙ্গে বললে—আসচে হাটে আপনাকে আর 8ఆషి বিভূতি-রচনাবলী গোটাকয়েক গল্প ও কবিতা দেবো—পড়ে দেখবেন কেমন হয়েচে । কলকাতার ওই বাবদেরও দেখাবেন । আমি উৎসাহের সঙ্গে বলি—নিশ্চয়ই । বাঃ চমৎকার লেখা তোমার। পড়ে সেখানে সবাই কি খুশি ! তা এনো। আসচে হাটবারেই এনো। তার আর কথা কি ! ও বললে—ফিরবেন তো এমন সময় ? আমি লেখা নিয়ে এই বটতলায় বসে থাকবো । আসবেন একটু সকাল-সকাল যদি পারেন—দু-একটা লেখা একটু পড়ে শোনাবার ইচ্ছে— আমি ওর মাখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম—শোনাবে নাকি ? বাঃ তবে তো বেশ দিনটা কাটবে। নিশ্চয়ই আসবো। তোমার কথা কত হয় কলকাতায় বন্ধবোন্ধবদের মধ্যে। বেচারীকে সত্যি কথা বলে লাভ নেই । ওতেই ওর সখে, আমরা সবাই জীবনে মিথ্যের সবগ রচনা করে রেখেচি, উনিশ না হয় বিশ। মিথ্যে বলে যদি ওই দরিদ্র, অসহায় পল্লীযবেককে এতটুকু আনন্দ দিতে পারি ভালই। ওর মিথ্যে সবগ আগামী জ্যৈষ্ঠ মাস পয্যন্ত অক্ষয় হোক । আজ ঘুম থেকে উঠে যখন হাটে যাই, তখন মেঘলা করে এসেচে, বেশ লাগলো । বনে বনে কাঁঠাল গাছে কাঁঠাল ফলে আছে, পানপাতার মত বড় বড় লতা উঠেচে গাছে গাছে— ঘন কালো বর্ষার মেঘ করেচে নৈঋত কোণে । গোপালনগর পৌছতেই রাধাবল্লভ নিয়ে গেল ওদের বাড়ি । রাধাবল্লভের স্ত্রী পাঁচী আমাদের গায়ের , মেয়ে । ছেলেবেলায় এক সঙ্গে খেলা করেচি বকুলতলায়—বিলবিলের ধারে, যুগল বোস্টমের কামরাঙা তলার পথে । ওরা জাতে জেলে । ওর বিয়ের পর ওকে আমি এই প্রথম দেখলাম বোধ হয় বাইশ-তেইশ বছর পরে। দেখে বড় স্নেহ হোল—জড় হয়ে এসে প্রণাম করল । কথাবাত্ত" খুব বিনীত, নম্নসম । একটু ভয়ে ভয়ে কথা বললে । আমি ব্রাহ্মণ, ওর বাড়িতে গিয়েচি, পাছে আমারকোনও অসম্মান হয়, এই ভয়েই তটস্হ । ওর ছেলেকে দিয়ে একটু সন্দেশ ও জল পাঠিয়ে দিলে । তাও ভয়ে ভয়ে । ভাবলে আমি খাবো কি না। নিজের হাতে সাহস করে নিয়ে আসতে পারলে না । আমি ওকে দেখিয়ে সে সন্দেশ ও জল খেলম, ওর মনে দ্বিধা ও সত্তেকাচের কোনও অবকাশ দিলাম না । ও পড়ে গিয়েছে বড় বিপদে । এর বড় মেয়ের বয়স প্রায় কুড়ি । মেয়েটি দেখতে শুনতে বড় ভাল, লেখাপড়াও শিখেচে । ওদের জাতে ভাল ছেলে বড় একটা পাওয়া যায় না— অনেক খুজে পেতে বাপে বিয়ে দিয়েছিল ওরই মধ্যে একটু আধটুশিক্ষিত একটি ছেলের সঙ্গে। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে ওর ওপর বড় খারাপ ব্যবহার করে বলে, বাপ মেয়েকে আর সেখানে পাঠাতে চায় না । সে জামাই আবার বিয়ে করচে । এই সব নিয়ে গোলমাল । ওরা জেলেপাড়ার মধ্যে বাস করে, ভাল কোঠা বাড়ি, পরিকার পরিচ্ছন্ন থাকে । ওর স্বজাতিরা সেজন্যে ওদের দু-চোখ পেতে দেখতে পারে না । তার ওপর মেয়েটা নাকি সব্বদা বই পড়ে। কি সম্বনাশ ! জেলের মেয়ে বই পড়বে কি ? ওদের পাড়ার লোক ষড়যন্ত্র করে একরাত্রে ওদের ঘরে ঢুকে কিছু টাকা কাপড়চোপড় চুরি করে নিয়ে গিয়েচে, আর এক বাক্স ভাল ভাল বই সব ছিড়ে দিয়ে গিয়েচে । পাঁচী লেখাপড়া জানে না, কিন্তু বইগুলোর শোক ওর লেগেচে খব। আমাকে কাঁদতে কাঁদতে বললে—আসন তো দাদা, দেখন দিকি, আপনি তো লেখাপড়া জানেন, আমার এক বাক্স বই, খড়বশরের কেনা—বইগুলো ছিড়ে ছটে তার আর কিছু রেখেচে দাদা ? গিয়ে দেখলাম একটা আমকাঠের সিন্দকে অনেকগুলো পরোনো বই, বেশ ভাল বাঁধানো। দীনবন্ধ, বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, কিছু সেকেলে বাজে বটতলার উপন্যাস, মডেলভগিনী, কঙ্কাবতী, পরোহিত দপণ ( ওদের বাড়ি পরোহিত দপণে কি কাজ জানি নে, }, রামায়ণ, হরিবংশ এই সব বই । মেয়েটা সেই সব বই পড়তো বলে পাড়ার কারও সহ্য হতো উমি্মুখর 8ෂළු না। তাই বইগুলোর ওপরে