কবিতা (কেশবচন্দ্র কুণ্ডু)/বসন্ত
বসন্ত
সুখের আলয় আমার ধাম,
সুখের বসন্ত আমার নাম,
যা কিছু সুখের সকলেই আজ
এনেছি এনেছি আমি ঋতুরাজ;
পরত ধরণী সহাস সাজ,
উঠত চন্দ্রমা হাসিয়া আজ,
ভাঙ্গিয়া বিরহ ব্যথিত প্রাণ
গাওত কোকিল পঞ্চমে গান;
কুসুম সুরভি ছড়ায়ে আজ
বহত মলয় পবন-রাজ!
বীর বন-ভূমে, আশ্রমে মুনি,
বিপুল বিভবে প্রাসাদে ধনী,
প্রবল প্রতাপ বুঝুক মোর,
ঘুচুক সবার নেশার ঘোর!
কি করে বীরত্ব কি করে জ্ঞান,
কি করে তন্মদ ধনের মান?
বসন্ত লইয়া নানানুরাগ
যেথায় জাগায় বাসনা যাগ,
অতি দূরদেশ হিমগিরি যেথা,
ছুঁইয়া গগন ছাইয়া আছে।
পর-পর-পর সকল ঋতুর
সুখের আবাস ফেলিয়া পাছে;
তুষারমণ্ডিত উচ্চ শৃঙ্গদেশে
শীতের আলয় ছাড়ায়ে আর,
স্বরগের কাছে স্বরগের সম
আমার আলয় সবার সার।
মুঞ্জর রে তরু মুঞ্জর লতা।
গিয়াছে শিশির গিয়াছে ব্যথা:
আমার উৎসবে মাতায়ে প্রাণ
ধরত পাপিয়া ঝঙ্কার তান;
ফুটত রে সুখে কুসুম-কলি,
গাও ত কোকিল গুঞ্জর আলি;
সুরুচি আপন ভুলিয়া যাক্।
হৃদিহীন প্রাণী অবাকে থাক।
ভাঙ্গিলে রে ঘুম স্বপন যায়,
স্বপনের নিধি জেগে কে পায়।
আচার বিচার সকলি মিছার
জ্ঞানের কুহক বিষম ভ্রম,
বিচারে যে চায় সুখ যে রে তায়
শুধুই কেবল আশার ক্রম।
অন্ধ পরাণে দেখা যা যায়
বিচারে আনিয়া কি ফল তায়?
প্রাণ আছে কি না জানিবার আশে
প্রাণময়ী ছবি ছিঁড়িয়া ফেলে,
পিশাচের মত শূন্য প্রাণ দেখে
কার প্রাণে সুখ কবে রে মেলে?
ভাল বেসে প্রাণে যাহারে চায়,
স্বজন প্রেমিক মিলয়ে তায়;
পেয়ে কেন দিন হারাও হেলে?
জনম যে যায় লহমা গেলে!
চুম্বিয়া চাঁদেরে তটিনীর বারি
মিছা কিরে ঢালে সুধার ধারা,
মিছা কি তটিনী হৃদয়ে চাঁদের
ধরে শত রূপ পাগল পারা?
মিছা কি মিছা কি প্রাণের রে হাসি
প্রাণ দিয়া পরে আপনা খুঁজে,
সুখ কি পরাণে যদি না পরাণ
আপনায় ভুলে অপরে মজে।
| ভাল বেসে প্রাণে | রেখ না খেদ, | |
| স্বরগে মরতে | কর না ভেদ; | |
| প্রেমের জগতে | সবাই সম, | |
| মিছা কুল শীল | মোহের তম! | |
| ভাল বেসে প্রাণে | হয়ে যে সুখী | |
| মরতের ফুল, | সূরযমুখী | |
| আকাশের রবি | আকাশে হায়! | |
| দোঁহা পানে দোঁহা | চাহিয়া রয়। | |
| দিনে দিনে দিনে | গুণিয়া তারা | |
| কে আছ কোথায় | কাঁদিয়া সারা, | |
| কহত আমায় | কেবা কি ছলে | |
| দিয়া গেছে প্রাণে | আগুন জ্বেলে? | |
| কি বা সে রমণী | কি বা সে নর, | |
| কি বা সে আপন | কি বা সে পর, | |
| যত কেন তেজ | গরবে র’ক | |
| যতই কেন না | পাষাণ হ’ক, | |
| ভালবাসা দিয়া | বুঝায়ে ব্যথা | |
| পায়ে ধরে এনে | কহাব কথা। |
সহজে বন্ধুর প্রেমনিকেতন
সারি সারি সারি বেড়িয়া রে যেথা
কল্পবৃক্ষ গুলি দাঁড়ায়ে রে আছে
ঘুচায়ে প্রাণের সকল ব্যথা;
ভোলা ভোলা মনে সরল প্রাণের
ছবি গুলি যেথা হৃদয়ে লয়,
সরল ভাবের স্বভাবে আপন
স্বভাবের রাণী সুখেতে রয়;
ত্যজি যারে আজ আমি ঋতুরাজ
আহা সে সুখের জনমভূমি,
ভূতের মতন ঘুরিতে ফিরিতে
শুধু এ ধরায় আমি আসিনি।
সুজীর্ণ কুটীরে মলিন বাসে
দিবানিশি দুঃখে দীরঘশ্বাসে
কেঁদ না দুঃখিনী কেঁদ না আর,
ঘুচাব তোমার দুঃখের ভার;
আমি রাজা, রাজ-ধরম জানি—
একে না রাখিয়া আনে না টানি;
ধনী কি কাঙ্গালে করি না বাছ,
সকলে সমান আমার কাছ;
আমার ধরায় কেহ না দুখী,
আমার আকাশে সবাই সুখী;
মধুর মলয় আমার বায়
সবায় সমানে মধুরে রয়!
আমি রে মধুর কোমল অতি
সমভাব সবে আমার নীতি!
সমান হাসিতে করিয়া তুল
শ্মশানে কাননে ফোটাই ফুল।
সুখের দেবতা আমি রে আমি
আমার এ ধরা লীলার ভূমি
তাতে বাতে জ্বালা সহিয়া ধীরে
অবশ পরাণে শ্মশান স্থিরে
সমাধিতে শোভা সকল রেখে
যখন রে ধরা কাঁদিতে থাকে—
কিশোরীর প্রাণে ধীরে ধীরে যথা
সরমে সোহাগ প্রকাশ পায়,
ঘুমের ঘোরেতে পরাণে যেমন
সুখের স্বপন ছাইয়া যায়—
হাসির অভাবে হাসিটি লয়ে,
ধীরে ধীরে কারে কিছু না কয়ে,
জীবের জীবনে মধুর ভাবে,
যা কিছু সুখের ছাইয়া সবে,
স্বরগের সুখে মরতে মাতি,
নানান কুহুক কৌশল পাতি;
ভাবময় প্রাণে ধরায় ছেয়ে
দিন কত শুধু প্রকাশ পেয়ে,
দিবালোক যথা কাল নিশাগমে
আপন মহিমা প্রচার তরে,
যেমন ধরায় ত্যজিয়া রে যায়
হইয়া নূতন আসিতে ফিরে;—
ধীরে ধীরে যথা মিলনের সুখ
বিরহে মহিমা রাখিয়া যথা
গিয়া দুঃখে, পুন আনিবারে রয়
লইয়া প্রাণের নূতন কথা।
বছরে বছরে আপন মহিমা
কেবল ধরায় প্রচার তরে,
চলে যাই আমি আবার আবার
হইয়া নূতন আসিতে ফিরে।