একান্নবর্তী

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

দৌলতচন্দ্র ও কানাই

দৌলত । হৃদয় যখন ভাবে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে তখন কোম্পানির দমকল এলেও থামাতে পারে না । একান্নবর্তী পরিবার-প্রথা সম্বন্ধে সভায় দাঁড়িয়ে অনর্গল বলতে লাগলুম , সভাপতি ঘুমিয়ে পড়াতে নিষেধ করবার কেউ রইল না । শেষকালে দুজন ছোকরা এসে দুই হাত ধরে আমাকে টেনে বসিয়ে দিলে । সেদিন এত উৎ সাহ হয়েছিল!

কানাই । বটে , তা হবার কথাই তো । তা , আপনি কী বলেছিলেন ?

দৌলত । আমি বলেছিলেম , স্বার্থত্যাগের একমাত্র উপায় একান্নবর্তী পরিবার । যেখানে পরের অর্থেই জীবননির্বাহ হয় সেখানে স্বার্থের কোনো প্রয়োজনই হয় না । খবরের কাগজে আমার বক্তৃতা খুব রটে গেছে-তারা সকলেই বলছে দুঃখের বিষয় দৌলতবাবুর পরিবার কেউ নেই , তিনি একলা ।

দীর্ঘনিশ্বাস

জয়নারায়ণের প্রবেশ

জয়নারায়ণ । জয় হোক বাবা! আমি তোমার পিসে ।

দৌলত । সে কী মশায় , আমার তো পিসি নেই ।

জয়নারায়ণ । না , তাঁর কাল হয়েছে বটে ।

দৌলত । পিসি কোনোকালেই যে ছিলেন না ।

জয়নারায়ণ । ( ঈষৎ হাসিয়া) সে কী করে হয় বাবা! আমি তা হলে তোমার পিসে হলুম কী করে! (কানাইয়ের প্রতি) কী বলেন মশায়!

কানাই । তা তো বটেই ।

দৌলত । যে আজ্ঞে , তা আপনার কী অভিপ্রায়ে আগমন ?

জয়নারায়ণ । অভিপ্রায় তেমন বিশেষ কিছু নয় । শুনলুম আমরা পৃথক হয়ে আছি ব'লে খবরের কাগজে নিন্দে করছে , তাই একত্র বাস করতে এসেছি ।

দৌলত । আপনার সম্পত্তি কিছু আছে ?

জয়নারায়ণ । কিছু নাই , কোনো বালাই নেই , কোনো উৎ পাত নেই । কেবল এক খুড়তুতো ভাই আছে — তা , সেও এল ব'লে।

দৌলত । তা বটে । তাঁর কিছু আছে ?

জয় । কিছু না , কোনো ঝঞ্ঝাট না । কেবল দুই স্ত্রী ও চারটি শিশুসন্তান ; তারাও এল ব'লে । এতক্ষণ এসে পড়ত ; যাত্রা করবার বেলা দুই স্ত্রীতে চুলোচুলি বেধে গেছে , তাই যা দেরি ।

দৌলত । কানাই , কি করা যায়!

জয়নারায়ণ । তোমাকে কিছুই করতে হবে না — তারা আপনারাই আসবে , ভাবনা কী দৌলত! এত অল্পে কাতর হোয়ো না। তারা আজ সন্ধ্যার মধ্যেই এসে পৌঁছবে ।

রামচরণের প্রবেশ ও ভূমিষ্ঠ হইয়া দৌলতকে প্রণাম

রামচরণ । মামা , তোমার বক্তৃতায় বড়ো লজ্জা দিয়েছ ।

দৌলত । কে হে বাপু , কে তুমি ?

রামচরণ । আজ্ঞে , আপনারই ভাগ্‌নে রামচরণ । ইস্টিশনে লোক পাঠিয়ে দিন — সেখেনে একটি পুঁটুলি আর বুড়ি মাকে রেখে এসেছি ।

দৌলত । এখানে কী করতে আসা ?

রামচরণ । বাস করতে ।

দৌলত । আর কোথাও বাসস্থান নেই ?

রামচরণ । একরকম আছে বটে , কিন্তু সেখানে স্বার্থত্যাগ শিক্ষা হয় না ।

দৌলত । ( ভীতভাবে) কানাই!

