বিষয়বস্তুতে চলুন

কল্কিপুরাণ (ভুবনচন্দ্র বসাক)/অনন্ত-কথা

উইকিসংকলন থেকে

অনন্ত কথা।

সুত বলে রাজাগণ কল্কির বদনে।
বিপ্র বৈশ্য ক্ষেত্রি আর বৈশ্যধর্ম্ম শুনে॥
সংসার বিবেকী ধর্ম্ম আছয়ে যেমন।
কল্কিদেব সেই সব করান শ্রবণ॥

তার পর নৃপগণ করে নিবেদন।
নর নারী হয় কেন বার্দ্ধক্য যৌবন॥
কি কারণে সুখ দুঃখ কোথা হতে হয়।
জানি না এ সব তত্ত্ব কহ দয়াময়॥
এই কথা শুনে কল্কি অনন্তেরে স্মরে।
তীর্থবাসী মুনি আসি বলে যোড় করে॥
কি কাজ করিতে দেব কোথা যেতে হবে।
আজ্ঞা কর দয়াময় মোরে যে সম্ভবে॥
অনন্তের কথা শুনে হেঁসে কল্কি কয়।
যা বলেছি জান সব দেখ সমুদয়॥
অদৃষ্টে লিখন যাহা কে করে খণ্ডন।
কর্ম্ম বিনা ফল লাভ না হয় কখন॥
কল্কিকথা শুনে মুনি আহ্লাদিত হন্।
তথা হতে যেতে ব্যস্ত দেখে নৃপগণ॥
জিজ্ঞাসে আশ্চর্য্য হয়ে কও ভগবন্।
বলাবলি মুনিসনে কি হল কেমন॥
কল্কি বলে সেই কথা জানতে ইচ্ছা হয়।
মুনিরে জিজ্ঞাসা কর নৃপ সমুদয়॥
কল্কি বাক্যে অনন্তেরে সবে যুড়ি পাণি।
কল্কি সনে কোন্ কথা কহিলা আপনি॥

কিছুই না বুঝি মোরা অহে মুনিবর।
প্রকাশ করিয়ে কহ কথা মনোহর॥

কহেন অনন্ত সে কালে পুরিকা পুরে।
বিদ্রুম নামেতে ঋষি ছিল বাস করে॥
তিনি পিতা সোমা মাতা বয়সেতে হই।
ক্লীব দেখে দুঃখী, তাঁরা ঘৃণিত সবাই॥
শোক দুঃখ ভয়াকুলে পিতা ত্যজি ঘর।
শিব বনে গিয়ে সদা পূজেন শঙ্কর॥
বলে এক মাত্র তিনি জীবের আশ্রয়।
যিনি শুভপ্রদ কণ্ঠে সর্প শোভাময়।
ষাঁর জটা জুটে গঙ্গা সদা বদ্ধ রন্।
দেব দেব সে শঙ্করে নমি অনুক্ষণ
হয়ে তুষ্ট ভোলানাথ বৃষ আরোহণে।
বর লও বলে বাপে প্রসন্ন বদনে॥
পিতা বলে দেব! পুত্ত্র মোর ক্লীব দেখে।
দিন দিন থাকি আমি সদাই অসুখে॥
পুরুষত্ব বর শিব দিলেন আমায়।
তখনি পার্ব্বতী দেন পতি-বাক্যে সায়॥

মাতা পিতা তুষ্ট দেখে পুরুষ আকার।
মহানন্দে দিল বিয়ে হই বর্ষ বার॥
যজ্ঞরাত তনয়ারে দেখিয়ে সুন্দরী।
দিবা নিশি গৃহে থাকি বশীভূত তারি॥
পিতা মাতা পরে স্বর্গে করিলে গমন।
বিধি মত শ্রাদ্ধ শান্তি করি সমাপন॥
মাতা পিতা বিনে দুঃখী হই হে রাজন।
এক মনে সদা করি বিষ্ণু আরাধন॥
পূজা জপে তুষ্ট বিষ্ণু স্বপ্নে আসি কন।
সংসারে যে কিছু সব মায়া নিবন্ধন॥
ইনি পিতা ইনি মাতা কেহ কার নয়।
মায়া মৃত্যু ক্লেশ মাত্র শোক দুঃখ ভয়॥
বিষ্ণু কথা শুনে ব্যস্ত সন্দেহ নাশিতে।
অন্তর্হিত হন্ হরি না পাই দেখিতে॥
প্রিয়া সনে গৃহ ছাড়ি জগন্নাথে যাই।
ডান দিকে কুঁড়ে বাঁধি চিন্তাতে কাটাই॥
দেখির কেমন মায়া হরি নাম করি।
নৃত্য গীতে জপি তাঁরে সুখে দিন হরি॥
কাটাই বৎসর বার বিষ্ণু আরাধনে।
সাগরে নাইতে যাই দ্বাদশী পারণে॥

