এতদ্দেশীয় স্ত্রীলোকদিগের পূর্ব্বাবস্থা/স্ত্রীলোকদিগের সম্মান

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

স্ত্রীলোকদিগের সম্মান।

 এদেশে স্ত্রীলোকদিগের সম্মান গৃহে ও বাহিরে একভাবে ছিল। বেদেতে, মনুতে ও পুরাণে স্ত্রীলোকদিগের সম্মানের প্রমাণ ভুরি ভূরি পাওয়া যায়। মনু বলেন স্ত্রীলোক যথার্থ পবিত্র। স্ত্রীলোক ও লক্ষ্মী সমান। ষে পরিবারে স্বামী স্ত্রীর প্রতি অনুরক্ত ও স্ত্রী স্বামীর প্রতি অনুরক্ত, সেই পরিবারে লক্ষ্মী বিরাজমানা। স্ত্রীলোকেরা সর্ব্বদাই শুদ্ধ। যেখানে স্ত্রীলোকের সম্মান, সেখানে দেবতারা তুষ্ট। যে স্থানে স্ত্রীলোক অসম্মানিত, সেখানে সকল ধর্ম্মের ভ্ৰষ্টতা।

 বিবাহিত স্ত্রীলোক পিতা কর্ত্তৃক, ভ্রাতা কর্ত্তৃক,স্বামী, কৰ্ত্তৃক ও দেবর, ভাসুর কর্ত্তৃক সন্মানিত ও পূজিত হওয়া কৰ্ত্তব্য। স্ত্রীলোক “ভবতি ও প্রিয় ভগ্নী বা মাতা” বলিয়া সম্বোধিত হইতেন। স্ত্রীলোক দেখিবামাত্রে পুরুষ দণ্ডায়মান হইয়া তাঁহাকে অগ্ৰে যাইতে দিতেন। রাজা যুধিষ্ঠির আপন কিঙ্করীকে “ভদ্রে” বলিয়া ডাকিতেন। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীলোক এবং বালকদিগের আহার অগ্রে প্রদত্ত হইত। অন্য পুরুষের সহিত স্ত্রীলোক নিষেধিত না হইলে, কথোপকথন করিতে পারিত। কিন্তু স্বামী বিদেশে গমন করিলে, স্ত্রী অন্যের বাটীতে উৎসব ও যেখানে বহুলোকের সমাগম, সেই সকল স্থানে না যাইয়া আপন গৃহে থাকিয়া ধৰ্ম্মানুষ্ঠান করিতেন। রাজারা স্ত্রীলোকদিগের তত্ত্বাবধারণ করিতেন। ভরত, রামচন্দ্রের নিকট বনে গমন করিলে রাম জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি স্ত্রীলোকদিগের প্রতি সম্মান পূর্ব্বক ব্যবহার করিয়া থাকতো?” যখন যুধিষ্ঠির ধৃতরাষ্ট্রের-আশ্রমে গমন করেন, তখন ধৃতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসা করিলেন—“রাজ্যেতে দুঃখিনী অঙ্গনারা তো উত্তমরূপে রক্ষিত হয় ও রাজবাটীতে স্ত্রীলোকেরা তো সম্মান পূর্ব্বক গৃহীত হয়?” স্ত্রীলোক, রক্ষক বিহীনা হইলে রাজা দ্বারা রক্ষিত হইতেন। মনু কহেন “কন্যা অতিশয় স্নেহের পাত্রী।” ভীষ্ম কহেন—মাতা ইহ ও পরলোকের মঙ্গলকারিণী। পীড়িত ও দুঃখিত স্বামীর স্ত্রী অপেক্ষা রত্ন নাই। স্ত্রী পরম ঔষধি; আধ্যাত্মিকতা অর্জ্জনে স্ত্রী অপেক্ষা সহযোগিনী নাই। মনু ও রামচন্দ্র বলিয়াছিলেন যে, স্ত্রীলোক আপন শুদ্ধমতিতেই রক্ষিত হয়, বদ্ধ থাকিলে রক্ষিত হয় না, কথা সরিত সাগরে এক গল্পে লেখে যে, যখন এক বর কন্যা বিবাহ করিয়া আইলেন, কন্যা কহিলে—দ্বার উদ্ঘাটন কর, বন্ধুবান্ধবের সমাগম হউক। স্ত্রীলোক অন্তর বলেতেই রক্ষিত হয়। বন্ধনের আবশ্যক নাই। ডাক্তর উইলসন আমাদিগের ভাষা ও শাস্ত্র উত্তমরূপে অবগত ছিলেন। তিনি বলেন, হিন্দুজাতীয় মহিলাগণ যেরূপ সম্মানিত হইয়াছিলেন, এরূপ আর কোন প্রাচীন জাতিতে হয় নাই। স্ত্রীলোক, সকল নাটকে কবিতাতে উৎকৃষ্ট ও উচ্চরূপে বর্ণিত। তাহারাপুরুষ দিগের নিয়ামক ও পুরুষেরাও তাহাদিগকে যথেষ্ট সম্মান করিত।