কানাই । আপনার উপদেশ উনি যেরকম দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করেছেন ওঁকে বোধ হয় নড়ানো শক্ত হবে ।

নিতাইয়ের প্রবেশ

নিতাই । দাদা , চাকরি ছেড়ে এলুম , নইলে তোমার যে নিন্দে হয় । কে আছিস রে! ঝট্‌ করে দুটো ডাব পেড়ে নিয়ে আয় তো । বড়ো পিপাসা লেগেছে ।

নদেরচাঁদের প্রবেশ

নদেরচাঁদ । এই লও খুড়ো , আমার সমস্ত স্বার্থ বিসর্জন দিতে এসেছি । এই আমার ভাঙা বোক্‌নো , থেলো হুঁকো আর এই বেড়ালছানাটি । এর মধ্যে ও-দুটো পৈতৃক সম্পত্তি , বেড়ালছানা আমার স্বোপার্জিত । আর আমার দোষ দিতে পারবে না , তোমার এখানেই আমি লেগে রইলুম ।

দর্জির প্রবেশ

দৌলত । তুমি আমার কে হও বাপু ?

দর্জি । আজ্ঞে আমি দর্জি , আপনার গায়ের মাপ নিতে এসেছি ।

দৌলত । এখন যাও , টানাটানির সময় । এখন আমি কাপড় করাতে পারব না ।

নদেরচাঁদ । খলিফাজি , যাও কোথায় । আমার গায়ের মাপটা নেও । খুড়োর গায়ে যেরকম ফুলকাটা ছিটের জামা দেখছি অমনি ছ-জোড়া হলেই আমার চলে যাবে । যদি বেশ ভালো রকম করে তৈরি করে দিতে পারো তো খুড়ো তোমাকে খুশি করে দেবেন , বুঝেছ খালিফাজি ?

দর্জি । যে আজ্ঞে ।

গায়ের মাপ-লওন

বালক-সমেত পরেশনাথের প্রবেশ

পরেশ । ( দৌলতকে প্রণাম করিয়া বালকের প্রতি) তোর জ্যাঠামশায়কে প্রণাম কর্। দাদা , এই লও তোমার ভ্রাতুষ্পুত্র ।

দৌলত । আমার ভ্রাতুষ্পুত্র!

পরেশ । যাকে চলিত বাংলায় বলে ভাইপো । দাদা যে একেবারে অবাক্‌ । ভাতৃ শব্দের ষষ্ঠীতে হয় ভ্রাতুঃ , তার উপরে পুত্র শব্দ যোগ করলেই হল ভ্রাতুষ্পুত্র । স্বয়ং পাণিনি বোপদেব রয়েছেন , অন্য প্রমাণের প্রয়োজন কী ? অতএব ইনি হলেন ভাইপো ।

কানাই । আপনার ছেলেটি কী করেন ?

পরেশ । ওকে নিজেই পড়াচ্ছিলুম । হ্রস্ব ই পর্যন্ত সেরে দীর্ঘ ঈতে এমনি আটকে পড়ল যে ভাবলুম , দৌলদ্দা যখন আছেন তখন ছেলের লেখাপড়ার দরকার কী ? যে বেটার হ্রস্ব-দীর্ঘ জ্ঞান নেই তার পক্ষে বাবা-জ্যাঠা দুই সমান । কেমন কি না ?

কানাই । সমান বৈকি ।

পরেশ । দাদা বলেছেন , নিজের ক্ষুধা হেয় জ্ঞান করে পরের ক্ষুধানিবৃত্তির সুখ একমাত্র একান্নবর্তী পরিবারেই সম্ভব । শুনেই ঠাওরালুম , এ সুখ দাদা নিশ্চয়ই অনেক দিন পান নি । যদি বা পেয়ে থাকেন বিস্মৃত হয়েছেন । তাই নিতান্ত মমতাপরবশ হয়ে ছেলেটিকে এখানে নিয়ে এলুম । রাবণের চুলো যদি কোথাও জ্বলে সে এর পেটের মধ্যে ।

নটবরের প্রবেশ

নটবর । ( দৌলতের কান মলিয়া) কী রে শালা! শুনলুম না কি শালার শোকে সভায় দাঁড়িয়ে কেঁদে ভাসিয়ে দিয়েছিস ?

