কমলাকান্তের দপ্তর (দ্বিতীয় সংস্করণ)/তৃতীয় সংখ্যা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


তৃতীয় সংখ্যা।

 

 

ইউটিলিটি[১]

বা

উদর-দর্শন।

 

 বেন্থাম হিতবাদ দর্শনের সৃষ্টি করিয়া ইউরোপে অক্ষয় কীর্ত্তি স্থাপন করিয়া গিয়াছেন।

 আমি এই হিতবাদ মতে অমত করি না; বরং আমি ইহার অনুমোদক, তবে, আপনারা জানেন কি না বলিতে পারি না, আমি এক জন সুযোগ্য দার্শনিক। আমি এই হিতবাদ দর্শন অবলম্বন করিয়া, কিছু ভাঙ্গিয়া, কিছু গড়িয়া, একটি নূতন দর্শনশাস্ত্র প্রণয়ন করিয়াছি। প্রকৃত পক্ষে, তাহা বাঙ্গালায় প্রচলিত হিতবাদ দর্শনের নূতন ব্যাখ্যা মাত্র। তাহার স্থুল মর্ম্ম আমি সংক্ষেপতঃ লিপিবদ্ধ করিতেছি। প্রাচীন প্রথানুসারে দর্শনটি সূত্রাকারে লিখিত হইয়াছে। এবং আমি স্বয়ংই সূত্রের ভাষ্য করিয়া তাহার সঙ্গে সঙ্গে লিখিয়াছি। বাঙ্গালাতেই সূত্রগুলি লিখিত হইয়াছে। আমি যে অসংস্কৃতজ্ঞ, এমত কেহ মনে করিবেন না। তবে সংস্কৃতে সূত্রগুলি কয় জন বুঝিতে পারিবে? অতএব, সাধারণ পাঠকের প্রতি অনুকূল হইয়া

বাঙ্গালাতেই সমস্ত কার্য্য নির্ব্বাহ করিয়াছি। সে সূত্র-গ্রন্থের সারাংশ এই;—

 ১। জীবশরীরস্থ বৃহৎ গহ্বর বিশেষকে উদর বলে।

ভাষ্য।

 “বৃহৎ”—অর্থাৎ নাসিকা কর্ণাদি ক্ষুদ্র গহ্বরকে উদর বলা যায় না। বলিলে, বিশেষ প্রত্যবায় আছে।

 “জীবশরীরস্থ বৃহৎ গহ্বর”—জীবশরীরস্থ বলিবার তাৎপর্য্য এই যে, নহিলে পর্ব্বতগুহা প্রভৃতিকে উদর বলিয়া পরিচয় দিয়া কেহ তাহার পূর্ত্তির প্রত্যাশা করিতে পারেন।

 “গহ্বর”—যদিও জীবশরীরস্থ গহ্বর বিশেষই উদর শব্দে বাচ্য, তথাপি অবস্থা বিশেষে অঞ্জলি প্রভৃতিও উদর মধ্যে গণ্য। কোন স্থানে উদর পূরাইতে হয়, কোন স্থানে অঞ্জলি পূরাইতে হয়।

 ২। উদরের ত্রিবিধ পূর্ত্তিই পরম পুরুষার্থ।

ভাষ্য।

 সাংখ্যেরও এই মত। আধিভৌতিক, আধ্যাত্মিক, এবং আধিদৈবিক এই ত্রিবিধ উদর-পূর্ত্তি।

 “আধিভৌতিক”—অন্ন ব্যঞ্জন সন্দেশ মিষ্টান্ন প্রভৃতি ভৌতিক সামগ্রীর দ্বারা উদরের যে পূর্ত্তি হয়, তাহাই আধিভৌতিক পূর্ত্তি।

 “আধ্যাত্মিক”—যাঁহারা বড়লােকের বাক্যে লুব্ধ হইয়া, আশায় বদ্ধ হইয়া, কালযাপন করেন, তাঁহাদিগেরও আধ্যাত্মিক উদরপূর্ত্তি হয়।

