ঐতিহাসিক চিত্র/১৩১২/আষাঢ়-শ্রাবণ/মতিঝিল

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

(মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক দৃশ্যাবলী)

(১)

মতিঝিল।[১]

মুর্শিদাবাদের নাম ইতিহাস খ্যাত,
সুদূর ইংলণ্ড কিবা পৃথিবী বিখ্যাত।
প্রাচীন কাহিনী তার করিতে প্রচার,
প্রবাহিতা ভাগীরথী, পূর্ব্বতীরে যার,—
জীর্ণদেহে শোভিতেছে দেখ “মতিঝিল”
(অশ্বের পাদুকাকৃতি ত্রিধারে সলিল)

পূর্ব্বশোভা তিরোহিত ঝিলের এখন,
একদা যাহার দৃশ্যে ভুলেছে ভুবন।
নাহিক সুনীল এবে ঝিলের সলিল,
শৈবাল, শাদ্বলে পূর্ণ হইয়াছে ঝিল;

তবুও কমল হাসে তুলি নিজ শির,
ধীরে যারে তালে তালে নাচায় সমীর
“গুন্ গুন” রব তুলি ভ্রমরনিচয়,
ঝিলের প্রাচীন কথা পরস্পরে কয়;
কোথাও জলের পাখী করি কল গান,
শ্রবণে বরিষে সুধা জুড়ায় পরাণ;
নব দূর্ব্বাদল শোভে ঝিল তীরদেশে,
সাজায়ে প্রকৃতি অঙ্গ মনোহর বেশে।
সুদীর্ঘ পাদপরাজি ঝিল তীরোপরে,
নীর মাঝে নিজাকৃতি দরশন করে,
পূর্ব্বের সৌভাগ্য স্মরি কভু হাহাকারে,
“শন্‌ শন্‌” শব্দ করি সে দুঃখ প্রচারে!
রাখাল গোপাল ল’য়ে বসিয়া ছায়ায়,
মনসুথে হাসে খেলে, কভু গীতি গায়;
রজনীতে ঝিলনীর কত শোভা ধরে,
চন্দ্রকর বায়ু সনে যখন বিচরে।

স্বভাব শোভায় পূর্ণ এবে ঝিলকায়,
ভগ্নস্তূপে পরিণত প্রাসাদ তথায়;
চিন্তারত চিতে ঝিল করিলে দর্শন,
প্রত্নতত্ত্ববিদ্‌ করে অশ্রু বরিষণ!

আলিবর্দ্দী ভ্রাতুষ্পত্র জামাতৃরতন—
নোয়াগেস মহম্মদ, করিয়া যতন,
হেথায় করিয়াছিল, মসজিদ ভবন,
মাদ্রাসা, অতিথিশালা, প্রাসাদ, তোরণ,

মনোজ্ঞ কানন ছিল চারিদিকে যার,
গঙ্গাবারি স্পর্শে পূত প্রাচীর যাহার,
অসিত মর্ম্মরযুত সে তোরণ দ্বার,
দেখিলে অলকাভ্রান্তি হইত সবার,
অর্দ্ধভগ্ন, লতাগুল্মে আবৃত এক্ষণে!
অশ্রু আসে যার প্রতি চাহিলে নয়নে!
গঙ্গা আর পদ তার চুম্বন না করে!
দূরে গিয়া দুঃখ গায় কুল কুল্‌ স্বরে!

কতই বিলাস দ্রব্য রম্য হর্ম্ম্য মাঝে!
শোভিয়াছে একদিন মনোহর সাজে!
ত্রিদিব সমান ছিল যে গৃহ নিচয়,
এখন পশিতে তথা মনে হয় ভয়!
লক্ষনর পদরজে, একদা যে স্থান,
পবিত্র হইত সদা জগত প্রধান,
সপ্ত ত্রিংশ সহজ রজত মুদ্রারাশি,
গ্রহণ করিত যথা দীন দুঃখী আসি,
মাসে মাসে এইমুদ্রা কে বিলাতে পারে?
ধন্য নোয়াগেস তুমি দয়ালু সংসারে!

