বিষয়বস্তুতে চলুন

কাব্যপরিক্রমা (১৯৫৮)/গীতিমাল্য

উইকিসংকলন থেকে

গীতিমাল্য

ইংরেজি গীতাঞ্জলির যতগুলি সমালোচনা বিলাতি কাগজে পড়িয়াছি তাহার অধিকাংশেরই মধ্যে রবীন্দ্রনাথকে মিস্টিক বা মরমী কবি মনে করার জন্য মিষ্টিক সাহিত্যের সহিত তাঁহার কাব্যের সৌসাদৃশ্য দেখাইবার চেষ্টা হইয়াছে। বিলাতি সমালোচকেরা খৃস্টান ভক্তিসাহিত্যের সঙ্গে গীতাঞ্জলির তুলনা করিয়াছেন; কেহ কেহ বা হিব্রু সামগাথা, ডেভিড আইজায়া প্রভৃতি ভক্তদের বাণীর সহিত তাঁহার কাব্যের সারূপ্য ঘোষণা করিয়াছেন। জলালুদ্দিন রুমি প্রভৃতি দু-একজন সুফি কবির নাম পশ্চিমে বিখ্যাত হইয়াছে; সুফি কাব্যের ইংরেজি অনুবাদ পাঠ করিয়া কোনো কোনো সমালোচক গীতাঞ্জলির প্রসঙ্গে সুফি কবিদের রচনা উদ্ধৃত করিবার প্রলোভন সম্বরণ করিতে পারেন নাই।

 রবীন্দ্রনাথকে মিষ্টিক উপাধিতে ভূষিত করা ও মিষ্টিক সাহিত্যের সঙ্গে তাঁহার কাব্যের সৌসাদৃশ্য দেখাইবার চেষ্টা করাটা ইংরেজ সমালোচকের পক্ষে কিছুমাত্র বিচিত্র হয় নাই। এক সময় ছিল যখন নাটক লিখিলেই লোকে শেক্‌স্‌পীয়রের নাটকের সঙ্গে তুলনা করিত। এখন দেখিতে পাইয়াছে যে, শেক্‌স্‌পীয়রের নাটকই নাটকের একমাত্র রূপ নয়। শেলির প্রমিথিউস আন্‌বাউণ্ড্ বা চেঞ্চি-ও নাটক; ব্রাউনিঙের প্যারাসেলসাস্ বা পিপা পাসেস্‌ও নাটক; আবার য়েট্‌সের শ্যাডোয়ি ওয়াটার্‌স্, মেটারলিঙ্কের ব্লু বার্ড, বার্নার্ড শ’র ম্যান অ্যাণ্ড সুপার্‌ম্যান এবং ইব্‌সেনের পিয়ার গিণ্ট্-ও নাটক। নাটক ও খণ্ডকাব্যের রূপ ক্রমশই বিচিত্র হইতে বিচিত্রতর হইতেছে। অধ্যাত্মকাব্যের রূপও যে খৃস্টান ভক্তবাণী বা হিব্রু সামগাথা হইতে স্বতন্ত্র হইতে পারে, এ ধারণা ইউরোপীয়দিগের মনে এখনও উজ্জ্বল হইয়া উঠে নাই। কারণ, খৃস্টানধর্ম ছাড়া জগতে আর কোথাও যে ভক্তিধর্ম থাকিতে পারে, সে দেশের নানাশাস্ত্রবিদ্ পণ্ডিত লোকেরও মনে এ বিশ্বাস নাই। ভারতবর্ষে বৈষ্ণব ভক্তিবাদের উৎপত্তি অনুসন্ধান করিতে গিয়া ইঁহারা বলেন যে, ভারতবর্ষের দক্ষিণ অঞ্চলে খৃস্টান মিশনারিগণ আসিয়াছিলেন, তাঁহাদের নিকট হইতে বাইবেলের ভক্তিবাদ শ্রবণ করিয়া এ দেশে বৈষ্ণবধর্মের অভ্যুদয় ঘটে। কবীরের বাক্যাবলীর মধ্যে এক জায়গায় আছে যে, শব্দ হইতে সমস্তের উৎপত্তি, সকলের আদিতে শব্দ ছিল—তাহা পাঠ করিয়া কোনো বিখ্যাত ইংরেজ বিদুষীর মনে হইয়াছিল যে, কবীর সেণ্ট্ জনের সুসমাচার হইতে নিশ্চয়ই ঐ ভাবটি ধার করিয়াছেন!

 যে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ পাঠ করিয়াছে, রবীন্দ্রনাথকে খৃস্টান ভক্তকবিদের সঙ্গে তুলনা করা তাহার পক্ষে অসম্ভব। খৃস্টান ধর্ম ভক্তিধর্ম হইলেও প্রাচীন হিব্রুধর্মের বহু সংস্কারকে সম্পূর্ণরূপে ছাড়াইয়া উঠিতে পারে নাই। এই জগৎ যে জগদীশ্বরের দ্বারা আবাস্য নহে, তিনি যে সর্বভূতান্তরাত্মারূপে ইহার অন্তরতর স্থানে প্রতিষ্ঠিত নাই—হিব্রুধর্মের ইহা এক মূল কথা। জগৎপতি থাকেন এক কল্পিত স্বর্গলোকে। এবং এই জগৎ-যন্ত্র তাঁহার হস্তের দ্বারা নির্মিত হইলেও তাঁহা হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পাপী মনুষ্যের আবাসস্থান হইয়া আছে। যদিচ খৃস্ট মানুষকে উদ্ধার করিবার জন্য এবং স্বর্গে পুনরায় লইয়া যাইবার জন্য পৃথিবীতে মানবরূপ পরিগ্রহ করিয়া অবতীর্ণ হইয়াছিলেন তথাপি স্বর্গ এবং মর্তের ব্যবধান তাঁহার দ্বারা দূরীভূত হয় নাই। তিনি মধ্যস্থতা করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন এবং স্বর্গ হইতে অবতরণ করিবার জন্য পৃথিবীতে তাঁহাকে ক্রুশের ব্যথা বহন করিতে হইয়াছিল। সেই ক্রুশ তাঁহার সকল ভক্তের জন্য তিনি রাখিয়া গিয়াছেন—সেই পরম দুঃখ-স্বীকারের উপর স্বর্গের অধিকারলাভের সম্ভাবনা নির্ভর করিতেছে। মানবের নিকটে ঈশ্বরের আত্মদান আনন্দের আত্মদান নহে, দুঃখের বলিদান—এই তত্ত্ব কোথায়, আর কোথায় উপনিষদের ‘আনন্দাদ্ধোব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে’, আনন্দ হইতে সকল সৃষ্টির উদ্ভব—এই তত্ত্ব! আমাদের শাস্ত্রে বলে জগতের সঙ্গে ঈশ্বরের, আনন্দের একাত্মযোগ, জগৎ ঈশ্বরের আনন্দের দ্বারা পরিপূর্ণ। জগৎ সসীম, ঈশ্বর অসীম, কিন্তু সসীমের মধ্যে অসীমের প্রকাশ। এই জগৎ তাহার আনন্দরূপ, অমৃতরূপ—আনন্দরূপমমৃতং যদ্বিভাতি। এ তত্ত্ব খৃস্টান ধর্মশাস্ত্রে কুত্রাপি পরিলক্ষিত হয় না। সেইজন্য সসীম অসীমের দ্বন্দ্ব সে দেশের ধর্মশাস্ত্রে কিছুতেই নিরস্ত হইবার নহে।

 রবীন্দ্রনাথ আবাল্য উপনিষদের স্তন্যরসে পরিপুষ্ট ও বর্ধিত—খৃষ্টীয় স্বর্গমর্তের কল্পিত ব্যবধানের তত্ত্ব, মনুষ্যের আদিম পাপের তত্ত্ব এবং খৃস্টের আত্মবলিদানের দ্বারা সেই পাপ হইতে উদ্ধারের তত্ত্ব তাঁহার কাছে অত্যন্ত স্থূল ও ভ্রান্ত ভিন্ন আর কী প্রতিপন্ন হইতে পারে? সেইজন্য তাঁহাকে সেণ্ট্ ফ্রান্সিস অব অ্যাসিসি বা ঐ শ্রেণীর খৃষ্টীয় সাধকদিগের সঙ্গে তুলনা করা নিতান্ত অসংগত হইয়াছে। উপনিষদের সঙ্গে বাইবেলের যেমন তুলনা চলে না, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ফ্রান্সিস অব অ্যাসিসি বা মঠাশ্রয়ী খৃষ্টীয় কোনো সাধকের তেমনি তুলনা চলে না।

