বিষয়বস্তুতে চলুন

কাব্যপরিক্রমা (১৯৫৮)/ছিন্নপত্র

উইকিসংকলন থেকে

ছিন্নপত্র

ইউরোপে কোনো বড়ো কবি বা মনীষী মারা গেলে তাঁহার জীবনচরিত, চিঠিপত্র, তাঁহার সম্বন্ধে ছোটো-বড়ো সকলপ্রকার জ্ঞাতব্য সংবাদ মোটা মোটা ভল্যুমে বাহির হইতে দেখা যায়। কবিদের সম্বন্ধে মানুষের কৌতূহল যেন কিছুতেই নিবৃত্ত হইতে চায় না—তাঁহারা যাহা প্রকাশ করিয়াছেন তাহাতে তৃপ্তি নাই, যাহা প্রচ্ছন্ন রহিয়াছে তাহাকেও সকলের ব্যগ্র দৃষ্টির সম্মুখে তুলিয়া ধরা চাই।

 এইজন্য অনেক সময় অঘটনের সৃষ্টি হয় এ কথা সত্য। এমন অনেক লোকের জীবনচরিত বাহির হয় যাহা বাহির না হইলে জগতের কোনো ক্ষতি ছিল না। চিঠিপত্র এমন অনেক প্রকাশিত হয় যাহা হইতে কবি সম্বন্ধে কোনো নতুন পরিচয় পাওয়া যায় না।

 বিশেষ কিছুই পাওয়া না গেলে তেমন অনিষ্টের হয় না—কিন্তু অনেক সময় এমন হয় যে, যে কবিকে তাঁহার রচনায় বড়ো বলিয়া জানিয়াছি, চিঠিপত্রে বা জীবনচরিতে তাঁহার মহিমা খর্ব হইয়া পড়ে। তাঁহার ভাবজীবন হইতে দৃষ্টিকে সরাইয়া বাস্তবজীবনে ফেলিতেই দেখি যে, মানুষটিকে যেমনটি কল্পনা করিয়াছিলাম তেমনটি নহে।

 এ-সকল আশঙ্কার কারণ সত্য হইলেও এখনকার কালে কবিদের প্রচ্ছন্ন থাকিবার কোনো উপায় নাই। কারণ, এ কথা সত্য যে, তাঁহাদের সম্বন্ধে যতই জানা যাইবে, ততই তাঁহাদিগকে বুঝিবার সাহায্য হইবে। অবশ্য তাঁহাদের জীবনের এমন অনেক দিক থাকিতে পারে যাহার সঙ্গে কাব্যের কোনো সম্বন্ধই নাই, যাহা নিতান্তই বাহিরের দিক। কিন্তু জীবনের ভিতর হইতে যখন কাব্য প্রতিফলিত হইতেছে তখন জীবনের অন্ধিতে সন্ধিতে যতই প্রবেশ করা যাইবে ততই অন্তর্লোকের এমন-সকল রহস্যের সন্ধান পাওয়া যাইবে যাহা কাব্যের পূর্ণ রসগ্রহণের পক্ষে অমূল্য। এইজন্য ছোটো-বড়ো সকল খবরই চাই—অনেক কিছু সংগ্রহ হইলে তখন তাহার মধ্য হইতে বাছিয়া লওয়া যাইতে পারে।

 ইউরোপের শ্রেষ্ঠ সমালোচক স্যাঁৎ ব্যভ (Sainte Beuve) যে-সকল লোকের সম্বন্ধে আলোচনা করিয়াছেন তাহা পাঠ করিলে দেখা যায় যে, তাঁহাদের সকলেরই চিঠিপত্র হইতে ও অন্যান্য নানা ছোটোখাটো ঘটনা হইতে তাঁহাদের অন্তরের প্রতিকৃতিটি তিনি আঁকিয়া তুলিতে পারিয়াছেন। জুবেয়ার, মাদাম রোল্যাঁ শীর্ষক তাঁহার প্রবন্ধগুলি পড়িলে এ কথা সুস্পষ্ট হইবে। ম্যাথু আর্নল্ড্ অনেক সমালোচনায় এই পন্থা অবলম্বন করিয়া কৃতকার্য হইয়াছেন।

 ইহার কারণ, চিঠিপত্র যে শুধুই সংবাদ বহন করিবার কাজ করে তাহা নহে, চিঠিপত্রও মানুষের ভাবপ্রকাশের একটা উপায়। যেমন নাট্য-উপন্যাসে, যেমন প্রবন্ধ গল্প বা গীতিকবিতায় মনের ভাবকে মানুষ বাহিরে স্থায়ী আকার দান করিয়া সার্থক হয়, চিঠিতেও আর-এক রকমে তাহার সেই কার্যই সাধিত হয়। উপন্যাসে বা নাটকে ব্যক্তিগত প্রকাশের স্থান অল্প—সেখানে চিত্তভাবকে নানা লোকচরিত্রের ঘাতপ্রতিঘাতের ভিতর দিয়া প্রশস্ত ক্ষেত্রে ছাড়া দিয়া প্রকাশ করিতে হয়। ছোটো গল্পে সে ক্ষেত্র আরো একটু সংকীর্ণ, কবিতাতে বা প্রবন্ধে আরো বেশি—সুতরাং সেখানে নিজের মনের কথা বেশ সহজেই বলা যাইতে পারে। কিন্তু বোধ হয় সকলের চেয়ে নিবিড়ভাবে মনের কথা বলা যায় চিঠিতে; তাহার কারণ চিঠিতে একমাত্র মনের মানুষকে বলা হয়, বাহিরের পাঠকসমাজ সেখানে প্রবেশ করিতে পায় না।

 ‘যেমন বাছুর কাছে এলে গোরুর বাঁটে আপনি দুধ জুগিয়ে আসে, তেমনি মনের বিশেষ রস কেবল বিশেষ বিশেষ উত্তেজনায় আপনি সঞ্চারিত হয়, অন্য উপায়ে হবার জো নেই। এই চারপৃষ্ঠা চিঠি মনের ঠিক যে রস দোহন করতে পারে, কথা কিম্বা প্রবন্ধ কখনোই তা পারে না।’

 কবিবর রবীন্দ্রনাথের নবপ্রকাশিত গ্রন্থ ‘ছিন্নপত্র’ হইতেই এই অংশটি উদ্ধৃত করিলাম। এই পুস্তকের সকল চিঠিতেই ঐ কথার প্রমাণ পাওয়া যায়। বাস্তবিক কবি ইহাতে আপনার যে পরিচয় দিয়াছেন তাহা তাঁহার কবিতা ও প্রবন্ধ হইতে স্বতন্ত্র, কারণ ইহাতে তাঁহার ভাবের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আপনি ধরা পড়িয়াছেন।

 সেইজন্য এই চিঠিগুলিতে কোনো কলাচাতুরী নাই, ভাষার ইন্দ্রজাল নাই। নানা লোকের হৃদয়ে প্রবেশের জন্য কবিকে স্বভাবতই যে-সকল মোহিনী মায়ার আশ্রয় লইতে হয়, নারীর অবগুণ্ঠনের মতো যে কারুপূর্ণ আবরণটুকু নহিলে তাঁহার সৌন্দর্যই প্রকাশ পায় না, এখানে তাহার কোনো আবশ্যকতা ঘটে নাই। কারণ, এখানে একজনের কাছেই সব বলা হইতেছে।

 কিন্তু কবির জীবিতকালে এই পত্রগুলি প্রকাশিত হইতেছে বলিয়া ইহাদিগকে তিনি ছিন্ন আকারে উড়াইয়া দিয়াছেন। অর্থাৎ, সবটা দিতে পারেন নাই। সম্ভবত সংকোচ তাহার কারণ। এই জন্য এই চিঠির টুকরাগুলির মধ্যে সেই ব্যক্তিগত রসটি নাই, চিঠিমাত্রেরই যেটি বিশেষ রস। একটি পূর্ণপ্রস্ফুটিত কমল শতদলে বিদীর্ণ হইয়া বিক্ষিপ্তভাবে ইতস্তত ভাসিয়া বেড়াইলে তাহার যেমন অবস্থা হয়, এই ছিন্নপত্রগুলিরও সেইরূপ অবস্থা হইয়াছে। ইহার প্রত্যেকটি পত্র সেই নন্দনগন্ধটুকু বহন করিতেছে বটে, কিন্তু ছিন্ন হইবার বেদনার রক্তলেখা ইহাদের গায়ে লাগিয়া আছে।

