বিষয়বস্তুতে চলুন

কদলী-রাজ্য

উইকিসংকলন থেকে

কদলী-রাজ্য

কদলী-রাজ্য


 
 

রাজমোহন নাথ বি, ই

বৌদ্ধতান্ত্রিক, নাথপন্থ, বৌদ্ধ সহজিয়া ও নাথ সহজিয়া পন্থের আভ্যন্তরীণ আভাষ; কামরূপ ও কমতারাজ্যের রাজনৈতিক, সাহিত্যিক ও ধর্ম্মবিষয়ক ইতিবৃত্তের একটী সংক্ষিপ্ত অধ্যায়; ময়নামতীর গান, গোরক্ষবিজয়, গোপীচাঁদের সন্ন্যাস প্রভৃতি বঙ্গীয় গীতিকাব্যোল্লিখিত কয়েকটা স্থানের আধুনিক নাম নির্ণয়।

কদলী-রাজ্য

শ্রীরাজমোহন নাথ, বি.ই

সর্ব্বস্বত্ব সংরক্ষিত ]
[ মূল্য—৷৵৹ আনা
°

প্রকাশক
Trio Store
Book sellers and Publishers
Gauhati.

প্রথম সংস্করণ
১৯৪১ সাল
জুন।


গৌহাটী জয়ন্তী আর্ট প্রেসে
শ্রীখগেন্দ্রনাথ দত্ত ভূঞার দ্বারা
মুদ্রিত।

ভূমিকা

 ১৯৩৮ ইংরাজীর ডিসেম্বর মাসে আসাম প্রদেশের গৌহাটী সহরে প্রবাসী-বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের ষোড়শ অধিবেশন আহূত হইয়াছিল। ২৯ শে ডিসেম্বর সমাজবিজ্ঞান শাখায় বর্ত্তমান প্রবন্ধটী পঠিত হয়। সেদিন সভায় ‘কৌলজ্ঞান নির্ণয়ে’র সম্পাদক ডক্টর শ্রীযুক্ত প্রবোধচন্দ্র বাগচী মহোদয়ও উপস্থিত ছিলেন। প্রবন্ধ পাঠান্তে বাগচী মহাশয় ও সমাজ বিজ্ঞান শাখার সভাপতি রায়বাহাদুর শ্রীযুক্ত শরচ্চন্দ্র রায় মহাশয় প্রবন্ধটীর উৎসাহজনক সমালোচনা করেন।

 প্রবন্ধে আসাম প্রদেশের পুরাতত্ত্ব সম্বন্ধে নূতন ভাবের কতকগুলি কথা বলা হইয়াছে বলিয়া আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব প্রবন্ধটী ছাপাইয়া তাহাদিগকে দিবার জন্য অনুরোধ বরয়াছিলেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গভাষা বিভাগের কয়েকজন ছাত্র প্রতিনিধি ও সভার পরে আমাকে অনুরোধ করিয়াছিলেন প্রবন্ধটী যেন শীঘ্র কোথাও প্রকাশ করা হয়। তদনুসারে প্রবন্ধটী বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় প্রেরিত হইয়াছিল; এবং প্রায় দুই বৎসর ধরিয়া অনেক পত্রাদি বিনিময়ের পর সম্প্রতি (৪৭ বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা ১৩৪৭ (বঙ্গাব্দ) ১৯৪১ ইং মে মাস) প্রবন্ধটী ঐ পত্রিকার স্থান লাভ করিয়া ধন্য হইয়াছে।

 অনেকদিন ধরিয়া প্রবন্ধটী সম্পাদকের দপ্তরে পড়িয়া থাকায়, এবং ইহা প্রকাশিত হইবে কি না হইবে কোনও খবর না পাওয়ায়, আমার উৎসাহদাতা বন্ধুবর্গের অনুরোধ রক্ষার জন্য উহা নিজেই ছোট পুস্তিকাকারে ছাপাইতে মনস্থ করি। তখনই আবার প্রবন্ধটী নূতন করিয়া লেখা হয় প্রথম প্রবন্ধ সভায় পাঠ করিবার জন্য সংক্ষিপ্তাকারে লিখা হইয়াছিল, পুস্তিকাকারে ছাপাইবার সময় কোন কোন স্থলে একটু পরিবর্দ্ধিত ও পরিবর্ত্তিত করিতে হইয়াছে। প্রথম প্রবন্ধ লিখার পর ডবকা অঞ্চলে আরও অনেক নূতন বস্তু আবিষ্কার করিবার সুযোগ হইয়াছিল, বর্ত্তমান প্রবন্ধে সেইগুলি অবলম্বন করিয়া কিছু নূতন বিষয়েরও অবতারণা করা হইয়াছে।

 সরকারী পি, ডব্লিউ, ডি বিভাগের সবডিভিশনেল অফিচার হিসাবে নগাঁও জেলায় প্রায় চার বৎসর ছিলাম। তখন কপিলা যমুনা উপত্যকায় কার্য্য ব্যপদেশে ভ্রমণ করিবার সময় প্রাচীন কালের নানা ধ্বংস কীর্ত্তি আবিষ্কার করিবার সুযোগ হইয়াছিল, এবং তখনই ডবকার সহিত এলাহাবাদ স্তম্ভোল্লিখিত ডবাক রাজ্যের সম্বন্ধ ও কন্দলীর সহিত বঙ্গীয় গীতিকাব্যোল্লিখিত কদলী রাজ্যের সম্বন্ধের কথা মনে পড়ে। ইংরাজীতে ঐ সম্বন্ধে কয়েকটী প্রবন্ধ লেখা হইয়াছে, বঙ্গভাষায় বর্ত্তমান প্রবন্ধ প্রথম প্রচেষ্টা।

 আমার জীবিকা অর্জ্জনের ব্যবসায় সরকারী চাকুরী; —স্থপতি বিদ্যা বা ইঞ্জিনিয়ারিং। সাহিত্য ও পুরাতত্ত্ব আলোচনা করাতে  অনেকের নিকট আমি উপহাসাম্পদ। যখন জীবনের জীবিকা অর্জ্জনের পন্থা স্থির নির্দ্দিষ্ট হয় নাই, তখন হইতেই নাথধর্ম্ম ও নাথ সাহিত্য সম্বন্ধে কিছু কিছু আলোচনা আরম্ভ করিয়াছিলাম এবং এখনও সেই রোগের জের রহিয়া গিয়াছে।

 নাথ ধর্ম্ম সম্বন্ধে অনেক বিজ্ঞ পণ্ডিত যথেষ্ট আলোচনা করিয়াছেন, কিন্তু এখনও শেষ কথা বলা হয় নাই বলিয়া মনে হয়।

 ধর্ম্মের আভ্যন্তরীণ তত্ত্বের দিক হইতে নাথ ধর্ম্মের পুরাতত্ত্ব আলোচনার প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে বর্ত্তমান প্রবন্ধে কিঞ্চিৎ আভাষ দেওয়া হইয়াছে। আমাপেক্ষা বিজ্ঞতর ঐতিহাসিক গবেষক ইহার মধ্যে কিছু সামগ্রী পাইতে পারেন, ইহার চেয়ে আর বেশী কিছু আমি আশা করিনা।

 এই প্রবন্ধে অনেক বিজ্ঞ লোকের গবেষণা প্রসূত গ্রন্থ ও প্রবন্ধ হইতে অনেক কিছু উদ্ধৃত করিতে হইয়াছে, তাঁহাদের প্রত্যেকের নিকট আমি ঋণী।

গৌহাটী, আসাম
১লা আষাঢ়—১৩৪৮

শ্রীরাজমোহন নাথ


কদলী রাজ্য

 খ্রীষ্টীয় একাদশ দ্বাদশ শতাব্দী হইতে বঙ্গদেশে প্রচলিত গীতিকাব্য গোপীচাদের সন্ন্যাস, মীনচেতন, ময়নামতীর গান, গোরক্ষ বিজয় প্রভৃতিতে কদলী রাজ্য একটী বিখ্যাত স্থান পরমসিদ্ধা মীন নাথ কদলী রাজ্যে ভ্রমণ করিতে আসিয়া সেই দেশের অধিপত্নী কমলা ও তাহার ভগ্নী মঙ্গলার প্রেমপাশে বদ্ধ হইয়া যোগধর্ম্ম বিস্মৃত হইয়া সাংসারিক দৈহিক সুখে মত্ত হইয়াছিলেন। অতঃপর তাঁহার উপযুক্ত শিষ্য গোরক্ষনাথ নর্ত্তকীর বেশে রাজ অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া নটীর “ভাও”[] দেখাইবার সময় বাদ্য-যন্ত্রের তালে তালে “কায়া সাধনে”র তত্ত্বগুলি গুরুর স্মৃতিপথে জাগরুক করিয়া দিয়া তাঁহাকে কদলী রাজ্যের নারীদের মায়াজাল হইতে মুক্ত করিয়া আনেন।

 গীতিকাব্য গুলিতে কদলী রাজ্যের যে বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া হইয়াছে, তাহা হইতে জানা যায়—

“* এহি রাজ্য বড় হএ ভালা।
চারি কড়া কড়ি বিকাএ চন্দনের তোলা॥
লোকের পিধন পাটের পাছড়া[]
প্রতি ঘর চালে দেখে সোণার কোমড়া॥
কার পখরির পানি কেহ নাহি খাএ।
মণি মাণিক্য তারা রৌদ্রেতে সুখাএ॥

* * *

স্থানে স্থানে দেখে সব অমরা নগর।

সকল নগরে দেখে উচ্চ উচ্চ ঘর॥
সুবর্ণের ঘর সব পতাকা রচিত।
সকল দেশের লোক রত্তনে ভুসিত॥
রাজ্যের সকল দেখে তার ভাল রঙ্গ।
প্রতি ঘর দ্বারে দেখে হিরণ্যের টঙ্গ॥
ধন্য ধন্য রাজ নগর করিয়া বাখানি।
সুবর্ণের কলসে সর্ব্বলোকে খাএ পানি॥”

গোরক্ষ বিজয় (বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ)

৫৫-৫৬ পূঃ

 এহেন সুজলা সুফলা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দেশে কমলা ও মঙ্গলা দুই বোন—সিংহাসনাধিকারিণী। তাহাদের মন্ত্রী-পরিষদ ষোলশত নারী—

“স্ত্রী রাজা স্ত্রী পূজা স্ত্রী রাজ্যের দেওান।
নারি বিনে নাহি রাজ্যে পুরুষের ঘ্রাণ॥”

গোপীচাঁদের সন্যাস (ভট্টশালী) ১৫ পৃঃ

রাজ্যে স্ত্রীলোকের সংখ্যা অতাধিক, পুরুষের সংখ্যা নগন্য। প্রতি পুরুষের ঘরে “দুই চারি মাই;” এমনকি প্রথম যৌবনোদ্গমে পুরুষের অভাবে—

“রিতুস্নান করে নারী জায়া কামরূপ।”

গোপীচাঁদের সন্যাস (ভট্টশালী ১৫ পৃঃ)

রাজ্যের নাম কদলী দেশ, রাজধানী কদলী নগর, অধিবাসীবৃন্দও কদলী নামে পরিচিত।

“ধরিয়া ব্রাহ্মণ রূপ কদলীতে জাএ।
এক দিষ্টে কদলীর সভা সবে চাএ॥ ”

গোরক্ষবিজয়-৫১ পৃঃ

সোল স কদলী আইল করি নানা সাজ।
বসিলেক চারিপাশে মীনে করি মাঝ॥ ”

ঐ—১৫৬ পৃঃ

  রাজ্যে সাধারণতঃ নাথ সম্প্রদায়ের লোকের সংখ্যা বেশী ছিল। পুরুষদিগকে “রাউল” বলিয়া সম্বোধন করা হইত, মেয়ে লোকেরা “চিকন সুতি” কাটিয়া “পাটের পাছড়া” এবং “ধুতি” বুনিত;” এবং তাহা হাটে নিয়া বিক্রয় করিয়া “কৌড়ী” পাইত। তাহারা সুবর্ণের “বাটা” ভরিয়া “তাম্বুল” খাইত, এবং পুরুষেরা “সমাজে মদের ঘটী আগে” পাওয়াকে সামাজিক গৌরব মনে করিত।

স্থান নির্ণয় সম্পর্কে মতামত

 এই স্ত্রী রাজ্যের স্থান নির্ণয় সম্পর্কে বঙ্গের মনীষিদিগের মধ্যে অনেক আলোচনা হইয়া গিয়াছে। গীতিকাব্যে যদিও ভৌগলিক বা ঐতিহাসিক তথ্যের অনুসন্ধান করা সকল সময় সমীচিন হয় না, তথাপি আলোচ্যমান গীতিকাব্য গুলিতে উল্লিখিত স্থান গুলি নিছক কাল্পনিক নহে বলিয়া পণ্ডিতেরা মনে করেন, এবং সেই সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করিয়া তাঁহারা কাব্যেক্ত স্থানগুলির আধুনিক নাম নির্দ্দেশ করিতে প্রয়াস পাইতেছেন।

 ঢাকা মিউজিয়মের অধ্যক্ষ ডক্টর নলিনী কান্ত ভট্টশালী মহাশয় কদলী রাজ্যকে—“স্ত্রী স্বাধীনতার দেশ—কামরূপ, মণিপুর, ব্রহ্মদেশ বলিয়া অনুমান করেন।[]  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর শহীদুল্লা কদলী অর্থে কাছাড় জেলা অনুমান করিয়াছেন।[] জৈমিনী মহাভারতে এবং বাৎস্যায়নের কাম সূত্রেও স্ত্রীরাজ্যের উল্লেখ আছে। অধ্যাপক শ্রীযুক্ত হারাণচন্দ্র চাক্‌লাদার মহাশয় বাহ্লিক দেশকে বক্ত্রিয়া ধরিয়া স্ত্রী রাজ্যের অবস্থিতি তাহারই সন্নিকটে নেহাৎ উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের কোথাও স্থির করিয়াছেন।[]