 আমি অবশ্য ভুলি নাই যে, গ্রীক দার্শনিক প্লেটো ও প্লাটিনাসের ভাববাদ যেখানেই খৃষ্টধর্মের সঙ্গে তত্ত্বে এবং সাধনায় মিলিত হইবার সুযোগ লাভ করিয়াছে সেখানেই খৃস্টান ধর্মতত্ত্ব এবং সাধনা এমন একটি অভাবনীয় রূপ লাভ করিয়াছে যাহা বাস্তবিকই বিস্ময় উদ্রেক না করিয়া পারে না। খৃস্টধর্মে ঈশ্বরের সসীম ও অসীম স্বরূপের যে দ্বন্দ্ব রহিয়াছে—ঈশ্বর তাঁহার শক্তিতে অনন্ত কিন্তু প্রেমে সান্ত, এই-যে তাঁহার দ্বৈত খৃষ্টধর্ম স্বীকার করিয়াছে—ইহাকে অবলম্বন করিয়া এক নিগূঢ় তত্ত্বের উদ্ভব জর্মান দেশে ঘটিয়াছে। জেকব বইমে, এই তত্ত্বের একজন প্রধান প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যাখ্যাতা। জেকব বইমে, রুইজব্রুয়েক প্রভৃতি কোনো কোনো সাধকের সহিত আমাদের প্রাচ্য ভক্তিসাধক দিগের সৌসাদৃশ্য এইজন্য দেখা যায়। কিন্তু মোটের উপর খৃস্টীয় সাধনা বলিতে উৎকট পাপবোধ ও তজ্জনিত ব্যাকুলতা এবং মানবরূপী ভগবান খৃষ্টের অনন্যশরণাগতির চিত্রই মনে জাগে। তাহার সঙ্গে ভারতবর্ষীয় সাধনার সম্বন্ধ বড়োই অল্প।

 উপনিষদের স্তন্যরসে রবীন্দ্রনাথ বর্ধিত হইয়াছেন এবং তাঁহার কাব্যের মর্মস্থলে উপনিষদের তত্ত্ব বিরাজমান এ কথা বলিলেও, কেবলমাত্র উপনিষদ গীতিমাল্যের গানগুলির উৎস হইতে পারিত না। উপনিষদের শ্রেষ্ঠ ভাব আত্মাতে পরমাত্মাকে দর্শন। শান্ত দান্ত উপরত তিতিক্ষু সমাহিত হইয়া সাধক ‘আত্মন্যেবাত্মানং পশ্যতি’, আত্মার মধ্যে সেই পরমাত্মাকে দেখিয়া থাকেন। সজ্ঞানপ্রসাদেন বিশুদ্ধসত্ত্বস্ততাস্তু তং পশ্যতে নিষ্কলং ধ্যায়মানঃ―জ্ঞানপ্রসাদে বিশুদ্ধসত্ত্ব হইলে ধ্যায়মান হইয়া মানুষ তাঁহাকে দেখিতে পায়। উপনিষদ যেখানে সর্বভূতের মধ্যে আত্মাকে দেখিবার কথা বলিয়াছেন সেখানেও আত্মস্থ হইয়া যোগস্থ হইয়া ‘নিত্যোঽনিত্যানাং’ সকল অনিত্যের মধ্যে তাঁহাকে নিত্যরূপে ধ্যান করিবার উপদেশই দিয়াছেন। উপনিষদের সাধনা এই অন্তর্মুখীন ধ্যানপরায়ণ সাধনা, অধ্যাত্মযোগের সাধনা। উপনিষদের ব্রহ্ম—দুর্দর্শং গূঢ়মনুপ্রবিষ্টং গুহাহিতং। তিনি লীলারসময় বিশ্বরূপ ভগবান নহেন। বৈষ্ণবের লীলাতত্ত্বের আভাস উপনিষদের মধ্যে নানা স্থানে থাকিতে পারে, কিন্তু সেই তত্ত্ব উপনিষদের মধ্যে পরিস্ফুট আকার লাভ করিয়াছে এ কথা কোনো মতেই বলা যায় না। লীলাতত্ত্বের কথা এই যে, বিশ্বের সকল সৌন্দর্য, সকল বস্তু, সকল বৈচিত্র্য, মানবজীবনের সকল ঘটনা, সকল উত্থানপতন সুখদুঃখ জন্মমৃত্যু—সমস্তই শ্রীভগবানের রসলীলা বলিয়া গভীরভাবে উপলব্ধি করিতে হইবে। ভগবান অনাদি অনন্ত নির্বিকল্প হইয়াও প্রেমে অন্তের মধ্যে ধরা দিয়াছেন, সেইজন্যই তো কোথাও অন্তের আর অন্ত পাওয়া যায় না। ‘সীমার মাঝে, অসীম, তুমি বাজাও আপন সুর।’ সকল সীমাকে রন্ধ্র করিয়া সেই অনন্তের বাঁশি তাই নিরন্তর বাজিতেছে এবং তিনি বারবার জীবনের নানা গোপন নিগূঢ় পথ দিয়া আমাদিগকে তাঁহার দিকে কত দুঃখক্লেশ কত আঘাত অভিঘাতের ভিতর দিয়া আকর্ষণ করিয়া লইয়া চলিয়াছেন। সমস্ত জীবনের এই সুখদুঃখবিচিত্র পথ তাঁহারই অভিসারের পথ। এই পথেই তাঁহার সঙ্গে আমাদের মিলন; এই পথেই কত বিচিত্র রূপ ধরিয়া তিনি দেখা দিতেছেন। এই-যে বিশ্ব ও মানবজীবনের সকল বৈচিত্র্যকে ভগবানের প্রেমের লীলা বলিয়া অনুভূতি, বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বের ইহাই সার কথা।

 উপনিষদের যোগতত্বে বেদান্তশাস্ত্র তৈরি হইতে পারে, কিন্তু তাহা হইতে কাব্যকলা সমুৎসারিত হয় না। বৈষ্ণবের লীলাতত্ত্বে অনুভূতির বিচিত্রতা ও প্রসার এমন বাড়িয়া যায় যে, কাব্যকলাকে আশ্রয় করিয়া তাহা আত্মপ্রকাশ না করিয়া থাকিতে পারে না। এইজন্য উপনিষদ হইতে আমরা দর্শনশাস্ত্র পাইয়াছি; কিন্তু বৈষ্ণব ভক্তিবাদ হইতে কেবল দর্শনশাস্ত্র নহে, অপূর্ব ভক্তিকাব্যসকলও সম্ভাবিত হইয়াছে। কেবল বাংলাদেশের বৈষ্ণব কবিতার কথা বলিতেছি না, উত্তর-পশ্চিমের কাব্য ও গানগুলিও সংখ্যায় বৈচিত্র্যে এবং রসগভীরতায় বাংলার বৈষ্ণব কাব্যের চেয়ে কোনো অংশে ন্যূন নহে, বরং অনেক বিষয়ে শ্রেষ্ঠ। আমরা সেসকল কাব্য ও গানের কত অল্প পরিচয় পাইয়াছি। জ্ঞানদাস রবিদাস কবীর দাদূ মীরাবাঈ প্রভৃতি ভক্তকবিদের গানের যে দু-একটা টুকরা কালের স্রোতে এখনকার ঘাটে আসিয়া লাগিয়াছে তাহা শতদলের ছিন্ন পল্লবের মতো সুগন্ধে প্রাণকে বিধুর করিয়া দেয়। মানুষের অন্তরের ভক্তি যখন তাহার অনুরূপ ভাষা লাভ করিয়া আপনাকে ব্যক্ত করে তখন সে যে কী অপূর্ব জিনিস হয় তাহা এই উত্তর-পশ্চিমের ভক্তিসাহিত্যে পরিষ্কার দেখিতে পাওয়া যায়।

 রবীন্দ্রনাথ কেবলমাত্র উপনিষদের অধ্যাত্মযোগতত্ত্বের দ্বারা অনুপ্রাণিত নন এবং কেবলমাত্র বৈষ্ণবের লীলাতত্ত্বের দ্বারাও অনুপ্রাণিত নন, এই দুই তত্ত্বই তাঁহার জীবনের সাধনায় জৈব মিলনে মিলিত হইয়া এক অপরূপ নূতন রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। তাঁহার ভক্তিকাব্যের এই নবরূপকে বিশ্লেষণ করিয়া, তাহার কী পরিমাণ অংশ উপনিষদের এবং কী পরিমাণ অংশ বৈষ্ণব ভক্তিতত্ত্বের তাহা নির্দেশ করতে যাওয়া ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র। কারণ, এ তো দর্শনশাস্ত্র নয়, এ যে জীবনের জিনিস। এ গান যে জীবন হইতে প্রতিফলিত হইতেছে। সে জীবন আপনার অধ্যাত্মপিপাসায় কোনো রসকেই বাদ দেয় নাই, তাহার মধ্যে সকল বিচিত্র রস মিলিয়া-জুলিয়া এক অভিনব মূর্তি গ্রহণ করিয়াছে। সেইজন্য বৈষ্ণবকাব্যের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি বা গীতিমাল্যের তুলনাই চলে না। ঐ কাব্য দুটির মধ্যে যে বৈষ্ণবভাব বহুলপরিমাণে নাই এমন কথা বলি না; কিন্তু আরও অনেক জিনিস আছে যাহা বৈষ্ণবভাব নয়, যাহা বৈষ্ণবভাবাবলীর সঙ্গে সংগত হইয়া তাহাদিগকে রূপান্তরিত করিয়া ফেলিয়াছে।

 আরও একটি কারণে রবীন্দ্রনাথকে ভারতবর্ষের প্রাচীন বৈষ্ণব বা ভক্তকবিদিগের সঙ্গে তুলনা করা চলে না। কেবল যে রবীন্দ্রনাথের মধ্যেই উপনিষদের অধ্যাত্মযোগতত্ত্ব এবং বৈষ্ণব লীলাতত্ত্ব মিলিয়াছে এবং বাণীরূপ লাভ করিয়াছে তাহা নহে, কবীর দাদূ প্রভৃতির মধ্যেও এই একই প্রক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। সুফিধর্ম, বেদান্ত এবং বৈষ্ণব ভক্তিবাদ এই ত্রিবেণীসংগমের তীর্থোদকে কবীরের অমর সংগীত অভিষিক্ত হইয়াছে। সেইজন্য তাহার অন্তরে যেমন কঠিন একটি তত্ত্বজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাধার, তাহার উপরে তেমনি ভক্তির রসোচ্ছ্বাস সংগীতের তরল ধারায় নৃত্য করিয়া চলিয়াছে। কিন্তু তথাপি সেই-সকল গানের সহিত গীতিমাল্যের গানের রূপভেদ আছে। গীতিমাল্য ও গীতাঞ্জলির রবীন্দ্রনাথ যে ‘সোনার তরী’ ‘চিত্রা’ ‘কল্পনা’ ‘ক্ষণিকার’ও রবীন্দ্রনাথ; যিনি প্রকৃতির কবি, মানবপ্রেমের কবি, যিনি সকল বিচিত্র রসনিগূঢ় জীবনের গান গাহিয়াছেন, তিনিই যে এখন ‘রসানাং রসতমঃ’, সকল রসের রসতম ভগবৎ-প্রেমের গান গাহিতেছেন—ইহাতেই ভারতবর্ষের ও অন্যান্য দেশের ভক্তিসংগীতের সঙ্গে এই নূতন ভক্তিসংগীতের প্রভেদ ঘটিয়াছে। এমন ঘটনা জগতে আর কোথাও ঘটিয়াছে কি না জানি না। কারণ, ধর্ম চিরকালই জীবনের অন্যান্য বৈচিত্র্য হইতে আপনাকে সরাইয়া লইয়া সযত্নে সন্তর্পণে আপনাকে এক কোণে রক্ষা করিবার চেষ্টা করিয়াছে। জীবনের গতি এক দিকে, ধর্মের গতি অন্য দিকে—জীবনের গতি প্রবৃত্তির দিকে, ধর্মের গতি নিবৃত্তির দিকে। সেইজন্য কবি ও ভগবদ্‌ভক্ত এ দুয়ের সম্মেলন দেখা যায় নাই। ভগবদ্‌ভক্ত হয়তো কবি হইয়াছেন অর্থাৎ ভক্তির গান লিখিয়াছেন—কিন্তু জীবনের অন্যান্য রসের প্রকাশ তাঁহার মধ্যে ফুটিয়াছে কোথায়? পক্ষান্তরে কোনো কবি যে ভক্তির গান লিখিয়া অমর হইয়াছেন তাহারও পরিচয় পাওয়া যায় না। কবীর বা দাদূ বা আর-কোনো ভক্তকবি রবীন্দ্রনাথের মতো প্রণয়কবিতা বা প্রণয়সংগীত লিখিয়াছেন ইহা কোনোদিন যদি কোনো ঐতিহাসিক বা প্রত্নতত্ত্ববিদ্ পণ্ডিত প্রমাণ করিয়াও দেন তাহা হইলেও আমরা বিশ্বাস করিতে পারিব না। কোনো পুরানো পুঁথির মধ্যে কবীরের লিখিত এমন ছত্র বাহির হওয়া অসম্ভব—

ভালোবেসে, সখি, নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখিয়ো
তোমার মনের মন্দিরে।

কিম্বা—

সখি, প্রতিদিন হায়, এসে ফিরে যায় কে?
তারে আমার মাথার একটি কুসুম দে।

 জীবনের সকল রস, সকল অভিজ্ঞতার এমন অবাধ এমন আশ্চর্য প্রকাশ জগতের অল্প কবিরই মধ্যে দেখা গিয়াছে। পরিপূর্ণ জীবনের গান যিনি গাহিয়াছেন তিনি যখন অধ্যাত্ম-উপলব্ধির গান গাহেন তখন এসরাজের মূল তারের ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে তাহার পাশাপাশি যে তারগুলি থাকে তাহারা যেমন একই অনুরণনে ঝংকৃত হইতে থাকে এবং মূল তারের সংগীতকে গভীরতর করিয়া দেয়, সেইরূপ অধ্যাত্ম-উপলব্ধির সুরের সঙ্গে জীবনের অন্যান্য রসোপলব্ধির সুর মিলিত হইয়া এক অপূর্ব অনির্বচনীয়তার সৃষ্টি করে। এই জন্য রবীন্দ্রনাথকে যে-সকল বিলাতি সমালোচক খৃস্টান ভক্তকবিদের সঙ্গে বা হিব্রু প্রফেট্‌দের সঙ্গে তুলনা করিয়াছেন তাঁহাদের তুলনা যেমন সত্য হয় নাই, সেইরূপ যাঁহারা এতদ্দেশীয় ভক্ত কবিদের সঙ্গে তাঁহার তুলনা করেন তাঁহাদেরও তুলনা ঠিক হয় বলিয়া মনে করি না। বরং আধুনিক কালের যে-সকল কবি জীবনের সকল বিচিত্রতার রসানুভূতিকে অধ্যাত্ম রসবোধের মধ্যে বিলীন করিয়া দিতে চান সেই-সকল কবিদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ তুলনীয় হইতে পারেন। ওয়াল্ট্ হুইট্‌ম্যান, রবার্ট্ ব্রাউনিং, এড্‌ওআর্ড্ কার্পেণ্টার, উইলিয়ম ব্লেক, ফ্রান্সিস টম্প্‌সন প্রভৃতি পাশ্চাত্য কবিদের কাব্যজীবন ধারার সঙ্গে বরং রবীন্দ্রনাথের কাব্যজীবনধারার তুলনা করিয়া অধ্যাত্মরসবোধের বিকাশ কোন্ কবির মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক ঘটিয়াছে তাহা আলোচনা করিয়া দেখা যাইতে পারে। ব্রাউনিঙের শেষবয়সের ধর্মকাব্য Ferishtah’s Fancies, হুইট্‌ম্যানের Sands at Seventy, কার্পেণ্টারের Towards Democracy এবং টম্প্‌সনের The Hound of Heaven প্রভৃতি কাব্যের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি বা গীতিমাল্যের তুলনা করিলে এই শ্রেণীর ধর্মকাব্যে এই-সকল কবির মধ্যে তাঁহার শ্রেষ্ঠত্ব সহজেই অনুমিত হইবে।

 আমার হাতের কাছে এই কাব্যগুলি নাই—কেবল টম্প্‌সনের The Hound of Heaven এর শেষ কয়েক ছত্র উদ্‌ধৃত করিতেছি—

‘All which I took from thee I did but take,
Not for thy harms,
But just that thou might’st seek it in My arms,
All which thy child’s mistake
Fancies as lost, I have stored for thee at home;
Rise, clasp my hand, and come.’

Halts by me that footfall,
Is my gloom, after all,
Shade of His hand, outstretched caressingly?


‘লয়েছিনু যাহা কাড়ি
আমি  লই নাই তাহা ক্ষতির লাগি—
ভেবেছিনু তুমি এসে
মোর  হাত হাতে নিজে লইবে মাগি।
অবুঝ শিশুর মতো
মনে  ভেবেছিলে যাহা হারায়ে গেছে
জমিয়ে রেখেছি তাহা
দেখো,  তোমারি লাগিয়া ঘরের মাঝে!
উঠ, ধরো হাত, এসো হে কাছে!’


থেমে গেল পদধ্বনি।
হায়,  আমার মনের আঁধাররাশি—
সে কি তাঁর করচ্ছায়া?
তিনি  আদরের লাগি বাড়ান হাসি?

ইহার জুড়ি কবিতা গীতিমাল্যে আছে—

এরে ভিখারি সাজায়ে কী রঙ্গ তুমি করিলে।
হাসিতে আকাশ ভরিলে।
পথে পথে ফেরে, দ্বারে দ্বারে যায়,
ঝুলি ভরি রাখে যাহা-কিছু পায়,
কতবার তুমি পথে এসে হায়
ভিক্ষার ধন হরিলে

ভেবেছিল চির কাঙাল সে এই ভুবনে,
কাঙাল মরণে জীবনে।
ওগো মহারাজা, বড়ো ভয়ে ভয়ে
দিনশেষে এল তোমার আলয়ে,
আধেক আসনে তারে ডেকে লয়ে
নিজ মালা দিয়ে বরিলে।

এই উদ্‌ধৃত ছোটো গানটির মধ্যে অধ্যাত্মসাধনের প্রথম অবস্থায় ত্যাগের রিক্ততার সুগভীর বেদনা এবং শেষ অবস্থায় ভগবানকে অনন্যশরণ জানিয়া আশ্রয় করিবামাত্র মিলনের অপূর্ব আনন্দের সমস্ত ইতিহাস কী একটি সংহতরূপ লাভ করিয়াছে! টম্প্‌সন The Hound of Heaven’এ এই ইতিহাসকেই কত ফলাও করিয়া স্তরে স্তরে উদ্‌ঘাটন করিয়া প্রকাশ করিবার চেষ্টা করিয়াছেন—তাহা আশ্চর্য হইলেও গীতিমাল্যের এই গানের কলাসংযম তাহাতে লক্ষিত হয় না।

গীতিমাল্যের গোড়ার দিকে নয়টি কবিতা আছে। এবং ইংলণ্ডে যাত্রা করিবার পূর্বে এই একই সময়ে রচিত গোটা-পনেরো গানও আছে। রবীন্দ্রনাথের জীবনের প্রত্যেক অবস্থার সঙ্গে সেই সেই অবস্থায় রচিত তাঁহার কাব্যের এমন অচ্ছেদ্য সম্বন্ধ যে, তাঁহার কাব্যকে সম্পূর্ণভাবে বুঝিবার জন্য তাঁহার জীবনের কথা কিছু কিছু জানা দরকার হয়। পৃথিবীতে বোধ হয় আর কোনো কবির জীবন নিজ কাব্যের ধারাকে এমন একান্তভাবে অনুসরণ করিয়া চলে নাই। কবির জীবনের বড়ো বড়ো পরিবর্তনগুলি প্রথমে কাব্যের মধ্য দিয়া নিগূঢ় ইঙ্গিতমাত্রে প্রতিফলিত হইয়া শেষে জীবনের ঘটনা রূপে প্রকাশ পাইয়াছে। পাশ্চাত্যদেশে অধুনা মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় subliminal consciousness বা মগ্নচৈতন্যের ক্রিয়া সম্বন্ধে বিচিত্র তথ্য সংগৃহীত হইতেছে। রবীন্দ্রনাথের কাব্যজীবন ইহার যেরূপ সুস্পষ্ট উদাহরণ এমন বোধ হয় দ্বিতীয় উদাহরণ খুঁজিয়া পাওয়া শক্ত। কোনো কবির কাব্য যে তাহার জীবনকে ক্রমে ক্রমে রচনা করিয়া তুলিয়াছে এবং সেই কাব্য যে জীবনের সচেতন কর্তৃত্বের কোনো অপেক্ষা রাখে নাই, এমন আশ্চর্য ব্যাপার আর কোনো কবির জীবনে ঘটিয়াছে কি না জানি না। সেই জন্যই অন্য সকল কবির চেয়ে রবীন্দ্রনাথের কাব্যালোচনার সময়ে তাঁহার জীবনের কথা বেশি করিয়া পাড়িতে হয়। ইহাকে অনেকে ব্যক্তিগত আলোচনা মনে করিতে পারেন, কিন্তু বস্তুত ইহা তাহা নহে।

 কবির কাব্যের সঙ্গে জীবন একসূত্রে গ্রথিত বলিয়া অন্য মানুষের জীবনে যে-সকল ঘটনা অত্যন্ত তুচ্ছ ও নগণ্য, কবির কাছে তাহা একটি অভূতপূর্ব অসামান্যতা লাভ করিয়া বিস্ময়কর রূপে প্রতীয়মান হয়। দেশভ্রমণের বাসনা আমাদের সকলেরই মধ্যে ন্যূনাধিক পরিমাণে আছে। যে পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করিয়াছি তাহাকে যতটা পারি দেখিয়া লইব এ সাধ মনের মধ্যে গোপনে গোপনে থাকে, সুযোগ পাইলেই ইহা প্রবল হইয়া চরিতার্থতার পথ অন্বেষণ করে। কত সময় কত অভাবিতপূর্ব কারণে এরূপ সুযোগ আসিয়াও আসে না, মনের একান্ত ইচ্ছার পূরণ হয় না। কিন্তু এই সামান্য ব্যাপারই কবির কাছে এমন একটি প্রবল ব্যাপার যে তাহা সমস্ত মনকে সমস্ত চৈতন্যকে নাড়া দিয়া কাব্যের মধ্যে একটা অননুভূত ভাবকে জাগাইয়া তোলে এবং জীবনকেও একটা নূতন রহস্যে মণ্ডিত করিয়া দেখে।

 কবি যে ইউরোপ-যাত্রার জন্য প্রস্তুত হইতেছিলেন তাহা এমনি একটি অসামান্য ব্যাপার; অকস্মাৎ অজানা দেশে যাত্রার জন্য বিহঙ্গদলকে যেমন এক অশান্ত আবেগ ও চঞ্চলতা মহাসমুদ্র পাড়ি দিতে প্রবৃত্ত করে, যাত্রার পূর্বে ঠিক তেমনি একটি অকারণ চাঞ্চল্য কবি অনুভব করিতেছিলেন। কেন যাইতেছেন, সেখানে গিয়া কী উদ্দেশ্য সাধিত হইবে—এ-সকল কোনো প্রশ্নেরই জবাব দেওয়া তাঁহার পক্ষে শক্ত ছিল। যাত্রার যাহা একমাত্র কারণ তাহা তো কবিতায় বহুপূর্বেই তিনি প্রকাশ করিয়াছেন—

আমি চঞ্চল হে,
আমি সুদূরের পিয়াসী!

কিন্তু এবারে সে কারণ ছিল না। এবারে কোনো কারণ না জানিয়াও তিনি অনুভব করিতেছিলেন যে, এ যাত্রা তাঁহার তীর্থযাত্রার মতো—এ যাত্রা হইতে তিনি শূন্য হাতে ফিরিবেন না। এবার মহামানবতীর্থের যে শক্তিসমুদ্রমন্থনজাত অমৃত তিনি সংগ্রহ করিয়া আনিবেন তাহাতে তাঁহার কাব্যের ও জীবনের মহা অভিষেক হইবে।

 তীর্থযাত্রার জন্য এই ব্যাকুলতা যখন পূর্ণমাত্রায় মনকে অধিকার করিয়া আছে তখন হঠাৎ স্নায়ুদৌর্বল্যপীড়ায় আক্রান্ত হইয়া কবির যাত্রায় ব্যাঘাত পড়িল। কবি শিলাইদহ চলিয়া গেলেন। ৪ হইতে ২১ সংখ্যা-চিহ্নিত যে কবিতা ও গানগুলি গীতিমাল্যে স্থান পাইয়াছে তাহারা সেখানে ‘আমের বোলের গন্ধে অবশ’ মধুমাসে রুগ্ন অবস্থায় রচিত। তখন কাজকর্ম দেখাসাক্ষাৎ সমস্তই বারণ হইয়া গিয়াছে—

কোলাহল তো বারণ হল,
এবার কথা কানে কানে।
এখন হবে প্রাণের আলাপ
কেবলমাত্র গানে গানে।

তাই বলিতেছিলাম যে, বাহির হইতে দেখিতে গেলে এই এক সামান্য ঘটনার আঘাতে এই নূতন ‘প্রাণের আলাপে’র সূত্রপাত হইল।

 কিন্তু এই কানে-কানে কথার রহস্যনিবিড়তাই যে এই সময়ের কবিতা ও গানগুলির বিশেষত্ব তাহা নহে। পৃথিবীর গভীরতম স্তরে যে উৎস জমাট হইয়া আছে তাহার পূর্ণতার তো কোনো অভাব নাই; তথাপি বাহির হইবার বেদনায় তাহার সমস্ত অন্তর যেন ক্রন্দন করিতে থাকে। সেইরূপ এই কানে-কানে কথা যখন সবচেয়ে বেশি জমিয়াছে, যখন বিশ্বের একেবারে মর্মস্থলে চোখ মেলিয়া চাহিয়া দেখিবার অবকাশ ঘটিয়াছে, ঠিক সেই সময়েই তাহাতেই চরম পরিতৃপ্তি হইল না—এই কথাই বারবার নানারকম সুরে বাজিতে লাগিল—

অনেক কালের যাত্রা আমার
অনেক দূরের পথে।···
সবার চেয়ে কাছে আসা
সবার চেয়ে দূর।
বড়ো কঠিন সাধনা, যার
বড়ো সহজ সুর।
পরের দ্বারে ফিরে, শেষে
আসে পথিক আপন দেশে—
বাহির ভুবন ঘুরে মেলে
অন্তরের ঠাকুর।

···


এবার ভাসিয়ে দিতে হবে আমার
এই তরী।

···


এমনি ক’রে ঘুরিব দূরে বাহিরে
আর তো গতি নাহি রে মোর নাহি রে।

অথচ কবিতাগুলির মধ্যে এই সুর নাই। তাহাদের মধ্যে পরিচিততম অভ্যস্ততম বস্তুর আবরণ উন্মোচিত হইয়া

সকল জানার বুকের মাঝে
দাঁড়িয়ে ছিল অজানা যে

সেই অজানাকে অত্যন্ত কাছাকাছি, অত্যন্ত প্রত্যক্ষ রূপে উপলব্ধির কথা আছে। ৯-সংখ্যক কবিতায় কবি বলিতেছেন যে, এই নদীর পারে এই বনের ধারে যে সেই ‘অজানা’ ছিলেন, সে কথা তো কেহই তাঁহাকে বলে নাই। কখনও কখনও ফুলের বাসে, দক্ষিণে হাওয়ায়, পাতার কাঁপনে মনে হইত যেন অত্যন্ত কাছেই তিনি। কিন্তু আজ এই ‘নয়নঅবগাহনি’ স্নিগ্ধ শ্যামল ছায়ায় সেই বন্ধুর এ কী হাসি, এ কী নীরব চাহনি দেখা দিল! ‘লক্ষ তারের বিশ্ববীণা’ এই নীরবতায় লীন হইয়া এইখানে আজ সুর কুড়াইতেছে, ‘সপ্তলোকের আলোকধারা’ এই ছায়াতে আজ লুপ্ত হইয়া যাইতেছে! ১১-সংখ্যক কবিতাটি আরও চমৎকার! বিশ্বের একেবারে অন্তরতম কেন্দ্রস্থলে সমস্ত জীবনের সুদীর্ঘ পথখানি গিয়া মিলিয়াছে এবং সেই নিভৃত কেন্দ্রলোকটির গোপন দ্বার সমস্ত ‘চরাচরের হিয়ার কাছে’ই আছে। এই জীবন পথিকের দীর্ঘ পথযাত্রার সেইখানেই অবসান। সেখানে কে আছে? যে আছে—

অপূর্ব তার চোখের চাওয়া,
অপূর্ব তার গায়ের হাওয়া,
অপূর্ব তার আসা যাওয়া গোপনে।

সেই ‘জগৎ-জোড়া ঘর’টিতে কেবল দুটিমাত্র লোকের ঠাঁই হয়—সেই বিশ্বপদ্মের কেন্দ্রগত মধুকোষে যে অপূর্ব লোকটি বসিয়া আছেন তাঁহার এবং সেই কমলমধুপিয়াসী যে চিত্তভ্রমর তাহার উদ্দেশে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে তাহার—কেবলমাত্র এই দুজনার। এই কবিতাগুলির প্রত্যেকটিতেই সসীম-অসীমের, সরূপ-অরূপের, জীব ও ভগবানের নিত্য প্রেমলীলার উপলব্ধির নিবিড় আনন্দ প্রকাশ পাইয়াছে। কিন্তু এ লীলা বিশ্বের সেই নিভৃততম অন্তরতম কেন্দ্রটিতে উদ্‌যাপিত। এ লীলা বিশ্বের সকল সৌন্দর্যে, সকল আনন্দে, বিশ্বমানবের সকল বিচিত্রতায় উচ্ছ্বসিত হইয়া ছাপাইয়া পড়ে নাই। ‘সেখানে আর ঠাঁই নাহি তো কিছুরই।’ সেই জন্যই ঐ আর-একটি সুর আসিয়া এই নিভৃত বিলাসকে ভাঙিয়া দিল—ঐ বাহির হইয়া পড়িবার সুর।

এমনি করে ঘুরিব দূরে বাহিরে
আর তো গতি নাহি রে মোর নাহি রে।

কেবল এই কবিতাগুলির স্তর যদি চিত্তকে ভরপুর করিয়া রাখিতে পারিত তাহা হইলে কখনোই ঐ বাহির হইয়া পড়িবার সুর এমন প্রবলতা লাভ করিতে পারিত না। কবিতাগুলির সুর বৈষ্ণবধর্মের শ্রেষ্ঠ সুর— রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলাতত্ত্বে এই সুরই তো ফুটিয়াছে। সেই তত্ত্বে এই কথাই বলে যে, ভগবান জীবনকে ভুলাইবার জন্যই সৌন্দর্যের বেশ পরিয়া দেখা দেন, অরূপ হইয়াও রূপ ধরেন, এবং দুঃখের দুর্গম পথের মধ্য দিয়া অভিসারে বিশ্বের অন্তরতম জায়গায় সেই নিভৃত নিকুঞ্জে সকল সংস্কারের পাশ ছিন্ন করিয়া তাহাকে আকর্ষণ করিয়া আনেন—

আমার পরশ পাবে ব’লে
আমায় তুমি নিলে কোলে
কেউ তো জানে না তা।
রইল আকাশ অবাক মানি,
করল কেবল কানাকানি
বনের লতাপাতা।

 কিন্তু সে সুরে কুলাইল না। লোহিত সমুদ্রে এই গান জাগিল—

প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে
মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ।

আরো আরো আরো চাই। কেবল তৃপ্তির বিরতি চাই না, অতৃপ্তির চিরগতি চাই। কেবল উপলব্ধির শান্তি নয়, নব নব বেদনাময় চৈতন্য।

ইংলণ্ডে, ইংলণ্ড হইতে ফিরিবার পথে জাহাজে, এবং স্বদেশে ফিরিয়া আসিবার পরে ভাদ্র হইতে মাঘ পর্যন্ত ছয় মাসে, কবি যে গীতিমাল্য গাঁথিয়াছেন সে গানগুলি একেবারে স্বচ্ছ, ভারমুক্ত, ফুলেরই মতো নৈসর্গিক সৌন্দর্যে মণ্ডিত। গীতাঞ্জলির কোনো গানই এই গানগুলির মতো এমন মধুর, এমন গভীর, এমন আশ্চর্য সরল নহে।

 ইংলণ্ডে ‘জনসংঘাতমদিরা’ স্বভাবতই মানুষকে কিছু-না-কিছু চঞ্চল করিয়া দেয়। তার উপর ইংলণ্ডের গুণীরসিকসমাজের স্তবমদিরা যখন পাত্র ছাপাইয়া উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিয়াছিল তখন সেই শান্তিভঙ্গকারী উত্তেজনা-উন্মত্ততা হইতে আপনাকে নিবৃত্ত রাখিয়া ‘তোমারি নাম বলব’, ‘ভোরের বেলা কখন এসে’ প্রভৃতি সরলমধুর গান রচনা করা আমার কাছে অত্যন্ত বিস্ময়কর বলিয়া মনে হয়। এ-সকল গানের নীচে ‘Cheyne Walk, London’ লেখা না থাকিলে এ গানগুলি ইংলণ্ডে রচিত এ কথা মনে করাই অসম্ভব হইত। ইংলণ্ডে গুণীসমাজ কবির গলায় যে প্রশংসার মণিহার পরাইয়া দিয়াছিলেন সে সম্বন্ধে একটিমাত্র গান গীতিমাল্যে আছে—‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে’।

 কবির সৌন্দর্যসাধনা যেমন ‘কড়ি ও কোমল’ ও ‘চিত্রাঙ্গদা’র ভোগপ্রদীপ্ত বর্ণ-উজ্জ্বলতায় প্রথম সূচনা প্রাপ্ত হইয়া ক্রমে ‘সোনার তরী’ ‘চিত্রা’র ‘মানসসুন্দরী’, ‘উর্বশী’ প্রভৃতি কবিতার বর্ণপ্রাচুর্যে ও বিলাসে বিচিত্র হইয়া অবশেষে ক্ষণিকার বর্ণবিরল ভোগবিরত সুগভীর স্বচ্ছতায় পরিণতি লাভ করিয়াছিল, সেই রূপ নৈবেদ্য খেয়া গীতাঞ্জলির ভিতর দিয়া ক্রমশ কবির অধ্যাত্মসাধনা এই গীতমাল্যে বিচিত্রতা হইতে ঐক্যে, বেদনা হইতে মাধুর্যে, বোধপ্রাখর্য হইতে সরল উপলব্ধিতে পরিণত হইয়াছে। উপনিষদে আছে, ‘পাণ্ডিত্যং নির্বিদ্য বাল্যেনানুতিষ্ঠেৎ’—পাণ্ডিত্যকে, অর্থাৎ বেদাধ্যয়নজনিত সংস্কারগত বুদ্ধিকে, দূর করিয়া বাল্যে, অর্থাৎ উপলব্ধির সারল্যে, প্রতিষ্ঠিত হও। গীতিমাল্যের ৩১-সংখ্যক কবিতার আছে যে, কবি সমস্ত জীবনের পশরা মাথায় করিয়া হাঁকিয়া ফিরিয়াছেন―কে তাহাকে কিনিয়া লইবে? মান নয়, ধন নয়, সৌন্দর্য নয়, কিন্তু সংসারসাগরতীরে যে শিশু ঝিনুক লইয়া আপন-মনে খেলিতেছে সেই তাঁহাকে বলিল, ‘তোমায় অমনি নেব কিনে।’ তাহারই কাছে সব বোঝা নামিল, সেই বিনা মূল্যে কবিকে কিনিয়া লইল। তাই ‘যে সুর ভরিলে ভাষাভোলা গীতে, শিশুর নবীন জীবনবাঁশিতে,’ সেই সুরে গীতিমাল্যের সরল গানগুলি বাঁধা হইয়াছে।

বিনা প্রয়োজনের ডাকে
ডাকব তোমার নাম,
সেই ডাকে মোর শুধু শুধুই
পূরবে মনস্কাম।
শিশু যেমন মাকে
নামের নেশায় ডাকে,
বলতে পারে এই সুখেতেই
মায়ের নাম সে বলে।

···

আমার মুখের কথা তোমার
নাম দিয়ে দাও ধুয়ে,
আমার নীরবতায় তোমার
নামটি রাখ থুয়ে।···
জীবনপদ্মে সংগোপনে
রবে নামের মধু,
তোমায় দিব মরণক্ষণে
তোমারি নাম বঁধু।

 ব্রাউনিঙের The Boy and the Angel নামক একটি কবিতায় আছে যে, একটি কাঠুরিয়া ছেলে বনে কাঠ কাটিত আর সর্বদাই ঈশ্বরের নামগান করিত। সেই গান স্বর্গে ঈশ্বরের সিংহাসনতলে গিয়া পৌঁছিত এবং তাঁহাকে পুলকিত করিত। তিনি স্বর্গের দেবতাদিগকে বলিতেন, সূর্য চন্দ্র গ্রহ তারা যে দিবানিশি আমার বন্দনাগান করিতেছে সে গানের সুর প্রাচীন, তাহা অনাদিকাল হইতে ধ্বনিত হইতেছে। কিন্তু ঐ-যে একটি ছেলে আমায় ডাকে, ঐ ডাক আমার বুকে লাগিয়াছে—ঐ ডাকের মতো মিষ্ট ডাক আর শুনি নাই।

 ঈশ্বরের এই কথা শুনিয়া স্বর্গের দেবতাগণ লজ্জায় অধোমুখ হইলেন। এঞ্জেল গেব্রিয়েল পাখা মেলিয়া পৃথিবীতে চলিয়া আসিলেন এবং সেই বালকের দেহ ধারণ করিয়া সেই কাঠ কাটার কাজে নিরত রহিলেন। তিনি সেই কাঠ কাটেন এবং ঈশ্বরের নামগান করেন।

 বালক গেল মরিয়া। সে দেহান্তর ধারণ করিয়া রোমের পোপ হইল। পোপ হইয়া সে গির্জায় বড়ো গলায় বড়ো সুরে ঈশ্বরকে ডাকিতে লাগিল।

 ঈশ্বর বলিলেন, আমার সমস্ত সৃষ্টির সংগীত যে বন্ধ হইয়া গেল—‘I miss my little human voice!’ আমি সেই ক্ষুদ্র মানবকণ্ঠটি যে আর শুনি না।

 গেব্রিয়েল সে সুর কেমন করিয়া পাইবেন? আর পোপের সুর, সেও যে স্বতন্ত্র।

 গেব্রিয়েল তখন লজ্জিত হইয়া পোপের প্রাসাদে আসিয়া পোপকে দেখা দিলেন। বলিলেন, আমি তোমার দেহ ধারণ করিয়া তোমার সুর সাধিবার বৃথা চেষ্টা করিতেছিলাম। আমি পারিলাম না। যাও, তুমি তোমার স্থানে পুনরায় গিয়া পূর্ববৎ ঈশ্বরের নামগান করো।

 ব্রাউনিং এই The Boy and the Angel কবিতায় যে কথাটি বলিতে গিয়াছেন তাহা ওই একটিমাত্র ‘তোমারি নাম বলব’ গানে, তত্ত্বরূপে নয়, সেই ‘human voice’-রূপে ব্যক্ত হইয়াছে। এই গানেই ‘তোমার সিংহাসনের আসন হতে এলে তুমি নেমে’ এই গান সত্য হয়। এ গানে তত্ত্বের কথা নাই, সাধনার কথা নাই। এ কেবল সেই একটি ডাক—সেই একটিমাত্র ডাক এমন পরিপূর্ণ, এমন গভীর, এমন সরল ষে তাহাতে এই আশ্বাস সুনিশ্চিতরূপে পাওয়া যায়—

আমার  সকল কাঁটা ধন্য করে
ফুটবে গো ফুল ফুটবে।
আমার  সকল ব্যথা রঙিন হয়ে
গোলাপ হয়ে উঠবে।

গীতিমাল্যে অধ্যাত্মসাধনার সংশয়-সংগ্রাম-বেদনা-অপেক্ষা-লীলায়িত বিচিত্র অবস্থা ও অনুভাবের গান যথেষ্ট নাই, এ কথা আমি পূর্বেই বলিয়া আসিয়াছি। গীতাঞ্জলি হইতে গীতিমাল্যের এইখানেই শ্রেষ্ঠত্ব এ কথাও আমি বলিয়াছি।

 বাস্তবিক গীতিমাল্যে কবি যেখানেই তাঁহার ভিতরকার সাধনার কথা ব্যক্ত করিয়াছেন সেখানেই তিনি সাধনার পথ সম্বন্ধে সংশয় প্রকাশ করিয়াছেন। আমাদের দেশে অধ্যাত্মসাধনার যে-সকল মার্গ নির্দিষ্ট আছে সে-সকল কোনো পন্থারই তিনি পন্থী নহেন। বিবেক-বৈরাগ্য বা শমদমাদিসাধন, শ্রবণ-মনন-নিদিধ্যাসন প্রভৃতি যোগসাধন, বৈষ্ণবের শান্তদাস্যাদি পঞ্চরসের সাধন—এ কোনো সাধন প্রণালীই তাঁহার জীবনের পক্ষে উপযোগী নয়। তাঁহার পথ তাঁহার আপনার পথ—কোনো শাস্ত্র বা গুরুর দ্বারা সে পথ নির্দেশিত হয় নাই।

 ইউরোপীয় মিষ্টিক সাধকদিগের পন্থা প্রণালী বা সাধনার ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার সঙ্গেও তাঁহার পন্থার বা সাধনার অবস্থার কোনো মিল নাই। প্রথমত তাঁহারা যাহাকে conversion বলেন, অর্থাৎ চৈতন্যের অকস্মাৎ উদ্‌বোধন এবং ধর্মজীবনের জন্য ব্যাকুলতা; তার পর যাহাকে purgative stage বলেন, অর্থাৎ সংসারবৈরাগ্য পাপবোধ দীনতা এবং আত্মত্যাগ; তার পর যাহাকে illuminative stage বলেন, যখন ঈশ্বরের সহবাসজনিত ভূমানন্দ সাধকের চিত্তকে উদ্‌বেলিত করিয়া তোলে, যখন বহির্লোকে ‘ঊর্ধ্ব পূর্ণ অধঃ পূর্ণ পূর্ণ সর্বচরাচর’ এবং চিদ্‌লোকে নানা visions বা দর্শন স্বেদকম্পপুলক প্রভৃতি রসভাবকে উদ্রিক্ত করে; এবং সর্বশেষ চরম অবস্থায় যাহাকে unitive stage বলেন, জীবাত্মা-পরমাত্মায় অচ্ছেদ্য একাত্মতা—সে-সকল অবস্থা এবং সে-সকল অবস্থালাভের জন্য সাধনপ্রণালী রবীন্দ্রনাথের ধর্মজীবনক্ষেত্রে মেলে কি না দেখিতে গেলে ব্যর্থমনোরথ হইয়া ফিরিতে হইবে।

 রবীন্দ্রনাথের সাধনপন্থা এদেশীয় বা বিদেশীয় কোনো সাধনপন্থার সঙ্গে মেলে না। ইহাকে subjective individualism বল, স্বানুভূতি বল, আর যাই বল—তাহাতে কিছুই আসে যায় না। পৃথিবীতে এপর্যন্ত যে-কোনো সাধক যথার্থ কোনো সত্য উপলব্ধিতে আসিয়া পৌঁছিয়াছেন এবং কোনো সত্যবাণী প্রচার করিয়াছেন, তিনি আপনার পথেই আপনি চলিয়াছেন, দশের পথে যান নাই, শাস্ত্রবাক্যকে অভ্রান্ত বলিয়া মানেন নাই, গুরুকরণ করিয়া গুরুর হাতেই আপনার বুদ্ধিকে গচ্ছিত রাখেন নাই, একেবারে তীরের মতো সোজা সেই পরমলক্ষ্যে গিয়া বিদ্ধ হইয়াছেন। শরবৎ তন্ময়ো ভবেৎ—সেই তন্ময়তা যে কোথা হইতে তাঁহারা পাইয়াছিলেন, যাহাতে বিষয় তৃষ্ণা আপনি বিনা চেষ্টায় তিরোহিত হইয়াছে, প্রেম সর্বভূতে আপনি প্রসারিত হইয়াছে, এবং হৃদয়গ্রন্থিসকল আপনি ছিন্ন হইয়াছে, তাহার কোনো ইতিহাস নাই। পাতালের যোগশাস্ত্রের নির্দিষ্ট সাধনার ধাপ অনুসরণ করিয়া কোনো বড়ো সাধকের সাধনা সিদ্ধির পথে অগ্রসর হয় নাই। আগে purgative পরে illuminative পরে unitive—এমন করিয়া ধাপে ধাপে খৃষ্টীয় কোনো সাধকেরও সাধনের অবস্থাগুলি উন্নীত হয় নাই। শাস্ত্র, গুরু, মার্গ, এ-সমস্ত দশের জন্য। তাহাদের পক্ষে individualism বা ব্যক্তিতন্ত্রতা সত্য নহে। কিন্তু যিনি আপনার পথে আপনি চলিবেনই চলিবেন এবং সেই চলার দ্বারাই যাঁহার উপলব্ধি গভীর হইতে গভীরতর হয় তাঁহার পক্ষে নিজের পথে চলার বিপদ কোথায়? তিনিই তো আসল individual বা ব্যক্তি, তাঁহার individualism বা ব্যক্তিতন্ত্রতা তো যথার্থরূপে সার্থক; কারণ, তাহা তাঁহাকে ক্রমশ ব্যক্ত করিয়া তুলিবেই তুলিবে—সত্যে আনন্দে কল্যাণে পূর্ণতায় ব্যক্ত করিয়া তুলিবে। গীতিমাল্যে তাই কবি কোথাও ব্যর্থতার কান্না কাঁদেন নাই, তিনি বেশ জোরের সহিতই বলিয়াছেন—

মিথ্যা আমি কী সন্ধানে
যাব কাহার দ্বার।
পথ আমারে পথ দেখাবে
এই জেনেছি সার।

পথ আমারে পথ দেখাবে! সে পথ একমাত্র individualএর নিজস্ব পথ—সে পথের সঙ্গে অন্য কাহারও কোনো পথের সাদৃশ্য নাই।

তোমার জ্ঞানী আমায় বলে কঠিন
তিরস্কারে
‘পথ দিয়ে তুই আসিস নি যে
ফিরে যা রে।’
ফেরার পন্থা বন্ধ করে
আপনি বাঁধ’ বাহুর ডোরে,
ওরা আমায় মিথ্যা ডাকে
বারে বারে।

জানি নাই গো সাধন তোমার
বলে কারে।

‘জ্ঞানী’ হইতেছেন সেই-সব লোক যাঁহারা বিচারে প্রবৃত্ত হন—এ সাধনা ‘বস্তুতন্ত্র’ কি না, এটা subjective individualism’এর কোঠায় পড়ে কি না, এবং যদি পড়ে তাহা হইলে এ সাধনার শেষফল কী দাঁড়াইবে ইত্যাদি। এই-সকল লোক একটা সোজা মোটা কথা ভুলিয়া যান যে, জীবন জিনিসটা কোনো শ্রেণী বিভাগের মধ্যে ধরা দিবার মতো জিনিস নহে। সূর্যাস্তের সময়ে মেঘের মধ্যে যখন বর্ণচ্ছটার পর বর্ণচ্ছটা বিচিত্র হিল্লোলে হিল্লোলিত হইতে থাকে তখন সেই-সকল সূক্ষ্ম বর্ণবিভঙ্গের শ্রেণীনির্দেশকার্য যেমন কোনোমতেই সম্ভাবনীয় নহে, কারণ মুহূর্তে মুহূর্তে তাহার পরিবর্তন দেখা দেয়— সেইরূপ জীবন যেখানে স্বভাবত বিকাশলাভ করিতেছে সেখানে তাহার নিত্যনবীন অভাবনীয় গতিশীল পরিবর্তনশীল বৈচিত্র্যকে তত্ত্বের শৃঙ্খলে বাঁধিয়া শ্রেণীর খোপের মধ্যে পুরিবার চেষ্টা করা মিথ্যা। জীবন্ত সাধনার কতটুকু সাব্‌জেক্‌টিভ বা আত্মতন্ত্র, কতটুকু অব্‌জেক্‌টিভ বা বস্তুতন্ত্র—এ-সকল বিচার করিতে যাওয়াই মূঢ়তা মাত্র। এ তো জড়বস্তু নয় যে স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র কোঠায় গুঁজিয়া রাখা যাইবে—এ যে জৈববস্তু, এ যে নিত্যক্রিয়াশীল, নিত্যপরিবর্তনশীল। তাই কবি বড়ো খেদে বলিয়াছেন—

ওদের কথায় ধাঁদা লাগে,
তোমার কথা আমি বুঝি।
তোমার আকাশ তোমার বাতাস
এই তো সবই সোজাসুজি।
হৃদয়কুসুম আপনি ফোটে,
জীবন আমার ভরে ওঠে,
দুয়ার খুলে চেয়ে দেখি
হাতের কাছে সকল পুঁজি।

 কাণ্টের categories ভাঙিবার জন্য আধুনিক যুগে বের্গ্‌সঁর অভ্যুদয় হইয়াছে। কাণ্ট্ আইডিয়াকে স্থিত দেখিয়াছিলেন, বের্গ্‌সঁ তাহাকে চিরচঞ্চল চিরগতিশীল বলিয়া প্রমাণ করিতে চান। হেগেল ‘dialectic movement’ তত্ত্বে চিন্তার গতিশীলতা প্রতিপাদন করিলেও, নামের বন্ধন হইতে মুক্ত হইতে পারেন নাই। আশা করা যায় যে, এক সময়ে আমাদের দেশে যেমন বৈষ্ণব আচার্যেরা দ্বৈত ও অদ্বৈত-বাদের বিচিত্র বাদানুবাদের দ্বারা বিভ্রান্ত হইয়া ‘অচিন্ত্যভেদাভেদ’-নামক এক অভিনব তত্ত্বের উদ্ভাবন করিয়াছিলেন, তদ্রূপ কোনো তত্ত্ব ইউরোপেও উদ্ভাবিত হইবে। ভাইটালিজ্‌ম্ এ কালের সেই তত্ত্ব।

 Not law but aliveness, incalculable and indomitable is their motto; not human logic, but actual human experience is their text... The Vitalists see the whole cosmos as instinct with spontaneity; as above all things free. অর্থাৎ, নিয়ম নহে, কিন্তু অপরিমাণ ও অদম্য প্রাণময়তা এই তত্ত্বের আদর্শ; এই তত্ত্বের কথা এই যে, লজিকের দ্বারা কোনো সত্য স্থিরীকৃত হয় না, বাস্তব অভিজ্ঞতাই সত্যনির্ধারণের মানদণ্ড।

 এই তত্ত্বের তাত্ত্বিকগণ সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে স্বতঃস্ফূর্ত দেখেন―তাহা কোনো নিয়মনিগড়ের দ্বারা কোথাও বদ্ধ নহে, সর্বত্র মুক্ত। এক কথায়, এই তত্ত্ব বলে যে, জীবন সকল তত্ত্বের চেয়ে বড়ো। এই নূতন জীবনতত্ত্বই এই বাক্যের মর্ম বুঝিতে পারে—

আপনাকে এই জানা আমার
ফুরাবে না।
এই জানারই সঙ্গে সঙ্গে
তোমায় চেনা।

এই জীবনকে যতই জানা যাইবে ততই জীবনের জীবনকেও বেশি করিয়া চেনা যাইবে। কারণ, জীবনই একমাত্র তত্ত্ব। হুইট্‌ম্যান তাঁহার Assurances-নামক কবিতায় বলিয়াছেন—আমার ছত্রটি ঠিক স্মরণে নাই—I know that exterior has an exterior and interior has an interior—আমি জানি যে, যাহাকে বাহ্য বলি তাহারও একটি বাহির আছে, যাহাকে অন্তর বলি তাহারও একটি অন্তর আছে। সমস্ত বিশ্বতত্ত্ব জানার সঙ্গে সঙ্গে সেই অসীমের তত্ত্ব আরও স্ফুটতর হইবে, যেমন অধুনা বিজ্ঞানের দ্বারা হইতেছে। আত্মতত্ত্ব জানার সঙ্গে সঙ্গে সেই পরমাত্মতত্ত্ব আরও ব্যক্ততর হইবে।—

এই জানারই সঙ্গে সঙ্গে
তোমায় চেনা।

অনেক দিন হইতেই আমাদের দেশে দুইটি সাধনায় বিরোধ চলিতেছে—এক নিরাকার চৈতন্যস্বরূপ ব্রহ্মের সাধনা; আর একটি বৈষ্ণব সাধনা, অর্থাৎ রূপরসের নিবিড় উপলব্ধির ভিতর দিয়া অতীন্দ্রিয় রসস্বরূপের লীলাকে প্রত্যক্ষ করিবার সাধনা। কেবল তত্ত্বমাত্রসার সাধনায় শুষ্কতা আনে, কেবলমাত্র ভক্তিরসবিহ্বল সাধনায় মাদকতা আনে। এ দুয়ের মিলন চাই। কিন্তু সে মিলন তত্ত্বে হইলে চলিবে না, জীবনে হওয়া চাই। রবীন্দ্রনাথের মধ্যে সেই দ্বন্দ্বের সমাধান আমরা দেখিবার জন্য প্রতীক্ষা করিয়া আছি।

 গীতিমাল্যের শেষ গানগুলিতে তাহার আভাস পাই।—

ওদের সাথে মেলাও, যারা
চরায় তোমার ধেনু,
তোমার নামে বাজায় যারা বেণু।

পাষাণ দিয়ে বাঁধা বাটে
এই-যে কোলাহলের হাটে
কেন আমি কিসের লোভে এনু।
কী ডাক ডাকে বনের পাতাগুলি,
কার ইশারা তৃণের অঙ্গুলি।
প্রাণেশ, আমার লীলাভরে
খেলেন প্রাণের খেলাঘরে—
পাখির মুখে এই-যে খবর পেনু।
এ গান কোনো ভক্ত বৈষ্ণবের রচনা হইতে পারিত।

 কিন্তু ইহার সঙ্গে সঙ্গে আর একটি গানের কয়েক ছত্র উদ্ধৃত করি। সে গানটি কোনোমতেই কোনো বৈষ্ণবের দ্বারা রচিত হইতে পারিত না—

তার অন্ত নাই গো যে আনন্দে গড়া আমার অঙ্গ,
তার অণুপরমাণু পেল কত আলোর সঙ্গ।
ও তার অন্ত নাই গো নাই।···
সে যে প্রাণ পেয়েছে পান করে যুগ যুগান্তরের স্তন্য,
ভুবন কত তীর্থজলের ধারায় করেছে তায় ধন্য।
ও তার অন্ত নাই গো নাই।

 এই নরদেহ গড়িয়া উঠিবার অভিব্যক্তির ইতিহাসের স্তরে স্তরে যে ভগবানের আনন্দলীলা বিরাজিত তাহা উপলব্ধি করা এ কালের কবি ভিন্ন আর কোনো কালের কবির দ্বারা সম্ভাবনীয় ছিল না। ভগবানের অসীম আনন্দকে সীমারূপের মধ্যে নিবিড় করিয়া উপলব্ধি বৈষ্ণব কবির মধ্যে আমরা দেখিয়াছি। আবার সেই সীমারূপকে অসীম দেশে ও অসীম কালে ব্যাপ্ত করিয়া সীমার মধ্যে অসীমতাকে প্রত্যক্ষরূপে উপলব্ধি এ কালের ভক্ত কবিদের মধ্যে দেখিতেছি। টেনিসনের Flower in the crannied wall, ব্লেকের To see a world in a grain of sand, এই শেষোক্ত উপলব্ধির কাব্যের নমুনা। ‘তার অন্ত নাই গো যে আনন্দে গড়া আমার অঙ্গ’ এই শ্রেণীর কবিতা। ইহা হুইট্‌ম্যান বা এড্‌ওআর্ড্ কার্পেণ্টার লিখিতে পারিতেন। এ কাব্য এভোল্যুশনে জীবলীলার কাব্য।

 গীতিমাল্যের সম্বন্ধে, আমার আলোচনা শেষ করিলাম। গীতিমাল্যের পরে আমরা আর কী শুনিব? কিন্তু কবির প্রার্থনা তো আমরা জানি—

সুরে সুরে বাঁশি পুরে
মোরে আরো আরো আরো দাও তান।

অতএব আমরাও সেই ‘আরো আরো আরো’র অপেক্ষায় রহিলাম।

 ১৩২১