 কিন্তু না, আমি বোধ হয় ভুল করিতেছি। এ চিঠিগুলি ঠিক ছিন্নদলের মতো নয়, কারণ ইহাদের মধ্যে একটি ভাবসামঞ্জস্য দেখিতে পাইতেছি। ১৮৮৫ হইতে ১৮৯৫ খৃস্টাব্দ―দশ বৎসর কালের এই চিঠিগুলি। কিন্তু পড়িতে পড়িতে এই দীর্ঘকালের ব্যবধান কিছুই অনুভূত হয় না। দশ বৎসরে কত বড়ো বড়ো পরিবর্তন হইয়া যাইতে পারে, কত রাজ্য-সাম্রাজ্য ভাঙিতে পারে গড়িতে পারে, কত কীর্তি ভূমিসাৎ হইতে পারে, কিন্তু একটি মানুষের নদীর উপরে নৌকাবাসের জীবনে পরিবর্তন নাই। মালার সূত্রে ফুলের পর ফুলের মতো দিনের পর দিন গ্রথিত হইয়া চলিয়াছে, পূর্ণ বিশ্বসৌন্দর্যের পায়ে নিবেদনের একটি সাজি সুগন্ধে আমোদিত হইয়া ভরিয়া উঠিয়াছে। কী নিবিড়, কী গভীর, কী আশ্চর্য এই মানুষটির অনুভূতি এবং উপভোগ। মনে হয় পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য সার্থক যে, একজনও তাঁহাকে এমন একান্ত আগ্রহে, এমন বিস্ময় বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে হৃদয় ভরিয়া দেখিয়াছে।

 পরিপূর্ণ সৌন্দর্যানুভূতির এই ভাব ঐক্য এই ছিন্নপত্রগুলির মাঝখানে সূত্রের মতো থাকায় ইহারা আর এলোমেলোভাবে উড়িতে পারে নাই। ইহাদের মধ্যে এই একটিমাত্র কথা—

‘হে চিরসুন্দর, আমি তোরে ভালোবাসি।’

তাহাই ‘শেষ কথা’ এবং চিরকালের কথা। সোনার ভাবের কালীতে লেখা পরম সুন্দর কথা।

 তথাপি এগুলি ছিন্ন করিবার বেদনা আমার মন হইতে মুছিতেছে না। চিঠিকে সাহিত্যের কড়া বাটখারায় ওজন করিয়া তাহার কতটুকু রাখিতে হইবে এবং কতটুকু ছাঁটিতে হইবে তাহা হিসাব না করিলেই ভালো হয়। কারণ, চিঠি তো আর সাহিত্যের মতো করিয়া লেখা হয় নাই, তাহার অলংকারের অভাবই তাহার সকলের চেয়ে বড়ো মূল্য। অবশ্য চিঠির মধ্যে ব্যক্তিগত অংশ বেশি থাকিলে তাহা সর্বসাধারণের উপভোগ্য হয় না—কিন্তু এ-সকল চিঠিতে কেহ তো গয়লার হিসাব বা সংসার খরচের তালিকা প্রত্যাশা করে না। এ তো কাজের চিঠি নয়, ভাবের চিঠি। মানুষকে লেখা হইলেও এ স্থলে মানুষ অনেকটা পরিমাণেই উপলক্ষ। বোধ হয়, বিশ্বপ্রকৃতি যদি ভাষা জানিত এবং তাহার সঙ্গে মোকাবিলায় আলাপের কোনো সুযোগ থাকিত, তবে এই চিঠিগুলি তাহারই নিকটে প্রেরিত হইত। সুতরাং এ চিঠিগুলি যেমন ছিল তেমনি বাহির করিলে কী ক্ষতি ছিল!