 তিব্বতী ভাষায় লিখিত প্বাগ্‌শ্বাম্‌জোনব্‌জ্বান নামক গ্রন্থেও কদলী ক্ষেত্রের উল্লেখ আছে। তাহাতে লিখিত আছে যে বঙ্গদেশীয় রাজা গোপীচন্দ্র সিদ্ধা বালপাদকে (অপর নাম হাড়িপা বা জালন্ধর সিদ্ধা) জীবন্ত মাটীর নীচে পুতিয়া রাখিয়াছিলেন। বারবৎসর পরে হাড়িপার শিষ্য কানফাসিদ্ধা রা কৃষ্ণাচার্য্য কদলীক্ষেত্রে যাওয়ার পথে গুরুদেবকে মুক্ত করেন এবং তখনই গোপীচন্দ্র হাড়িপার অনুগ্রহ লাভ করিয়া সন্ন্যাস গ্রহণ করেন।[] গোরক্ষ নাথের শিষ্যা ময়নামতী এই গোপীচন্দ্রের মাতা, এবং এই মাতা পুত্রের কাহিনীই বঙ্গীয় গীতিকাব্যগুলির উপজীব্য।

 গোরক্ষ বিজয় ও গোপীচাঁদের সন্ন্যাসে আরও কয়েকটী স্থানের উল্লেখ আছে। হাড়িপা সিদ্ধা ময়নামতীর ঘরে মেহারকুল দেশে অবস্থান করিতেছিলেন। কানফা কামরূপ ভ্রমণ করিয়া পাটন গিয়াছিলেন, সেখান হইতে লঙ্কাপুরী হইয়া ডাহুকা, এবং ডাহুকা হইতে কদলী দেশ ভ্রমণ করিয়া ফিরিবার পথে বকুল তলাতে গোরক্ষ নাথের সহিত দেখ করেন।[] অন্যদিকে আবার গুক মীননাথকে অনুসন্ধান করিতে করিতে গোরক্ষনাথ “বিজয় নগর ছাড়ি বকুলেতে য়াইলা[]”, এবং বকুলেতেই ডাহুকা প্রত্যাগত কানফার নিকট মীননাথের কদলী দেশে “নটিনির বাশোরে” বিভোর হইয়া থাকার সংবাদ পাইলেন।

 বকুল হইতে সোজাসুজি কদলী দেশে গিয়া গোরক্ষনাথ অনেক চেষ্টার পর গুরু মীননাথকে কদলীদের হাত হইতে উদ্ধার করিয়া বিজয় নগর চলিয়া গেলেন, এবং যাইবার পূর্ব্বে কদলীগণকে শাপ দিলেন:—

“মুখে খাও মুখে বর্ছ মুখে জাও সঙ্গ।
গোর্খের শাপেতে উঠ হইয়া পতঙ্গ॥
বির্ক্ষের ফলমূল বসি কর পান।
এহি শাপ দিলো তোরে করি সমাধান॥
এবলিয়া জতিনাথ হাতে দিল তুড়ি।
বাদুর হইয়া সব কদলী গেল উড়ি॥”— গোরক্ষবিজয়-১৯৭ খৃঃ

ঐতিহাসিক তথ্য

 ৯৮৫ খ্রীষ্টাব্দ হইতে ১১২৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্য্যন্ত প্রাচীন কামরূপ রাজ্য নরকাসুর বংশীয় ভৌমপাল নৃপতিগণের শাসনাধীনে ছিল। এই বংশের প্রথম রাজা ব্রহ্মপাল (৯৮৫-১০০০), দ্বিতীয় রত্নপাল (১০০০-১০৩০), তৃতীয় ইন্দ্রপাল (১০৩০১০৫৫), ষষ্ঠ ধর্ম্মপাল (১০৯০-১১১৫) এবং সপ্তম বা শেষ রাজা জয়পাল (১১১৫-১১২৫)[] প্বাগ্‌শ্বাম্‌জোনব্‌জ্বান মতে শঙ্করাচার্য্যের দিগ্বিজয়ের পর শ্রীহর্ষের জ্যেষ্ঠপুত্র যখন মগধদেশ শাসন করিতেছিলেন, তখন বঙ্গদেশে সিংহচন্দ্রের পুত্র বালচন্দ্র রাজত্ব করিতেন। বালচন্দ্রের পুত্র বিমলচন্দ্র (ময়নামতীর গানের মতে—মাণিকচন্দ্র) মালবদেশের রাজা ভত্তৃহরির ভগিনী ময়নামতীকে বিবাহ করেন। বিমলচন্দ্র তিরভুক্তি, সমগ্র বঙ্গদেশ ও কামরূপে আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিলেন। তিনি মাধ্যমিকা দর্শনোৎসাহী ছিলেন।[১০]

 ১০২৫ খ্রীষ্টাব্দের উড়িষ্যার রাজা রাজেন্দ্রচোলের তিরুমলয় শিলালিপি হইতে জানা যায় যে ঐ সময় চন্দ্রবংশীয় গোবিন্দচন্দ্র বাঙ্গালাদেশের রাজা ছিলেন। চন্দ্রবংশীয় রাজারা সমগ্র সমতট, বঙ্গ ও চন্দ্রদ্বীপের অধীশ্বর হইয়াছিলেন। শ্রীচন্দ্রদেবের রামপাল লিপিতে দেখা যায় যে চন্দ্রবংশীয় রাজারা রোহিত পর্ব্বত পর্য্যন্ত রাজ্য বিস্তার করিয়াছিলেন।[১১] চন্দ্রদ্বীপ বাখরগঞ্জ জেলায় ও রোহিত পর্ব্বত ত্রিপুরা জেলায় অবস্থিত ছিল।

 চন্দ্রবংশীয় রাজারা বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বী ছিলেন এবং আরাকান অঞ্চল হইতে আসিয়া সর্ব্বপ্রথম বাখরগঞ্জের চন্দ্রদ্বীপ নামক স্থানে বসতি করেন। তাহাদের প্রত্যেকের নামের পরে ‘চন্দ্র’ পাদান্ত থাকিত বলিয়াই তাহাদিগকে চন্দ্রবংশীয় রাজা বলা হয়। তাহাদিগের নামের পাদাস্ত হইতেই দ্বীপের নাম চন্দ্রদ্বীপ হইয়াছে।[১২]

 এই সময় রাঢ়, উত্তর বঙ্গ ও বরেন্দ্র ভূমিতে পালবংশীয় রাজারা রাজত্ব করিতেছিলেন। —চন্দ্ররাজারা পরবর্ত্তীকালে বর্ম্মন পদবীধারী রাজাগণ কর্ত্তৃক পূর্ব্ববঙ্গ হইতে বিতাড়িত হন কিন্তু স্থানে স্থানে তাহাদের ক্ষমতা অক্ষত থাকে। লামা তারনাথের বহিতে দেখা যায় যে মগধে বৌদ্ধধর্ম্মের প্রাধান্য লোপ পাইলে বৌদ্ধসন্ন্যাসীরা পূর্ব্বদিকে কুকিদের দেশে গিয়া আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল, এবং ঐ দেশীয় রাজারা তাহাদের জন্য অনেক মঠ ও বিহার নির্ম্মাণ করিয়া দিয়াছিলেন। —পরবর্ত্তী কালেও চট্টগ্রাম অঞ্চলে বাবলা সুন্দর নামক একজন রাজা ছিলেন। তিনি এবং তাঁহার চারিপুত্র চন্দ্রবাহন, অতীতবাহন, বালবাহন এবং সুন্দরহাঁচি বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বী ছিলেন। চন্দ্রবাহন আরাকানের, অতীতবাহন পার্ব্বত্য চট্টগ্রামের, বালবাহন ব্রহ্মদেশের (মুনাদ) এবং সুন্দরহাঁচি নাইনগাতা রাজ্যের রাজা হইয়াছিলেন। আসাম, কাছাড় ও ত্রিপুরার পার্ব্বত্য অঞ্চল লইয়া নাইনগাতা রাজ্য ছিল।

বৌদ্ধ ধর্ম্মের অবস্থা

 চন্দ্র রাজারা তান্ত্রিক মহাযান ধর্মাবলম্বী ছিলেন; বৌদ্ধ তান্ত্রিক সন্ন্যাসীরা নানারূপ মন্ত্র সাধন করিয়া সিদ্ধা হইতেন এবং ঐ মন্ত্রবলে অলৌকিক বিভূতি দেখাইয়া লোককে বিস্ময়ান্বিত করিতেন এবং নিজামতাবলম্বী করিতেন।

 বালপাদ বা হাড়িপা সিদ্ধা ছিলেন সিন্ধু দেশের লোক, জাতিতে শূদ্র। তিনি ওড্ডিয়ানে থাকিয়া যোগধর্ম্ম শিক্ষা করেন এবং বৌদ্ধ তান্ত্রিক ও ঐন্দ্রজালিক শাস্ত্রে তাঁহার এত অধিকার জন্মিয়াছিল যে একবার অবন্তী দেশে দেবতার নিকট বলি দিবার নিমিত্ত আনীত কয়েক হাজার পাঠা তাঁহার মন্ত্রবলে নেকড়ে বাঘে পরিণত হইয়া গিয়াছিল। তাঁহার মন্ত্রবলে নেপালের মন্দিরের প্রধান শিবলিঙ্গটী ফাটীয়া চৌচির হইয়া গিয়াছিল। ময়নামতীর বাগানে বসিয়া তাহার জলপানের ইচ্ছা হইলে—মন্ত্রের প্রভাবে ডাব নিজে গাছ হইতে আসিয়া তাঁহার মুখে জল ঢালিয়া দিয়া আবার স্ব স্থানে প্রস্থান করিত।[১৩]

 কামরূপের রাজা রত্নপালের রাজধানী সুনির্ম্মিত দুর্জ্জয় নগর ছিল। সুধাধবলিত শিবাধিষ্ঠিত মন্দির দ্বারা নগর শোভিত ছিল এবং রাজ্যের ব্রাহ্মণ গণের গৃহ নানা প্রকার ধন-সম্পদ দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল।[১৪]

 সিদ্ধা সরহপাদ পূর্ব্বদেশে রাজ্ঞীতে (Rajni) চন্দনপালের রাজ্যে একজন ব্রাহ্মণের ঔরসে ও ডাকিনীর গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেন, এবং অত্যাশ্চর্য্য ঐন্দ্রজালিক বিভূতি দেখাইয়া রাজা রত্নপাল ও তাঁহার ব্রাহ্মণ মন্ত্রীদিগকে বিস্ময়াপন্ন করিয়াছিলেন এবং তাঁহাদিগকে বৌদ্ধধর্ম্মের প্রতি আস্থাবান করিয়া তুলিয়াছিলেন।

 গৌহাটী সহরের ১৬ মাইল পশ্চিম দক্ষিণে রাণীনামক একটী প্রাচীন স্থান আছে। সামন্ত রাজ্যরূপে অনেক প্রাচীন কাল হইতে রাণী রাজ্যের নাম শুনা যায়। ইংরাজাধিকারের সময় পর্য্যন্ত রাণীর সামন্ত রাজার অস্তিত্ব ছিল। সুতরাং মনে হয় চন্দনপাল রত্নপা সামন্ত রাজা ছিলেন, এবং রাণীরাজ্যেই সরহপাদের জন্ম হইয়াছিল।

 ইন্দ্রভূতির (ইন্দ্রপাল?) রাজ্যে সামন্তশোভা নামক একজন সামন্য রাজকর্মচারী ছিলেন। তিনি জাতিতে ছিলেন  কৈবর্ত্ত। তিনি শবরীপাদ নামক একজন সিদ্ধার নিকট হইতে বৌদ্ধতান্ত্রিক ধর্ম্মে দীক্ষা গ্রহণ করিয়া সিদ্ধা হন। তিনি তিব্বত অঞ্চলে বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেন এবং সেইদেশে লোহিত পাদ বা লুইপাদ নামে পরিচিত হন। তিনি বৌদ্ধ তান্ত্রিক ধর্ম্মে এক নূতন পন্থা প্রবর্তন করেন; উহা বৌদ্ধ সহজিয়াধর্ম্ম নামে পরিচিত।

 ইন্দ্রভূতির ভগ্নী ভগবতী লক্ষ্মী বা লক্ষ্মীঙ্করা ও সিদ্ধা হইয়া যান; এবং পুত্র পদ্মসম্ভব ও একজন বিখ্যাত সিদ্ধ পুরুষ ছিলেন। তিনি গুরুপদ্মসম্ভব নামে অদ্যাপিও ভুটীয়া ও তিব্বতীগণ কর্তৃক পূজিত। সিকিমের রাজমন্দিরে গুরু পদ্মসম্ভবের মূর্ত্তি আজকাল ও পূজিত হইতেছে। ভুটীয়ারা তাঁহাকে নাম-গুরুও বলে। ভুটীয়াদের মধ্যে প্রবাদ আছে যে গুরুপদ্মসম্ভব কামরূপ অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন।[১৫] টেঙ্গুরের ক্যাটালগে লুইপাদকে বঙ্গদেশবাসী এবং গ্রাব-ও-টাব নামক তিব্বতী গ্রন্থে তাঁহাকে কামরূপ দেশের কৈবর্ত্তের সন্তান বলা হইয়াছে। কামরূপের প্রধান নদী ব্রহ্মপুত্র বা লোহিত; এবং তদনুসারে দেশকে লৌহিত্য দেশ ও বলা হয়। লৌহিত্য দেশের লোক বলিয়া তাঁহাকে লোহিতপাদ বলা হইত। চৌরাশীসিদ্ধার ইতিহাসে লেখা আছে লুইপাদের জন্ম ওড্ডিয়ান দেশে, এবং ওড্ডিয়ান দেশের রাজা ছিলেন ইন্দ্রভৃতি।

নবগোরক্ষ নাথ

 এই সময় রমণবজ্র বা অনঙ্গ বজ্র নামক একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু কোন কারণে নিজ সম্প্রদায়ের সহিত মনোমালিন্য করিয়া নিজের দলবল সহ নাথ সম্প্রদায় ভুক্ত হইয়া যান, এবং গোরক্ষনাথ নাম গ্রহণ করেন।[১৬] কিন্তু নাথধর্ম্মের কঠোর হঠযোগ ও নিয়ম সংযমের মধ্যে তিনি আবদ্ধ থাকিতে না পারিয়া সেই সম্প্রদায় হইতে ও বাহির হইয়া পড়েন। এই সময় লুইপাদ প্রবর্ত্তিত ধর্ম্মের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন; এবং তাঁহার অনুবর্ত্তী বৌদ্ধ ও নাথগণ সহ খুব জোরের সহিত লুইগাদের বৌদ্ধসহজিয়া ধর্ম প্রচার করিতে থাকেন।

