কমলাকান্তের দপ্তর (দ্বিতীয় সংস্করণ)/দশম সংখ্যা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

দশম সংখ্যা । বড় বাজার । প্রসন্ন গোয়ালিনীর সঙ্গে আমার চিরবিচ্ছেদের সম্ভাবনা দেখিতেছি । আমি নশীরাম বাবুর গৃহে আসিয়া অবধি, তাহার নিকট ক্ষীর সর, দধি দুগ্ধ এবং নবনীত খাইতেছি । আহারকালে মনে করিতাম, প্রসন্ন কেবল পরলোকে সদগতির কামনায় অনন্ত পুণ্য সঞ্চয় করিতেছে ;–জানিতাম, সংসারারণ্যে যাহারা পুণ্যরূপ মৃগ ধরিবার জন্য ফাদ পাতিয়া বেড়ায়, প্রসন্ন তন্মধ্যে স্বচতুরা ; ভোজনাস্তুে নিত্যই প্রসনের পরকালে অক্ষয় স্বর্গ, এবং ইহকালে মেীতাত বৃদ্ধির জন্য দেবতার কাছে প্রার্থনা করিতাম । কিন্তু এক্ষণে হায় ! মানব-চরিত্র কি ভীষণ স্বার্থপরতায় কলঙ্কিত । এক্ষণে সে মূল্য চাহিতেছে ! সুতরাং তাহার সঙ্গে চিরবিচ্ছেদের সম্ভাবন। প্রথম দিন সে যখন মুল্য চাহিল, রসিকর্তা করিয়া উড়াইয়া দিলাম—দ্বিতীয় দিনে ৰিম্মিত হইলাম—তৃতীয় দিনে গালি দিয়াছি । কমলাকাস্তের দপ্তর। ১২১ এক্ষণে সে দুধ দই বন্ধ করিয়াছে। কি ভয়ানক ! এত দিনে জানিলাম, মনুষ্যজাতি নিতান্ত স্বার্থপর ; এত দিনে জানিয়াছি, ষে সকল আশা ভরসা সযত্নে হৃদয়ক্ষেত্রে রোপণ করিয়া বিশ্বাসজলে পুষ্ট কর, সকলই বৃথা । এক্ষণে জানিয়াছি গল্প—আকাশকুসুম ! ছায়াবাজি । হায় । মনুষ্যজাতির কি হইবে । হায়, অর্থলুব্ধ গোয়াল । জাতিকে কে নিস্তার করিবে ! হায় ! প্রসন্ন নামে গোয়ালার কবে গোরু চুরি যাবে । প্রসনের দুগ্ধ দধি আছে, সে দিবে, আমার উদর আছে, খাইব, তাহার সঙ্গে এই সম্বন্ধ, ইহাতে সে মুল্য চাহে কোন অধিকারে, তাহ। আমি বুঝিতে পারিলাম না। প্রসন্ন বলে, আমি অধিকার অনধিকার বুঝি না ; আমার গোরু, আমার দুধ, আমি মূল্য লইব । সে বুঝে ন যে, গোরু কাহারও নহে; গোরু, গোরুর 5ՀՉ কমলাকাত্তের দপ্তর। সকল সামগ্রীই মূল্য দিয়া ক্রয় করিতে হয়। দুধ দই, চাল দাল, খাদ্য পেয়, পরিধেয় প্রভৃতি পণ্য দ্রব্য দূরে থাকুক, বিদ্যা বুদ্ধিও মূল্য দিয়া কিনিতে হয় । কালেজে মুল্য দিয়া বিদ্যা কিনিতে হয়। অনেকে ভাল কথা মূল্য দিয়া কিনিয়া থাকেন । হিন্দুরা সচরাচর মূল্য দিয়৷ ধৰ্ম্ম কিনিয়া থাকেন। যশঃ মান অতি অল্প মূল্যেই ক্রীত হইয়া থাকে। ভাল সামগ্ৰী মূল্য দিয়া কিনিতে হইবে, ইহাও কতক বুঝিতে পারি, কিন্তু মনুষ্য এমনই মূল্যপ্রিয়, যে বিনামূল্যে মন্দ সামগ্ৰীও কেহ কাহাকে দেয় না । যে বিষ খাইয়া মরিবার বাসনা