কমলাকান্তের দপ্তর (দ্বিতীয় সংস্করণ)/সপ্তম সংখ্যা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

সপ্তম সংখ্যা । । বসন্তের কোকিল। তুমি বসন্তের কোকিল, বেশ লোক। যখন ফুল ফুটে, দক্ষিণ বাতাস বহে, এ সংসার সুখের স্পর্শে শিহরিয়া উঠে, তখন তুমি আসিয়া রসিকতা আরম্ভ কর। আর যখন দারুণ শীতে জীবলোকে থরহরি কম্প লাগে, তখন কোথায় থাক, বাপু ? যখন শ্রাবণের ধারায় আমার চালাঘরে নদী বহে, যখন বৃষ্টির চোটে কাক চিল ভিজিয়া গোময় হয়, তখন তোমার মাজা মাজা কালে কালো তুলালি ধরণের শরীরখানি কোথায় থাকে ? তুমি বসন্তের কোকিল, শীত বর্ষার কেহ নও । । রাগ করিও না—তোমার মত আমাদের মাঝখানে অনেকে আছেন । যখন নশী বাবুর তালুকের খাজান আসে, তখন মানুষ-কোকিলে তাহার গৃহকুঞ্জ পূরিয়া যায়—কত টিকি, ফোটা, কমলাকাভের দপ্তর । ьс তেড়ি, চসয়ার হাট লাগিয়া যায়—কত কবিতা, শ্লোক, গীত, হেটো ইংরেজি, মেটো ইংরেজি, চোর। ইংরেজি, ছেড়া ইংরেজি,(যশুরে ইংরেজিতে নশী বাবুর বৈঠকখানা পারাবত-কাকলিসংকুল গৃহসেীধৰং, বিকৃত হইয়া উঠে। যখন তাহার বাড়ীতে নাচ, গান, যাত্রা, পৰ্ব্ব উপস্থিত হয়, তখন দলে দলে মানুষ, কোকিল আসিয়া, তাহার ঘর বাড়ী অর্ণধার করিয়া তুলে —কেহ খায়, কেহ গায়, কেহ হাসে, কেহ কাশে, কেহ তামাক পোড়ায়, কেহ হাসিয়া বেড়ায়, কেহ মাত্র। চড়ায়, কেহ টেবিলের নীচে গড়ায়। যখন নশীবাবু বাগানে যান,তখন মানুষ কোকিল, তাছার সঙ্গে পিপীড়ার সারি দেয়। আর যে রাত্রে, অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হইতেছিল, আর নশী বাবুর পুত্রটির অকালে সত্যু হইল, তখন তিনি একটি লোক পাইলেন না । কাহ|রও “অসুখ,” এজন্য আসিতে পারিলেন না ; কাহারও বড় মুখ—একটি নাতি হইয়াছে, এজন্য আসিতে পারিলেন না ; কাছারও সমস্ত রাত্রি নিদ্রা হয় নাই, এজন্য আসিতে পারিলেন না ; جty কমলাকাত্তের দপ্তর । في بb কেহ সমস্ত রাত্রি ঘোর নিদ্রায় অভিভূত, এজন্য আসিতে পারিলেন না। আসল কথা,সে দিন বর্ষা, বসন্ত নহে, বসন্তের কোকিল সেদিন আসিবে কেন? তা ভাই, বসন্তের কোকিল, তোমার দোষ নাই, তুমি ডাক। ঐ অশোকের ডালে বসিয়া । রাঙ্গ ফুলের রাশির মধ্যে কাল শরীর, জ্বলন্ত আগুনের মধ্যগত কালো বেগুনের মত, লুকাইয়। রাখিয়া, এক বার তোমার ঐ পঞ্চম স্বরে, কু—উ বলিয়া ডাক। তোমার ঐ কু—উ রবটি আমি বড় ভালবাসি। তুমি নিজে