 হিসাব করিয়া দেখি, ‘মানসী’ ‘সোনার তরী’ ও ‘চিত্রা’ যে সময়ের মধ্যে রচিত হইতেছে, ‘সাধনা’ চলিতেছে, এবং গল্পগুচ্ছ একটির পর একটি করিয়া তৈরি হইতেছে, এই চিঠিগুলি সেই সময়ের। মানসীর সময়ের চিঠি অতি অল্পই আছে, বোধ হয় শ্রীশবাবুর নিকটে লিখিত গোড়াকার চিঠিগুলি বাদে আর বেশি নাই। অধিকাংশ চিঠিই সোনার তরী ও চিত্রা রচনার সময়ের, এবং প্রায়ই শিলাইদহ ও পতিসর হইতে লিখিত। তখন জমিদারি পরিচালনার কার্যে কবি বোটে বাস করিতেছিলেন।

 ইহার পূর্বে বাংলাদেশের এমন ঘনিষ্ঠ পরিচয়-লাভের সুযোগ কবির ঘটে নাই। জীবনস্মৃতিতে দেখি যে, ‘সন্ধ্যাসংগীত’ রচনাকালে চন্দননগরের গঙ্গাতীরে এবং ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’ লিখিবার সময়ে গুজরাট অঞ্চলে কারোয়ারের সমুদ্রতীরে বাস ব্যতীত, বিশ্বপ্রকৃতির সহবাস কবির ভাগ্যে বেশি ঘটে নাই। অবশ্য তাহাতে কবির চিত্ত যে উপবাসী হইয়া ছিল এমন নয়—কারণ ‘যিনি দেনেওয়ালা তিনি গলির মধ্যে এক মুহূর্তে বিশ্বসংসারকে দেখাইয়া দিতে পারেন’—সৌন্দর্য-উপভোগ বাহিরের আয়োজনের উপর নির্ভর করে না। তথাপি মনে হয় যে, এই সময়ে নদীপথে নৌকায় করিয়া ঘুরিয়া বেড়াইয়া বাংলার গ্রাম্য প্রকৃতি ও গ্রাম্যজীবনের প্রত্যক্ষ পরিচয় না লাভ করিলে কবির স্বাভাবিক বিশ্বানুভূতি কখনোই বাস্তব রূপ পাইত না। ‘স্বর্গ হইতে বিদায়’, ‘বৈষ্ণব কবিতা’, ‘পুরস্কার’, ‘বসুন্ধরা’, ‘জীবনদেবতা’ প্রভৃতি যে-সকল কবিতা ভাবে ও প্রকাশে ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করিয়া বিশ্বের জিনিস হইয়া উঠিয়াছে, যাহাদের অর্থ সীমাবদ্ধ তত্ত্বমাত্র নহে কিন্তু বিচিত্ররূপে ব্যঞ্জনাপূর্ণ, যাহাদের ভিতরকার দৃষ্টি বিশ্বপ্রসারিত, এবং প্রকাশ উপমায় ও রূপে জীবন্ত ও বস্তুগত—আমি তো কখনোই মানিতে রাজি নই যে কবি আপনার ভাবজীবনকে পরিপুষ্ট করিয়া লইবার এমন অবসর না পাইলে সে-সকল কবিতায় এরূপ প্রসার, বিচিত্রতা ও সত্যতা কদাচ দেখা যাইত।

