এতদ্দেশীয় স্ত্রীলোকদিগের পূর্ব্বাবস্থা/উপসংহার

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

উপসংহার।

 আৰ্য্য জাতীয় মহিলাগণের পূর্ব্ব বৃত্তান্ত পাঠে স্পষ্ট বোধ হয় যে, তাহাদিগের শিক্ষা, আচার ও ব্যবহার আধ্যাত্মিক—যাহা কিছু শিখিতেন ও করিতেন তাহা ঈশ্বর ও পরলোকের প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া করিতেন—ইহা পৌত্তলিক অথবা অপৌত্তলিক ভাবে হইতে পারে কিন্তু অন্তর অভ্যাসের ফললাভ অবশ্যই হইত। এইরূপ অভ্যাস বহুকালাবধি হওয়াতে স্ত্রীলোকদিগের হৃদয়ে নিষ্কাম ধৰ্ম্মানুষ্ঠান করা বদ্ধমূল হইয়াছিল। এই জন্য সহমরণ, ব্রহ্মচৰ্য্য, ব্রত, নিয়মাদি ও পতিপরায়ণত্ব অনুষ্ঠিত হইত। নিষ্কামভাবই আত্মার প্রকৃত বল।

 “ঋগ্বেদ, যজুর্ব্বেদ, সামবেদ, অথর্ব্ববেদ, শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ, জ্যোতিষ এ সমুদয় অশ্রেষ্ঠ বিদ্যা, যদ্দ্বারা অবিনাশী পরব্রহ্মের জ্ঞান প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহাই শ্রেষ্ঠ বিদ্যা।” গার্গীর এই উপদেশ “যেনাহং নামৃতা স্যাং কিমহং তেন কুৰ্য্যাং”—যাহার দ্বারা অমৃত তত্ত্ব না পাইব, তাহ লইয়া কি করিব? উক্ত বেদ প্রেরণা ও উপদেশ হিন্দু মহিলাগণের হৃদয়ে যেন মুদ্রাঙ্কিত হইয়াছে, বাহ্য আড়ম্বরীয় বা অনুকরণীয় শিক্ষা তাহাদিধগর চিত্তে বিতৃষ্ণারূপ প্রবেশ করে ও অনাদর পূর্ব্বক গৃহীত হয়। যে উপদেশ ঐহিক ও পারত্রিক মঙ্গলজনক না হয়, যে উপদেশে ও অভ্যাসে আত্মার শান্ত প্রকৃতি উদ্দীপন করে না—সে উপদেশ ও অভ্যাস হিন্দু মহিলাগণের হৃদয়ে স্থায়ী হয় না। যেরূপ স্রোত প্রবাহিত হইয়া আসিতেছে ও অন্তর যেরূপ আধ্যাত্মিক সলিলে ধৌত হইতেছে, সেইরূপ উপদেশ না পাইলে কখনই গৃহীত হইবেক না।

 বাহ্য আড়ম্বরীয় শিক্ষাতে সমাজ সুশোভন হইতে পারে; কিন্তু ঈশ্বর পরায়ণত্বের ব্যাঘাত, আত্মবলের হ্রাস ও প্রকৃতির প্রাবল্য। ঈশ্বর পরায়ণত্ব ও আত্মবলের জন্য এদেশের মহিলাগণ পূৰ্ব্ব হইতেই বিখ্যাত। কোন দেশে পতির জন্য স্ত্রীলোক অগ্নিতে গমন করে? ও সৰ্ব্বত্যাগী হইয়া, ব্রহ্মচৰ্য্য অনুষ্ঠান করে? সামাজিক বিবেচনায় ইহা যদিও প্রসিদ্ধ না হইতে পারে, কিন্তু আত্মবলের পক্ষে ইহা বিলক্ষণ প্রমাণ। আৰ্য্য জাতীয় মহিলাগণ! সতী, সীতা, সাবিত্রী প্রভৃতি ঈশ্বর পরায়ণা নারীদের চরিত্র সর্ব্বদা স্মরণ কর। তাঁহাদিগের ন্যায় সম, যম, তিতিক্ষা অভ্যায় কর ও সমাহিত হইয়া উপরতিতে পূর্ণ হও। বিষয়ানন্দ, বাসনানন্দ ত্যাগ পূর্ব্বক ধ্যানানন্দে মগ্ন হইয়া ব্ৰহ্মানন্দ লাভ কর। ধ্যানাৎ পরতরং নহি—ধ্যানের অপেক্ষা কিছুই শ্রেষ্ঠ নহে। ধ্যানই অন্তর যোগ। ধ্যানেতে শারীরিক ও মানসিক দুর্ব্বলতা, ও মালিন্যের বিনাশ, আত্মার উদ্দীপন ও ঈশ্বরের সহিত সংযোগ।

ভব-ভাবনা ভেবনা, ভৌতিক ভাবনা,
ভাব ভাব ভাবাতীত, যিনি নাশেন ভাবনা।


 

সম্পূর্ণ।