ঝাল ঝেড়েচে । আমি বললাম—যদি ওকে বশীর বাড়ি না পাঠাও, তবে ওর লেখাপড়া শেখার ব্যবস্হা করো । পাঁচীর কান্না দেখে বড় কষ্ট হোল । কতকাল আগে বাল্যে এক সঙ্গে খেলা করেচি, ওদের পর ভাবতে পারি নে । হাট থেকে যখন ফিরি, তখন বেলা গিয়েচে, রোদ রাঙা হয়ে এসেচে । মাঠে নদীর ধারে একটু বসে ওপারের মেঘস্তুপ লক্ষ্য করি, তারপর জলে নামি স্নান করতে । অধিকার হয়ে গিয়েচে, ওপারের চরে সাইবাবলা গাছের বন, আর সেই প্রতিদিনের উত্তজবল তারাটি উঠেচে, দেখতে বড় চমৎকার হয় ও তারাটা । সকালে বসে যখন লিখচি, মনোরমা এসে বই চাইলে—পাঁচীর মেয়ে মনোরমা । ও আমার কাছে একখানা বই চেয়েছিল এবার, কিন্তু নানা গোলমালে সবিধে হয় নি । বললাম, কলকাতায় গিয়ে পাঠিয়ে দোবো, মা । বেশ মেয়েটি মনোরমা, জেলের মেয়ে বলে ওকে বোঝাই যায় না । ওপাড়ার ঘাটে সাঁতার দিয়ে যাবার সময় নড়াইল থেকে একখানা নেীকো আসচে দেখি, যাবে গঙ্গায় ইলিশ মাছ ধরতে, দু-দিন হোল ইছামতী নদীতে পড়েচে । তারা জিজ্ঞেস করলে—ইছামতীর মুখ আর কত দরে ? 蟾 羈 ঘাটের কেউ জানে না। আমি বললাম—আরও দুদিন লাগবে চণি নদীতে পড়তে । সেখান থেকে আর একদিন । বৈকালে বেলেডাঙার পল্লীমঙ্গল সমিতি প্রতিষ্ঠা করলাম । আরামডাঙা, নতিডাঙা, সদানন্দপুর, চিত্রাঙ্গপুর, নতুনপাড়া, পাঁচপোতা প্রভৃতি সাত-আটখানা গায়ের লোক জড়ো হয়েছিল। সদানন্দপুরের সৈয়দ আলি মোল্লাকে সভাপতি করে আমি এক লম্বা বক্ততা ঝাড়লাম সভার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে । ছেলেরা গান গাইলে, ফুলের মালা গলায় দিলে । হৈ হৈ ব্যাপার। তারপর উপস্হিত লোকেদের মধ্যে বেছে বেছে এক কাযf্যকরী সমিতি গঠন করি । নর মহম্মদ মাস্টারের আগ্রহেই এ সব হোল । সে লোকটা নিঃসবাথ সেবাপরায়ণ, গ্রামে গ্রামে ঘরে লোক যোগাড় করা, সকলকে খবর দেওয়া, এসব সে-ই করেচে। মিটিং-এর পরে বৈকালে নীল আকাশের বিচিত্রবণ মেঘস্তুপের তলে মরাগাঙের ধারে সবুজ ঘাসভরা মাঠের মধ্যে বসে গ্রামের লোক কত দুঃখের কথা আমার কাছে বলতে লাগল। গাঁয়ে জলের কণ্ট, কচুরিপানায় পচা জল খাচ্ছে, বেলে জমিতে ফসল হয় না, ক-বছর অজন্মা, মোল্লাহাটির খেয়াঘাটের ঘাটওয়ালাদের জলম । • তাদের বুঝিয়ে দিলাম, এই পল্লীমঙ্গল সমিতি থেকে গ্রামে এসব অভাব অভিযোগ দর করবার চেস্টা করা হবে । তোমরা চাইতে জানো না, তাই পাও না । অন্য গাঁয়ে দুটো টিউবওয়েল হয় দু-পাড়ায়, তোমাদের গোটা গাঁয়ে একটাও হয় না। সন্ধ্যার আগে সেখান থেকে রওনা হলমে যখন, তখন মাথায় সেই উৎজল তারাটি উঠেছে। বাড়ি এসেই উষার পত্র পেলাম । ছুটি শেষ হয়ে আসচে আর আমার মন খারাপ হয়ে আসচে। এই মন্ত নদীর চর, নীল উদার আকাশ, বষ*াশ্যাম তৃণভূমি, আষাঢ়ের টলটলে কালো জল ইছামতী, জোনাকীর ঝকি, বেী-কথা-কও পাখীর ডাক, এসব ছেড়ে যেতে কষ্ট হয়। জীবনের বেগ ষেন মন্দ্ৰীভূত না হয়। আমাদের দেশে, আমাদের জাতীয় জীবনে তার আশঙ্কা খুব বেশী। পেট্রাক" সম্বন্ধে যেমন উক্ত হয়েচে—‘It is a noble Florentine 8&8 বিভূতি-রচনাবলী profile, the whole aspect suggesting abundance of thought and life--.” আমাদের দেশে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কার সম্বন্ধে সে কথা বলা যায় ? 