 সুতরাং আমি দেখিতে পাইতেছি যে, এই চিঠিগুলির মধ্যে সেইসকল কবিতাসৃষ্টির ও গল্পসৃষ্টির মূল উৎস পাওয়া যায়। এই-যে নিগূঢ় সৌন্দর্য উপভোগ এবং তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, প্রকৃতির সঙ্গে এই-যে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা, ইহার মধ্যে সেই রসটি রহিয়াছে যে রসে কলম ডুবাইয়া কবি তাঁহার অমর কাব্য ও গল্প-সকল রচিয়াছেন। সুতরাং সে দিক দিয়াও এগুলি পরম আদরের সামগ্রী হইবে সন্দেহ নাই। উদাহরণস্বরূপে কালিগ্রাম হইতে লিখিত জানুয়ারি ১৮৯১ তারিখের পত্রখানি লওয়া যায়: ‘মনে হয় পৃথিবীর কাছ থেকে আমরা যে সব পৃথিবীর ধন পেয়েছি, এমন-কি কোনো স্বর্গ থেকে পেতুম? স্বর্গ আর কী দিত জানি নে, কিন্তু এমন কোমলতা-দুর্বলতা-ময়, এমন সকরুণ-আশঙ্কা-ভরা অপরিণত এই মানুষগুলির মতো এমন আপনার ধন কোথা থেকে দিত?’ ইত্যাদি। ‘যেতে নাহি দিব’, ‘দরিদ্রা বলিয়া তোরে বেশি ভালোবাসি হে ধরিত্রী’, ‘স্বর্গ হইতে বিদায়’ প্রভৃতি কবিতার ভিতরকার কথা কি এই চিঠির কথার সঙ্গে সায় দেয় না? এমন প্রায় অনেক চিঠিতেই এই সময়কার কোনো-না-কোনো পরিচিত কবিতার সঙ্গে ভাবের সাদৃশ্য পাওয়া যাইবে। শুধু কবিতা নয়, অনেক গল্পের প্লটের ও গদ্যরচনার ইতিহাসও এই চিঠিগুলির মধ্যে লুকাইয়া রহিয়াছে। ‘সমাপ্তি’র মৃন্ময়ী ৪ জুলাই ১৮৯১ তারিখের চিঠিতে ধরা পড়িয়াছে, সাজাদপুরের (১৮৯১ জুন) একটি চিঠিতে ‘ছুটি’ গল্পের ফটিক চক্রবর্তী ছেলেটিকে দেখা গিয়াছে।

 তাই বলিতেছিলাম যে, এই চিঠিগুলি সেই কবিতা ও গল্প রচনার মতোই আর-এক রকমের আত্মপ্রকাশ। সেই-সকল কথাই অন্য আকারে এখানে প্রকাশ পাইয়াছে।

 এগুলি পড়িতে পড়িতে একটি জিনিস কেবলই মনে হয় যে, কবির সঙ্গে প্রকৃতির আত্মীয়তা কী আশ্চর্যরূপে গভীর! কবিতাতে অবশ্য তাহার পরিচয় যথেষ্ট পাইয়াছি, কিন্তু চিঠিতে আরো অধিক করিয়া পাইলাম। চিঠিগুলিতে চিন্তার কথা অল্পই আছে—ছাপা পুস্তকের গল্প এখানে-সেখানে উঁকি মারিবামাত্র নিরস্ত হইয়াছে। কেবল এই প্রতিদিনের সকাল দুপুর সন্ধ্যা রাত্রি, মেঘ ঝড় বাদল, নদীর তীর, স্নানের ঘাট, গ্রামের সরল জীবনযাত্রা—ইহার খবর কি দিনের পর দিন দিয়াও তাহা কোনোমতে ফুরাইতে চায়! যে-সকল সংবাদ অন্য লোকের কাছে তুচ্ছ, যাহা চোখ দিয়া দেখিলেও মনের মধ্যে লেশমাত্র রেখাপাত করে না, সেই-সকল সংবাদ এই পত্রগুলি নিত্য বহন করিয়াছে এবং নিঃসংশয়ে প্রমাণ করিয়াছে যে, মানুষের জগতের সকলের চেয়ে বড়ো সংবাদের চেয়ে ইহারা কোনো অংশে ন্যূন নহে। বরং জীবনে এই-সকল স্মৃতির সঞ্চয় অন্য সকল সঞ্চয়ের চেয়ে মূল্যবান।

 ভাবিয়া দেখি প্রকৃতির এমন পরিপূর্ণ উপভোগ আর কোথায় দেখিয়াছি। ওয়ার্ড্‌স্‌ওআর্থ্? কিন্তু তাঁহার সঙ্গে প্রকৃতির সম্বন্ধ যেন হিমাচলে ধ্যান নিমগ্ন অনুত্তরঙ্গ শিবের সঙ্গে সেবারতা পার্বতীর সম্বন্ধের মতো। প্রকৃতির সেই গভীরতম প্রাণলোকের সমাহিত ভাবটিই তাঁহার কাছে অধিক চিত্তহারী।

