এতদ্দেশীয় স্ত্রীলোকদিগের পূর্ব্বাবস্থা/অন্যান্য স্ত্রীলোকদিগের অন্যপ্রকার শিক্ষা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


অন্যান্য স্ত্রীলোকদিগের অন্য প্রকার শিক্ষা।

 কুমারসম্ভব ও বিক্রমোর্ব্বশী নাটকে এই প্রমাণ পাওয়া যায় যে, স্ত্রীলোকেরা ভূর্জ্জপত্রে লিখিতেন। তাঁহাদিগের শিক্ষা নানা বিষয়ে হইত। ভাস্করাচার্য্যের কন্যা লীলাবতী, পাটীগণিত ও লীলাবতী গ্রন্থ লেখেন। মণ্ডন মিশ্রের স্ত্রী তত্ত্বজ্ঞানী ছিলেন, কারণ যখন মণ্ডন মিশ্রের সহিত শঙ্করাচার্য্যের বিতণ্ডা হয়, তখন তিনি মধ্যস্থ হয়েন। বিদ্যতমা কালদাসের স্ত্রী ছিলেন, তিনিও বিদ্যাবতী ছিলেন। মিহিরের স্ত্রী খনা জ্যোতিষ বিদ্যা ও তাঁহার বচনের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। মিরা বাই চিতোরের রাণী বড় কবি ছিলেন। তিনি জয়দেবের ন্যায় মিষ্ট কবিতা লিখিয়া গিয়াছেন।

পৃথ্বীরাজার স্ত্রী পদ্মাবতী, চৌষট্টি শিল্প ও চতুর্দ্দশ বিদ্যা জানিতেন।

 মালাবারে চারি জন সহোদরা স্ত্রীলোক বিখ্যাত হন। তাঁহাদিগের মধ্যে আভির সর্ব্বোৎকৃষ্ট হইয়াছিলেন। তিনি বিবাহ করেন নাই, তিনি নীতি কাব্য ও দর্শন বিষয়ক পুস্তক লেখেন। ঐ সকল পুস্তক পাঠশালাতে পাঠ্য পুস্তক হইয়াছিল। তিনি ভূগোল, চিকিৎসা, কিমিয়া ইত্যাদি বিষয়ক গ্রন্থ লিখিয়াছিলেন। তাঁহার অন্যান্য ভগিনীরা নীতি ও অন্যান্য বিষয়ক পুস্তক লিখিয়াছিলেন। কাশীতে হট্টি বিদ্যালঙ্কার নামে এক জন বিখ্যাত স্ত্রীলোক ছিলেন। তিনি স্মৃতি ও ন্যায়জ্ঞ ছিলেন।

 ব্ৰহ্মবাদিনী ও সদ্যোবধূদিগের যেরূপ শিক্ষা হইত, তাহা উল্লিখিত হইল। ঈশ্বর তাহাদিগের জীবনের উদ্দেশ্য;— ব্ৰহ্মানন্দের জন্য তাঁহাদিগের ধ্যান, জপ ও সৰ্ব্ব প্রকার অন্তর অভ্যাস হইত। আয়, ব্যয়, শান্তিরক্ষা, পাক করা, আতিথ্য করণ ইত্যাদি গৃহকার্য্য যাহা দ্ৰৌপদী সত্যভামাকে বিস্তার পূর্ব্বক বর্ণনা করিয়াছিলেন, সদ্যোবধূরা সেই সমস্ত গৃহকার্য্য বিশেষরূপে জানিতেন। ইহা ভিন্ন অন্যান্য শ্রেণীস্থ স্ত্রীলোকেরাও নানা প্রকার বিদ্যা শিখিতেন। দশকুমারে লেখে যে স্ত্রীলোকেরা বিদেশীয় ভাষা, চিত্রকরা, নৃত্য বিদ্যা, সঙ্গীত, নাট্যশালায় অভিনয়করণ, আয় ব্যয় বিষয়ক, তর্কবিদ্যা, গণনা বাক্য-বিন্যাস, পুষ্পবিদ্যা, সৌগন্ধ ও মিষ্টান্ন প্রস্তুত করণ, জীবিকা নির্ব্বাহক—অর্থকরী বিদ্যা ইত্যাদি শিখিতেন। কাব্য গ্রন্থতে চিত্রশালা, নৃত্যশালা ও সঙ্গীতশালার উল্লেখ পাওয়া যায়। অর্জ্জুন বিরাটের কন্যাদিগকে নৃত্য ও সঙ্গীত শিখাইয়া ছিলেন। নৃত্য, গান ও সমাজে গমন জন্য স্ত্রীলোকেরা মিষ্টরূপে আলাপ করিতে পারিতেন। বিষ্ণু পুরাণে লেখে যে, অঙ্গনাগনের কথা সুমধুর ও সংগীত স্বরূপ।

 কালেতে স্ত্রীলোকদিগের উপনয়ন ও বেদ অধ্যয়ন বিলুপ্ত হইল। পুরাণ ও অন্যান্য গ্রন্থ তাহাদিগের পাঠ্য পুস্তক হইল। কালেতে স্ত্রীলোকদিগের নিরাকার ব্ৰহ্ম লোপ হইলেও ব্রহ্মধ্যান, অনন্ত ও বিস্তীর্ণরূপে না হইয়া পরিমিত ও সাকার ব্রহ্মেতে চিত্ত অর্পিত হইল। তথাচ স্ত্রীলোকদিগের আত্মার অমরত্ব ও পরলোকে ব্রহ্মানন্দ ভোগ, এ বিশ্বাস দৃঢ় রূপে হৃদয়ে বদ্ধ থাকিল। এই কারণ বশতঃ তাঁহাদিগের অন্তরে যে নিৰ্ম্মল স্রোত বহিতে ছিল, তাহা বহিতে লাগিল। উপনিষদের জ্ঞান-সুধা, পুরাণের ভক্তি-সুধার সহিত মিলিত হইয়া ভক্তির প্রবলতায় আত্মার শুদ্ধ জ্ঞান, প্রকৃতি হইতে অতীত হয় নাই, সুতরাং ভক্তির প্রাবল্য ও আত্মার অনন্ত জ্ঞানের খৰ্ব্বতা হইয়াছিল।