কল্কিপুরাণ (ভুবনচন্দ্র বসাক)/কল্কির বিবাহের উদ্যম
কল্কির বিবাহের উদ্যম।
শুক বলে ভগবান্ পদ্মা সখী সনে।
ভাবিতে ভাবিতে, হরি বিরস বদনে॥
বিমলারে ডেকে বলে শুন ওলো সই।
বিয়ে হবে ধূম ধাম পতি মোর কই॥
এ কি বিধি বিড়ম্বনা পুরুষ হেরিলে।
তখনি রমণী হয় কি লেখো কপালে॥
কোথা হে শঙ্কর! মোর কোথা পতি বল।
করেছি যে আরাধনা হবে কি বিফল॥
তব বাক্য মিথ্যা যদি বিষ্ণু পতি নন।
আগুণে এ দেহ দিয়ে ত্যজিব জীবন॥
আমি যে মানবী কোথা দেব জনার্দ্দন।
বঞ্চনা করেছে শিব বিধি বিড়ম্বন॥
বিষ্ণুতেজী আমা সমা বাঁচে কোন নারী
পদ্মার শোকের কথা কহিতে না পারি॥
শুকমুখে শুনে কল্কি বিস্ময় হইয়া।
শুকে বলে শীঘ্র যাও এসো বুঝাইয়া ॥
মম প্রণয়িনী পদ্মা আমি তার পতি।
বিধাতা লিখেছে এই জান মহামতি॥
আনন্দে প্রণমি শুক কল্কির বচনে।
যাইল সিংহলে, উপনীত কিছু ক্ষণে॥
স্নান কোরে জল খেয়ে সাগরের পারে।
রাজার বাড়ীতে যান কন্যা অন্তঃপুরে॥
নাগেশ্বর গাছে বসি মানুষের স্বরে।
জিজ্ঞাসে পদ্মারে দেখি সম্বোধন কোরে॥
হে বরবর্ণিনি, রূপ-যৌবন-শালিনী।
কমল বদন তব ওহে কমল নয়নি ॥
পদ্মকর পদ্মগন্ধা ও পদ্মবাসিনী।
তোমারে কোরেছে ব্রহ্মা ভুবন মোহিনী॥
শুকবাক্য শুনে পদ্মা হাঁসিতে হাঁসিতে।
বলে তুমি কে আপনি ইচ্ছুক জানিতে॥
দেব কি দানব তুমি শুক রূপ ধরি।
এসেছেন কোথা হতে বল কৃপা করি॥
হে দেবি! সর্ব্বজ্ঞ আমি সর্ব্ব শাস্ত্র জানি।
পূজিত সভায় সব আমি কামগামী॥
যেথা ইচ্ছা সেথা যাই গগণে বেড়াই।
তোমারে দেখিতে হেথা আসিয়াছি তাই॥
কি দুঃখ ঘটেছে আজি কেন ভাব মনে।
কিছু মাত্র হাঁসি নাই এ চাঁদ বদনে॥
অঙ্গ শোভা গেছে দেখি ত্যজি আভরণ।
আমোদ প্রমোদ নাই বিরস বদন॥
ভাব দেখে দুঃখে মরি জিজ্ঞাসা করি না।
সুধা মুখে মধু কথা শুনিতে বাসনা॥
মধুর এ কণ্ঠস্বরে নীরবে কোকিল।
যাঁর কানে গেছে তাঁর তপে কিবা ফল॥
অধর দশন তব রসনা হইতে।
নির্গত অক্ষর পাঁতি জীব উদ্ধারিতে॥
তুচ্ছ সে শারদ কান্তি বলি সুধাননে।
কোমল শিরিশফুল লজ্জা পায় মনে॥
পণ্ডিতে অমৃত শ্রেষ্ঠ দেবের গণনা।
আপনার বাক্য সনে হয় না তুলনা॥
বাহুলতে আলিঙ্গিতে যিনি সুধা পান।
করিতে না হবে তাঁরে জপ তপ ধ্যান
হে রাজনন্দিনী! এই তিলক শোভিত।
চঞ্চল নয়ন লোল, কুণ্ডল মণ্ডিত॥
এ মুখ চন্দ্রিমা যেবা করে নিরীক্ষণ।
ধরাধামে জন্ম তার হবে না কখন॥
রোগ নাই দেহ কৃশ কেন হে ভামিনী।
বল ছাই হয় কেন স্বর্ণ মূর্ত্তিখানি ॥
হরি যাঁর প্রতিকূল শুকে পদ্মা কন।
রূপে কুলে বংশে ধনে কিবা প্রয়োজন॥
আমার বৃত্তান্ত যদি অবিদিত হন।
বলিতেছি প্রকাশিয়ে কর হে শ্রবণ॥
কত যে সাধনা শিবে ছেলেবেলা করি।
তুষ্ট হয়ে আইলেন শঙ্কর শঙ্করী॥
বলে কিছু লও বর কথাই না কই।
সমুখেতে অধোমুখে দাঁড়াইয়া রই॥
তাই দেখে বলে পদ্মে! পতি হবে হরি।
যে হেরিবে কামভাবে সেই হবে নারী॥
বর দিয়ে বিষ্ণুপূজা শিখাইয়া যান।
তাও বলিতেছি পরে কর অবধান॥
এই যত সখী দেখ রাজার কুমার।
এনেছিল স্বয়ম্বরে জনক আমার॥
সবে যুবা রূপে গুণে ছিল ধনবান।
মোরে কামভাবে হেরে নারীদশা পান॥
দেখে উচ্চ পয়োধর, নিতম্বের ভার।
চিন্তা করি সহচরি হইল আমার॥
আমা সনে নারায়ণে ধ্যান পূজী করে।
আমিও যে কত পূজি ইহাঁদের তরে॥
শুনে শুক মিষ্ট বাক্যে পদ্মারে শুধায়।
বিষ্ণু আরাধনা দেবী শুনাও আমায়॥
ইতি কল্কির বিবাহ উদ্যম।