কালে –পরান্নপ্রতিপালিত, তোমার চক্ষে সকলই “কু”—তবে যত পার, ঐ পঞ্চম স্বরে ডাকিয়া বল, “কু—উ ।” যখন এ পৃথিবীতলে এমন কিছু সুন্দর সামগ্ৰী দেখিবে যে, তাহাতে তোমার দ্বেষ, হিংসা, ঈর্ষ্যার উদয় হয়, তখনই উচ্চ ডালে বসিয়া ডাকিয়া বলিও, “কু—উ”—কেন না তুমি সৌন্দৰ্য্য-শূন্য, পরান্নপ্রতিপালিত । যখনই দেখিবে, লতা সন্ধ্যার বাতাস পাইয়া, উপযুপিরি বিন্যস্ত পুপ-স্তবক লইয়া দুলিয়া উঠিল, আমনি মুগন্ধের তরঙ্গ ছুটিল—তখনই ডাকিয় বলিও কমলাকাত্তের দপ্তর। । وسوف “কু—উঃ - যখনই দেখিবে, অসংখ্য গন্ধরাজ এক কালে ফুটিয়া আপনাদিগের গন্ধে আপনার বিভোর হইয়া,এ উহার গায়ে ঢলিয়া পড়িতেছে, তখনই তোমার সেই ডাল হইতে ভাকিয়৷ বলিও, “কু—উঃ । যখন দেখিবে, বকুলের অতি ঘনবিন্যস্ত মধুরশ্যামল মিগ্ধোজ্জ্বল পত্ররাশির শোভা আর গাছে ধরে না—পূর্ণযৌবন সুন্দরীর লাবণ্যের ন্যায় হাসিয়া হাসিয়া, ভাসিয়া ভাসিয়া, হেলিয়া দুলিয়া, ভাঙ্গিয়া গলিয়া, উছলিয় উঠতেছে, তাহার অসংখ্য প্রস্ফুট কুস্থমের গন্ধে আকাশ মাতিয়া উঠিতেছে—তখন তাহারই আশ্রয়ে বসিয়া সেই পাতার স্পর্শে অঙ্গ শীতল করিয়া,সেই গন্ধে দেহপবিত্র করিয়া,সেই বকুলকুঞ্জ হইতে ডাকিও, এ “কু—উঃ ” যখন । দেখিবে, শুভ্ৰ-মুখী, শুদ্ধশরীরা, সুন্দরী নবমল্লিকা সন্ধ্যা-শিশিরে সিক্ত হইয়া, আলোক-প্রাখর্ঘ্যের হ্রাস দেখিয়া, ধীরে ধীরে মুখখানি খুলিতে সাহস করিতেছে—স্তরে স্তরে অসংখ্য অকলঙ্ক দল-রাজি বিকসিত করিবার উপক্রম করিতেছে, —যখন দেখিবে যে, ভ্রমর সে রূপ দেখিয়া— । ᎽᎭ 頓 কমলাকাত্তের দপ্তর। “আদরেতে আগুসারি”—কণ্ঠভরা গুনগুন মধু ঢালিয়া দিতেছে—তখন, হে কালামুখ ! আবার “কু—উঃ”বলিয়া ডাকিয় মনের জ্বালা নিবাইও । আর যখনই গৃহস্থের গৃহপ্রাঙ্গনস্থ দাড়িম্বশাখায় বসিয়া, দেখিবে সেই গৃহপুপরূপিণী কন্যাগণে সেই লতার দোলনি, সেই গন্ধরাজের প্রস্ফুটতা সেই বকুলের রূপোচ্ছাস, সেই মল্লিকার অমলতা একাধারে মিলিত করিয়াছে, তখনই তাহাদের মুখের উপর, ঐ পঞ্চম-স্বরে, গৃহপ্রাচীর প্রতিধ্বনিত করিয়া,সবাইকে ডাকিয়া বলিও,এত রূপ,এত সুখ,এত পবিত্রতা—এ“কু—উঃ ” ঐটি তোমার জিত—ঐ পঞ্চম-স্বর! নহিলে তোমার ও কু—উ কেহ শুনিত না । এ পৃথিবীতে গ্লাডষ্ট্রোন ডিস্ৰেলি প্রভৃতির ন্যায়,—তুমি কেবল গলাবাজিতে জিতিয়া গেলে—নহিলে অত কালো চলিত না ; তোমার চেয়ে হাড়িচাচা ভাল গলাবাজির