 “আধিদৈবিক”—দৈবানুকম্পায় প্লীহা যকৃৎ প্রভৃতি দ্বারা যাঁহাদের উদর পূরিয়া উঠে, তাঁহাদিগের আধিদৈবিক উদরপূর্ত্তি।

 ৩। এতন্মধ্যে আধিভৌতিক পূর্ত্তিই বিহিত।

ভাষ্য।

 “বিহিত”—বিহিত শব্দের দ্বারা অন্যান্য পূর্ত্তির প্রতিষেধ হইল কি না, ভবিষ্যৎ ভাষ্যকারেরা মীমাংসা করিবেন।

 এক্ষণে সিদ্ধ হইল যে, উদরনামক মহা-গহ্বরে লুচি সন্দেশ প্রভৃতি ভৌতিক পদার্থের প্রবেশই পুরুষার্থ। অতএব এ গর্ত্তের মধ্যে কি প্রকার ভূত প্রবেশ করান যাইতে পারে, তাহা নির্ব্বাচন করা যাইতেছে।

 ৪। বিদ্যা, বুদ্ধি, পরিশ্রম, উপাসনা, বল, এবং প্রতারণা এই ষড়্‌বিধ পুরুষার্থের উপায়, পূর্ব্বপণ্ডিতের নির্দ্দেশ করিয়াছেন।

ভাষ্য।

 ১। “বিদ্যা”-বিদ্যা কি, তাহা অবধারণ করা কঠিন। কেহ কেহ বলেন, লিখিতে ও পড়িতে শিখাকে বিদ্যা বলে। কেহ কেহ বলেন, বিদ্যার জন্য বিশেষ লিখিতে বা পড়িতে শিখার প্রয়ােজন নাই, গ্রন্থ লিখিতে, সম্বাদ পত্রাদিতে লিখিতে জানিলেই হইল। কেহ কেহ তাহাতে আপত্তি করেন যে, যে লিখিতে জানে না, সে পত্রাদিতে লিখিবে কি প্রকারে? আমার বিবেচনায় এরূপ তর্ক নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর। কুম্ভীরশাবক ডিম্ব ভেদ করিবামাত্র জলে গিয়া সাঁতার দেয়—অথচ কখন সাঁতার শিখে নাই। সেইরূপ বিদ্যা বাঙ্গালির স্বতঃসিদ্ধ, তজ্জন্য লেখা পড়া শিখিবার প্রয়ােজন নাই।

 ২। “বুদ্ধি”—যে আশ্চর্য্য শক্তি দ্বারা তূলাকে লৌহ, লৌহকে তূলা বিবেচনা হয়, সেই শক্তিকে বুদ্ধি বলে। কৃপণের সঞ্চিত ধনরাশির ন্যায় ইহা আমরা স্বয়ং সর্ব্বদা দেখিতে পাই, কিন্তু পরের কখন দেখিতে পাই না। পৃথিবীর সকল সামগ্রীর অপেক্ষা বােধ হয় জগতে ইহারই আধিক্য। কেন না, কখন কেহ বলিল না যে, ইহা আমি অল্প পরিমাণে পাইয়াছি।

 ৩। “পরিশ্রম”—উপযুক্ত সময়ে ঈষদুষ্ণ অন্ন ব্যঞ্জন ভােজন, তৎপরে নিদ্রা, বায়ু সেবন, তামাকুর ধূমপান, গৃহিণীর সহিত প্রিয় সম্ভাষণ ইত্যাদি গুরুতর কার্য্য সম্পাদনের নাম পরিশ্রম।

