কবিতা (কেশবচন্দ্র কুণ্ডু)/পাগলী

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


পাগলী।

চোখে লয়ে জল
হাসে খল খল
শুধালে পাগলী কয় না কথা;
বোঝালে বোঝে না প্রাণের ব্যথা;
ধূলা মেখে তার সোনার গায়
কে জানে সে যে কি আমোদ পায়।

ভরা সে যৌবনে রূপের ছবি
স্বভাবে পাগলী সুখের কবি,
আলো করে বসি রূপের হাটে
কত ছড়া কাটে দীঘীর ঘাটে।

সুখে দুখে মুখে মাখান হাসি
যে দেখে সে বলে ভালই বাসি,
পাগলী কিছু না কাহারে চায়
যতন করিলে পালায়ে যায়।

প্রতিদিন প্রাতে ঘুমের ঘোরে
ডাকিতে না পাখী মধুর স্বরে,
ভাঙ্গিয়া নিশির নিঝুম তান
ধরিয়া পাগলী মধুর গান
সকাল হইতে সাঁঝের বেলা
যেখানে সেখানে করিয়া খেলা,
চুপে চুপে কারে কিছু না বলে
নিশীথে সে যায় নিঝুমে চলে।

পাগলিনী গায়,—
সব গেছে হায়
জনে জনে যেন যতেক ফুল,
জনে জনে যেন যতেক তারা,
আলো করে সেই দীঘীর কূল;
ভাই বোন যত সব মনমত।
ছিল তার কত, সব গেছে তারা।
পাগলিনী বলে,—
কে জানে কি ছলে
সে কাল দীঘীর মিশ কাল জলে
ঢে’য়ে ঢে’য়ে বায়ু নাচিয়া চলে

মরালে মৃণাল ছিঁড়িয়া খায়
কমলিনী প্রাণে কতই সয়!

গ্রামপ্রান্তভাগে ভগন মঠে
যমুনা দীঘির শ্যামল তটে,
যেখানেতে বট অশথ ছায়
নিঝুমে আঁধার খেলাতে রয়,
নিশিতে পাগলী একলা থাকে,
আয় আয় করে তারাকে ডাকে;
তারা যে গো তারা কিছুই নয়,
কিছুতে তাহার মনে না লয়,
বারে বারে যদি বলি গো তাকে—
তারা কি মানুষ আসিবে ডাকে?
পাগলিনী বলে,—মানুষি তারা
মরিয়া হয়েছে অমন ধারা!
সে সব মানুষ পাগলী কারা
ভাই বোন সব সবাই তারা!

আঁখি ছল ছলে
যত বার বলে

ততই কেবল উদাসে চায়,
কি বলে পাগলী বুঝি না হায়!
বারে বারে যদি বলি গো তাকে
কি ফল পাগলী একলা থেকে?
পাগলিনী বলে, থাকি না একা,
সবাই যে তারা দেয় গো দেখা;
পাগলী পাগলী কেহ ত নাই,
ভেবেছিনু আগে আমি ও তাই!
যত বার বলি ততই বলে,
বুঝি না পাগলী বলে কি ছলে!
পাগলিনী দেখা দেয় গো কারা
ভাই বোন সব সবাই তারা;
বারে বারে যদি শুধাই তায়
গ্রামেতে কি তারা দেখ না যায়?
পাগলিনী বলে
গ্রামকোলাহলে
ভয় করে তারা কাছে যে এসে,
কয়নাক কথা মধুরে হেসে;
পাগলী পাগলী তাও কি হয়?
পাগলিনী বলে, হয় গো হয়!

এক মনে এক যবে সে ডাকে
তারা গুলি যেন নামিতে থাকে;
মনে যেন হয়
ঠিক তারে কয়
দিন কত পরে হারালে শেষে
লয়ে যাবে তারা তারার দেশে;
কয় দিন মাঝে পাগলী আর
আসেনিক গ্রামে একটি বার;
কয় দিন—মাঝে—ঘুমের ঘোরে
শুনেনি সে গীত মধুর স্বরে।

প্রাণের ভিতর কি যেন কত
পাগলীর ভাবে পাগল মত,
কত কি ভাবিয়া কেঁদেছি মনে
কি হল তাহার কিছু না শুনে;
না দেখে সে ঘাটে, না দেখে মঠে
না দেখে দিঘীর শ্যামল তটে,
গ্রাম পরে গ্রামে প্রাস্তর বনে
যেথা সেথা তারে দেখিতে মনে
নিশি দিন কত খুজেছি একা,

কোথাও তাহার পায়নি দেখা;
নিঝুম রজনী চলেছি একা,
গগনেতে চাঁদ দিয়াছে দেখা,
চারি ধারে তরু মনের সাধে
ধরিবারে ফুল কেন বা কাঁদে?
চুপে চুপে চুপে মারুত মন্দ
চুরি করি আনি ফুলের গন্ধ
উদাসেতে কেন যাইছে উড়ে?
হরিষে বিষাদ কি আছে দূরে?

ছাড়ায়ে অশথ, ছাড়ায়ে বট,
ছাড়ায়ে দিঘীর শ্যামল তট,
সমুখেতে ভাঙ্গা মঠের কাছে
দেখি না—পাগলী শুইয়া আছে;
ছবি খানি যেন হেলায় পড়ে
হারায়েছে রং গিয়াছে ঝরে;
পাগলীর আর সে ভাব নাই,
জলন্ত আগুনে পড়েছে ছাই!
চেয়ে আছে সে যে চাঁদের পানে,
চেয়ে আছে চাঁদ তাহার পানে,

পাগলী পাগলী বলিয়া তায়
কত দ্বার ডেকে দেখিনু হায়!
গিয়াছে পাগলী
কিছুই না বলি।
যেখানেতে আছে ভগিনী ভাই;
পড়ে আছে দেহ, সে আর নাই!