零 রাত্রে মন রায়ের বাড়িতে সামাজিক দলাদলির মিটিং হোল রাত একটা পয্যন্ত । * গাঁয়ের সবাই ছিল, কিছুতেই আর মেটে না। নানা কথা ওঠে, এ রাগ করে চলে যায়, ও রাগ করে চলে যায়। শেষ পয্যন্ত কিছুই মীমাংসা হোল না। আমায় দু-বার ডাকতে এল, আমি যাই নি । " সারাদিন বর্ষার বটি । আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, পথে ঘাটে জল বেধেচে । বৈকালে বটি একটু ধরেছিল, সন্ধ্যায় আবার মেঘ এল ঘনিয়ে । আমি সেই সময় নদীর জলে নেমেচি নাইতে–মাধবপুরের পারের ওপরে সেই মেঘনীল দিবলয়ের পটভূমিতে একটা শিমল গাছ কি সুন্দর দেখাচ্চে । এই ইছামতী, এই মেঘমালা, এই বর্ষার সবুজ বনভুমি এমনি থাকবে—অথচ আমরা চলে যাবো আমাদের সকল সুখ-দঃখ নিয়ে, আজকের এই মেঘ-মেদর সন্ধ্যার সকল অনভূতি নিয়ে। ঘাটের ওপর ওই বনসিম লতার কোলের নিচে খকুর সে ছবিটা ক্ৰমে বহ,দরের হয়ে পড়েচে, এই পল্লীনদীটির শ্যামতীরে বাঁশ ও বনসিম লতার ছায়ায় অক্ষম হয়ে থাকবে সে ছবি, এর আকাশে বাতাসে মিলিয়ে, কিন্তু তাকে চিনে নেবার লোক থাকবে না কেউ, কেউ এমন থাকবে না যার মনে ও ছবি বেচে থাকবে । বারাসাত গেলাম পশুপতিবাবর কাছে । উনি সকালেই যেতে লিখেছিলেন । কিন্তু শরীরটা একটু খারাপ ছিল । বারাসাত নেমে দেখি এ অঞ্চলে খুব ব্যটি হয়ে গিয়েচে—অথচ কলকাতায় এক ফোঁটাও জল নেই। হাসপাতালে গিয়ে দেখি পশুপতিবাব জেল দেখতে গিয়েচেন । আমি বসে রইলাম, তারপর পশুপতিবাব এলেন । আমায় পেয়ে খুব খুশি । দু-জনে হাসপাতাল দেখতে গেলাম, গোবরডাঙ্গা থেকে এসেচে একটা জখম রোগী। তার মাথায় দু-তিনটা বড় বড় গত্ত । তার বড় ভাই নাকি বিষয়ের ভাগ দিতে হবে বলে তার মাথায় ওই রকম মেরেচে। পশুপতিবাব বললেন, লোকটা বাঁচবে না। জাতিতে ব্রাহ্মণ, গাঙ্গলি, গোবরডাঙার কাছে বেড়গমি গ্রামে বাড়ি । হাসপাতালের কালো, মোটা মত একটা নাস ওকে যত্ন করচে দেখলাম । তারপর জেল দেখতে গেলাম । তখন কয়েদীরা সব খেতে বসেচে। খাবার বন্দোবস্ত দেখে মনে হোল জেলের মধ্যে ওরা বেশ সুখেই থাকে । দিব্যি সাদা চালের ভাত, তরকারিটা রোধেচে তার বেশ সদগন্ধ বেরচ্ছে, ডালটাও বেশ ঘন । সপ্তাহে একদিন মাছ, একদিন মাংস দেয় । ওরা নিজেদের বাড়িতে অমন খাদ্য প্রতিদিন তো দরের কথা কালেভদ্রে খেতে পায় কি না সন্দেহ । একজন কয়েদী ভদ্রলোকশ্রেণীর, তাকে বললাম, আপনার কি হয়েছিল, কতদিনের জেল ? বললে, চিটিং কেস মশাই, পনেরো মাসের জেল । আর একটা ছোকরাকে বসিরহাট অঞ্চল থেকে ধরে এনেচে । তার বিচার এখনও হয় নি। জিজ্ঞেস করলাম—কি করেছিলে ? বললে—একটা মেয়েকে খনে করেচি । —কেন খন করলে ? —বাব, চারদিন খাইনি। ওর গায়ে গয়না ছিল, সেই লোভে মেরেচি। আমরা বললাম-বাপ। ওরকম বোলো না, পলিসের কাছেও না বিচারের সময়ও না। বললে মারা পড়বে । তারপর এসে একটা বড় পুকুরের ধারে বসলাম । তখন বন্টি থেমে গিয়েচে । পুকুরের উমি্মথের Svå: ওপারের আকাশে মেঘপুঞ্জ, তবে কি আর দেশের মত ভাল লাগছিল, তা নয়। কলকাতার চেয়ে ভাল বটে। একটা ছোট মেয়ে পশুপতিবাব বলাতে, অনেকগুলো বই ফুল তুলে এনে দিলে। পশুপতিবাবরে বাসায় বারান্দাতে বসে চা খেয়ে অনেক গল্প করা গেল । রাত্রে ফিরবার সময় মিনদের বাড়িটা দেখলাম । বাড়িটা ভালই, তবে বারাসাতে অত্যন্ত ম্যালেরিয়া বলে ও'রা এখানে থাকতে পারেন না । আজ রাধাকান্তদের বাড়ি গেলাম তার বৌভাতের নেমস্তৰে । অনেকদিন যাই নি ওদের বাড়ি, ওরাও খুব ভালবাসে । বাইরের ঘরে খুব ভিড় থাকা সত্বেও রাধাকান্ত, খিচু, ভীম, বাঁটুল সবাই এসে গল্পগুজব ও আপ্যায়িত করলে ৷ ভীম ও বাঁটুলের সে কি আনন্দ আমি গিয়েচি বলে ! রাধাকান্ত খাবার সময়ে হাত ধরে ওপরে নিয়ে গেল ওর বোন লক্ষীর কাছে । লক্ষসীকে বললে—এ কে আলাদা জায়গা করে খেতে দে । লক্ষীর ছোট বোনটা বেশ বড় হয়ে উঠেচে দেখলাম । আমি একবার পুজোর সময় জাহ্নবীর মেয়েকে নিয়ে গিয়েছিলাম, ওর আগের পক্ষের খড়ীমা তাকে পুতুল দিয়েছিলেন—সে সব কথা বললে । বাঁটুল একটা ঘরের কাছে নিয়ে গিয়ে জানালা দিয়ে বেী দেখালে—ঘরের মধ্যে মেয়েদের ভিড় । সোনারবেনের মেয়েরা অত্যন্ত গহনা, পরে এক একটি মেয়ের আপাদমস্তক গহনায় মোড়া, নাকের নথও বাদ যায় নি । আজকাল যে এত গহনা পরার রেওয়াজ আছে, বিশেষ এই কলকাতা শহরে—সে আমার ধারণা ছিল না । 