ডুবে যাই ঢেউ লেগে হাবু ডুবু খাই।
সাগর দক্ষিণ তীরে বায়ুবেগে যাই॥
বৃদ্ধশর্ম্মা নামে বিপ্র সন্ধ্যা করি সায়।
মরা যত মোরে দেখি ঘরে লয়ে যায়॥
আরাম করিয়ে পালে ছেলের মতন।
পুত্ত্র ধনে সুখী বৃদ্ধ ছিল হে রাজন্॥
দিক্ হারা হয়ে আমি রই সেইখানে।
পিতা মাতা মত মানী তাঁদের দুজনে॥
বৃদ্ধশর্ম্মা বেদে দীক্ষা করিয়ে আমায়।
চারুমতী কন্যা তাঁর বিয়ে মোরে দেয়॥
সোণার বরণ তার পরমা সুন্দরী।
মোহে পোড়ে তারে লয়ে সতত বিহারী॥
পাঁচ পুত্ত্র হয় মোর বিজয় কমল।
জ্যেষ্ঠ পুত্র বুধ নাম কনিষ্ঠ বিমল॥
ধন পুত্ত্রে দেব মান্য ইন্দ্র সম হই।
জ্যেষ্ঠ পুত্র বিয়ে, বড় ধুম ধামে দেই॥
অভ্যুদয় হেতু আমি করিতে তর্পণ।
সানন্দে সাগর তীরে করিনু গমন॥
কর্ম্ম সারি জলে থেকে উঠিব যখন।
সন্ধ্যা পূজা করি দেখি পূর্ব্ব বন্ধুগণ॥

হে নৃপতিগণ, আমি বড়ই উন্মনে।
পারণ করিতে দেখি ভক্ত বিপ্রগণে॥
রূপ আয়ু কিছু মাত্র ব্যত্যয় না হয়।
জিজ্ঞাসে আমারে সবে দেখিয়ে বিস্ময়॥
অনন্ত ব্যাকুল কেন? ভক্ত চূড়ামণি।
ত‍্যজিয়ে পারণা, বল কি ভাব তা শুনি॥
দেখি নাই শুনি নাই কিছু হে ব্রাহ্মণ।
কামে বিমোহিত আমি বড় নীচ মন॥
দেখিতে সে হরি মায়া চিন্তা করি মনে।
জ্ঞান বুদ্ধি হলো লোপ সেই মায়া গুণে॥
হায় কি আশ্চর্য্য বড় নিজে ভুলে রই।
আমি বিনা মায়া মম জানে না কেহই॥
দারা পুত্ত্র ধনাগার বিবাহ বিষয়।
ছট ফট করে মন তাই মনে হয়॥
দেখ্চি সকলি স্বপ্ন, দেখে ভার্য্যা বলে।
কাছে এসে কেঁদে পড়ে কি হলে কি হলে॥
জগন্নাথে পূর্ব্ব নারী স্মরি পর নারী।
কাতর হইনু কত বলিতে না পারি॥
জনেক পরমহংস এমন সময়।
কাছে আসি হিত-বাক্যে আমারে বোঝায়॥

পরম ধার্ম্মিক তিনি ধীর তত্ত্বজ্ঞানী।
সুর্য্যের সমান তেজী শান্ত মূর্ত্তি খানি ॥
পরমহংসেরে দেখি মম বন্ধুগণ।
কাছে আসি পূজা করি মঙ্গল সুধান॥

ইতি অনন্ত কথা।