 ৪। “উপাসনা”—কোন ব্যক্তির সম্বন্ধে কোন কথা বলিতে গেলে, হয় তাহার গুণানুবাদ নয় দোষকীর্ত্তন করিতে হয়। কোন ক্ষমতাশালী প্রধান ব্যক্তি সম্বন্ধে এরূপ কথা হইলে, যদি তিনি প্রকৃত দোষযুক্ত ব্যক্তি হয়ে, তবে তাহার দোষকীর্ত্তন করাকে নিন্দা বলে। আর তিনি যদি দোষ যুক্ত না হয়েন, তবে তাঁহার দোষকীর্ত্তনকে স্পষ্টবক্তৃত্ব অথবা রসিকতা বলে। গুণ পক্ষে, তিনি যদি গুণহীন হয়েন, তবে তাহার গুণকীর্ত্তনকে ন্যায়নিষ্ঠতা বলে। আর যদি তিনি যথার্থ গুণবান্ হয়েন, তবে তাঁহার গুণকীর্ত্তনকে উপাসনা বলে।

 ৫। “বল”—দীর্ঘচ্ছন্দ বাক্য-মুখ চক্ষুর আরক্তভাব—ঘােতর ডাক, হাঁক,—মুখ হইতে অনর্গল, হিন্দী, ইংরেজি এবং নিষ্ঠীবনের বৃষ্টি,—দূর হইতে ভঙ্গী দ্বারা কিল, চড়, ঘুষা, এবং লাথি প্রদর্শন ও সার্দ্ধ তিপ্পান্ন প্রকার অন্যান্য অঙ্গভঙ্গী—এবং বিপক্ষের কোন প্রকার উদ্যম দেখিলে অকালে পলায়ন ইত্যাদিকে বল বলে।

 বল ষড় বিধ, যথা:—

 মৌখিক—অভিসম্পাত, গালি, নিন্দা প্রভৃতি।

 হাস্ত—কিল, চড়, প্রদর্শন প্রভৃতি।

 পাদ—পলায়নাদি।

 চাক্ষুষ—রোদনাদি। যথা, চাণক্যপণ্ডিত,—“বালানাং রােদনং বলং” ইত্যাদি।

 ত্বাচ—প্রহার সহিষ্ণুতা ইত্যাদি।

 মানস—দ্বেষ, ঈর্ষা, হিংসা প্রভৃতি।

 ৬। “প্রতারণা”—নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের পৃথিবীমধ্যে প্রতারক বলিয়া জানিও,

 এক, পণ্যাজীব। প্রমাণ—দোকানদার জিনিষ বেচিয়া, আবার মূল্য চাহিয়া থাকে। মূল্যদাতা মাত্রেরই মত যে, তিনি ক্রয়কালীন প্রতারিত হইয়াছেন।

 দ্বিতীয়, চিকিৎসক। প্রমাণ—রোগী বােগ হইতে মুক্ত হইলে পরে যদি চিকিৎসক বেতন চায়, তবে রােগী প্রায় সিন্ধান্ত করিয়া থাকেন যে, আমি নিজে আরাম হইয়াছি; এ বেটা অনর্থক ফাঁকি দিয়া টাকা লইতেছে।

 তৃতীয়, ধর্ম্মোপদেষ্টা এবং ধার্ম্মিক ব্যক্তি। ইঁহারা চিরপ্রথিত প্রতারক, ইঁহাদিগের নাম “ভণ্ড”। ইঁহারা যে প্রতারক, তাহার বিশেষ প্রমাণ এই যে, ইঁহারা অর্থাদির কামনা করেন না।

 ইত্যাদি।

 ৫। এই ষড়্‌বিধ উপায়ের দ্বারা উদরপূর্ত্তি বা পুরুষার্থ অসাধ্য।

ভাষ্য।

 এই সূত্রের দ্বারা পূর্ব্বপণ্ডিতদিগের মত খণ্ডন করা যাইতেছে। বিদ্যাদি ষড়্‌বিধ উপায়ের দ্বারা যে উদরপূর্ত্তি হইতে পারে না, ক্রমে তাহার উদাহরণ দেওয়া যাইতেছে।

 “বিদ্যা”—বিদ্যাতে যদি উদরপূর্ত্তি হইত, তবে বাঙ্গালা সম্বাদপত্রের অন্নাভাব কেন?