 এই সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্রস্থান বাখরগঞ্জের চন্দ্রদ্বীপেই ছিল। তাঁহার ভাঙ্গা সংস্কৃত ভাষায় সকলের বোধগম্য করিয়া অসংখ্য গ্রন্থ লিখিতে লাগিলেন। লুইপাদকে মৎস্যেন্দ্রনাথের অবতার বলিয়া ঘোষণা করা হইল। নাথ সম্প্রদায়ের গোরক্ষশতক ও গোরক্ষসহস্র নাম স্তোত্রের অনুকরণে তাঁহারাও নিজেদের ধর্ম্মভাবানুযায়ী গোরক্ষশতক ও গোরক্ষসহস্রনাম স্তোত্র লিখিলেন; হঠযোগী নাথ সম্প্রদায়ের ধর্ম্মমতের গ্রন্থ গোরক্ষসংহিতার অনুকরণে তাহারা ও তাহাদের সহজিয়া ধর্ম্মমতের গ্রন্থ গোরক্ষসংহিতা ও কৌলজ্ঞান নির্ণয় রচনা করিলেন। কৌলজ্ঞাননির্ণয় চন্দ্রদ্বীপ হইতে মৎস্যেন্দ্রনাথ পাদাবতারিত বলিয়া লিখা হইয়াছে।[১৭]

 নাথধর্ম্ম অতি প্রাচীন; এবং নাথ সম্প্রদায়ের আদিগুরু মৎস্যেন্দ্রনাথ। মৎস্যেন্দ্রনাথের প্রধান শিষ্য গোরক্ষনাথ এই ধর্ম্ম সাধারণের মধ্যে প্রচারিত করেন। এই ধর্ম্ম বর্ত্তমানেও সজীব এবং পশ্চিম ও উত্তর ভারতে নাথ সম্প্রদায়ের অসংখ্য সন্ন্যাসী ও অসংখ্য মঠ আছে। অনেক পণ্ডিত নাথ সম্প্রদায়ের প্রবর্ত্তক মৎস্যেন্দ্রনাথ ও লুইপাদকে অভিন্ন মনে করেন। ৺মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীও অধ্যাপক Tucci এই মতের বিশেষ সমর্থক। এই সিদ্ধান্তের সপক্ষে ও বিপক্ষে অনেক যুক্তি ডক্টর শ্রীযুক্ত নলিনীকান্ত ভট্টশালী মহাশয় গোপীচাদের সন্ন্যাসের সম্পাদকীয় মন্তব্যে (পৃঃ ৬৩-৬৫) ও অধ্যাপক ডক্টর শ্রীযুক্ত প্রবোধচন্দ্র বাগচী মহাশয় কৌলজ্ঞান নির্ণয়ের ভূমিকায় ব্যক্ত করিয়াছেন। কিন্তু লুইপাদ ও মৎস্যেন্দ্রনাথের ধর্ম্মমত সমালোচনার দিকে মনিষিবৃন্দ লক্ষ্য করিয়াছেন বলিয়া মনে হয় না।

 মৎস্যেন্দ্রনাথ ছিলেন হঠযোগের প্রবর্ত্তক। হঠযোগে তাঁহার প্রবর্ত্তিত কয়েকটী কষ্ট সাধ্য আসন ও আছে। গোরক্ষনাথও কায়াসাধনের প্রধান নেতা। যোগের কঠোর নিয়মের দ্বারা দেহকে সংযত ও চিত্তবৃত্তিকে নিরোধ করিয়া সাধনা করাই ছিল মৎস্যেন্দ্র নাথের পন্থা। গোরক্ষসংহিতায় গোরক্ষনাথের উপদেশ “আসনং প্রাণ সংরোধঃ প্রত্যাহারশ্চধারণা।” এবং “যোগশাস্ত্রঞ্চ পরমং যোগিনাং সিদ্ধিদায়কম্”।[১৮] কিন্তু লুইপাদ এই কষ্টসাধ্য সাধন পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন,—

“সঅল সমাহিঅ কাহি করিঅই।
সুখ দুখেতে নিচিত মরি আই।” বৌদ্ধ গান ও দোহা।

তিনি মহা সুখ লক্ষ্য করিয়া গুরুর নিকট হইতে সহজানন্দ মহাসুখ লাভ করিবার উপায় জানিয়া লইতে বলেন—

“দিট করিঅ মহাসুহ পরিমাণ।
লুই ভনই গুরু পুচ্ছিঅ জ্ঞান॥” ঐ

হঠযোগীর নিকট মূলবন্ধ, জালন্ধর বন্ধ ও ওড্ডিয়ানবন্ধ সাধনার কয়েকটী শ্রেষ্ঠ পন্থা—

“মহাবন্ধং সমাসাদ্য উড্ডীনকুম্ভকংচরেৎ।
মহাবেধ সমাখ্যাতো যোগিনাংসিদ্ধিদায়কঃ॥”—গোরক্ষ সংহিতা—৭০।

 কিন্তু লুইপাদ বলেন—

“এড়ি এউ ছান্দক বান্ধ করণক পাটের আশ।
শুনুপাখভীতি লাহুরে পাশ॥”

 অর্থাৎ মূলবন্ধ, জালন্ধর বন্ধ, আদি হঠযোগের বিরাট সাধনা ত্যাগ করিয়া শুধু নৈরাত্ম্য ধর্ম্মপাশ আশ্রয় কর।

 লুইপাদের এই ভাবই পরবর্ত্তীকালে কৌলতান্ত্রিকদের মধ্যে প্রচারিত হইয়াছে—

“একভক্তোপবাসাদৈর্নিয়মৈঃ কায়শোষণৈঃ।
মূঢ়া পরোক্ষমিচ্ছন্তি ভব মায়াবিমোহিতাঃ॥
দেহদণ্ডনমাত্রেণ কা সিদ্ধিরবিবেকিনাম্।
বল্মীক তাড়নাদ্দেবি মৃতঃ কোঽত্র মহোরগঃ॥”—কুলার্ণব

 লুইপাদের সাধনার পদ্ধতি “ধনন চমন বেণি পাণ্ডি বইণ” অর্থাৎ ভ্রুযুগলের মধ্যে আজ্ঞাচক্রে ইড়া ও পিঙ্গলার সঙ্গম স্থলে স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণ বীজ বেষ্টিত (অ হইতে ল বীজ “অলি,” ইড়া বা চন্দ্রনাড়ী বেষ্টিত; এবং ক হইতে ল বীজ “কালি,” পিঙ্গলা বা সূর্য্য নাড়ী বেষ্টিত) ত্রিকোণাকার মণ্ডল মধ্যে[১৯] পদ্মাসনে সমাসীন নিজগুরুর মূর্ত্তির ধ্যান করা। এই ভাবে গুরুধ্যান পরবর্ত্তী কালে ঘেরণ্ড সংহিতায়[২০] (“ধ্যায়েত্তত্র গুরু দেবং দ্বিভুজঞ্চ ত্রিলোচনম্‌”) এবং বিশ্বসার তন্ত্রে দেখতে পাই। আরও পরবর্ত্তীকালে কঙ্কালমালিনী তন্ত্রে কে স্থানে গুরুর বাম উরুতে উপবিষ্টা গুরুপত্নীকে ধ্যানের ও উল্লেখ আছে।

 নাথ সম্প্রদায়ের ধ্যান এরূপ নহে। তাঁহারা আজ্ঞাচক্রে নাদবিন্ধুর ধ্যান করেন, জ্যোতির্ম্ময় বিন্ধুর ধ্যান করিয়া কর্ণে নাদ শ্রবণ করাই তাঁহাদের প্রথম লক্ষ্য। গোরক্ষনাথ “মূঢ়গণের ও সম্মত নাদোপাসনা” প্রচলিত করিয়াছিলেন বলিয়া রাজা হইতে পথের ভিখারী সকলেরই পূজ্য হইয়াছিলেন। লুইপাদের লক্ষ্য মহাসুখ; মৎস্যেন্দ্র নাথের লক্ষ্য “মনের সহিত নাদের বিলয় সাধন করিয়া পরব্রহ্ম পরমাত্মার স্বরূপ উপলব্ধি করা।”[২১]

 লুইপন্থের সরহ পাদের দোহায় নাদবিন্ধু সাধনের নিষ্প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হইয়াছে। সদ্‌গুরুর বদনামৃতলহরীর প্রভাবে নাদবিন্দুর কল্পনা ত্যাগ করিলেও মহাসুখ পাওয়া যায়—

নাদ ন বিন্দু ন রবি ন শশিমণ্ডল।
চি অরাঅ সহাবে মুকুল।” চর্যাচর্য্যবিনিশ্চয়—৩২

সরহপাদও বলেন মনকে বায়ুর সহিত যুক্ত করিয়া রবি শশির মধ্যে চালিত না করিয়া শুধু বটের ছায়ায় অর্থাৎ সদগুরুর আশ্রয়ে থাকিলেই সমস্ত লাভ হয়।[২২]কাহ্নপাদও বলেন অলিও কালিয়ে কৃত সিদ্ধির পথ দৃঢ়ভাবে রুদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে। কেবল সদগুরুর প্রসাদে ঐ পথ উন্মুক্ত হইতে পারে।[২৩]

 নাথ সম্প্রদায়ের মধ্যে গুরুশিষ্য অথবা সাধকে সাধকে অভিবাদন প্রত্যভিবাদন করিতে জোড়হাত করিয়া “আদেশ” বলেন। আদেশ শব্দের অর্থ “আত্মা পরমাত্মা ও জীবাত্মার এক সংভূতি।[২৪] এই এক সংভূতি পদদ্বারা ব্রহ্মকে বুঝাইতেছে। সুতরাং শিষ্য গুরুকে, গুরু শিষ্যকে বা একজন সন্ন্যাসী অন্য একজন সন্ন্যাসীকে “আদেশ” বলিলে “তুমি ব্রহ্মস্বরূপ” এই বলিয়া পরস্পরে পরস্পরকে সম্মান করেন।”[২৫]

 সুতরাং দেখা যাইতেছে লুইপাদ ও মৎস্যেন্দ্রনাথের ধর্ম্মমতের বা সাধনার পদ্ধতির মধ্যে সামঞ্জস্য নাই; গোরক্ষ সংহিতার ধর্ম্মমতের সহিত কৌলজ্ঞাননির্ণয়ের ধর্ম্মমতের মিল নাই। কাজেই বৌদ্ধ সহজিয়া পন্থের লুইপাদকে তাঁহার ভক্তেরা মৎস্যেন্দ্র নাথের অবতার বলিয়া প্রচার করিয়াছিলেন সত্য কিন্তু তাঁহার ধর্ম্ম মতের সহিত নাথপন্থ প্রবর্ত্তক মৎস্যেন্দ্র নাথের ধর্মের কোনও মিল নাই।

 অবশ্য রমণবজ্রের সহিত নাথ সম্প্রদায়ের কঠোর নিয়ম ভঙ্গকারী অনেক যোগভ্রষ্ট সন্ন্যাসীরা যোগদান করিয়াছিলেন সন্দেহ নাই। এই ধর্ম্ম চন্দ্ররাজাদের অনুগ্রহ লাভ করাতে চন্দ্রদ্বীপই উহার কেন্দ্রস্থল হয়, এবং রাজার ধর্ম্মে অধিকাংশ প্রজা দীক্ষিত হয়। কৌলজ্ঞান নির্ণয় “চন্দ্রদ্বীপ বিনির্গত” এবং “মৎসেন্দ্র পাদাবতারিত”।

 এই নবগোরক্ষ নাথ ও নবমৎস্যেন্দ্র নাথের পন্থের সন্ন্যাসীরাও ‘নাথ’ পাদান্ত গ্রহণ করিতেন। পরবর্ত্তীকালে তাহাদের মধ্যেও দুইটী দল হইয়া যায় এবং তাহাদেরই এক শাখা বঙ্গদেশীয় কুলাচারী বা কৌলতান্ত্রিক বলিয়া পরিচিত হন। কৌলদের মত হইতেছে যোগী হইলে ভোগ হইতে বিরত হইতে হয়, ভোগী যোগী হইতে পারেনা। কাজেই ভোগ ও যোগের সমাবেশ কৌলাচার[২৬]; এবং তাঁহাদের ও সাধকেরাও নাথ, দেব, স্বামী, ‘আনন্দনাথ’ প্রভৃতি পদবী দীক্ষান্তে গ্রহণ করেন।[২৭] অপর দল আদি নাথপন্থের মতানুসারে চলিতে চেষ্টা করেন! এই শ্রেণীবিভাগ খুব সম্ভব সেনরাজাদের সময় হইয়াছিল। কারণ চন্দ্ররাজাদের পরে বঙ্গে আবার পালরাজাদের আধিপত্য হয়, পালরাজারা ও বৌদ্ধধর্ম্মী ছিলেন, কাজেই তখন পর্য্যন্ত লুইপাদের ধর্ম্ম রাজানুগ্রহ লাভ করিয়াছিল, এবং ঐ পন্থের সাধকদের স্থান সমাজের অতি উচ্চ স্তরে ছিল। কিন্তু পালরাজাদের পরে সেনরাজারা গোঁড়া হিন্দু ছিলেন, কাজেই তখন ঐ পন্থের ধর্ম্মাবলম্বীরা রাজানুগ্রহ লাভে বঞ্চিত হন, এবং হিন্দু ধর্ম্মাবলম্বীদের নিকট সমাজে হেয় বলিয়া বিবেচিত হন।

