বিষয়বস্তুতে চলুন

কাব্যপরিক্রমা (১৯৫৮)/গীতাঞ্জলি

উইকিসংকলন থেকে

গীতাঞ্জলি

গীতাঞ্জলি পশ্চিমের সাহিত্যের অরণ্যে দাবানলের মতো গিয়া পড়িয়াছে, এ সংবাদ যখন আমরা প্রথম পাই তখন এই ঘটনার আকস্মিকতা আমাদিগকে চমৎকৃত করিয়া দিয়াছিল। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলিকে তাঁহার শ্রেষ্ঠ কাব্য বলিয়া আমাদের মনে হয় নাই, সুতরাং তাহাকে লইয়া এতটা মাতামাতির ব্যাপার কেন হইল, তাহার কারণটা আমরা ঠিকমত বাহির করিতে পারি নাই।

 অবশ্য রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি গীতাঞ্জলি যে কেবলমাত্র বাংলা গীতাঞ্জলির অনুবাদ নয়, আমাদের মধ্যে অনেকেই তাহা জানিতেন না। তাহাতে পাঁচ সাজির ফুল একত্র করা হইয়াছিল। নৈবেদ্যের অনেক ভালো ভালো কবিতা, খেয়ার বহু কবিতা, গীতাঞ্জলির গান এবং গীতিমাল্যেরও প্রায় পনেরো-ষোলোটি গানের অনুবাদ ইংরেজি গীতাঞ্জলিতে প্রকাশিত হইয়াছে। সুতরাং ইংরেজি গীতাঞ্জলি একপ্রকার রবিবাবুর শেষ বয়সের কবিতার কষ্টিপাথর।

 আমি যখন ইংলণ্ডে ছিলাম তখন অক্‌স্‌ফোর্ডে বন্ধুজনসভায় রবিবাবুর গোটাকতক বাছা বাছা কবিতার অনুবাদ পাঠ করিয়াছিলাম। আমার সৌভাগ্যক্রমে তখন রবিবাবুর নিজ কাব্যের অনুবাদচেষ্টা অসম্ভবের রাজ্যে বাষ্প মুড়ি দিয়া নিদ্রিত ছিল—সে যে সম্ভবের দেশে কোনোদিন পক্ষবিস্তার করিবে, এমন স্বপ্নও কেহ দেখে নাই। আমি তাই নিশ্চিন্তমনে একটা দুঃসাহসিক কাজ করিয়া ফেলিলাম। আমার রচনার সৌষ্ঠব বা কলাচাতুর্য—ভাষার মাধুর্য বা বিশুদ্ধি—উৎকৃষ্ট কি মাঝারি কি নিকৃষ্ট, সে দিকে কেহ লক্ষমাত্র করিল না। আমি বাংলাকাব্যের পরিচয়বহনকার্যে সেই পাদপহীন দেশে স্বচ্ছন্দে দ্রুম বলিয়া চলিয়া গেলাম।

 সোনার তরী, চিত্রা ও চৈতালির অনেকগুলি কবিতার সঙ্গে গোটা দুই-তিন মাত্র নৈবেদ্য ও খেয়ার কবিতার অনুবাদ পাঠ করিয়াছিলাম। আমার দু-একজন বন্ধু নৈবেদ্য ও খেয়ার কবিতাগুলিকেই সর্বোত্তম বলাতে আমি বিস্মিত হইয়াছিলাম। জিজ্ঞাসা করাতে তাঁহারা বলিলেন, ‘প্রেমের কবিতা আমাদের দেশে এত জমিয়াছে যে, পাঠকেরা আর তাহাতে স্বদি পায় না। টেনিসন, ব্রাউনিং, জর্জ এলিয়ট প্রভৃতির ‘বস্তুতন্ত্র’ সাহিত্যেও জগৎটা এমনি গায়ে ঘেঁষিয়া দাঁড়াইয়াছে যে, তাহার ‘মায়া’ যেন সূর্যাস্তে মেঘের চতুর্দিকের চঞ্চল বর্ণচ্ছটার মতো আর হিল্লোলিত হইয়া বেড়ায় না—সব যেন বড্ড স্পষ্ট, বড্ড নিরেট, বড্ড বেশি গোচর। আমরা তাই অতীন্দ্রিয় রাজ্যের মোহাঞ্জন চোখে পরিতে চাই; সেই অঞ্জন পরিয়া জগৎকে, মানুষকে, মানুষের প্রেমকে নূতন করিয়া দেখিতে চাই। য়েট্‌স্ প্রভৃতি কেল্‌টিক অভ্যুত্থানের কবিদল, ফ্রান্সিস টম্প্‌সন, জন মেস্‌ফিল্ড, প্রভৃতি আধুনিক ইংরেজ কবিগণ সেই অঞ্জন চোখে মাখাইয়াছেন বলিয়া পাঠকেরা তাঁহাদের আদর করে। নৈবেদ্য ও খেয়ার কবিতার মধ্যে সেই অতীন্দ্রিয় রাজ্যের অনির্বচনীয় রস আছে―রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য কবিতায় সে রস নাই।’

 কথাটা তখন আমার মনে লাগিয়াছিল, কিন্তু আধুনিক ইংরেজি কাব্যের সহিত আমার পরিচয় যথেষ্ট ছিল না বলিয়া আমি ভালো করিয়া কথাটা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারি নাই। য়েট্‌সের কাব্য লইয়া পড়িবার চেষ্টা করিয়াছিলাম। য়েট্‌সের কাব্যের মধ্যে বিশেষত্ব যে কী তাহা বুঝিলাম না। প্রাচীন কেল্‌ট্‌ পুরাণকাহিনীকে ছন্দোবদ্ধ করাতেই যদি কোনো বিশেষ বাহাদুরি থাকে তবে সে স্বতন্ত্র কথা। ইংলণ্ডে সবাই বলিত, য়েট্‌স্ একজন অসাধারণ মিষ্টিক। যাহা-কিছু দুর্বোধ্য ও হেঁয়ালি তাহাকেই মিষ্টিক আখ্যা দেওয়া হয়, ইহাই জানিতাম। এখনকার কালের সাহিত্যে হঠাৎ যে দক্ষিনে হাওয়া মাধবীবনে পুষ্পবিকাশ বন্ধ করিয়া, পুবদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব করিয়া পুবে হাওয়া হইয়া আকাশকে রহস্যগম্ভীর জলদজালে ঘেরিয়া ফেলিয়াছে, সে খবর কে জানিত। ইউরোপের ইতিহাসে পড়িয়াছি, মধ্যযুগকে বলিত Dark Ages—অন্ধকারের যুগ। সেই অন্ধকারের খনি খুঁড়িয়া যে রাশি রাশি মধ্যযুগের ভক্ত সাধক ও কবিদের মণিমালা গাঁথিয়া তুলিবার প্রভূত আয়োজন চলিতেছে, তাহাই বা কে জানিত! সেণ্ট্ ফ্রান্সিস অব অ্যাসিসি, ম্যাডাম গেঁয়ো, রিচার্ড্ রোলে, জুলিয়ান অব নর্‌উইচ, ক্যাথারিন ডি সায়েনা ইত্যাদি ভক্তদের নামই লোকে ভুলিয়াছিল। এ ছাড়া কোথায় পারসিক, কোথায় ভারতবর্ষীয়, কোথায় চৈন—সকল দেশের মিষ্টিকদের যে তলব পড়িয়াছে, এ দেশে বসিয়া শেক্‌স্‌পীয়র বার্ক্ টেনিসন পড়িয়া পরীক্ষা পাস করিবার উদ্যোগে সে-সব সংবাদের কিছুই আমাদের কাছে আসিয়া হাজির হয় নাই। পশ্চিমের লোকেরা জানে যে, মহাভারতের প্রায় আড়াই লক্ষ শ্লোক এবং রামায়ণের আটচল্লিশ হাজার শ্লোক এবং যত রাজ্যের অসম্ভব অলৌকিক গাঁজাখুরি গল্পই হিন্দুসাহিত্য—কেবল উপমা অনুপ্রাস ও অলংকারের ঘটা—শব্দের চাতুর্য এবং তত্ত্বের কচ্‌কচি তাহাকে এমনি ভারাক্রান্ত করিয়া রাখিয়াছে যে, আপাদমস্তক-গহনামণ্ডিত দেহের মতো, তাহার গড়ন যে কেমন, সৌন্দর্য যে কেমন, তাহা বুঝিবারই জো নাই। আমরাও তেমনি জানি যে, পশ্চিমের সাহিত্য মানে সেই শেক্‌স্‌পীয়র এবং টেনিসন এবং তাহাদের সমালোচকবর্গ। পশ্চিমের লোকেরা যখন আমাদের গালি দেয় যে, তোমাদের কলাবোধ নাই, আমরা পাল্টা জবাব দিই যে, ‘ও বোধটা তোমাদের জন্য কায়েম করিয়া রাখিয়াছি। তোমরা তো তত্ত্বের ধার ধার’ না, ঐ বস্তুর বোধ ভিন্ন আর কোন্ বোধ তোমাদের জন্মিবে বলো?’

 যাহাই হউক, আমাদের অজ্ঞাতসারে বিধাতাপুরুষের গোপন দূতেরা হাওয়ার মুখে পশ্চিমের শিল্পসাহিত্য হইতে কলাসৌষ্ঠববোধের বীজ এ দেশে আনিয়া ফেলিয়াছিল এবং পূর্বদেশের ভারী ভারী তত্ত্বের বীজ ও সাধনার বীজ ও দেশে লইয়া যাইতেছিল। কেবল আমাদের সঙ্গে পশ্চিমের প্রভেদ ছিল এই যে, আমাদিগকে যে কারণেই হউক বাধ্য হইয়া পশ্চিমের সাহিত্য পড়িতে হইয়াছিল এবং ক্রমে ক্রমে সেই সাহিত্য হইতে রস আদায় করিয়া আমাদের নিজেদের সাহিত্যের সঙ্গে তাহার একটা সজীব সম্বন্ধ স্থাপন করিতেও হইয়াছিল। এইরূপে আমরা বিদেশী সাহিত্য হইতে যে আহার পাইয়াছিলাম তাহাকে অল্পে অল্পে জীর্ণ করিয়া আত্মসাৎ করিবার চেষ্টায় ছিলাম। কিন্তু বিদেশীরা আমাদের সাহিত্য সম্বন্ধে কিছুই জানিত না; শুধু জানিত এই যে, হিন্দুসাহিত্যে অনাবশ্যক মাল মসলা এতই অধিক যে তাহার মধ্য হইতে রস আদায় করা বিষম শক্ত। সংস্কৃত সাহিত্যের উপমার আড়ম্বরের এবং প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের অনুগ্রামের ঘটার যেটুকু রস পশ্চিমীরা চাখিয়াছিলেন, তাহাই তাঁহাদের বিতৃষ্ণা জন্মাইবার পক্ষে পর্যাপ্ত হইয়াছিল।

 সকলেই জানেন যে, ইংরেজি গীতাঞ্জলি যখন প্রথম প্রকাশিত হয় তখন, তাহা যে এক মুহূর্তেই ইংরেজ পাঠকের মন হরণ করিয়াছিল তাহা কেবল ভাবের সৌন্দর্যের জোরে নয়, ভাষার ও রচনার আশ্চর্য কলাসৌষ্ঠবের জোরে।

Have you | not heard | his si | lent steps?
He comes, | comes, | ever comes |


তোরা শুনিস নি কি শুনিস নি তার পায়ের ধ্বনি?
সে যে আসে, আসে, আসে।

গদ্যানুবাদে ছন্দের এমন দোল ইতিপূর্বে ইংরেজি সাহিত্যে কাহারো রচনায় প্রকাশ পায় নাই। হুইট্‌ম্যান মিল বাদ দিয়া গদ্যে কাব্যরচনার চেষ্টা করিয়াছিলেন, কিন্তু সে গদ্যই হইয়াছে, কাব্যের ভাষার ললিত নৃত্যগতি সে গদ্যে জাগে নাই। এড্‌ওআর্ড্ কার্পেণ্টার Towards Democracy-নামক গ্রন্থে সেই একই প্রয়াস করিয়াছেন, কিন্তু তিনি হুইট্‌ম্যানী ধাচার ভাষা ও ভঙ্গিমাকেই আশ্রয় করিয়াছেন—তাঁহার গদ্যের একটানা প্রবাহে ছন্দের তরঙ্গদোললীলা জমে নাই। সেই জন্য গীতাঞ্জলির ছন্দযুক্ত গদ্যের তুলনা খুঁজিতে গিয়া ইংরেজ সমালোচকবর্গকে হিব্রু সামগাথার (Psalms) কথা পাড়িতে হইয়াছে।

 তার পর শুধু ছন্দ নয়, শুধু ভাষার শিল্পচাতুর্য নয়, এ কবিতায় প্রাচ্যদেশসুলভ অলংকারবাহুল্য পশ্চিমবাসীগণ একেবারেই লক্ষ্য করেন নাই। অধ্যাত্ম-উপলব্ধির বাণীতে যে অলংকার সাজে না, কারণ—

অলংকার যে মাঝে প’ড়ে মিলনেতে আড়াল করে,
তোমার কথা ঢাকে যে তার মুখর ঝংকার।

সে কথাটি হয়তো ও দেশের লোকেরা ভালো করিয়া ভাবে নাই। অলংকার অধ্যাত্ম-উপলব্ধির বাণীর গভীরতাকে ঢাকুক বা না ঢাকুক, সে যে কবিতার কলাসৌষ্ঠবকে নষ্ট করে, ইহাই তাহার বিরুদ্ধে সকলের চেয়ে প্রবল অভিযোগ। অতএব এই নিরাভরণ সরল কবিতার বিরল সৌষ্ঠব পশ্চিমের রসগ্রাহীদিগের মনকে এক মুহূর্তে অধিকার করিয়াছিল।

 অলংকার বাদ দিয়া একেবারে অনাবৃত উলঙ্গ করিয়া কলামূর্তি গড়িবার সাধনা এখনকার কবিদের একটি প্রধান সাধন। একাল যে আবরণ মোচন করিবার কাল—বহুযুগ সঞ্চিত সংস্কারের একটি একটি করিয়া আবরণ খসাইয়া সমাজকে, মানুষকে, মানুষের সম্বন্ধগুলিকে, বিশ্বজগৎকে একেবারে তাহার যথাযথ মর্মস্থানে দেখিবার জন্য একালের মানুষের মন যে চেষ্টা করিতেছে, তাহার প্রমাণ আধুনিক সাহিত্য হইতেই প্রচুর পাওয়া যায়। হেন্‌রিক ইব্‌সেন, মেটার্‌লিঙ্ক্‌ বার্নার্ড্‌ শ, এইচ. জি. ওয়েল্‌স্‌, হাউপ ট্রুম্যান, বদ্‌লেয়ার প্রভৃতি প্রসিদ্ধ সাহিত্যিকগণের যে-কোনো রচনা পড়িলেই দেখা যাইবে যে, হয় সমাজের কোনো পাকাপোক্ত সংস্কারের পর্দা তুলিয়া সমাজের ভিতরকার জীবননাট্যলীলাকে তাঁহারা উদ্‌ঘাটন করিয়া দেখাইতেছেন, নয় স্ত্রী-পুরুষের সম্বন্ধ-ঘটিত সংস্কারকে ছিন্ন করিয়া তাহাদের সম্বন্ধের যথার্থ স্বরূপ নির্ণয়ের জন্য চেষ্টা করিতেছেন। কোনো-না-কোনো জায়গায় তাঁহাদের আঘাত আবরণ ছিন্ন করিবার জন্য উদ্যত। সাহিত্যের এই ভিতরের চেষ্টা বাহিরের নিরাভরণ ভাষার ভিতর দিয়া আপনাকে প্রকাশ করিতেছে। সাহিত্যরচনার কোনো আলংকারিক প্রথা বা নিয়ম (conventions) একালের সাহিত্যিকেরা মানেন না। সেইজন্য তাঁহাদের রচনা সময়ে সময়ে এত নেড়া হইয়া পড়ে যে, পড়িয়া কোনো রসই পাওয়া যায় না। কিন্তু তাহার প্রধান কারণ, তাঁহারা অনেকেই নিজেদের সম্বন্ধে অতিসচেতন। আমি একটা কিছু বলিতেছি, আমি এমন করিয়া লিখিয়া থাকি, আমি ভাষার বা সাহিত্যিক প্রথা পদ্ধতির ভারী একটা বদল করিয়া দিতেছি—এ কথা কোনো কবি বা সাহিত্যিক লিখিবার সময়ে ভাবিলেই তাঁহার রচনা কখনোই সরলতার মাধুর্যে ভরিয়া উঠিবে না। অবলীলাক্রমে যে কাজটি হয় তাহাতেই সৌন্দর্য ফোটে। যে গায়ক গানের প্রত্যেক তালটিতে লয়টিতে তানটিতে অত্যন্ত বেশি ঝোঁক দেয়, অর্থাৎ সে সম্বন্ধে সচেতন হয়, তাহার গানের মাধুর্য নষ্ট হইতে বাধ্য। এই জন্য আপনাকে একেবারে ভুলিয়া যখন ভাবের প্রেরণার হাতে কবিরা আপনাদিগকে সমর্পণ করেন তখনই তাঁহাদের সংগীত ফুলের মতো রঙে ও গন্ধে পূর্ণ হইয়া ফোটে, ঢেউয়ের মতো কলক্রন্দনে বাজিতে থাকে, বিশ্বের সকল সৌন্দর্য সকল আনন্দের সঙ্গে একাসন গ্রহণ করে। ইউরোপে আধুনিক কালে একজন কবিও নাই, যিনি এমনি আত্মভোলা সরল। সেই কারণে তাঁহাদিগকে বলিতে হয় এবং তাঁহারাই আপনাদিগকে বলিতে শুরু করিয়াছেন—

তোরা কেউ পারবি নে গো
পারবি নে ফুল ফোটাতে।

যতই বলিস যতই করিস
যতই তারে তুলে ধরিস
ব্যগ্র হয়ে রজনী দিন
আঘাত করিস বোঁটাতে।
তোরা কেউ পারবি নে গো
পারবি নে ফুল ফোটাতে।

তাঁহাদের কাব্যরচনা ঐ বোঁটায় আঘাত করা মাত্র, আলংকারিক প্রথাকে ভাঙিবার প্রয়াস মাত্র—কিন্তু ফুল ফুটিয়াছে কোথায়? সেই ফুল ফুটিয়াছে গীতাঞ্জলিতে। সেইজন্য তাহার বাহ্য সৌষ্ঠবেই ইউরোপীয় সাহিত্যিকদের মন সর্বপ্রথমে ভূলিয়াছিল।

 আমি বলিয়াছি যে, দ্রাক্ষা হইতে মদ চোলাইয়া লইবার মতো বাস্তব সাহিত্য নিঙ্‌ড়াইয়া যেটুকু রস আদায় করিবার তাহা পূর্ণমাত্রায় আদায় করিয়া অবশেষে পশ্চিমের সাহিত্যের রসপাত্র রিক্ত হইয়া পড়িয়াছিল। গায়্‌টে, ওয়ার্ড্‌স্‌ওআর্থ্, কীট্‌স্‌, টেনিসন প্রভৃতি কবিদিগের কাব্যে এখনকার কালের মানুষের মন আর রস পাইতেছিল না। এখন নূতন সাকীর প্রয়োজন। বাস্তবলোকের রসাস্বাদন তো হইল, এবার অতীন্দ্রিয়লোকের মধু যে কেমনতর তাহা আস্বাদন করা চাই। একদল নূতন সাকী অত্যন্ত আভরণহীন, ছায়ার মতো না-যায়-ধরা না-যায়-ছোঁওয়া গোছের আধারে সেই ‘নন্দনবনমধু’ ভরিয়া আনিলেন এবং রসপিপাসুদিগকে বিতরণ করিলেন। য়েট্‌স্ প্রভৃতি কেল্‌টিক অভ্যুত্থানের কবিগণ ফ্রান্সিস টম্প্‌সন প্রভৃতি ‘মিষ্টিক’এর দল মিষ্ট রস পরিবেশনে আসর জমকাইয়া পুরাতন সাকীদিগের রসভাণ্ডারে একেবারেই কুলুপ লাগাইয়া দিলেন। এখন হইতে অতীন্দ্রিয়লোক এবং বাস্তবলোকের মধ্যে যে পর্দা ছিল তাহা ক্ষণে ক্ষণে চঞ্চল হইয়া উড়িতে লাগিল। কবির সেই ক্ষণিকার ‘এক গাঁয়ে’ কবিতার মতো এই দুই লোকের মধ্যে রহস্যলীলা চলিতে লাগিল মন্দ না।—

তাদের ছাদে যখন ওঠে তারা
আমার ছাদে দখিন হাওয়া ছোটে।
তাদের বনে ঝরে শ্রাবণ-ধারা,
আমার বনে কদম ফুটে ওঠে।

সেখানকার হাওয়া আসিয়া এখানকার পুষ্প ফোটায়, সেখানকার পরীদের গান এখানকার বনমর্মরে নদীনির্ঝরে শোনা যায় এবং নবীন সাকী সেই গান শুনিয়া গাহিয়া ওঠেন—

Fairies, come, take me out of this dull world
For I would ride with you upon the wind,
Run on the top of the dishevelled tide
And dance upon the mountains like a flame!

—W. B. Yeats, The Land of Heart’s Desire


ওগো পরীরা, এই নিরানন্দ জীর্ণ জগৎ থেকে আমায় নিয়ে যাও,
আমায় বের করে নিয়ে যাও।
তোমাদের সঙ্গে আমি পবন-মাতলির পৃষ্ঠে চড়ে ছুটব
বন্যা যখন তার কুন্তল এলিয়ে দেবে, তখন তার চূড়ায় চূড়ায় আমি চলব,
এবং পর্বতে পর্বতে অগ্নিশিখার মতো নৃত্য করব।

ইঁহারা বলেন যে, এই বাস্তব জগৎ তো আসল জগৎ নয়—সেই অদৃশ্য ছায়ার জগৎই আসল জগৎ। কারণ, যাহাকে বাস্তব বলিতেছি তাহার বস্তুত্ব কোথায়? সীমা যে ক্রমাগতই তাহার সীমারূপ পরিত্যাগ করিতেছে। সে কথাটা তো আজ বিজ্ঞান অণুপরমাণুর মধ্যে পর্যন্ত দেখাইয়া দিতেছে। য়েট্‌স্ তাঁহার The Shadowy Waters-নামক পরমরমণীয় আর-একটি নাট্যে নায়কের মুখ দিয়া বলাইতেছেন—

All would be well
Could we but give us wholly to the dreams,
And get into their world that to the sense
Is shadow, and not linger wretchedly
Among substantial things; for it is dreams
That lift us to the flowing, changing world
That the heart longs for.


যদি স্বপ্নের হাতে আমরা আমাদের ছেড়ে দিতে পারতুম,
সে কী চমৎকার হত।
যে জগৎটা ইন্দ্রিয়ের কাছে ছায়ার মতো
যদি সেই জগতে প্রবেশ পেতুম,
যদি কঠিন বস্তুগুলোর মধ্যে হতভাগ্যের মতো দিন গোঁয়াতে না হত।
যে জগৎ কেবলই বয়ে চলছে, কেবলই বদলে চলছে,
হৃদয় যার জন্যে ব্যাকুল হয়ে রয়েছে,
ওগো, এই স্বপ্নই যে আমাদের সেই জগতে পৌঁছে দেবে।

এখনকার কাব্যের এই জগৎ—এই flowing, changing world। এই বাস্তব জগতের মাঝখানেই সেই অদৃশ্য জগৎ; এই বাস্তব রাজ্যের মধ্যেই সেই ছায়ার লীলা, সেই স্বপ্নের গতায়াত। এই—

‘সীমার মাঝে, অসীম, তুমি বাজাও আপন সুর,
আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর!’

ফ্রান্সিস টম্প্‌সনের নিম্নোদ্‌ধৃত কবিতাটিতে এই একই ভাবের সাক্ষ্য পাওয়া যায়—

O world invisible, we view thee,
O world intangible, we touch thee,
O world unknowable, we know thee,

Inapprehensible, we clutch thee!
Does the fish soar to find the ocean,
The eagle plunge to find the air—
That we ask of the stars in motion
If they have rumour of thee there?
Not where the wheeling systems darken,
And our benumbed conceiving soars!―
The drift of pinions, would we hearken,
Beats at our own clay-shuttered doors.


হে অদৃশ্য জগৎ, আমরা তোমায় দেখছি।
হে অস্পর্শ জগৎ, আমরা তোমায় স্পর্শ করছি।
হে অজ্ঞাত জগৎ, আমরা তোমায় জানছি।
হে ধারণার অগম্য, আমরা তোমায় মুষ্টি দিয়ে ধরছি।
সমুদ্রকে পাবার জন্যে মাছকে কি উড়তে হয়?
আকাশকে অনুভব করবার জন্যে পাখিকে কি ডুব দিতে হয়?
যে অগণ্য গ্রহ চন্দ্র শূন্যপথে বেগে ঘূর্ণমান,
তারা তোমার খবর পেয়েছে কি না সে কথা আমরা
জিজ্ঞাসা করছি কেন?
যেখানে সেই চক্রপথে ভ্রাম্যমাণ গ্রহেরা অন্ধকার জমিয়ে আছে,
আমাদের মন যেখানে উড়তে গিয়ে হতচেতন হয়ে ফিরে আসছে—
সেখানে নয়, সেখানে নয়।
আমরা যদি শুনতে পেতুম তবে দেখতুম যে, স্বর্গের পাখার বিধুনন
আমাদের এই দেহের মৃদর্গলবিশিষ্ট দ্বারের কাছেই শোনা যাচ্ছে।

 গীতাঞ্জলির কবিতায় এই অদৃশ্য অস্পর্শ অজ্ঞাত জগতের রূপ স্পর্শ রস গন্ধ অত্যন্ত সুস্পষ্ট এবং অসন্দিগ্ধ রূপে দেখিতে পাওয়া গিয়াছে বলিয়াই নবীন সাকীর দল এই কবিকে তাহাদের সকলের সেরা জানিয়া তাঁহারই ললাটে জয়মাল্য বাঁধিয়া দিয়াছে এবং কাব্যের কুঞ্জবনে তাঁহাকে রত্ন-আসনে উপবেশন করাইয়াছে।

 রবীন্দ্রনাথের জগৎও ‘flowing, changing world’―চিরবহমান চিরপরিবর্তমান জগৎ—‘খসে যাবার, ভেসে যাবার, ভাঙবার’ জগৎ।—

পাগল করা গানের তানে
ধায় যে কোথা কেই-বা জানে—
চায় না ফিরে পিছন পানে
রয় না বাঁধা বন্ধে রে
লুটে যাবার ছুটে যাবার চলবারই আনন্দে রে।

 এই জগৎ যেমন বহমান চলমান, এই জগতের যিনি স্বামী তাঁহাকেও কবি নিশ্চল নির্বিকল্প নির্‌গুণ ঈশ্বর করিয়া ভাবেন নাই। লোকলোকান্তর-জন্মজন্মান্তরের মধ্য দিয়া জীব-অভিব্যক্তির যে যাত্রাপথ বাহিয়া আমাদের প্রত্যেকের জীবনখানি পূর্ণ পূর্ণতর হইয়া চলিয়াছে, সেই পথেই যিনি সকল পথের অবসান, যিনি পরম পরিণাম, তিনি সঙ্গীরূপে পথিকরূপে ক্ষণে ক্ষণে দেখা দিতেছেন। কবির জীবনে জীবনে এই লীলা করিবার জন্য তিনিও বাহির হইয়াছেন। ‘আমার মিলন লাগি তুমি আসছ কবে থেকে?’— সে কোন্ অনাদিকাল হইতে যে তিনি বাহির হইয়াছেন তাহা কে জানে। সেইজন্যই তো এই পরিচিত জগদ্‌দৃশ্যের মধ্যে সেই অদৃশ্যের ছায়া পড়ে—

‘O world invisible, we view thee!’

 একদিন ভরা শ্রাবণের প্রভাতে যখন রাত্রির মতো সমস্ত নিস্তব্ধ, যখন কাননভূমি কূজনহীন এবং ঘরে ঘরে সকল দ্বার রুদ্ধ, তখন সেই নিরুদ্ধ নিস্তব্ধ বর্ষা প্রভাতের জনশূন্য পথে চকিতের মতো সেই অনাদিকালযাত্রী একক পথিকের ক্ষণিক দর্শন মিলিয়া যায়—

কূজনহীন কাননভূমি,
দুয়ার দেওয়া সকল ঘরে,
একেলা কোন্ পথিক তুমি
পথিকহীন পথের ’পরে।

 এমনি করিয়াই ক্ষণে ক্ষণে কত দৃশ্যে কত গন্ধে কত রসে সেই অদৃশ্য অনির্বচনীয় পরম রসকে বারম্বার পাওয়া গিয়াছে—

বিশ্বের সবার সাথে হে বিশ্ব-রাজন,
অজ্ঞাতে আসিতে হাসি আমার অন্তরে
কত শুভদিনে; কত মুহূর্তের ’পরে
অসীমের চিহ্ন লিখে গেছ।

 তবেই দেখা যাইতেছে যে, ঈশ্বরের সঙ্গে জগতের, পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার ঐক্য স্থির ও ধ্রুব হইয়া আছে এবং ইহাদের মধ্যে বস্তুতঃই কোনো দ্বৈত নাই। কবির কাছে এই বৈদান্তিক মতের কোনো অর্থ নাই। কারণ, জগতের সমস্ত রূপরূপান্তর এবং মানবজীবনের সমস্ত পরিবর্তন-পরম্পরাকে ‘মায়া’ বলিয়া উড়াইয়া দিয়া একটি নিশ্চল শূন্য ‘এক’কে একমাত্র করিবার একান্ত চেষ্টা করিলেও, মায়া কোনোমতেই দূর হইবার নহে। ঈশ্বরের সঙ্গে জগতের এবং ঈশ্বরের সঙ্গে আমাদের মিলনের মধ্যে যে একটি চিরবিরহ আছে, এই মায়াই যে উভয়ের মধ্যে সেই বিরহের ব্যবধান রচনা করিয়াছে। ইহাতেই তো মিলনের সার্থকতা। নহিলে মিলন যে আছে এ কথাটাই কে অনুভব করিত?

হেরি অহরহ তোমারি বিরহ
ভুবনে ভুবনে রাজে হে—
কত রূপ ধ’রে কাননে ভূধরে
আকাশে সাগরে সাজে হে।

 সকল সৌন্দর্যের মধ্যে যে অনির্বচনীয় বেদনা, তাহা এই বিরহেরই বেদনা। গ্রহতারার অনিমেষ দৃষ্টির মধ্যে সেই বিরহের চিরব্যাকুলতা মানব-প্রেমের ও বাসনার সকল অতৃপ্তির মধ্যে সেই অনাদি বিরহের বেদনা। এই বিরহই রূপ ধরিতেছে বলিয়া রূপ ক্রমাগতই flowing and changing, বহমান এবং পরিবর্তমান।

 গীতিমাল্যের একটি কবিতায় এই মায়ার তত্ত্ব বড়ো চমৎকার করিয়া কবি ব্যক্ত করিয়াছেন—

আমি আমায় করব বড়ো
এই তো আমার মায়া--
তোমার আলো রাঙিয়ে দিয়ে
ফেলব রঙিন ছায়া।
তুমি তোমায় রাখবে দূরে,
ডাকবে তারে নানা সুরে,
আপ্‌নারই বিরহ তোমার
আমায় নিল কায়া।

কবি বলিতেছেন, এই-যে আমি নিজেকে তাঁহা হইতে স্বতন্ত্র বলিয়া জানিতেছি, ইহাই তো মায়া! কিন্তু এই মায়াটি যদি না থাকিত তবে কি আমাদের কান্নাহাসি আশাভয় এমন নানা রঙে রঞ্জিত হইয়া উঠিত—তবে যে বিচিত্রতার কোথাও কোনো স্থানই থাকিত না। এই তাঁতে-আমাতে যে আড়াল রহিয়াছে, তাহাতেই তো ‘দিবানিশির তুলি দিয়ে হাজার ছবি আঁকা’ হইতেছে। এই মায়ার পর্দাখানি না থাকিলে কি এত রঙ, এত আঁকাবাঁকা কিছুই থাকিত—বর্ণ ও আকার লোপ পাইয়া সমস্তই একমাত্র অখণ্ড এক হইয়া যাইত না? ভাগ্যে এই মায়া ছিল, নহিলে ঈশ্বরেরই বা আপনাতে আপনি থাকিয়া কী আনন্দ ছিল, এবং আমাদেরই বা অহংকার বিলুপ্ত হইয়া তুরীয় অবস্থা প্রাপ্ত হইয়া কী আনন্দ ছিল?

তাই তোমার আনন্দ আমার ’পর
তুমি তাই এসেছ নীচে।
আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর,
তোমার প্রেম হত যে মিছে।

মায়ার আড়ালে সসীম ও অসীমের এই খেলাটাই সমস্ত জগতের খেলা, সৃষ্টির খেলা, আমাদের জীবনের খেলা বলিয়া সসীম ক্রমাগতই অসীমে আপনাকে হারাইয়া ফেলিতেছে এবং অসীম ক্রমাগতই সসীম-রূপে আপনাকে ধরা দিতেছে। আমাদের জীবনের পথে যেমন আমাদের জীবন ‘প্রতিপদেই···উৎসুক অজানা কোন্ নিরুদ্দেশের তরে’, সেইরূপ সেই পথের যিনি চিরসঙ্গী তাঁহারও রূপের অন্ত নাই। ক্ষণে ক্ষণে ‘তন্‌নবতামুপৈতি’। সন্ধ্যার গভীর ছায়াগহন নদীর ঘাটে কোন্ ‘অজানার বীণাধ্বনি’ বাজে, ঝড়ের রুদ্র মাতুনির মধ্যে ‘মেঘের জটা’ উড়াইয়া কাহার অকস্মাৎ আবির্ভাব হয়, ‘প্রভাতের আলোর ধারায়’ কাহার একটি নতমুখ মুখের উপর প্রেমদৃষ্টি নিক্ষেপ করে, ঋতুতে ঋতুতে সেই চিরন্তন পথিক কত নব নব রঙিন বেশে দেখা দেয়। শুধুই কি তাহার মনোহরণ বেশ! প্রভাতে শুধু ‘অরুণবরণ পারিজাত লয়ে হাতে’ সোনার রথে চড়িয়া বাতায়নের কাছে একটিবার আসিয়া ঘরের অন্ধকারকে আনন্দে কম্পিত করিয়াই কি সে চলিয়া যায়? তাহার ঝড়ের বেশ। তাহার মৃত্যুর বেশ। জীবনের সকল রূপের মধ্যেই সেই অপরূপের লীলা।

আমরা দেখিলাম যে, গীতাঞ্জলির হিরণ্ময় পাত্রখানি অতীন্দ্রিয়লোকের অনির্বচনীয় রসে পূর্যমান এবং য়েট্‌স টম্প্‌সন প্রভৃতি আধুনিক কোনো কবির কাব্যের পেয়ালা সেই রসে এমন ভরপুর নহে বলিয়া গীতাঞ্জলি সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য বলিয়া আদৃত হইয়াছে। কিন্তু গীতাঞ্জলিতে যদি কেবলমাত্র দৃশ্য এবং অদৃশ্য জগতের মাঝখানের পর্দাটি তুলিয়া ধরা হইত এবং এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের উপরে সেই অতীন্দ্রিয় জগতের অপরূপ আলো পড়িয়া সকল রূপরস সকল শব্দগন্ধকে যে কী অনির্বচনীয় বেদনায় ঝংকৃত করিয়া তোলে যদি গানে কবি তাহারই আভাসমাত্র দিতেন—তবে কাব্য হিসাবে ইহা অতুলনীয় হইত সন্দেহ নাই। কিন্তু গীতাঞ্জলিতে শুধু উপলব্ধির কথা তো নাই—কেমন করিয়া সেই উপলব্ধি সম্ভাবনীয় হইল তাহার সাধনার ইতিবৃত্তও আছে। কাব্য হিসাবে এই সাধনার-ইঙ্গিত-সম্বলিত কবিতাগুলি নিকৃষ্ট—ফরাসী গীতাঞ্জলির ভূমিকায় কবি Andre Gide এইরূপ কোনো কোনো কবিতাকে ‘নৈতিক’ কবিতা বলিয়াছেন দেখিলাম।

 ইংরেজি গীতাঞ্জলি, নৈবেদ্য হইতে গীতিমাল্য পর্যন্ত সমস্ত কাব্যগুলি হইতে অবচিত শ্রেষ্ঠ কবিতাপুষ্পের সাজি, সুতরাং তাহার কোনো কোনো কবিতা সম্বন্ধেই যদি Gide’এর এ কথা মনে উদয় হইয়া থাকে তবে কেবলমাত্র বাংলা গীতাঞ্জলি পাঠ করিলে এ কথা তাঁহার পুনঃপুনই মনে হইত। বাংলা গীতাঞ্জলির গানগুলিতে কবির অধ্যাত্মসাধনার বার্তার ভাগই বেশি, পরিপূর্ণ উপলব্ধির বাণীর ভাগ কম।

 বাংলা গীতাঞ্জলির যে-সকল গানে কবির অধ্যাত্মসাধনার আভাস-ইঙ্গিত আছে সেগুলি পরে পরে সাজাইলে কবির সাধনার একটি সুস্পষ্ট চেহারা ধরিতে পারা যায়। মোটামুটি সাধনার তিনটি ধারা আমি ধরিতে পারিয়াছি; যথা:

 ১ সংসারের দুঃখ-আঘাত-বেদনার একটি বিশেষ সার্থকতা আছে। ইহারা তাঁহার ‘দূতী’; তিনি যে আমাদের জন্য অভিসারে বাহির হইয়াছেন ইহারাই সেই সংবাদ জানায়। আমাদের চিত্ত যখন অসাড় থাকে তখন এই দুঃখ-আঘাতই তো তাঁহার স্পর্শ, তিনিই আমাদের জাগাইয়া দেন। ধূপকে না পোড়াইলে সে যেমন গন্ধ দেয় না, দুঃখের আঘাত ভিন্ন আমাদের জীবনের পূজা তাঁহার দিকে উচ্ছ্বসিত হয় না। কবি তাই বলিয়াছেন, ‘আমার জীবনে তব সেবা তাই বেদনার উপহারে।’ এই ব্যথার গানই তাঁহার পূজার শ্রেষ্ঠ অঞ্জলি।

 ২ ‘সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে।’ অহংকারের বাঁধন যতক্ষণ প্রবল ততক্ষণ বিশ্বের সকলের সঙ্গে এবং ভগবানের সঙ্গে মিলন হইতেই পারে না—কারণ অহংকার ‘সকল সুরকে ছাপিয়ে দিয়ে আপনাকে যে বাজাতে চায়।’

 গীতিমাল্যের একটি গান আছে—

বেসুর বাজে রে,
আর কোথা নয়, কেবল তোরই
আপন-মাঝে রে!

এই অহংকারের মধ্যেই সমস্ত বেসুর—এইখানে বিশ্ব প্রতিদিন প্রতিহত, আনন্দ সংকীর্ণ, প্রেম সংকুচিত। এই অহংটিকে তাঁহার পায়ে বিসর্জন না করা পর্যন্ত আমাদের শান্তি নাই।

 ৩ এ দেশের ‘সবার পিছে সবার নীচে, সবহারাদের মাঝে’ অপমানের তলায় ভগবানের চরণ নামিয়াছে—সেইখানে তাঁহাকে প্রণাম না করিলে তাঁহাকে প্রণাম করাই হইবে না। সেইখানে তাহাদের সঙ্গে এক না হইলে ‘মৃত্যুমাঝে হতে হবে চিতাভস্মে সবার সমান’—সেই বড়ো যাত্রায়, সেই-সকল মানুষের মধ্যে, ভিড়ের মধ্যে কর্মযোগে তাঁহার সঙ্গে মিলিত হইয়া সকল কর্ম করিতে হইবে, তবেই মুক্তি। কারণ—

তিনি গেছেন যেথায় মাটি ভেঙে
করছে চাষা চাষ,
পাথর ভেঙে কাটছে যেথায় পথ,
খাটছে বারো মাস।

 বাংলা গীতাঞ্জলিতে কবির সাধনার ধারার এইরূপ সুস্পষ্ট চেহারা দেখিতে পাওয়া যায় বলিয়া গীতাঞ্জলিতে যে-সকল কবিতায় সাধনার সফলতার মূর্তি পরিস্ফুট হইয়াছে, তাহারা যে কত সত্য তাহা হৃদয়ঙ্গম করা যায়।

 কিন্তু সচরাচর আর্টিস্টের কাছে আমরা তাঁহার সাধনার শ্রেষ্ঠ ফলটাই পাই, কেমন করিয়া সে ফল ফলিল সে সংবাদ চাপা থাকে। কারণ, পাকশালায় রন্ধনের সামগ্রী যখন স্তূপীকৃত তখন তাহাতে কোনো আনন্দ নাই; কিন্তু যখন অন্নব্যঞ্জন প্রস্তুত হইয়া দেখা দেয় তখনই ভোজের প্রকৃত আনন্দ। গীতাঞ্জলির এই সাধনার কবিতাগুলি কবিতা হিসাবে উৎকৃষ্ট নহে সে বিষয়ে সন্দেহ নাই, কিন্তু ইহাই আশ্চর্য যে কবির সমস্ত স্বরূপটি কেমন সহজে কেমন অনায়াসে এই কাব্যের মধ্যে ধরা দিয়াছে। এ যেন কবির প্রতিদিনের ডায়ারি—শুধু প্রভেদ এই যে, মানুষ ডায়ারি লিখিবার কালে প্রায়ই আপনার সম্বন্ধে কিছু-না-কিছু সচেতন না হইয়া পারে না, এই কাব্যে কবির অজ্ঞাতসারে তাঁহার হৃদয়ের অন্তরতম অভিজ্ঞতাগুলি পরে পরে বাহির হইয়া আসিয়াছে। বিশ্বপ্রকৃতির সৌন্দর্যের স্পর্শে তাঁহার অপূর্ব পুলক, তাঁহার অপেক্ষা ও আশা, আপনার সঙ্গে আপনার দ্বন্দ্ব, প্রবল দুঃখ ও আঘাতের মধ্য দিয়া কেবলই জাগরণ, তাঁহার সুদূর পরিণামের দৃষ্টি—সমস্তই স্তরে স্তরে পত্রে পত্রে ধরা পড়িয়া গিয়াছে। শিল্পীর মতো কেবল শিল্পের শ্রেষ্ঠ ফল দান করিয়া কবি বিদায় লন নাই, তিনি এই কাব্যে আপনাকে সম্পূর্ণ করিয়া দান করিয়াছেন। এইখানেই গীতাঞ্জলির বিশেষত্ব। এই বিশেষত্বের জন্যই পশ্চিমে এই শ্রেণীর অন্যান্য সকল কাব্যের অপেক্ষা গীতাঞ্জলির সমাদর এত অধিক হইয়াছে। এই কাব্যে মানুষের জীবনের মধ্যে কবির সাধনা গিয়া আঘাত করিতেছে। আমার যতদূর মনে পড়ে, ইংরেজি গীতাঞ্জলি সম্বন্ধে একখানি পত্রে প্রবীণ সাহিত্যিক স্টপ্‌ফোর্ড্ ব্রুক এই কথাটিই বলিয়াছিলেন।