কর, তাহাও তোমাকে বাজার হইতে মূল্য দিয়া, কিনিয়া খাইতে হইবে। অতএব এই বিশ্বসংসার, একটি বৃহৎ বাজার —সকলেই সেখানে আপনাপন দোকান সাজইয়া বসিয়া আছে। সকলেরই উদ্দেশ্য মুল্যপ্রাপ্তি। সকলেই অনবরত ডাকিতেছে, “আমার দোকানে ভাল জিনিষ—খরিদার চলে আয়”—সকলেরই একমাত্র উদ্দেশ্য, খরিদারের চোকে ধূলা দিয়া রদি মাল পাচার করিবে । দোকানদার খরিদ্দারে কেবল যুদ্ধ, কে কাকে ফাকি দিতে পারে । সস্তা খরিদের অবিরত । ভাবিয়া চিন্তিয়া, মনের দুঃখে আফিমের যাত্রা চড়াইলাম। তখন জ্ঞাননেত্ৰ ফুটিল । । সম্মুখে ভবের বাজার সুবিস্তৃত দেখিলাম । দেখিলাম, অসংখ্য দোকানদার, দোকান সাজাইয়া । বসিয়া আছে—অসংখ্য খরিদ্দারে খরিদ করিতেছে—দেখিলাম, সেই অসংখ্য দোকানদারে। অসংখ্য খরিদ্দারে পরম্পরকে অসংখ্য অঙ্গুষ্ঠ । দেখাইতেছে। অামি গামছা কাধে করিয়া, বাজার করিতে বাহির হইলাম। প্রথমেই রূপের । দোকানে গেলাম । যে জিনিষ ঘরে নাই, সেই । সংসারের সেই মেছে হাটা । পৃথিবীর রূপসীগণ মাছ হইয়া बूड़ि চুপড়ির ভিতর প্রবেশ করিয়াছেন। দেখিলাম, ছোট বড় রুই কাতলা, মৃগেল । লিস, চুনো পুটি, কই, মাগুর খরিদারের জন্ত । * * 8 কমলাকাণ্ডের দপ্তর। বেলা বাড়িতেছে, তত বিক্রয়ের জন্য খাবি খাইতেছে। —মেছনীরা ডাকিতেছে, “মাছ নেবে গো ! কুল পুকুরের সস্তা মাছ, অমনি ছাড়ব—বোঝা বিক্রী হলেই বাচি ।” কেহ ভাকিতেছে, “মাছ নেবে গো—ধন সাগরের মিঠা মাছ—যে কেনে তার পুনর্জন্ম হয় না—ধৰ্ম্ম অর্থ কাম মোক্ষ বিবির মুণ্ডে পরিণত হইয়া তার ঘর দ্বারে ছড়াছড়ি যায়, যার সাধ্য থাকে কিনিবে। সোণার হাড়িতে চোখের জলে সিদ্ধ করিয়া, হৃদয়-আগুনে কড়া জ্বাল দিয়া রাধিতে হয়—কে খরিদার সাহস করিস —আয় । সাবধান ! হীরার কাটা—নাতি বাটা—গলায় বাধলে শ্বাশুড়ীরূপী বিড়ালের পায়ে পড়িতে হয়—কাটার জ্বালায়, খরিদার হলে কি পলায় ।” কেহ ডাকিতেছে, ‘ওরে আমার সরম পুটি, বিক্রী হলেই উঠি । ঝোলে কালে অম্বলে, তেলেবিয়ে জলে, যাতে দিবে ফেলে, রান্না যাবে চলে,—সংসারের দিন সুখে কাটাবে, আমার এই সরম পুটির বলে।” কেহ বলিতেছে, “কাদা ছেচে চাঁদা এনেছি—দেখে २२é খরিদার পাগল হয় ! কিনে নিয়ে ঘর আলো কর ।” এইরূপ দেখিয়া শুনিয়া মাছ কিনিতে প্রবৃত্ত হইলাম—কেন না আমার নিরামিষ ঘর করন । দেখিলাম, মাছের দালাল আছে; নাম পুরোহিত। দালাল খাড়া হইলে দর জিজ্ঞাসা করিলাম—শুনিলাম, দর “জীবন সৰ্ব্বস্ব।” যে মাছ ইচ্ছা সেই মাছ কেন, একই দর, “জীবন