এক দিন নোয়াগেস যে প্রাসাদতলে
গায়িকার[২] গীত সুধাপানে, নেত্রজলে,

ভাসিয়া আবদ্ধচিত, প্রেমের বন্ধনে!
রসাতলে সে ভবন দেখে সর্ব্বজনে!
নোয়াগেস্‌ প্রণয়িনী ঘেসেটী বেগম,
একদা রহিত যথা পারিজাত সম,
কি যাতনা আজি তথা শৃগাল বানর!
অনায়াসে ক্রীড়া করে বাঁধি নিজঘর!
একদিন যে প্রাসাদে ইংরাজ রাজন
“পুণ্যাহ” করিয়াছিল লইয়া স্বজন!
কত আড়ম্বর হায়! হইয়াছে যথা,
বিজন বিপিন এবে কিছু নাহি তথা!
একদিন শ্বেতাঙ্গেরো প্রিয়বাসস্থান
যে স্থান আছিল, তাহা বিজন শ্মশান!
সৌন্দর্য্য বর্দ্ধন আর যাহার নির্ম্মাণ
ঘটায়েছে কত রাশি অর্থতিরোধান!
এবে তার এই দশা ভাবিলে নয়নে,
অশ্রুপাত নাহি করে বল কোন্ জনে?
স্বর্গ করিয়াছে আজি নরকে গমন!
জগতের কিবা রীতি দেখ জনগন!

কি ছার এ মতিঝিল প্রাসাদ ভবন!
পরিণাম লয় তরে বিশ্বের সৃজন!
কাননে কুসুম হাসে কদিনের তরে?
সহসা তাহার শোভা বল কেবা হরে?
দিব্যকান্তি জন মূর্ত্তি সংসারে যাহার!
কে করে হরণ বল জীবন তাহার?

সংসারের মায়া চক্রে পড়ি জীবগণে!
নিজের গৌরব রাশি ছড়ায় ভুবনে!
বৃথা ক্ষণেকের তরে সুন্দর আকার!
দেখিয়া মোহিত বিশ্ব রূপেতে তাহার!
কালচক্রে নিষ্পেষিত কিন্তু সে যখন!
কিছুই তাহার আর রহেনা তখন!
তাই আজি “মতিঝিল”—কীর্ত্তি নোয়াগেস্‌
গৌরব বিচ্যুত দেহ, পেয়েছে এবেশ!

শ্রীশ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
 

  1. মতিঝিল এক্ষণে মুর্শিদাবাদ সহরের ১ মাইল অন্তরে দক্ষিণ-পূর্ব্বাংশে রহিয়াছে। অতি পূর্ব্বকালে এস্থান ভাগীরথীর গর্ভে অবস্থিত ছিল, কিন্তু ক্রমশঃ ভাগীরধীর উভয় পার্শ্বের স্রোত রুদ্ধ হইয়া অশ্বপাদুকাকার-ঝিল বা বদ্ধ বিলে পরিণত হইয়া গিয়াছে। ইহার গর্ভে যথেষ্ট পরিমাণে মতি পাওয়া যাইত বলিয়াই ইহার নাম “মতিঝিল” হয়।
  2. ভগবাই নারী জনৈক নর্ত্তকীর সহিত এই মতিঝিলের প্রাসাদে নোরাগেস্‌ মহন্মদ প্রণয়পাশে আবদ্ধ হইয়াছিলেন: এবং অনেক সময় মধ্যে মধ্যে তিনি উক্ত বাইজীসহ এই প্রাসাদে কালাতিপাত করিতেন বলিয়া ইতিহাসে কথিত হইয়া থাকে।

এই লেখাটি ১ জানুয়ারি ১৯২৩ সালের পূর্বে প্রকাশিত এবং বিশ্বব্যাপী পাবলিক ডোমেইনের অন্তর্ভুক্ত, কারণ উক্ত লেখকের মৃত্যুর পর কমপক্ষে ১০০ বছর অতিবাহিত হয়েছে অথবা লেখাটি ১০০ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছে ।