কল্কিপুরাণ (ভুবনচন্দ্র বসাক)/মায়া প্রদর্শন
মায়া প্রদৰ্শন।
সকলে পরমহংসে কাতরেতে কয়।
অনন্ত হইবে ভাল কিসে মহাশয়॥
তাঁহাদের মন-কথা জানিয়ে ঠাকুর।
মোরে দেখে বলে ওরে অনন্ত চতুর॥
কোথা তব চারুমতি পুত্ত্র পঞ্চ আর?।
বিচিত্র ভবন কোথা কোথা ধনাগার?॥
কর হেথা অদ্য কিবা পুত্ত্র বিয়ে দিনে।
আজও তোমারে হেরি সাগর পুলিনে ॥
করে সমাদর সবে তোমারে সেখানে।
নিমন্ত্রণ ছিল আজি দেখ ভেবে মনে॥
সেথা দেখি যুবা, হেথা বয়স সত্বর।
অনন্ত হতেছে মনে এ সংশয় বড়॥
তোমার এ ভার্য্যা আমি না দেখি তথায়।
কোথা থাকি আমি তুমি কেমনে হেথায়॥
কে আনিল এইখানে না পারি বুঝিতে।
আমি কি ভিক্ষুক সেই তুমি কি অনন্তে?॥
তোমাতে আমাতে দেখা ভেল্কীর মতন।
উন্মত্তের ন্যায় এই কথোপকথন॥
ধার্ম্মিক সংসারী তুমি আমি যে ভিখারী।
দিবা নিশি আমি পরমার্থ চিন্তা করি॥
এ সব বিষ্ণুর মায়া বোঝা নাহি যায়।
বোঝাই যদ্যপি, অদ্বৈত জ্ঞান জন্মায়॥
এ বোলে পরমহংস হইয়ে বিস্ময়।
মার্কণ্ডে ভবিষ্য কথা বলে সমুদয়॥
অনন্ত বলেন ডেকে অহে রাজাগণ।
সেই কথা বলি আমি করহ শ্রবণ॥
দেখেছ মায়ারে লয়ে বিষ্ণুর উদরে।
সেই মায়া জগৎ ব্যাপ্ত জন মন হরে॥
যেমন গণিকাগণ বেশ ভূষা করে।
দাঁড়ায় রাস্তার ধারে জন মন হরে॥
মিথ্যার সংসারে মায়া ভ্রমিয়া বেড়ায়।
কিছুতেই নাশ নাই সন্তাপ বাড়ায়॥
প্রলয়েতে লয় পেয়ে খালি অন্ধকার।
ত্রিভুবন সৃষ্টি হেতু হন্ অবতার॥
পুরুষ প্রকৃতি পরে মাহাত্ম্য বিস্তারি।
মহত্তত্ত্ব অহংতত্ত্ব হয় সহকারী॥
ত্রিগুণে বিভক্ত, ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর।
ক্ষিতি আদি পঞ্চ ভূত হয় পর পর॥
পুরুষ প্রকৃতি যোগে এই সৃষ্টি হয়।
সুরাসুর নর পরে জীব সমুদয়॥
মায়াতে আবদ্ধ জীব সংসারেতে রত।
খুঁজে মরে মুক্তি পথ বিভ্রম সতত॥
মায়ার ক্ষমতা কত, ব্রহ্মা আদি দেব যত,
রজ্জুবদ্ধ পাখীর মতন।
মায়া বশীভূতে রয়, টেনে মায়া মোহময়,
নাসা বিদ্ধ বৃষভ যেমন॥
মায়া নদী হতে পার, অভিলাষ হয় যার,
জানিবে সার্থক জন্ম তাঁর।
সেই মুনীশ্বরগণ, সংসারেতে মুগ্ধ নন,
অর্থ তত্ত্ব জ্ঞাত সে জনার॥
সূত বলে, অনন্তকে অতি সমাদরে।
জিজ্ঞাসেন রাজাগণ কি হইল পরে॥
তার পর তপস্যায় যাইলাম বনে।
মন কাম উভয়ের নিগ্রহ কারণে॥
পরব্রহ্মে ধ্যান করি এক মনে যবে।
ধন পুত্ত্র পরিবার মনে হয় তবে॥
তপস্যায় বিঘ্ন দেয় বড় কষ্ট মনে।
ইন্দ্রিয় নিগ্রহ হেতু বসিলাম ধ্যানে॥
উপেন্দ্র প্রচেতা ইন্দ্র অশ্বিনীকুমার।
দিক্ সূর্য্য বায়ু আসে নিকটে আমার॥
রলে হে অনন্ত মোরা ইন্দ্রিয় দেবতা।
তোমারো শরীরে থাকি জান না কি হেথা?॥
মোদের মারিতে গিয়ে আপনি মরিবে।
সফল তোমার কায কদাচ না হবে॥
কাঁণা খোঁড়া বনবাসী যিনি যেথা রয়।
বিষয় আস্বাদে ইচ্ছা কাহার না হয়?॥
সংসারে গৃহস্থ জীব, দেহ জীব ঘর।
মনের অধীন দেহ বুদ্ধি নাড়ী বড়॥
সে বুদ্ধির মোরা সব পিছু পিছু যাই।
বিষ্ণুমায়া দ্বারা মন সংসারী সদাই॥
মনেরে শাসিতে যদি কোরে থাক মন।
তবে তুমি বিষ্ণু-ভক্তি কর আচরণ॥
তাতে সুখ মোক্ষ লাভ সর্ব্ব কর্ম্ম নাশী।
দ্বৈত ও অদ্বৈত জ্ঞানে পাবে অবিনাশী॥
অনন্ত! দেহান্তে তুমি বিষ্ণু-ভক্তি বলে।
পাইবে নির্ব্বাণ মুক্তি কল্কিরে দেখিলে॥
ভক্তি সহ কেশবের করিনু অর্চ্চন।
প্রভুরে দেখিতে আজি করি আগমন॥
অপরূপ রূপ হেরি অপদের পদ।
বাক্যহীনে বাক্যাহত জগত সম্পদ॥
কমলাক্ষ পদ্মা-নাথে নমস্কার করে।
অনন্ত চলিয়া যান প্রফুল্ল অন্তরে॥
পদ্মা সনে পদ্মানাথে পূজে রাজাগণ।
মোক্ষ হেতু তপস্যার্থ করিল গমন॥
এমন অনন্ত কথা যেবা পাঠ করে।
দূরে যায় মায়া, অজ্ঞান তিমির হরে॥
বিষ্ণু সেবি শুনে পড়ে যেই মহাশয়।
গৃহে থাকি ছয় রিপু করে তিনি জয়॥
ইতি মায়া প্রদর্শন।