সৰ্ব্বস্ব।” জিজ্ঞাসা করিলাম, “ভাল, এ মাছ কত দিন খাইব ?” দালাল বলিল, “দুদিন চারি দিন, তার পর পচিয়া গন্ধ হইবে।” তখন “এত চড়া দরে, এমন নশ্বর সামগ্রী কেন কিনিব ?” ভাবিয়া আমি মেছো হাট হইতে পলায়ন করিলাম। দেখিয়া মেছনীরা গামছা কাধে মিনসেকে গালি পাড়িতে লাগিল । । রূপের বাজার ছাড়িয়া বিদ্যার বাজারে গেলাম। দেখিলাম, এখানে ফলমূল বিক্রয় হয় । এক স্থানে দেখিলাম, কতকগুলি ফোট-কাট টিকিওয়াল ব্রাহ্মণ তসর গরদ পরিয়া, নাযাবলি গায়ে, ঝুনা নারিকেলের দোকান খুলিয়া বসিয়া ১২৩ কমলাকাস্তের দপ্তর। খরিদৃদার ডাকিতেছেন—“বেচি আমরা ঘটত্ব পটত্ব ষত্ব ণত্ব—ঘরে চাল থাকিলেই স্ব-ত্ব, নইলে ন-ত্ব । দ্রব্যত্ব জাতিত্ব গুণত্ব পদার্থ—রাপের শ্রাদ্ধে বিদায় না দিলেই তুমি বেট অপদার্থ। পদার্থতত্ত্ব নামে ঝুনা নারিকেল—খাইতে বড় কঠিন—তাহার প্রথম ছোবড়ায় লেখে যে, ব্রাহ্মণীই পরম পদার্থ। অভাব নামে নারিকেল চতুবির্বধ*—তোমার ঘরে ধন আছে, আমার ঘরে নাই, ইহা অন্যান্যাভাব । যত ক্ষণ না পাই, তত ক্ষণ প্রাগভাব ; খরচ হইয়া গেলেই ধ্বংসাভাব ; আর আমাদের ঘরে সর্বদাই অত্যন্ত অভাব। অভাব নিত্য কি অনিত্য যদি সংশয় থাকে, তবে আমাদের ভাণ্ডারে উকি মার—দেখিবে, নিত্যই অভাব । অতএব আমাদের ঝুনা নারিকেল কেন । ব্যাপ্য, ব্যাপক, ব্যাপ্তি, এ নারিকেলের শাস, ব্রাহ্মণের হস্ত হইল ব্যাপ্য, রজত হইল

  • নৈয়ারিকের বলেন, অভাব চতুৰ্ব্বিধ ; অন্যান্তাভাব,

প্রাগভাব, ধ্বংসাভাব, আর অত্যন্তাভাব । কমলাকাত্তের দপ্তর। १२१ ব্যাপক ; আর তুমি দিলেই ঘটিল ব্যাপ্তি ; এই বুন নারিকেল কেন এখনই বুঝিবে। দেখ, বাপু, কাৰ্য্য কারণ সম্বন্ধ বড় গুরুতর কথা ; টাকা দাও, এখনই একটা কাৰ্য্য হইবে, কম দিলেই অকাৰ্য্য। আর কারণ বুঝাইব কি, এই যে দুই প্রহর রৌদ্রে ঝুনা নারিকেল বেচিতে আসিয়াছি, ব্রাহ্মণীই তাহার কারণ—কিছু যদি না কেন, তবে নারিকেল বহা,—অকারণ । অতএব নারিকেল কেন, নহিলে এই ঝুনা নারিকেল মাথায় ঠুকিয়৷ মরিব ।” । & ব্রাহ্মণদিগের সেই প্রখর তপনতপ্ত ঘৰ্ম্মাক্ত ললাট এবং বাগবিতণ্ডাজনিত অধর-মুধাবৃষ্টি দেখিয়া দয়া হইল—জিজ্ঞাসা করিলাম, “হঁ। ভট্টাচাৰ্য মহাশয়! শুনা নারিকেল কিনিতে আপত্তি নাই, কিন্তু দোকানে দা আছে ? ছুলিবে। কি প্রকারে ?” । “না বাপু, দা রাখি না ।” । “তবে নারিকেল ছোল কিসে?” । ծ Հb- কমলাকাস্তের দপ্তর। শুনিয়া, আমি ব্রাহ্মণদিগকে নমস্কার করিয়া পাশের দোকানে গেলাম। দেখিলাম, ইহাদিগের