鹽 觀 রাধাকাস্তের বোন লক্ষী অন্যরকম দেখতে হয়ে গিয়েচে । শিব যখন আর একবার দোতলার ঘরে বেী দেখাতে নিয়ে গেল তখন সে একখানা লুচি হাতে সঙ্গে সঙ্গে ফিরতে লাগল, কিন্তু ও যেন বড় ছেলেমান ষ হয়ে গিয়েচে । - রাধাকান্ত ছেলেটি আমায় খুব ভালবাসে এ আমি বরাবরই দেখে আসচি–শিবর চেয়ে ভীমের চেয়েও । ওর মধ্যে কপটতা নেই । কলকাতায় বড় একটা আনন্দ পাওয়া যায় না ; কিন্তু কাল সন্ধ্যা ছ-টার সময় বাসায় ফিরে এসে বারাশদীতে বসে আছি, হঠাৎ মনে আপনা-আপনিই আনন্দ এল । সকলের কথা মনে এল । দেখলাম ভেবে নিরাকার ভগবানকে আমি বুঝি নে, তাঁর ধারণাও করতে পারি নে—God as pure spirit তাঁকে বুঝতে পারবো না যতক্ষণ তাঁর রপ না পাচ্ছি। যখন তিনি নিদিষ্ট রপে গ্রহণ করে আসবেন, তখন তাঁকে আমরা ভক্তি করতে পারি। কেন না মানুষ নিরাকার নয়। এমন সে কখনও জীবের কল্পনা করতে পারবে না যার প্রাণ আছে, মন আছে, অথচ আকার নেই। নিরাকার ভগবানের উপাসনা কি সোজা ব্যাপার । কিন্তু এসব কথা অবাস্তর ; আমার মনে উঠল একটা অন্য ভাব । খকুদের কাছে একটা বার-তের বছরের ছোট মেয়ে খেলে বেড়াচ্চে। মেয়েটি ভারী সন্দরী, নীলাবরী শাড়ি পরনে, বিদ্যুতের মত ছটে ছটে খেলে বেড়াচ্চে । মাথার খোঁপাটিতে যেমন ঘন কালো চুল, তেমনি পরিপাটী করে বাঁধা । ওকে দেখলেই মনে হোল Out of clay ভগবান এমন সম্বর ছাঁচে গড়েচেন, এমন আকারে গড়েচেন—আর তিনি নিজে নিরাকার, এ কেমন করে ভাবতে ভাল লাগে ? কি অদ্ভুত রসায়ন যার বলে মাটি থেকে অমন সুন্দরী মেয়েটির মত চেহারা তৈরি হয়েচে । তিনি নিজেও ইচ্ছা করলে সন্দের মাত্তিতে প্রকাশ হতে পারেন নিজে, যে দেশের লোকে যা ভালবাসে সেই মাত্তিতে। যেমন ধরা যাক, আমাদের দেশে বহন শতাব্দী ধরে গলে বনমালা, মাথায় শিথিপচ্ছে, হাতে বেণ এই শ্রীকৃষ্ণের কিশোর মাত্তি'র প্রচলন, তাও দ্বারকা বা কুরক্ষেত্রের শ্ৰীকৃষ্ণকে কেউ চায় না—সে সময় তিনি নিশ্চয় প্রৌঢ় হয়েছিলেন যদি বি. র. (৩য়)—৩০ 800 বিভূতি-রচনাবলী সত্যি ঐতিহাসিক ব্যক্তি হয়ে থাকেন—কিন্তু চাইবে সবাই বন্দাবনের সেই কিশোর শ্ৰীকৃষ্ণকে । সতরাং আমাদের দেশের লোকের রক্তে ওই শ্ৰীকৃষ্ণরপেী ভগবানের রপে নত্য করচে—আমাদের দেশের হাওয়ায় তাঁর বাঁশি বাজে, পাখীরা তাঁর নাম করে—এদেশের মাটিতে তাঁর চরণচিহ্ন সন্বলি । এদেশে ভগবানের সাকার মাত্তির কথা ভাবতে গেলে শ্ৰীকৃষ্ণ মুক্তিই এসে পড়ে মনে । যে ভালবাসে ওই মত্তিকেই ভালবাসে, যে না ভালবাসে সেও পাকে-চক্লে ওই মত্তির কথাই ভাবে, শেষে ভালবাসা এসে পড়ে মনে কোন অলক্ষ্য দ্বারপথ বেয়ে । কলকাতা শহরের একটা অদ্ভুত রুপ আছে, যেটাকে দেখতে হলে বিকেল ছ-টা থেকে রাত এগারোটা পৰ্য্যস্ত জনবহল কোয়ার, সাধারণ পাক, সিনেমা, থিয়েটার, ভাল ক্লাব প্রভৃতি ঘরে বেড়ানো দরকার । কোনও পাটিতে গিয়ে সহাণবৎ আচল হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিলে শহরের এ ঐশ্বয*্য, রংপ হারিয়ে ফেলতে হয়। এক জায়গায় বেশীক্ষণ থাকলে হয় না—ট্রামে বা বাসে ঘরে বেড়াতে হয়, মোটর যদি না থাকে। আলো না জবললে শহরের রপে খোলে না। আজ ভোরে বেরিয়েছিলাম একখানা ট্রামের all day ticket কেটে । কারণ নানা জায়গায় ঘরতে হচ্চে, রবিবার ভিন্ন সবিধে হয় না। কমলাদের হোস্টেল হয়ে মণীন্দ্রলালের ওখানে গিয়ে দেখি পুরো আভা বসেচে–পরেশ সেন বিলেতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করচে, ভূপতি, মহিম, নরেনদা সবাই উপস্হিত। সেখানে ঠিক হোল ওবেলা ছ-টার