এত গুণ না থাকিলে,যিনি বাজে নবেল লিখিয়াছেন,তিনি রাজমন্ত্রী হইবেন কেন ? আর জন ইয়ার্ট মিল পার্লিমেন্টে স্থান পাইলেন না কেন? তবে, কোকিল, তুমি প্রকৃতির মহা-পালি কমলাকাত্তের দপ্তর। - . ** - মেন্টে দাড়াইয়া নক্ষত্রময় নীলচন্দ্রাতপমণ্ডিত, গিরিনদী নগর কুঞ্জাদি বেঞ্চে স্থসজ্জিত, ঐ মহাসভা-গৃহে,তোমার এ মধুর পঞ্চম-স্বরে—কু—উঃ ৰলিয়া ডাক—সিংহাসন হইতে হষ্টিংস পৰ্য্যন্ত সকলেই কাপিয় উঠুক। “কু—উঃ ” ভাল, তাই ; ও কলকণ্ঠে কু বলিলে কু মানিব, স্থ বলিলে স্ব মানিব । কু বৈ কি ? সব কু। লতায় কণ্টক আছে ; কুস্থযে কীট আছে; গন্ধে বিষ আছে ; পত্র শুষ্ক হয়, রূপ বিকৃত হয়, স্ত্রীজাতি বঞ্চনা জানে। কু—উঃ বটে—তুমি গাও। কিন্তু তুমি ঐ পঞ্চম-স্বরে কু বলিলেই কু মানিব— নচেৎ কঁকড়ো বাবুজি “কু কু কু কু” বলিয়া আমার সুখের প্রভাত নিদ্রাকে কু বলিলে আমি মানিব না। তার গলা নাই। গলাবাজিতে সংসার শাসিত হয় বটে, কিন্তু কেবল চেচাইলে হয় না ; যদি শব্দ-মন্ত্রে সংসার জয় করিবে, তবে যেন তোমার স্বরে পঞ্চম লাগে—বে-পর দা বা কড়িমধ্যমের কাজ নয়। সরু জেমস মাকিন্টশ, প্তাহার বক্তৃতায় ফিলজফির* কুড়িমধ্যম মিশা 高9 কমলাকাস্তের দপ্তর । ইয়া হারিয়া গেলেন—আর মেকলে রেটরিকের* পঞ্চম লাগাইয়া জিতিয়া গেলেন । ভারতচন্দ্র আদিরস পঞ্চমে ধরিয়া জিতিয়া গিয়াছেন—কবিকঙ্কণের ঋষভ-স্বর কে শুনে ? দেখ লোকের বৃদ্ধ পিতা মাতার বেস্তুরো বক্লাবকিতে কোন ফল দর্শে ? আর যখন বাবুর গৃহিণী বাবুর স্বর বাধিয়া দিবার জন্য বাবুর কান টিপিয়া ধরিয়া পঞ্চমে গলার আওয়াজ দেন, তখন বাবু পিড়িং পিড়িং বলেন, কি না ? তবে তোমার স্বরকে পঞ্চম-স্বর কেন বলে,তাহা বুঝি না। যাহা মিষ্ট, তাহাই পঞ্চম ? দুইটি পঞ্চম মিষ্ট্র বটে,—স্বরের পঞ্চম, আর আলতাপর ছোট পায়ের গুজরী পঞ্চম । তবে,স্থর,পঞ্চমে উঠিলেই মিষ্ট্র ; পায়ের পঞ্চম,পা হইতে নামাইলেই মিঃ । কোন স্বর পঞ্চম, কোন স্বর সপ্তম, কে মধ্যম, কে গান্ধার আমাকে কে বুঝাইয়া দিবে ? এটি হাতীর ডাক, ওটি ঘোড়ার ডাক, সেটি ময়ুরের কেক, ওটি বানরের কিচিমিচি,এ বলিলে ত কিছু বুঝিতে পারি না। আমি আফিংখোর—বেহরো —ज्ञतः—— কমলাকাত্তের দপ্তর । సి' শুনি, বেম্বরে বুঝি, বেস্তুরো লিখি—ধৈবত গান্ধার নিষাদ পঞ্চমের কি ধার ধারি? যদি কেহ। পাখোয়াজ তানপুর দাড়ী দাত লইয়া, আমাকে সপ্ত