 সম্প্রতি একজন লেখক সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় লিখিয়াছেন “দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত ছিলেন। কিন্তু বাঙ্গালায় আসিবার পর, আর তিব্বতীয়দের সঙ্গে মিশিতে পারেন নাই। তখন তিনি বাঙ্গালাদেশে এক সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করেন। তাহারা নাথ সম্প্রদায় নামে বিদিত।”[২৮] ইহার মধ্যে আংশিক যুক্তি আছে—তবে বাঙ্গালাদেশে নূতন সম্প্রদায়ের সৃষ্টিকর্তা দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান নন তিনি গোরক্ষনাথ নামধারী, লুইপাদের ধর্ম্মের প্রধান প্রচারক প্রাক্‌বৌদ্ধ রমণবজ্র। তাঁহারই সম্প্রদায়ের লোক বর্ত্তমানে বাঙ্গলাদেশে ‘নাথ’ বলিয়া পরিচিত। আদি মৎস্যেন্দ্র নাথ বা গোরক্ষ নাথ প্রবর্ত্তিত নাথ ধর্ম্ম অদ্যাপি সজীব ধর্ম্ম, এবং সেই নাথ সম্প্রদায়ের প্রতাপ ও সম্মান এখনও অখণ্ড। তাঁহাদের ধর্ম্মমত ও আচার বিচার যোগশাস্ত্রানুযায়ী।

 নবগোরক্ষনাথের সহজিয়া নাথ পন্থ হইতে পৃথক হইয়া কৌলতান্ত্রিকেরা পরবর্ত্তীকালে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের মতাবলম্বী হওয়া খুবই স্বাভাবিক বলিয়া মনে হইতেছে। ইহাদের কেন্দ্র ছিল ঢাকার বিক্রমপুরে।

ওড্ডিয়ান

 সিদ্ধাচার্য্য লুইপাদ কামরূপ দেশের ধীবরের পুত্র ছিলেন বলিয়া তিব্বতীগ্রন্থ গ্রাব ও টবে (Grub O Tub) লিখা আছে। প্রথম জীবনে তিনি ওড্ডিয়ান দেশের নৃপতি ইন্দ্রভূতির কর্ম্মচারী ছিলেন। তিব্বতে লুইপাদের অপর নাম মৎসান্ত্রাদপাদ। কৌলজ্ঞাননির্ণয়ে[২৯] শিব পার্ব্বতীকে বলিতেছেন—

“অহং স ধীবরো দেবী অহং বীরেশ্বর প্রিয়ে।” ১১

* * *

“যদাবতারিতং জ্ঞানং কামরূপী ত্বয়া ময়া।” ২১

* * *

“অব্যক্তেন তু রূপেণ চন্দ্রদ্বীপে অহংপ্রিয়ে।” ২২

 পার্ব্বতী জিজ্ঞাসা করিতেছেন—

“কিমর্থং চন্দ্রদ্বীপন্তু অহঞ্চৈব গতঃ প্রভো।” ২৩

 আবার শিব বলিতেছেন—

জ্ঞান তেজেন সংভূতো দুর্জ্জয়স্ত্রিদশৈরপি।
ব্রহ্মত্বং হি তদা ত্যক্তং চিত্তবী ধীবরাত্মকম্॥ ৩৪
অহং স ধীবরো দেবি কৈবর্ত্তত্বং ময়া কৃতঃ।

* * *

ব্রাহ্মণোঽসি মহাপুণ্যে কৈবর্ত্তত্বং ময়া কৃতঃ।

মৎস্যাভিঘাতিনৈর্বিপ্রা মৎস্যঘ্নমেতি বিশ্রুতাঃ।
কৈবর্ত্তত্বংকৃতং যস্মাৎ কৈবর্ত্তো বিনায়কঃ॥ ৩৭

 প্বাগ্‌শ্বাম্‌জোনব্‌জ্বান্‌ মতে সিদ্ধাচার্য্য লুইপাদ ওড্ডীয়ান দেশের কৈবর্ত্তের সন্তান। টেঙ্গুরের ক্যাটালগকার কডিয়ার সাহেব লুইপাদকে বাঙ্গালা দেশের লোক বলিয়া লিখিয়া গিয়াছেন। যে সময়ের কথা হইতেছে সে সময় বাঙ্গালা দেশ অর্থে পূর্ব্ববঙ্গের কিয়দংশ বুঝাইত।

 ওড্ডিয়ানদেশ বৌদ্ধতান্ত্রিকদের একটী প্রধান কেন্দ্র ছিল। চৌরাশী সিদ্ধার ইতিহাসে দেখা যায় ওড্ডিয়ান দেশে পাঁচ লক্ষ নগর ছিল, এবং ইহা দুই রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এক রাজ্যের নাম শাম্ভব, অপরের নাম লঙ্কাপুরী। লঙ্কা জ্বাহর দেশের সন্নিকটে ছিল।[৩০] ইন্দ্রভূতির পুত্র পদ্মসম্ভব প্রথমজ বনে জ্বাহর দেশের নৃপতির কন্যাকে বিবাহ করেন। জ্বাহর নৃপতির নাম ছিল সন্তরক্ষিত। প্বাগ্‌শ্বামজোনব্‌জ্বান্ মতে ওড্ডিয়ানেই বৌদ্ধতান্ত্রিক ধর্ম্মের উৎপত্তি হয়। লঙ্কাপুরীর রাজা জালেন্দ্রর পুত্র ইন্দ্রভূতির ভগিনী লক্ষ্মীঙ্করাকে বিবাহ করিয়াছিলেন। এই লক্ষ্মীঙ্করা পরে সিদ্ধা হইয়াছিলেন।[৩১]

 কামরূপ অতি প্রাচীন কাল হইতে তান্ত্রিক ধর্ম্মের প্রধান কেন্দ্র ছিল; কৌলজ্ঞান নির্ণয়ে কামাখ্যাকে আদিপীঠ ও ওড্ডিয়ানকে মহাপীঠ বলা হইয়াছে।[৩২] বজ্রযোগিনী সাধনার মন্ত্রে কামরূপের কয়েকটা স্থানের নামোল্লেখ আছে:—

 “ওঁ ওড্ডিয়ান বজ্রপুষ্পে স্বাহা, ওঁ পূর্ণগিরি বজ্রপুষ্পে স্বাহা, ওঁ কামরূপ বজ্রপুষ্পে স্বাহা, ওঁ শ্রীহট্ট বজ্রপুষ্পে স্বাহা।” ইত্যাদি[৩৩]

 কৌলজ্ঞান নির্ণয় গ্রন্থখানা ও নাকি কামরূপবাসী ভক্তদের গৃহে গৃহে থাকিত। চন্দ্রদ্বীপে প্রকাশিত হইলেও এই শাস্ত্র কামাখ্যায় বেশী প্রচারিত হইয়াছিল।[৩৪]

 বালপাদ বা হাড়িপাসিদ্ধা ওড্ডিয়ান দেশে বৌদ্ধতান্ত্রিক ও ঐন্দ্রজালিক শিক্ষালাভ করিয়া অনেক অলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করিতেন ইহ। পূর্ব্বে বলা হইয়াছে। কামরূপে এরূপ যাদুবিদ্যার প্রবাদের কথা কাহার ও অবিদিত নাই। এখানে লোককে ভেড়া করা হয়,—ইহা আধুনিক কালেও অনেকে বিশ্বাস করেন। গুরু নানকের অনুচর মর্দ্দানাকে কামাখ্যার একজন নারী, গলায় একগাছা সূতা বাঁধিয়া ভেড়া করিয়া ফেলিয়াছিল। দ্বিতীয় অনুচর বালার নিকট হইতে জানিতে পারিয়া বাবা সাহেব অনেক চেষ্টায় সঙ্গীটীকে উদ্ধার করেন। এই কাহিনীটি ভাই বালা গুরুজীর “জনম সাথা” গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন।[৩৫]

 ১৩৩৭ খ্রীষ্টাব্দে মহম্মদ শাহের একলক্ষ অশ্বারোহী সৈন্য এই যাদুবিদ্যার দেশে মুহূর্ত্তে বিনষ্ট হইয়া গিয়াছিল, এবং কয়েক বৎসর পরে যখন দ্বিতীয়বার সৈন্য প্রেরণ করিবার বন্দোবস্ত হইল, তখন যাদুর ভয়ে সৈন্যেরা বঙ্গদেশের সীমা অতিক্রম করিয়া এই ভয়ঙ্কর দেশে পদার্পণ করিতে সাহস করিলনা। আলমগীর নামার সুশিক্ষিত লেখক দিল্লীর রাজ দরবারের শিক্ষিত ও মার্জিত পাঠক বৃন্দকে এই অদ্ভুত কাহিনীটি বলিয়া গিয়াছেন।[৩৬] অনেকের বিশ্বাস গৌহাটী হইতে ২১ মাইল দূরবর্ত্তী নগাঁও জেলার অন্তর্গত মায়ংমৌজাতে এখন ও ঐরূপ যাদুবিদ্যার প্রচলন আছে, এবং এখনও সুদূর মাদ্রাজ হইতে আসিয়া অনেকলোক যাদুমন্ত্র শিক্ষা করিবার জন্য মায়ং-এর পার্ব্বত্য রাজার উমেদারী করিয়া থাকে।[৩৭]

 উপরোক্ত সমস্ত বিবরণ হইতে বুঝা যায় ওড্ডিয়ান কামরূপ ও বঙ্গদেশের মধ্যেই কোথাও অবস্থিত। বাডেল সাহেবের (waddel) মতে ওড্ডিয়ান (উদ্দিয়ান, উজ্জিয়ান বা ওজ্জিয়ান) উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সোবাট ও চিত্রলের নিকটস্থ উদ্যান নামক স্থান। সেখানে প্রাচীন কালান অনেক বৌদ্ধ মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে। ইহা হইতে অনেকে মনে করেন তান্ত্রিক ধর্ম্ম সুদূর আফগানিস্থান পর্য্যন্ত প্রচারিত হইয়াছিল।

 সোবাট উপত্যকায় গ্রীক্ নৃপতিদের সময় হইতেই গান্ধার ভাস্কর্য্যের উন্নতি হয়, সেই সময় হইতেই সেই অঞ্চলে অসংখ্য প্রস্তর নির্ম্মিত বৌদ্ধ মূর্ত্তি নির্ম্মিত হইতে থাকে। কিন্তু খ্রীষ্টাব্দের সপ্তম শতিকায় হুয়েন্থসাং ঐ অঞ্চলের সঙ্ঘারামগুলি পরিত্যক্ত ও জঙ্গলাকীর্ণ দেখিয়াছিলেন। ঐ অঞ্চলের শাহী বংশের শেষ হিন্দু রাজা ত্রিলোচন একাদশ শতিকায় গজনীর সুলতান মাহমুদ কর্তৃক তুষি নদীর তীরে পরাজিত হওয়ার পর তাঁহার পুত্র ভীমপাল মাত্র পাঁচ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন, তাহার পর গান্ধার অঞ্চলে হিন্দু বা বৌদ্ধ রাজত্ব চিরতরে লুপ্ত হয়।[৩৮] সুতরাং ইহার পরে ঐ অঞ্চলে বৌদ্ধতান্ত্রিক ধর্ম্মের পৃষ্ঠপোষক কেহ ছিলেন বলিয়া মনে হয় না। বরঞ্চ লামা তারনাথের মতে মুসলমানদের অত্যাচারের ভয়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা পূর্ব্বদিকে কুকীদের দেশে গিয়া আশ্রয় লাভ করেন, এবং ঐ সব দেশের শুভজাত, সিংহজাত প্রভৃতি রাজন্যবর্গ নিজ নিজ রাজ্যে অনেক বৌদ্ধবিহার নির্মাণ করিয়া দেন।[৩৯]

 ৺মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে উড়িষ্যাই ওড্ডিয়ান, এবং সিলভাঁ লেভির মতে ওড্ডিয়ান খাসগড়ে।[৪০] তন্ত্রসারে পীঠমালাতে পূর্ণ শৈল, জালন্ধর, জয়ন্তী, উজ্জয়িনী, উড্ডীশ, উড্ডিয়ান”র নাম আছে।[৪১] ইহাতেই মনে হয় উড্ডীশই উড়িষ্যা এবং উড্ডিয়ান পৃথক স্থান।

 দশম শতিকার পূর্ব্বে[৪২] লিখিত কালিকাপুরাণে লিখিত আছে যে উড্ডিয়ানে সতীর ঊরুযুগল পতিত হইয়াছিল[৪৩] এবং পীঠমালা মতে ঊরু জয়ন্তিয়ায় পতিত হইয়াছিল। বর্ত্তমানে ও জয়ন্তিয়ায় বাউর ভাগ (বাম-ঊরু ভাগ) নামক স্থানে জয়ন্তেশ্বরীর মন্দির আছে। উহা একটী পীঠ স্থান; ভৈরব ক্রমদীশ্বর। তন্ত্রচূড়ামণি মতে “জয়ন্ত্যাং বামজঙ্ঘা চ জয়ন্তী ক্রমদীশ্বরঃ।”