সময় বিজলীতে সবাই মিলে "She" দেখতে যাওয়া হবে । মণি বন্ধনের নাচ হবে আজই ইনস্টিটিউটে, আমায় মণি বন্ধনি একখানা কাড" দিয়েচে সে-কথা বললাম। ওরা উড়িয়ে দিলে। তখন ঝমােঝম বৃটি নামল। সেই বটি মাথায় ট্রামে ও বাসে সাঁতরাগাছি গিয়ে পোছই ননীর বাড়ি । ননীরা বাসা বদলে আর একটা বাড়িতে এসেচে। ‘বিজলীতে এসে দেখি শুধ পরেশ সেন এসেচে। একটু পরে মণীন্দ্র ও ভুপতি এল । আমরা সবাই ফিলম দেখলাম। "বিজলী'তে এমন একটা atmosphere আছে সেখানে বসে ফিলম দেখে সুবিধে হয় না। ভাল সঙ্গ, ভাল পারিপাবিক অবস্হা ভিন্ন যেখানে সেখানে বসে, ছবি বা থিয়েটার বা যে কোনও আমোদ-প্রমোদ ভাল লাগে না । আলোকোছজনল প্রেক্ষাগহ, সুবেশা তরণীর দল, পরিপাটী আসন—এ সবের খুব বড় একটা স্হান আছে ছবি বা থিয়েটার দেখাতে । ওখান থেকে বেরিয়ে ট্রামে আলিপুর ও খিদিরপর হয়ে বাসায় ফিরলাম। পথের বণ্টিনাত গাছপালার ওপর শ্যাওলা পড়ে বেশ দেখতে হয়েচে, কাজ’ন পাকে ফুল ফুটে আছে, নরনারীর চিত্ৰ—বেশ লাগল। কলকাতার এই প্রমোদসজ্জা অতি চমৎকার । এত বড় একটা শহরের এ রপে ভাল করে দেখবার জিনিস । পরদিনই বিকেলে তরদের বাড়ি গেলাম শ্যামবাজারে, সেখান থেকে সম্প্রধ্যায় রঙমহলে বিধায়ক ভট্টাচায্যের নাটক দেখতে গেলাম ‘কালের মন্দিরা বাজে’ ও ‘অতি আধুনিক’ । নাটক দ'খানা কিছুই নয়, অতি বাজে, তবে গান ও variety show হিসেবে অনেকগুলো গণী লোককে একত্র করেচে বটে, নাটকের সঙ্গে তার কোনও সম্পক নেই। হেমেনদা এসে এক কোণে চুপ করে বসে আছেন। দেখা করে এলাম। সবাই মিলে এক সঙ্গে বসে খব জমিয়ে আভা দিতে দিতে থিয়েটার দেখা গেল । গত শক্রবারে শ্রীরামপারে দিদির মেয়ে প্রভার বিয়ে হোল । আমি প্রথমে গেলাম লীলাদিদিদেরবাড়ি। লীলাদিদির শরীর প্রথমে খবই খারাপ হয়েছিল। এখন কিছর সেরেচে। অমিয় কলেজ থেকে এল রমেশ কবিরাজকে সঙ্গে করে । ওখানে অপেক্ষণ বসেই দিদির বাড়ি গেলাম। ওরা সকলে মিলে স্ত্রী-আচারের সময়ে বরকে ঘিরে আলো নিয়ে প্রদক্ষিণ করলে। উমি্মুখর 894 আমি ওদের সকলকে অনেকদিন পরে একজায়গায় দেখলাম,—বড় ভাল লাগছিল । রাত দশটার ট্রেনে কলকাতায় এলমে । পরদিন শনিবার বনগাঁ যাব, ঠিক দুপারবেলা থেকে ঝমােঝম ব্যটি শার হোল—অতি কন্টে বটির মধ্যে দিয়ে তো ট্রেন ধরলাম। বণ্টিনাত ঘন সবুজ গাছপালা, ধানের ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে ট্রেন বনগাঁ গিয়ে পৌছল। খয়রামারিতে ফুটবল ম্যাচ দেখতে গেলাম । তার পরদিন সকাল থেকে কি বিশ্রী বাদলা । নদীর জলে ঘোলা এসেচে, ঘাস পৰ্য্যস্ত ডুবে গিয়েচে, এত জল বেড়েচে নদীতে। এখন তো খুবই ভাল, মুশকিল বাধবে সেই কাত্তিক মাসে যখন হাঁটুভ’র কাদা হবে নদীর ধারের সম্ববত ! 證 সোমবার বৈকালে চলে এলমে কলকাতায় । দিনটা পরিৎকার ছিল, নীল আকাশ, রৌদ্রও উঠেচে । মনে হোল ওই প্রজাপতির দলের উড়ে বেড়ানোর দিকে চেয়ে সারাদিন যদি বসে থাকি, চমৎকার গলেপর প্লট মনে আনতে পারি । এই আলো ছায়ার খেলাতেই মনের ভাব নতুন ধরনের হয়—মাটির সঙ্গে, প্রস্ফুটিত ভায়োলেট রঙের বনকলমী ফুলের শোভা ব্যটিধোয়া নীল আকাশের রাপে । আজ স্কুলের ছাদ থেকে দর্পরের চনমনে রোদে দীর আকাশের দিকে চেয়ে রবীন্দ্রনাথের গানটি মনে পড়ল— ‘কেন বাজাও কাঁকন কনকন কত ছল ভরে । ওগো, ঘরে ফিরে চল কনককলসে জল ভরে” । এই গানের ছত্র দটির সঙ্গে আমার আঠার বৎসর পবেকার প্রথম যৌবনের জীবনের একটা ঘনিষ্ঠ সাপক আছে । চেয়ে চেয়ে মনে হোল বষাসতেজ সবুজ গাছপালা বনঝোপে ঘেরা কোন একটি নিভৃত পল্লীভবনে তারা এখনও সব কিশোরই রয়ে গিয়েচে কত বৎসর আগের সেই এক প্রথম শরতের দিনগুলির মত i কোথায় যে তারা ছায়াছবির মত মিলিয়ে গিয়েচে রজনীর