স্বর বুঝাইতে আসে, তবে তাহার গর্জন শুনিয়া, মঙ্গলা গাইয়ের সদ্যঃপ্রসুত বৎসের ধ্বনি আমার মনে পড়ে—তাহার পীতাবশিষ্ট নির্জল দুগ্ধের অনুধ্যানে মন ব্যস্ত হয়—স্থর বুঝা হয় না। আমি গায়কের নিকট কৃতজ্ঞ হইয় তাহাকে কায়মনোবাক্যে আশীৰ্ব্বাদ করি, যেন তিনি জন্মান্তরে মঙ্গলার বৎস হন । । এখন আয়, পার্থী ! তোতে আমাতে এক বার পঞ্চম গাই। তুইও যে, আমিও সে—সমান দুঃখের দুঃখী, সমান সুখের সুখী । তুই এই পুষ্পকাননে, বৃক্ষে বৃক্ষে আপনার আনন্দে গাইয়া বেড়াস্—আমিও এই সংসার-কাননে, গৃহে গৃহে, আপনার আনন্দে এই দপ্তর লিখিয়া বেড়াই—আয়, ভাই, তোতে আমাতে মিলে মিশে পঞ্চম গাই। তোরও কেহ নাই—আনন্দ আছে, আমারওঁ কেহ নাই—আনন্দ আছে। তোর পুজিপাটা ঐ গল ; আমার পুজিপাট, এই আফি *३३ কমলাকাত্তের দপ্তর । ঙ্গের ডেলা ; তুই এ সংসারে পঞ্চম-স্বর ভালবাসিস —আমিও তাই ; তুই পঞ্চম-স্বরে কারে ডাকিস ? আমিই বা কারে ? বল দেখি, পার্থী, কারে ? - - - - যে সুন্দর, তাকেই ডাকি ; যে ভাল, তাকে ডাকি ; যে আমার ডাক শুনে, তাকেই ডাকি । এই যে আশ্চৰ্য্য ব্রহ্মাণ্ড দেখিয়া কিছুই বুঝিতে না পারিয়া বিস্মিত হইয়া আছি, ইহাকেই ডাকি । এই অনন্ত সুন্দর জগৎ-শরীরে যিনি আত্মা, তবে তাহাকে ডাকি। আমিও ডাকি, তুইও ডাকিস । জানিয়া, ডাকি না জানিয়া ডাকি, সমান কথা ; তুইও কিছু জানিস না, আমিও জানি না ; তোরও ডাক পৌছিবে, আমারও ডাক পৌছিবে । যদি সৰ্ব্বশব্দগাহী কোন ৷ কর্ণ থাকে, তবে তোর আমার ডাক পৌছিবে না কেন ? অায়, ভাই, এক বার মিলে মিশে দুই জনে পঞ্চম-স্বরে ডাকি । তবে, কুহুরবে সাধাগলায়, কোকিল এক বার ডাক দেখি রে । কণ্ঠ নাই বলিয়া, আমার মনের কথা কখন বলিতে পাইলাম না। যদি তোর ও কমলাকাত্তের দপ্তর । సిథి ভুবন-ভুলান স্বর পাইতাম, ত বলিতাম। তুই । আমার সেই মনের কথা প্রকাশ করিয়া দিয়া এই পুপময় কুঞ্জবনে এক বার ডাক দেখি রে । কি কথাটি বলিব বলিব মনে করি, বলিতে জানি না, সেই কথাটি তুই বল্প দেখি রে । কমলাকান্তের মনের কথা, এ জন্মে বলা হইল না—যদি কোকিলের কণ্ঠ পাই—অমানুষী ভাষা পাই, আর । নক্ষত্রদিগকে শ্রোতা পাই, তবে মনের কথা বলি। ঐ নীলাম্বর মধ্যে প্রবেশ করিয়া, ঐ নক্ষত্রমণ্ডলীমধ্যে উড়িয়া, কখন কি কুহু বলিয়৷ ডাকিতে পাইব না ? আমি না পাই, তুই কোকিল আমার হয়ে এক বার ডাক দেখি রে! : ঐকমলাকাত্ত চক্ৰবৰ্ত্তী ।