 শ্রীযুত নলিনীনাথ দাশগুপ্ত মহাশয় অনেক যুক্তির দ্বারা প্রমাণ করিয়াছেন যে উড্ডিয়ান বঙ্গদেশেই অবস্থিত ছিল। (Indian Historical Quarterly XI p. 192) স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্যে ঊনকোটী তীর্থ নামক স্থানে অনেক প্রস্তর নির্ম্মিত বৌদ্ধমূর্ত্তির ধ্বংসাবশেষ আছে। আসামের গোয়ালপাড়া জেলায় গোয়ালপাড়া সহরের সন্নিকটে শিলাময় পর্ব্বত গাত্রে অনেকগুলি বৃহদাকার গুহা আছে; নিকটে পঞ্চরত্নের পাহাড় আছে। শ্রীসূর্য্য পাহাড়ে ধর্ম্মচক্র সমন্বিত দণ্ডায়মান বুদ্ধমূর্ত্তি প্রস্তর গাত্রে খোদিত আছে। বর্ত্তমান কামরূপ জেলার গৌহাটীর উত্তরে রঙ্গিয়া রেল জংশনের সন্নিকটে উদীয়ানা নামক একটী গ্রাম আছে। উহা হাজো মন্দির ও বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বী ভুটীয়াদের প্রাচীন দুর্গ দেওয়ান গিরি হইতে বেশী দূর নয়। হাজোর সন্নিকটে বুদ্ধদেব মহাপরিনির্ব্বাণ লাভ করিয়াছিলেন বলিয়া ভুটীয়া ও তিব্বতীদের মধ্যে প্রগাঢ় বিশ্বাস অদ্যাপিও আছে! বাডেল সাহেব এই সম্বন্ধে বিস্তৃত বিবরণ তাঁহার গ্রন্থে লিখিয়া গিয়াছেন। গৌহাটী হইতে ৯৫ মাইল পূর্ব্বে নগাওঁ জিলায় লঙ্কা নামক একটী মৌজা[৪৪]ও একটী রেলষ্টেশন আছে। লঙ্কা অঞ্চলে অসংখ্য বৃহদায়তন প্রাচীন পুষ্করিণীর অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। লঙ্কার সন্নিকটে হোজাই নামক আর একটী স্থানে (রেলষ্টেশন ও আছে) প্রাচীনকালের দশম একাদশ শতিকার প্রস্তরনির্ম্মিত অসংখ্য মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গিয়াছে। হোজাইর নিকটে যোগিজান নামক স্থানে বৃহদাকার প্রস্তর মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দুইটী বৃহদাকার কৃষ্ণ প্রস্তর নির্ম্মিত শিবলিঙ্গ অদ্যাপি যোনিপীঠ সহিত দণ্ডায়মান আছে।[৪৫] যোগিজানের সন্নিকটে ন-ভাঙ্গা নামক স্থানে একটী চামুণ্ডার মূর্ত্তি অদ্যাপিও ভগ্নাবস্থায় আছে। মূর্ত্তিটী একাদশ দ্বাদশ খ্রীষ্টাব্দে নির্ম্মিত[৪৬]। লঙ্কা অঞ্চল একবার জয়ন্তিয়াদের অধীনে ছিল। লঙ্কা হইতে খারিখানা মাত্র চারি মাইল দূরে কপিলী নদীর পারে অবস্থিত। খারিখানা হইতে পানিমূর হইয়া জয়ন্তিয়া যাওয়ার রাস্তা অদ্যাপিও আছে, এবং ব্যবসায়ীরা সেই রাস্তা ব্যবহার করে।

 অধ্যাপক জেকবি সাহেব (Jacobi) এই লঙ্কাকেই বৌদ্ধ তাত্রিক যুগের লঙ্কাপুরী বলিয়াই স্থির করিয়াছেন। লঙ্কার সন্নিকটে ছিল জ্বাহর দেশ। বাডেল সাহেব লাহোরকে জ্বাহর বলিয়া মনে করেন, রাজরত্ন ডক্টর বিনয়তোষ ভট্টাচার্য্য মহোদয় তাঁহার সম্পাদিত সাধন মালার ভূমিকায় ঢাকার সাভারকে জ্বাহর বলিয়া স্থির করিয়াছেন। কিন্তু তিনিই লিখিয়াছেন লঙ্কাপুরী আসামের লঙ্কা হইলে ওড্ডিয়ান ও ইহারই সন্নিকটে কোথাও হইবে। জয়ন্তিয়া বর্ত্তমানে ও একজন রাজার অধীন এবং খাসিয়াপাহাড়ের স্থানে স্থানে পূর্ব্বের সামন্ত রাজারা এক একটী ছোট ছোট রাজ্যে রাজত্ব করেন। চেরাপুঞ্জীর সন্নিকটে ছাবর (বা সাবার) পুঞ্জী নামক একটী ছোট রাজ্য আছে। সেখানে শিবটিলা নামক একটী পাহাড় ও আছে।

 লঙ্কার সন্নিকটস্থ হোজাইকে স্থানীয় লোকে ওজ্জাই, ওজাই বা উজাই বলে। হোজাই লঙ্কা ডরকা যমুনামুখ, বকুলিয়া প্রভৃতি স্থান কপিলীও যমুনা উপত্যকার মধ্যে পারিপার্শ্বিক স্থান, এবং ঐ সমস্ত স্থানে প্রাচীন কালের অসংখ্য ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হইয়াছে। প্রতি ক্রোশের মধ্যে অন্ততঃ একটী মন্দির, ও চারিটী বৃহৎ পুষ্করিণীর ধ্বংসাবশেষ দেখিতে পাওয়া যায়। এককালে এই অঞ্চল সুসভ্য জনপদে পূর্ণ ছিল এবং চৌরাশী সিদ্ধার ইতিহাসোল্লিখিত পাঁচলক্ষ নগর পূর্ণ দেশ এতদঞ্চলেই ছিল বলিয়া অনুমান হয়।

 ডবকা নগাওঁ সহর হইতে ২৪ মাইল দক্ষিণ পূর্ব্বে যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত। সম্রাট সমুদ্র গুপ্তের চতুর্থ শতাব্দীর এলাহাবাদ স্তম্ভে সমতট, ডবাক, কামরূপ, নেপাল কর্ত্তৃপুর রাজ্য সমূহের উল্লেখ আছে। খ্রীষ্টাব্দের পঞ্চম শতিকায় ও কপিলী উপত্যকা রাজ্যের চন্দ্রপ্রিয় বা চন্দ্র বল্লভ (Yue-Aimoon loved) নামক একজন রাজা চীনদেশে দূত পাঠাইয়াছিলেন। ডবকা হইতে ১৮ মাইল উত্তর পূর্ব্বে বড়গঙ্গা নামক স্থানে ২৩৪ গুপ্তাদের (৫৫৪ খ্রীষ্টাব্দ) খোদিত কামরূপের রাজা মহাভূতি বর্ম্মার একখানি প্রস্তর লিপি পাওয়া গিয়াছে।[৪৭] এইসব কারণ হইতে বর্ত্তমান ডবকাকে প্রাচীন যুগের ডবাক রাজ্য বলিয়া স্থির করা হইয়াছে।[৪৮]

 পরবর্ত্তীকালেও স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্যের রাজার পূর্ব্বপুরুষেরা কপিলী নদীর পারে রাজত্ব করিতেন। হেড়ম্বরাজের সহিত যুদ্ধে পরাস্ত হইয়া ত্রিপুর রাজ দাক্ষিণ দক্ষিণ দিকে বরাক নদীর উপত্যকায় চলিয়া যান[৪৯]। ত্রিপুরার রাজাকে কুকিরা সার্ব্বভৌম বলিয়া স্বাকার করে।

 ডবকা অঞ্চলে মহামায়া পর্ব্বতে কামাখ্যা দেবীর মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আছে; ফুলনি নামক স্থানে অসংখ্য পুষ্করিণী ও মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখিতে পাওয়া যায়। ডবকার নিকটে কমলা দেবী পর্ব্বতের পূর্ব্বাংশে হেরুক নামক শিবলিঙ্গ আছে বলিয়া কালিকাপুরাণে উল্লিখিত আছে। ইহারই সন্নিকটে পর্ব্বতের অপরপার্শ্বে চম্পানালা বা চম্পা নগর নামক একটী স্থান আছে। সেখানে হংসধ্বজ রাজার নগর ছিল বলিয়া প্রবাদ আছে; এবং জিয়াজুরি চা বাগানে প্রাচীন নগর ও পুষ্করিণীর ধ্বংসাবশেষ ও নবম দশম শতিকার ভাস্কর্য্যের নিদর্শন দেখিতে পাওয়া যায়।

 এইসব হইতে মনে হয় বর্ত্তমান হোজাই বৌদ্ধতান্ত্রিকদের উড্ডিয়ান বা ওড্ডিয়ান।[৫০]

 কৌলজ্ঞান নির্ণয়ে মহামায়াইপাদ, চম্পাইপাদ, পুলিন্দাইপাদ হিড়িম্বাইপাদ প্রভৃতি পীঠমহাপুরুষের নাম আছে।[৫১] যদি স্থানের নাম হইতে মহাপুরুষদের নামকরণ করা হইয়া থাকে, তাহা হইলে মনে হয়, সেই সময় মহামায়া, চম্পানালা, ফুলনি, হিড়িম্বা (ডিমাপুর) বৌদ্ধতান্ত্রিকদের এক একটী কেন্দ্র ছিল।

 নগাঁও জেলার অধিকাংশ এক সময়ে জয়ন্তিয়াদের অধীনে ছিল। প্রাচীনকালে জয়ন্তিয়ারা ব্রাহ্মণ নরপতি কেদারেশ্বর রায়, ধনেশ্বর রায়, প্রভৃতির অধীনে কপিলী যমুনা উপত্যকার উর্ব্বরা ভূমির একাংশে বাস করিত। মার্কণ্ডেয়পুরাণে লিখিত আছে যে স্বরূচিঃ ইন্দীবর বিদ্যাধরের কন্যা মনোরমার গর্ভে জাত পুত্র বিজয়কে “পূর্ব্বদিকে কামরূপে পর্ব্বতের উপরিভাগে নির্ম্মিত বিজয় নামক শ্রেষ্ঠপুর প্রদান করেন।”[৫২] কেহ কেহ মনে করেন যে এই বিজয়পুরই পরবর্ত্তীকালে জয়ন্তিয়া নামে পরিচিত হয়।

 জয়ন্তিয়ারা হিন্দুভাবাপন্ন; তাহারা আদিতে হিন্দু ছিল, কিন্তু মন্‌খমের জাতীয় খাসিয়াদের সংস্পর্শেও অধীনে থাকার জন্য তাহাদের আচার ব্যবহার খাসিয়াদের মত হইয়া পড়ে। তাহারা স্ত্রী স্বাধীন জাতি; উত্তরাধিকারী সূত্রে মেয়েরাই পিতৃসম্পত্তির অধিকারিণী। প্রবাদ আছে যে জয়ন্তরায়ের মৃত্যুর পর তদীয় একমাত্র কন্যা জয়ন্তী আরাধ্যা দেবী চণ্ডীর আদেশে সিংহাসনের অধিকারিণী হন এবং তদবধি দেশের নাম জয়ন্তিয়া হয়।

 মাসিক অশৌচের সময় নদীতে স্নান করিবার কালে জয়ন্তীর ছায়া হইতে এক কন্যারত্ন উৎপন্ন হয় এবং এক রাঘব মৎস্য তৎক্ষণাৎ সেই কন্যাকে ভক্ষণ করে। পরে লাণ্ঢাবর নামক এক বীর যুবক সেই রাঘব মৎস্যকে দৈবাৎ ধরিয়া উহার উদর হইতে কন্যাকে উদ্ধার করে এবং মৎস্যোদরী নাম দিয়া তাহাকে বিবাহ করে। মৎস্যোদরীও লাণ্ঢাবরের পুত্র পরে জয়ন্তিয়ার অধীশ্বর হয়।[৫৩]

 এই প্রবাদের সহিত নাথসিদ্ধা মৎস্যেন্দ্রনাথ বা মীননাথের জন্মপ্রবাদের অনেকটা সাদৃশ্য আছে। গণ্ডযোগে জাত ব্রাহ্মণ কুমারকে পিতামাতার মঙ্গলের জন্য সমুদ্রে বিসর্জ্জন করা হয়; রাঘবমৎস্য সেই শিশুকে উদরসাৎ করে। পরে ক্ষীরোদ সাগরের টঙ্গীতে রাঘবের উদর হইতে উদ্ধার করিয়া হরপার্ব্বতী সেই শিশুকে যোগধর্ম্ম শিক্ষা দেন। পরিণত বয়সে সেই বালকই মৎস্যেন্দ্র নাথ নামে ভুবনবিজয়ী সিদ্ধা বলিয়া পরিচিত হন।[৫৪]

 বৌদ্ধতান্ত্রিক শাস্ত্র কৌলজ্ঞান নির্ণয় মৎস্যের উদর হইতে বাহির করা হইয়াছে এবং ইহা কলিকালে মৎস্যোদর শাস্ত্র বলিয়া খ্যাত।[৫৫]

 সুতরাং মনে হইতেছে এই তিনটী প্রবাদের মধ্যে একটী সামঞ্জস্য রহিয়াছে এবং একের প্রভাব অন্যের উপর পড়িয়া স্থান কাল পাত্রভেদে নিজর স্বরূপ গ্রহণ করিয়াছে। মনে হয়, জয়ন্তিয়ারা পূর্ব্বে নগাঁও জিলার লঙ্কা হোজাই ডবকা অঞ্চলে রাজত্ব করিত, কিন্তু পরে ঐ অঞ্চল হইতে প্রবল রাজশক্তি কর্ত্তৃক বিতাড়িত হইয়া পার্ব্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করে, এবং সমতল ভূমির তীর্থস্থান উড্ডিয়ানের স্মৃতি সঙ্গে করিয়া লইয়া যায়। প্রবাদ আছে যে বর্ত্তমান বাউরভাগে দেবীর বামজঙ্ঘার প্রতীক প্রস্তর খণ্ড আবিষ্কৃত হইলে তাৎকালীন জয়ন্তিয়া রাজ বড়গোঁসাই (১৫৪৮-১৫৬৪ খৃঃ) আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া বলিয়াছিলেন “আমাদের পরিবারে যে দেবতার প্রবাদের কথা শুনিতাম আজ সৌভাগ্যক্রমে এতদিন পরে তাঁহাকে পাওয়া গেল।”[৫৬]

কমলাদেবী পাহাড়

 পূর্ব্বে বলা হইয়াছে ডবকা একটী প্রাচীন স্থান। কালিকা পুরাণে ইহার নাম ক্ষোভকা লিখা হইয়াছে।[৫৭] আহোম রাজার ইতিহাসে অনেক স্থলে ডাউকা[৫৮] লিখা হইয়াছে। ডবকা হইতে লঙ্কা প্রায় ২১ মাইল দক্ষিণ পূর্ব্বে, হোজাই ৯ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে, বকুলিয়া লঙ্কার ২১ মাইল পূর্ব্বে।