সম্মুখেই এক্সপেরিমেন্টেল সায়েনসের দোকান । কতকগুলি সাহেব দোকানদার, কুন নারিকেল, বাদাম, পেস্তা, সুপারি প্রভৃতি ফল বিক্রয় করিতেছেন । ঘরের উপরে বড় বড় পিতলের অক্ষরে লেখা আছে । MESSRS BROWN JONES AND ROBINSON NUT suppliers ESTABLISHED 1757 ON THE FIELD OF PLASSEY. MESSRs BRowN JONES AND ROBINSON, offer to the Indian Public A Large Assortment of NUTS, PHYSICAL, METAPEIYSICAL, цoанслі, плосicді, - AND SUFFICIENT To BREAK THE JAws and * DISLoCATE THE TEETH OF ALL INDIAN YOUTHS wao sTAND IN NEED or HavING THEIR DENTAL SUPERFLUITIES GURTAILED. কমলাকাত্তের দপ্তর । । ১২৯ ৷ দোকানদার ডাকিতেছেন—“আয় কাল৷ offso Experimental Science খাবি আয় । দেখ, ১নম্বর এক্সপেরিমেন্ট—ঘুসি; ইহাতে দাত উপড়ে, মাথা ফাটে এবং হাড় ভাঙ্গে । আমরা এ সকল এক্সপেরিমেন্ট বিনামূল্যে দেখাইয়া থাকি—পরের মাথা বা নরম হাড় পাইলেই হইল । আমরা স্কুল পদার্থের সংযোগ বিয়োগ সাধনে পটু— রাসায়নিক বলে, বা বৈদ্যুতীয় বলে, বা চৌম্বুক । বলে, জড়পদার্থের বিশ্লেষণেই সুদক্ষ—কিন্তু সৰ্ব্বাপেক্ষ মু&্যাঘাতের বলে মস্তকাদির বিশ্লেষণেই আমরা কৃতকার্য্য । মাধ্যাকর্ষণ, যৌগিক|কর্ষণ, চৌম্মুকাকর্ষণ প্রভৃতি নানাবিধ আকর্ষণের কথা আমরা অবগত আছি, কিন্তু সৰ্ব্বাপেক্ষ কেশাকর্ষণেই আমরা কৃতবিদ্য । এই সংসারে জড়পদার্থের নানাবিধ যোগ দেখা যায় ; যথা বায়ুতে অম্লজান ও যবক্ষারজানের সামান্য যোগ, জলে জলজান ও অম্লজানের রাসায়নিক যোগ, আর তোমাদিগের পৃষ্ঠে, আমাদের হস্তে, মুষ্টিযোগ । অতএব, এই সকল আশ্চৰ্য্য ব্যাপার । -বাড়াইয়া দাও ; এক্সপেরি سحه. ృ\రిa কমলাকাস্তের দপ্তর । । মেণ্ট করিব। দেখিবে, গ্রাবিটেশ্যনের বলে এই সকল নারিকেলাদি তোমাদের মস্তকে পড়িবে ; পর্কশন নামক অদ্ভুত শাব্দিক রহস্যেরও পরিচয় পাইবে, এবং দেখিবে, তোমার মস্তিষ্কস্থিত স্নায়ব পদার্থের গুণে তুমি বেদন অনুভূত করিবে । অগিম মুল্য দিও ; তাহ হইলে চ্যারিটিতে এক্সপেরিমেন্ট খাইতে পারিবে ।” - আমি এই সকল দেখিতে শুনিতেছিলাম, এমত সময়ে, সহসা দেখিলাম যে, ইংরেজ দোকানদারেরা, লাঠী হাতে, দ্রুতবেগে ব্রাহ্মণদিগের ঝুনা নারিকেলের গাদার উপর গিয়া পড়িলেন, দেখিয়া ব্রাহ্মণের নারিকেল ছাড়িয়া দিয়া, নামাবলী ফেলিয়া, মুক্তকচ্ছ হইয়৷ উৰ্দ্ধশ্বাসে পলায়ন করিতে লাগিলেন। তখন সাহেবের সেই সকল পরিত্যক্ত নারিকেল দোকানে