মধ্যযামে শুক্লা চতুর্থীর চাঁদ যেমন মিলিয়ে যায়, এ কথা ভুলেই গেলমে ক্ষণকালের জন্যে। পেট্রাকের সবধে যে কথা হয়েচে, বড় সত্যি সে কথা । ‘Know that for a lofty soul death is but a release from prison, that she frightens only those who look for their whole happiness in this poor earth.” ইত্যাদি । প্রায় ছ-বছর পরে আবার রামরাজাতলায় গিয়েছিলাম রামরাজা ঠাকুরের ভাসান দেখতে । ননীদের বাড়ি গিয়ে উঠলাম, জতু খাব খুশি হোল, জতুর মাকে দেখলাম আজ বহুকাল পরে। অনেক সব পরোন কথা হোল । সাঁতরাগাছি গ্রাম সম্বন্ধে ননী এমন সব গল্প করলে যাতে জায়গাটার ওপরে আমার কোন শ্রদ্ধা রইল না। একজন লোকের স্ত্রী একটু পাগল মত, সে লোকটা নাকি তার স্ত্রীকে প্রায়ই এমন মারে যে দু-তিন দিন বেচারী আর উঠতে পারে না। অথচ সেই লোকটি এখানে নাকি একজন সমাজপতি । কলকাতার এত কাছে অথচ কালচার বলে কোনও জিনিস নেই এখানে, লোকে বোঝে দশটায় খেয়ে আপিসে ছোটা, আর রবিবার দিন ভাল করে বাজার করে দাপরে ঠেসে খাওয়া । গ্রামটাও অত্যন্ত নোংরা, চারিদিকে খোলা ড়েন, জঞ্জাল, দুগ'-ধ, নোংরা জল গড়িয়ে চলেচে রাস্তার পাশ দিয়ে । আমি *যতক্ষণ ছিলাম, দম বন্ধ হবার উপক্রম হয় আর কি । রামরাজার মিছিল বার হবার আগে আমি আর ননী দু-জনে পথের ধারে একখানা গরুর গাড়ির ওপর গিয়ে বসলাম। প্রথমে বাকসাড়া ও ব্যাতড়ের নবনারী কুঞ্জর বেরলে, সঙ্গে অনেক সঙ, কাগজের এরোপ্লেন, রাক্ষসী ইত্যাদি । পেছনে এল রামরাজার মিছিল । শেষের 8&ty विछूज्रि-ब्रह्ननावलौ মিছিলটাই বড় কিন্তু এমন কিছু দেখবার কি আছে বুঝলাম না। রাস্তার দু-পাশে, ছাদে, বারাদায়, পথের ধারে হাজার হাজার মেয়েমানুষের ভিড় । এ মেয়েদেরই দেখবার জিনিস । ওরা আজ এখানে আসে রামরাজাতলার সিদর দিতে ও মিছিল দেখতে। সবু মেয়েরই কপালে অনেকটা করে সিদর লেপা । ভিড়ের মধ্যে আমাদের গায়ের কিশোরী কাকার ছেলে সন্তোষ আর জীবনের সঙ্গে দেখা হোল । সন্ধ্যার সময় আবার ননীদের বাড়ি ফিরে এসে চা খেলাম। আজ ৩২শে শ্রাবণ বলেই মনটা মাঝে মাঝে অনেক দরে চলে যাচ্ছিল, অনেক দিন আগেকার এই সন্ধ্যা-গোধলির একটা ছবি পর-পর আমার মনে আসছিল। জতু দেখলাম মনে করে রেখেচে, সে ননীকে বললে—কোন গানটা গাওয়া যেত না বিভুতির সামনে, মনে আছে ? ননীরও মনে আছে । সে বললে—জানি ঃ "সে মুখ কেন অহরহ মনে পড়ে এই গানটা । আমি হাসলাম । এরা বেশ লোক । আমার জীবনের কতদিন আগেকার কথা এরা কেন মনে রেখেচে, কি দরকার এদের ! বিশেষ করে জতু মেয়েটি বড় ভাল, এত স্নেহশীলা । সন্ধ্যার পরে চলে এলুম, বাসে ভয়ানক ভিড়, মল্লিকের ফটক বন্ধ, বাস ঘরে এল জামতলা দিয়ে । সারাদিন পরে কলকাতার মুক্ত হাওয়ায় এসে এখন বাঁচলাম । জতু বার বার বললে—আজ রাতটা থেকে যান না, পপির ভাজবো এখন । আমার থাকবার জো নেই, লেখা আছে । Af বললাম—আর একদিন এসে রাত্রে থাকব। স্পেনের বিদ্রোহ কি ভীষণ মাত্তি ধারণ করচে । বাড়াজোজ শহর বিদ্রোহীরা অধিকার করেচে, রাস্তায় রাস্তায় barricade এবং প্রতোক barricade-এর গায়ে মতদেহ স্তপোকার হয়ে আছে, আর সীলোক ও বালক-বালিকারা মতদেহের স্তপ খুজে নিজেদের বাপ, ভাই ছেলে স্বামীর দেহ বার করতে ব্যস্ত । মানুষ এখনও কত আদিম-যুগে পড়ে রয়েচে তা এইসব ঘটনা থেকে বোঝা যায় । জাম্মানিতে বিদ্রোহের সময়েও ঠিক এই ধরনের নিষ্ঠুর কাণ্ড এই সেদিন ঘটে গিয়েচে, Ernest Toller-এর বই পড়লে তা জানা যায় । মানুষের প্রতি মানুষ এমন senseless নিষ্ঠুরতার অনুষ্ঠান কি করে করতে পারে ভেবেই পাই নে। এর মধ্যে বড় মানুষও জন্মেচে বৈকি ! Ernest Toller-এর ভাষায় বলি ৪— In the war there lined a man among