 গোরক্ষবিজয়ে লেখা আছে যে কাণফা সিদ্ধা ‘ডাহুকা’তে এক বহরীর গৃহে আশ্রয় নিয়াছিলেন। গোরক্ষবিজয় সম্পাদক মুন্‌সী আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ এই ডাহুকাকে (পাঠান্তর ডাহুরা বা ডউকা) ডবাক মনে করিয়া ‘ঢাকা’ বলিয়া সিদ্ধান্ত করিয়াছেন, এবং ‘বহরী’কে চট্টগ্রামের চলিত ভাষায় ‘বধিরা’ ধরিয়া সিদ্ধান্ত করিতে চাহিয়াছেন যে কানফা ঢাকার এক বধিরা স্ত্রীলোকের গৃহে আশ্রয় নিয়াছিলেন।[৫৯]

 আসামের কামরূপ নগাঁও অঞ্চলে পোহরী (পহারী. বহারী) শব্দে মস্তকে বোঝা লইয়া ফেরী করা স্ত্রীলোককে বুঝায়। ডবকা প্রাচীন ডবাক রাজ্যেরই বর্ত্তমান নাম। কাজেই মনে হয় কানফা ডবকাতে একজন ফেরীওয়ালীর ঘরে আশ্রয় নিয়াছিলেন।

 ডবকা হইতে বকুলিয়ায় যাওয়ার অন্য একটী রাস্তাও আছে। ডবকা হইতে মহামায়া, ফুলনি, তারাবাসা হইয়া প্রাচীন কালের প্রশস্ত রাজপথ শ্যামাগুড়িরান্তা ধরিয়া সোজাসুজি বকুলিয়ায় পৌঁছা যায়। বকুলিয়ায় প্রশস্ত ও উচ্চ মাটীর প্রাকার বেষ্টিত একটী বৃহদায়তন স্থানকে বৈরাগী নগর বলা হয়। স্থানটী ঘোর অরণ্যময়। ইহারই অল্পদূরে রাজাপাথার, রাজাপুখুরী ইত্যাদি প্রাচীন কালের ধ্বংসাবশেষ পড়িয়া আছে। বকুলিয়া হইতে লঙ্কা ও হোজাই যাইবার প্রাচীন কালের রাজপথ আছে।

 ডবকার সন্নিকটে, নগাওঁ সহর হইতে ১১ মাইল দক্ষিণ পূর্ব্বে কন্দলী নামে একটী মৌজা আছে। সেই মৌজার স্থানে স্থানে প্রাচীন মন্দিরের নিদর্শন এবং ভগ্ন হরপার্ব্বতীর মূর্ত্তি ও শিবলিঙ্গ পাওয়া গিয়াছে। ডবকা ও কন্দলীর মধ্যবর্ত্তী স্থানে ২৫৪৬ ফিট উচ্চ কমলাদেবীর পর্ব্বত আছে। এই পর্ব্বতের উপর প্রাচীন মন্দির ও পুস্করিণীর ধ্বংসাবশেষ আছে। স্থানীয় লোকে এখনও ভক্তিবিমিশ্রিত ভীতির সহিত সেই পর্ব্বতের উদ্দেশ্যে প্রণাম করিয়া থাকে। কালিকাপুরাণে এই কমলাদেবীর স্থানকে রক্তদেবীর পীঠ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে, এবং এই পর্ব্বতের দক্ষিণ পূর্ব্বে আর একটী পর্ব্বতে হেরুক নামে শিবলিঙ্গ আছে বলিয়া উল্লিখিত আছে।[৬০] এই পর্ব্বত বর্ত্তমানে লিঙ্গখোয়া পর্ব্বত নামে পরিচিত।  কন্দলী চা বাগানের তিন মাইল ঈশানকোণে পাহাড়ের উপর বাদুলীকুরুং নামে একটি গুহা আছে। সরকারী কঠিয়াতলী—আমলকী সদর রাস্তা হইতে প্রায় দেড়মাইল পাহাড়ের উপর যাইতে হয়। বৃহৎ শিলাময় পর্ব্বতের নিম্নদেশে পর্ব্বতের ভিতরে এক প্রশন্ত গহ্বর আছে। সম্মুখে বৃহৎ বৃহৎ প্রস্তর যেন প্রাচীর স্বরূপে রক্ষিত হইয়াছে। এই প্রাচীর বাহিয়া ভিতরে প্রবেশ করিলে, নীচের গহ্বরের দ্বারদেশ দেখা যায়। গহ্বরের দুইটীদ্বার; ভিতর অতি প্রশস্ত কিন্তু ঘোর অন্ধকারময়। এই গুহার ভিতর লক্ষ লক্ষ বাদুড়ের বাস। মানুষের আগমনের শব্দে ইহারা এমনই এক তুমুল আলোড়ন করে যে মনে হয় যেন ভূমিকম্পে সমগ্র পর্ব্বত কম্পিত হইতেছে। পার্শ্ববর্ত্তী অধিবাসীরা গুহাটীকে দেবতার স্থান বলিয়াই সম্মান করে এবং এই বাদুড়গুলি কমলাদেবীর আশ্রিত অনুচর বলিয়া বিশ্বাস করে।

 কন্দলী পর্ব্বতের অপর অংশের নাম বামুনী পর্ব্বত। এই পর্ব্বতে স্থানে স্থানে জলপ্রপাত গুহাও প্রাচীন মন্দিরাদির ধ্বংসাবশেষ আছে। বাদুলী কুরুংয়ের আঠমাইল উত্তরে প্রাচীন কালের ধ্বংসাবশেষ পূর্ণ চম্পানালা পাহাড়ে হংসধ্বজ রাজার নগর ছিল বলিয়া প্রবাদ আছে।

 কন্দলী ও বামুনী পাহাড়ের পারিপার্শ্বিক মিকির পাহাড়ে এখনও পর্য্যাপ্ত অগুরু চন্দন পাওয়া যায় এবং মহলদারেরা এখনও উহা দেশ বিদেশে রপ্তানী করিয়া থাকে। পার্ব্বত্য লোকের নিকট হইতে এখনও অনেক সময় “চারিকড়ায়” “একতোলা” চন্দন কাষ্ঠ পাওয়া অসম্ভব নয়।

 কন্দলী মৌজার সন্নিকটবর্ত্তী ননই, দীঘলদরি, পেটভরা প্রভৃতি স্থানে বর্ত্তমানে ও হাজার হাজার নাথ যোগীর বাস। তাহারা বর্ত্তমানেও “পার্টের পাছড়া” প্রস্তুত করিতে সিদ্ধহস্ত, এবং তাহাদের মেয়েরা এখনও পাটের “চিকণ সূতি” কাটিয়া বেশ দুপয়সা রোজগার করে। পাটের সূতার পোকার চাষ এই জাতীয় লোক ভিন্ন অন্য কেহ করিতে জানে না।[৬১] পুরুষেরা বর্ত্তমানে অধিকাংশই বৈষ্ণব ধর্ম্মাবলম্বী ও কৃষিকর্ম্মপরায়ণ; এখন কৌলধর্ম্মের চক্রে তাহারা সাধারণতঃ বসেনা, এবং সমাজে মদের ঘটী আগে পাইবার আকাঙ্ক্ষা এখন কাহারও নাই।

 চতুর্দ্দশ পঞ্চদশ শতাব্দীতেও কন্দলীর বিশিষ্ট অধিবাসীদের পদবী “কন্দলী” ছিল। অনন্ত কন্দলীর মহাভারত ও ভাগবতের অনুবাদ সুপরিচিত: মাধব কন্দলীর সপ্তকাণ্ড রামায়ণের অনুবাদ অসমীয়া ভাষার অমূল্য সম্পদ। কন্দলী মৌজায় এখনও মাধব কন্দলীর বাড়ী আছে।

 নগাঁওবাসীরা একটু অনুনাসিকত্বপ্রিয়, তাহারা বদুলা আতা নামক বৈষ্ণব গুরুকে “বন্দুলা আতা” বলে বাদুলীকে (বাদুড়) বান্দুলী বলে। তাহাদের নিকট প্রাচীন কদলী কন্দলী হইয়া গিয়াছে।

 সুতরাং দেখা যাইতেছে নগাঁও জেলার কন্দলীই প্রাচীন কদলী রাজ্য, এবং কমলাদেবী পর্ব্বতেই কদলী রাণী কমলার নগর ছিল। কন্দলী পর্ব্বতের বাদুলীকুরুংয়ের বাদুড় হইতেই কমলা দেবীর ষোলশত সঙ্গিনীর বাদুড় হওয়ার কল্পনা করা হইয়াছে। ডবকা প্রাচীন ডাহুকা এবং বকুলিয়া প্রাচীন বকুলতলা বলিয়া অনুমিত হয়।

 গোয়ালপাড়া জেলায় রংজুলির নিকট গোরক্ষনাথের পর্ব্বত আছে; যোগি-গুম্ফায় বৌদ্ধভিক্ষুদের গুহা আছে। গোয়াল পাড়ায় কোচবংশীয় রাজার বিজনা রাজ্য বর্ত্তমানে ও আছে। রাজধানী অভয়াপুরী। যোগি গুম্ফা আদি বৌদ্ধকীর্ত্তি বিজনী রাজ্যের অন্তর্গত। সেই অঞ্চলেই পূর্ব্বে বিজয় নগর ছিল, এবং গোরক্ষনাথ বিজয় নগরে থাকিতেন। গুরু মীন নাথকে অনুসন্ধান করিতে করিতে গোরক্ষনাথ “বিজয় নগর ছাড়ি বকুলেত য়াইলা।” গোরক্ষনাথ কামরূপ হইতে পাটন গিয়াছিলেন এবং সেখান হইতে লঙ্কাপুরী গিয়াছিলেন। গৌহাটীর পূর্ব্ব দিকে ২০ মাইল দূরে ক্ষেত্রি রেলষ্টেশনের নিকট পাটান নামক একটী গ্রাম আছে। ইহা মায়ংএর সন্নিকটে।[৬২]

মৎস্যেন্দ্রনাথের পতন

 এখন প্রশ্ন হইতেছে, কোন মৎস্যেন্দ্রনাথ নগাঁও জেলার কন্দলীর নিকটস্থ কমলাদেবী পর্ব্বতের রাণী কমলার প্রেমে মুগ্ধ হইয়াছিলেন? আমরা প্রমাণ করিতে চেষ্টা করিয়াছি যে নাথধর্ম্মের প্রবর্ত্তক আদি মৎস্যেন্দ্র নাথ ও বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্ম্মের প্রবর্ত্তক মৎস্যেন্দ্রনাথ ওরফে লুইপাদ দুইজন পৃথক ব্যক্তি। নাথ সিদ্ধা মৎস্যেন্দ্রনাথ নারীর মায়া পাশে বদ্ধ হইয়াছিলেন এই প্রবাদ নাথ সম্প্রদায়ের সন্নাসীদের মধ্যেও প্রচলিত আছে। বাবা সুন্দর নাথ লেখককে এই প্রবাদের কথা বলিয়াছেন:— কামরূপের একজন রাণী সামলযোগী নামক একজন তান্ত্রিক সিদ্ধার শিষ্যা ছিলেন; তিনি মায়া দ্বারা মৎস্যেন্দ্র নাথকে মোহিত করিয়া রাখেন। রাণী ও মৎস্যেন্দ্র নাথের সংযোগে পার্শ্বনাথ ও নেম নাথ নামে দুটী সন্তান জন্মে। গোরক্ষনাথ এই সন্তান দুটীকে লালন পালন করিয়াছিলেন, কিন্তু বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে তাহারা গোরক্ষনাথের সহিত বিবাদ করিয়া অন্যত্র চলিয়া যায়।[৬৩] মাধবাচার্য্যের বহুপূর্ব্বে মৎস্যেন্দ্র নাথ কোন ও মৃত রাজার দেহে প্রবেশ করিয়া রাজার একশত যুবতী স্ত্রীর সহিত রঙ্গরসে মত্ত হইয়াছিলেন।[৬৪] লালদাস বাবাজীর ভক্তমাল গ্রন্থে মীন নাথ কোন ও অবৈষ্ণব রাজার সহিত সখ্য করিয়া পাশাখেলায় মত্ত হইয়া পড়েন, এবং পরে রাজার কন্যার পাণি গ্রহণ করিয়া রাজার মৃত্যুর পর রাজসিংহাসনের অধিকারী হন।[৬৫] গোরক্ষবিজয়াদি গীতিকাব্য মতে পার্ব্বতার চক্রান্তে কদলী দেশ ভ্রমণে আসিয়া মীননাথ নারীর প্রেমে বদ্ধ হন।

 লুইপাদ-মৎস্যেন্দ্রনাথের আদি বাসস্থান ছিল নগাঁও জেলার হোজাই অঞ্চলে; কদলী রাজ্যও নগাঁও জেলায় অবস্থিত। কাজেই পরবর্ত্তীকালে প্রবাদ নূতন রূপ ধারণ করিয়াছে। ভক্তের স্থান পরিবর্ত্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেবতা ও তীর্থস্থান গুলি প্রবাদ সহ স্থান পরিবর্ত্তন করে, এবং নূতন স্থানের আবহাওয়ার সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া নূতন রূপ ধারণ করে; এরূপ উদাহরণ সর্ব্বত্রই দেখা যায়। সুতরাং মৎস্যেন্দ্রনাথের নারীর মায়াপাশে বদ্ধ হওয়ার কাহিনী যুগে যুগে নানাস্থানে নানা ভাবে আরোপিত হইয়া নব নব রূপ ধারণ করিয়াছে। এবং শেষপর্যান্ত নাথপন্থের মৎস্যেন্দ্রনাথের কাহিনী লুইপাদ মৎস্যেন্দ্রনাথে আরোপিত হইয়াছে; এবং এই জন্য নাথপন্থভ্রষ্ট যে সকল যোগীরা নব গোরক্ষনাথের দলভুক্ত হইয়াছিলেন, তাঁহারাই দায়ী। নাথপন্থের গোরক্ষনাথ গোপীচাঁদকে সন্যাসী করেন নাই, এই কার্য্য নবগোরক্ষনাথ দ্বারা সম্পন্ন হইয়াছিল বলিয়া মনে হয়।