 “বুদ্ধি”—বুদ্ধিতে যদি উদরপূর্ত্তি হইত, তবে গর্দ্দভ মােট বহিবে কেন?

 “পরিশ্রম”—পরিশ্রমে যদি হইত, তবে বাঙ্গালি বাবুরা কেরাণী কেন?

 “উপাসনা’—উপাসনায় যদি হইত, তবে সাহেবগণ কমলাকান্তকে অনুগ্রহ করেন না কেন? আমি ত মন্দ পেবিল লিখি নাই।

 “বল”—বলে যদি হইত, তবে আমরা পড়িয়া মার খাই কেন?

 “প্রতারণা”—প্রতারণায় যদি হইত, তবে মদের দোকান কখন কখন ফেল হয় কেন?

 ৬। উদরপূর্ত্তি বা পুরুষার্থ কেবল হিতসাধনের দ্বারা সাধ্য।

ভাষ্য।

 উদাহরণ। ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতেরা লোকের কানে মন্ত্র দিয়া তাহাদের হিতসাধন করিয়া থাকেন। ইউরােপীয় জাতিগণ অনেক বন্যজাতির হিতসাধন করিয়াছেন, এবং রুসেরা এক্ষণে মধ্য-আসিয়ার হিতসাধনে নিযুক্ত আছেন। বিচারকগণ বিচার করিয়া দেশের হিতসাধন করিতেছেন। অনেকে সুবিক্রেয় এবং অবিক্রেয় পুস্তক ও পত্রাদি প্রণয়ন দ্বারা দেশের হিতসাধন করিতেছেন। এ সকলের প্রচুর পরিমাণে উদরপূর্ত্তি অর্থাৎ পুরুষার্থলাভ হইতেছে।

 ৭। অতএব সকলে দেশের হিতসাধন কর।

ভাষ্য।

 এই শেষ সূত্রের দ্বারা হিতবাদ দর্শন, এবং উদর দর্শনের একতা প্রতিপাদিত হইল। সুতরাং এই স্থলে কমলাকান্তের সূত্র-গ্রন্থের সমাপ্তি হইল। ভরসা করি, ইহা ভারতবর্ষের সপ্তম দর্শনশাস্ত্র বলিয়া আদৃত হইবে।

শ্রীকমলাকান্ত চক্রবর্ত্তী।
 

  1. “ইউটিলিটি” শব্দের অর্থ কি? ইহার কি বাঙ্গালা নাই? আমি নিজে ইংরেজি জানি না-কমলাকান্তও কিছু বলিয়া দেয় নাই—অতএব অগত্যা আমার পুত্রকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। আমার পুত্র, ডেক্সনারী দেখিয়া এইরূপ ব্যাখ্যা করিয়াছে—“ইউ” শব্দে তুমি বা তোমরা, “টিল্‌’ শব্দে চাষ করা, “ইট্‌” শব্দে খাওয়া, “ই” অর্থে কি তাহা সে বলিতে পারিল না, কিন্তু বোধ করি কমলাকান্ত, “ইউ-টিল-ইট-ই” পদে ইহাই অভিপ্রেত করিয়াছেন যে, “তোমরা চাষ করিয়াই খাও।” কি, পাষণ্ড! সকলকেই চাষা বলিল! ঈদৃশ দুর্ব্বৃত্ত দশানন লম্বোদর গজাননের রচনা পাঠ করাতেও পাপ আছে। বোধ হয়, আমার পুত্রটি ইংরেজি লেখা পড়ায় ভাল হইয়াছে, নচেৎ এরূপ দুরূহ শব্দের সদর্থ করিতে পারিত না।—শ্রীভীষ্মদেব খোষনবীশ।