 তার পর মনে পড়ে আমিয়েলের জর্নাল। কিন্তু ফিলজফির ভারে আমিয়েল একেবারে ভারাক্রান্ত—ধর্ম সমাজ সভ্যতা প্রভৃতির কত জটিল সমস্যা ও প্রশ্ন লইয়া তিনি ব্যস্ত। ইহার মধ্যে মধ্যে প্রকৃতির সৌন্দর্য যদিচ ‘পাষাণ-গলা সুধা’র মতো ঝরিয়া পড়িয়াছে, তথাপি এই ছিন্নপত্রের মতো আমিয়েলের ডায়ারিগুলি এমন একটানা প্রবাহ রক্ষা করে নাই। স্থানে স্থানে চিন্তার শৈল আসিয়া সেই সোনার স্রোতের পথরোধ করিয়া দাঁড়াইয়াছে। তার পর থোরোর ‘ওয়াল্ডেন্’এ প্রকৃতির সহবাসের খানিকটা রস পাওয়া যায় বটে, কিন্তু থোরোর প্রকৃতিতে বাস আধুনিক সভ্যতার সহিত বিরোধ—তাহা কতকটা রুশো জাতীয়। এমন স্নিগ্ধ সরল সুগভীর আনন্দময় বাস নহে।

 বরং আমিয়েলের জর্নালের সঙ্গেই ছিন্নপত্রের কতকটা সাদৃশ্য পাওয়া যায়। কারণ, এই চিঠিগুলিতে যেমন চিত্রের পর চিত্র অঙ্কিত হইয়া চলিয়াছে, সকলগুলিতেই কবির উপভোগ এবং তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের পরিচয় বিদ্যমান—তেমনি আর-একটি ভাবের ও চিন্তার মালা সেই চিত্রমালার সঙ্গেই গ্রথিত হইয়া চলিয়াছে যাহা আমিয়েলের জর্নালের কথাই বিশেষভাবে স্মরণ করাইয়া দেয়। কবি এই ছিন্নপত্রে এক জায়গায় সেই জর্নাল সম্বন্ধে যাহা লিখিয়াছেন, আমার মনে হয় তাঁহার এই গ্রন্থ সম্বন্ধে সে কথা আরো বেশি করিয়া খাটে—‘এমন অন্তরঙ্গ বন্ধু আর খুব অল্প ছাপার বইয়ে পেয়েছি। ···অনেক সময় আসে যখন সব বই ছুঁয়ে ছুঁয়ে ফেলে দিতে হয়, কোনোটা ঠিক আরামের বোধ হয় না―যেমন রোগের সময় অনেক সময় বিছানায় ঠিক আরামের অবস্থাটি পাওয়া যায় না, নানা রকমে পাশ ফিরে দেখতে ইচ্ছে করে―কখনো বালিশের উপর বালিশ চাপাই, কখনো বালিশ ফেলে দিই—সেইরকম মানসিক অবস্থায় আমিয়েলের যেখানেই খুলি সেখানেই মাথাটি ঠিক গিয়ে পড়ে, শরীরটা ঠিক বিশ্রাম পায়।’

 ছিন্নপত্রও সেইরূপ ‘অন্তরঙ্গ বন্ধু’র মতো বলিয়া ইহার স্থানে স্থানে উদ্ধৃত করিয়া দেখানো নিস্প্রয়োজন। এমন-কি, ইহা আগাগোড়া পড়িয়া যাইবারও বিশেষ প্রয়োজন নাই। যেখানে খুশি সেখানে খুলিয়া পড়া যাইতে পারে। শহরের গোলমালের মধ্যে, নানা কাজের ভিড়ে একটুখানি অবসর করিয়া লইয়া আমরা এই বইখানির যেখানেই খুলিয়া পড়িব, সেখানেই নিমেষের মধ্যে বাংলার নদীতীরবর্তী গ্রামের সরল সৌন্দর্যের উপর দিয়া সমস্ত মনকে বুলাইয়া লইয়া যাইতে পারিব এবং ভাবের রসে আপনাকে সহজেই রসাইয়া পরম আনন্দ-উপভোগের অধিকারী হইব। চিত্তের সকল ভার ইহা লঘু করিয়া দিতে তিলমাত্র বিলম্ব করিবে না।

 ১৩১৯