দৌলত । কে হে তুমি বেল্লিক! ভদ্রলোকের কানে হাত দাও!

নটবর । ভগ্নীপতির কান মলব না তো কি কান ভাড়া করে এনে মলব! কী বলেন মশায় ?

কানাই । কথাটা তো ঠিক বটে ।

দৌলত । কী বল হে কানাই! আমার স্ত্রীই নেই , তো আবার শালা কিসের ?

নটবর । তোমারই যেন স্ত্রী নেই , তাই বলে আর কারো স্ত্রী নেই ? একটু ভেবে দেখো-না ।

দৌলত । স্ত্রী তো অনেকেরই আছে , তা আর ভাবতে হবে কী!

নটবর । ( হাসিয়া) তবে ?

দৌলত । ( সরোষে) তবে কী! তুমি আমার শালা কোন্‌ সম্পর্কে ?

নটবর । কেন , দাদার সম্পর্কে । দাদা আছেন তো! শালাই যেন ভাঁড়ালে , কিন্তু দাদা বেকবুল গেলে তো চলবে না!

দৌলত । আমি তো জানতেম নেই , কিন্তু আজ যেরকম দেখছি তাতে-

নটবর । থাক্‌ , তা হলেই তো চুকে গেল । বেশি বকাবকিতে কাজ কী ? ভদ্রলোক বসে আছেন , এঁর সামনে কে শালা আর কে শালা নয় তা নিয়ে তক্‌রার করা ভালো দেখায় না । ( দৌলতের পশ্চাৎ হইতে তাকিয়া টানিয়া লইয়া) একটু জিরোনো যাক , এক ছিলিম তামাক ডাকো ।

ফলমূলমিষ্টান্ন লইয়া ভৃত্যের প্রবেশ

ভৃত্য । ( দৌলতকে) আপনার জলখাবার ।

দৌলত । ( সরোষে) বেটা , তোকে এখানে কে খাবার আনতে বলেছে ? বাড়ি-ভিতর নিয়ে যা!

পরেশ । বিলক্ষণ , তাতে দোষ হয়েছে কী! (ভৃত্যের প্রতি) ওরে তুই দিয়ে যা , এ দিকে দিয়ে যা ।

থালা লইয়া আহার-আরম্ভ

চুলের মুঠি ধরিয়া বিধুভূষণকে লইয়া দুই স্ত্রীলোকের প্রবেশ

প্রথমা । পোড়ারমুখো তোমার মরণ হয় না!

দৌলত । ( শশব্যস্তে) এঁরা কে ?

জয়নারায়ণ । বাবা , ব্যস্ত হোয়ো না , আমার সেই খুড়তুত ভাই এসে পৌঁচেছেন ।

প্রথমা । ও আবাগের বেটা ভূত!

দ্বিতীয়া । মার্‌ ঝাঁটা , মার্‌ ঝাঁটা!

দৌলত । ভাই কানাই!

কানাই । সহিষ্ণুতা শিক্ষার এমন উপায় আর কী আছে!

প্রথমা । মিন্‌সে তুমি বুড়োবয়সে আক্কেল খুইয়ে বসেছ!

দ্বিতীয়া । ওগো , এত লোকের এত সোয়ামি মরছে , যমরাজ কি তোমাকেই ভুলেছে!

দৌলত । বাছারা একটু ঠাণ্ডা হও ।

উভয়ে । ঠাণ্ডা হব কিরে মিন্‌সে । তুই ঠাণ্ডা হ , তোর সাত পুরুষ ঠাণ্ডা হয়ে মরুক ।

দৌলত । কানাই!

কানাই । গৃহ পূর্ণ হয়েছে-

দৌলত । গ্রহ পূর্ণ হয়েছে বলো-

কানাই । যাই হোক , আজ আর আমাকে প্রয়োজন নেই । আমি এই বেলা সরি ।

[ প্রস্থান

দৌলত । ( উচ্চস্বরে ) কানাই , আমাকে একলা রেখে পালাও কোথায়!

সকলে মিলিয়া । ( দৌলতকে চাপিয়া ধরিয়া) একলা কিসের! আমরা সবাই আছি , আমরা কেউ নড়ব না ।

দৌলত । বল কী!

সকলে । হাঁ , তোমার গা ছুঁয়ে বলছি ।