রামপালের সময়

 বঙ্গদেশীয় রাজা তৃতীয় বিগ্রহ পালের (১০৪৫-১০৭২) মৃত্যুর পর মহীপাল রাজা হন। সেই সময় দেশে নানাপ্রকার অশান্তির সৃষ্টি হয় এবং কৈবর্ত্ত দিব্বোক বরেন্দ্র অঞ্চলের রাজা হন। দিব্বোকের পর রুঢ়ক এবং তারপর ভীম রাজত্ব করেন। মহীপালের অপর পুত্র রামপাল সৈন্য-সামন্ত সংগ্রহ করিয়া ভীমকে পরাজিত করেন ও হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। এই সময় কামরূপের রাজা ছিলে ধর্ম্মপাল (১০৯০-১১১৫)। ধর্মপাল বৌদ্ধসহজিয়া ধর্ম্মভাবাপন্ন ছিলেন বলিয়া মনে হয়। তাঁহার পুষ্পভদ্রা তাম্রলিপিতে তিনি ভবিষ্যত নৃপতিগণকে সম্বোধন করিয়া বলিতেছেন-—“বিদ্যুচ্ছটার ন্যায় চঞ্চল এই রাজত্বের বৃথাভিমান পরিত্যাজ্য, কিন্তু নিত্যসুখাবহ ধর্ম্ম কখনও ত্যাজ্য নহে।[৬৬]

 ধর্ম্মপালের পরে জয়পাল রাজা হন; এবং সেই সময় রামপালের মায়ন নামক একজন সামন্ত বা সেনাপতি কামরূপ রাজ্য জয় করেন।[৬৭] গৌহাটীর ২১ মাইল পূর্ব্বদক্ষিণে কলঙ্গ ও ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গমস্থলে কাজলীমুখ নামক স্থানে মায়নের নগর ছিল বলিয়া প্রবাদ আছে। সেই স্থান বর্ত্তমানে মায়ং বলিয়া পরিচিত। মায়ং এ অনেক প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ আছে, বিশেষতঃ বুঢ়াবুঢ়ীর (হরপার্ব্বতীর) পাহাড়, গণেশের পাহাড় প্রভৃতি স্থানে অনেক প্রাচীন ভাস্কর্য্যের নিদর্শন আছে। মায়াং যাদুবিদ্যার দেশ বলিয়া প্রসিদ্ধ। মায়ংএর যাদুর কথা শুনিলে আসামের লোকেরাও ভীত হয়। মনে হয় মায়নের সময় বৌদ্ধতান্ত্রিক সাধুরা এই মায়ংএ বসতি করিয়া ইহাকে তাহাদের ধর্ম্মের ও তন্ত্রমন্ত্রের কেন্দ্র করিয়া তুলিয়াছিল।

 মায়ন বেশী দিন কামরূপে রাজত্ব করিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয়না; তিনি ধর্ম্মপালবংশীয় তিঙ্গ্যদেবকে কামরূপের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়া চলিয়া যান। রামপালের পরে কুমার পাল বঙ্গদেশের রাজা হন; তাঁহার সময় তিঙ্গ্যদেব বিদ্রোহী হইয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তখন তিঙ্গ্যদেবকে দমন করিবার জন্য কুমার পালের মন্ত্রী ও সেনাপতি বৈদ্যদেব প্রবল সৈন্য বাহিনী লইয়া আসিয়া তিঙ্গ্যদেবকে অকস্মাৎ আক্রমণ করেন; যুদ্ধে তিঙ্গ্যদেব পরাজিত হন, এবং অসংখ্য কামরূপী সৈন্য নিহত হয়। বৈদ্যদেব কামরূপের শাসনভার গ্রহণ করেন এবং গৌহাটীর সন্নিকটে বেতনা নামক স্থানে একটী নগর স্থাপন করিয়া পরে বঙ্গদেশের রাজার সহিত সমস্ত সম্বন্ধ ছিন্ন করিয়া নিজে স্বাধীন রাজা হইয়া বসেন। ইহা আনুমানিক ১১৩১ খ্রীষ্টাব্দের ঘটনা।

 এই সময় ও বঙ্গদেশ হইতে বৌদ্ধতান্ত্রিক সন্ন্যাসী, ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারী ইত্যাদি দলে দলে এই দেশে যাতায়াত করিতে থাকে এবং কামাখ্যা তীর্থ দর্শনের সঙ্গে সঙ্গে হোজাই ডবকা অঞ্চলের মন্দির ও তীর্থস্থান গু[৬৮] দর্শন করিতে গিয়া কুমলাদেবী পর্ব্বত, কন্দলী, বাদুলীকুরুং প্রভৃতি দর্শন করিয়াছে ও তাহাদের বিষয়ে স্থানীয় প্রবাদ জনশ্রুতি প্রভৃতি শুনিয়াছে ও দেশের অবস্থা পর্য্যবেক্ষণ করিয়াছে।

 বৈদ্যদেব কামরূপের পূর্ব্বাংশ সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করিয়া মাত্র পশ্চিমাঞ্চল লইয়া সন্তুষ্ট থাকেন এবং ক্রমে ইহাই কমতা রাজ্যে পরিণত হয়। কমতারাজ্যের রাজধানী রংপুরেই এই সব গীতিকাব্যের প্রচলন বেশী হয়।

কামরূপীয় গীতিকা

 এখন প্রশ্ন করা যাইতে পারে যদি কামরূপেই এই সব ঘটনা ঘটিয়াছিল এবং কামরূপের নগাঁও জেলাতেই ঘটনা সংশ্লিষ্ট স্থানগুলি ছিল, তাহা হইলে কামরূপে ঐ সম্বন্ধে কোনও প্রবাদ বা গীতিকাব্য আছে কিনা:

 কামরূপে ময়নামতী ও গোপীচাঁদের কাহিনী প্রচলিত আছে। কামরূপের রাজা ধর্ম্মপাল ময়নামতীর জ্যেষ্ঠা ভগিনী বনমালীকে বিবাহ করিয়াছিলেন। ময়নামতীর স্বামী মাণিকচন্দ্রের রাজধানী ছিল কমতাপুরে। গোপীচাঁদকে নাবালক অবস্থায় রাখিয়া মাণিকচন্দ্র স্বর্গী হন; ধর্ম্মপাল কমতাপুর নিজ রাজ্য ভুক্ত করিতে প্রয়াস পান, ফলে ময়নামতীর সঙ্গে তিস্তা নদীর পারে যুদ্ধ হয় এবং যুদ্ধে ধর্ম্মপাল পরাজিত হইয়া মনের দুঃখে সন্ন্যাসী হইয়া চলিয়া যান।[৬৯]

 জনাগাভকর গীত নামক আর একখানা গীতিকাব্যে[৭০] লিখিত আছে যে নগাঁও জেলার কামপুরের সন্নিকটে কপিলী নদীর দক্ষিণপারে গরুবাট নামক একটী রাজ্য ছিল। এখনও সেই অঞ্চল গরুবাট মৌজা নামে পরিচিত। গরুবাটের বৃদ্ধরাজার কন্যা জনা গরুবাটের অধীনে আর একটী ছোট নগরে নিজে স্বাধীনভাবে থাকিত। নগাঁওতে গোপীচাঁদ নামক একজন রাজকুমার ছিলেন, তাঁহার বিধবামাতা গৌহাটী সহরে থাকিতেন। তাঁহার ‘নয়পণ’ মহিষী থাকা সত্ত্বেও বিধবা মাতার বাধা না মানিয়া গোপীচাঁদ গরুবাটের রাজাকে যুদ্ধে পরাজিত করিয়া, জনাকে লাভ করেন।

 পরবর্ত্তীকালে আসামদেশ পূর্ব্বদিকের আহোম, চুটিয়া কাছারী প্রভৃতি জাতির শাসনাধীন হইয়া পড়ে। এই সময় দেশের প্রাচীন কৃষ্টির স্রোত কয়েক শতাব্দী ধরিয়া সম্পূর্ণ না হইলেও প্রায় বন্ধ হইয়া যায়, এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন ধর্ম্ম, সাহিত্য আদি বিষয়ে এক বিশৃঙ্খলা আসিয়া উপস্থিত হয়। রংপুর কোচবিহার ও ত্রিপুরা অঞ্চলে এই দেশের অসংখ্যলোক গিয়া বসবাস করে এবং এই দেশের প্রাচীন কালের কাহিনী ও স্থান গুলির নাম গ্রাম্য কবিরা গীতিকাব্যগুলিতে সজীব করিয়া রাখে। বঙ্গদেশ ও বিজাতীয় রাজাদের করতলগত হইয়াছিল সত্য, কিন্তু প্রাচীন রাজবংশীয় রাজপুরুষেরা স্থানে স্থানে সামন্ত রাজারূপে রাজত্ব করিয়াছিলেন, এবং তাঁহারাই বঙ্গদেশে সাহিত্য ও কৃষ্টি কিয়ৎ পরিমাণে সজীব রাখিয়াছিলেন। আসাম দেশে সেই সুবিধা ছিলনা; আহোম নৃপতিদের অধীনে প্রাচীন রাজবংশীয় কোনও সামন্ত রাজা ছিলেন না, কাজেই প্রাচীন সাহিত্য ও কৃষ্টি বজায় রাখিবার পক্ষে নানারূপ অন্তরায় আসিয়া উপস্থিত হয়। প্রাচীন কালে খ্রীষ্টাব্দের সপ্তম হইতে নবম শতাব্দী পর্যন্ত বঙ্গের কিয়দংশ প্রাচীন কামরূপের অন্তর্ভুক্ত ছিল, সেই জন্যই আসামের রাজনৈতিক বিপর্য্যয়ের সময় পশ্চিমে, অপেক্ষাকৃত নিরাপদ অঞ্চলে জাতীয় ইতিহাসের সামগ্রীগুলি গীতিকাব্যাকারে রক্ষিত হইবার সুবিধা পাইয়াছিল।

সমাপ্ত।

  1. অসমীয়া ভাষায়—ভাওনা-যাত্রাগান; ভাও-যাত্রাগানের পাঠ; ভাওরীয়া ঐ পাঠকারী।
  2. পাছড়া আজকাল ও পরিধানের কাপড় অর্থে অসমীয়া ভাষায় প্রচলিত।
  3. ঢাকা সাহিত্য পরিষদ প্রকাশিত “ময়নামতীর গান-১২২ পৃঃ পাদটীকা (৩)।”
  4. Les chantes Mystiques—Page 27.
  5. Social Life in ancient India—Studies in Vatsyana’s Kamasutra—Pages 59-60.
  6. Journal of the Royal Asiatic Society Bengal—1898, pt I Page 20—Rai Bahadur S. C. Das’s Notes on Antiquities of Chittagong compiled from PagsamJon Jhan of Sumpakhan po and Kahbab Dundan of Lama Tara Natha.
  7. গোপীচাঁদের সন্ন্যাস—১৪ পুঃ।
  8. গোরক্ষবিজয়— ৩৯পৃঃ
  9. Early History of Kamarupa by K L. Barua page 147.
  10. J.A.S.B. 1898 pt 1 page 20.
  11. Ancient Indian Tribes by Dr. B. C. Law page. 7
  12. Indian Histotical Quarterly. Vol.xvi. No3. pp 635-636. sept 1940
  13. J. R. A, S. B pt 1. 1898. P 20.
  14. কামরূপ শাসনাবলী-—(৺পদ্মনাথ বিদ্যাবিনোদ) ১২৬ পূঃ
  15. He is generally credited with having traversed most of the county between lower Assam and Tibet —Waddel's Lamaism (journal of the Assam Research society. Vol 11, 1934. No 2, p 43)
  16. J.R.A.S.B. p1898 Pt I 20 বৌদ্ধগান ও দোহা ভূমিকা ১৬ পৃঃ
  17. ‘কৌলজ্ঞান নির্ণয়’ ডক্টর শ্রীযুত প্রবোধচন্দ্র বাগচী কর্ত্তৃক সম্পাদিত হইয়া Calcutta Sanskrit series রূপে ১৯৩৪ ইং তে প্রকাশিত হইয়াছে। তাহার ভূমিকায় (৬৪-৭৫ পৃঃ) গোরক্ষ সহস্রনাম স্তোত্র ও গোরক্ষ সংহিতার কিছু অংশ উদ্ধৃত করিয়া দেওয়া হইয়াছে। নাথ সম্প্রদায়ের গোরক্ষ সহস্র নাম স্তোত্র, গোরক্ষ নাথাষ্টক স্তোত্র ৺বিষ্ণু চরণ নাথ কৃত মুক্তাশ্রম গ্রন্থে (২৪-৩৪ পৃঃ দেওয়া আছে) নাথ সম্প্রদায়ের গোরক্ষ সংহিতা প্রসন্ন কুমার কবিরত্ন কর্ত্তৃক সঙ্কলিত ও অনূদিত হইয়াছে। সহজিয়া গোরক্ষসংহিতা দেবীশ্বরসংবাদ আকারে লিখিত; নাথ পন্থের গোরক্ষসংহিতা সূত্র আকারে লিখিত। সহজিয়া সংহিতায় প্রথম খণ্ডে সৃষ্টিবিধি, ও তৃতীয় খণ্ডে মহানন্দ সম্বন্ধে লিখিত হইয়াছে; নাথ সংহিতায় প্রথম খণ্ডে যোগাঙ্গ ও তৃতীয় খণ্ডে ধ্যান ধারণা সম্বন্ধে লিখিত হইয়াছে। ডক্টর শ্রীযুত প্রবোধচন্দ্র বাগচীমহাশর প্রসন্ন কবিরত্নের বহিখানা খুঁজিয়া পান নাই, সেইজন্য সহজিয়া গোরক্ষ সংহিতাকে নাথ গোরক্ষসংহিতা বলিরা ভ্রম করিরাছেন (কৌলজ্ঞান নির্ণয় ৬৪ পৃঃ পাটীকা)
  18. প্রসন্নকুমার কবিরত্ন সম্পাদিত—গোরক্ষ সংহিতা ৫,২০৫।
  19. ইহাকে অকথাদি মণ্ডল, হলক্ষ মণ্ডল, ত্রিবেণীর ঘাট বলা হয়।
  20. কালীপ্রসন্নবিদ্যারত্ন সম্পাদিত ‘ঘেণ্ডসংহিতা ৬ষ্ঠ উপদেশ’—১০-১৪
  21. ব্রজেন্দ্রকুমার বিদ্যারত্ন সম্পাদিত হঠ প্রদীপিকা ৪র্থ উপদেশ ১০০-১০২
  22. বৌদ্ধগাণও দোহা—১৫ পৃঃ