millions Karl Liebkrecht; his was the voice of truth and of freedom. Even the prison groove could not silence that voice. grad ideal on fo of ox on I too socialist 3 communist-it #RTH বিরদ্ধে বিদ্রোহ করে গণতন্ত্র মহাপন করলে, খুব ভাল কথা । এ পয্যন্ত বুঝি। আবার এল Fascists-এর দল, এরা বিদ্রোহ করচে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে socialist-দের শাসনের বিরুদ্ধে, কিন্তু কি ভীষণ রক্তারক্তি আর নিষ্ঠুরতার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্চে, ভাবলে বৰ্ত্তমান সভ্যতার ওপরে মানষের আস্হা থাকে না । দলে দলে যন্ধের বন্দীদের পড়িয়ে মারচে, বিষাক্ত গ্যাস পয্যন্ত ব্যবহার করচে । qTorfars affolio Koto-An easily realizable ideal quickly loses its power of stimulating, nothing lets a man down with such a pump into listless disillusionment as the discovery that he has achieved all his ambition and realized all his ideals. One actually seizes the peach which turns out to be a Dead Sea fruit. এ কথা স্বীকার করতে হবে যে কলকাতায় এবার গ্রামের ছয়টির পর এসে বিশেষ করে উমি্মখের 8୯୪ নানারকম অভিজ্ঞতা হচ্চে । এই অভিজ্ঞতা বিভিন্ন ধরনের জীবনযাত্রা প্রণালী সম্বন্ধে । জীবমটাকে এভাবে দেখাও বড় দরকার বলে মনে করি । তবে পাটিতে জীবন দেখার চেয়ে আমি যে লোকজনের বাসায় গিয়ে ঘনিষ্ঠভাবে তাদের সঙ্গে মিশি, ওতে আরও ভাল করে ওদের দেখা হয়, যেমন রামপ্রসাদের বাড়ি, বকুদের বাড়িতে বিনর পাগল হয়ে যাওয়া রাতের দশ্য, রমা যখন আমাদের কাছ থেকে চলে গেল মীরাট, তার সেই আকুল কান্নার দশ্য, রাজপরে তেতুলের বৌয়ের অসখের জন্যে চান্দ্রায়ণ করবার ব্যাপার ইত্যাদি । অনেকদিন আগে কামাখ্যা ছিল ইউনিভাসিটি ইনস্টিটিউটের একজন চাই থিয়েটারের সময়ে মেয়েদের পাট" সে-ই করতো, এবং আমাদের সময়ে বেশ নামও করেছিল তাতে । কাল ইনস্টিটিউটে আর একটি ছেলেকে মানময়ী গাল’স স্কুলে নীহারিকার পাট করতে দেখলাম-- এত চমৎকার মানিয়েছিল তাকে যে কোথায় লাগে মেয়েদের । যেমন রপসী, তেমনি কমনীয় কান্তি, তেমনি গলার সর ও গান ! হায় কামাখ্যা, তুমি এখন কোথায় তাই ভাবি ! সে ভাল লেখাপড়া শেখে নি, থিয়েটার করে বেড়াতো, বোধহয় বি. এ. পাসটাও করেছিল । কোন পাড়াগাঁয়ে এতদিন ছেলেমেয়ে পরিবত হয়ে দাবাপাশা ও দলাদলির চচ্চা করচে। এখন তার মনের সে সফত্তি নেই, চোখের জলস কমেচে, চুলে পাক ধরেচে, মুখশ্রীর সে কমনীয়তা আর নেই। এখন যে নীহারিকার পাট করল, সে ছেলেটি সে সময়ে হয়তো ছিল তিন-চার বছরের শিশ । ‘মানময়ী গাল’স স্কুল’ দেখতে দেখতে হঠাৎ আজ কামাখ্যার কথা মনে পড়ল কেন কি জানি । একদিন মাত্র কলকাতা থেকে বেরিয়োচ অমনি কি ভালই লাগচে । আজ সকালে উঠে অশোক গপ্তের বাড়ি গেলাম, সেখান থেকে খেয়ে দুজনেই যতীশবাবদের গাড়িতে গ্নে স্ট্রীট দিয়ে ট্রান্ড য়োড দিয়ে হাওড়া স্টেশনে । বসন্মতাঁর সেই পরোনো বাড়িটা, বাবার সঙ্গে যেখানে বল্যে একদিন এসেছিলম, সেটা সেই রকমই আছে । কুসুম বলে বাল্যে যে মেয়েটিকে জানতুম, এখন সে বড়ী হয়েচে, ছেলেবেলায় আমায় তার ছেলের মত ভালবাসতো, সে থাকে কাছেই ওই বাড়িটাতে । ট্রেনে ভিড় নেই, কারণ পুজোর সময় তো আর নয়। দিব্যি আরামে বেচিতে বিছানা পেতে নিলাম। সাঁতরাগাছি স্টেশনে উঠলো কিশোর কাকার ছেলে সন্তোষ, তাকে উঠিয়ে দিতে এল জীবন। আজ দিনটা বাদলা, জোলো হাওয়া দিচ্চে । কোলাঘাটে রপনারায়ণের কি রপে, কুলে কুলে ভরা গৈরিক জলরাশি তাঁরবেগে ছটেচে। সেই অন্তরীপ মত জায়গাটা, যেটা প্রতিবারই মনে করিয়ে