 কিন্তু কবির অধ্যাত্মসাধনার কথা মানুষের যতই উপকার সাধন করুক, তাহা সেই ‘আঘাত করা বোঁটাতে’, তাহা ‘ফুল ফোটানো’ নহে। একজনের সাধনা আর একজনের জীবনকে সাহায্য করিতে পারে বটে, কিন্তু সাধনা নিজেই যখন কূলে উত্তীর্ণ হয় নাই তখন তাহার উপর নির্ভর করিতে গেলে, যে ব্যক্তি নির্ভর দেয় এবং যে ব্যক্তি নির্ভর করে উভয়কেই ডুবিতে হয়। সকল দেশেই গুরুবাদ এইজন্য অন্ধ অনুকরণেরই সৃষ্টি করিয়াছে। কারণ, কোনো একজন মানুষের পন্থা আর-একজনের পন্থার সমান নহে। যে যে-পন্থা দিয়াই যাউক, গম্যস্থানে পৌঁছিয়া সেখানকার কথা বলিলে আর ভয় নাই, কারণ সেখানকার আনন্দের হিল্লোল তখন সকল বিচিত্র পথের মধ্যেই সমান হিল্লোলিত হইবে। আমাদের দেশের লোক সাধনার বিচিত্রতাকে, ‘varieties of religious experience’কে, উইলিয়ম জেম্‌সের মতো বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝিতে পারুক আর নাই পারুক, একটি বিষয়ে এ দেশের লোকের বোধ সুপরিণত হইয়াছে। অধ্যাত্মসাধনার ফলটিতে ঠিক পাক ধরিল কি না তাহা আমরা বিলক্ষণ বুঝি। কথায় আমাদের চিঁড়া ভিজাইতে পারে না। আমাদের দেশের লোক শ্রুতিধারণের মতো করিয়া যে সকল ভক্তদের বাণী ও সংগীত রক্ষা করিয়া আসিয়াছে তাহা শ্রবণমাত্র আমরা এ বিষয়ে আমাদের জাতির প্রতিভা বুঝিতে পারিব। ভক্তির সঙ্গে ভেক এ দেশে মিশিয়া আছে সত্য; কিন্তু কালের চালুনিতে ভেকের রচনা তলায় থিতাইতেছে কই?

 আমরা রবীন্দ্রনাথের সমস্ত জীবনবৃক্ষের পরিণামের দিকে চাহিয়া আছি; একটা গীতাঞ্জলিকেই আমরা সেই জীবনমহাবৃক্ষের পরিণত ফল বলিতে যাইব কেন? গীতাঞ্জলিকে পশ্চিম বেশি বুঝিয়াছে এ কথা তাহারা গর্ব করিয়া উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করিলেও আমরা তাহা সত্য নয় জানি। যথার্থ বোধ জনসংখ্যার আধিক্যের উপর নির্ভর করে না। পৃথিবীর কোনো কবিকেই বহু লোকে বুঝে নাই। আমরা যে কবিকে তাঁহার সমগ্র কাব্যজীবনের ভিতর হইতে দেখিতেছি, তাঁহার জীবনের পশ্চাতে যে বহুযুগের অধ্যাত্মরসধারা তাঁহাকে পরিপুষ্ট করিতেছে তাহাকে দেখিতেছি—কিছুই আমাদের কাছে ঝাপসা নহে। আমরা জানি, তাঁহার প্রাণের মূল জীবনের সুখদুঃখময় সকল বিচিত্র রসের মধ্যে কত দূরে গভীরতম তন্তুতে আপনাকে প্রেরণ করিয়াছে এবং সমস্ত বিশ্বের আলোকে সমীরণে নানা আঘাতে বিকাশ লাভ করিয়া দিকে দিকে সেই বিচিত্র জীবনের রসপুষ্ট কাব্যের শাখাপ্রশাখা কী আশ্চর্য পত্রপুষ্পে শোভিত হইয়া আপনাকে প্রসারিত করিয়া দিয়াছে। ক্রমে যখন শাখাগ্রভাগে পরিণত জীবনের ফল ধরিল তখন তাহার কাঁচা রঙ আমরা দেখিয়াছি—তখনও তাহা রসে মধুর হয় নাই, জীবনের ভোগের বৃন্তে তাহার জোড় দৃঢ়বদ্ধ। ক্রমে ভিতরে ভিতরে রসে যখন সে পূর্ণ হইতে লাগিল, তাহার ভিতরের সেই পূর্ণতা তাহার বাহিরে আত্মদানরূপে অত্যন্ত অনায়াসে যখন প্রকাশ পাইল, তাহার পুষ্পদল ছিন্ন হইয়া তাহার ভোগের বৃত্ত শিথিল হইল—তখন তাহার সেই বিশ্বের কাছে নিবেদিত অঞ্জলিকে আমরা যে চিনি নাই এ কথা স্বীকার করি না। কিন্তু সেই অঞ্জলিকেই সম্পূর্ণ বলিতে যাইব কেন? সে তো রসের ভারে একেবারে অবনত হয় নাই—তাহার রসের কথার চেয়ে তাহার সাধনার কথা, তাহার বেদনার কথা যে অধিক। এই নবপ্রকাশিত গীতিমাল্যের গানগুলি রসে টুস্‌টুসে ফলের মতো—স্পর্শমাত্রেই যেন ফাটিয়া পড়িবে। ইহার মধ্যে সাধনার বিশেষ কোনো বার্তাই নাই—সেইজন্য বেদনার মেঘমলিনিমা নাই, আগাগোড়া আনন্দের জ্যোতির্ময় উচ্ছ্বাস। গীতাঞ্জলি এবং গীতিমাল্য এই দুই নামের মধ্যেই দুই কাব্যের পার্থক্য দিব্য সূচিত হইয়াছে। গীতাঞ্জলি যেন দেবতার পায়ে সসম্ভ্রমে গীতিনিবেদন, সেখানে—

দেবতা জেনে দূরে রই দাঁড়ায়ে,
বন্ধু ব’লে দু হাত ধরি নে।

 গীতিমাল্য বঁধুর গলায় গীতিমাল্যের উপহার। দূরত্বের বাধা দূর হইয়া অত্যন্ত নিকট নিবিড় পরিচয়।—

বঁধুর কাছে আসার বেলায়
গানটি শুধু নিলেম গলায়,
তারই গলার মালা ক’রে
করব মূল্যবান!

 ১৩২১