    “জাহি মন পবণ ন সঞ্চরই
    রবি শশি নাহি পবেশ।
    তহি বট চীঅ বিসামকর
    সরহে কহি উববেস।”

  23. “অলি এঁ কালি এঁ বাটকন্ধেলা
    তা দেখি কাহ্নু বিমন ভইলা॥ ”

  24. “আত্মেতি পরমাত্মেতি জীবাত্মেতি বিচারতঃ।
    ত্রয়াণামেক সংভূতিরাদেশঃ পরিকীর্ত্তিত।”—গোরক্ষনাথ সিদ্ধসিদ্ধান্ত পদ্ধতি

  25. ৺বিষ্ণুচরণ নাথ কৃত মুক্তাশ্রম ৪০-৪১ পৃঃ (বর্দ্ধমান ১৯০৪ সাল)
  26. “রোগী চেন্নৈব ভোগীস্যাৎ, ভোগীচেন্নৈব যোগবিৎ। ভোগো যোগাত্মকং কৌলং তস্মাৎ সর্ব্বাধিকঃ প্রিয়ে॥”—কুলার্ণবম্, ২য় অধ্যায়
  27. কুলার্ণবর, (নবম অধ্যায়) “শ্রীনাথ, দেব, স্বামীতি বিবাদে সাধনে বদে‍ৎ” এবং সচ্চিদানন্দ সরস্বতী প্রণীত “গুরু প্রদীপ, ৭৩ পৃঃ।
  28. বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎপত্রিকা—৪৭শ বর্ষ ৪র্থসংখ্যা—১৩৪৭ বঙ্গাব্দ-৭০ পৃঃ। (তারা প্রসন্ন মুখোপাধ্যায়— দেলপূজার ছড়া প্রবন্ধ)
  29. কৌলজ্ঞান নির্ণয় ১৬শ পটল
  30. Waddel's Lamaism. Page 182.
  31. সাধনমালা (বিনয়তোষভট্টাচার্য্য) দ্বিতীয় ভাগ, ভূমিকা ৩৮ পৃঃ
  32. “প্রথমং পীঠমুৎপন্নং কামাখ্যা নাম সুব্রতে
    ওড্ডিয়ান মহাপীঠমুপপীঠসমন্বিতম্‌।—কৌলজ্ঞাননির্ণয়—অষ্টম পটল—২০-২১

  33. সাধনমালা দ্বিতীয় ভাগ, পূঃ ৪৫৫, সাধন সংখ্যা ২৩৪
  34. কামরূপে ইমং শাস্ত্রং যোগিনীনাং গৃহে গৃহে
    চন্দ্রদ্বীপং মহাশাস্ত্রং অবতীর্ণং সুলোচনে।
    কামাখ্যে গীয়তে নাথে মহামৎস্যোবরস্থিতিঃ॥—২২শ পটল ২০-২২

    শ্রীকামাখ্যা গুহ্যসিদ্ধি নামক আর একখানা পুথিও শ্রীমৎস্যেন্দ্রপাদাবতারিত বলিয়া লেখা হইয়াছে। ইহাতে শ্রীশ্রীকণ্ঠদেব, শ্রীখাগাশনাথ শঙ্করদেব, অনন্তদেব, পিঙ্গলদেব, শ্রীচিঞ্চিনাথ, শ্রীআজ্ঞানাথ প্রভৃতি নামকণের নাম লিখিত আছে।

    — কৌলজ্ঞাননির্ণয় ভূমিকা ৬০ পৃঃ
  35. জনম সাথী ভাই বালাকী— পৃষ্ঠা ৩৩৬
  36. Alamgirnamah page 731. Gait’s History of Assam. page 35.
  37. রামপালের সেনাপতি মায়নের নাম হইতে মায়ং নাম হইয়াছে বলিয়া প্রবাদ আছে। মায়ন কামরূপরাজ বিজয় পালকে পরাজিত করিয়া তিঙ্গালেবকে কামরূপের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়া যান।
  38. Some Ksatriya Tribes of Ancient India (B C Law) The Gandharas page 271. এবং A Guide to the Sculptures in the Indian Museum by N. G. Majumdar part 11. page 28
  39. J. R. A. S. B. 1898 pt II, page 20.
  40. সাধন মালা—প্রথমভাগ ভূমিকা ৩৭ পৃঃ
  41. তন্ত্রসার (রসিক মোহন চট্টোপাধ্যায়)—৩৪০ পৃষ্ঠা।
  42. Journal of Oriental Research Vol. X (1936.) pp 289-294 Date of Kalika Purana Before 1000 A. D. by P. K Gode M. A.
  43. উড্ডীয়ানে চোরূযুগ্মং হিতার জগতাং ততঃ।—
    কামরূপে কামগিরৌ নৃপতং যোনি মণ্ডলম্।
    প্রাচ্যেষু যাজ্ঞিকো দেশস্তাবদেব প্রকীর্ত্তিতঃ॥

    (বঙ্গবাসী সংস্করণ ১৮শ অধ্যায় ৪২-৪৫)
  44. কতকগুলি গ্রাম লইয়া একটী মৌজা হয়; মৌজার রাজস্ব আদায়ের জন্য মৌজাদার নির্ব্বাচিত হন।
  45. Journal of the Assam Research society voi V. No 1, 2, July 1937 page 28. (Jugijan)
  46. J. A. R. S. vol Vill. No 2, Apil 1941, pages 35-37
  47. J. A. R. S. Vol VII. No 2, 1941 page 33. ডক্টর শ্রীযুক্ত নলিনীকান্ত ভট্টশালী এই লিপির পাঠোদ্ধার করিয়াছেন। ভারতবর্ষ ১৩৪৮. আষাঢ় ৮৩ পৃঃ।
  48. J. A. R. S. Vol V No 1. 2. 1937. page 34-36.
  49. রাজমালা—প্রথম লহর  কপিলা নদীর তীরে পাটছারিদিয়া।
    একাদশ ভাই মিলি মন্ত্রণা করিয়া॥
    সৈন্য সেনা সনে রাজা স্থানান্তরে গেল।
    বরবক্র উজানেতে খলংমা রহিল॥”

  50. J. A. R, S. Vol V No 1. 2. 1937 pp 348 57. (Hojai and Oddiyana)
  51. অষ্টমপটল—২৩ শ্লোক
  52. মার্কণ্ডেয়পুরাণ (বঙ্গবাসী) ৬৬ অঃ ৫-১০
  53. দেওধাই বুরঞ্জী সূর্য্যকুমার ভূঞা সম্পাদিত—১৭২ পৃঃ
  54. স্কন্ধপুরাণ—নাগর কাণ্ড ২৬ অধ্যায় (৪৩-৬২) মৎস্যেন্দ্রনাথোৎপত্তি কথন।
  55. কৌলজ্ঞান নির্ণয় ষোড়শ পটল ৪৮ ৩২ শ পটল ১২
  56. শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত ১ম ভাগ, ১ম খণ্ড, ১ম অধ্যায়, ১৯২ পৃঃ
  57. কালিকা পুরাণ (বঙ্গবাসী)
  58. দেওধাই বুরঞ্জী ৩৭ পৃঃ (৪র্থ অধ্যায়)
  59. গোরক্ষবিজয় (আব্দুল করিম—বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ) ভূমিকা ২২ পৃঃ
  60. কালিকাপুরাণ (বঙ্গবাসী) ৭৯ অঃ ১৬৫। এখন ও লোকের বিশ্বাস, কমলাদেবীর স্থান দর্শন করিব এই উদেশ্য লইয়া গেলে পাহাড়ে পথ হারাইয়া যায়; তবে শিকারীরা প্রাই সেই স্থান দেখিতে পায়। Nowgong district gazetteer এ এই স্থানের উল্লেখ আছে পূঃ ৬।
  61. কন্দলীর পাটের সূতা আজকাল ও বিখ্যাত District Gazetter Nowgong. Page 144)
  62. J A R S. Vol April 1939. Page 23 foot note.
  63. ২-৪-৩৭ ইং তারিখে নগাঁও সহরে বাবা সুন্দরনাথের সহিত তদীয় শিষ্য শ্রীযুত সরোজ বন্ধু ঘোষ ষ্টেশন মাষ্টারের বাসায় আলোচনা হইয়াছিল।
  64. মৎস্যেন্দ্রনামাহিপুরামহাত্মা গোরক্ষমাদিশ্য নিজাঙ্গগুস্ত্যৈ।
    নৃপস্যকস্যাপিতনুং পরাসোঃ প্রবিশ্য তৎপত্তনমাসসাদ॥

    * * *

    স এষ বিস্মৃতা মুনিঃ সমাধিং সর্ব্বাত্মনা প্রাকৃতবদ্‌বভূব॥-৯ম অধ্যায় ৮০-৮৫ শঙ্কর বিজয়ম্
  65. ভক্তমাল (অবিনাশ মুখোপাধ্যায়) ১৯৬ পৃঃ
  66. কামরূপশাসনাবলী (৺পদ্মনাথ বিদ্যাবিনোদ) ১৮০ পৃঃ
  67. বাঙ্গালার ইতিহাস (রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়)-৩০২ পৃঃ পাদটীকায়—সন্ধ্যাকর নন্দীকৃত রামচরিতের শ্লোক দেওয়া হইয়াছে:—

    তস্যজিত কামরূপাদিবিষয়বিনিবৃত্তঃ মানসম্পাদ্যঃ।
    মহিমান মায়ন নৃপো যত মানস্য প্রজাভিরক্ষার্থম্‌॥” রামচরিত ৩।৪৭

  68. কালিকাপুরাণ ৭৯ অধ্যায়ে কপিলগঙ্গা বৃদ্ধানদী, দিব্যযমুনা, ভৈরবগঙ্গা, ভৈরবসরোবর প্রভৃতি যে সকল তীর্থস্থানের বিবরণ আছে সেই সমস্ত পুরাণোক্ত স্থাননির্দ্দেশানুসারে নগাঁও জেলাতেই অবস্থিত। ভৈরবগঙ্গা যোগিজাননদী, ভৈরবসরোবর যোগিজান বিল, তাহাদেরই পারে বৃহদাকার শিবলিঙ্গ সহ বৃহদায়তন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আছে। কালিকা পুরাণে বশিষ্ঠাশ্রমের যে স্থান নির্দ্দেশ আছে তাহাতে স্পষ্টই প্রমাণিত হয় যে উহা ডবকার সন্নিকটস্থ আকাশগঙ্গা নামক জলপ্রপাতের পারে ছিল। এখনও সেখানে নবম দশম শতিকার অনেকগুলি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আছে। গৌহাটীর সন্নিকটে যে বশিষ্ঠাশ্রম আছে উহার বিষয় পুরাণে লেখা নাই। কান্তা, সন্ধ্যা ও ললিতা নামক তিনটী নদী পৃথক পৃথক স্থানে অবস্থিত। ডবকা পর্ব্বতের পূর্ব্বদিকে কান্তা, ঈশান কোণে সন্ধ্যা ও সন্ধ্যার পূর্ব্বদিকে ললিতা নদী থাকার কথা পুরাণে লেখা আছে (৭৯ অঃ ১৬৪-২৮৩) কিন্তু গৌহাটীতে একটী প্রস্তর খণ্ডের উপরে ত্রিধাবিভক্ত একই নদী স্রোতের তিনটী ধারাকে কান্তা সন্ধ্যা ললিতা নাম দেওয়া হইয়াছে। গৌহাটীর বশিষ্ঠাশ্রম ৬৮৬ শকাব্দায় আহোম রাজা কর্ত্তৃক প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে।
  69. অধুনালুপ্ত “জোনাকী” নামক অসমীয়া ভাষার মাসিক পত্রিকায় রত্নেশ্বর মোহন্ত লিখিত “মিনারতী” প্রবন্ধ।
  70. জনাগাভরুর গীত শ্রীরুপেশ্বর দত্তকর্ত্তৃক (মেলেং, যোরহাট, আসাম) সঙ্কলিত ও প্রকাশিত। অসম সাহিত্য সভা পত্রিকা অষ্টম বৎসর ৩য় সংখ্যা ও নবম বৎসর প্রথম সংখ্যায় লেখক কর্তৃক জনাগাভরুর গীতের বিস্তৃত তুলনা মূলক সমালোচনা প্রকাশিত হইয়াছে।

শুদ্ধিপত্র

অস্পষ্ট ছাপা—

১৩ পৃঃ ৯ পংক্তি হইবে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
১৩ পৃঃ পাদটীকা ৩ পংক্তি হইবে গোরক্ষ সহস্রনাম
১৩ পৃঃ পাদটীকা পংক্তি হইবে গোরক্ষ নাথাষ্টক
১৩ পৃঃ পাদটীকা পংক্তি হইবে দেওয়া আছে
১৩ পৃঃ১৬ পাদটীকা পংক্তি হইবে ঐ স্থানে
১৩ পৃঃ পাদটীকা পংক্তি হইবে আছে
১৩ পৃঃ২০ পাদটীকা পংক্তি হইবে অদ্যাপি
১৩ পৃঃ পাদটীকা পংক্তি হইবে সম্মান
১৩ পৃঃ২৫ পাদটীকা পংক্তি হইবে সঙ্ঘারাম
১৩ পৃঃ পাদটীকা পংক্তি হইবে পরাজিত হওয়ার
১৩ পৃঃ পাদটীকা১১ পংক্তি হইবে চিরতরে
১৩ পৃঃ পাদটীকা১৪ পংক্তি হইবে মুসলমানের * * ভয়ে

ভুল ছাপা—

২৮ পৃঃ ১১ পংক্তি আছে তাত্রিক হইবে তান্ত্রিক
৩৬ পৃঃ পংক্তি আছে প্রশন্ত হইবে প্রশস্ত
৪৪ পৃঃ পাদটীকা ৪ পংক্তি আছে ৬৮৬ শকাব্দা। হইবে ১৬৮৬ শকাব্দা।

এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০২৬ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৬৬ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।