দেয় পজোর সময়, সেটা কেমন চমৎকার দেখাচ্চে । রেলের বাঁধের ধারে ঘন বনঝোপে কত কি ফুল ফুটেচে। এসব গাছের নাম জানি নে। এ অঞ্চলে গাছগলি আমার সম্পণ অপরিচিত, একমায় বনকলমী ফুল ছাড়া । হলদে কাপাস তলোর গাছের বড় ফুল, ঘে'টকোল ফুলের মত বড় বড় ফুল, সাদা সাদা কুচো ফুল, আরও কত কি ! এবার জল বেজায় বেড়েচে, সব গ্রামের বাড়িঘরের চারিধারে জল ভৰ্ত্তি, ডোবা, বিল, পুকুর । কোলাঘাটে গাড়ি একঘণ্টা দাঁড়িয়ে রইল লাইন বন্ধ ছিল বলে । খড়গপর ছাড়িয়েচি, সেই সময় আবার মেঘ করে এল। ঝাড়গ্রামে থামবার কিছর আগে সন্তোষ গ্রামের কথা উপলক্ষে বললে—গণেশ মচির ছোট ছেলেটি মারা গিয়েচে । শনে খুবই দুঃখিত হলাম, গণেশ বড়ো হয়েচে, ওই ছেলেটিকে বড় ভালবাসতো। আর একটা খবর বললে—হরিদাদার মেয়ে কনকের বিয়ে হয়েচে এক বড়ো বরের সঙ্গে। আরও দুঃখিত হলাম, কনক মেয়েটি বড় সন্দরী, তার জন্যে তার বাবা ওর চেয়ে 8&O বিভূতি-রচনাবলী ভাল বর জোটাতে পারলে না কেন জানি নে, কারণ তার বাবা গরীব নয়, ইচ্ছে করলে দপয়সা খরচ তো করতে পারতো । ● এইবার ঘন মেঘ করে ব্যটি এল। গাড়ি এখন শালবনি ছাড়িয়ে গিডনি স্টেশনে এসে পৌঁছেচে । বড় ইচ্ছে ছিল বাকুডি যাবো, কিন্তু যাওয়া হোল না। ● সবণরেখার ধারে এসে ঘন ছায়াভরা বৈকালে শালবনের মধ্যে এক জায়গায় বসলাম । ওই দরে সিদ্ধেশ্বর ডুংরী, যার মাথায় উঠে বনে চিড়ে দই খেয়েছিলাম, যার মাথায় উঠে শিলাখণ্ডে নাম লিখে রেখেছিলাম । চারিধারে শ্যামল বনানী, প্রাস্তর ধানবন, শালগাছ। ওই ওপারে প্রকাণ্ড দীঘ পাহাড়শ্রেণী । সামনে খরস্রোতা সবণরেখা, তীরে ছোট বড় শিলাখণড, শাল চারার জঙ্গল । সন্ধ্যা নেমে আসচে, পাহাড়শ্রেণী নীরব, বনানী নীরব, মেঘলা, সবণরেখার কুলকুল শব্দ ছাড়া অন্য কোনই শব্দ নেই । গত শনিবারে এমন সময় ইছামতীর ধারে বসে আছি । এই নিস্তবধ অপরাহ্লে সবণরেখার তীরে দাঁড়িয়ে পেছনের শালবনের মাথার ওধার দিয়ে পৰবদিকে চেয়ে দেখলাম, দুরে এমনি ইছামতী নদী বয়ে যাচ্চে, বাংলাদেশের এক অখ্যাত পাড়াগায়ের কোল দিয়ে । , সেই নদীর ধারে একটা গাঁয়ের ঘাটে এক জায়গায় একটা বনসিমের ঘন ঝোপ নত হয়ে আছে ঘাটের পথের ওপরে। একটি মেয়ের ছবি সেই বনসিমের লতার ঝোপের তলায় চিরকাল অক্ষয় হয়ে আছে। ছবিটি মনে পড়তেই অপৰ্ব আনন্দে ও মাধযেf্য এই সন্ধ্যা ভরে উঠলো, বাতাস আরও মধর হোল । আমার ঘরে গত জ্যৈষ্ঠমাসে একদল রামছাগল উঠে উপদ্রব করছিল, আমি হাট থেকে এসে 'দর দরে করে ছাগলের দল তাড়িয়ে দিলাম, সেই কথা মনে পড়লো। এই রামছাগলের দল তাড়ানোর সঙ্গে আমার সেদিনের একটা বড় মধর ঘটনা মেশানো আছে, কেউ তা জানে না-তা আমি এখানে লিখবও না । এটুকু লিখে রাখলাম এজন্যে যে সবণরেখার তীরে দাঁড়িয়ে এই বষসিন্ধ্যায় সেই ঘটনাটা আমার মনে এসেছিল । সপ্রভা কত দুরে আছে, তার কথাও মনে হোল এ সন্ধ্যায়। বড় ভাল মেয়ে সে, তার মতো মেয়ে কখনো দেখি নি । এই ডায়েরীটি শেষ হয়ে গেল। আমার জীবনে এই দেড় বছর বড়ই আনন্দের। পরিপণ" আনন্দের। নানা ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাত—কত নতুন বন্ধ লাভ, কত অভিজ্ঞতা। কত পরোনো বন্ধদের সঙ্গে আলাপ হোল বহুদিন পরে এই দেড় বছরের মধ্যে, এই ১৯৩৬ সালে । যেমন মণিকুন্তলা তার মধ্যে একজন। ভগবানকে এজন্যে ধন্যবাদ জানাই । কত কি পেলাম এই দেড় বছরে। সব কথা ডায়েরীতে লেখা যায় না। যা এখানে লিখলাম না, তা রইল আমার মনের গভীর গোপন তলে । কম’হীন অবকাশ-মহমত্তে" তাদের চিন্তা আমায় আনন্দ দেবে। কত জায়গায় বসেই কত ডায়েরী লিখলাম, ভাগলপুরে, ইশমাইলপরে দ্বিয়ারায়, আজমাবাদ কাছারীতে, কাশীতে, রাধামাইনসে, নাগপারে, কলকাতায় ॥৫ o