কল্কিপুরাণ (ভুবনচন্দ্র বসাক)/পদ্মা কক্ষির সাক্ষ্যাৎ
পদ্মা কল্কির সাক্ষাৎ।
অশ্ব হতে নেবে কল্কি সরোবরে চলে।
স্ফটিক সোপানে বসে, শুন শুক বলে॥
সমাদরে ডাকি শুকে পুলকিত মনে।
বলে যাও শীঘ্র যাও পদ্মার আশ্রমে॥
নাগেরশ্ব গাছে বসি শুক দেখে সব।
পদ্মার সে মুখপদ্ম ম্লান অসম্ভব॥
সেজেতে পড়িয়ে করে আতার কাতার।
সখীরা বাতাস করে তবু হাহাকার॥
দেখে শুরু হেন দশা কাছে আসি কয়।
এত যে চঞ্চল কেন কি ভয় কি ভয়॥
শুকে দেখি ডেকে কাছে ভাল আছ কয়।
তোমার মঙ্গল হৌক কুশল ত হয়॥
কহিল মঙ্গল শুক, সব হে শোভনে।
তোমার এ দশা কেন আছ যে কেমনে॥
ছট ফট করে মন তুমি গেলে পরে।
বলিতে না পারি মন কেমন যে করে॥
শুক বলে দেবি আর ভাবনা কি তার।
এখনি চাঞ্চল্য সব যাবে আপনার॥
পদ্মা বলে কোথা আছে হেন রসায়ন।
শুক বলে এইখানে পাবে দরশন॥
আমি যে হতভাগিনী পাব না পাব না।
শুক বলে সরে গিয়ে দেখ না দেখ না॥
এসেছি দুজনে মোরা আর কি ভাবনা।
চল চল সখীসনে বিলম্ব কোরো না॥
শুকমুখে দিয়ে মুখ নয়নে নয়ন।
আনন্দে না বাঁচে পদ্মা ডাকে সঙ্গীগণ॥
বিমলা মালিনী লোলা, কুমুদা কমলা।
চল ওরে চারুমতি ও কামকন্দলা॥
চল সরোবরে তোরা ওরে বিলাসিনী।
নয়ন জুড়াই গিয়ে দেখে চিন্তামণি ॥
ভুলি চড়ে পদ্মা দেবী যান সরোবরে।
যৌবনে গর্ব্বিতা নারী ডুলি কাঁধে করে॥
দরশনে যদুপতি রুক্মিণী যেমন।
সেই মত দেখ্তে পদ্মা করেন গমন॥
পদ্মার গমন শুনে রাস্তার দুধারী।
পলায় পুরুষ সব পাছে হয় নারী।
চাঁদবদনা শোভনা যতেক ললনা।
সরোবরে নেয়ে করে শশিরে রাসনা॥
মদান্ধ ভ্রমরা যত কথা ত মানে না।
মুখপদ্মে বসে গিয়ে তাড়ালেও যায় না॥
নৃত্য গীত বাদ্যে পদ্মা প্রফুল্ল অন্তরে।
সখীসনে ধরাধরি জলকেলি করে॥
শুরু কথা মনে পোড়ে জ্বরে কামশরে।
সখী রে! কদম্ব কুঞ্জে মোরে লয়ে চল্ রে॥
মণিময় বেদিকায় কল্কি শুরু সনে।
সূর্য্যের সমান তেজী আছেন শয়নে॥
শ্রীবৎস কৌস্তুভ কান্তি অতি মনোহর।
পীতাম্বর পরিধেয় শ্যাম কলেবর॥
আজানুলম্বিত ভুজ কমল লোচন।
কমলাপতিরে পদ্মা করে নিরীক্ষণ॥
রূপ দেখে ভুলে যায় করিতে সৎকার।
শুক দেখে চেষ্টা পায় নিদ্রা ভাঙাবার॥
থাম থাম বলে পদ্মা চিন্তা বড় মনে।
পাছে নারী হয়ে যান মম দরশনে॥
তা হলে শিবের বর কি হবে আমার।
সে সব আমার পক্ষে শাপ মাত্র সার॥
পদ্মার মনের ভাব বুঝে উঠে জেগে।
রূপসী পদ্মারে দেখে দাঁড়াইয়ে আগে॥
দেখা মাত্র পদ্মা দেবী লজ্জাতেই মরে।
কাছে এস বলে কল্কি কামশরে জ্বরে॥
আজি যে কি শুভ দিন দেখা তব সনে।
কুশল হউক সব হে চাঁদ বদনে॥
দংশেছে মন্মথ সর্প বিষ চড়ে গায়।
তোমা বিনা নাহি দেখি শান্তির উপায়॥
আমি জগতের নাথ তবু সুলোচনে।
তোমা বিনা শান্তি লাভ নহে এ জীবনে॥
মত্ত গজ কুম্ভে শাদী অঙ্কুশ আঘাতে।
বিদারণ করে মাথে আপনার হাতে॥
আয়ত যুগলভুজে নখাঙ্কু শাঘাতে।
হৃদি ফেটে যায়, দূর কর সে মন্মথে॥
সুগুল যুগল কুচ বস্ত্র ঢাকা রয়।
গর্ব্ব খর্ব্ব কর ওর দলিয়ে হৃদয়॥
রেখাবলি চিহ্নে এই চিহ্নিত ত্রিবলী।
ঋতুরাজ সিঁড়ি সেই কন্দর্পের কেলি॥
ওরে প্রাণপ্রিয়ে আর আমি কি জানিনে।
কাম-দর্প চূর্ণ এই নিতম্বপুলিনে॥
আহা কিবা শোভা হেরি মিহিঁ বস্ত্র দিয়ে।
বিষ শান্তি কর প্রিয়ে! হৃদয়ে লাগিয়ে॥
কল্কির অমৃত বাক্য পদ্মা দেবি শুনি।
দেখে তাঁর পুরুষত্ব নাহি হয় হানি॥
সখীসনে নতশিরে যুড়ি দুটি কর।
কল্কিরে বলেন ধীরে করি সমাদর॥