উঠাইয়া লইয়া আসিয়া, বিলাতী অস্ত্রে ছেদন করিয়া, সুখে আহার করিতে লাগিলেন । আমি জিজ্ঞাসা করিলাম যে, "এ কি হইল ?” সাহেবের বলিলেন,“ইহাকে বলে,Asiatic Researches" আমি তখন ভীত হইয়া, আত্মশরীরে কোন কমলাকাস্তের দপ্তর و هد প্রকার Anatonical researches stood করিয়া • সেখান হইতে পলায়ন করিলাম। । সাহিত্যের বাজার দেখিলাম। দেখিলাম, বাল্মীকি প্রভৃতি ঋষিগণ অমৃত ফল বেচিতেছেন বুঝিলাম, ইহ সংস্কৃত সাহিত্য ; দেখিলাম, আর কতকগুলি মনুষ্য নীচু পাঁচ পেয়ার আনারস আঙ্গুর প্রভৃতি স্বস্বাদু ফল বিক্রয় করিতেছেন—বুঝিলাম, এ পাশ্চাত্য সাহিত্য । আরও একখানি দোকান দেখিলাম—অসংখ্য শিশুগণ এবং অবলাগণ তাহাতে ক্রয় বিক্রয় করিতেছে—ভিড়ের জন্য তন্মধ্যে প্রবেশ করিতে পারিলাম না—জিজ্ঞাসা করিলাম, এ কিসের দোকান ? । বালকের বলিল, “বাঙ্গাল সাহিত্য।” । “বেচিতেছে কে ?” । “আমরাই বেচি। দুই এক জন বড় মহাজনও আছেন। তদ্ভিন্ন বাজে দোকানদারের ১৩২ ৷ কমলাকাস্তের দপ্তর । বিক্রেয় পদার্থ দেখিবার বাসনা হইল। দেখিলাম—খবরের কাগজ জড়ান কতকগুলি অপক কদলী । তাহার পরে কলুপটিতে গেলাম। দেখিলাম, যত উমেদার, মোসায়েব, সকলে কলু সাজিয়া তেলের ভাড় লইয়া সারি সারি বসিয়া গিয়াছে। তোমার ট্যাকে চাকরি আছে, শুনিতে পাইলেই, পী টানিয়া লইয়া, ভাড় বাহির করিয়া, তেল মাখাইতে বসে। চাকরি না থাকিলেও—যদি থাকে, এই ভরসায়, পা টানিয়া লইয়া, তেল লেপিতে বসে। তোমার কাছে চাকরি নাই—নাই নাই—নগদ টাকা আছে ত—আচ্ছা,তাই দাও—তেল দিতেছি । কাহারও প্রার্থনা, তোমার বাগানে বসিয়া তুমি যখন ব্রাণ্ডি খাইবে, আমি তোমার চরণে তৈল মাখাইব—আমার কন্যার বিবাহটি যেন হয় । কাহারও আদাশ, তোমার কানে অবিরত খোষামোদের গন্ধ তৈল ঢালিব—বাড়ীর প্রাচীরটি যেন দিতে পারি। কাহারও কামনা, তোমার তোষাখানার বাতি জ্বালিয়া দিব—আমার খবরের কাগজখানি কমলাকাস্তের দপ্তর। ১৩০ যেন চলে। শুনিয়াছি, কলুদিগের টানাটানিতে অনেকের পা খোড়া হইয়া গিয়াছে। আমার শঙ্কা হইল, পাছে কোন কলু আফিঙ্গের প্রার্থনায় । আমার পায়ে তেল দিতে আরম্ভ করে । আমি পলায়ন করিলাম । - তার পরে । ময়রাপট । সম্বাদপত্রলেখক । নামে ময়রাগণ, গুড়ে সন্দেশের দোকান পাতিয়া, নগদ মূল্যে বিক্রয় করিতেছে—রাস্তার লোক ধরিয়া সন্দেশ গতাইয়া দিয়া, হাত পাতিতেছে —মুল্য না পাইলেই কাপড় কাড়িয়া লইতেছে । এ দিকে তাহদের বিক্রেয় যশের দুর্গন্ধে পথিক নাসিক আবৃত করিয়া