কবিতা (কেশবচন্দ্র কুণ্ডু)/পাপিয়া

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন




পাপিয়া।

ও কি ও উদাস প্রাণে  মর্ম্মভেদী উচ্চতানে
 বল রে বিহঙ্গ তুই বল বল বল,
কারে তুই হেঁকে হেঁকে  অমন করিয়া ডেকে
 এমন পাগল তুই এমন পাগল!

হাসে ফুল, হাসে তরু,  হাসে রে কানন চারু,
 হাসিতে জোছনা ঢলে পড়িছে ধরায়;
হাসিছে প্রকৃতি রাণী,  শান্তিময়ী মূর্ত্তি খানি,
 দেখে পাখী প্রাণ তোর কেন না জুড়ায়?

দিবানিশি এক বোলে  বুক-ভাঙ্গা ঘন রোলে
 কেন না রে ঘুচে পাখী বিষাদের ঘোর?
এত কি প্রাণের ব্যথা,  এত কি খেদের কথা,
 মর্ম্মভেদী কাতরতা গাঁথা হৃদে তোর?



নীরব গভীর রেতে   সত্ৰাস শ্রুতির পথে
আশার বিহ্বলে যথা নিরাশ ক্রন্দন,
বিষাদে বিষাদ গাঁথা   গত পুন প্রিয় কথা
হারান সুখের পাখী স্মৃতিতে যেমন।

ডুবে ডুবে যেন যায়   ছিন্ন তারে মৃতপ্রায়
কি বলিতে কি বা বলে বীণার ঝঙ্কার;
মর্ম্মভেদী ওই স্বর   নিশি দিন নিরন্তর
শুনিতে পারি না পার্থী শুনিতে ষে আর!

ধরার সহাস হাসে   মধুভরা মধুমাসে
ঊষার গগনে পাখী নবদিবাকর,
জগৎ আনন্দময়   যেন সুখ সমোদয়
নয় কিরে নয় পাখী নয় মনোহর?

নবদূর্ব্বাদলে দুলে   ঘুমে যেন ঢুলে ঢুলে
নীহারের কণাগুলি নয় কিরে নয়,
প্রভাত-পবনে জেগে   রঞ্জি রবি নবরাগে
নয়ন-জুড়ান রূপে প্রীতি শান্তিময়।



আমার মতন পাখী!   তোর কি পুড়েছে আঁখি,
হেলায় হারালি কবে বল বল বল!—
জগতে সৌন্দৰ্য্য সুখ,   শান্তি-পূর্ণ ভরা বুক;
জানিলি জগৎ কবে দগ্ধ মরুস্থল?

সুখের শৈশব বেলা   ভেঙ্গে গেলে ছেলেখেলা
একলা বসিয়া অই বৃদ্ধ তরুতল,
উদাস পরাণে থাকি   এমনি শুনেছি পাখী!
তোর অই স্বর পাখী, পরাণ পাগল!

কত দিন চলে গেছে,   এখন তেমনি আছে,
তেমনি সে কাতরতা করুণ উচ্ছ্বাস,
ভাল পাখী! শিখেছিলি,   পরাণ উছলি তুলি
বিষাদসঙ্গীত গীতে কাতর উল্লাস!

ঘুমে বায়ু অচঞ্চল,   নড়ে না পল্লবদল,
ঘুমায় সকল পাখী, ঘুমায় সকল;
তরঙ্গে না ভাঙ্গি হৃদি,   নিথরে ঘুমায় নদী,
শ্বাসে যেন রাখি প্রাণ স্রোতমুখী জল।



করুণ কাতর তর   হৃদয় দগধকর,
অনিচ্ছায় ম্লান হাসি দুঃখের যেমন,
বাড়াতে প্রাণের ব্যথা,   দারুণ দুঃখের যথা
জ্বলন্ত পুড়ন্ত মিছা সান্ত্বনা বচন!

উছলে উছল প্রাণ,   কে করে বিষাদ-গান?
তোর মত কে বা পাখী কে বা রে ধরায়?
পবিত্র নিদ্রার কোলে   কেবা না যন্ত্রণা ভুলে
একা বসি সারানিশি কেবা রে জাগায়?

আপন হারায় প্রাণ   যথা করি অন্যে দান
দিবানিশি কেঁদে কেঁদে মনের ব্যথায়,
হতাশ, যেমন পাখী!   বিরলে বসিয়া থাকি
একলা বিষাদ গানে পরাণ জুড়ায়!

তেমনি ও তুই পাখী   একলা বসিয়া থাকি
ঘুচাস কি ব্যথা প্রাণে বল খুলে বল,
শুনিতে পারি না আর   মর্ম্মভেদী অই স্বর,
শূন্য প্রাণে প্রতিধ্বনি বড় যে প্রবল!