পলায়ন । कि তেে দোকানদারগণ বিনা ছানায়, শুধু গুড়ে, আশ্চৰ্য্য সন্দেশ করিয়া সস্তী দরে, বিক্রয় করিতেছেন । কেহ টাকাটা সিকেটায় আনা জু আনায়, কেহ কেবল খাতিরে—কেহ বা এক সাজ ফলাহার পেলেই, ছাড়েন—কেহ বা বাবুর গাড়িতে চড়িতে পেলেই যশোবিক্রয় করেন। অন্যত্র রাজপুরুষগণ মিঠাইওয়ালা সাজিয়া, রায়বাহাদুর, রাজাবাহাদুর খেতাব, খেলাত, নিমন্ত্রণ, ধন্যবাদ কমলাকাস্তের দপ্তর । । 8סי צ প্রভৃতি মিঠাই লইয়া দোকান পাতিয়া বসিয়া আছেন,—চাদা, সেলাম, খোষামোদ, ডাক্তারখান, রাস্তাঘাট, মূল্য লইয়া মিঠাই বেচিতেছেন । বিক্রয়ের বড় বেবন্দোবস্ত— কেহ সৰ্ব্বস্ব দিয়া এক ঠোঙ্গা পাইতেছে না—কেহ শুধু সেলামে দেড় মন লইয়া যাইতেছে । এইরূপ অনেক দোকান দেখিলাম—কিন্তু সৰ্ব্বত্রই পচা মাল আধা দরে বিক্রয় হইতেছে—খাটি দোকান দেখিলাম না । কেবল একখানি দোকান দেখিলাম—তাহা অতি চমৎকার । দেখিলাম দোকানের মধ্যে নিবিড় অন্ধকার—কিছু দেখা যায় না। ডাকিয় দোকানদারের উত্তর পাইলাম না— কেবল এক সৰ্ব্বপ্রাণিভীতিসাধক অনন্ত গর্জন শুনিতে পাইলাম—অল্পালোকে দ্বারে ফলক-লিপি পড়ি লাম । - - যশের পণ্যশালা । বিক্রেয়–অনন্ত যশ । বিক্রেতা-কাল । - মুল্য—জীবন । কমলাকাস্তের দপ্তর। రిr জীবস্তে কেহ এখানে প্রবেশ করিতে পারে না। । , আর কোথাও সুযশ বিক্রয় হয় না । । পড়িয়া ভাবিলাম—আমার যশে কাজ নাই— কমলাকান্তের প্রাণ বাচিলে অনেক যশ হইবে । বিচারের বাজারে গেলাম—দেখিলাম সেটা । কসাইখানা। টুপি মাথায়, শামলা মাথায়— । ছোট বড় কসাই সকল, ছুরি হাতে গোরু কাটিতেছে। মহিমাদি বড় বড় পশু সকল শৃঙ্গ । নাড়িয়া ছুটিয়া পলাইতেছে ;–ছাগ মেষ এবং গোরু প্রভৃতি ক্ষুদ্র পশু সকল ধরা পড়িতেছে। আমাকে দেখিয়া গোরু বলিয়া এক জন কসাই বলিল, “এও গোরু, কাটিতে হইবে।” আমি সেলাম করিয়া পলাইলাম। . * আর বড় বাজার বেড়াইবার সাধ রহিল নী —তবে প্রসন্নের উপর রাগ ছিল বলিয়া এক বার দইয়েহাটা দেখিতে লাগিলাম—গিয়া প্রথমেই দেখিলাম যে সেখানে খোদ কমলাকান্ত চক্রবৰ্ত্তী নামে গোয়ালা—দপ্তররূপ পচা ঘোলের হাড়ি লইয়া বসিয়া আছে—আপনি ঘোল খাইতেছে, এবং পরকে খাওয়াইতেছে। । అ কমলাকাত্তের দপ্তর । তখন চমক হইল—চক্ষু চাহিলাম—দেখিলাম, নশী বাবুর বাড়ীতেই আছি। ঘোলের হাড়ি কাছে আছে বটে। প্রসন্ন এক হাড়ি ঘোল আনিয়া আমাকে সাধিতেছে—“চক্রবর্তী মশাই—রাগ করিও না। আজ আর দুধ দই নাই—এই ঘোলটুকু আনিয়াছি—ইহার দাম দিতে হইবে ন৷ ” ।